📄 অনুবাদকের কথা
ইতিহাস ও গল্পের প্রতি মানুষের আকর্ষণ জন্মগত-স্বভাবজাত। ইতিহাস আলোচনা করলে, গল্প দিয়ে কোনো কঠিন বিষয়কে ফুটিয়ে তুললে ভালো লাগে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। মানুষের এই জন্মগত ও স্বভাবজাত বিষয়কে আল্লাহ তাআলা ও তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পূর্ণরূপে গুরুত্ব প্রদান করেছেন। কুরআন কারিমের অগণিত আয়াত এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বহু হাদিসে এর প্রমাণ রয়েছে।
আপনি যদি সুরা বাকারা, সুরা ইউসুফ, সুরা নমল, সুরা নাহাল, সুরা কাহাফ, সুরা মারয়াম এবং সুরা ফিল তিলাওয়াত করেন, সেগুলোর তাফসির পড়েন, বুখারি শরিফ ও মুসলিম শরিফ থেকে আরম্ভ করে হাদিসের অন্যান্য কিতাবাদি অধ্যয়ন করেন, তাহলে অগণিত ও অজস্র ইতিহাস ও গল্পের সন্ধান পাবেন। আল্লাহ তাআলা তো সুরা ইউসুফের শুরুতেই বলেছেন—
نَحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ أَحْسَنَ الْقَصَصِ 'আমি আপনার প্রতি সবচেয়ে সুন্দর ঘটনাটি বর্ণনা করবো'। [সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৩]
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা কত নান্দনিকভাবে বান্দার দৃষ্টি ও মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন! কেন এই প্রয়াস? আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে ইরশাদ করেছেন—
لَقَدْ كَانَ فِي قَصَصِهِمْ عِبْرَةٌ لِأُولِي الْأَلْبَابِ 'নিশ্চয় তাদের ঘটনাগুলোর মাঝে রয়েছে জ্ঞানীদের জন্য শিক্ষা।' [সুরা ইউসুফ, আয়াত: ১১১]
প্রথম আয়াতের তাফসিরে ইমাম কুরতুবি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, 'কুরআন কারিমে বর্ণিত ঘটনাগুলো সুন্দর হওয়ার কারণ হলো, এগুলো মানুষকে সৌভাগ্যের পথে পরিচালিত করে।'[১]
একটি হাদিসে বর্ণিত আছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে হজরত সাহাবায়ে কেরাম গল্প শোনার আবেদনের প্রেক্ষিতেই আল্লাহ তাআলা সুরা ইউসুফ অবতীর্ণ করেছেন। যা প্রমাণ করে, শিক্ষণীয় গল্প শোনা এবং গল্পের প্রতি আসক্তি থাকা মন্দ নয়।[২]
আমাদের বর্তমান, নিকট অতীত এবং দূর-অতীতের সকল পূর্বসূরি বিষয়টির গুরুত্ব খুব ভালোভাবে অনুধাবন করেছেন। ফলে তাদের হাতে বহু ইতিহাস ও গল্পের কিতাব রচিত হয়েছে। আমাদের নিকট-আকাবিরের মাঝে হাকিমুল উম্মাত আশরাফ আলি থানবি, কারি তৈয়্যব সাহেব এবং জীবন্ত কিংবদন্তি শাইখুল ইসলাম তাকি উসমানি যার উৎকৃষ্ট উপমা।
এই ধারাবাহিকতায় আরব আলেমদের মাঝে প্রখ্যাত আলোচক এবং বিশ্বখ্যাত লেখক ড. শাইখ আবদুর রহমান আরিফি অন্যতম। কুরআন সুন্নাহকে মেনে চলার আগ্রহ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করার জন্য 'কিসাসুল আরিফি' নামে অতীত ও বর্তমান যুগের শতাধিক গল্পবহুল একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। লেখক তার গল্পের মাধ্যমে কোথাও নেককাজের জ্যোতির্ময়তা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন, কোথাও চেষ্টা করেছেন পাপকাজের কদর্যতা বর্ণনা করার। কোথাও তুলে ধরেছেন কল্যাণময় কাজের পুরস্কারের কথা, কোথাও বদ-কাজের শাস্তির কথা। কোথাও তুলে ধরেছেন ধোঁকা ও প্রতারণার উচিত শিক্ষা, কোথাও চেষ্টা করেছেন ইনসাফের যথাযোগ্য প্রাপ্তির। এভাবে আমাদের জীবনে ঘটমান প্রায় প্রতিটি বিষয়ের ফল ও প্রতিফল তিনি গল্পের মাধ্যমে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু গল্পগুলো শুধু গল্পই নয়, বরং সেগুলোর কোনোটি হাদিস, কোনোটি ইতিহাস এবং কোনোটি কুরআন কারিমের বর্ণনা। পাঠক-মাত্রই কিতাবটি পড়ে আপ্লুত হবেন এটাই স্বাভাবিক।
কিতাব এবং বিষয়বস্তুর উপকার ও অপরিহার্যতা উপলব্ধি করে মুহাম্মদ পাবলিকেশন-এর স্বত্বাধিকারী মুহাম্মদ আবদুল্লাহ খান কিতাবটি অনুবাদ করার জন্য আমাকে প্রস্তাব করেন। তার আগ্রহ ও কিতাবের বিষয়বস্তু বিবেচনায় আমি 'বিসমিল্লাহ' বলে এর অনুবাদের কাজ আরম্ভ করি।
আল্লাহর অশেষ রহমতে খুব অল্প সময়েই অনুবাদের কাজটি শেষ হয় আলহামদুলিল্লাহ।
বইটির ভাষা-উপস্থাপনা সুন্দর ও সাবলীল করতে লেখক, অনুবাদক ও বহুগ্রন্থ সম্পাদক সালমান মোহাম্মদ আমাকে চিরঋণী করে রেখেছেন। এ কাজে লেখক ও অনুবাদক হাফিজুর রহমানের সহযোগিতাও ভুলবার নয়।
বইটি এ পর্যায়ে নিয়ে আসতে অনুবাদক, সম্পাদক ও প্রকাশকসহ যে যেভাবে সহযোগিতা করেছেন আল্লাহ সকলের মেহনত কবুল করুন। আমিন, ইয়া রাব্বাল আলামিন।
-আবদুন নুর সিরাজি
শিক্ষক, ফুলবাড়ি মাদরাসা, বগুড়া
১০. ০৯. ২০১৯
টিকাঃ
[১] তাফসির কুরতুবি: ৯/১২০
[২] মুস্তাদরাক হাকেম: ৭/৪৫৯
📄 ইস্তেগফার : কল্যাণ ও সফলতার রাজপথ
পার্থিব জীবন মোহ-মায়াময়। এর পরতে পরতে রয়েছে নানাবিধ জটিলতা। বাঁকে- বাঁকে রয়েছে বহুবিধ পরীক্ষা আর চড়াই-উৎরাইয়ের পিচ্ছিল গিরিপথ। কখনো পরীক্ষার দমকা হাওয়া এলোমেলো করে দেয় সাজানো সবকিছু। কর্দমাক্ত করে স্বপ্নের সফেদ আঙিনা। কঠিন চোরাবালি টেনে ধরে শরীর-মন। আবার কখনো-বা হতাশার ঘনকালো মেঘ নিমিষেই সরে যায় মাথার ওপর থেকে। সোনালি রঙে সেজে ওঠে জীবনাকাশ। এই নিবিড় সুখ-দুঃখ আর হাসি-আনন্দের পালাবদলের দুনিয়ায় জীবনের প্রকৃত বাস্তবতা ভুলে আমরা নিমগ্ন হয়ে পড়ি কেবল দুনিয়ার পেছনে; যা ক্ষণস্থায়ী ও কোহেলিকায় মোড়ানো। তাই প্রিয় ভাই! আসুন, অনুভবের দুয়ার খুলি। বোধের জগত করি উন্মোচন। পর্যালোচনা করি জীবনের ভালো-মন্দের হিসাব-নিকাশ।
পৃথিবী বৈচিত্র্যময়। চিন্তার বৈচিত্র্যে, চেতনার ভিন্নতায় পৃথিবী প্রাচুর্যময়। কারও চিন্তা আবর্তিত হয় কেবল দুনিয়াকে ঘিরে। কেউ আবার আখেরাতকে নিজের লক্ষ্যস্থল বানিয়ে জীবনের প্রতিটি কাজ পরিচালিত করে। এই দুই শ্রেণির মানুষের মধ্যে প্রকৃত সৌভাগ্যবান হলো সে, যে গুনাহের পঙ্কিল পথে পা বাড়িয়ে পরক্ষণেই নিজেকে গুটিয়ে নেয়। ফিরে আসে শুভ্র-সুন্দর পথে। হৃদয়গহীনে অনুশোচনার কালিমা মেখে তাওবা করে মহামহিম প্রভুর দরবারে। হযরত আনাস রাদি. থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
كُلُّ ابْنِ آدَمَ خَطَّاءُ وَخَيْرُ الْخَطَّابِينَ التَّوَّابُونَ ‘মানুষমাত্রই গুনাহগার। আর গুনাহগারদের মধ্যে তাওবাকারীরাই উত্তম।”¹
মানুষ গুনাহপ্রবণ। চিরশত্রু শয়তান, নফস ও লোভাতুর দুনিয়ার মুগ্ধতায় ইচ্ছা- অনিচ্ছায়, ছোটো-বড়ো অসংখ্য পাপের জালে জড়িয়ে পড়ে অহর্নিশ। কিন্তু বিবেকের দুয়ারে প্রশ্ন রেখে যদি বলি, পাপের অন্ধকার গলিতে হেঁটে বেড়ানোর জন্যই কি মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে?
কবি বড়ো চমৎকার বলেছেন, 'বিপদ ও দুর্ভাগ্যের বিশালতার দরুণ আমি চারটি মহা পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছি। • অভিশপ্ত ইবলিশ • মোহমায়াময় পৃথিবী, • কুটিল নফস ও প্ররোচক প্রবৃত্তি। ভয়াল এই শত্রুদের থেকে কীভাবে মুক্তি পাব আমি?'
আল্লাহ তায়ালা মানুষকে শয়তানের কূটচাল ও কুমন্ত্রণা থেকে সতর্ক করেছেন।
শয়তান মানুষের সামনে দারিদ্র্যকে খুব বিশালাকারে উপস্থাপন করে। তাই কিছু মানুষ ধনাঢ্য হওয়া সত্ত্বেও আখেরাতের পথে একটি টাকা খরচ করতে তাদের অন্তরে ভীতি সৃষ্টি হয়। চলমান বাস্তবতা ও ভবিষ্যত পরিণতির কথা ভেবে দান- সদকা থেকে হাত গুটিয়ে রাখে। যদি আমরা শয়তানের হরেক রকম চক্রান্ত সম্বন্ধে অবগত না হই, তাহলে শয়তান দক্ষ চোরের মতো ক্রমে-ক্রমে হৃদয়ের গভীরে বাসা বাঁধবে। হৃদয়ের দরজা যদি অরক্ষিত হয়, তবে কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই শয়তান হৃদয়ের দুর্গ জয় করে নেয়। তখন দ্বীনের কাজগুলো পালন করা খুবই কঠিন মনে হয়। মন্দ ও গর্হিত কাজগুলো সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে ধরা দেয় চোখের সামনে। পাপের ধ্বংসাত্মক পথ হাতছানি দিয়ে ডাকে মায়াময় মোহগ্রস্ততায়। তাই প্রিয় ভাই, ধ্বংসের পথে পা বাড়ানোর আগেই আপনার শত্রুকে চিনুন, যেন সে আপনাকে পথভ্রষ্টতায় নিক্ষেপ না করতে পারে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
الشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُم بِالْفَحْشَاءِ وَاللَّهُ يَعِدُكُم مَّغْفِرَةً مِّنْهُ وَفَضْلًا وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ
'শয়তান তোমাদের দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার নির্দেশ দেয়। আর আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর ক্ষমা এবং অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।'²
শয়তানের কুমন্ত্রণা ও কিছু দিক-নির্দেশনাসহ অপর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ إِنَّمَا يَأْمُرُكُم بِالسُّوءِ وَالْفَحْشَاءِ وَأَن تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ
'হে মানবজাতি! পৃথিবীতে যা কিছু বৈধ ও পবিত্র খাদ্যবস্তু রয়েছে তা থেকে তোমরা আহার করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না, নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। সে তো কেবল তোমাদেরকে মন্দ ও অশ্লীল কাজের এবং আল্লাহ সম্বন্ধে তোমরা যা জানো না এমন সব বিষয় বলার নির্দেশ দেয়।'³
প্রিয় ভাই ও বোন! প্রবৃত্তির কুমন্ত্রণা থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখুন। কু-প্রবৃত্তি সর্বদা মন্দ ও নিন্দনীয় কাজের দিকে প্ররোচনা দেয়। কু-প্রবৃত্তির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া যদিও কঠিনসাধ্য সাধনা, কিন্তু এই কণ্টকাকীর্ণ পথ শেষে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে মুক্তি ও সফলতার অপার দিগন্ত। আযিযে মিশরের স্ত্রী জুলায়খা নফসের কুমন্ত্রণার শিকার হয়ে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে ব্যভিচারে প্ররোচিত করেছিল। আল্লাহ তার কথাগুলো কুরআনুল কারিমে নিম্নোক্ত ভাষায় উল্লেখ করেছেন। জুলায়খা বলেছিল,
وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِي إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ إِلَّا مَا رَحِمَ E رَبِّي إِنَّ رَبِّي غَفُورٌ رَّحِيمٌ
'আমি নিজেকে নির্দোষ মনে করি না, মানুষের মন অবশ্যই মন্দ কর্মপ্রবণ, কিন্তু সে নয়, যার প্রতি আমার প্রতিপালক দয়া করেন। আমার প্রতিপালক তো অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।'⁴
তাফসিরে মুয়াসসারে জুলায়খার এই বক্তব্যের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, আমি নিজেকে কখনো পবিত্র ও নির্দোষ বলে দাবি করছি না। নফস গুনাহের স্বাদ আস্বাদন করানোর জন্য মানুষকে অনবরত পঙ্কিলতার পথে আহ্বান করে। তার কথা ভিন্ন,
আল্লাহ তায়ালা যাকে নিরাপদ রাখেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর পাপী বান্দাদের তাওবা গ্রহণ করেন। তিনি বান্দাদের প্রতি অতিশয় দয়ালু।
নফসের কামনা-বাসনার পেছনে ছুটে চলা শরিয়ত গর্হিত কাজ। মানুষকে নফসের গোলামি থেকে মুক্ত করে আল্লাহ অভিমুখী করা শরিয়তের একমাত্র উদ্দেশ্য। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَىٰ فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى 'পক্ষান্তরে যে স্বীয় প্রতিপালকের সম্মুখে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে এবং প্রবৃত্তি থেকে নিজেকে বিরত রাখে, জান্নাতই হবে তার আবাস।”⁵
হযরত আবু বারযাহ রাদি. থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
إنَّما أخشى عليكم شهوات الغي في بطونكم وفروجكم ومضلات الهوى 'আমি তোমাদের জন্য পেট, লজ্জাস্থানের প্রবৃত্তির বাসনা এবং চিন্তাগত ভ্রষ্টতার ভয় করি।'⁶
অপর এক হাদিসের শেষাংশে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, 'ধ্বংসাত্মক বিষয় হলো কৃপণতা, প্রবৃত্তির অনুসরণ এবং অহংকার করা।'⁷
পার্থিব জীবন শোভা-সৌন্দর্য ও প্রাচুর্যতা লাভের মুক্ত আবাস। ইরশাদ হয়েছে,
اعْلَمُوا أَنَّمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَزِينَةٌ وَتَفَاخُرُ بَيْنَكُمْ وَتَكَاثُرُ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ كَمَثَلِ غَيْثٍ
أَعْجَبَ الْكُفَّارَ نَبَاتُهُ ثُمَّ يَهِيجُ فَتَرَاهُ مُصْفَرًّا ثُمَّ يَكُونُ حُطَامًا وَفِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ شَدِيدٌ وَمَغْفِرَةٌ مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانُ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ
'তোমরা জেনে রাখো, পার্থিব জীবন ক্রীড়া-কৌতুক, জাঁকজমক, পারস্পরিক শ্লাঘা, ধন-সম্পদ ও সন্তান- সন্ততিতে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা ব্যতীত আর কিছুই নয়। এর উপমা এমন বৃষ্টি, যদ্দ্বারা উৎপন্ন শস্য-সম্ভার কৃষকদেরকে চমৎকৃত করে, অতঃপর শুকিয়ে যায়, ফলে তুমি তা পীতবর্ণ দেখতে পাও, অবশেষে তা খড়কুটায় পরিণত হয়। পরকালে রয়েছে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। পার্থিব জীবন প্রতারণার সামগ্রী ব্যতীত কিছুই নয়।'⁸
পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও উদাসীনতার জালে ঘুরপাক খাচ্ছে। তাদের জীবনের সম্পর্ক দুনিয়াকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত। রং-তামাশা ও আনন্দ- উল্লাসময় জীবন উদযাপনের জন্য তারা পৃথিবীর সাথে গড়ে তুলেছে গভীর সখ্যতা। কুরআন-সুন্নাহর সাথে তাদের সম্পর্ক ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। কেবল হাতেগোনা কিছু মানুষ এই ধ্বংসাত্মক জালের বাইরে রয়েছে। ক্ষনিকের পৃথিবীর চোখধাঁধানো চাকচিক্য অচিরেই ধ্বংস হবে। গ্রীষ্মের আকাশে উড়ে বেড়ানো মেঘমালার মতো বিলীন হবে সুনিশ্চিত। সুতরাং চাকচিক্যময় পৃথিবীর মোহে পড়ে পৃথিবীকেই ধ্যান-জ্ঞান বানাবেন না হে আমার প্রিয় ভাই! দেখুন আল্লাহ তায়ালা কী বলেছেন,
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَمَن زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ
'জীবমাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে তোমাদের কর্মফল পূর্ণমাত্রায় দেওয়া হবে। যাকে অগ্নি হতে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করা হবে সেই সফলকাম। আর পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ব্যতীত কিছুই নয়।'⁹
আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াকে খেল-তামাশার জায়গা বলেছেন। কল্যাণের প্রতি দ্রুত অগ্রসর, পুণ্যার্জন এবং কথা-কাজে তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ করেন,
وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَلَلدَّارُ الْآخِرَةُ خَيْرٌ لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ
'পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক ব্যতীত আর কিছুই নয় এবং যারা তার পথ অবলম্বন করে তাদের জন্য আখেরাতের আবাসই শ্রেয়; তোমরা কি অনুধাবন করো না?'¹⁰
টিকাঃ
১ তিরিমিজি : ২৪৯৯। ইবনে মাজাহ : ৪২৫১।
২ সুরা বাকারা: ২৬৮
৩ সুরা বাকারা: ১৬৮,১৬৯
৪ সুরা ইউসুফ: ৫৩
৫ সুরা নাযিআত : ৪০
৬ মুসনাদে আহমদ ইবনে হাম্বল
৭ মুসনাদে বাযযার: ৬৪৯১
৮ সুরা হাদিদ: ২০
৯ সুরা আলে-ইমরান: ১৮৫
১০ সুরা আনআম: ৩২
📄 আল্লাহ আপনার ডাকের অপেক্ষায় আছেন
পার্থিব জীবন রেললাইনের মতো সমান্তরাল নয় কখনো। ঘাত-প্রতিঘাত, উত্থান- পতনের তরঙ্গে বয়ে চলে জীবনের কিশতি। নদীর মতো বয়ে চলা জীবনে শয়তান, নফস, প্রবৃত্তি এবং চাকচিক্যময় দুনিয়ার কুমন্ত্রণার ঢেউ আছড়ে পড়ে জীবনোপকূলে। কখনো আমরা সেই ঢেউয়ে পরাস্ত হই, কখনো দাঁড়িয়ে থাকি সটান সৌধের মতো। তাই সব সময় আপনাকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে, কুমন্ত্রণার ঢেউ যেন আপনাকে দীর্ঘস্থায়ী কোনো ক্ষতির সম্মুখীন করতে না পারে। গুনাহের লকলকে শিখা কখনো আপনাকে স্পর্শ করলে পূর্ণ আত্মবিশ্বাসে প্রতিরোধ করতে হবে তৎক্ষণাৎ। গুনাহের ফিরিস্তি আকাশের মেঘমালা স্পর্শ করলেও হতাশ হবেন না কখনো। গুনাহের জমাট আঁধার ভেদ করে পুণ্যের আলোকরেখা স্পর্শের নিরন্তর সাধক আপনি। আল্লাহ তায়ালা ক্ষমাশীল, অতিশয় দয়ালু। প্রচেষ্টা ও সদিচ্ছার ফলে তিনি তাঁর অপার ক্ষমা ও অনুগ্রহে গুনাহের কালিমা মোচন করে দেবেন।
আল্লাহ তায়ালার রহমতের শামিয়ানার ব্যাপ্তি অসীম। সাগরের অথৈ জলরাশির সমপরিমাণ গুনাহকেও তিনি ক্ষমার আপন মহিমায় ক্ষমা করে দেন। গুনাহের বোঝা মাথায় নিয়ে অনুতপ্ত হৃদয়ে যদি আমরা তার দরবারে কড়া নাড়ি, তিনি তৎক্ষণাৎ আমাদের জন্য খুলে দেবেন রহমতের অবারিত দরোজা। আমার প্রতিপালক কত সহনশীল, তিনি ক্ষমা ও অবারিত রহমতের মালিক। দিবানিশি আকণ্ঠ রবের অবাধ্যতায় ডুবে থাকি, তবুও তিনি আমাদের সকল দোষত্রুটি গোপন রাখেন। হিদায়াতের পথে ফিরে আসার সুযোগ দেন। রাতের শেষ প্রহরে ডেকে ডেকে বলেন,
مَنْ يستغفرني فأغفر لَهُ 'কে আমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব।”¹¹
ইবনু আবিদ দুনিয়া রহ. বলেন, হযরত মালিক ইবনে দিনার রহ. তার কিতাবুশ শুকরে বলেন, 'আমি কয়েকটি হাদিসের কিতাবে পড়েছি আল্লাহ তায়ালা বলেন, "হে আদম সন্তান! আমার কল্যাণ তোমার প্রতি বর্ষণ হয়, পক্ষান্তরে তোমার মন্দ কাজ আমার দিকে উত্থিত হয়। আমি তোমার প্রতি পছন্দনীয় নেয়ামত দান করি, তুমি আমার প্রতি অপছন্দনীয় গুনাহ পাঠাও। সম্মানিত ফেরেশতা তোমার থেকে মন্দ আমল নিয়ে আমার কাছে আসতেই থাকে।”
আল্লামা আলবানি রহ. সহিহুল জামে গ্রন্থে এই হাদিস উল্লেখ করেছেন, 'বামপাশের ফেরেশতা অপরাধী মুসলমানের গুনাহ লিপিবদ্ধ করতে ছয় দফা বিলম্ব করে, এর ভেতরে যদি সে অনুশোচনায় দগ্ধ হয় এবং কৃত অপরাধে আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করে তাহলে তা লিপিবদ্ধ করা হয় না, অন্যথায় একটি গুনাহ লিপিবদ্ধ করা হয়।'
প্রিয় ভাই! ধীর পায়ে, কম্পিত হৃদয়ে, মিনতিভরা কণ্ঠে ক্ষমাশীল, দয়ালু প্রতিপালকের দরবার চোখের নোনাজলে সিক্ত করুন, তাওবাকারীদের নুরানি কাফেলায় আশ্রয় নিন পরম নির্ভরতায়।
হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখনিঃসৃত বাণী আমাদের প্রত্যাশার উপকূলে জোয়ারের প্লাবন সৃষ্টি করে, আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে থাকি, আমাদের রব অত্যন্ত দয়ালু, তিনি আমাদের ক্ষমা করবেন, যদিও আমাদের গুনাহ আসমান পর্যন্ত পৌঁছে।
لَوْ أَخْطَأْتُمْ حَتَّى تَبْلُغَ خَطَايَاكُمُ السَّمَاءَ ثُمَّ تُبْتُمْ لَتَابَ عَلَيْكُمْ 'তোমরা যদি পাপাচার করো, এমনকি তোমাদের পাপ আকাশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, অতঃপর তোমরা তাওবা করো, তাহলে আল্লাহ অবশ্যই তোমাদের তাওবা কবুল করবেন।'¹²
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
التَّابِبُ مِنَ الذَّنْبِ كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ 'গুনাহ থেকে তাওবাকারী নিষ্পাপ ব্যক্তিতুল্য।'¹³
হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে কিছু নসিহত করুন।' তখন তিনি আমাকে বললেন, 'সাধ্যের সবটুকু দিয়ে আল্লাহকে ভয় করবে। সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ রাখবে, কোনো মন্দ কাজ করে ফেললে তাওবা করবে। গোপনে একটি মন্দ কাজ করলে তৎপরিবর্তে গোপনে একটি ভালো কাজ করবে, প্রকাশ্যে মন্দ কাজ করলে এর পরিবর্তে প্রকাশ্যে একটি ভালো কাজ করবে।'¹⁴
তাওবার অবারিত দরোজা সর্বদা উন্মুক্ত। এই দরজার কপাট দুটো কখনো একত্রিত হয় না। তাহলে অযথাই কেন হীনম্মন্যতায় ভোগছেন। হতাশার চাদর দূরে নিক্ষেপ করুন। ছিঁড়ে ফেলুন অলসতা, কুমন্ত্রণা ও হারাম প্রবৃত্তির সকল ঠুনকো মায়াবী জাল। ফিরে আসুন আসমান-জমিনের প্রতিপালকের সন্তুষ্টির পথে। চোখের নোনাজল নিয়ে হাজির হন তার রহমতের দরোজায়, তার আশ্রয়ের শামিয়ানায় নিজেকে আবদ্ধ রাখুন সব সময়, জান্নাত ও সকল কল্যাণের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী সব পাপরাশি থেকে মহামহিম প্রভুর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করুন বিগলিত হৃদয়ে। দেখুন আল্লাহ তায়ালা আপনার জন্যই ইরশাদ করেছেন,
وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَن يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهُ وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَى مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ
'এবং যারা কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে অথবা নিজেদের প্রতি জুলুম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করে। আল্লাহ ব্যতীত কে পাপ ক্ষমা করবে? এবং তারা যা করে ফেলে, জেনে- শুনে তার পুনরাবৃত্তি করে না।”¹⁵
হ্যাঁ, সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তিরা সর্বদা আল্লাহর স্মরণ অন্তরে জাগরুক রাখে। তাদের দ্বারা গুনাহের কাজ পুনরাবৃত্তি হয় না। পৃথিবীতে থেকেই তাদের জন্য রয়েছে আখেরাতের অনন্ত সুখের সুসংবাদ।
টিকাঃ
১১ ইবনে মাজাহ: ১৩৮৮
১২ ইবনে মাজাহ: ৪২৪৮
১৩ ইবনে মাজাহ: ৪২৫০
১৪ মুজামুত তাবারানি। সহিহ আত-তারগিব: ৩১৪৪
১৫ সুরা আলে-ইমরান: ১৩৫
📄 বেলা চলে যায়
প্রিয় ভাই আমার! পৃথিবী আনন্দ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় আবাসস্থল। ঈমানের স্তম্ভগুলো দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা, নেক কাজে অবিরাম সাধনা, কল্যাণের পথে প্রতিযোগিতা এবং নেককার ব্যক্তিদের পথ অবলম্বন ব্যতীত দুনিয়ার প্রকৃত স্বাদ কখনো উপভোগ করতে পারবেন না। জান্নাতের নেয়ামত বৃদ্ধির জন্য দুনিয়াতে প্রতিযোগিতার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَ فِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ 'এ বিষয়ে প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতা করুক।¹⁶
আখেরাতের অনন্ত সফরে যাত্রার পূর্বেই জীবনকে অর্থবহ করে তুলুন। সময়কে গনিমত মনে করে নেক কাজে প্রতিযোগিতার ময়দানে নেমে পড়ুন। আব্দুল কাদির জিলানি রাহিমাহুল্লাহ ফাতহুর রব্বানি গ্রন্থে বলেন, 'হে লোকসকল! জীবনপ্রদীপ প্রজ্বলিত থাকা অবস্থায় জীবনকে গনিমত মনে করে নেক কাজের প্রতিযোগিতায় জীবনকে উৎসর্গ করো। তাওবা ও দোয়ার রোনাজারিতে ক্ষমা চাও রবের কাছে। মৃত্যুর দমকা হাওয়ায় অচিরেই জীবনপ্রদীপ নিভে যাবে তোমার।'
প্রিয় ভাই! পরকালে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জীবনের হিসাব নেওয়ার পূর্বে নিজেই নিজের হিসাব মিলাতে থাকুন। আখেরাতের সম্বলহীন পথিক হওয়ার পূর্বে ফিরে আসুন আল্লাহর দরবারে। পৃথিবীর জীবন ক্ষণস্থায়ী। অচিরেই দেহের খাঁচা থেকে রুহ উড়ে যাবে আসমান পানে। দুনিয়ার আশা-আকাঙ্ক্ষা ও আপনার নিথর দেহের মাঝে তৈরি হবে অসীম দূরত্ব। যে দূরত্ব কোনোদিন মুছে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
حَتَّىٰ إِذَا جَاءَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ رَبِّ ارْجِعُونِ لَعَلَّى أَعْمَلُ صَالِحًا فِيمَا تَرَكْتُ كَلَّا إِنَّهَا كَلِمَةٌ هُوَ قَابِلُهَا وَمِن وَرَابِهِم بَرْزَخٌ إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ
'যখন ওদের কারও মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন সে বলে, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে পুনরায় প্রেরণ করুন। যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি যা আমি পূর্বে করিনি। না, তা হবার নয়। এই কথা তো তার একটি উক্তি মাত্র। তাদের সম্মুখে বারযাখ থাকবে উত্থান দিবস পর্যন্ত।'¹⁷
ইবনে কাসির রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মৃত্যুর সময় কাফের এবং সীমালঙ্ঘনকারী ব্যক্তিদের অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন। যাতে মানুষ পৃথিবীতেই আখেরাতের সুখ-শান্তি বিধ্বংসী কাজ থেকে বিরত থাকে।
প্রিয় ভাই আমার! মৃত্যুর পরোয়ানা এবং জানাজার খাটিয়া আসার পূর্বে আপনার দয়াশীল প্রভুর দরবারে আশ্রয় নিন। আল্লাহর কাছে তাওবা ও গুনাহের লজ্জায় যাদের মুখ অবনমিত হয়, আপনি তাদের দলভুক্ত হোন। আল্লাহর পথে সফরের দীর্ঘ পরিক্রমায় হতাশ হবেন না, অচিরেই আপনার জন্য অপেক্ষা করছে মুক্তির বিস্তৃত উপকূল। মুক্তির ঠিকানায় পৌঁছার জন্য সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের সাহচর্য গ্রহণ করুন। ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ফিতনার সময়ে তারাই আপনার সর্বোত্তম সহযোগী।
জেনে রাখুন, দুনিয়া আমাদের জন্য পরীক্ষার হল। এখানে রয়েছে প্রবৃত্তি ও কামনা-বাসনার সকল আসবাব। যে ব্যক্তি অপছন্দনীয় জিনিসগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখে সে জান্নাতের পথিক। যে প্রবৃত্তি ও দুনিয়ার সুখ- স্বাচ্ছন্দ্যে ডুবে থাকে সে এগিয়ে চলছে জাহান্নামের পথে। হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
حفَتْ الجنَّةُ بالمكاره وحُفَتْ النَّارُ بالشهوات
'জান্নাতকে সাধনা দ্বারা ঢেকে দেওয়া হয়েছে, আর জাহান্নামকে আচ্ছাদিত করা হয়েছে কামনা-বাসনা দ্বারা।'¹⁸
আল্লাহ তায়ালা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমকে ধৈর্যধারণের নির্দেশ দিয়েছেন। কাফেরদের জাঁকজমকপূর্ণ জীবনের দিকে দৃষ্টিপাত করতে নিষেধ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে,
وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُم بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ صلے يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَاةِ صلے الدُّنْيَا وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَن ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا
'আপনি নিজেকে ধৈর্য সহকারে রাখুন ওই সকল লোকদের সংসর্গে, যারা সকাল ও সন্ধ্যায় আহ্বান করে তাদের প্রতিপালককে তার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে এবং আপনি পার্থিব জীবনের শোভা কামনা করে তাদের হতে আপনার দৃষ্টি ফিরিয়ে নেবেন না। আপনি তার আনুগত্য করবেন না যার চিত্তকে আমি আমার স্মরণে অমনোযোগী করে দিয়েছি, যে তার খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে এবং যার কার্যকলাপ সীমা অতিক্রম করে।'¹⁹
হে ভাই আমার! নিকট অতীতে হয়তো আপনি অনেক অপরাধ ও পাপকাজে জড়িয়ে ছিলেন, সবকিছু থেকে তাওবা করে এখনো যদি সঠিক পথে ফিরে আসেন, আল্লাহ তায়ালা পূর্বের পাপরাশিকে সওয়াব দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। তিনি তো সকল রাজত্বের অধিপতি, ক্ষমার আধার, অসীম রহমের মালিক। তিনি বান্দাদের দিনের গুনাহসমূহ মোচন করার জন্য রাতে ক্ষমার হাত প্রসারিত করেন, রাতের গুনাহসমূহ মোচনের জন্য দিনে ক্ষমার হাত বাড়িয়ে দেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
إِلَّا مَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُولَبِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا وَمَن تَابَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَإِنَّهُ يَتُوبُ إِلَى اللَّهِ مَتَابًا
'তবে যারা তাওবা করে ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে। আল্লাহ তাদের পাপ পরিবর্তন করে দিবেন পুণ্যের দ্বারা। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। যে ব্যক্তি তাওবা করে ও সৎকর্ম করে সে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর অভিমুখী হয়।'²⁰
গুনাহের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে দুনিয়া-আখেরাতে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও প্রশান্তিময় জীবনের জন্য কিছু বিষয়ের ওপর আমল করা অতীব জরুরি। অতীতের সকল ভুলত্রুটির জন্য খাঁটি দিলে আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে। নেক কাজে অধিক অংশগ্রহণ এবং গুনাহ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। অতীতের গুনাহের জন্য সর্বাঙ্গে লজ্জা ও অনুশোচনা মেখে আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে হবে।
ইনশাআল্লাহ, তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার জীবনে নেমে আসবে অবারিত শান্তি, সুন্দর স্থিতিশীলতা, অগণিত রহমত, বরকত ও সাহায্যের শীতল বারিধারা। রিজিকের প্রাচুর্যে বিস্মিত হবে আপনার হৃদয়। এই অনুগ্রহ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকেই দান করেন, তিনি অতিশয় দয়াপরবশ। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলেন,
وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِم بَرَكَاتٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ وَلَكِن كَذَّبُوا فَأَخَذْنَاهُم بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
'যদি সেই সকল জনপদের অধিবাসীবৃন্দ ঈমান আনত ও তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের জন্য আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সকল কল্যাণ উন্মুক্ত করে দিতাম, কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছিল। সুতরাং তাদের কৃতকর্মের জন্য তাদেরকে শাস্তি দিয়েছি।'²¹
প্রিয় ভাই ও বোন! তাওবা ও ইস্তেগফারের চমৎকার সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য রয়েছে। এর ফলে মানুষের জীবনে নেমে আসে কল্যাণ ও শান্তির ফল্গুধারা। পুষ্পসজ্জায় সজ্জিত এই পথের শেষে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে মুক্তির মোহনা। গুনাহ থেকে মুক্তি লাভ, চিরস্থায়ী জীবনের পরম সৌভাগ্য, পার্থিব জীবনের প্রশান্তি, দাম্পত্যজীবনে ভালোবাসা, জীবনের প্রফুল্লতা, বিপদ থেকে মুক্তি, বিবাহের ব্যবস্থাসহ জীবনের যে-কোনো প্রয়োজনে তাওবা-ইস্তেগফারের বিকল্প নেই। অধিকাংশ মুসলমান গুরুত্বপূর্ণ এই আমলের প্রতি উদাসীন। ইহকালীন ও পরকালীন জীবনে তাওবা-ইস্তেগফারের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে অবগত না থাকার ফলে এই পরিস্থিতি পরিলক্ষিত হয়।
একটি সুন্দর, নির্মল জীবন উপভোগের জন্য ইস্তেগফার পাঠে অভ্যস্ত হওয়ার বিকল্প নেই। পবিত্র কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
وَأَنِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ يُمَتِّعْكُم مَّتَاعًا حَسَنًا إِلَى أَجَلٍ مُّسَمًّى
'তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করো এবং তার দিকে প্রত্যাবর্তন করো। তিনি তোমাদেরকে একটি করে নির্দিষ্ট কাজের জন্য উত্তম জীবন উপভোগ করতে দেবেন।' ২২
উক্ত আয়াতে আল্লাহ তায়ালা সমস্ত গুনাহ থেকে তাওবা- ইস্তেগফারকারীদের জন্য উত্তম জীবন উপভোগের অঙ্গীকার করেছেন।
يُمَتِّعْكُم مَّتَاعًا حَسَنًا
আয়াতের এই অংশের ব্যাখ্যায় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'রিজিক ও সচ্ছলতা দ্বারা আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ওপর অনুগ্রহ করবেন।'
ইমাম কুরতুবি রহ. বলেন, 'তাওবা ও ইস্তেগফারের ফলে আল্লাহ তায়ালা প্রশস্ত ও স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন দান করবেন।'
শারীরিক সামর্থ্য ও সুস্থতা, রহমতের বারিধারা, কল্যাণ ও বরকতের প্রাচুর্যতা অর্জনের জন্য আপনি ইস্তেগফারকে সঙ্গী করুন। হযরত হুদ আলাইহিস সালাম প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন,
قُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُم مِّدْرَارًا وَيُمْدِدْكُم بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَل لَّكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَل لَّكُمْ أَنْهَارًا
'আর বলেছি, তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করো, তিনি তো মহা ক্ষমাশীল, তিনি তোমাদের জন্যে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তিনি তোমাদেরকে সমৃদ্ধ করবেন ধন- সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে এবং তোমাদের জন্য স্থাপন করবেন উদ্যান ও প্রবাহিত করবেন নদী-নালা।' ২৩
ইমাম কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, 'বেশি বেশি ইস্তেগফার করার দ্বারা রিজিকে বরকত হয় এবং আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ হয়।'
ইবনে কাসির রহ. এই আয়াতের তাফসিরে বলেছেন, 'তোমরা যখন আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে তাওবা-ইস্তেগফার এবং তাঁর আনুগত্য করবে, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের রিজিকে প্রশস্ততা দান করবেন, আসমান থেকে রহমতের শীতল বারি বর্ষণ করবেন, বিভিন্ন প্রজাতির শস্য উৎপাদন করবেন, পশুর ওলান দুধে পরিপূর্ণ করবেন, সৃষ্টি করবেন চোখজুড়ানো বাগান, যার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হবে নয়নাভিরাম ছোটো ছোটো নদী।'
শাইখ আবু বকর জাযাইরি রহ. আইসারুত তাফাসির গ্রন্থে উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, 'যে ব্যক্তির সন্তান এবং সম্পত্তির প্রতি আগ্রহ রয়েছে সে যেন দিবানিশি অবিরাম ইস্তেগফার পাঠ করে। তাহলে আল্লাহ তায়ালা তার সম্পদ এবং সন্তানের আশা পূরণ করবেন।' ইস্তেগফার কল্যাণ ও সৌভাগ্যের দরোজা উন্মুক্ত করে, সফলতার রাজপথ খুলে দেয়, শত্রুতা ও বিদ্বেষ প্রতিহত করে।
হযরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, পৃথিবীতে আল্লাহর শান্তি থেকে নিরাপদ থাকার দুটি মাধ্যম। একটি মাধ্যম প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। দ্বিতীয়টি হলো ইস্তেগফার। এই মাধ্যমটি এখনো বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَأَنتَ فِيهِمْ وَمَا كَانَ اللَّهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُونَ
'আল্লাহ তায়ালা এমন নন যে, আপনি তাদের মধ্যে থাকবেন অথচ তিনি তাদেরকে শাস্তি দেবেন। এবং আল্লাহ তায়ালা এমনও নন যে, তারা ক্ষমাপ্রার্থনা করবে অথচ তিনি তাদেরকে শাস্তি দেবেন।' ২৪
হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
مَنْ لَزِمَ الْإِسْتِغْفَارَ جَعَلَ اللَّهُ لَهُ مِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا وَمِنْ كُلِّ هَمَّ فَرَجًا وَرَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ.
'কোনো ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তেগফার পড়লে আল্লাহ তাকে প্রত্যেক বিপদ থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করবেন, সকল দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত করবেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেবেন যা সে কল্পনাও করতে পারবে না।'²⁵
হাসান ইবনে আহমাদ ইবনে হাসান হুমাম এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন,' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিক পরিমাণে ইস্তেগফার পাঠের ফলাফলস্বরূপ কয়েকটি পুরস্কার লাভের সংবাদ দিয়েছেন। প্রথমটি হলো, বান্দার ধারণাতীত অপ্রত্যাশিত স্থান থেকে আল্লাহ তায়ালা তার জন্য রিজিকের ব্যবস্থা করবেন। সুতরাং উত্তম রিজিক প্রত্যাশীদের কথা এবং কাজে ইস্তেগফারের ওপর আমল করা উচিত। কোনো ব্যক্তি যদি শুধু মুখে মুখে আস্তাগফিরুল্লাহ বলে, কাজে-কর্মে বাস্তবায়ন না করে তাহলে সে নির্জলা মিথ্যুক সাব্যস্ত হবে।'
তাওবা ও ইস্তেগফারের পুরস্কারের আধিক্য দেখে কিছু মানুষ সন্দিহান। তারা পরস্পরকে প্রশ্ন করে, তাওবা, ইস্তেগফার পাঠ করার পুরস্কার এত বেশি! আমি আশ্বস্ত করে বলতে চাই, জি, প্রিয় ভাই ও বোন! শুধু এতটুকুই নয়, এর পুরস্কার আরও রয়েছে। আমাদের ওপর বিপদ, দুর্যোগ আপতিত হওয়ার কারণ হলো, আমরা ইবাদতের প্রতি উদাসীন, গুনাহের কাজে লিপ্ত এবং শরিয়তের বিরোধী কর্মকাণ্ডে নিমগ্ন। আল্লাহ তায়ালা এই কথাগুলো কুরআনুল কারিমে চমৎকারভাবে উল্লেখ করেছেন,
وَمَا أَصَابَكُمْ مِنْ مُصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَ يَعْفُوا عَنْ كَثِيرٍ
'তোমাদের যে বিপদ-আপদ ঘটে তা তো তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল, এবং তোমাদের অনেক অপরাধ তো তিনি ক্ষমা করে দেন।'²⁶
অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
ط لَيْسَ بِأَمَانِيكُمْ وَلَا أَمَانِي أَهْلِ الْكِتَابِ مَنْ يَعْمَلْ سُوءًا يُجْزَ بِهِ وَلَا يَجِدْ لَهُ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَلِيًّا وَلَا نَصِيرًا
'তোমাদের খেয়াল-খুশি ও কিতাবিদের খেয়াল-খুশি অনুসারে কাজ হবে না। কেউ মন্দ কাজ করলে তার প্রতিফল সে পাবে এবং আল্লাহ ব্যতীত তার জন্য সে কোনো অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না।'²⁷
অপর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ
'মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে তাদেরকে তাদের কোনো কোনো কর্মের শাস্তি তিনি আস্বাদন করান; যাতে তারা ফিরে আসে।'²⁸
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
وَجُعِل الذُّلُّ والصَّغار على من خالف أمرى 'যে আমার আদেশ লঙ্ঘন করবে তার জন্য রয়েছে লাঞ্ছনা এবং অপমান।' ²⁹
সুতরাং, হে প্রিয় ভাই ও বোন! আয়াত ও হাদিসে উল্লিখিত অবাধ্যতা থেকে মুক্তি এবং উভয় জগতে সফলতার জন্য বেশি বেশি ইস্তেগফারের বিকল্প নেই। যে ব্যক্তির আমলনামায় অধিক পরিমাণ ইস্তেগফার রয়েছে, তার জন্য মহা সুসংবাদ। যার আমলনামা ইস্তেগফারশূন্য সেদিন তার কী অবস্থা হবে, যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো কাজে আসবে না; সেদিন উপকৃত হবে কেবল সে, যে আল্লাহর নিকট আসবে বিশুদ্ধ অন্তঃকরণ নিয়ে।
আব্দুল্লাহ ইবনে বুসর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
طُوبَى لِمَنْ وَجَدَ فِي صَحِيفَتِهِ اسْتِغْفَارًا كَثِيرًا 'যে ব্যক্তি তার আমলনামায় অধিক পরিমাণ ইস্তেগফার অর্থাৎ “ক্ষমাপ্রার্থনা” যোগ করতে পেরেছে, তার জন্য সুসংবাদ, আনন্দ।' ³⁰
হযরত জুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
من أَحَبَّ أن تسره صحيفته فليكثر فيها من الاستغفار 'যে ব্যক্তি তার আমলনামা দেখে খুশি হতে চায় সে যেন বেশি বেশি ইস্তেগফার পাঠ করে।' ³¹
একটি বিষয় হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করুন, সমস্ত নবীগণ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। গুনাহের কালিমা যাদেরকে স্পর্শ করতে পারেনি। এতৎসত্ত্বেও তারা অধিক পরিমাণে ক্ষমাপ্রার্থনা করতেন। বারবার আল্লাহকে ডেকে ঘনিষ্ঠতা অর্জন করে একমাত্র প্রভুর দরবারে সাহায্য কামনা করতেন। সেই তুলনায় আমাদের অবস্থা কতটা শোচনীয়! আমলের খাতা পাপ-পঙ্কিলতায় পরিপূর্ণ। ইবাদত স্বল্প ও সংক্ষিপ্ত করা আমাদের সহজাত অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং এইসব সীমাবদ্ধতার জন্য বেশি বেশি তাওবা-ইস্তেগফার করা উচিত। দয়াশীল আল্লাহ তায়ালা গুনাহগারের কাতর কণ্ঠের মিনতি ফিরিয়ে দেবেন না। তিনি সাহায্যকারী, তার ওপরই নির্ভরতা। তিনি ছাড়া কোনো শক্তিমান ও সাহায্যকারী নেই।
আমাদের আদি পিতা হযরত আদম আলাইহিস সালাম এবং মা হাওয়া আলাইহাস সাল্লামের ইস্তেগফারের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
قَالَا رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
'তারা বলল, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছি, যদি তুমি আমাদেরকে ক্ষমা না করো এবং দয়া না করো তবে তো আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবো।' ³²
আল্লাহ তায়ালা হযরত মুসা আলাইহিস সালামের ইস্তেগফারের কথা আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে ইরশাদ করেন,
قَالَ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي فَغَفَرَ لَهُ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
'মুসা আলাইহিস সালাম বললেন, হে আমার প্রতিপালক! আমি তো আমার নিজের প্রতি জুলুম করেছি।' ³³
হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
وَظَنَّ دَاوُدُ أَنَّمَا فَتَنَّهُ فَاسْتَغْفَرَ رَبَّهُ وَخَرَّ رَاكِعًا وَ أَنَابَ
'দাউদ বুঝতে পারল, আমি তাকে পরীক্ষা করলাম। অতঃপর সে তার প্রতিপালকের নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করল ও নত হয়ে লুটিয়ে পড়ল এবং তাঁর অভিমুখী হলো।'³⁴ ³⁵ হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
قَالَ رَبِّ اغْفِرْ لِي وَهَبْ لِي مُلْكًا لَّا يَنبَغِي لِأَحَدٍ مِّن بَعْدِي إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ
'সুলাইমান বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমাকে দান করুন এমন এক রাজ্য যার অধিকারী আমি ছাড়া কেউ হবে না। তুমি তো পরম দাতা।' ³⁶ হযরত নুহ আলাইহিস সালাম সম্বন্ধে ইরশাদ হয়েছে,
رَّبِّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِمَن دَخَلَ بَيْتِيَ مُؤْمِنًا وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ
'হে আমার প্রতিপালক! আপনি ক্ষমা করুন আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং যারা মুমিন হয়ে আমার গৃহে প্রবেশ করে তাদেরকে এবং মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে।'³⁷ আল্লাহর কাছে সর্বোচ্চ প্রিয় পাত্র নবীগণ এভাবেই আমাদেরকে তাওবা এবং ইস্তেগফার শিক্ষা দিয়েছেন। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ তায়ালা জীবনের সমস্ত ক্ষমার ঘোষণা দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও তিনি পৃথিবীতে সর্বোচ্চ ইস্তেগফারকারী। সর্বদা ইস্তেগফারে ডুবে থাকতেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
إِنَّهُ لَيْغَانُ عَلَى قَلْبِي وَإِنِّي لَأَسْتَغْفِرُ اللَّهَ فِي الْيَوْمِ مِائَةَ مَرَّةٍ
'আমার অন্তরে কখনো কখনো অলসতা দেখা দেয়, তথাপিও আমি দৈনিক একশবার আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করি।' আরও বলেন,
وَاللهِ إِنِّي لَأَسْتَغْفِرُ اللهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ فِي الْيَوْمِ أَكْثَرَ مِنْ سَبْعِينَ مَرَّةً.
'আল্লাহর শপথ! আমি প্রতিদিন আল্লাহর কাছে সত্তরবারেরও অধিক ইস্তেগফার ও তাওবা করে থাকি।' ³⁸
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা গণনা করেছি আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক বৈঠকে একশবার এই দোয়া পড়েছেন,
رب اغفر لي وتب علي، إنك أنت التواب الرحيم 'হে প্রভু আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার তাওবা গ্রহণ করুন। নিশ্চয়ই আপনি তাওবা গ্রহণকারী, অতিশয় দয়ালু।'
হযরত সাওবান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِذَا انْصَرَفَ مِنْ صَلَاتِهِ اسْتَغْفَرَ ثَلَاثًا
'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজ শেষ করে তিনবার ইস্তেগফার পাঠ করতেন।' ৩৯
অর্থাৎ ফরজ নামাজ শেষ করেই তিনবার আস্তাগফিরুল্লাহ বলতেন। আবু মুসা আশআরি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিম্নবর্ণিত শব্দে আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করতেন,
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي خَطِيئَتِي وَجَهْلِي وَإِسْرَافِي فِي أَمْرِي وَمَا أَنْتَ أَعْلَمُ بِهِ مِنِّي اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي جِدِّي وَهَزْلِي وَخَطَئِي وَعَمْدِي وَكُلُّ ذَلِكَ عِنْدِي اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي مَا قَدَّمْتُ وَمَا أَخَرْتُ وَمَا أَسْرَرْتُ وَمَا أَعْلَنْتُ وَمَا أَنْتَ أَعْلَمُ بِهِ مِنِّي أَنْتَ الْمُقَدِّمُ وَأَنْتَ الْمُؤَخِّرُ وَأَنْتَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ .
'হে আল্লাহ! আপনি আমার পাপ, আমার অজ্ঞতা ও আমার কাজের সীমালঙ্ঘনকে মার্জনা করে দিন। আপনি এ বিষয়ে আমার চেয়ে সর্বাধিক জ্ঞাত। হে আল্লাহ! আমাকে মাফ করে দিন আমার আন্তরিকতাপূর্ণ ও রসিকতামূলক অপরাধ এবং আমার ইচ্ছাকৃত ও ভুলক্রমে সব রকমের অপরাধগুলো। হে আল্লাহ! মাফ করে দিন যা আমি আগে করে ফেলেছি এবং যা আমি পরে করব। যা আমি গোপনে করেছি এবং যা প্রকাশ্যে করেছি। আর আপনি আমার চাইতে আমার সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞাত। আপনিই একমাত্র অগ্রবর্তী এবং আপনিই একমাত্র পরবর্তী। আপনি সব বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান।'⁴⁰
প্রিয় ভাই! বাড়িতে-সফরে, একাকী-বৈঠকে যেখানেই থাকুন, তাওবা-ইস্তেগফার দ্বারা নিজ জিহ্বাকে সিক্ত রাখুন। প্রদীপের মিটিমিটি আলোর মতো আল্লাহর স্মরণ প্রজ্বলিত রাখুন হৃদয়গহনে। যদি আপনার আমল এমন হয়ে থাকে, তাহলে আপনি আখেরাতের সফলতার পথপানে এগিয়ে চলছেন। হযরত আবু মুসা আশআরি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
مَا أَصْبَحْتُ غَدَاةً قَطُّ إِلا اسْتَغْفَرْتُ اللهَ فِيهَا مِائَةَ مَرَّةً
'আমি এমন কোনো সকাল যাপন করি না, যাতে একশবার ইস্তেগফার নেই।'৪১
এই হাদিসে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। আমাদের প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা উম্মতের হিদায়াতের চিন্তায় সদা অস্থির থাকতেন। দাওয়াত, জিহাদ এবং দ্বীনের নানাবিধ কাজের ব্যস্ততায় সর্বদা ব্যস্ত থাকতেন। তা সত্ত্বেও আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনার জন্য পৃথক সময় নির্ধারণ করেছেন। নবীজির এই শিক্ষা আমাদের জীবনে দৃঢ়ভাবে বাস্তবায়ন করা আবশ্যিক কর্তব্য।
প্রিয় ভাই ও বোন! কত মানুষ জীবনের সংকীর্ণতা, দুর্যোগের ঘনঘটা ও বিপদের দুর্বিপাকে রয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। এসব মুসিবত থেকে মুক্তির জন্য মানুষ দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করছে। খেই হারিয়ে সেবন করছে ভুল প্রতিষেধক। মদ পান, প্রবৃত্তি ও বাসনার পূজা, গণকের দ্বারস্থ হওয়া ইত্যকার আঁধার পথে খুঁজছে আলোর দিশা। এই পথে তাদের সমস্যার সমাধান নেই আদৌ। সঠিক পথ ছেড়ে অযথাই ভুল পথে সমাধান খুঁজে ফিরছে তারা। মূলত তাদের জন্য প্রয়োজন ইস্তেগফারের মহৌষধ।
ডক্টর হুসাইন শারাফা সুনানুল্লাহি ফি ইহয়াইল উমাম গ্রন্থে বলেন, তাওবা ও ইস্তেগফার মানুষকে সভ্যতার পথে নিয়ে যায়। সভ্যতার প্রাসাদ নির্মাণে সর্বপ্রথম তাওবা ও ইস্তেগফারের ইট স্থাপনের বিকল্প নেই। স্বচ্ছ ও খাঁটি হৃদয়ে ইবাদত করার জন্য এটিই প্রথম শর্ত। এরই মাঝে রয়েছে উম্মাহর মহাসফলতা। কুরআন-হাদিসের বিভিন্ন ভাষ্যে তাওবা-ইস্তেগফারের সুদূরপ্রসারী প্রভাব ও ফলাফল বর্ণিত হয়েছে। প্রশান্তিময় জীবন, আকাশ থেকে ঝরে পড়া রিমঝিম বৃষ্টি, চোখজুড়ানো সবুজ বাগিচা, সন্তান ও সম্পদের প্রাচুর্য-এই আমলের পুরস্কারস্বরূপ আল্লাহ তায়ালা উল্লিখিত নেয়ামত প্রদানের অঙ্গীকার করেছেন। আল্লাহর অঙ্গীকারের কখনো ব্যত্যয় ঘটে না।
তাহলে আর দেরি নয়, পূর্বের গন্তব্য ছেড়ে ফিরে আসুন মুক্তির নতুন মোহনায়। আল্লাহর আদেশের ছায়াতলে আশ্রয় নিন পরম নির্ভরতায়। অন্তরের সুস্থতার জন্য সন্তুষ্টির রজ্জু দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরুন। গুনাহ ও অবাধ্যতার আঁধার থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন।
ইমাম কাতাদা রহ. বলেন, 'কুরআন তোমাদের রোগ ও প্রতিষেধক উভয়টি বলে দিয়েছে। সমস্ত গোনাহ হলো রোগ-সমতুল্য। আর ইস্তেগফার হলো সেই রোগের প্রতিষেধক।'
হযরত আলি ইবনে আবু তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'ধ্বংসের কিনারে দাঁড়ানো সেই ব্যক্তিটির ওপর আমি আশ্চর্যবোধ করি, মুক্তির রসদ থাকা সত্ত্বেও যে নিশ্চল রয়েছে! জিজ্ঞেস করা হলো, মুক্তির রসদ কী? তিনি উত্তরে বললেন, ইস্তেগফার।
তিনি আরও বলেন, আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে ক্ষমা করার জন্য বান্দার অন্তরে ইস্তেগফারের অনুভূতি সৃষ্টি করে দেন।'
এক নেককার ব্যক্তি বলেছেন, 'গুনাহ এবং নেয়ামত, মানুষের জীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে দুটো বিষয়। গুনাহের পর ইস্তেগফার এবং নেয়ামত ভোগের পর আল্লাহর প্রশংসা আদায় করলে সুন্দর ফলাফল অর্জিত হয়।'
হযরত লোকমান আলাইহিস সালাম তার ছেলেকে উপদেশ দিয়েছিলেন, ওহে পুত্র! আল্লাহ তায়ালা এমন কিছু সময় রেখেছেন যে সময়গুলোতে দোয়া বৃথা যায় না। সুতরাং বেশি বেশি ইস্তেগফার পাঠ করো।'
হযরত বকর ইবনু আব্দিল্লাহ মুযানি বলেন, তোমরা খুব বেশি গুনাহে লিপ্ত হয়ে যাও, এজন্য বেশি বেশি ইস্তেগফার পাঠ করো। হিসাবের দিন মানুষ তার আমলনামার প্রতি দুই লাইনের মাঝে যখন ইস্তেগফার দেখতে পাবে, তখন সে আনন্দে উদ্বেলিত হবে।'
ইমাম হাসান বসরি রহ. বলেন, 'তোমরা ঘরে-বাইরে, পথে-বাজারে, মজলিসে যেখানেই থাকো বেশি বেশি ইস্তেগফার পড়ো। তোমরা জানো না কোন সময় আল্লাহ তায়ালা ক্ষমার শীতল বৃষ্টি নাজিল করবেন।'
একজন নেককার ব্যক্তি বলেন, চারটি জিনিস রিজিক বৃদ্ধি করে। ক. রাত্রির নামাজ। খ. ভোরবেলা অধিক পরিমাণে ইস্তেগফার করা। গ. দান-সদকা ঘ. দিনের প্রথম এবং শেষ ভাগে আল্লাহর স্মরণ।
জাফর ইবনে মুহাম্মাদ সুফিয়ান সাওরিকে বলেন, যখন তুমি খুব বেশি চিন্তিত থাকো, তখন বেশি বেশি لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ الْعَلِيِّ الْعَظِيمِ 'লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা-বিল্লাহিল আলিইয়িল আযিম' পাঠ করো। যখন তোমার ওপর নেয়ামতের প্রাচুর্য কামনা করো, তখন অধিক পরিমাণে الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ 'আল-হামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন' পড়তে থাকো। আর যখন রিজিকের স্বল্পতা অনুভব করো, তখন বেশি বেশি ইস্তেগফার পড়ো।'
আবু বকর আল-মুযানি রহ. বলেন, আমি শীর্ণকায় এক ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করে কিছু উপদেশ কামনা করলাম। তিনি বললেন, তোমাকে কী বলা উচিত আমি ভেবে পাচ্ছি না। মানুষের জন্য উচিত হলো হামদ এবং ইস্তেগফার পাঠে অলসতা করবে না। মানুষের মাঝে দুইটি বিষয় রয়েছে। গুনাহ এবং নেয়ামত। আল্লাহর প্রশংসা এবং কৃতজ্ঞতা আদায় ব্যতীত নেয়ামত ভোগ করা যথার্থ হবে না। অনুরূপভাবে গুনাহের পর তাওবা-ইস্তেগফার ছাড়া তা মোচন হবে না। তখন মুযানি রাহিমাহুল্লাহ বললেন, আপনার এই কথাগুলো দ্বারা আমার ইলম সমৃদ্ধ হয়েছে।
হে প্রিয় ভাই ও বোন! আল্লাহর নৈকট্য অর্জন ব্যতীত আপনার অন্তর সৌভাগ্য ও সফলতার রাজপথ খুঁজে পাবে না কখনো। জীবন নিক্ষিপ্ত হবে লাঞ্ছনা ও দরিদ্রতার ভাগাড়ে। জীবনের খাতায় সৌভাগ্যের রশ্মি স্পর্শ করতে আল্লাহর স্মরণের বিকল্প নেই। পৃথিবীর তুচ্ছ ভোগবিলাস অচিরেই বিলীন হবে। যদি জীবন রহমানের পথে পরিচালিত না হয়, তাহলে কিয়ামতের দিন পরম শখের জিনিসগুলোই আপনার লজ্জা ও অপদস্থতার কারণ হবে। জীবনের প্রকৃত শান্তি, নিরাপত্তা এবং অন্তরের স্থিতিশীলতার জন্য খাঁটি অন্তঃকরণ নিয়ে আল্লাহর আনুগত্যের চৌকাঠ আঁকড়ে ধরার এখনই সময়। সুতরাং নির্ভেজাল ঈমান নিয়ে দিনরাত্রির প্রতিটি মুহূর্ত ইস্তেগফারের সুরভিত ঘ্রাণে মোহিত করে রাখুন।
ফরজ বিধানাবলি ও অন্যান্য সব ইবাদতে প্রতিযোগিতার ময়দানে অবতীর্ণ হন। ইনশাআল্লাহ জীবনের পরতে পরতে নেমে আসবে সুখদ শান্তির ফল্গুধারা। আসমান-জমিনের বরকতে সিক্ত হবে হৃদয়ের উষ্ণ প্রান্তর। নেয়ামত ও কল্যাণের রাশি রাশি চিত্র ভেসে উঠবে বাস্তবতার আয়নায়। আল্লাহ তায়ালা ঠিক এ কথাটিই বলে দিয়েছেন পবিত্র কুরআনে এভাবে,
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُم بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
'মুমিন পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে কেউ সৎকর্ম করবে তাকে আমি নিশ্চয়ই পবিত্র জীবন দান করব এবং তাদেরকে তাদের কর্মের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করব।'⁴²
তাফসিরে মুয়াসসারে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, আল্লাহ এবং রাসুলের প্রতি বিশ্বাসী ঈমানদার নারী বা পুরুষের যে কেউ সৎকর্ম করুক, সম্পদের প্রাচুর্যতা না থাকলেও আমি তাকে নিশ্চিন্ত, স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন দান করব। দুনিয়াতে যে পরিমাণ আমল করেছে, আখেরাতে এর চেয়ে উত্তম বিনিময় দান করব। ইরশাদ হয়েছে,
وَأَن لَّوِ اسْتَقَامُوا عَلَى الطَّرِيقَةِ لَأَسْقَيْنَاهُم مَّاءً غَدَقًا لِنَفْتِنَهُمْ فِيهِ وَمَن يُعْرِضْ عَن ذِكْرِ رَبِّهِ يَسْلُكْهُ عَذَابًا صَعَدًا
'তারা যদি সত্য পথে প্রতিষ্ঠিত থাকত তাদেরকে আমি প্রচুর বারি বর্ষণের মাধ্যমে সমৃদ্ধ করতাম, এর দ্বারা আমি তাদেরকে পরীক্ষা করতাম। যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের স্মরণ হতে বিমুখ হয় তিনি তাকে দুঃসহ শাস্তিতে প্রবেশ করাবেন।'⁴³
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরে মুয়াসসারে উল্লেখ করা হয়েছে, জিন এবং মানুষ যদি সকলেই ইসলামের পথে ফিরে আসে, তাদের ওপর আমি মুষলধারে কল্যাণকর বারি বর্ষণ করব। রিজিকের প্রাচুর্যতায় সজ্জিত করব দুনিয়ার জীবন। আমি তাদেরকে পরীক্ষা করব, নেয়ামত ভোগ করে তারা কেমন কৃতজ্ঞ? আর যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য, কুরআন শ্রবণ, অনুধাবন ও তদনুযায়ী আমল থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে, সে প্রবিষ্ট হবে মর্মন্তুদ লেলিহান আগুনে।
ইমাম হাসান বসরি রহ. বলেন, 'মানুষ যদি আল্লাহর আনুগত্যে অবিচল থাকে, আল্লাহ তাদেরকে সম্পদের প্রাচুর্যতা দান করবেন। আল্লাহর কসম করে বলি, সাহাবায়ে কেরাম এই গুণের অধিকারী ছিলেন। ফলশ্রুতিতে আল্লাহ তায়ালা তাদের জন্য রোম-পারস্যের ধন-ভান্ডারের দ্বার খুলে দিয়েছিলেন।' ⁴⁴
আমরা আল্লাহ তায়ালার নেয়ামতের সরোবরে ডুবে আছি। এই নেয়ামতপ্রাপ্তি আমাদের নিজেদের অর্জন নয়, আমাদের প্রতি এবং আমাদের ভূখণ্ডের প্রতি আল্লাহ তায়ালার অপার অনুগ্রহের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। তাই আমাদের জন্য উচিত হলো, আনুগত্যের জন্য আল্লাহর সাহায্য কামনা করা এবং নেয়ামতগুলোকে তাঁর কৃতজ্ঞতার মোড়কে সজ্জিত করা। নেয়ামত ভোগ করে যদি গুনাহ ও কৃতজ্ঞতার লাগাম আঁকড়ে থাকি, তাহলে আজ হোক বা কাল নেয়ামত বিলুপ্ত হবে।
কবি কতই-না সুন্দর বলেছেন, 'যখন ডুবে আছ নেয়ামতের প্রাচুর্যতায়, তা আঁকড়ে রাখো। কেননা, গুনাহ নেয়ামত দূরীভূত করে দেয়।
আল্লাহর কৃতজ্ঞতায় ডুবে থাকো অহর্নিশ। নিশ্চয়ই তিনি দ্রুত শাস্তি প্রদানকারী।'
টিকাঃ
১৬ সুরা মুতাফফিফিন: ২৬
১৭ সুরা মুমিনুন: ৯৯,১০০
১৮ মুসলিম শরিফ: ২৮২২
১৯ সুরা কাহফ: ২৮
২০ সুরা ফুরকান: ৭০-৭১
২১ সুরা আরাফ: ৯৬
২২ সুরা হুদ: ৩
২৩ সুরা নুহ: ১০-১২
২৪ সুরা আনফাল: ৩৩
২৫ আবু দাউদ: ১৫১৮
২৬ সুরা শুরা: ৩০
২৭ সুরা নিসা: ১২৩
২৮ সুরা রুম: ৪১
২৯ মুসনাদে আহমাদ: ৫৬৬৭
৩০ ইবনে মাজাহ: ৩৮১৮
৩১ ইমাম বাইহাকি, শুআবুল ঈমান: ৬৪৮
৩২ সুরা আরাফ: ২৩
৩৩ সুরা কাসাস: ১৬
৩৪ সুরা সোয়াদ: ২৪
৩৫ হযরত দাউদ আলাইহিস সালামের ইবাদতখানায় হঠাৎ দুই ব্যক্তি প্রবেশ করল। তিনি ক্রুদ্ধ হওয়ার পরিবর্তে ধৈর্যধারণ করলেন। তিনি সর্বদা ন্যায়বিচার করতেন। আগত দুই ব্যক্তির বিচারে অত্যাচারীকে কিছু না বলে অত্যাচারিতকে সম্বোধন করায় হয়তো-বা কিছুটা পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করা হয়েছে মনে করে দাউদ আলাইহিস সালাম আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করেছেন।
৩৬ সুরা সোয়াদ: ৩৫
৩৭ সুরা নুহ: ২৮
৩৮ সহিহ বুখারি: ৬৩০৭
৩৯ সহিহ মুসলিম: ১২২১
৪০ সহিহ মুসলিম: ৬৭৯৪।
৪১ আস-সুনানুল কুবর: ১০২৭৫। তাবারানি।
৪২ সুরা নাহল: ৯৭
৪৩ সুরা জিন: ১৬-১৭
৪৪ আদ্দুররুল মানসুর: ৮/৩০৫