📄 মাটি গ্রহণ করেনি যার লাশ
হিহাইনে একটি ঘটনা বর্ণিত আছে- রাসুল ﷺ-র যুগে এক ব্যক্তি ছিল। সে ছিল একাধারে ক্বারী ও কাতেবে ওহী। রাসুল ﷺ-র কাছে আসা ওহীগুলো সে লিখে রাখত। সে সূরা বাকারা ও আলে ইমারান মুখস্ত করে ফেলেছিল। সেজন্যে সাহাবাদের মধ্যে তার সম্মান ছিল ঈর্ষণীয় পর্যায়ের। কিন্তু কিছু মোশরেক তাকে দুনিয়া, ধন সম্পদ ও নারীর লোভ দেখিয়ে পথভ্রষ্ট করে ফেলল। সে মুরতাদ হয়ে গেল। জাগতিক সুখ-শোভা পাওয়ার লোভে শামিল হয়ে গেল মূর্তি পূজারীদের দলে।
পরবর্তীতে সে রাসুল -কে নিয়ে ঠাট্টা করে বলত- মুহাম্মাদ তো তাই জানে যা আমি লিখতাম। এ ছাড়া আর কিছুই সে জানে না।
এরপর...
রাসুল তার এ অবস্থার কথা জানতে পারলেন। তিনি আল্লাহ -র কাছে দোআ করলেন- হে আল্লাহ! তুমি তাকে জগতের জন্য দৃষ্টান্ত বানিয়ে দাও।
কিছুদিন পরই সেই ব্যক্তিটি মারা গেল।
তার সাথীরা কবর খনন করে তাকে দাফন করল। অতঃপর যখন তারা চলে আসছিল তখন দেখতে পেল মাটি তাকে জমিনের ওপর নিক্ষেপ করেছে। এ দৃশ্য দেখে তারা অবাক হয়ে গেল। পরস্পর বলাবলি করতে লাগল, নিশ্চয় এটা মুহাম্মাদ ও তার সাথীদের কাজ। অতঃপর তারা দ্বিতীয়বার গভীরভাবে মাটি খনন করে তাকে দাফন করল। মাটি পুনরায় তার সাথে একই আচরণ করল। তাকে ওপরে নিক্ষেপ করল। এবারও তার বন্ধুরা বলতে লাগল, এটা মুহাম্মাদ ও তার সাথী-সঙ্গীদের কাজ। অতঃপর তারা পুনরায় তাদের সাধ্যের সবটুকু ব্যয় করে যতোটা সম্ভব গভীর করে মাটি খনন করল। এবারও মাটি তাকে ওপরে নিক্ষেপ করল।
এবার তারা বলতে লাগল, এটা কোন মানুষের কাজ হতে পারে না। তাই তারা তাকে এভাবেই মাটির ওপর রেখে চলে গেল। অতঃপর কুকুর তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তার মুখে পেশাব করত। কাক, শিয়াল ও অন্যান্য প্রাণী তার গোস্ত ছিঁড়ে ফেড়ে খেত। এভাবেই একসময় তার লাশ জমিনের উপরেই পচে গলে শেষ হয়ে গেল। (নাউযুবিল্লাহ)।
📄 আলো ছেড়ে আঁধার পানে
মানুষ দীর্ঘকাল আল্লাহ-র আনুগত্য করে। সৎকর্মে ব্যস্ত থাকে। আসমান-জমিনের প্রভুর সাথে ভাব তৈরী করে ফেলে। নিভৃতে তাঁর সাথে কথা বলে। তাঁর মহব্বতের মাঝে অনুভব করে অনাবিল জান্নাতী সুখ। তাঁর ভালোবাসায় অন্তরাত্মাকে রাখে সজীব। তাঁর সন্তুষ্টির অন্বেষণেই হৃদয়কে রাখে প্রশান্ত।
অতঃপর একসময় সে পাপাচারী ও মন-পূজারীদের দেখে তাদের বিলাসী জীবনের মোহে পড়ে যায়। তাদের মতো জীবন যাপনে আগ্রহী হয়ে ওঠে। তার মনে হয়, তারা কতই না সুখে আছে। পরিণামে সে একের পর এক বালা-মসিবতে আক্রান্ত হতে থাকে।
📄 ভালোবাসা অর্জনে ঈমান বিসর্জন
ল্লামা জাওহারী তার কিতাব আল মুনতাজিমে এ সম্পর্কে একটি ঘটনা লিখেছেন-
একবার মুসলামানগণ যুদ্ধ করতে গিয়ে রোমের কোনো এক দূর্গ অবরোধ করল। দূর্গটি ছিল অত্যন্ত মজবুত। তাই তাদের অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হতে থাকল। এই দীর্ঘ অবরোধের মাঝে একদিন রোমানদের একটি মেয়ে দূর্গ থেকে উঁকি দিল। ইবনে আব্দুর রহীম নামক এক ব্যক্তি মেয়েটিকে দেখে ফেলল। মেয়েটিকে ভীষণ ভালো লেগে গেল তার। মেয়েটির জন্য তার অন্তরে জন্ম নিল গভীর ভালোবাসা। সে মেয়েটির কাছে চিঠি পাঠাল-
হে রূপসী! কি করে তোমায় পাওয়া যাবে বলো? জবাবী চিঠিতে মেয়েটি লিখল, তুমি খ্রিস্টান হয়ে যাও, তাহলেই আমাকে কাছে পাবে।
লোকটি মেয়েটির ভালোবাসার মোহে পড়ে খ্রিস্টান হয়ে গেল এবং চলে গেল তার কাছে।
আহা! সে কত বড় মিসকিন! একজন নারীকে বিবাহ করতে পারাকেই সে নিজের সফলতা মনে করল।
সে হাতছাড়া হওয়ার কারণে মুসলমানগণ অনেক চিন্তিত হল। অতঃপর যখন অবরোধের সময়কাল প্রলম্বিত হচ্ছিল, কিছুতেই জয় করা যাচ্ছিল না দূর্গটি, তখন মুসলমানেরা সেখান থেকে ফিরে গেল।
কিছুদিন পরে কথা। অবরোধকারী مسلمانوں একটি দল ওই দূর্গের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। তখন তাদের আব্দুর রহিমের কথা মনে পড়ল। তারা তার নাম ধরে ডাক দিল। হে ইবনে আব্দুর রাহিম। তুমি কোথায়?
সে উকি দিয়ে বাইরে তাকাল।
তারা তাকে বলল, তুমি তো যা কামনা করেছিলে তা পেয়ে গেছ। এখন তোমার কোরআন, তোমার ইলম ও সালাতের খবর কি?
সে উত্তর দিল, আমি পুরো কোরআন ভুলে গেছি। শুধু একটি আয়াত মনে আছে আমার-
﴿ رُبَمَا يَوَدُّ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْ كَانُوا مُسْلِمِينَ ﴾ কোনো সময় কাফেররা আকাঙ্ক্ষা করবে, কি চমৎকার হত, যদি তারা মুসলমান হত! [সূরা হিজর : ২]
এর পরের আয়াতেই আল্লাহ বলেন- ذَرْهُمْ يَأْكُلُوا وَيَتَمَتَّعُوا وَيُلْهِهِمُ الْأَمَلُ فَسَوْفَ يَعْلَمُونَ আপনি ছেড়ে দিন তাদেরকে, খেয়ে নিক এবং ভোগ করে নিক এবং আশায় ব্যাপৃত থাকুক। অতি সত্বর তারা জেনে নেবে। [সূরা হিজর : ৩]
এই ছিল আব্দুর রহিমের ঘটনা। একটি মেয়ের ফেতনা তাকে বিভ্রান্ত করেছে। করেছে পথভ্রষ্ট। ফলে সে আসমান ও জমিনের প্রভুর সাথে শিরক করেছে।
📄 সম্পদের লোভে সংকল্প পরিত্যাগ, অতঃপর...
ক খনও কখনও মানুষ ধন-সম্পদের মোহে পড়ে দয়ালু আল্লাহ -র সাথে কুফুরী করে। এই ধরো আ'শা ইবনে কায়সের কথা। সে ছিল এক বৃদ্ধ কবি। আরবের নজদ অঞ্চলের অন্তর্গত ইয়ামামা থেকে রাসুল -র সাথে সাক্ষাত করার জন্য সফর শুরু করল। উদ্দেশ্য নবীজীর হাতে ইসলাম গ্রহণ করা। সে অবিরাম সফর করে মদিনার পানে এগুচ্ছিল। তার মনের পর্দায় ভাসছিল রাসুল নূরানী মুখচ্ছবি। তার হৃদয় নবীজীর সাক্ষাত লাভে হচ্ছিল ব্যকুল। তার জবান রাসুলের প্রশংসায় একের পর এক কাব্যগাঁথা আওড়াচ্ছিল।
সে অবিরাম পাহাড়-পর্বত ও মরু-প্রান্তর অতিক্রম করে আসছিল। মনে তার দৃঢ় সংকল্প- দেখা করবে নবীর সাথে। আস্তাকুড়ে ছুড়ে ফেলবে কুফর-শিরকের পঙ্কিলতাকে।
কিন্তু সে যখন মদিনার কাছাকাছি পৌঁছল, তখন কিছু কাফের এসে তার পথ আগলে দাঁড়াল। তারা জানতে চাইল তার সফরের উদ্দেশ্য।
সে বলল, আমি রাসুল -র সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছি।
তারা ভড়কে গেল। মনে মনে ভাবল, এই কবি যদি মুহাম্মাদের সাথে দেখা করে ইসলাম গ্রহণ করে ফেলে। তাহলে তো মুহাম্মাদের শান আরো বেড়ে যাবে। তিনি হয়ে উঠবেন আরো শক্তিশালী। হাচ্ছান বিন ছাবেত একাই তো তাদের অবস্থা নাজেহাল করে ছাড়ছে। এখন যদি এই কবিও ইসলাম গ্রহণ করে নেয়, তাহলে তো উপায় নেই।
তাই তারা তাকে বোঝাল, হে আ'শা! তোমার বাপ দাদাদের ধর্মের মাঝেই রয়েছে কল্যাণ।
সে বলল, না, রাসুল -র ধর্মই অধিক ভালো।
তারা বলল, তিনি তো জিনাকে হারাম বলেন।
আ'শা বলল, আমি বৃদ্ধ। মহিলাদের প্রতি আমার কোনো আকর্ষণ নেই।
তারা বলল, তিনি তো মদ পান করাকে হারাম বলেন।
আ'শা বলল, মদতো আকলকে বিকল করে দেয়। মানুষকে অপদস্থ করে। মদের প্রতি আমার কোনো আগ্রহ নেই।
তারা যখন দেখল যে, সে ইসলাম গ্রহণে দৃঢ় প্রত্যয়ী। তখন তারা বলল, আমরা তোমাকে ১০০ উট দেব। তুমি তোমার বাড়িতে ফিরে যাও। ইসলাম গ্রহণের সংকল্প ত্যাগ কর।
আ'শা বলল, আচ্ছা! সম্পদের কথা যখন বলছ, তাহলে ঠিক আছে। আমি ইসলাম গ্রহণ করব না।
অতঃপর তারা তাকে ১০০ উট দিল। উট বুঝে পেয়ে সে আর ইসলাম গ্রহণ করল না। কাফের অবস্থাতেই ফিরে চলল তার স্বজাতির কাছে। সে প্রফুল্ল চিত্তে উটগুলোকে পেছন থেকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। নিজ এলাকার কাছাকাছি পৌঁছার পর আচানক সে উট থেকে পড়ে গেল। ভেঙ্গে গেল তার পা ও কোমর। পরিশেষে সে মৃত্যু বরণ করল। ۞ ذلِكَ بِأَنَّهُمُ اسْتَحَبُّوا الْحَيُوةَ الدُّنْيَا عَلَى الْآخِرَةِ وَ أَنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ ﴿١٠﴾ أُولَئِكَ الَّذِينَ طَبَعَ اللَّهُ عَلَى قُلُوبِهِمْ وَسَمْعِهِمْ وَأَبْصَارِهِمْ وَ أُولَئِكَ هُمُ الْغُفِلُونَ ﴿١٠٨﴾ لَا جَرَمَ أَنَّهُمْ فِي الْآخِرَةِ هُمُ الْخُسِرُونَ এটা এ জন্যে, তারা পার্থিব জীবনকে পরকালের চাইতে প্রিয় মনে করেছে এবং আল্লাহ্ অবিশ্বাসীদের পথ প্রদর্শন করেন না।
এরাই তারা, আল্লাহ তা'আলা এদেরই অন্তর, কর্ণ ও চক্ষুর ওপর মোহর মেরে দিয়েছেন এবং এরাই কান্ডজ্ঞানহীন। বলাবাহুল্য, পরকালে এরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। [সূরা নাহল ১০৭-১০৯]