📘 আল্লাহ প্রেমের সন্ধানে > 📄 অহংকারের করুণ পরিণতি

📄 অহংকারের করুণ পরিণতি


উমর -র শাসনামলে গাস্সানের রাজা ছিল জাবালা ইবনে আইহাম। সে ইসলাম গ্রহণ করে উমর-র কাছে তার সাথে দেখা করার অনুমতি চেয়ে চিঠি পাঠাল। উমর অনেক খুশি হলেন। তিনিও জাওয়াবী চিঠি পাঠালেন। লিখলেন যদি তুমি আমাদের কাছে আস, তাহলে তোমার ওপর সেসব বিষয় আবশ্যক হবে যা আমাদের ওপর আবশ্যক। আর সেসব বিষয় নিষিদ্ধ হবে যা আমাদের ওপর নিষিদ্ধ।
অনুমতি পত্র পেয়ে জাবালা পাঁচশত ঘোড় সওয়ার নিয়ে মদিনার দিকে রওয়ানা হল। মদিনার কাছাকাছি পৌঁছার পর সে স্বর্নখচিত পোশাক পরিধান করল। মাথায় হীরাখচিত মুকুট পরল। সাথে আসা সৈন্যদেরকেও পরিধান করাল মূল্যবান পোশাক-আশাক। অতঃপর সে প্রবেশ করল মদিনায়। মদিনার লোকজন তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। মহিলা ও বাচ্চারাও তাকে এবং তার দলবলকে একনজর দেখার জন্য ভীড় জমাল।
অতঃপর সে উমর -র দরবারে প্রবেশ করল। তিনি তাকে অভিবাদন জানালেন। নিজের পাশে বসালেন। তাকে যথাযথ আদর আপ্যায়ন করলেন। তখন হজের মওসুম চলছিল। উমর হজের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলেন। জাবালাও তার সাথে রওয়ানা হল।
জাবালা যখন বাইতুল্লাহ শরীফ তওয়াফ করছিল, তখন বনি ফাযারাহ গোত্রের এক দরিদ্র লোকের পায়ের নিচে জাবালার বহুমূল্য ইহরামের এককোণা অসর্তকতায় চাপা পড়ে গেল। জাবালা ক্ষুব্ধ হয়ে তার দিকে তাকাল এবং তার গালে একটা চড় বসিয়ে দিল। চড়টি সে এতোটাই জোরে মেরেছিল যে, লোকটির নাকের হাড্ডি ভেঙ্গে গেল। লোকটি উমর -র কাছে নালিশ করল।
তিনি জাবালাকে ডেকে আনলেন। বললেন, হে জাবালা! তওয়াফ অবস্থায় তোমার মুসলমান ভাইয়ের গায়ে হাত তুলতে কিসে তোমাকে প্ররোচিত করল?
জাবালা বলল, ওই বেটা আমার কাপড় মাড়িয়ে দিয়েছে। নেহাত কা'বার সম্মান রক্ষার্থে আমি তাকে ছেড়ে দিয়েছি। নইলে আমি তাকে মেরেই ফেলতাম।
উমর বললেন, তাহলে তুমি তোমার অপরাধ স্বীকার করছ? তাই এখন হয় তুমি তাকে যে কোনভাবে সন্তুষ্ট করবে, নয়তো কিসাস অনুসারে এই লোকটি তোমাকে চড় মেরে প্রতিশোধ নেবে।
জাবালা বলল, অসম্ভব! আমি একজন রাজা আর সে একজন দরিদ্র লোক।
উমর বললেন, হে জাবালা! ইসলাম তোমার ও তার মাঝে সমতার বিধান কায়েম করেছে। তোমরা দুজনই মুসলিম। তাই আইনের দৃষ্টিতে দুজনই সমান। তাকওয়া ব্যতিত অন্য কিছু দ্বারা তুমি তার থেকে উৎকৃষ্ট হতে পারো না।

📘 আল্লাহ প্রেমের সন্ধানে > 📄 এবার আক্ষেপের পালা

📄 এবার আক্ষেপের পালা


জাবালা বলল, যে ধর্মে একজন রাজা আর ফকির সমান, সে ধর্মের আনুগত্য আমি করব না। এই লোকটি আমাকে আঘাত করলে আমি ইসলাম ত্যাগ করে পুনরায় খ্রিস্টান হয়ে যাব। (নাউযুবিল্লাহ)
উমর গর্জন করে বললেন, তোমার মত হাজারো জাবালা যদি ইসলাম ত্যাগ করে চলে যায়, তবু ইসলামের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিধানের লঙ্ঘন হতে পারে না। ইসলাম কাউকে জোর করে মুসলমান বানায় না। তবে মনে রেখ, ইসলাম ত্যাগ করা এত সহজ নয়। কারণ, ইসলামে মুরতাদের শাস্তি মৃত্যুদন্ড।
উমর -এর শেষ কথাটি শুনে জাবালা ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। সে বলল, আমিরুল মুমিনিন! আমাকে আগামী কাল পর্যন্ত সময় দিন।
উমর বললেন, ঠিক আছে, তোমাকে সময় দেওয়া হল।
অতঃপর সেদিন গভীর রাতে জাবালা ও তার সাথী-সঙ্গীরা মক্কা থেকে বের হয়ে কুসতুনতুনিয়ার দিকে পালাল এবং সেখানে গিয়ে তারা খ্রিস্টান হয়ে গেল।
তারপর সময় গড়াল। কালের গর্ভে বিলীন হল বহু বছর। জগতের বহু স্বাদের বস্তু বিস্বাদ হল। বহু মিষ্টান্ন তিক্ততায় রূপ নিল। জাবালার জন্য আক্ষেপ ছাড়া বাকি রইল না কিছুই। সে যখন তার অতীত ইসলামী জীবনের কথা স্মরণ করত, মনের ক্যানভাসে ভেসে উঠত সালাত-সওমের সেই অনাবিল সৌন্দর্যের স্মৃতি; তখন ইসলাম ত্যাগের আফসোস তাকে একশ তরবারীর ধারালো ফলা হয়ে আঘাত করত। করত। সে আল্লাহ ও তার রাসুলের সাথে কৃত নাফরমানীর জন্য লজ্জিত হত।
সে বলত-
تَنَصَّرَتِ الْأَشْرَافُ مِنْ عَارِ لَطْمَةٍ * وَمَا كَانَ فِيهَا لَوْ صَبَرَتْ لَهَا ضَرَر تُكَنِّفُنِي مِنْهَا الْحِجَاجُ وَنَخْوَةٌ * وَبِعْتُ لَهَا الْعَيْنَ الصَّحِيْحَةِ بِالْعَوْرِ فَيَا لَيْتَ أُمِّي لَمْ تَلِدْنِي وَلَيْتَنِيْ * رَجَعْتُ إِلَى الْقَوْلِ الَّذِي قَالَ لِي عُمَر وَيَالَيْتَنِي أَرْعَى الْمَخَاضَ بِقَفْرَةٍ * وَكُنْتُ أَسِيرُ فِي رَبِيعَةَ أَوْ مُضَر وَيَا لَيْتَ لِي بِالشَّامِ أَدْنَى مَعِيْشَةً * أُجَالِسُ قَوْمِي ذَاهِب السَّمْعِ وَالْبَصَرِ
অভিজাত ব্যক্তি একটি থাপ্পড়ের ভয়ে খ্রিস্টান হয়ে গেল, অথচ সে যদি সবর করত, তাহলে তার হতো না কোন ক্ষতি।
আহা! অহংকার ও অহমিকা ঘিরে ফেলেছিল আমায়, তাই তো সুস্থ চক্ষুর বিনিময়ে আমি কিনেছি অন্ধত্ব।
হায়! আমার মা যদি জন্মই না দিত আমায়! হায়! আমি যদি মেনে নিতাম উমরের কথা। হায়! আমি যদি কোন চারণভূমিতে উটের রাখাল হয়ে উট চরাতাম।
ঘুরে বেড়াতাম রাবিয়া ও মুজার গোত্রে। হায়! আমি যদি জীবন যাপন করতাম সিরিয়ায়, যদি তুষ্ট হতাম স্বল্প রুজিতেই। থাকতাম আমার জাতির সাথেই- অন্ধ ও বধির হয়ে।
অতঃপর সে আমৃত্যু খ্রিস্টধর্মের ওপরই অটল ছিল। কাফের অবস্থাতেই হয়েছে তার মরণ।
হাঁ, সে কুফরের ওপর মৃত্যু বরণ করেছে। কারণ, সে ছিল অহংকারী। সে দম্ভভরে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল বিশ্ব প্রতিপালকের বিধান থেকে। অহংকারই ডেকে এনেছিল তার পতন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00