📄 আবু জান্দালের বন্দি জীবন
আবু জান্দালকে মক্কায় নিয়ে যাওয়া হল। হয়তো সে তাদের কাছে এক আল্লাহর দ্বীনের ওপর অটল অবিচল থাকার আর্জি পেশ করেছিল। এক আল্লাহ্-র উপর বিশ্বাসী থেকে তার পথে বাকি জীবনটুকু কাটিয়ে দেওয়ার জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়র মিনতি করেছিল। নিষ্ঠুর কাফের শ্রেণি যার প্রতি কোনো কর্ণপাত করেনি।
এদিকে মুসলমানরা কাফেরদের ওপর ক্রোধান্বিত ও মক্কার অসহায় মুসলমানদের ব্যাপারে চিন্তিত অবস্থায় রাসুল -র সাথে মদিনাতে ফিরে গেলেন।
এরপর...
মক্কার অসহায় মুসলমনাদের ওপর কাফের শ্রেণির জুলুম তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছিল। তাদের অত্যাচার-নির্যাতন সব সীমা অতিক্রম করে ফেলেছিল। তাই আবু জান্দাল ও তার সাথী আবু বাসীর এবং মক্কার অন্যান্য অসহায় মুসলমানরা বন্দি অবস্থা থেকে পলায়ণ করার জন্য আপ্রাণ চেষ্ট করতে লাগলেন।
📄 আবু বাসীরের ঘটনা
একপর্যায়ে আবু বাসীর বন্দি অবস্থা থেকে পালাতে সক্ষম হলেন। তিনি মদিনায় চলে এলেন। কারণ, রাসুল ও তাঁর সাহাবাদের সান্নিধ্য অর্জনের আকাঙ্ক্ষা তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। তিনি জনমানবহীন দুর্গম মরুভূমি অতিক্রম করে সামনে অগ্রসর হতে লাগলেন। তার নগ্ন পা উত্তপ্ত পাথরের তীব্র দহনে পুড়ে যাচ্ছিল। এভাবে চলতে চলতে এক সময় তিনি মদিনায় পৌঁছলেন। পৌঁছেই প্রথমে মসজিদে নববীতে গেলেন। রাসুল সেসময় সাহাবায়ে কেরামের সাথে মসজিদে অবস্থান করছিলেন। আবু বাসীর সেখানে প্রবেশ করলেন। তার শরীর জুড়ে আঘাতের চিহ্ন। চেহারায় সফরের ক্লান্তি। চুল এলোমেলো। ধূলিযুক্ত। ভালোভাবে শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল তার।
ইত্যবসরে কোরাইশ নেতাদের পক্ষ থেকে দুই কাফের এসে মসজিদে প্রবেশ করল। আবু বাসীর তাদের দেখে ভয় পেয়ে গেলেন। তার হৃদকম্পন বেড়ে গেল। যে যাতনা থেকে বহু কষ্টে তিনি নিজেকে মুক্ত করেছিলেন, যেন তা আবার তার কাছে প্রত্যাবর্তন করল।
অতঃপর এই দুই কোরাইশ ব্যক্তি চিৎকার দিয়ে বলতে লাগল, হে মুহাম্মাদ! তাকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দাও। আমাদের সাথে কৃত চুক্তির কথা স্মরণ কর।
রাসুল আবু বাসীরকে তাদের হাতে সোপর্দ করে দিলেন। তিনি আবু বাসীরকে বললেন, আমি চুক্তির খেলাফ করতে পারি না। তাই তুমি এখন ফিরে চলে যাও।
আবু বাসীর বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আমাকে কাফেরদের হাতে তুলে দিচ্ছেন? তারা আমাকে দীন থেকে ফেরাতে চেষ্টা করছে। আমার ওপর নানাভাবে অত্যাচার চালাচ্ছে।
রাসুল তাকে বললেন, সবর কর। আল্লাহ-র ওপর ভরসা রাখ। তিনি নিশ্চয়ই তোমার মুক্তির কোন ব্যবস্থা করে দেবেন।
কাফের দু'জন আবু বাসীর-কে সাথে নিয়ে মক্কার পথে রওয়ানা হল। যুলহুলাইফা নামক স্থানে পৌঁছার পর তারা বিশ্রাম নিতে থামল। তাদের একজন আবু বাসীরের পাশেই বসে রইল। অপরজন প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দিতে একটু দূরে চলে গেল। আবু বাসীরের পাশে বসে থাকা কাফেরটি তার তরবারী বের করে নাড়াতে লাগল। গর্বভরে বলতে লাগল, আমি এই তরবারী দ্বারা একদিন দিনভর আউস ও খাজরাজের লোকদের হত্যা করব।
আবু বাসীর লোকটিকে বলল, বাহ! তোমার তরবারীটি তো ভারী সুন্দর।
সে খাপ থেকে তরবারীটি বের করে বলল, হাঁ, আল্লাহর শপথ, এটি খুবই ভালো তরবারী। অনেকবার আমি এটিকে পরখ করে দেখেছি।
আবু বাসীর বললেন, আমাকেও একটু দেখতে দাও।
লোকটি তরবারীটি তার হাতে দিল। তিনি তরবারীটি হাতে পেয়েই এক কোপে লোকটির গর্দান উড়িয়ে দিলেন। দ্বিতীয় লোকটি ফিরে এসে তার সঙ্গীর রক্তাত্ব নিথর দেহ মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌঁড় দিল। সে এক দৌঁড়ে মদিনায় চলে এল। রাসুল -র কাছে এসে জানাল, সে আমার সাথীকে মেরে ফেলেছে। এখন আমাকেও মেরে ফেলবে।
এরই মধ্যে আবু বাসীর -ও সেখানে এসে হাজির হল। তার চক্ষু থেকে আগুন বিচ্ছুরিত হচ্ছিল। হাতে থাকা তরবারী থেকে টপটপ করে রক্ত ঝরছিল।
আবু বাসীর বলতে লাগলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহ আপনাকে অঙ্গীকার পূর্ণ করার তাওফীক দান করেছেন। আপনি আমাকে তাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। হে আল্লাহর রাসুল! আপনি জানেন যে, আমি মক্কায় ফিরে গেলে তারা আমাকে দীন থেকে ফিরে যেতে বল প্রয়োগ করবে। আমি যা কিছু করেছি তা কেবল এ কারনেই করেছি যে, তাদের সাথে আমার কোন চুক্তি ছিল না। এখন আপনি আমাকে আপনাদের অন্তর্ভূক্ত করে নিন।
রাসুল বললেন, না।
আবু বাসীর বললেন, আপনি আমাকে কিছু মানুষ দিন। আমি মক্কা বিজয় করবো।
রাসুল সাহাবাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, দুর্ভাগ্য যুদ্ধের ইন্ধন দাতার মায়ের। যদি আজ তার সাথে কিছু লোক থাকত (তাহলে তো সে মক্কায় আক্রমন করে সর্বনাশ করে ফেলত)।
অতঃপর রাসুল কোরাইশদের সাথে কৃত চুক্তির কথা স্মরণ করলেন এবং আবু বাসীরকে মদিনা থেকে বের হয়ে যেতে বললেন।
আবু বাসীর ও তাঁর কথা মেনে মদিনা থেকে বের হয়ে গেলেন। হাঁ, এটাই ছিল প্রকৃত অবস্থা। তিনি দীনের বিরোধীতায় অবতীর্ণ হননি। কেননা তিনি তো পরম দয়াময় দাতার মহাদানের আশা করেন। যার জন্য তিনি ত্যাগ করেছেন তার পরিবার পরিজন। নিজেকে নিপতিত করেছেন কষ্ট যাতনায়।
📄 নতুন ঠিকানা
আবু বাসীর মদিনা থেকে বের গেলেন। কিন্তু যাবেন কোথায়? ভাবনার অতলে ডুব দিলেন। কেননা মক্কাতে গেলে সইতে হবে কেবল কষ্ট-যাতনা। মদিনাতে গেলে হবে مسلمانوں চুক্তিভঙ্গ।
অবশেষে জিদ্দার উত্তরে সাগর তীরের এমন এক নির্জন বালুকাময় ভূমিকে থাকার জন্য নির্ধারণ করলেন, যেখানে তার সাথী-সঙ্গী কেউ ছিল না।
কিছুদিন পর মক্কার দুর্বল মুসলমানেরা তার নতুন আবাসভূমির কথা জানতে পারল। তারা এটিকে মুক্তির নতুন পথ জ্ঞান করল। কেননা, মদিনার মুসলমানেরা তাদের গ্রহণ করবে না। আর মক্কার কাফেররা তাদেরকে শাস্তি ছাড়া আর কিছুই দিচ্ছে না।
অতঃপর একদিন আবু জান্দাল শিকল ভেঙ্গে পালাল। আশ্রয় নিল আবু বাসীরের কাছে। তারপর এই তালিকা আরো দীর্ঘ হল। মক্কা থেকে একের পর এক মুসলমান শিকল ছিড়ে পালিয়ে গিয়ে তার কাছে গিয়ে আশ্রয় নিল। এক পর্যায়ে তাদের সংখ্যা অনেক হয়ে গেল। তাদের শক্তি বৃদ্ধি পেল।
যখন কোরাইশদের কোন ব্যবসায়ী কাফেলা এ এলাকা দিয়ে যেত, তারা সকলে মিলে তাদের ওপর আক্রমন করত। তাতে যে গনীমত লাভ হত তা দিয়ে তাদের দিন গুজরান হত। অতঃপর এ ধরণের ঘটনা যখন বারবার ঘটতে লাগল, তখন কোরাইশরা অপারগ হয়ে রাসুল ﷺ-র কাছে এই প্রস্তাব পাঠাল যে, আমরা আল্লাহ এবং আত্মীয়তার দোহাই দিয়ে আবেদন করছি, আপনি আবু বাসীর এবং তার সাথীদেরকে মদিনায় ডেকে নিন। আমাদের এলাকা থেকে কেউ যদি মুসলমান হয়ে মদিনায় আপনার কাছে চলে যায়, তাহলে আমরা তার পিছু ধাওয়া করব না।