📄 হৃদয় বিদারক দৃশ্য
রাসুল ﷺ বললেন, এখনও তো চুক্তিনামা সম্পন্ন হয়নি। লেখা শেষ হলে তাতে উভয় পক্ষের দস্তখত হলে তারপর চুক্তির ভিত্তিতে কাজ শুরু হবে।
রাসুল ﷺ সুহাইলকে বারবার অনুরোধ করলেন, আবু জান্দাল আমাদের কাছে থাকুক। কিন্তু সুহাইল তা মানল না। অবশেষে তিনি আবু জান্দালকে সুহাইলের হাতে তুলে দিলেন।
মক্কার কাফেররা আবু জান্দাল -কে এমনিতেই নানাভাবে কষ্ট দিয়েছে। নির্যাতন করেছে। তাই আবার তাকে কাফেরদের মাঝে ফেরত প্রদানে আবু জান্দাল খুবই দুঃখভারাক্রান্ত কন্ঠে বললেন, আফসোস, হে মুসলমানেরা, আমাকে আবার কাফেরদের হাতেই তুলে দেওয়া হচ্ছে।
রাসুল ﷺ তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন- يَا أَبَا جَنْدَلٍ اِصْبِرْ وَاحْتَسِبْ فَإِنَّا لَا نَغْدِرُ إِنَّ اللَّهَ جَاعِلُ لَكَ فَرَجًا وَمَخْرَجًا হে আবু জান্দাল! ধৈর্য ধর। আল্লাহর কাছে বিনিময়ের প্রত্যাশা কর। আমরা তো বিশ্বাসভঙ্গের কোন কাজ করতে পারি না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমার মুক্তির কোন উপায় ব্যবস্থা বের করে দেবেন।
সুহাইল দ্রুতপদে তার ছেলের কাছে গেল। শৃঙ্খল ধরে টেনে হেঁচড়ে তাকে নিয়ে মক্কার দিকে রওয়ানা হল। আবু জান্দাল গগন বিদারী আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভারী করে তুলল। মুসলমানদের দিকে তাকিয়ে বারবার বাঁচাও বাঁচাও বলে ফরিয়াদ জানাল।
সে বলতে লাগল, হে মুসলমানেরা, আমাকে কাফের মুশরেকদের কাছে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অথচ তোমাদের মত আমিও তো মুসলমান হয়েছি। তোমরা কি দেখো না, আমি কি পরিমাণ শাস্তি ভোগ করেছি। দৃষ্টির আড়ালে চলে যাওয়া অবধি সে অনবরত এ কথাগুলোই বলে যাচ্ছিল। কামনা করে যাচ্ছিল মুসলমানদের সাহায্য।
সাহাবায়ে কেরামের অন্তর বিগলীত হয়ে গেল। তারা ভাবতে লাগল, আহা! বেচারা, সবে যৌবনের তীরে পা ফেলেছে। এখনই তাকে সইতে হচ্ছে কত কষ্ট-যাতনা। সুখময় জীবনের বদলে সে আজ নিপতিত কঠিন বিপদে। অথচ সে তো ছিল মক্কার নেতৃস্থানীয় এক ব্যক্তির আদরের পুত্র। জীবন ছিল তার সুখ-শোভায় পরিপূর্ণ। তার চারপাশ জুড়ে ছিল হাজারো ভোগ্য সামগ্রীর ভীড়। অথচ আজ মুসলমানদের সামনে থেকে তাকে বেড়ি পরিয়ে বন্দি জীবনের দিকে নিয়ে যাওয়া হল। এসব ভাবতে ভাবতে সাহাবায়ে কেরام খুবই কষ্ট পাচ্ছিলেন।
📄 আপনি কি সত্য নবী নন?
উমর কিছুতেই নিজেকে সামলে রাখতে পারছিলেন না। তিনি বলেই ফেললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি কি আল্লাহর সত্য নবী নন?
রাসুল বললেন, অবশ্যই।
উমর বললেন, আমরা হকের ওপর এবং তারা বাতিলের ওপর নয় কি?
রাসুল বললেন, অবশ্যই।
উমর বললেন, তাহলে আমরা এই অপমান ও লাঞ্ছনা কেন সহ্য করব?
রাসুল বললেন, আমি আল্লাহর রাসুল ও সত্য নবী। আমি আল্লাহর হুকুমের বিপরীতে কোন কাজ করতে পারি না। তিনিই আমার সাহায্যকারী।
উমর জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি কি এ কথা বলেননি যে, আমরা কা'বা ঘরের তাওয়াফ করব।?
রাসুল বললেন, তা এ বছরেই হবে তা তো বলিনি।
উমর-র অন্তর শান্ত হল না। তার অস্থিরতা কিছুতেই কাটছিল না। তিনি আবু বকর-র কাছে গেলেন। তাকেও তিনি সেই প্রশ্নগুলোই করলেন যেগুলো রাসুল-কে করেছিলেন।
আবু বকর-ও সেই উত্তরই দিলেন যেগুলো রাসুল দিয়েছিলেন।
উমর বলেন, পরবর্তীতে আমি আমার আচরণের জন্য অনেক লজ্জিত হয়েছি। কাফফারা স্বরূপ অনেক সালাত পড়েছি। অনেক সওম রেখেছি। দান-খয়রাত করেছি। বহু গোলাম আযাদ করেছি।
📄 আল্লাহ অচিরেই মুক্তির ব্যবস্থা করবেন
সহীহ মুসলিমে আনাস (রাঃ)-র সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, সাহাবায়ে কেরাম রাসুল (সাঃ)-র কাছে জানতে চাইলেন, হে আল্লাহর রাসুল! এ শর্তের ওপর কীভাবে চুক্তি করা যায় যে, আমাদের মধ্যে কেউ তাদের কাছে গেলে তারা তাকে ফেরত দেবে না। অথচ তাদের কেউ আমাদের কাছে এলে আমরা তাকে তাদের কাছে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য থাকব?
রাসুল (সাঃ) বললেন, হ্যাঁ, আমাদের কেউ যদি তাদের সাথে মিলিত হয় তবে আমাদের ওই ব্যক্তির কোনই প্রয়োজন নেই। আল্লাহ্ তাকে আপন রহমত থেকে বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত করেছেন। আর তাদের থেকে যে ব্যক্তি মুসলমান হয়ে আমাদের কাছে আসবে, যদি চুক্তির শর্ত হিসেবে তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে, কিন্তু তাতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। কারণ, আল্লাহ্ শীঘ্রই তার মুক্তির ব্যবস্থা করে দেবেন।
📄 আবু জান্দালের বন্দি জীবন
আবু জান্দালকে মক্কায় নিয়ে যাওয়া হল। হয়তো সে তাদের কাছে এক আল্লাহর দ্বীনের ওপর অটল অবিচল থাকার আর্জি পেশ করেছিল। এক আল্লাহ্-র উপর বিশ্বাসী থেকে তার পথে বাকি জীবনটুকু কাটিয়ে দেওয়ার জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়র মিনতি করেছিল। নিষ্ঠুর কাফের শ্রেণি যার প্রতি কোনো কর্ণপাত করেনি।
এদিকে মুসলমানরা কাফেরদের ওপর ক্রোধান্বিত ও মক্কার অসহায় মুসলমানদের ব্যাপারে চিন্তিত অবস্থায় রাসুল -র সাথে মদিনাতে ফিরে গেলেন।
এরপর...
মক্কার অসহায় মুসলমনাদের ওপর কাফের শ্রেণির জুলুম তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছিল। তাদের অত্যাচার-নির্যাতন সব সীমা অতিক্রম করে ফেলেছিল। তাই আবু জান্দাল ও তার সাথী আবু বাসীর এবং মক্কার অন্যান্য অসহায় মুসলমানরা বন্দি অবস্থা থেকে পলায়ণ করার জন্য আপ্রাণ চেষ্ট করতে লাগলেন।