📄 এলো সন্ধির প্রস্তাব
মিকরায় এসে রাসুল ﷺ-র সাথে কথা বলার মাঝেই কুরাইশের পক্ষ থেকে সন্ধির প্রস্তাব নিয়ে সুহাইল ইবনে আমর এসে উপস্থিত হল। রাসুল ﷺ তাকে দেখে বললেন, আল্লাহ তোমাদের কাজ কিছু সহজ করে দিয়েছেন।
সুহাইল ইবনে আমর রাসুল ﷺ-র কাছে সন্ধির শর্তাবলি নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করল। অতঃপর সকল শর্ত স্থির হল। এবার লেখার পালা।
রাসুল আলী -কে সন্ধির শর্তাবলি লেখার আদেশ দিলেন। বললেন, সর্বপ্রথম লিখ-
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيمِ
সুহাইল আপত্তি তুলে বলল, আমরা বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম কি তা জানি না। প্রাচীন রীতি অনুযায়ী লিখ- بِاسْمِكَ اَللَّهُمَّ )বিসমিকা আল্লাহুম্মা)।
রাসুল বললেন, ঠিক আছে এটাই লেখ। এরপর বললেন লিখ- هذَا مَا قَضَى عَلَيْهِ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ
অর্থাৎ, চুক্তিনামা, যার শর্তাবলীর ভিত্তিতে আল্লাহর রাসুল মুহাম্মাদ সন্ধিতে সম্মত হয়েছেন।
সুহাইল আবার আপত্তি তুলল। আমরা যদি আপনাকে আল্লাহর রাসুলই স্বীকার করি, তাহলে আপনাকে কা'বা ঘরে আসতে বাঁধা দেব কেন? কেনইবা আপনার সাথে লড়াই করতে যাব? তাই মুহাম্মাদ রাসুলুল্লাহ না লিখে মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ লিখুন।
রাসুল বললেন, আল্লাহর কসম, তোমরা আমাকে স্বীকার না করলেও আমিই আল্লাহর রাসুল। অতঃপর তিনি আলী -কে বললেন, আমার নামের পর রাসুলুল্লাহ শব্দটুকু মুছে ফেলে সে যেভাবে বলে সেভাবেই লিখ।
আলী বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি তা কখনও মুছব না।
রাসুল বললেন, ঠিক আছে, যেখানে এই শব্দগুলো লিখেছ, সে জায়গাটুকু আমাকে দেখাও।
আলী আঙুল দিয়ে তা দেখিয়ে দিলেন।
রাসুল নিজ হাতে সেই লেখাটুকু মুছে ফেললেন এবং আলী -কে সে স্থানে মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ লেখার জন্য নির্দেশ দিলেন।
📄 সন্ধির শর্তাবলী
১. আগামী দশ বছর পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধ থাকবে।
২. কোরাইশদের কোন ব্যক্তি তার অভিভাবক বা মনিব ব্যতিত মদিনায় গেলে সে মুসলমান হয়ে গেলেও তাকে ফেরত দিতে হবে।
৩. মুসলমান কোন লোক মক্কায় গেলে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে না।
৪. এই দশ বছর কেউ কারো ওপর তরবারী উঠাবে না। কেউ সন্ধি ভঙ্গ করে খেয়ানত করবে না।
৫. মুহাম্মাদ ও তার দলবল এ বছর উমরা না করেই মদিনায় ফিরে যাবে। আগামী বছর কেবল তিন দিন মক্কায় থেকে উমরা করতে পারবে। সে সময় সাথে কেবল খাপবদ্ধ তরবারী রাখতে পারবে।
৬. অন্যসব গোত্রের স্বাধীনতা রয়েছে যে, তারা যাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে থাকতে চায় থাকতে পারে।
এ শর্তের পরিপ্রেক্ষিতে বনু খুযাআ গোত্র مسلمانوں সাথে এবং বনু বকর কোরাইশদের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়।
📄 আশ্চর্য শর্ত
সন্ধিচুক্তির এই দুটি শর্ত- কোন মুসলমান মক্কা থেকে বের হয়ে মদিনায় গেলে তাকে মক্কাতে ফেরত পাঠাতে হবে। আর যদি কেউ মদিনা থেকে মুরতাদ হয়ে মক্কায় চলে আসে তাহলে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে না-এটা শুনে মুসলমানেরা বলতে লাগল, কী আশ্চর্য! যে আমাদের কাছে ইসলাম গ্রহণ করে আসবে আমরা তাকে কাফেরদের কাছে ফিরিয়ে দেব? এটা কি করে সম্ভব? আমরা কিভাবে আমাদের মুসলিম ভাইকে মুশরেকদের হাতে তুলে দেব?
তারা এসব কথাই বলছিল, ইত্যবসরে এক যুবক শৃঙ্খলিত অবস্থায় ধীরে ধীরে তাদের কাছে আসছিল। এবং ইয়া রাসুলাল্লাহ বলে চিৎকার করছিল। সবাই পেছনে ফিরে তার দিকে তাকাল। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বলল, আরে! এতো সুহাইল বিন আমরের ছেলে-আবু জান্দাল।
সে পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। সে কারণে তার পিতা তাকে নানাভাবে অত্যাচার-উৎপীড়ন করছিল। শাস্তি স্বরূপ তাকে বেড়ি পরিয়ে বন্দি করে রেখেছিল। সে মুসলমাননদের আগমনের কথা শুনতে পেয়ে জেলখানা থেকে পালিয়ে এখানে চলে এল। শিকলের ভারে তার শরীর নুয়ে পড়েছিল। তার দেহের জখমগুলো থেকে রক্ত ঝরছিল। তার চক্ষু রক্তাশ্রু প্রবাহিত করছিল। মুসলমানরা তার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল।
সে বন্দি অবস্থা থেকে পালিয়ে কিভাবে এখানে এল- এই ভেবে সুহাইল ইবনে আমর ক্রোধে ফেটে পড়ছিল। সে হুংকার দিয়ে বলল, এ হচ্ছে প্রথম ব্যক্তি যাকে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী মক্কায় ফিরিয়ে দিতে হবে।
📄 হৃদয় বিদারক দৃশ্য
রাসুল ﷺ বললেন, এখনও তো চুক্তিনামা সম্পন্ন হয়নি। লেখা শেষ হলে তাতে উভয় পক্ষের দস্তখত হলে তারপর চুক্তির ভিত্তিতে কাজ শুরু হবে।
রাসুল ﷺ সুহাইলকে বারবার অনুরোধ করলেন, আবু জান্দাল আমাদের কাছে থাকুক। কিন্তু সুহাইল তা মানল না। অবশেষে তিনি আবু জান্দালকে সুহাইলের হাতে তুলে দিলেন।
মক্কার কাফেররা আবু জান্দাল -কে এমনিতেই নানাভাবে কষ্ট দিয়েছে। নির্যাতন করেছে। তাই আবার তাকে কাফেরদের মাঝে ফেরত প্রদানে আবু জান্দাল খুবই দুঃখভারাক্রান্ত কন্ঠে বললেন, আফসোস, হে মুসলমানেরা, আমাকে আবার কাফেরদের হাতেই তুলে দেওয়া হচ্ছে।
রাসুল ﷺ তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন- يَا أَبَا جَنْدَلٍ اِصْبِرْ وَاحْتَسِبْ فَإِنَّا لَا نَغْدِرُ إِنَّ اللَّهَ جَاعِلُ لَكَ فَرَجًا وَمَخْرَجًا হে আবু জান্দাল! ধৈর্য ধর। আল্লাহর কাছে বিনিময়ের প্রত্যাশা কর। আমরা তো বিশ্বাসভঙ্গের কোন কাজ করতে পারি না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমার মুক্তির কোন উপায় ব্যবস্থা বের করে দেবেন।
সুহাইল দ্রুতপদে তার ছেলের কাছে গেল। শৃঙ্খল ধরে টেনে হেঁচড়ে তাকে নিয়ে মক্কার দিকে রওয়ানা হল। আবু জান্দাল গগন বিদারী আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভারী করে তুলল। মুসলমানদের দিকে তাকিয়ে বারবার বাঁচাও বাঁচাও বলে ফরিয়াদ জানাল।
সে বলতে লাগল, হে মুসলমানেরা, আমাকে কাফের মুশরেকদের কাছে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অথচ তোমাদের মত আমিও তো মুসলমান হয়েছি। তোমরা কি দেখো না, আমি কি পরিমাণ শাস্তি ভোগ করেছি। দৃষ্টির আড়ালে চলে যাওয়া অবধি সে অনবরত এ কথাগুলোই বলে যাচ্ছিল। কামনা করে যাচ্ছিল মুসলমানদের সাহায্য।
সাহাবায়ে কেরামের অন্তর বিগলীত হয়ে গেল। তারা ভাবতে লাগল, আহা! বেচারা, সবে যৌবনের তীরে পা ফেলেছে। এখনই তাকে সইতে হচ্ছে কত কষ্ট-যাতনা। সুখময় জীবনের বদলে সে আজ নিপতিত কঠিন বিপদে। অথচ সে তো ছিল মক্কার নেতৃস্থানীয় এক ব্যক্তির আদরের পুত্র। জীবন ছিল তার সুখ-শোভায় পরিপূর্ণ। তার চারপাশ জুড়ে ছিল হাজারো ভোগ্য সামগ্রীর ভীড়। অথচ আজ মুসলমানদের সামনে থেকে তাকে বেড়ি পরিয়ে বন্দি জীবনের দিকে নিয়ে যাওয়া হল। এসব ভাবতে ভাবতে সাহাবায়ে কেরام খুবই কষ্ট পাচ্ছিলেন।