📄 ভক্তি-শ্রদ্ধার অনুপম নিদর্শন
উরওয়া নবীজী ﷺ-র সাথে কথা বলছিল এবং সাহাবায়ে কেরামের অন্তরে নবীজীর প্রতি কতটুকু শ্রদ্ধা ও মর্যাদা, প্রেম ও ভালোবাসা তা প্রত্যক্ষ করছিল। সে দেখছিল, রাসুল ﷺ যখনই কোন কাজের আদেশ দিচ্ছেন, সেটি পালন করার জন্য প্রত্যেকেই ব্যস্ত ও উদগ্রীব হয়ে পড়ছে। প্রত্যেকেই সেই আদেশ পালনে অগ্রগামী হওয়ার চেষ্টা করছে। তিনি মুখ থেকে কোন কথা বের করা মাত্রই তারা তা বাস্তবায়নে সাধ্যের সবটুকু উজাড় করে দিচ্ছে। তিনি উযু করার সময় পানি নিয়েও এত কাড়াকাড়ি লেগে যাচ্ছে যে, যেন মারামারিই বেঁধে যাবে। শরীর মোবারক থেকে একটি চুল বা পশম পড়লেও সাথে সাথে তারা তা সংরক্ষণ করে নিচ্ছে। যখন তিনি কথা বলেন, তখন আশ্চর্য এক নীরবতা ছেয়ে যায়। মনে হয় তাদের দেহের প্রতিটি অঙ্গ কান হয়ে গেছে। মুখ তুলে রাসুল ﷺ-কে দেখার সামর্থ্য যেন কারোরই নেই।
এভাবেই উরওয়া তার -যারা সেসময় আপনাকে ছেড়ে চলে যাবে - মন্তব্যটির জবাব পাচ্ছিল। তার অভিজ্ঞ চোখে সবই ধরা পড়ছিল। যারা এমনি ভক্তি, শ্রদ্ধা, আস্থা-বিশ্বাস, প্রেম-ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা প্রদর্শন করে, তারা যে কখনোই নবীকে ছেড়ে যেতে পারে না- সেটা তার অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে গেল।
উরওয়া রাসুল ﷺ-র সান্নিধ্য থেকে কোরাইশদের কাছে ফিরে গিয়ে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! আমি কায়সার, কিসরা ও নাজ্জাশীসহ আরো অনেক বড় বড় বাদশাহের দরবারে গিয়েছি। কিন্তু আল্লাহর শপথ, ভক্তি-শ্রদ্ধা, সম্মান-সমীহ, আনুগত্য ও বশ্যতার সম্মিলিত যে রূপ আমি মুহাম্মাদের দরবারে দেখেছি, তা আর কোথাও দেখিনি।
📄 নবীজীর সাথে হুলাইস ইবনে আলকামার সাক্ষাৎ
রওয়ার মুখে এসব কথা শুনে হাবশী সরদার হুলাইস ইবনে আলকামা কিনানী বলল, তোমরা আমাকে অনুমতি দাও, আমি মুহাম্মাদের সাথে সাক্ষাত করে আসি।
সবাই অনুমতি দিল। সে রাসুল ﷺ এর সাথে সাক্ষাত করতে গেল। রাসুল ﷺ দূর থেকে হুলাইসকে আসতে দেখে বললেন, তোমরা কুরবানীর জন্তুগুলোকে সামনে এনে রাখ। এ ওই সকল লোকের অন্তর্ভূক্ত যারা কুরবানীর জন্তুর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে।
হুলাইস কুরবানীর জন্তুগুলো দেখে রাস্তা থেকেই ফিরে গেল। কোরাইশদের কাছে গিয়ে বলল, কা'বার রবের শপথ, এরা তো কেবল উমরা করার জন্য এসেছে। এদেরকে আল্লাহ-র ঘরে আসতে মোটেই বাঁধা দেওয়া উচিত নয়।
কোরাইশরা হুলাইসকে বলল, তুমি যাও। চুপ করে বসে থাক।
তাদের আচরণে হুলাইস অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে বলল, হে কোরাইশ সম্প্রদায়! আল্লাহর শপথ, আমাদের তোমাদের সাথে এমন কোন চুক্তি ছিল না যে, যারা কেবল বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করার জন্য আসবে তাকে তাওয়াফ করতে বাঁধা দেবে। যার হাতে হুলাইসের প্রাণ তাঁর শপথ, তোমরা যদি মুহাম্মাদকে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করতে বাঁধা দাও, তাহলে আমি হাবশার লোকদের নিয়ে এ মুহূর্তে তোমাদের থেকে আলাদা হয়ে যাব।
📄 এ লোকটি বড়ই মন্দ
কোরাইশরা বলল, তুমি রাগ করো না। স্থির হয়ে বস। আমরা দেখি কি করা যায়।
কপর্যায়ে জমায়েত থেকে মিকরায ইবনে হাফস উঠে বলল, আমি মুহাম্মদের সাথে সাক্ষাৎ করে আসছি। মিকরাযকে আসতে দেখে রাসুল ﷺ বললেন, এ লোকটি বড়ই মন্দ। হোদায়বিয়ার প্রান্তরে মুসলমানদের অবস্থানকালে মিরকায পঞ্চাশজন সাথী নিয়ে রাতের আঁধারে আক্রমন করার ষড়যন্ত্র করেছিল। সাহাবায়ে কেরাম টের পেয়ে তাদের ধরে ফেলেন। সে সময় মিকরায ধরা পড়েনি। সে পালিয়ে গিয়েছিল। রাসুল ﷺ সেদিকে ইশারা করেই এ মন্তব্যটি করেন।
📄 এলো সন্ধির প্রস্তাব
মিকরায় এসে রাসুল ﷺ-র সাথে কথা বলার মাঝেই কুরাইশের পক্ষ থেকে সন্ধির প্রস্তাব নিয়ে সুহাইল ইবনে আমর এসে উপস্থিত হল। রাসুল ﷺ তাকে দেখে বললেন, আল্লাহ তোমাদের কাজ কিছু সহজ করে দিয়েছেন।
সুহাইল ইবনে আমর রাসুল ﷺ-র কাছে সন্ধির শর্তাবলি নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করল। অতঃপর সকল শর্ত স্থির হল। এবার লেখার পালা।
রাসুল আলী -কে সন্ধির শর্তাবলি লেখার আদেশ দিলেন। বললেন, সর্বপ্রথম লিখ-
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيمِ
সুহাইল আপত্তি তুলে বলল, আমরা বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম কি তা জানি না। প্রাচীন রীতি অনুযায়ী লিখ- بِاسْمِكَ اَللَّهُمَّ )বিসমিকা আল্লাহুম্মা)।
রাসুল বললেন, ঠিক আছে এটাই লেখ। এরপর বললেন লিখ- هذَا مَا قَضَى عَلَيْهِ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ
অর্থাৎ, চুক্তিনামা, যার শর্তাবলীর ভিত্তিতে আল্লাহর রাসুল মুহাম্মাদ সন্ধিতে সম্মত হয়েছেন।
সুহাইল আবার আপত্তি তুলল। আমরা যদি আপনাকে আল্লাহর রাসুলই স্বীকার করি, তাহলে আপনাকে কা'বা ঘরে আসতে বাঁধা দেব কেন? কেনইবা আপনার সাথে লড়াই করতে যাব? তাই মুহাম্মাদ রাসুলুল্লাহ না লিখে মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ লিখুন।
রাসুল বললেন, আল্লাহর কসম, তোমরা আমাকে স্বীকার না করলেও আমিই আল্লাহর রাসুল। অতঃপর তিনি আলী -কে বললেন, আমার নামের পর রাসুলুল্লাহ শব্দটুকু মুছে ফেলে সে যেভাবে বলে সেভাবেই লিখ।
আলী বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি তা কখনও মুছব না।
রাসুল বললেন, ঠিক আছে, যেখানে এই শব্দগুলো লিখেছ, সে জায়গাটুকু আমাকে দেখাও।
আলী আঙুল দিয়ে তা দেখিয়ে দিলেন।
রাসুল নিজ হাতে সেই লেখাটুকু মুছে ফেললেন এবং আলী -কে সে স্থানে মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ লেখার জন্য নির্দেশ দিলেন।