📄 অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ
পাদ্রীর মৃত্যুর পর সালমান কিছুদিন সেখানে অবস্থান করলেন। তিনি এখানে আরবের একদল বণিকের সাথে তার সাক্ষাৎ হল। তিনি তাদেরকে বললেন, তোমরা যদি আমাকে তোমাদের দেশে নিয়ে যাও তবে আমি আমার পশুপাল তোমাদেরকে দিয়ে দেব। তারা রাজি হল এবং সালমান-কে তাদের সঙ্গে নিয়ে আসল। কিন্তু তারা ওয়াদিল কোবা নামক স্থানে পৌঁছে অন্যায়ভাবে তাকে ক্রীতদাসরূপে এক ইহুদীর কাছে বিক্রি করে দিল। এরপর তিনি একজন থেকে অপরজনের কাছে বিক্রি হতে থাকলেন। এমনিভাবে তিনি তের বা ততোধিক মনিবের হাত বদল হলেন। শেষে মদিনাবাসী এক ইহুদী তাকে কিনে নিল। সেই সুবাদে তিনি মদিনায় পৌঁছলেন। মদিনার চারপাশ দেখে তার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাল যে, এটাই সেই স্থান যার কথা পাদ্রী তাকে বলেছিলেন। তখনও রাসুলুল্লাহ ﷺ মক্কা হতে মদিনায় হিজরত করেননি। সালমান তাঁর প্রতীক্ষায় দিন গুনতে লাগলেন।
কদিনের কথা। তিনি তার মনিবের উপস্থিতিতে খেজুর গাছের ওপরে কাজ করছিলেন। হঠাৎ এক লোক এসে তার মনিবকে সংবাদ দিল যে, কোবা মহল্লায় মক্কা থেকে একজন লোক এসেছে। সে নিজেকে নবী বলে দাবি করছে। সালমান গাছের ওপর থেকে কথাগুলো শুনলেন। তার শরীর শিউরে উঠল। উত্তেজনায় তিনি গাছ থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলেন। কোন প্রকারে গাছ থেকে নেমে মনিবের কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে মনিব তাকে একটি ঘুষি মেরে বলল, তুই তোর কাজ কর। এ খবর নিয়ে তোর কি দরকার?
সালমান বিকালে কোবা মহল্লায় উপস্থিত হয়ে কিছু খাদ্যসামগ্রী রাসুল-র সামনে পেশ করলেন। রাসুল ﷺ সে খাদ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, এগুলো সদকা।
এ কথা শুনে রাসুল তা সঙ্গীদের দিয়ে দিলেন, নিজে খেলেন না। আরেকদিন সালমান কিছু খাবার নিয়ে গেলেন। বললেন, আপনি সদকা গ্রহণ করেন না দেখে আজ আমি এগুলো আপনার জন্য হাদিয়াস্বরূপ নিয়ে এসেছি।
রাসুল সঙ্গীদেরসহ তা খেলেন। সালমান ভাবলেন, দুটো নিদর্শনই তো ঠিক পাওয়া গেল।
এরপর একদিন রাসুল বসেছিলেন। সালমান তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে পিঠ মোবারক দেখার চেষ্টা করতে লাগলেন। নবীজী তার মনোভাব বুঝতে পেরে কাঁধের কাপড় খানিকটা সরিয়ে দিলেন। সালমান রাসুল-র মোহরে নবুওয়াত দেখলেন এবং শ্রদ্ধার সাথে চুম্বন করে কেঁদে ফেললেন।
রাসুল তার সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তিনি তার জীবনের সুদীর্ঘ কাহিনী নবীজীকে শোনালেন এবং তৎক্ষণাৎ ইসলাম গ্রহণ করলেন।
যে মহাসত্য সন্ধানে অশেষ দুঃখ, কষ্ট, ঘাত-প্রতিঘাত, দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনা, কষ্ট-যাতনা তিনি সহ্য করেছিরেন, যার সত্য সন্ধানী অতৃপ্ত আত্মা শত বছরেও তৃপ্ত হয়নি, সেই অতৃপ্ত আত্মা আজ তৃপ্তিতে পরিপূর্ণ।
তিনি পারস্যের অধিবাসী বলে সাহাবীরা তাকে সালমান ফারসী বলে ডাকতেন। ক্রীতদাসরূপে ইহুদীর কাছে আবদ্ধ থাকায় স্বাধীনভাবে রাসুল-র সাহচর্য লাভ করা তার জন্য সম্ভব হচ্ছিল না। এমনকি বদর এবং ওহুদ যুদ্ধে তিনি শরিক হতে পারেননি। তাই রাসুল ﷺ বললেন, আপনি বিনিময় আদায়ের শর্তে মুক্তি লাভের চুক্তি করে নিন। সেমতে তিনি তার মনিবের সাথে আলাপ করলেন। মনিব লোকটি তার মুক্তির জন্য দুইটি শর্ত আরোপ করল-
(১) তিনশ বা পাঁচশ খেজুর গাছের চারা সঞ্চয় করে তা রোপণ করতে হবে এবং ওইসব গাছে ফল না আসা পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে।
(২) চল্লিশ উকিয়া অর্থাৎ ৬ সেরের অধিক পরিমাণ স্বর্ণ তাকে দিতে হবে।
এই দুই শর্ত পূর্ণ করলেই সে তাকে মুক্তি দেবে- এই মর্মে চুক্তি সম্পাদিত হল।
রাসুল ﷺ সাহাবীদেরকে বললেন, খেজুরের চারা দিয়ে তোমরা সবাই সালমানকে সাহায্য কর।
সেমতে কেউ পাঁচটা, কেউ দশটা করে খেজুরের চারা দিয়ে তাকে সাহায্য করলেন। তিনশ মতান্তরে পাঁচশ খেজুরের চারা জমা হলে রাসুল ﷺ সালমান -কে গাছ রোপণ করার জন্য গর্ত তৈরি করতে বললেন। গর্ত তৈরি হলে রাসুল ﷺ সেখানে এসে নিজ হাতে গাছগুলো রোপণ করলেন। শুধু একটি গাছ উমর রোপণ করলেন। আল্লাহর কুদরতে এক বছরেই ওই গাছগুলোতে ফল ধরল। উমর -র লাগানো গাছটিতে এক বছরে ফল না ধরায় রাসুল ﷺ তা উঠিয়ে পুনঃরোপণ করলেন। ফলে সেই গাছটিতেও ওই বছর ফল এসে গেল। এভাবে পূরণ হল প্রথম শর্ত।
এদিকে ডিমের আকারে একটি স্বর্ণের চাকা একদা রাসুল -র হস্তগত হল। তিনি তা সালমানকে -কে দিয়ে বললেন, যান, এটি দিয়ে আপনার মুক্তির শর্ত পূরণ করুন। সালমান বললেন এতটুকু স্বর্ণে তো শর্ত পূরণ হবে না।
নবীজী বললেন, আল্লাহ এর দ্বারাই সম্পূর্ণ আদায় করে দেবেন। বাস্তবিকই যখন শর্ত আদায়ের জন্য ওজন দেয়া হল তখন তা চল্লিশ উকিয়া পরিমাণ দেখা গেল।
এভাবেই দুটি শর্ত পূরণ হল এবং সালমান গোলামীল শিকল থেকে মুক্ত হয়ে গেলেন। হেদায়াত অন্বেষণ এবং সত্য সাধনার জয়লাভের নিশ্চয়তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন সালমান ফারসী।
📄 হেদায়াত লাভের জন্যেই সয়েছিলেন এ যাতনা
সালমান ফারসী-র এই কাহিনীকেই স্মরণ করো। যিনি হেদায়াত পাওয়ার জন্য ত্যাগ করেছিলেন অনাবিল সুখের জীবন। ছেড়ে এসেছিলেন প্রিয় মাতৃভূমি। কোরবান করেছিলেন প্রবৃত্তিকে। ঘুরেছিলেন দেশে দেশে। গোলামীর জিঞ্জিরে আবদ্ধ হয়ে যাপন করেছিলেন লাঞ্ছনাকর জীবন। স্থানান্তরিত হয়েছেন এখান থেকে ওখানে। কেবল চিরস্থায়ী হেদায়াত পাওয়ার জন্যেই তিনি সয়েছিলেন এত যাতনা।
মনের আয়নাতে তিনি সৃষ্টিকর্তার মহত্বকে জ্ঞান করেছেন। তাঁর স্মরণ ও নৈকট্যের মাধ্যমে লাভ করেছেন প্রশান্তি। নিভৃতে তাঁর সাথে আলাপে মত্ত হয়েছেন। তাঁকে ভালোবেসে অর্জন করেছেন অনাবিল সুখের উপলব্ধি।
ফলে তাঁকে ব্যতিত তার কাছে সব কিছুই মনে হয়েছে তুচ্ছ ও নগণ্য। এই কষ্ট-যতনা তিনি সয়েছেন মাত্র স্বল্ল কিছুদিন। তারপরই তিনি লাভ করেছেন দীর্ঘ সুখের জীবন। তার সামনে যখন জান্নাতের আলোচনা করা হত, তখন আগ্রহের আতিশয্যে তার অন্তর সেখানে উড়ে চলে যেত। যেন কল্পনায় তিনি দেখতে পেতেন যে, কত সুখ-স্বাচ্ছন্দে সেখানে তিনি দিন কাটাচ্ছেন। জান্নাতের ছায়াঘেরা মায়াঘেরা পরিবেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। জান্নাতের বৃক্ষরাজি থেকে ফল-ফলাদি খাচ্ছেন। জান্নাতের সৃষ্টিকর্তার দিদার লাভে ধন্য হচ্ছেন।
📄 হেদায়াত তো পেতে চাই কিন্তু...
কিছু মানুষ মনে প্রাণে হেদায়াত পেতে আগ্রহী। কিন্তু সালফে সালেহীনদের কতকের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ তাদেরকে হেদায়াত থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। অথবা কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে তারা তাদের বিরুদ্ধাচরণ করে।
তুমি দেখবে কিছু মানুষ নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিবর্গের সাথে আত্মশুদ্ধির সম্পর্ক রাখে। যারা তাদেরকে দীনের বিভিন্ন বিষয়ে সাহায্য করে। অতঃপর যখন সেই নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গের দীনি হালত নষ্ট হয়ে যায়। অথবা কোনো কারণে যুগ তাদের সম্পর্কের মাঝে ফাটল ধরায়, তখন তারা দীন থেকে ছিটকে পড়ে। এবং বিশ্ব জাহানের প্রতিপালকের অবাধ্যতা করে।
এমন কিছু ধর্মত্যাগী মানুষ ইসলামের উষালগ্নেও ছিল। যারা তাদের ধর্মকে রাসুল ﷺ এর জীবদ্দশার সাথেই সম্পৃক্ত করেছিল। তাদের অবস্থা এমন ছিল যে, রাসুল ﷺ এর জীবদ্দশায় তারা সর্বদা এই ধর্মের সাথে থেকেছে। ইসলামের প্রতি তাদের বিশ্বাস অটল অবিচল রেখেছে। শুধু তাই নয় এরা ছিল শেষ রাতের তাহাজ্জুদ গোজার। দিবসের রোজাদার। কিন্তু যখনই রাসুল পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে পরম প্রিয় প্রভুর সান্নিধ্যে চলে গেলেন; তখনই তারা পৃষ্টপ্রদর্শন করল। ইসলাম গ্রহণের পর দ্বিতীয়বার কুফুরী করল।
তখন আবু বকর তাদের উদ্দেশ্যে তাঁর সেই ঐতিহাসিক ভাষণটি প্রদান করলেন। বললেন-
হে মানুষ সকল! তোমাদের মধ্যে যারা মুহাম্মাদ -র ইবাদত করত, তাদের জেনে রাখা উচিত যে, আজ তিনি ইন্তেকাল করেছেন। আর যারা আল্লাহ -র ইবাদত করে তাদের জেনে রাখা উচিত যে, আল্লাহ চিরঞ্জীব। তিনি কখনও মৃত্যু বরণ করবেন না।
হ্যাঁ, অবশ্যই আল্লাহ চিরঞ্জীব। চির জীবিত। তিনি কখনও মৃত্যু বরণ করবেন না। তিনি প্রার্থনাকারীদের প্রার্থনা কবুল করেন। তওবাকারীদের তওবা কবুল করেন। যে তাঁর কাছে আশ্রয় নেয় তিনি তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। যে প্রতিমার উপসনা ছেড়ে তাঁর দরবারে উপস্থিত হয়, তিনি তাকে কাছে টেনে নেন। বান্দা যদি তাঁকে মনে মনে স্মরণ করে, তাহলে তিনিও তাকে মনে মনে স্মরণ করেন। বান্দা যদি তাঁকে মজলিশে স্মরণ করে, তাহলে তিনিও তাকে এমন মজলিশে স্মরণ করেন যা তাদের মজলিশ অপেক্ষা অধিক উত্তম। যে তাঁর দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসে তিনি তার দিকে এক হাত এগিয়ে আসেন। আর যে তাঁর দিকে এক হাত এগিয়ে আসে তিনি তার দিকে প্রসারিত দুই বাহু পরিমাণ এগিয়ে আসেন।
যার অন্তরে ঈমান বদ্ধমূল হয়েছে সে দয়াময় প্রভুর ইবাদতে অবিচল থাকে। বিপদাপদের তীব্রতা তাকে বিচলিত করতে পারে না।