📄 অনন্য ক্ষমার সুযোগ
মানুষ মহাপরাক্রমশালী মহাজ্ঞানবান আল্লাহ্র কত প্রিয় সৃষ্টি এবং তার প্রতি তিনি কিরূপ ক্ষমাশীল তা সে নিজেই জানে না। অবশ্য ফেরেশতামণ্ডলী ও ইবলীস ভালভাবেই জানে। মানব সৃষ্টির সূচনা পর্বে এক মহৎ উদ্দেশ্য সাধনে আল্লাহ্র দরবারে ইবলীস মর্যাদার লড়াইয়ে তার প্রতিদ্বন্দী মানব জাতির নিকট পরাজয় বরণ করে। অতঃপর তার প্রতিপক্ষের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে (ইবলীস) তার বিরুদ্ধে সবিনয়ে অভিযোগ পেশ করে মহান পালনকর্তার সমীপে। মহাজ্ঞানী আল্লাহ তা'আলা ইবলীসকে কিছু কূট-কৌশল মানব জাতির উপর প্রয়োগ করার ক্ষমতা প্রদান করেন। ফলে সহজ-সরল, সত্যবাদী মানব চরিত্রের অধিকারী আদম (আঃ) ইবলীসের প্রথম আক্রমণেই বিব্রত হয়ে ভুল করে ফেলেন এবং মহান আল্লাহ্র নিকট বিনীত ও ক্রন্দনরত অবস্থায় ক্ষমাপ্রার্থী হন। মহা ক্ষমাশীল আল্লাহ তা'আলা আদম (আঃ)-কে ক্ষমা করে দেন এবং মূল্যবান উপদেশ দিয়ে পৃথিবীতে নির্বাসন দেন।
মূলতঃ ইবাদত হ'ল মানব জাতির জন্য এ নশ্বর পৃথিবীর সাময়িক কালের বাধ্যবাধকতা। আর পৃথিবী হ'ল পরীক্ষার মূল কেন্দ্র। অতঃপর ক্বিয়ামত হবে ফলাফল প্রকাশ বা মূল্যায়ন দিবস। কিন্তু এর মূল্যায়ন হবে অবিনশ্বর পরকালের অনন্ত ও অসীম পারাবার জান্নাত ও জাহান্নাম। মহান স্রষ্টা তাঁর প্রিয় মানুষকে স্বীয় সান্নিধ্যে রাখার প্রয়াসে বিপুল উপদেশ ভাণ্ডার কুরআন প্রেরণ করেন। কুরআন আল্লাহ্র মনোনীত একটি ধর্মগ্রন্থ এবং মানব জাতির জন্য প্রচারমূলক ও গ্রহণযোগ্য উপদেশমালা। এসব উপদেশ উচ্চারিত হয়েছে অথবা ঘোষিত হয়েছে সেই সব মানুষের জন্য যারা সত্য, সুন্দর, সহজ-সরল ও শান্তিপ্রিয় জীবনে বিশ্বাসী। তবুও সমগ্র বিশ্ববাসীর জ্ঞান-গরিমা, বিবেক-বিবেচনা, চিন্তা-গবেষণা ইত্যাদির উন্মেষ ঘটানোর প্রয়াসে পবিত্র কুরআন উন্মুক্ত রয়েছে বিশ্ব দরবারে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মাতৃভাষায় ভাষান্তরিত করা হয়েছে পবিত্র কুরআনকে। আমাদের মাতৃভাষা বাংলায়ও অনূদিত হয়েছে মহাপবিত্র ও মহাসম্মানিত আল্লাহ্ বাণী কুরআন। ফলে ক্ষমাশীল আল্লাহ্ ক্ষমার বিষয়গুলো সহজেই জানা সম্ভব হচ্ছে। একইভাবে বিশ্বের যেকোন দেশের যেকোন সম্প্রদায়ের চিন্তাশীল মানুষ ক্ষমাশীল আল্লাহ্ ক্ষমার ঘোষণায় আশ্বস্ত হয়ে তাঁর একক ধর্মের ছায়াতলে আশ্রয় নিচ্ছে। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার জন্য আল্লাহ্ ক্ষমার দরজা উন্মুক্ত রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,
إِنَّمَا تُنْذِرُ مَنِ اتَّبَعَ الذِّكْرَ وَحَشِيَ الرَّحْمَنَ بِالْغَيْبِ فَبَشِّرْهُ بِمَغْفِرَةٍ وَأَجْرٍ كَرِيمٍ
'আপনি কেবল তাদেরকে সতর্ক করতে পারেন, যারা উপদেশ অনুসরণ করে এবং দয়াময় আল্লাহকে না দেখে ভয় করে। অতএব আপনি তাদেরকে সুসংবাদ দিয়ে দিন ক্ষমা ও সম্মানজনক পুরস্কারের' (ইয়াসীন ৩৬/১১)।
অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ عَظِيمٌ وَالَّذِيْنَ كَفَرُوا وَكَذَّبُوا بِآيَاتِنَا أُوْلَئِكَ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ
'যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা ও মহা প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যারা অবিশ্বাস করে এবং আমার নিদর্শনাবলীকে মিথ্যা বলে, তারা জাহান্নামী' (মায়েদাহ ৫/৯, ১০)।
অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন, 'তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা এবং জান্নাতের দিকে ছুটে যাও যার সীমানা হচ্ছে আসমান ও যমীন, যা তৈরী করা হয়েছে পরহেযগারদের জন্য। যারা সচ্ছলতায় ও অভাবের সময় ব্যয় করে, যারা নিজেদের রাগকে সংবরণ করে আর মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে, বস্তুতঃ আল্লাহ সৎকর্মশীলদেরকেই ভালবাসেন। তারা কখনও কোন অশ্লীল কাজ করে ফেললে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ছাড়া কে পাপ ক্ষমা করবেন? তারা নিজের কৃতকর্মের জন্য হঠকারিতা প্রদর্শন করে না এবং জেনে শুনে তা-ই করতে থাকে না। তাদের জন্য প্রতিদান হ'ল তাদের পালনকর্তার ক্ষমা ও জান্নাত, যার তলদেশে প্রবাহিত হচ্ছে প্রস্রবন; সেখানে তারা থাকবে অনন্তকাল। যারা কাজ করে তাদের জন্য কতইনা চমৎকার প্রতিদান' (আলে ইমরান ৩/১৩৩-১৩৬)।
অতঃপর বিশৃংখলা সৃষ্টিকারীদের ব্যাপারে আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূল (ছাঃ)-কে প্রত্যাদেশ করেন, 'নিশ্চয়ই যারা স্বীয় ধর্মকে খণ্ড-বিখণ্ড করেছে এবং অনেক দল হয়ে গেছে, তাদের সাথে আপনার কোন সম্পর্ক নেই। তাদের ব্যাপার আল্লাহ তা'আলার নিকট সমর্পিত। অতঃপর তিনি বলে দেবেন যা কিছু তারা করে থাকে। যে একটি সৎকর্ম করবে, সে তার দশগুণ পাবে এবং যে একটি মন্দ কাজ করবে, সে তার সমান শাস্তিই পাবে। বস্তুতঃ তাদের প্রতি যুলুম করা হবে না। আপনি বলে দিন, আমার প্রতিপালক আমাকে সরল পথ প্রদর্শন করেছেন, একাগ্রচিত্ত ইবরাহীমের বিশুদ্ধ ধর্ম। তিনি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। আপনি বলুন, আমার ছালাত, আমার কুরবানী এবং আমার জীবন ও মরণ বিশ্ব-প্রতিপালক আল্লাহ্রই জন্য। তাঁর কোন অংশীদার নেই। আমি তাই আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম আনুগত্যশীল। আপনি বলুন, আমি কি আল্লাহ ব্যতীত অন্য প্রতিপালক খুঁজব। অথচ তিনি সবকিছুর প্রতিপালক? যে ব্যক্তি কোন গোনাহ করে, তা তার দায়িত্বে থাকে। কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না। অতঃপর তোমাদের সবাইকে প্রতিপালকের কাছে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। অনন্তর তিনি তোমাদেরকে বলে দিবেন, যেসব বিষয়ে তোমরা বিরোধ করতে। তিনিই তোমাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছেন এবং একে অন্যের উপর মর্যাদা সমুন্নত করেছেন। যাতে তোমাদেরকে এ বিষয়ে পরীক্ষা করেন, যা তোমাদেরকে দিয়েছেন। আপনার প্রতিপালক দ্রুত শাস্তিদাতা এবং তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, দয়ালু' (আন'আম ৬/১৫৯-১৬৫)।
আল্লাহ্র দয়া, ক্ষমা ও অনুগ্রহ সীমাহীন। তিনি তাঁর বান্দাদেরকে বিভিন্নভাবে সেই ক্ষমার দিকে আহ্বান জানিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন, 'সেদিন অর্থাৎ সমাবেশের দিন আল্লাহ তোমাদেরকে সমবেত করবেন। এদিন হার-জিতের দিন। যে ব্যক্তি আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে, আল্লাহ তাঁর পাপসমূহ মোচন করবেন এবং তাকে জান্নাতে দাখিল করবেন। যার তলদেশে নির্ঝরিণী সমূহ প্রবাহিত হবে, তারা তথায় চিরকাল বসবাস করবে। এটাই মহাসাফল্য। আর যারা কাফের এবং আমার আয়াত সমূহকে মিথ্যা বলে তারাই জাহান্নামের অধিবাসী, তারা তথায় অনন্তকাল থাকবে। কতই না মন্দ প্রত্যাবর্তনস্থল এটা। আল্লাহ্র নির্দেশ ব্যতিরেকে কোন বিপদ আসে না এবং যে আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস করে, তিনি তার অন্তরকে সৎপথ প্রদর্শন করেন। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সম্যক পরিজ্ঞাত। তোমরা আল্লাহ্র আনুগত্য কর এবং রাসূলুল্লাহ্ আনুগত্য কর। যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে আমার রাসূলের দায়িত্ব কেবল খোলাখুলি পৌঁছে দেয়া। আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোন মা'বৃদ নেই। অতএব মুমিনগণ আল্লাহ্র উপর ভরসা করুক। হে মুমিনগণ! তোমাদের কোন কোন স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের দুশমন। অতএব তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাক। যদি মার্জনা কর, উপেক্ষা কর এবং ক্ষমা কর তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়। তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো কেবল পরীক্ষা স্বরূপ। আর আল্লাহ্র কাছে রয়েছে মহাপুরস্কার। অতএব তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় কর। শুন, আনুগত্য কর এবং ব্যয় কর। এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম। যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান কর, তিনি তোমাদের জন্য তা দ্বিগুণ করে দেবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আল্লাহ গুণগ্রাহী। তিনি দৃশ্য ও অদৃশ্যের জ্ঞানী পরাক্রান্ত প্রজ্ঞাময়' (তাগাবুন ৬৪/৯-১৮)।
উপরোল্লেখিত আয়াতগুলিতে যারা আল্লাহকে না দেখে ভয় করে তাদেরকে ক্ষমার সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কথা হ'ল, যারা আল্লাহকে ভয় করে, তারা সবাই তাঁকে না দেখেই ভয় করে। আসলে এ রহস্যপূর্ণ কথাটি প্রকৃত আল্লাহভীরুদের এবং যাদেরকে তিনি ক্ষমা করবেন তাদের জন্য প্রযোজ্য। একইভাবে অন্য আয়াতে এসেছে যারা বিশ্বাস করে এবং সৎকর্ম করে আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা ও পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যারা কোন অশ্লীল বা খারাপ কাজ করার পর অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দেন বা দেবেন। বান্দার অবগতির প্রয়াসে আর এক প্রত্যাদেশে আল্লাহ তা'আলা বলেন, ক্বিয়ামতের দিন সকলকে একত্রিত করা হবে এবং এখানেও বলেন, যে বিশ্বাস স্থাপন করেও সৎকর্ম সম্পাদন করে, তিনি তার পাপ সমূহ মোচন করে দেবেন এবং তাকে জান্নাতে দাখিল করবেন।
আরও বলা হয়েছে, মানুষের কোন বিপদ আসলে তা আল্লাহ্র নির্দেশেই ও ভাগ্যের লিখনেই আসে, যারা এই বিশ্বাস নিয়ে অবিচল থাকে আল্লাহ তাকে সৎপথে চালিত করেন এবং ক্ষমাও করেন। পক্ষান্তরে কেউ আল্লাহ্ উপর আস্থা বা বিশ্বাস হারিয়ে ফেললে পথভ্রষ্ট হয়ে যায় এবং তাঁর ক্ষমা হ'তেও বঞ্চিত হয়। পৃথিবীতে সংসার জীবনের উল্লেখ করতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, মানুষের এবং মুমিনদেরও কোন কোন স্ত্রী ও পুত্র তাদের শত্রুর তুল্য হ'তে পারে, এখানে তাদেরকে সহনশীল হওয়ার কথা বলেছেন। আর তাদের এ পথ অবলম্বন করাই উত্তম। শেষোক্ত আয়াতে দানের কথা বলা হয়েছে। মানুষকে দুনিয়ার জীবনে আল্লাহ্র পথে অকাতরে দান খয়রাত করার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং এই দানকে আল্লাহ ঋণ গ্রহণের সঙ্গে তুলনা করেছেন। আল্লাহ তাঁর দীন-দরিদ্র, অসহায়, অনাহারক্লিষ্ট, আশ্রয়হীন, পঙ্গু, প্রতিবন্ধী বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত দয়াশীল, ক্ষমাশীল ও সহানুভূতিশীল। ধনী, সচ্ছল বা যেকোন উপযুক্ত বান্দার মতই এক ও অভিন্নভাবে তারাও আল্লাহ্র প্রিয় বান্দা। সুতরাং তাদের প্রতি যারা দয়া পরবশ হয়ে দান করে, আল্লাহ তার দানের বা পুণ্যের পরিমাণকে দ্বিগুণ করে দেন এবং তার পাপও ক্ষমা করে দেন। এভাবে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের কত প্রকারে ক্ষমা প্রদান করেন তা একমাত্র তিনিই জানেন। কাজেই আমাদের দৈনন্দিন জীবন যাপনে কেবল ইচ্ছাকৃত কোন ভুল, অন্যায় বা পাপের জন্য নয়, বরং অনিচ্ছাকৃত ছোট-বড় সকল অপরাধের জন্য আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা ও অনুগ্রহের আশা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
ইতিমধ্যে আমরা দান-খয়রাতের সামান্য আলোচনা করেছি। কিন্তু দান-খয়রাতও ইবাদতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কুরআনের বর্ণনায় পাওয়া যায় সেদিন সামর্থ্যবান অপরাধীরা জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হিসাবে বলবে, قَالُوْا لَمْ نَكُ مِنَ الْمُصَلِّينَ - وَلَمْ نَكُ نُطْعِمُ الْمِسْكِينَ, আমরা ছালাত পড়তাম না, অভাবগ্রস্তকে আহার্য দিতাম না' (মুদ্দাছছির ৭৪/৪৩-৪৪)।
অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ،وَيَتُوْبُ اللَّهُ عَلَى مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ عَلِيْمٌ حَكِيمٌ 'আল্লাহ যার প্রতি ইচ্ছা ক্ষমাশীল হবেন, আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়' (তওবা ৯/১৫)।
আল্লাহ আরো বলেন,
وَإِنَّ رَبَّكَ لَذُو مَغْفِرَةٍ لِّلنَّاسِ عَلَى ظُلْمِهِمْ وَإِنَّ رَبَّكَ لَشَدِيدُ الْعِقَابِ
'আপনার পালনকর্তা মানুষকে তাদের অন্যায় সত্ত্বেও ক্ষমা করেন এবং আপনার পালনকর্তা কঠিন শাস্তিদাতাও বটে' (রা'দ ১৩/৬)।
মহান আল্লাহ আরও বলেন, وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعَظِّمْ لَهُ أَجْراً، 'যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার পাপ মোচন করেন এবং তাকে মহাপুরস্কার দেন' (তালাক্ব ৬৫/৫)।
পবিত্র কুরআনে শত শত আয়াতে ক্ষমা, দয়া ও অনুগ্রহের বিষয়ে বর্ণিত হয়েছে। এগুলির মধ্যে এমন কিছু রয়েছে যা সহজেই বোঝা যায়। কিছু কিছু কোনভাবে অনুভব করা যায়। আর একটা অংশ অনুধাবন করা মোটেও সম্ভব হয় না। যেমন উপরের আয়াতগুলিতে বলা হয়েছে (১) আল্লাহ যার প্রতি ইচ্ছা ক্ষমাশীল হবেন, (২) মানুষকে তাদের অন্যায় সত্ত্বেও আল্লাহ ক্ষমা করেন, (৩) যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার পাপ ক্ষমা করে দেন। উল্লেখিত তিনটি বাক্যের যেকোনটির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ব্যাপক। কিন্তু প্রজ্ঞাময় আল্লাহ তা'আলা উক্ত ব্যাখ্যায় তাঁর সন্তুষ্টির দিকগুলিই গ্রহণ করবেন। অসন্তুষ্টির বিষয় তিনি মোটেও দৃকপাত করবেন না বা প্রত্যাখ্যান করবেন। উদাহরণতঃ আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবীব মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে প্রত্যাদেশ করেন, 'আপনি কাফেরদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য ভীত-সন্ত্রস্ত দেখবেন। তাদের কর্মের শাস্তি অবশ্যই তাদের উপর আপতিত হবে। আর যারা মুমিন ও সৎকর্মী, তারা জান্নাতের উদ্যানে থাকবে। তারা যা চাইবে, তা-ই তাদের জন্য তাদের পালনকর্তার কাছে রয়েছে। এটাই বড় পুরস্কার। এরই সুসংবাদ দেন আল্লাহ সেসব বান্দাকে, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে। বলুন, আমি আমার দাওয়াতের জন্য তোমাদের কাছে কেবল আত্মীয়তাজনিত সৌহার্দ্য চাই। যে কেউ উত্তম কাজ করে, আমি তার জন্য তাতে পুণ্য বাড়িয়ে দেই। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাকারী, গুণগ্রাহী (শূরা ৪২/২২, ২৩)।
অন্য এক আয়াতে আল্লাহ বলেন, 'তিনি তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করেন, পাপ সমূহ মার্জনা করেন এবং তোমাদের কৃত বিষয় সম্পর্কে অবগত রয়েছেন। তিনি মুমিন ও সৎকর্মীদের দো'আ শোনেন এবং তাদের প্রতি স্বীয় অনুগ্রহ বাড়িয়ে দেন। আর কাফেরদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি' (শূরা ৪২/২৫, ২৬)।
ক্ষমার তাৎপর্যের আরও এক বর্ণনায় মহান আল্লাহ বলেন, 'কাফেররা বলবে, হে আমাদের পালনকর্তা! যেসব জিন ও মানুষ আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল, তাদেরকে দেখিয়ে দিন, আমরা তাদেরকে পদদলিত করব, যাতে তারা যথেষ্ট অপমানিত হয়। নিশ্চয়ই যারা বলে আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ, অতঃপর তাতেই অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে তোমরা ভয় কর না, চিন্তা কর না এবং তোমাদের প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ শোন। ইহকালে ও পরকালে আমরা তোমাদের বন্ধু। সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমাদের মন চায়। এটা ক্ষমাশীল করুণাময়ের পক্ষ থেকে সাদর আপ্যায়ন' (হা-মীম-সিজদাহ ৪১/২৯-৩২)।
মহাক্ষমাশীল আল্লাহ্র আদেশ, উপদেশ, দয়া, ক্ষমা, রহমত, অনুগ্রহ প্রভৃতি অসামান্য গুণাবলী সর্বজনবিদিত এবং পবিত্র কুরআন ও হাদীছের মধ্যে তা সীমাবদ্ধ বলা যায়। তাঁর পক্ষ থেকে কোন নবী-রাসূল বা প্রিয়জনের নিকট কোন গোপন আদেশ উপদেশের প্রমাণ নেই। তিনি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এবং তাঁর নিকট অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সকল মানুষ সমান ভালবাসার পাত্র এবং সকলের প্রতি তিনি সমানভাবে ক্ষমাশীল। শুধু কর্মের কারণে পার্থক্য নিরূপিত হয় এবং আগামীতেও হবে। যেহেতু তিনি বহু সদুপদেশ দ্বারা মানুষকে সৎ পথে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তাকে পুনঃ পুনঃ ক্ষমার ঘোষণা দিয়েছেন। সুতরাং মানুষকে অনুরূপ প্রতিদান হিসাবে আল্লাহকে সর্বাধিক স্মরণ ও ভালবাসার প্রমাণ স্বরূপ কাজ করতে হবে।
আমাদের পার্থিব জীবনের সময় খুব স্বল্প এবং মৃত্যুর পরবর্তী পরকালীন জীবন অত্যন্ত সুদীর্ঘ বা কল্পনাতীত। এ স্বল্প সময়ের কাজের বিভিন্ন পর্যায়ে আল্লাহ মানুষকে তাঁর দয়া ও ক্ষমার পুনঃ পুনঃ আশ্বাস দিয়েছেন এবং আশ্বাসগুলির মধ্যে এত ভালবাসা গভীরতা ও প্রেমের বন্ধন রয়েছে যা প্রতিটি বান্দার উপলব্ধি করা উচিত। যারা বোঝে এবং যারা বোঝে না উভয়েরই এ বিষয়ে সচেতন হওয়া যরূরী। অসচেতনতা কারো জন্য মোটেও কাম্য নয়।
📄 কৃতজ্ঞতা ও ক্ষমা
আমাদের দৃষ্টিসীমা ও জ্ঞানসীমার মধ্যে অবস্থিত দৃশ্য ও অদৃশ্য বস্তুসমূহের সমন্বয়ে গঠিত পরিবেশ নিয়েই গড়ে উঠেছে আমাদের জীবন। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, যোগাযোগ, কর্মস্থল প্রভৃতি দৃশ্য বস্তুগুলির সঙ্গে আলো, অন্ধকার, বায়ু, তাপ, ঠাণ্ডা, শব্দ প্রভৃতি অদৃশ্য বস্তুগুলি নিবিড়ভাবে মিশে আছে। ধর্মীয় জীবন-যাপনে ছালাত, ছিয়াম, হজ্জ, যাকাত, কুরবানী, কুরআন পাঠ, দান-খয়রাত, সালাম আদান-প্রদান প্রভৃতি দৃশ্য ইবাদত ও কর্মগুলির সঙ্গে বিশ্বাস, অবিশ্বাস, দয়া, ক্ষমা, রহমত, হিংসা-বিদ্বেষ, অহংকার, কৃতজ্ঞ-অকৃতজ্ঞ প্রভৃতি অদৃশ্য ইবাদত ও কর্মগুলি পরস্পর অঙ্গাঙ্গিভাবে মিশে আছে। এগুলিকে পৃথকীকরণ করার কোন ক্ষমতা মানুষের নেই। আবার সঠিকভাবে চিহ্নিত করারও ক্ষমতা নেই।
ক্ষমা ও কৃতজ্ঞতা দু'টি পৃথক গুরুত্বপূর্ণ অদৃশ্য বস্তু এবং দু'টিই আমাদের ধর্মীয় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আল্লাহ ক্ষমাশীল পবিত্র কুরআনের এই অভাবনীয় সুসংবাদ হ'তেই মানুষ তাঁর নিকট বিভিন্নভাবে ক্ষমাপ্রার্থনা করে, তওবা করে, মন্দ কাজ না করার প্রতিশ্রুতি দেয়, নিজের পিতা-মাতা, পরিবারবর্গ, আত্মীয়-স্বজন, সকল ঈমানদার মুমিন ও মুসলমানদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। অবশ্য আল্লাহ্র নিকট প্রত্যেকেরই ক্ষমা প্রার্থনা করা অপরিহার্য কর্তব্য। কারণ স্বয়ং তিনিই তো ক্ষমা প্রার্থনার নির্দেশ দিয়েছেন, 'তোমরা ক্ষমা প্রার্থনা কর আল্লাহ্র কাছে, আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু' (৭৩-২০)। অন্যত্র সবার উদ্দেশ্যে তাঁর প্রিয় হাবীব (ছাঃ)-কে প্রত্যাদেশ করেন, 'বলুন, হে আমার প্রতিপালক! ক্ষমা করুন ও দয়া করুন, আপনি তো শ্রেষ্ঠ দয়ালু' (মুমিনূন ২৩/১১৮)।
আল্লাহ তা'আলা উপরের আয়াতদ্বয় দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে মানুষকে ক্ষমা প্রার্থনার নির্দেশ দিয়েছেন। অনুরূপ আরও বহু আয়াতে ক্ষমা প্রার্থনার নির্দেশ রয়েছে। আবার পরোক্ষভাবেও ক্ষমা প্রার্থনার বহু সুসংবাদ বিদ্যমান। মহান আল্লাহ বলেন, 'যারা না দেখে তাদের প্রতিপালককে ভয় করে তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার' (মুলক ৬৭/১২)। অন্য আয়াতে তিনি বলেন, 'আকাশ ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব আল্লাহ্রই তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন, যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন। তিনি ক্ষমাশীল পরম দয়ালু' (ফাতাহ ৪৮/১৪)।
মানুষ একান্তভাবেই আল্লাহ্ প্রিয় সৃষ্টি ও শ্রেষ্ঠ হিসাবে, ঘোষিত ও স্বীকৃত। কিন্তু তাঁর অসংখ্য সৃষ্টির মধ্যে আমাদের জানা মতে ফেরেশতার গুরুত্বও অনস্বীকার্য। ফেরেশতারা আল্লাহ্র শ্রেষ্ঠ বার্তাবাহক, আজ্ঞাবহ, অনুগত, প্রশংসা ও তাসবীহ পাঠসহ আদেশ পালনে সদা প্রস্তুত। এখানে শয়তানের কোন ঠাঁই নেই। তারা জানে আল্লাহ তাঁর বিশ্বস্ত ও মুমিন বান্দাদের ভালবাসেন এবং তাদের প্রতি ক্ষমাশীল, করুণাময়। সুতরাং ফেরেশতারাও আল্লাহ্ অনুমতিক্রমে এবং তাঁর সন্তুষ্টির প্রত্যাশায় মানুষকে ভালবাসে এবং তাদের প্রতি দয়াশীল ও কৃপাশীল হয়ে আল্লাহ্ নিকট মঙ্গল প্রার্থনা করে ও ক্ষমাপ্রার্থনা করে। পবিত্র কুরআনে এ বিষয়ে অনেক প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, 'যারা আরশ বহন করে এবং যারা তার চারপাশে আছে, তারা তাদের পালনকর্তার সপ্রশংস পবিত্রতা বর্ণনা করে, তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে বলে, হে আমাদের পালনকর্তা! আপনার রহমত ও জ্ঞান সবকিছুতে পরিব্যাপ্ত। অতএব যারা তওবা করে এবং আপনার পথে চলে, তাদেরকে ক্ষমা করুন এবং জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করুন। হে আমাদের পালনকর্তা! আর তাদেরকে দাখিল করুণ চিরকাল বসবাসের জান্নাতে, যার ওয়াদা আপনি তাদেরকে দিয়েছেন এবং তাদের বাপ-দাদা, পতি-পত্নী ও সন্তানদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করে তাদেরকে। নিশ্চয়ই আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় এবং আপনি তাদেরকে অমঙ্গল থেকে রক্ষা করুন। আপনি যাকে সেদিন অমঙ্গল থেকে রক্ষা করবেন, তার প্রতি অনুগ্রহই করবেন। এটাই মহা সাফল্য' (মুমিন ৪০/৭-৯)।
ফেরেশতাদের ক্ষমাপ্রার্থনা সম্পর্কিত অপর এক আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, 'হা-মীম, আইন, সীন, ক্বাফ। এমনিভাবে পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময় আল্লাহ আপনার প্রতি ও আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি অহি প্রেরণ করেন। নভোমণ্ডলে যা কিছু আছে এবং ভূমণ্ডলে যা কিছু আছে, সমস্তই তাঁর, তিনি সমুন্নত মহান। আকাশ উপর থেকে ফেটে পড়ার উপক্রম হয় আর তখন ফেরেশতাগণ তাদের পালনকর্তার প্রশংসাসহ পবিত্রতা বর্ণনা করে এবং পৃথিবীবাসীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। শুনে রাখ, আল্লাহই ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়' (শূরা ৪২/১-৫)।
এ বিষয়ে আল্লাহ আরো বলেন, 'মুমিনগণ তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণ স্মরণ কর এবং সকাল-বিকাল আল্লাহ্র পবিত্রতা বর্ণনা কর। তিনিই তোমাদের প্রতি রহমত করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণও রহমতের দো'আ করেন, অন্ধকার থেকে তোমাদেরকে আলোকে বের করার জন্য। তিনি মুমিনদের প্রতি পরম দয়ালু। যেদিন আল্লাহ্র সাথে মিলিত হবে সেদিন তাদের অভিবাদন হবে সালাম। তিনি তাদের জন্য সম্মানজনক পুরস্কার প্রস্তুত রেখেছেন। হে নবী! আমি আপনাকে সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি এবং আল্লাহ্র আদেশক্রমে তাঁর দিকে আহ্বায়করূপে এবং উজ্জ্বল প্রদীপ রূপে। আপনি মুমিনদেরকে সুসংবাদ দিন যে, তাদের জন্য আল্লাহ্র পক্ষ থেকে বিরাট অনুগ্রহ রয়েছে' (আহযাব ৩৩/৪১-৪৭)।
মূলতঃ এসব প্রত্যাদেশ আল্লাহ্র বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী সকল বান্দার জন্যই সমান উপকারের উদ্দেশ্যেই অবতীর্ণ হয়। কিন্তু বিশ্বাসীরা ভীত ও সন্ত্রস্ত অন্তরে কাজ করায় আল্লাহ্ পক্ষ হ'তে বহুবিধ ক্ষমার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় এবং অবিশ্বাসীরা গর্ব ও অহংকারে নিমজ্জিত থাকায় ক্ষমার বিপরীতে শাস্তি তে পতিত হয়। অতঃপর সংকট মুহূর্তে ক্বিয়ামতে বিগত দুনিয়ার জীবনের কথা মনে পড়ে যাবে, তখন আল্লাহ্র নিকট অযৌক্তিক অভিযোগ পেশ করবে। এক আয়াতে আল্লাহ বলেন, 'কাফেররা বলবে, হে আমাদের পালনকর্তা! যেসব জিন ও মানুষ আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল, তাদেরকে দেখিয়ে দিন, আমরা তাদেরকে পদদলিত করব, যাতে তারা যথেষ্ট অপমানিত হয়। নিশ্চয়ই যারা বলে, আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ, অতঃপর তাতেই অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, তোমরা ভয় কর না, চিন্তা কর না এবং তোমাদের প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ শোন। ইহকালে ও পরকালে আমরা তোমাদের বন্ধু। সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমাদের মন চায় এবং সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে যা তোমরা দাবী কর। এটা ক্ষমাশীল করুণাময়ের পক্ষ থেকে সাদর আপ্যায়ন' (হা-মীম-সিজদাহ ৪১/২৯-৩২)।
উপরোক্ত আয়াতগুলিতে ফেরেশতা কর্তৃক মুমিন ও সৎকর্মপরায়ণদের ক্ষমার জন্য আল্লাহ্র নিকট দো'আ বা ক্ষমা প্রার্থনার কথা বলা হয়েছে। কেননা আল্লাহ চান তাঁর বান্দারা যেন তাঁর নিকটে বিনীতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করে। আর তাঁর নে'মতকে আন্তরিকতার সাথে গ্রহণ করে এবং সে পথের অনুসারী হয়, অতঃপর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে। কিন্তু তিনি তাঁর বান্দা তথা আমাদের জন্য অগণিত নে'মত দান করেছেন, যার সমুচিত কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন সম্ভব নয় । তবে আন্তরিক কৃতজ্ঞতায়ই তাঁর কাম্য। মহান আল্লাহ বলেন, 'তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে তিনি তা পসন্দ করেন' (যুমার ৩৯/৭)।
অন্য আয়াতে তিনি বলেন, 'আল্লাহ তোমাদেকে মাতৃগর্ভ হ'তে এমন অবস্থায় বের করেছেন যে তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদের শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও হৃদয় দিয়েছেন, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পার' (নাহ'ল ১৬/৭৮)।
অতঃপর আল্লাহ মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রত্যাদেশ করেন, 'তিনি তোমাদের অধীন করেছেন রাত্রি-দিন, সূর্য ও চন্দ্রকে, নক্ষত্ররাজিও অধীন হয়েছে তাঁরই বিধানে। নিশ্চয়ই এতে বোধশক্তি সম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য রয়েছে নিদর্শন। আর তিনি তোমাদের অধীন করেছেন নানা রকম জিনিস যা তোমাদের জন্য পৃথিবীতে সৃষ্টি করেছেন। এতে রয়েছে নিদর্শন সেই সম্প্রদায়ের জন্য যারা নির্দেশ গ্রহণ করে। তিনি সমুদ্রকে অধীন করেছেন যাতে তোমরা তার থেকে তাজা মাছ আহরণ করতে পার এবং তার থেকে আহরণ করতে পার যা দিয়ে তোমরা নিজেদেরকে অলংকৃত কর। আর তোমরা দেখতে পাও তার বুক চিরে জলযান চলাচল করে। আর এজন্য যে, তোমরা যেন তাঁর অনুগ্রহ সন্ধান করতে পার ও তোমরা যেন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর' (নাহ'ল ১৬/১২-১৪)।
আল্লাহ তাঁর বান্দার সাথে প্রতিটি কাজে সার্বক্ষণিকভাবে মিশে আছেন, এর মহাসাক্ষ্যে তিনি বলেন, 'সুতরাং তোমরা আমাকেই স্মরণ কর আর আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করব। আমার কাছে তোমরা কৃতজ্ঞ হও, আর কৃতঘ্ন হয়ো না' (বাক্বারাহ ২/১৫২)।
অকৃতজ্ঞ বা কৃতঘ্ন বান্দাদের প্রতি অসন্তোষের এক বার্তায় মহান আল্লাহ বলেন, 'স্মরণ করো যখন তোমাদের প্রতিপালক ঘোষণা করলেন যে, যদি কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর, তবে তোমাদেরকে আরও দেব এবং যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি হবে কঠোর' (ইবরাহীম ১৪/৭)।
এরপর কৃতজ্ঞদের পুরোপুরি আশ্বস্ত করে ক্ষমাশীল আল্লাহ বলেন, 'তোমাদের আযাব দিয়ে আল্লাহ কি করবেন যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর এবং ঈমানের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক। আর আল্লাহ হচ্ছেন সমুচিত মূল্য দানকারী, সর্বজ্ঞ' (নিসা ৪/১৪৭)।
মানুষকে এ পৃথিবীতে বসবাসের জন্য আল্লাহ তা'আলা যে অগণিত দৃশ্য ও অদৃশ্য নে'মত দান করেছেন, তার কোনটি অপ্রতুল নয়। তবে তা বণ্টনের ক্ষেত্র একরূপ নয়, কমবেশী হয়। অবশ্য আল্লাহ্র কিছু বিশেষ নে'মত আছে, যেমন আলো, তাপ, বায়ু, পানি প্রভৃতি অমূল্য বস্তুগুলি সকল মানুষ এমনকি সকল প্রাণীই সমানভাবে উপভোগ করে থাকে। এগুলির প্রতি কারো কোন একক অধিকার নেই। অনুরূপভাবে মানুষের জন্য পরকালীন জীবনের যেসব নে'মত ভাণ্ডার রয়েছে, সেখানেও কেউ কোন অধিকার খাটাতে পারবে না। আল্লাহ্র আইন ও বিধান অনুযায়ী সম্পূর্ণ সত্য, ন্যায় ও নিরপেক্ষ বিচারের মাধ্যমে এক ও অভিন্ন বিচারের মানদণ্ডে ফায়ছালা নিরূপিত হবে মহাবিচার দিবসে।
ক্বিয়ামতের এই বিচার দিবস বড় কঠিন দিবস, ভয়াবহ দিবস, অবিশ্বাসীদের জন্য কঠোর শাস্তি দিবস। এ দিবসের ভয়ে বিশ্বাসী বান্দারাই ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে এবং মুক্তির জন্য আল্লাহ্ দেয়া বিধান ও সুযোগ অনুযায়ী তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। বান্দার এ ক্ষমা প্রার্থনায় আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়ে তার বড় বড় গোনাহ ক্ষমা করে দেন। কিন্তু যারা অবিশ্বাসী তারা তো বিচার দিবস বিশ্বাসই করে না, এর ভয়ও করে না, ক্ষমা প্রার্থনাও করে না। ফলে তাদের শাস্তি অবধারিত হয়ে যায়। অথচ আল্লাহ বহুমুখী ক্ষমার ঘোষণা দিয়ে তাঁর অপরাধী বান্দাদেরও পুনঃ পুনঃ তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনার আহ্বান জানিয়েছেন এবং সকলকে ক্বিয়ামতের শাস্তি হ'তে মুক্তির পথ প্রশস্ত করে দিয়েছেন। আল্লাহ আমাদের সকলকে এ সুযোগ গ্রহণ করার তওফীক দান করুন।
📄 উপসংহার
আল্লাহ্র নিকট সর্বান্তকরণে ক্ষমা প্রার্থনার এই সুবর্ণ সুযোগ শ্রেষ্ঠ মানব জাতির জন্য এক অদ্বিতীয় অবলম্বন। 'আল্লাহ ক্ষমাশীল' এই মহা ঘোষণার অভ্যন্তরে যে মহান তাৎপর্য, মাহাত্ম্য ও রহস্য লুক্কায়িত আছে, তা স্বয়ং তিনি ছাড়া কেউ জানে না। তবে তাঁর ক্ষমা প্রদানের ব্যাপক ঘোষণায় প্রতীয়মান হয় যে, মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহ তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানব সম্প্রদায়কে তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের স্থানেই (জান্নাতে) রাখতে চান। পবিত্র কুরআনে বড় বড় সৃষ্ট দৃশ্য ও অদৃশ্য বস্তুগুলি প্রথম সারির বড় বড় সংবাদ শিরোনাম আকারে প্রত্যাদেশ হয়েছে। যেমন দৃশ্য বস্তুর মধ্যে আসমান-যমীন, সূর্য-চন্দ্র, পাহাড়-পর্বত, সাগর-মহাসাগর, উদ্ভিদ রাজি, মানুষ, জীবজন্তু প্রভৃতির বর্ণনা। পাশাপাশি অদৃশ্য বস্তু সমূহের মধ্যে আলো-তাপ, বাতাস, দয়া-মায়া, ক্ষমা, রহমত, সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়, ক্বিয়ামত, জান্নাত-জাহান্নাম প্রভৃতির বর্ণনা বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
পবিত্র কুরআনে আসমান-যমীনের বর্ণনাগুলি আসমান যমীনের মতই বৃহৎ ও শক্তিশালীভাবে বর্ণিত হয়েছে। আকাশসমূহ মাথার উপর বহু ঊর্ধ্বে স্তম্ভ ব্যতীত নির্মিত হয়েছে। অনুরূপভাবে সূর্য, চন্দ্রও ঊর্ধ্বজগত হ'তেই আলো ও তাপ বিকিরণ করছে। এই বিশাল সৃষ্টি বিষয়ক আয়াতগুলি পবিত্র কুরআনে ঘুরে ফিরে প্রায় শতাধিক জায়গায় সন্নিবেশিত হয়েছে। এগুলি আল্লাহ্র অসীম জ্ঞানের বর্ণনা ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ আসমান-যমীনের সৃষ্টি মানুষ সৃষ্টি অপেক্ষাও কঠিনতর বলে জানিয়েছেন মহান স্রষ্টা পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় আল্লাহ তা'আলা।
মূলতঃ মানুষ সৃষ্টির লক্ষ্যেই সর্বোচ্চ জ্ঞান প্রযুক্তির কঠিনতর সৃষ্টি আসমান সৃষ্টি করা হয়েছে। আসমান-যমীন সৃষ্টির জ্ঞানের ভাণ্ডারের প্রতি লক্ষ্য করেই মানুষকে আল্লাহ্র প্রতি আত্মসমর্পণ করা উচিত। এত বড় সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা ও গবেষণা করলে, অন্য কোন কিছু নিয়ে চিন্তা করার অবকাশ থাকে না। আর একটি কথা, মানুষের সামনে যত (অগণিত) সৃষ্টিই থাক না কেন, তার নিকটতম সৃষ্টিগুলি অপেক্ষা দূরবর্তী আসমানই তার বার বার নযরে পড়ে, সেটা ইচ্ছাকৃতভাবে হোক বা অনিচ্ছাকৃত ভাবে হোক। সেখান থেকে দৃষ্টিকে ফিরিয়ে রাখা কোন মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয় বা সম্ভব হয় না।
আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু 'আল্লাহ ক্ষমাশীল' আধ্যাত্মিক জগতের সর্বঊর্ধ্বে অবস্থানরত একটি পরাক্রমশালী পবিত্র অদৃশ্য বা অলৌকিক শক্তি। একমাত্র আল্লাহ তা'আলায়ই এ শক্তির মালিক। তিনি তাঁর এ অলৌকিক শক্তি দ্বারা পসন্দের বান্দাদের পরিশুদ্ধ করবেন। অর্থাৎ তাঁর মন মত বা তাঁর উপর নির্ভরশীল বান্দার জন্য তিনি ক্ষমাশীল হবেন বলে ধারণা করা যায়। পবিত্র কুরআনে এ আয়াতগুলি শ্রেষ্ঠ দৃশ্যবস্তু আসমান-যমীনের মতই শত শত জায়গায় বর্ণিত হয়েছে। এসব আয়াতগুলি গুরুত্বপূর্ণ। এসব আয়াত সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে আল্লাহ্ ক্ষমার দিকে অগ্রসর হওয়া সকলের একান্ত কর্তব্য।
আল্লাহ আমাদের সকলকে তাঁর ক্ষমা লাভ করার তওফীক দান করুন। - আমীন!
লেখকের প্রকাশিত বই সমূহ
১। সৃষ্টির সন্ধানে।
২। আমলনামা।
৩। আল্লাহ্র সঙ্গে সাক্ষাৎ।
৪। ইসলামধর্ম ও মাতৃভাষা।
৫। আল্লাহ ক্ষমাশীল।
৬। শ্রেষ্ঠ ইবাদাত ছালাত বা দো'আ ।