📄 নবী-রাসূলই ক্ষমাপ্রার্থী ছিলেন
আল্লাহ অসীম জ্ঞানভাণ্ডারের মালিক, তাঁর সীমাহীন জ্ঞানের বাইরে কিছুই নেই। তিনি মানুষকে সামান্য জ্ঞান দান করেছেন, কিন্তু মানুষ নিজকে অনেক জ্ঞানী বা বুদ্ধিমান মনে করে। ফলে প্রায়ই তাদের ভুল হয়ে যায়, তখন আল্লাহ্র কাছে ক্ষমাপ্রার্থী হয়। ক্ষমাশীল আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। সব মানুষের মধ্যে এ ভুল হয়, এমনকি নবী-রাসূলগণেরও ভুল হয়েছে। কারণ তাঁরাও তো মানুষ। তবে তাঁদের ভুল সাধারণতঃ অনিচ্ছাকৃতভাবে হয়ে যায়, ইচ্ছাকৃতভাবে নয় এবং ভুলের পরিমাণও কম। নবী-রাসূলগণের ভুল হয়ে গেলে তাঁরা সাথে সাথে আল্লাহ্র কাছে ক্ষমাপ্রার্থী হয়েছেন এবং ক্ষমাশীল আল্লাহ তাঁদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।
মানুষ মাত্রেরই ভুল হয়, কাজেই নবী-রাসূলগণের ভুল হওয়ায় বা ক্ষমাপ্রার্থী হওয়ায় আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কারণ আল্লাহ ইচ্ছা করলে নবী-রাসূলগণের ভুল হ'ত না বা সাধারণ মানুষেরও ভুল হত না। কিন্তু আল্লাহ তা করেননি, তিনি মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য সবার মধ্যে এক ও অভিন্ন এমন এক উপাদান মিশ্রিত করে দিয়েছেন যে মিশ্রণ হ'তে কেউ মুক্ত নয়। তাছাড়া মানুষকে ভুল পথে বা খারাপ পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য শয়তানের প্রস্তুতি ও প্রচেষ্টার কোন কমতি নেই। শয়তান সুযোগ পেলেই যে কোন মানুষের ক্ষতি সাধনে তৎপর হয়। এমনকি নবী-রাসূলগণের ক্ষতি সাধনের প্রচেষ্টায়ও বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেও ব্যর্থ হয়। সাধারণ মানুষকে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি অবহিত করে সান্ত্বনা প্রদান করাই এ অধ্যায়ের আলোচনার মূখ্য উদ্দেশ্য।
এ পৃথিবীর জীবনযাত্রার পথে কোন সময় অনাকাংখিতভাবে মানুষ ভুল-ত্রুটি, অন্যায়-অত্যাচার বা অবিচার করে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে যেতে পারে, কিন্তু সে সংশোধিত হয়ে আবার নিজ অবস্থানে বা আরও ভাল অবস্থানে ফিরে আসতে পারবে। মানুষকে তার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য বা সগৌরবে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য এ দুর্লভ আত্মত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন মহিমাময় আল্লাহ তা'আলা। সাধারণ মানুষ ত্রুটি-বিচ্যুতি, অন্যায় বা পাপ করে আল্লাহ্র নিকট তওবা করে এবং ক্ষমাপ্রার্থী হয়। নবী-রাসূলগণ কোন অন্যায় বা পাপ করেন না, তাঁরা কোন ঘটনাচক্রে ত্রুটি-বিচ্যুতিতে জড়িয়ে পড়েন। অতঃপর লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহ্র নিকট সবিনয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। আল্লাহ তাঁদেরকে ক্ষমা করে দেন।
উল্লেখ্য, আমাদের আদি পিতা আদম (আঃ) আল্লাহ্র আদেশ ভুলে গিয়ে শয়তানের মিথ্যা কথার চক্রান্তে পড়ে নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়ে আল্লাহ্র অসন্তুষ্টির মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন। অতঃপর আল্লাহ্র কাছে করুণভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। দয়াশীল আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করে দেন এবং পরবর্তী উত্তম কর্মসূচী প্রদান করেন। তাঁর ক্ষমা প্রার্থনার দো'আটি পবিত্র কুরআনে এভাবে বর্ণিত হয়েছে, قَالَا رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ 'তাঁরা উভয়ে বললেন, হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা নিজেদের প্রতি যুলুম করেছি। যদি আপনি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না করেন, তবে আমরা অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যাব' (আ'রাফ ৭/২৩)।
ইবরাহীম (আঃ) তাঁর সন্তানাদি ও কওমের জন্য দো'আ করেছিলেন,
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ اجْعَلْ هَذَا الْبَلَدَ آمِنًا وَاجْنُبْنِي وَبَنِيَّ أَن نَّعْبُدَ الأَصْنَامَ - رَبِّ إِنَّهُنَّ أَضْلَلْنَ كَثِيرًا مِّنَ النَّاسِ فَمَنْ تَبِعَنِي فَإِنَّهُ مِنِّي وَمَنْ عَصَانِي فَإِنَّكَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
'যখন ইবরাহীম বললেন, হে পালনকর্তা! এ শহরকে শান্তিময় করে দিন এবং আমাকে ও আমার সন্তান-সন্ততিকে মুর্তিপূজা থেকে দূরে রাখুন। হে পালনকর্তা! এরা অনেক মানুষকে বিপথগামী করেছে। অতএব যে আমার অনুসরণ করে, সে আমার এবং কেউ আমার অবাধ্যতা করলে নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু' (ইবরাহীম ১৪/৩৫, ৩৬)।
মূসা (আঃ) এক ঘটনা বা দুর্ঘটনার কবলে পতিত হয়ে অপরাধীর বেশে আল্লাহ্র কাছে ক্ষমাপ্রার্থী হয়েছিলেন এবং আল্লাহ তাঁকে ক্ষমাও করে দিয়েছেন। বিষয়টি পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, 'যখন মূসা যৌবনে পদার্পণ করলেন এবং পরিণত বয়স্ক হয়ে গেলেন, তখন আমি তাঁকে প্রজ্ঞা ও জ্ঞানদান করলাম। এমনিভাবে আমি সৎ কর্মীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। তিনি শহরে প্রবেশ করলেন, যখন তার অধিবাসীরা ছিল বেখবর। তথায় তিনি দুই ব্যক্তিকে লড়াইরত দেখলেন এদের একজন ছিল তাঁর নিজ দলের এবং অন্যজন তাঁর শত্রু দলের। অতঃপর যে তাঁর নিজ দলের সে তাঁর শত্রু দলের লোকটির বিরুদ্ধে তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করল। তখন মূসা তাকে ঘুষি মারলেন এবং এতেই তার মৃত্যু হয়ে গেল। মূসা বললেন, এটা শয়তানের কাজ। নিশ্চয়ই সে প্রকাশ্য শত্রু, বিভ্রান্তকারী। তিনি বললেন, হে আমার পালনকর্তা! আমি তো নিজের উপর যুলুম করে ফেলেছি। অতএব আমাকে ক্ষমা করুন। আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করলেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, দয়ালু। তিনি (মূসা) বললেন, হে আমার পালনকর্তা! আপনি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন, এরপর আমি কখনও অপররাধীদের সাহায্যকারী হব না' (ক্বাছাছ ২৮/১৪-১৭)।
নূহ (আঃ)-এর আমলে যে ঐতিহাসিক প্লাবন সংঘটিত হয়েছিল, তাকে কেন্দ্র করে আল্লাহ তা'আলা যে অহি অবতীর্ণ করেছিলেন এবং তার ভয়াবহতায় নূহ (আঃ) আল্লাহ্র নিকট যেসব প্রার্থনা করেছিলেন তা উপস্থাপন করা হ'ল। মহান আল্লাহ বলেন, নূহ (আঃ)-এর প্রতি অহি প্রেরণ করা হ'ল যে, যারা ইতিমধ্যেই ঈমান এনেছে তাদের ছাড়া আপনার জাতির অন্য কেউ ঈমান আনবে না। অতএব তাদের কার্যকলাপে বিমর্ষ হবেন না। আর আপনি আমার সম্মুখে আমারই নির্দেশ মোতাবেক একটি নৌকা তৈরী করুন এবং পাপিষ্ঠদের ব্যাপারে আমাকে কোন কথা বলবেন না। অবশ্যই তারা ডুবে মরবে। তিনি নৌকা তৈরী করতে লাগলেন, আর তাঁর কওমের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা যখন পার্শ্ব দিয়ে যেত, তখন তাঁকে বিদ্রূপ করত। তিনি বললেন, তোমরা যদি আমাকে উপহাস করে থাক, তবে তোমরা যেমন উপহাস করছ আমরাও তদ্রূপ তোমাদের উপহাস করছি। অতঃপর অচিরেই জানতে পারবে লাঞ্ছনাদায়ক আযাব কার উপর আসে এবং চিরস্থায়ী আযাব কার উপর অবতরণ করে। অবশেষে যখন আমার হুকুম এসে পৌঁছল এবং ভূ-পৃষ্ঠ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল, আমি বললাম, সর্বপ্রকার জোড়ার দু'টি করে এবং যাদের উপর পূর্বাহ্ণেই হুকুম হয়ে গেছে তাদের বাদ দিয়ে আপনার পরিজনবর্গ এবং সকল ঈমানদারগণকে নৌকায় তুলে নিন। বলা বাহুল্য, অতি অল্পসংখ্যক লোকই তাঁর সাথে ঈমান এনেছিল। আর তিনি বললেন, তোমরা এতে আরোহণ কর। আল্লাহ্ নামেই এর গতি ও স্থিতি। আমার পালনকর্তা অতি ক্ষমাপরায়ণ, মেহেরবান। আর নৌকাখানি তাদের বহন করে চলল পর্বতপ্রমাণ তরঙ্গমালার মাঝে। আর নূহ (আঃ) তাঁর পুত্রকে ডাক দিলেন, সে সরে রয়েছিল, তিনি বললেন, প্রিয় বৎস! আমাদের সাথে আরোহণ কর এবং কাফেরদের সাথে থেক না। সে বলল, আমি অচিরেই কোন পাহাড়ে আশ্রয় নেব, যা আমাকে পানি হ'তে রক্ষা করবে। নূহ (আঃ) বললেন, আজকের দিনে আল্লাহ্র হুকুম থেকে কোন রক্ষাকারী নেই। একমাত্র তিনি যাকে দয়া করবেন। এমন সময় উভয়ের মাঝে তরঙ্গ আড়াল হয়ে দাঁড়াল, ফলে সে নিমজ্জিত হ'ল। আর নির্দেশ দেয়া হ'ল, হে পৃথিবী! তোমার পানি গিলে ফেল, আর হে আকাশ ক্ষান্ত হও। আর পানি হ্রাস করা হ'ল এবং কাজ শেষ হয়ে গেল। আর জুদী পর্বতে নৌকা ভিড়ল এবং ঘোষণা করা হ'ল, দুরাত্মা কাফেররা নিপাত যাক। আর নূহ (আঃ) তাঁর পালনকর্তাকে ডেকে বললেন, হে পরওয়ারদেগার! আমার পুত্র তো আমার পরিজনদের অন্তর্ভুক্ত, আর আপনার ওয়াদাও নিঃসন্দেহে সত্য। আর আপনিই সর্বাপেক্ষা বিজ্ঞ ফায়ছালাকারী। আল্লাহ বলেন, হে নূহ! নিশ্চয়ই সে আপনার পরিবারভুক্ত নয়। নিশ্চয়ই সে দুরাচার। সুতরাং আমার কাছে এমন দরখাস্ত করবেন না, যার খবর আপনি জানেন না। আমি আপনাকে উপদেশ দিচ্ছি যে, আপনি অজ্ঞদের দলভুক্ত হবেন না। নূহ (আঃ) বলেন, হে আমার পালনকর্তা! আমার যা জানা নেই এমন কোন দরখাস্ত করা হ'তে আমি আপনার কাছেই আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আপনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন, দয়া না করেন, তাহ'লে আমি ক্ষতিগ্রস্ত হব। হুকুম হ'ল, হে নূহ! আমার পক্ষ হ'তে নিরাপত্তা এবং আপনার নিজের ও সঙ্গীয় সম্প্রদায়গুলির উপর বরকত সহকারে অবতরণ করুন' (হৃদ ১১/৩৬-৪৮)।
আল্লাহ্র কাছে ক্ষমাপ্রার্থনার ইতিহাসে দাউদ (আঃ)-এর কাহিনীও বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। এ বিষয়ের বর্ণনায় আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূল (ছাঃ)-কে বলেন, 'আমার শক্তিশালী বান্দা দাউদকে স্মরণ করুন। তিনি ছিলেন আমার প্রতি প্রত্যাবর্তনশীল। আমি পর্বতমালাকে তাঁর অনুগামী করে দিয়েছিলাম, তারা সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর সাথে পবিত্রতা ঘোষণা করত । আর পক্ষীকুলকেও, যারা তাঁর কাছে সমবেত হ'ত। সবাই ছিল তাঁর প্রতি প্রত্যাবর্তনশীল। আমি তাঁর সাম্রাজ্যকে সুদৃঢ় করেছিলাম এবং তাঁকে দিয়েছিলাম প্রজ্ঞা ও ফায়ছালাকারী বাগ্মীতা। আপনার কাছে দাবীদারদের বৃত্তান্ত পৌঁছেছে, যখন তারা প্রাচীর ডিঙিয়ে ইবাদতখানায় প্রবেশ করেছিল। যখন তারা দাউদের কাছে অনুপ্রবেশ করল, তখন তিনি সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লেন। তারা বলল, ভয় করবেন না, আমরা বিবদমান দু'টি পক্ষ, একে অপরের প্রতি বাড়াবাড়ি করেছি। অতএব আমাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করুন, অবিচার করবেন না। আমাদেরকে সরল পথ প্রদর্শন করুন। সে আমার ভাই, সে নিরানব্বইটি দুম্বার মালিক আর আমি মালিক একটি মাদী দুম্বার। এরপরও সে বলে, এটিও আমাকে দিয়ে দাও। সে কথাবার্তায় আমার উপর বলপ্রয়োগ করে। দাউদ বললেন, সে তোমার দুম্বাটিকে নিজের দুম্বাগুলির সাথে সংযুক্ত করার দাবী করে তোমার প্রতি অবিচার করেছে। শরীকদের অনেকেই একে অপরের প্রতি যুলুম করে থাকে। তবে তারা করে না, যারা আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাসী এবং সৎকর্ম সম্পাদনকারী। অবশ্য এমন লোকের সংখ্যা অল্প । দাউদের খেয়াল হ'ল যে, আমি তাকে পরীক্ষা করছি। অতঃপর সে তাঁর পালনকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করল, সিজদায় লুটিয়ে পড়ল এবং তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করলেন। আমি তাঁর সে অপরাধ ক্ষমা করলাম। নিশ্চয়ই আমার কাছে তাঁর জন্য রয়েছে উচ্চ মর্তবা ও সুন্দর আবাসস্থল' (ছোয়াদ ৩৮/১৭-২৫)।
বিগত নবী-রাসূলগণের ভুল-ত্রুটির ঐতিহাসিক কাহিনী সমূহ উম্মতে মুহাম্মাদীর অবগতিকল্পে আমাদের মহানবী (ছাঃ)-কে তা উদাহরণ স্বরূপ বর্ণনা করা হয়েছে। ঐগুলোরই অংশ হিসাবে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবীব (ছাঃ)-কে বলেন, 'স্মরণ করুণ আইয়ূবের কথা, যখন তিনি তাঁর পালনকর্তাকে আহ্বান করে বলেছিলেন, আমি দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়েছি এবং আপনি দয়াবানদের চাইতেও শ্রেষ্ঠ দয়াবান। অতঃপর আমি তাঁর আহ্বানে সাড়া দিলাম এবং তাঁর দুঃখ-কষ্ট দূর করে দিলাম এবং তাঁর পরিবারবর্গ ফিরিয়ে দিলাম। আর তাদের সাথে তাদের সমপরিমাণ আরও দিলাম আমার পক্ষ থেকে কৃপাবশতঃ। এটা ইবাদতকারীদের জন্য উপদেশ স্বরূপ। আর ইসমাঈল, ইদরীস ও যুলকিফলের কথা স্মরণ করুন, তাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন ছবরকারী। আমি তাঁদেরকে আমার রহমতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম, তাঁরা ছিলেন সৎকর্মপরায়ণ। আর মাছওয়ালার কথা স্মরণ করুন যখন তিনি ক্রুব্ধ হয়ে চলে গিয়েছিলেন। অতঃপর মনে করেছিলেন যে, আমি তাঁকে ধৃত করতে পারব না। অতঃপর তিনি অন্ধকারের মধ্যে আহ্বান করলেন। আপনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, আপনি নির্দোষ, আমি গোনাহগার। অতঃপর আমি তাঁর আহ্বানে সাড়া দিলাম এবং তাঁকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিলাম। আমি এমনিভাবে বিশ্বাসীদেরকে মুক্তি দিয়ে থাকি। যাকারিয়ার কথা স্মরণ করুন, যখন তিনি তাঁর পালনকর্তাকে আহ্বান করেছিলেন হে আমার পালনকর্তা! আমাকে একা রাখবেন না, আপনি তো উত্তম ওয়ারিছ। অতঃপর আমি তাঁর দো'আ কবুল করেছিলাম, তাঁকে দান করেছিলাম ইয়াহইয়া এবং তাঁর জন্য তাঁর স্ত্রীকে প্রসবযোগ্য করেছিলাম। তাঁরা সৎকর্মে ঝাঁপিয়ে পড়তেন, তাঁরা আশা ও ভীতি সহকারে আমাকে ডাকতেন এবং তাঁরা ছিলেন আমার কাছে বিনীত' (আম্বিয়া ২১/৮৩-৯০)।
খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের ধর্মবিশ্বাস ঈসা (আঃ)-এর উপাস্যতা খণ্ডনের এক প্রশ্নোত্তর পর্বে মহান আল্লাহ প্রত্যাদেশ করেন, 'যখন আল্লাহ বললেন, হে ঈসা ইবনে মরিয়াম! তুমি কি লোকদেরকে বলেছিলে যে, আল্লাহকে ছেড়ে আমাকে ও আমার মাতাকে উপাস্য সাব্যস্ত কর? ঈসা বললেন, আপনি পবিত্র। আমার জন্য শোভা পায় না যে, আমি এমন কথা বলি, যা বলার কোন অধিকার আমার নেই। যদি আমি বলে থাকি, তবে আপনি অবশ্যই পরিজ্ঞাত, আপনি তো আমার মনের কথাও জানেন এবং আমি জানি না যা আপনার মনে আছে। নিশ্চয়ই আপনিই অদৃশ্য বিষয়ে জ্ঞাত। আমি তো তাদেরকে কিছুই বলিনি, শুধু সে কথাই বলেছি যা আপনি বলতে আদেশ করেছিলেন যে, তোমরা আল্লাহ্র দাসত্ব কর, যিনি আমার ও তোমাদের পালনকর্তা, আমি তাদের সম্পর্কে অবগত ছিলাম যতদিন তাদের মধ্যে ছিলাম। অতঃপর যখন আপনি আমাকে লোকান্তরিত করলেন, তখন থেকে আপনিই তাদের সম্পর্কে অবগত আছেন। আপনি সব বিষয়ে পূর্ণ পরিজ্ঞাত। যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি দেন, তবে তারা আপনার দাস এবং যদি আপনি তাদের ক্ষমা করেন, তবে আপনিই পরাক্রান্ত মহাবিজ্ঞ' (মায়েদাহ ৫/১১৬-১১৮)।
আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়, যারা এই বিশ্বাসে সন্দেহ পোষণ করে বা কাউকে আল্লাহ্ অংশীদার সাব্যস্ত করে, শুধু তারাই আল্লাহ্ ক্ষমা হ'তে সম্পূর্ণ বাদ যাবে। এতদ্ব্যতীত যত বড়ই পাপী বা মহাপাপী হোক আল্লাহ তাকে মাফ করে দিতে পারেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু যে আল্লাহ্ ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব বা অনুরূপ কিছু দাবী করবে সে কখনও ক্ষমা পাবে না। উপরের আলোচনায় নবীকুলের অন্যতম সম্মানিত নবী ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের লোকেরা যে দাবী করে, তাতে ঈসা (আঃ)-এর মনোভাব পরীক্ষা করার জন্য আল্লাহ তা'আলা তাঁকে খ্রীষ্টানদের দাবীর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন করেন। ঈসা (আঃ) অন্তর্যামী আল্লাহ্র কাছে ঐ বিষয়ের পবিত্রতা ও স্বচ্ছতার সঠিক জবাবদিহিতা করেন এবং পৃথিবীতে থাকা অবস্থায় যারা আল্লাহ ও তাঁর অনুগত ছিল তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। অতঃপর তাঁকে লোকান্তরিত করার পর যা হয়েছে তা সবিনয়ে আল্লাহ্র উপর সমর্পণ করেন।
প্রোক্ত আলোচনায় বোঝা যায় খ্রীষ্টানরা ঈসা (আঃ)-কে মর্যাদা দেয়ার জন্য যা কিছু বলে তাতে যদি তিনি আনন্দিত বা বিন্দুমাত্র গর্বিত হ'তেন, তবে ইতিহাস অন্যরূপ হয়ে যেত। কিন্তু তিনি তা না করে তাঁর নবী ও মানব মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখেন। অতীতে অনেক স্বৈরাচারী ও স্বেচ্ছাচারী শক্তিবলে নিজেকেই 'আল্লাহ' বলে দাবী করেছে। কিন্তু নবী-রাসূলগণ তো তা করেনইনি, পরন্তু তাঁরা সব সময়ই আল্লাহ্র নিকট বিনীতভাবে ক্ষমাপ্রার্থনা করে গেছেন। আমাদের মহানবী (ছাঃ)ও তাঁর এবং তাঁর উম্মতবর্গের জন্য মহাক্ষমাশীল আল্লাহ্র নিকট অত্যন্ত বিনয় ও করুণভাবে প্রার্থনা করে গেছেন এবং পবিত্র কুরআনে তা বর্ণিত হয়েছে, 'যা কিছু আকাশসমূহে রয়েছে এবং যা কিছু যমীনে আছে, সব আল্লাহ্রই। যদি তোমরা মনের কথা প্রকাশ কর কিংবা গোপন কর, আল্লাহ তোমাদের কাছ থেকে তার হিসাব নেবেন। অতঃপর যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করবেন এবং যাকে ইচ্ছা তিনি শাস্তি দেবেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে শক্তিমান। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বিশ্বাস রাখেন ঐ সমস্ত বিষয় সম্পর্কে যা তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাঁর উপর অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুসলমানরাও সবাই বিশ্বাস রাখে আল্লাহ্র প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর গ্রন্থসমূহের প্রতি এবং তাঁর পয়গম্বরগণের প্রতি। তারা বলে, আমরা তাঁর পয়গম্বরগণের মধ্যে কোন তারতম্য করি না। তারা বলে, আমরা শুনেছি এবং কবুল করেছি। আমরা আপনার ক্ষমা চাই, হে আমাদের পালনকর্তা! আপনারই দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না। সে তা-ই পায় যা সে উপার্জন করে এবং তা-ই তার উপর বর্তায় যা সে করে। হে আমাদের পালনকর্তা! যদি আমরা ভুলে যাই কিংবা ভুল করি, তবে আমাদেরকে অপরাধী করবেন না। হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের উপর এমন দায়িত্ব অর্পণ করবেন না, যেমন আমাদের পূর্ববর্তীদের উপর অর্পণ করেছেন। হে আমাদের প্রভু! আমাদের দ্বারা ঐ বোঝা বহন করাবেন না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই। আমাদের পাপ মোচন করুন। আমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং আমাদের প্রতি দয়া করুন। আপনিই আমাদের প্রভু, সুতরাং কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য করুন' (বাক্বারাহ ২/২৮৪-২৮৬)। অন্যত্র ক্ষমাশীল আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূল (ছাঃ)-কে বলেন, 'বলুন, হে আমার পালনকর্তা! ক্ষমা করুন ও রহম করুন। রহমকারীদের মধ্যে আপনি শ্রেষ্ঠ রহমকারী' (মুমিনূন ২৩/১১৮)।
নবী-রাসূলগণের ক্ষমা প্রার্থনায় তাঁদের সামান্য ভুল-ত্রুটি বা ত্রুটি-বিচ্যুতির অনুরূপ বিষয়গুলি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে সাথে তুলে ধরা হয়েছে। এসব অসামান্য আলোচনায় উম্মতে মুহাম্মাদীর অফুরন্ত কল্যাণ নিহিত রয়েছে। আল্লাহ্র কাছে ক্ষমাপ্রার্থী হওয়া যে কত মহান কাজ তা হৃদয়ঙ্গম করার জন্যই নবী-রাসূলগণের ক্ষমা প্রার্থনা ও প্রার্থনার বাক্যগুলি পবিত্র কুরআনে লিপিবদ্ধ হয়েছে। এগুলির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করত বাস্তব জীবনে সুশিক্ষা গ্রহণ করায় আল্লাহ্র সন্তুষ্টির কারণ হবে বলে আশা করা যায়। তিনি তাঁর সকল বান্দার প্রতি রহম করুন এবং ক্ষমাপ্রার্থনার জ্ঞান দান করুন।
📄 আল্লাহ যাদের ক্ষমা করবেন না
আল্লাহ তা'আলার যাবতীয় আদেশের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছে, একমাত্র আল্লাহ্র আনুগত্য করা। সর্বনিকৃষ্ট পাপ হচ্ছে আল্লাহ্ শরীক সাব্যস্ত করা। যেটা আল্লাহ তা'আলার পক্ষে চরম অসন্তোষ ও অপসন্দনীয় বিষয়। কারণ এক আল্লাহ সত্য, দ্বীন ইসলাম সত্য, জন্ম-মৃত্যু, ইহকাল-পরকাল, নবী-রাসূল, ক্বিয়ামত, জান্নাত-জাহান্নাম সবই সত্য। এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ সকল সত্যের প্রবর্তক। কিন্তু বিপরীতে আল্লাহ্ শরীক মিথ্যা, জান্নাত ও জাহান্নামে অবিশ্বাস মিথ্যা, সর্বোপরি পরকাল ও অনন্তকালে অবিশ্বাসও মিথ্যা। আর শয়তান (ইবলীস) সকল মিথ্যার প্রবর্তক।
ইসলামের ঘোর শত্রু, মিথ্যার প্রবর্তক ইবলীস তার প্রচেষ্টা, প্ররোচনা-প্রবঞ্চনায় প্রাগৈতিহাসিক যুগ হ'তে ধীরে ধীরে অতি কৌশলে মানুষকে মিথ্যার পানে নিবিড়ভাবে আকৃষ্ট করছে। ফলে সারা বিশ্বে আল্লাহ্ সমকক্ষ বহু মানুষ, জ্বিন, দেব-দেবী, মূর্তি, জড়বস্তু, প্রকৃতি ইত্যাদি শক্তির উদ্ভব হয়েছে। কিন্তু আল্লাহ্র সমতুল্য বা তাঁর চেয়ে কমবেশী উপকারী বলে পূজনীয় বস্তুগুলি তাদের (পূজকদের) বিন্দু-বিসর্গও উপকার করতে পারে না। তাদের এহেন হীন ও গর্হিত সিদ্ধান্তের প্রতিফল দেওয়ার জন্য আল্লাহ দৃঢ় প্রতিজ্ঞা রয়েছেন। এরূপ শিরককারীদের আল্লাহ কখনও ক্ষমাও করবেন না। মহান আল্লাহ বলেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُوْنَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا بَعِيدًا
'নিশ্চয়ই আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে তাঁর সাথে কাউকে শরীক করে। এছাড়া যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। যে আল্লাহ্র সাথে শরীক করে, সে সুদূর ভ্রান্তিতে পতিত হয়' (নিসা ৪/১১৬)।
অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يَشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْماً عَظِيمًا
'নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে লোক তাঁর সাথে শরীক করে। তিনি ক্ষমা করেন এতদ্ব্যতীত অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন। আর যে লোক অংশীদার সাব্যস্ত করল আল্লাহ্র সাথে সে যেন অপবাদ আরোপ করল' (নিসা ৪/৪৮)।
আল্লাহ তা'আলা তাঁর সাথে শরীক স্থাপনকারীদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর এবং শাস্তি দানে দৃঢ় সংকল্প। এ বিষয়ে বিশেষ হুঁশিয়ারী প্রদান করে তিনি তাঁর প্রিয় রাসূল (ছাঃ)-কে বলেন,
فَلَا تَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَهَا آخَرَ فَتَكُوْنَ مِنَ الْمُعَذِّبِينَ
'অতএব আপনি আল্লাহ্র সাথে অন্য উপাস্যকে আহ্বান করবেন না। করলে শাস্তিতে পতিত হবেন' (শু'আরা ২৬/২১৩)।
পবিত্র কুরআন মাজীদের উপরোক্ত বাণীর প্রতি সংগত কারণেই সকল মুমিন, ধর্মভীরু ও আল্লাহভীরু বান্দার মনোযোগী ও আস্থাশীল হওয়া একান্তই বাঞ্ছনীয়। পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনে যে কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি, অন্যায়-অপরাধ বা পাপ সমূহ হ'তে শিরক অধিক মারাত্মক। কারণ আল্লাহ্র সঙ্গে শরীক স্থাপন, তাঁর একক সার্বভৌমত্বের প্রতি হস্ত ক্ষেপ করার স্পর্ধা ছাড়া কিছু নয়। আর এটা সবচেয়ে বড় সীমালংঘন। আল্লাহ্র সাথে শরীক স্থাপনকারী ছাড়া যেকোন ব্যক্তির বিশাল পাপরাশিও আল্লাহ তা'আলা ইচ্ছা করলে ক্ষমা করে দিতে পারেন।
শিরকমুক্ত বড় পাপীও সর্বশেষ সুযোগে আল্লাহ্ ওয়াদা অনুযায়ী ক্ষমাপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে অর্থাৎ ক্ষমা পেয়ে যাবে। এ সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদীছ আবু যর থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাতে আমি বের হ'লাম। আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে একাকী হেঁটে যেতে দেখলাম। আমি ভাবলাম রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সম্ভবত চান না যে, কেউ তাঁর সঙ্গী হোক। সুতরাং আমি চন্দ্রলোকে হাঁটতে লাগলাম। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) পিছনে ফিরে আমাকে দেখে বললেন, কে ওখানে? আমি বললাম, আবু যর, আল্লাহ আপনার জন্য আমাকে কোরবান করুক। তিনি বললেন, আবু যর এসো। আমি তাঁর সাথে কিছুক্ষণ চললাম, তিনি বললেন, ধনীরাই প্রকৃতপক্ষে ক্বিয়ামতের দিন দরিদ্র। তবে যে ব্যক্তিকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন, সে তা (সৎপথে) ডানে, বামে, সামনে, পিছনে খরচ করবে এবং ভাল কাজে ব্যয় করবে। (আবু যর বলেন) আমি আরও কিছুক্ষণ তাঁর সাথে চললে তিনি বললেন, এখানে বসো। এই বলে আমাকে চারদিকে পাহাড় ঘেরা ময়দানে বসিয়ে বললেন, আমি না আসা পর্যন্ত এখানে বসে থাক। (আবু যর বলেন) তিনি পাথুরে প্রান্তরের দিকে চলে গেলেন, এমনকি আমার দৃষ্টির অন্তরালে চলে গেলেন। অতঃপর দীর্ঘক্ষণ পরে আমি তাঁকে বলতে শুনলাম যে, 'যদি সে চুরি করে এবং যেনা করে! অতঃপর যখন তিনি এলেন, তখন আমার ধৈর্যচ্যুতি ঘটল, আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! আপনার জন্য আল্লাহ আমার জীবনকে কোরবান করুন! আপনি ওখানে কার সাথে কথা বলছিলেন? কাউকে তো আপনার কথার প্রতি উত্তর করতে শুনলাম না। তিনি বললেন, সে তো ছিল জিবরাঈল! ময়দানের প্রান্তেই আমার কাছে এসে বলল, 'আপনার উম্মতকে সুসংবাদ দিন, যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সাথে কাউকে শরীক না করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে'। (রাসূলুল্লাহ বলেন) আমি জিজ্ঞেস করলাম, যদি সে যেনা করে এবং চুরি করে? সে বলল, যদিও সে যেনা করে এবং চুরি করে। আমি (পুনরায়) বললাম, যদি সে যেনা করে এবং চুরি করে? সে বলল, যদি সে যেনা করে এবং চুরি করে। আমি (আবারও) বললাম, যদি সে যেনা করে এবং চুরি করে? সে বলল, যদি সে যেনা করে এবং চুরি করে, আর যদি শারাবও পান করে। আবু দারদা থেকে বর্ণিত রেওয়ায়েতে (একথাও) আছে যে, যদি সে মৃত্যুকালে 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে (বুখারী হা/৬০৭৮ ‘ধনীরাই মূলত দরীদ্র' পরিচ্ছেদ, ‘রিক্বাক’ অধ্যায়)।
উপরোল্লেখিত আয়াত ও হাদীছ হ'তে বোঝা যায় আল্লাহ্র সঙ্গে শিরক করা জঘন্যতম অপরাধ। বিষয়টিকে যদি সাধারণ অর্থেই ব্যাখ্যা করা যায়, তবে এর অর্থ দাঁড়াবে কারো নিজস্ব বস্তু বা সম্পদ অন্য লোকে জবর দখল করে নেওয়া বা ঐ বস্তুতে কিছু ভাগ বসান বুঝায়। পৃথিবীতে এরূপ ঘটনার কোন অভাব নেই। এমনকি পবিত্র কুরআনেও এরূপ নযীর এসেছে এবং গত অধ্যায়েই তা আলোচনা করেছি। সেটি হ'ল বিবাদমান দু'ব্যক্তি, একজন নিরানব্বইটি দুম্বার মালিক এবং অপরজন একটি দুম্বার মালিক। নিরানব্বই দুম্বার মালিক একটি দুম্বার মালিকের কাছে তার দুম্বাটি নেওয়ার জন্য বল প্রয়োগ করে কথা বলত। অতঃপর তারা বিচারের জন্য দাঊদ (আঃ)-এর নিকট উভয়ে গমন করে। পৃথিবীতে এ ধরনের অনধিকার চর্চা নিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য ঝগড়া-বিবাদ ও রক্তপাত ঘটছে।
সুতরাং বিশ্বজগতের তথা নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল ও জানা-অজানা অসংখ্য জগতের যিনি একক অধিপতি বা বাদশাহ, যেখানে কারও সূচাগ্র পরিমাণ অধিকার নেই, সমগ্র সৃষ্টি তাঁর পবিত্রতা, মহিমা, গরিমা ঘোষণা করে, সবাই তাঁর কাছে প্রার্থী ও ক্ষমাপ্রার্থী, শুধু সামান্য সংখ্যক মানুষ তাঁর এ অধিকারে হস্তক্ষেপ করবে, এটা অমার্জনীয় অপরাধ। শুধু এরাই আল্লাহ্ কাছে ক্ষমা পাবে না। এদেরকে ভয়াবহ জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত করবেনই। আল্লাহ বলেন,
إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ،
'নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সাথে অংশীদার স্থির করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার বাসস্থান জাহান্নাম' (মায়েদাহ ৫/৭২)।
একই মর্মার্থে অন্যত্র প্রত্যাদেশ এসেছে, 'নবী ও মুমিনদের উচিত নয় অংশীবাদীদের জন্য মাগফেরাত কামনা করা, যদিও তারা আত্মীয় হোক, একথা সুস্পষ্ট হওয়ার পর যে তারা জাহান্নামী' (তওবা ৯/১১৩)।
অংশীবাদীদের পরিণতির অপর এক বর্ণনায় সর্বজ্ঞ আল্লাহ বলেন, 'অমোঘ প্রতিশ্রুত সময় নিকটবর্তী হ'লে কাফেরদের চক্ষু উচ্চে স্থির হয়ে যাবে, হায় আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা এ বিষয়ে বেখবর ছিলাম, বরং আমরা গোনাহগারই ছিলাম। তোমরা এবং আল্লাহ্র পরিবর্তে তোমরা যাদের পূজা কর, সেগুলো জাহান্নামের ইন্ধন। তোমরাই তাতে প্রবেশ করবে। এই মূর্তিরা যদি উপাস্য হ'ত, তবে জাহান্নামে প্রবেশ করত না। প্রত্যেকেই তাতে চিরস্থায়ী হয়ে পড়ে থাকবে। তারা সেখানে চীৎকার করবে এবং সেখানে তারা কিছুই শুনতে পাবে না' (আম্বিয়া ২১/৯৭-১০০)।
তিনি আরো বলেন, 'যখন যালেমরা আযাব প্রত্যক্ষ করবে, তখন তাদের থেকে তা লঘু করা হবে না এবং তাদেরকে কোন অবকাশ দেয়া হবে না। অংশীবাদীরা যখন ঐসব বস্তুকে দেখবে, যেসবকে তারা আল্লাহ্র সাথে শরীক সাব্যস্ত করেছিল, তখন বলবে, হে আমাদের পালনকর্তা! এরাই তারা যারা আমাদের শিরকীর উপাদান, আপনাকে ছেড়ে যাদেরকে আমরা ডাকতাম। তখন ওরা তাদেরকে বলবে, তোমরা মিথ্যাবাদী। সেদিন তারা আল্লাহ্র সামনে আত্মসমর্পণ করবে এবং তারা যে মিথ্যা অপবাদ দিত তা বিস্মৃত হবে। যারা কাফের হয়েছে এবং আল্লাহ্র পথে বাধা সৃষ্টি করেছে, আমি তাদেরকে আযাবের পর আযাব বাড়িয়ে দেব। কারণ তারা অশান্তি সৃষ্টি করত' (নাহ'ল ১৬/৮৫-৮৮)।
আল্লাহ আরও বলেন, 'তারা ক্বিয়ামতকে অস্বীকার করে এবং যে ক্বিয়ামতকে অস্বীকার করে, আমি তার জন্য অগ্নি প্রস্তুত করেছি। অগ্নি যখন দূর থেকে তাদেরকে দেখবে, তখন তারা শুনতে পাবে তার গর্জন ও হুঙ্কার। যখন এক শিকলে কয়েকজন বাঁধা অবস্থায় জাহান্নামের কোন সংকীর্ণ স্থানে নিক্ষেপ করা হবে, তখন সেখানে তারা মৃত্যুকে ডাকবে। বলা হবে, আজ তোমরা এক মৃত্যুকে ডেকো না অনেক মৃত্যুকে ডাক। বলুন, এটা উত্তম, না চিরকাল বসবাসের জান্নাত, যার সুসংবাদ দেয়া হয়েছে মুত্তাকীদেরকে? সেটা হবে তাদের প্রতিদান ও প্রত্যাবর্তন স্থান, তারা চিরকাল বসবাসরত অবস্থায় সেখানে যা চাইবে, তাই পাবে। এই प्रार्थীত ওয়াদা পূরণ আপনার পালনকর্তার দায়িত্ব। সেদিন আল্লাহ একত্রিত করবেন তাদেরকে এবং তারা আল্লাহ্র পরিবর্তে যাদের ইবাদত করত তাদেরকে, সেদিন তিনি উপাস্যদেরকে বলবেন, তোমরাই কি আমার এই বান্দাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিলে, না তারা নিজেরাই পথভ্রষ্ট হয়েছিল? তারা বলবে, আপনি পবিত্র আমরা আপনার পরিবর্তে অন্যকে মুরুব্বীরূপে গ্রহণ করতে পারতাম না, কিন্তু আপনিই তো তাদেরকে এবং তাদের পিতৃপুরুষদেরকে ভোগসম্ভার দিয়েছিলেন। ফলে তারা আপনার স্মৃতি বিস্তৃত হয়েছিল এবং তারা ছিল ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতি। আল্লাহ মুশরিকদেরকে বলবেন, তোমাদের কথা তো তারা মিথ্যা সাব্যস্ত করল, এখন তোমরা শাস্তি প্রতিরোধ করতে পারবে না এবং সাহায্যও করতে পারবে না। তোমাদের মধ্যে যে গোনাহগার আমি তাকে গুরুতর শাস্তি আস্বাদন করাব' (ফুরক্বান ২৫/১১-১৯)।
অংশীবাদীদের আয়াতগুলিতে আল্লাহ্ সীমাহীন অসন্তুষ্টি প্রকাশ পেয়েছে, 'ওরা প্রত্যেকেই কি মাথার উপর স্ব স্ব কৃতকর্ম নিয়ে দণ্ডায়মান নয়? এবং তারা আল্লাহ্ জন্য অংশীদার সাব্যস্ত করে। বলুন, নাম বল অথবা খবর দাও পৃথিবীর এমন কিছু জিনিস সম্পর্কে যা তিনি জানেন না অথবা অসার কথাবার্তা বলছ? বরং সুশোভিত করা হয়েছে কাফেরদের জন্য তাদের প্রতারণাকে এবং তাদেরকে সৎপথ থেকে বাধাদান করা হয়েছে। আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তার কোন পথপ্রদর্শক নেই। দুনিয়ার জীবনেই এদের জন্য রয়েছে আযাব এবং অবশ্য আখেরাতের জীবন কঠোরতম। আল্লাহ্র কবল থেকে তাদের কোন রক্ষাকারী নেই' (রা'দ ১৩/৩৩, ৩৪)।
এ আলোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, শুধু আল্লাহ্র সাথে অংশীদার স্থাপনকারী দল ছাড়া অন্যান্য পাপী, অপরাধী এমনকি বড় বড় গোনাহগাররাও শেষ পর্যন্ত ক্ষমা পেয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে যেসব বিশ্বাসের কথা বলা হয়েছে, সেরূপ কোন বিশ্বাস সৃষ্ট কোন বস্তুর প্রতি পোষণ করাই হ'ল শিরক। শিরকের তাৎপর্য বা রহস্য হচ্ছে আল্লাহ ব্যতীত কোন সৃষ্ট বস্তুকে ইবাদত কিংবা মুহাব্বত কিংবা সম্মান প্রদর্শন বা তার মহিমা-গরিমা ও প্রশংসায় আল্লাহ্র সমতুল্য মনে করা। এসব শরীক স্থাপনকারীদেরকে আল্লাহ কখনও ক্ষমা করবেন না।
কতিপয় কৃত্রিম ঈমানদার হয়ত শিরক করে বা করে না, গোনাহ করে অতঃপর تওবা করে। আবার পৃথিবীর মোহে, প্রবৃত্তির তাড়নায়, আন্তরিক ভীতির অভাবে, পরিবেশের চাপে তওবার কথা ভুলে গিয়ে অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়ে। অতঃপর কিছুকাল পর পুনরায় তওবা করে এবং অনির্দিষ্টকাল পর পথভ্রষ্ট হয় এবং আবার তওবা করে। এভাবে বার বার কৃত্রিম তওবার মাধ্যমে আল্লাহ্র সাথে প্রহসন করে। এরূপ ব্যক্তির তওবা কখনও কবুল হবে না। এদের অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, 'আর এমন লোকদের জন্য কোন ক্ষমা নেই, যারা মন্দ কাজ করতেই থাকে, এমনকি যখন তাদের কারো মাথার উপর মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন বলতে থাকে, আমি এখন তওবা করছি। আর তওবা নেই তাদের জন্য, যারা কুফরী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। আমি তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি' (নিসা ৪/১৮)।
অন্য আয়াতে বর্ণিত হয়েছে এভাবে, 'যারা একবার মুসলমান হয়ে পুনরায় কাফের হয়ে গেছে, আবার মুসলমান হয়েছে এবং আবারও কাফের হয়েছে এবং কুফরীতেই উন্নতি লাভ করেছে, আল্লাহ তাদেরকে না ক্ষমা করবেন, না পথ দেখাবেন' (নিসা ৪/১৩৭)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, 'যারা কুফরী অবলম্বন করেছে এবং আল্লাহ্র পথে বাধা সৃষ্টি করেছে, তারা সুদূর ভ্রান্তি তে পতিত হয়েছে। যারা কুফরী অবলম্বন করেছে এবং সত্য চাপা দিয়ে রেখেছে, আল্লাহ কখনও তাদেরকে ক্ষমা করবেন না এবং সরলপথ দেখাবেন না' (নিসা ৪/১৬৭, ১৬৮)।
মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেন, 'নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের রাজত্ব আল্লাহ্ই যেদিন ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন মিথ্যাপন্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আপনি প্রত্যেক উম্মতকে দেখবেন নতজানু অবস্থায়। প্রত্যেক উম্মতকে তাদের আমলনামা দেখতে বলা হবে। তোমরা যা করতে, অদ্য তোমাদেরকে তার প্রতিফল দেয়া হবে। আমার কাছে রক্ষিত এই আমলনামা তোমাদের সম্পর্কে সত্য কথা বলবে। তোমরা যা করতে, আমি তা লিপিবদ্ধ করতাম। যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং সৎকর্ম করেছে, তাদেরকে তাদের পালনকর্তা স্বীয় রহমতে দাখিল করবেন। এটাই প্রকাশ্য সাফল্য। আর যারা কুফরী করেছে, তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে, তোমাদের কাছে কি আয়াতসমূহ পঠিত হ'ত না? কিন্তু তোমরা অহংকার করেছিলে এবং তোমরা ছিলে এক অপরাধী সম্প্রদায়। যখন বলা হ'ত, আল্লাহ্র ওয়াদা সত্য এবং ক্বিয়ামতে কোন সন্দেহ নেই, তখন তোমরা বলতে আমরা জানি না কিয়ামত কি? আমরা কেবল ধারণাই করি এবং এ বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই। তাদের মন্দ কর্মগুলো তাদের সামনে প্রকাশ হয়ে পড়বে এবং যে আযাব নিয়ে তারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত, তা তাদেরকে গ্রাস করবে। বলা হবে, আজ আমি তোমাদেরকে ভুলে যাব, যেমন তোমরা এদিনের সাক্ষাৎকে ভুলে গিয়েছিলে। তোমাদের আবাসস্থল জাহান্নাম এবং তোমাদের সাহায্যকারী নেই। এটা এজন্য যে তোমরা আল্লাহ্ আয়াত সমূহকে ঠাট্টা রূপে গ্রহণ করেছিলে এবং পার্থিব জীবন তোমাদেরকে প্রতারিত করেছিল। সুতরাং আজ তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে না এবং তাদের কাছে তওবা চাওয়া হবে না' (জাছিয়া ৪৫/২৭-৩৫)।
ইতিমধ্যে ক্ষমা প্রার্থনার আয়াতগুলোতে আমরা দেখেছি, আল্লাহ ক্ষমাপ্রার্থীকে ভালবাসেন। তিনি অন্তর্যামী, কাজেই কোন অকৃত্রিম ক্ষমাপ্রার্থীকে ফিরিয়ে দেন না। কৃত্রিম ধর্মপালন বা ক্ষমা প্রার্থনা মিথ্যার নামান্তর ছাড়া কিছুই নয়। কাজেই অন্তর্যামী আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা প্রার্থনায় অকৃত্রিম বা আন্তরিক ক্ষমাপ্রার্থনার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। অবশ্য আলোচ্য অধ্যায়ে যাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না, তাদেরকে নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তারা প্রকাশ্যভাবেই আল্লাহ্র পরিবর্তে অন্য জীব ও জড়বস্তুর ইবাদত করে এবং তাদের (উপাস্যদের) নিকট নিজেদের কাংখিত মনস্কামনা পূরণের আবেদন বা প্রার্থনা করে এবং তাদের উদ্দেশ্যে কুরবানীও করে। আবার অনেকে গোপনভাবে বা তাদের কাজের মাঝে আল্লাহ্র পরিবর্তে অন্যকে প্রাধান্য দেয় বা মান্য করে। এসব স্পর্শকাতর আলোচনার বিশদ ব্যাখ্যা দান খুবই কঠিন। তবে সবার জন্য মনে রাখা দরকার যে আন্তরিক স্বচ্ছতার কাছে শিরক-এর কোন জীবাণু প্রবেশ করা অসম্ভব। যারা নিজেদের অন্তর বা হৃদয়কে অহেতুক ঐসব (শিরক-এর) চিন্তার সুযোগ দিবে তারাই নিরাপদ থাকতে পারবে কি-না সন্দেহ। আল্লাহ পাক তাঁর সব বান্দাকে শিরকের অভিশাপ হ'তে মুক্ত রাখুন।
📄 অনন্য ক্ষমার সুযোগ
মানুষ মহাপরাক্রমশালী মহাজ্ঞানবান আল্লাহ্র কত প্রিয় সৃষ্টি এবং তার প্রতি তিনি কিরূপ ক্ষমাশীল তা সে নিজেই জানে না। অবশ্য ফেরেশতামণ্ডলী ও ইবলীস ভালভাবেই জানে। মানব সৃষ্টির সূচনা পর্বে এক মহৎ উদ্দেশ্য সাধনে আল্লাহ্র দরবারে ইবলীস মর্যাদার লড়াইয়ে তার প্রতিদ্বন্দী মানব জাতির নিকট পরাজয় বরণ করে। অতঃপর তার প্রতিপক্ষের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে (ইবলীস) তার বিরুদ্ধে সবিনয়ে অভিযোগ পেশ করে মহান পালনকর্তার সমীপে। মহাজ্ঞানী আল্লাহ তা'আলা ইবলীসকে কিছু কূট-কৌশল মানব জাতির উপর প্রয়োগ করার ক্ষমতা প্রদান করেন। ফলে সহজ-সরল, সত্যবাদী মানব চরিত্রের অধিকারী আদম (আঃ) ইবলীসের প্রথম আক্রমণেই বিব্রত হয়ে ভুল করে ফেলেন এবং মহান আল্লাহ্র নিকট বিনীত ও ক্রন্দনরত অবস্থায় ক্ষমাপ্রার্থী হন। মহা ক্ষমাশীল আল্লাহ তা'আলা আদম (আঃ)-কে ক্ষমা করে দেন এবং মূল্যবান উপদেশ দিয়ে পৃথিবীতে নির্বাসন দেন।
মূলতঃ ইবাদত হ'ল মানব জাতির জন্য এ নশ্বর পৃথিবীর সাময়িক কালের বাধ্যবাধকতা। আর পৃথিবী হ'ল পরীক্ষার মূল কেন্দ্র। অতঃপর ক্বিয়ামত হবে ফলাফল প্রকাশ বা মূল্যায়ন দিবস। কিন্তু এর মূল্যায়ন হবে অবিনশ্বর পরকালের অনন্ত ও অসীম পারাবার জান্নাত ও জাহান্নাম। মহান স্রষ্টা তাঁর প্রিয় মানুষকে স্বীয় সান্নিধ্যে রাখার প্রয়াসে বিপুল উপদেশ ভাণ্ডার কুরআন প্রেরণ করেন। কুরআন আল্লাহ্র মনোনীত একটি ধর্মগ্রন্থ এবং মানব জাতির জন্য প্রচারমূলক ও গ্রহণযোগ্য উপদেশমালা। এসব উপদেশ উচ্চারিত হয়েছে অথবা ঘোষিত হয়েছে সেই সব মানুষের জন্য যারা সত্য, সুন্দর, সহজ-সরল ও শান্তিপ্রিয় জীবনে বিশ্বাসী। তবুও সমগ্র বিশ্ববাসীর জ্ঞান-গরিমা, বিবেক-বিবেচনা, চিন্তা-গবেষণা ইত্যাদির উন্মেষ ঘটানোর প্রয়াসে পবিত্র কুরআন উন্মুক্ত রয়েছে বিশ্ব দরবারে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মাতৃভাষায় ভাষান্তরিত করা হয়েছে পবিত্র কুরআনকে। আমাদের মাতৃভাষা বাংলায়ও অনূদিত হয়েছে মহাপবিত্র ও মহাসম্মানিত আল্লাহ্ বাণী কুরআন। ফলে ক্ষমাশীল আল্লাহ্ ক্ষমার বিষয়গুলো সহজেই জানা সম্ভব হচ্ছে। একইভাবে বিশ্বের যেকোন দেশের যেকোন সম্প্রদায়ের চিন্তাশীল মানুষ ক্ষমাশীল আল্লাহ্ ক্ষমার ঘোষণায় আশ্বস্ত হয়ে তাঁর একক ধর্মের ছায়াতলে আশ্রয় নিচ্ছে। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার জন্য আল্লাহ্ ক্ষমার দরজা উন্মুক্ত রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,
إِنَّمَا تُنْذِرُ مَنِ اتَّبَعَ الذِّكْرَ وَحَشِيَ الرَّحْمَنَ بِالْغَيْبِ فَبَشِّرْهُ بِمَغْفِرَةٍ وَأَجْرٍ كَرِيمٍ
'আপনি কেবল তাদেরকে সতর্ক করতে পারেন, যারা উপদেশ অনুসরণ করে এবং দয়াময় আল্লাহকে না দেখে ভয় করে। অতএব আপনি তাদেরকে সুসংবাদ দিয়ে দিন ক্ষমা ও সম্মানজনক পুরস্কারের' (ইয়াসীন ৩৬/১১)।
অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ عَظِيمٌ وَالَّذِيْنَ كَفَرُوا وَكَذَّبُوا بِآيَاتِنَا أُوْلَئِكَ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ
'যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা ও মহা প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যারা অবিশ্বাস করে এবং আমার নিদর্শনাবলীকে মিথ্যা বলে, তারা জাহান্নামী' (মায়েদাহ ৫/৯, ১০)।
অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন, 'তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা এবং জান্নাতের দিকে ছুটে যাও যার সীমানা হচ্ছে আসমান ও যমীন, যা তৈরী করা হয়েছে পরহেযগারদের জন্য। যারা সচ্ছলতায় ও অভাবের সময় ব্যয় করে, যারা নিজেদের রাগকে সংবরণ করে আর মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে, বস্তুতঃ আল্লাহ সৎকর্মশীলদেরকেই ভালবাসেন। তারা কখনও কোন অশ্লীল কাজ করে ফেললে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ছাড়া কে পাপ ক্ষমা করবেন? তারা নিজের কৃতকর্মের জন্য হঠকারিতা প্রদর্শন করে না এবং জেনে শুনে তা-ই করতে থাকে না। তাদের জন্য প্রতিদান হ'ল তাদের পালনকর্তার ক্ষমা ও জান্নাত, যার তলদেশে প্রবাহিত হচ্ছে প্রস্রবন; সেখানে তারা থাকবে অনন্তকাল। যারা কাজ করে তাদের জন্য কতইনা চমৎকার প্রতিদান' (আলে ইমরান ৩/১৩৩-১৩৬)।
অতঃপর বিশৃংখলা সৃষ্টিকারীদের ব্যাপারে আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূল (ছাঃ)-কে প্রত্যাদেশ করেন, 'নিশ্চয়ই যারা স্বীয় ধর্মকে খণ্ড-বিখণ্ড করেছে এবং অনেক দল হয়ে গেছে, তাদের সাথে আপনার কোন সম্পর্ক নেই। তাদের ব্যাপার আল্লাহ তা'আলার নিকট সমর্পিত। অতঃপর তিনি বলে দেবেন যা কিছু তারা করে থাকে। যে একটি সৎকর্ম করবে, সে তার দশগুণ পাবে এবং যে একটি মন্দ কাজ করবে, সে তার সমান শাস্তিই পাবে। বস্তুতঃ তাদের প্রতি যুলুম করা হবে না। আপনি বলে দিন, আমার প্রতিপালক আমাকে সরল পথ প্রদর্শন করেছেন, একাগ্রচিত্ত ইবরাহীমের বিশুদ্ধ ধর্ম। তিনি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। আপনি বলুন, আমার ছালাত, আমার কুরবানী এবং আমার জীবন ও মরণ বিশ্ব-প্রতিপালক আল্লাহ্রই জন্য। তাঁর কোন অংশীদার নেই। আমি তাই আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম আনুগত্যশীল। আপনি বলুন, আমি কি আল্লাহ ব্যতীত অন্য প্রতিপালক খুঁজব। অথচ তিনি সবকিছুর প্রতিপালক? যে ব্যক্তি কোন গোনাহ করে, তা তার দায়িত্বে থাকে। কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না। অতঃপর তোমাদের সবাইকে প্রতিপালকের কাছে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। অনন্তর তিনি তোমাদেরকে বলে দিবেন, যেসব বিষয়ে তোমরা বিরোধ করতে। তিনিই তোমাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছেন এবং একে অন্যের উপর মর্যাদা সমুন্নত করেছেন। যাতে তোমাদেরকে এ বিষয়ে পরীক্ষা করেন, যা তোমাদেরকে দিয়েছেন। আপনার প্রতিপালক দ্রুত শাস্তিদাতা এবং তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, দয়ালু' (আন'আম ৬/১৫৯-১৬৫)।
আল্লাহ্র দয়া, ক্ষমা ও অনুগ্রহ সীমাহীন। তিনি তাঁর বান্দাদেরকে বিভিন্নভাবে সেই ক্ষমার দিকে আহ্বান জানিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন, 'সেদিন অর্থাৎ সমাবেশের দিন আল্লাহ তোমাদেরকে সমবেত করবেন। এদিন হার-জিতের দিন। যে ব্যক্তি আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে, আল্লাহ তাঁর পাপসমূহ মোচন করবেন এবং তাকে জান্নাতে দাখিল করবেন। যার তলদেশে নির্ঝরিণী সমূহ প্রবাহিত হবে, তারা তথায় চিরকাল বসবাস করবে। এটাই মহাসাফল্য। আর যারা কাফের এবং আমার আয়াত সমূহকে মিথ্যা বলে তারাই জাহান্নামের অধিবাসী, তারা তথায় অনন্তকাল থাকবে। কতই না মন্দ প্রত্যাবর্তনস্থল এটা। আল্লাহ্র নির্দেশ ব্যতিরেকে কোন বিপদ আসে না এবং যে আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস করে, তিনি তার অন্তরকে সৎপথ প্রদর্শন করেন। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সম্যক পরিজ্ঞাত। তোমরা আল্লাহ্র আনুগত্য কর এবং রাসূলুল্লাহ্ আনুগত্য কর। যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে আমার রাসূলের দায়িত্ব কেবল খোলাখুলি পৌঁছে দেয়া। আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোন মা'বৃদ নেই। অতএব মুমিনগণ আল্লাহ্র উপর ভরসা করুক। হে মুমিনগণ! তোমাদের কোন কোন স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের দুশমন। অতএব তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাক। যদি মার্জনা কর, উপেক্ষা কর এবং ক্ষমা কর তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়। তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো কেবল পরীক্ষা স্বরূপ। আর আল্লাহ্র কাছে রয়েছে মহাপুরস্কার। অতএব তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় কর। শুন, আনুগত্য কর এবং ব্যয় কর। এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম। যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান কর, তিনি তোমাদের জন্য তা দ্বিগুণ করে দেবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আল্লাহ গুণগ্রাহী। তিনি দৃশ্য ও অদৃশ্যের জ্ঞানী পরাক্রান্ত প্রজ্ঞাময়' (তাগাবুন ৬৪/৯-১৮)।
উপরোল্লেখিত আয়াতগুলিতে যারা আল্লাহকে না দেখে ভয় করে তাদেরকে ক্ষমার সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কথা হ'ল, যারা আল্লাহকে ভয় করে, তারা সবাই তাঁকে না দেখেই ভয় করে। আসলে এ রহস্যপূর্ণ কথাটি প্রকৃত আল্লাহভীরুদের এবং যাদেরকে তিনি ক্ষমা করবেন তাদের জন্য প্রযোজ্য। একইভাবে অন্য আয়াতে এসেছে যারা বিশ্বাস করে এবং সৎকর্ম করে আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা ও পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যারা কোন অশ্লীল বা খারাপ কাজ করার পর অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দেন বা দেবেন। বান্দার অবগতির প্রয়াসে আর এক প্রত্যাদেশে আল্লাহ তা'আলা বলেন, ক্বিয়ামতের দিন সকলকে একত্রিত করা হবে এবং এখানেও বলেন, যে বিশ্বাস স্থাপন করেও সৎকর্ম সম্পাদন করে, তিনি তার পাপ সমূহ মোচন করে দেবেন এবং তাকে জান্নাতে দাখিল করবেন।
আরও বলা হয়েছে, মানুষের কোন বিপদ আসলে তা আল্লাহ্র নির্দেশেই ও ভাগ্যের লিখনেই আসে, যারা এই বিশ্বাস নিয়ে অবিচল থাকে আল্লাহ তাকে সৎপথে চালিত করেন এবং ক্ষমাও করেন। পক্ষান্তরে কেউ আল্লাহ্ উপর আস্থা বা বিশ্বাস হারিয়ে ফেললে পথভ্রষ্ট হয়ে যায় এবং তাঁর ক্ষমা হ'তেও বঞ্চিত হয়। পৃথিবীতে সংসার জীবনের উল্লেখ করতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, মানুষের এবং মুমিনদেরও কোন কোন স্ত্রী ও পুত্র তাদের শত্রুর তুল্য হ'তে পারে, এখানে তাদেরকে সহনশীল হওয়ার কথা বলেছেন। আর তাদের এ পথ অবলম্বন করাই উত্তম। শেষোক্ত আয়াতে দানের কথা বলা হয়েছে। মানুষকে দুনিয়ার জীবনে আল্লাহ্র পথে অকাতরে দান খয়রাত করার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং এই দানকে আল্লাহ ঋণ গ্রহণের সঙ্গে তুলনা করেছেন। আল্লাহ তাঁর দীন-দরিদ্র, অসহায়, অনাহারক্লিষ্ট, আশ্রয়হীন, পঙ্গু, প্রতিবন্ধী বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত দয়াশীল, ক্ষমাশীল ও সহানুভূতিশীল। ধনী, সচ্ছল বা যেকোন উপযুক্ত বান্দার মতই এক ও অভিন্নভাবে তারাও আল্লাহ্র প্রিয় বান্দা। সুতরাং তাদের প্রতি যারা দয়া পরবশ হয়ে দান করে, আল্লাহ তার দানের বা পুণ্যের পরিমাণকে দ্বিগুণ করে দেন এবং তার পাপও ক্ষমা করে দেন। এভাবে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের কত প্রকারে ক্ষমা প্রদান করেন তা একমাত্র তিনিই জানেন। কাজেই আমাদের দৈনন্দিন জীবন যাপনে কেবল ইচ্ছাকৃত কোন ভুল, অন্যায় বা পাপের জন্য নয়, বরং অনিচ্ছাকৃত ছোট-বড় সকল অপরাধের জন্য আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা ও অনুগ্রহের আশা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
ইতিমধ্যে আমরা দান-খয়রাতের সামান্য আলোচনা করেছি। কিন্তু দান-খয়রাতও ইবাদতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কুরআনের বর্ণনায় পাওয়া যায় সেদিন সামর্থ্যবান অপরাধীরা জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হিসাবে বলবে, قَالُوْا لَمْ نَكُ مِنَ الْمُصَلِّينَ - وَلَمْ نَكُ نُطْعِمُ الْمِسْكِينَ, আমরা ছালাত পড়তাম না, অভাবগ্রস্তকে আহার্য দিতাম না' (মুদ্দাছছির ৭৪/৪৩-৪৪)।
অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ،وَيَتُوْبُ اللَّهُ عَلَى مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ عَلِيْمٌ حَكِيمٌ 'আল্লাহ যার প্রতি ইচ্ছা ক্ষমাশীল হবেন, আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়' (তওবা ৯/১৫)।
আল্লাহ আরো বলেন,
وَإِنَّ رَبَّكَ لَذُو مَغْفِرَةٍ لِّلنَّاسِ عَلَى ظُلْمِهِمْ وَإِنَّ رَبَّكَ لَشَدِيدُ الْعِقَابِ
'আপনার পালনকর্তা মানুষকে তাদের অন্যায় সত্ত্বেও ক্ষমা করেন এবং আপনার পালনকর্তা কঠিন শাস্তিদাতাও বটে' (রা'দ ১৩/৬)।
মহান আল্লাহ আরও বলেন, وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعَظِّمْ لَهُ أَجْراً، 'যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার পাপ মোচন করেন এবং তাকে মহাপুরস্কার দেন' (তালাক্ব ৬৫/৫)।
পবিত্র কুরআনে শত শত আয়াতে ক্ষমা, দয়া ও অনুগ্রহের বিষয়ে বর্ণিত হয়েছে। এগুলির মধ্যে এমন কিছু রয়েছে যা সহজেই বোঝা যায়। কিছু কিছু কোনভাবে অনুভব করা যায়। আর একটা অংশ অনুধাবন করা মোটেও সম্ভব হয় না। যেমন উপরের আয়াতগুলিতে বলা হয়েছে (১) আল্লাহ যার প্রতি ইচ্ছা ক্ষমাশীল হবেন, (২) মানুষকে তাদের অন্যায় সত্ত্বেও আল্লাহ ক্ষমা করেন, (৩) যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার পাপ ক্ষমা করে দেন। উল্লেখিত তিনটি বাক্যের যেকোনটির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ব্যাপক। কিন্তু প্রজ্ঞাময় আল্লাহ তা'আলা উক্ত ব্যাখ্যায় তাঁর সন্তুষ্টির দিকগুলিই গ্রহণ করবেন। অসন্তুষ্টির বিষয় তিনি মোটেও দৃকপাত করবেন না বা প্রত্যাখ্যান করবেন। উদাহরণতঃ আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবীব মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে প্রত্যাদেশ করেন, 'আপনি কাফেরদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য ভীত-সন্ত্রস্ত দেখবেন। তাদের কর্মের শাস্তি অবশ্যই তাদের উপর আপতিত হবে। আর যারা মুমিন ও সৎকর্মী, তারা জান্নাতের উদ্যানে থাকবে। তারা যা চাইবে, তা-ই তাদের জন্য তাদের পালনকর্তার কাছে রয়েছে। এটাই বড় পুরস্কার। এরই সুসংবাদ দেন আল্লাহ সেসব বান্দাকে, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে। বলুন, আমি আমার দাওয়াতের জন্য তোমাদের কাছে কেবল আত্মীয়তাজনিত সৌহার্দ্য চাই। যে কেউ উত্তম কাজ করে, আমি তার জন্য তাতে পুণ্য বাড়িয়ে দেই। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাকারী, গুণগ্রাহী (শূরা ৪২/২২, ২৩)।
অন্য এক আয়াতে আল্লাহ বলেন, 'তিনি তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করেন, পাপ সমূহ মার্জনা করেন এবং তোমাদের কৃত বিষয় সম্পর্কে অবগত রয়েছেন। তিনি মুমিন ও সৎকর্মীদের দো'আ শোনেন এবং তাদের প্রতি স্বীয় অনুগ্রহ বাড়িয়ে দেন। আর কাফেরদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি' (শূরা ৪২/২৫, ২৬)।
ক্ষমার তাৎপর্যের আরও এক বর্ণনায় মহান আল্লাহ বলেন, 'কাফেররা বলবে, হে আমাদের পালনকর্তা! যেসব জিন ও মানুষ আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল, তাদেরকে দেখিয়ে দিন, আমরা তাদেরকে পদদলিত করব, যাতে তারা যথেষ্ট অপমানিত হয়। নিশ্চয়ই যারা বলে আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ, অতঃপর তাতেই অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে তোমরা ভয় কর না, চিন্তা কর না এবং তোমাদের প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ শোন। ইহকালে ও পরকালে আমরা তোমাদের বন্ধু। সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমাদের মন চায়। এটা ক্ষমাশীল করুণাময়ের পক্ষ থেকে সাদর আপ্যায়ন' (হা-মীম-সিজদাহ ৪১/২৯-৩২)।
মহাক্ষমাশীল আল্লাহ্র আদেশ, উপদেশ, দয়া, ক্ষমা, রহমত, অনুগ্রহ প্রভৃতি অসামান্য গুণাবলী সর্বজনবিদিত এবং পবিত্র কুরআন ও হাদীছের মধ্যে তা সীমাবদ্ধ বলা যায়। তাঁর পক্ষ থেকে কোন নবী-রাসূল বা প্রিয়জনের নিকট কোন গোপন আদেশ উপদেশের প্রমাণ নেই। তিনি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এবং তাঁর নিকট অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সকল মানুষ সমান ভালবাসার পাত্র এবং সকলের প্রতি তিনি সমানভাবে ক্ষমাশীল। শুধু কর্মের কারণে পার্থক্য নিরূপিত হয় এবং আগামীতেও হবে। যেহেতু তিনি বহু সদুপদেশ দ্বারা মানুষকে সৎ পথে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তাকে পুনঃ পুনঃ ক্ষমার ঘোষণা দিয়েছেন। সুতরাং মানুষকে অনুরূপ প্রতিদান হিসাবে আল্লাহকে সর্বাধিক স্মরণ ও ভালবাসার প্রমাণ স্বরূপ কাজ করতে হবে।
আমাদের পার্থিব জীবনের সময় খুব স্বল্প এবং মৃত্যুর পরবর্তী পরকালীন জীবন অত্যন্ত সুদীর্ঘ বা কল্পনাতীত। এ স্বল্প সময়ের কাজের বিভিন্ন পর্যায়ে আল্লাহ মানুষকে তাঁর দয়া ও ক্ষমার পুনঃ পুনঃ আশ্বাস দিয়েছেন এবং আশ্বাসগুলির মধ্যে এত ভালবাসা গভীরতা ও প্রেমের বন্ধন রয়েছে যা প্রতিটি বান্দার উপলব্ধি করা উচিত। যারা বোঝে এবং যারা বোঝে না উভয়েরই এ বিষয়ে সচেতন হওয়া যরূরী। অসচেতনতা কারো জন্য মোটেও কাম্য নয়।
📄 কৃতজ্ঞতা ও ক্ষমা
আমাদের দৃষ্টিসীমা ও জ্ঞানসীমার মধ্যে অবস্থিত দৃশ্য ও অদৃশ্য বস্তুসমূহের সমন্বয়ে গঠিত পরিবেশ নিয়েই গড়ে উঠেছে আমাদের জীবন। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, যোগাযোগ, কর্মস্থল প্রভৃতি দৃশ্য বস্তুগুলির সঙ্গে আলো, অন্ধকার, বায়ু, তাপ, ঠাণ্ডা, শব্দ প্রভৃতি অদৃশ্য বস্তুগুলি নিবিড়ভাবে মিশে আছে। ধর্মীয় জীবন-যাপনে ছালাত, ছিয়াম, হজ্জ, যাকাত, কুরবানী, কুরআন পাঠ, দান-খয়রাত, সালাম আদান-প্রদান প্রভৃতি দৃশ্য ইবাদত ও কর্মগুলির সঙ্গে বিশ্বাস, অবিশ্বাস, দয়া, ক্ষমা, রহমত, হিংসা-বিদ্বেষ, অহংকার, কৃতজ্ঞ-অকৃতজ্ঞ প্রভৃতি অদৃশ্য ইবাদত ও কর্মগুলি পরস্পর অঙ্গাঙ্গিভাবে মিশে আছে। এগুলিকে পৃথকীকরণ করার কোন ক্ষমতা মানুষের নেই। আবার সঠিকভাবে চিহ্নিত করারও ক্ষমতা নেই।
ক্ষমা ও কৃতজ্ঞতা দু'টি পৃথক গুরুত্বপূর্ণ অদৃশ্য বস্তু এবং দু'টিই আমাদের ধর্মীয় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আল্লাহ ক্ষমাশীল পবিত্র কুরআনের এই অভাবনীয় সুসংবাদ হ'তেই মানুষ তাঁর নিকট বিভিন্নভাবে ক্ষমাপ্রার্থনা করে, তওবা করে, মন্দ কাজ না করার প্রতিশ্রুতি দেয়, নিজের পিতা-মাতা, পরিবারবর্গ, আত্মীয়-স্বজন, সকল ঈমানদার মুমিন ও মুসলমানদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। অবশ্য আল্লাহ্র নিকট প্রত্যেকেরই ক্ষমা প্রার্থনা করা অপরিহার্য কর্তব্য। কারণ স্বয়ং তিনিই তো ক্ষমা প্রার্থনার নির্দেশ দিয়েছেন, 'তোমরা ক্ষমা প্রার্থনা কর আল্লাহ্র কাছে, আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু' (৭৩-২০)। অন্যত্র সবার উদ্দেশ্যে তাঁর প্রিয় হাবীব (ছাঃ)-কে প্রত্যাদেশ করেন, 'বলুন, হে আমার প্রতিপালক! ক্ষমা করুন ও দয়া করুন, আপনি তো শ্রেষ্ঠ দয়ালু' (মুমিনূন ২৩/১১৮)।
আল্লাহ তা'আলা উপরের আয়াতদ্বয় দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে মানুষকে ক্ষমা প্রার্থনার নির্দেশ দিয়েছেন। অনুরূপ আরও বহু আয়াতে ক্ষমা প্রার্থনার নির্দেশ রয়েছে। আবার পরোক্ষভাবেও ক্ষমা প্রার্থনার বহু সুসংবাদ বিদ্যমান। মহান আল্লাহ বলেন, 'যারা না দেখে তাদের প্রতিপালককে ভয় করে তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার' (মুলক ৬৭/১২)। অন্য আয়াতে তিনি বলেন, 'আকাশ ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব আল্লাহ্রই তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন, যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন। তিনি ক্ষমাশীল পরম দয়ালু' (ফাতাহ ৪৮/১৪)।
মানুষ একান্তভাবেই আল্লাহ্ প্রিয় সৃষ্টি ও শ্রেষ্ঠ হিসাবে, ঘোষিত ও স্বীকৃত। কিন্তু তাঁর অসংখ্য সৃষ্টির মধ্যে আমাদের জানা মতে ফেরেশতার গুরুত্বও অনস্বীকার্য। ফেরেশতারা আল্লাহ্র শ্রেষ্ঠ বার্তাবাহক, আজ্ঞাবহ, অনুগত, প্রশংসা ও তাসবীহ পাঠসহ আদেশ পালনে সদা প্রস্তুত। এখানে শয়তানের কোন ঠাঁই নেই। তারা জানে আল্লাহ তাঁর বিশ্বস্ত ও মুমিন বান্দাদের ভালবাসেন এবং তাদের প্রতি ক্ষমাশীল, করুণাময়। সুতরাং ফেরেশতারাও আল্লাহ্ অনুমতিক্রমে এবং তাঁর সন্তুষ্টির প্রত্যাশায় মানুষকে ভালবাসে এবং তাদের প্রতি দয়াশীল ও কৃপাশীল হয়ে আল্লাহ্ নিকট মঙ্গল প্রার্থনা করে ও ক্ষমাপ্রার্থনা করে। পবিত্র কুরআনে এ বিষয়ে অনেক প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, 'যারা আরশ বহন করে এবং যারা তার চারপাশে আছে, তারা তাদের পালনকর্তার সপ্রশংস পবিত্রতা বর্ণনা করে, তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে বলে, হে আমাদের পালনকর্তা! আপনার রহমত ও জ্ঞান সবকিছুতে পরিব্যাপ্ত। অতএব যারা তওবা করে এবং আপনার পথে চলে, তাদেরকে ক্ষমা করুন এবং জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করুন। হে আমাদের পালনকর্তা! আর তাদেরকে দাখিল করুণ চিরকাল বসবাসের জান্নাতে, যার ওয়াদা আপনি তাদেরকে দিয়েছেন এবং তাদের বাপ-দাদা, পতি-পত্নী ও সন্তানদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করে তাদেরকে। নিশ্চয়ই আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় এবং আপনি তাদেরকে অমঙ্গল থেকে রক্ষা করুন। আপনি যাকে সেদিন অমঙ্গল থেকে রক্ষা করবেন, তার প্রতি অনুগ্রহই করবেন। এটাই মহা সাফল্য' (মুমিন ৪০/৭-৯)।
ফেরেশতাদের ক্ষমাপ্রার্থনা সম্পর্কিত অপর এক আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, 'হা-মীম, আইন, সীন, ক্বাফ। এমনিভাবে পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময় আল্লাহ আপনার প্রতি ও আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি অহি প্রেরণ করেন। নভোমণ্ডলে যা কিছু আছে এবং ভূমণ্ডলে যা কিছু আছে, সমস্তই তাঁর, তিনি সমুন্নত মহান। আকাশ উপর থেকে ফেটে পড়ার উপক্রম হয় আর তখন ফেরেশতাগণ তাদের পালনকর্তার প্রশংসাসহ পবিত্রতা বর্ণনা করে এবং পৃথিবীবাসীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। শুনে রাখ, আল্লাহই ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়' (শূরা ৪২/১-৫)।
এ বিষয়ে আল্লাহ আরো বলেন, 'মুমিনগণ তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণ স্মরণ কর এবং সকাল-বিকাল আল্লাহ্র পবিত্রতা বর্ণনা কর। তিনিই তোমাদের প্রতি রহমত করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণও রহমতের দো'আ করেন, অন্ধকার থেকে তোমাদেরকে আলোকে বের করার জন্য। তিনি মুমিনদের প্রতি পরম দয়ালু। যেদিন আল্লাহ্র সাথে মিলিত হবে সেদিন তাদের অভিবাদন হবে সালাম। তিনি তাদের জন্য সম্মানজনক পুরস্কার প্রস্তুত রেখেছেন। হে নবী! আমি আপনাকে সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি এবং আল্লাহ্র আদেশক্রমে তাঁর দিকে আহ্বায়করূপে এবং উজ্জ্বল প্রদীপ রূপে। আপনি মুমিনদেরকে সুসংবাদ দিন যে, তাদের জন্য আল্লাহ্র পক্ষ থেকে বিরাট অনুগ্রহ রয়েছে' (আহযাব ৩৩/৪১-৪৭)।
মূলতঃ এসব প্রত্যাদেশ আল্লাহ্র বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী সকল বান্দার জন্যই সমান উপকারের উদ্দেশ্যেই অবতীর্ণ হয়। কিন্তু বিশ্বাসীরা ভীত ও সন্ত্রস্ত অন্তরে কাজ করায় আল্লাহ্ পক্ষ হ'তে বহুবিধ ক্ষমার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় এবং অবিশ্বাসীরা গর্ব ও অহংকারে নিমজ্জিত থাকায় ক্ষমার বিপরীতে শাস্তি তে পতিত হয়। অতঃপর সংকট মুহূর্তে ক্বিয়ামতে বিগত দুনিয়ার জীবনের কথা মনে পড়ে যাবে, তখন আল্লাহ্র নিকট অযৌক্তিক অভিযোগ পেশ করবে। এক আয়াতে আল্লাহ বলেন, 'কাফেররা বলবে, হে আমাদের পালনকর্তা! যেসব জিন ও মানুষ আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল, তাদেরকে দেখিয়ে দিন, আমরা তাদেরকে পদদলিত করব, যাতে তারা যথেষ্ট অপমানিত হয়। নিশ্চয়ই যারা বলে, আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ, অতঃপর তাতেই অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, তোমরা ভয় কর না, চিন্তা কর না এবং তোমাদের প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ শোন। ইহকালে ও পরকালে আমরা তোমাদের বন্ধু। সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমাদের মন চায় এবং সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে যা তোমরা দাবী কর। এটা ক্ষমাশীল করুণাময়ের পক্ষ থেকে সাদর আপ্যায়ন' (হা-মীম-সিজদাহ ৪১/২৯-৩২)।
উপরোক্ত আয়াতগুলিতে ফেরেশতা কর্তৃক মুমিন ও সৎকর্মপরায়ণদের ক্ষমার জন্য আল্লাহ্র নিকট দো'আ বা ক্ষমা প্রার্থনার কথা বলা হয়েছে। কেননা আল্লাহ চান তাঁর বান্দারা যেন তাঁর নিকটে বিনীতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করে। আর তাঁর নে'মতকে আন্তরিকতার সাথে গ্রহণ করে এবং সে পথের অনুসারী হয়, অতঃপর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে। কিন্তু তিনি তাঁর বান্দা তথা আমাদের জন্য অগণিত নে'মত দান করেছেন, যার সমুচিত কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন সম্ভব নয় । তবে আন্তরিক কৃতজ্ঞতায়ই তাঁর কাম্য। মহান আল্লাহ বলেন, 'তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে তিনি তা পসন্দ করেন' (যুমার ৩৯/৭)।
অন্য আয়াতে তিনি বলেন, 'আল্লাহ তোমাদেকে মাতৃগর্ভ হ'তে এমন অবস্থায় বের করেছেন যে তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদের শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও হৃদয় দিয়েছেন, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পার' (নাহ'ল ১৬/৭৮)।
অতঃপর আল্লাহ মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রত্যাদেশ করেন, 'তিনি তোমাদের অধীন করেছেন রাত্রি-দিন, সূর্য ও চন্দ্রকে, নক্ষত্ররাজিও অধীন হয়েছে তাঁরই বিধানে। নিশ্চয়ই এতে বোধশক্তি সম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য রয়েছে নিদর্শন। আর তিনি তোমাদের অধীন করেছেন নানা রকম জিনিস যা তোমাদের জন্য পৃথিবীতে সৃষ্টি করেছেন। এতে রয়েছে নিদর্শন সেই সম্প্রদায়ের জন্য যারা নির্দেশ গ্রহণ করে। তিনি সমুদ্রকে অধীন করেছেন যাতে তোমরা তার থেকে তাজা মাছ আহরণ করতে পার এবং তার থেকে আহরণ করতে পার যা দিয়ে তোমরা নিজেদেরকে অলংকৃত কর। আর তোমরা দেখতে পাও তার বুক চিরে জলযান চলাচল করে। আর এজন্য যে, তোমরা যেন তাঁর অনুগ্রহ সন্ধান করতে পার ও তোমরা যেন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর' (নাহ'ল ১৬/১২-১৪)।
আল্লাহ তাঁর বান্দার সাথে প্রতিটি কাজে সার্বক্ষণিকভাবে মিশে আছেন, এর মহাসাক্ষ্যে তিনি বলেন, 'সুতরাং তোমরা আমাকেই স্মরণ কর আর আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করব। আমার কাছে তোমরা কৃতজ্ঞ হও, আর কৃতঘ্ন হয়ো না' (বাক্বারাহ ২/১৫২)।
অকৃতজ্ঞ বা কৃতঘ্ন বান্দাদের প্রতি অসন্তোষের এক বার্তায় মহান আল্লাহ বলেন, 'স্মরণ করো যখন তোমাদের প্রতিপালক ঘোষণা করলেন যে, যদি কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর, তবে তোমাদেরকে আরও দেব এবং যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি হবে কঠোর' (ইবরাহীম ১৪/৭)।
এরপর কৃতজ্ঞদের পুরোপুরি আশ্বস্ত করে ক্ষমাশীল আল্লাহ বলেন, 'তোমাদের আযাব দিয়ে আল্লাহ কি করবেন যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর এবং ঈমানের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক। আর আল্লাহ হচ্ছেন সমুচিত মূল্য দানকারী, সর্বজ্ঞ' (নিসা ৪/১৪৭)।
মানুষকে এ পৃথিবীতে বসবাসের জন্য আল্লাহ তা'আলা যে অগণিত দৃশ্য ও অদৃশ্য নে'মত দান করেছেন, তার কোনটি অপ্রতুল নয়। তবে তা বণ্টনের ক্ষেত্র একরূপ নয়, কমবেশী হয়। অবশ্য আল্লাহ্র কিছু বিশেষ নে'মত আছে, যেমন আলো, তাপ, বায়ু, পানি প্রভৃতি অমূল্য বস্তুগুলি সকল মানুষ এমনকি সকল প্রাণীই সমানভাবে উপভোগ করে থাকে। এগুলির প্রতি কারো কোন একক অধিকার নেই। অনুরূপভাবে মানুষের জন্য পরকালীন জীবনের যেসব নে'মত ভাণ্ডার রয়েছে, সেখানেও কেউ কোন অধিকার খাটাতে পারবে না। আল্লাহ্র আইন ও বিধান অনুযায়ী সম্পূর্ণ সত্য, ন্যায় ও নিরপেক্ষ বিচারের মাধ্যমে এক ও অভিন্ন বিচারের মানদণ্ডে ফায়ছালা নিরূপিত হবে মহাবিচার দিবসে।
ক্বিয়ামতের এই বিচার দিবস বড় কঠিন দিবস, ভয়াবহ দিবস, অবিশ্বাসীদের জন্য কঠোর শাস্তি দিবস। এ দিবসের ভয়ে বিশ্বাসী বান্দারাই ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে এবং মুক্তির জন্য আল্লাহ্ দেয়া বিধান ও সুযোগ অনুযায়ী তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। বান্দার এ ক্ষমা প্রার্থনায় আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়ে তার বড় বড় গোনাহ ক্ষমা করে দেন। কিন্তু যারা অবিশ্বাসী তারা তো বিচার দিবস বিশ্বাসই করে না, এর ভয়ও করে না, ক্ষমা প্রার্থনাও করে না। ফলে তাদের শাস্তি অবধারিত হয়ে যায়। অথচ আল্লাহ বহুমুখী ক্ষমার ঘোষণা দিয়ে তাঁর অপরাধী বান্দাদেরও পুনঃ পুনঃ তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনার আহ্বান জানিয়েছেন এবং সকলকে ক্বিয়ামতের শাস্তি হ'তে মুক্তির পথ প্রশস্ত করে দিয়েছেন। আল্লাহ আমাদের সকলকে এ সুযোগ গ্রহণ করার তওফীক দান করুন।