📄 আল্লাহ অন্তর্যামী ও ক্ষমাশীল
৮. আল্লাহ অন্তর্যামী ও ক্ষমাশীল
মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহ তা'আলা বিশ্বজগতে অগণিত দৃশ্য ও অদৃশ্য বস্তু সৃষ্টি করেছেন। তন্মধ্যে প্রাণীজগত একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যমান সৃষ্টি। আর এদের দেহের অভ্যন্তরে এক অকল্পনীয় অদৃশ্য বস্তু হৃদয়, অন্তর, মন বা নফসের সৃষ্টি করেছেন যা সকল প্রাণীরই পরিচালক, বিশেষ করে মানুষের ক্ষেত্রে এর কোন বিকল্প নেই। মানুষের মন বড় বিচিত্র, একজনের মনের সঙ্গে অন্যজনের মনের মিল নেই। পৃথিবীর শতকোটি মানুষের মনের কথা শতকোটি ধারায় প্রবাহিত। অথচ এগুলো সবই আল্লাহ্ নিয়ন্ত্রণে। তিনি সকলের (সব মানুষের) মনের খবর জানেন এবং তিনি সকলের একমাত্র প্রভু বা উপাস্য।
মানুষের মধ্যে মনের মিল না থাকায় কাজের মধ্যেও কোন মিল নেই। তাছাড়া স্বয়ং আল্লাহ তা'আলাই মানুষের রং, চেহারা, আকৃতি-প্রকৃতি প্রভৃতিতে এক জনের সঙ্গে আর এক জনের হুবহু মিল রাখেননি। কথাবার্তা, গলার স্বর, বিদ্যা, বুদ্ধিসহ মানবিক সকল কাজে কিছু কিছু অমিল রয়েছেই। এর মধ্য দিয়েই চলছে দুনিয়ার ভাল-মন্দ সহ সকল হিসাব-নিকাশ। মানুষের অন্তর স্বাধীন হওয়ায় সে প্রায় নিজের ইচ্ছামত কাজ করে। এতে ভুল-ত্রুটি হয়ে যায়, অতঃপর ক্ষমাশীল আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু সে ভুল-ত্রুটি বিবেক বহির্ভূত হয়ে গেলে অর্থাৎ আল্লাহ্ নির্ধারিত সীমার বাইরে চলে গেলে ক্ষমার অযোগ্য হয়ে যাবে। তবে আল্লাহর দয়ায় মানুষ বহু ভুল-ত্রুটি ও অন্যায় কাজের পরেও ক্ষমা পেয়ে যাবে।
'আল্লাহ ক্ষমাশীল' এ পর্যায়ে আমরা ইতিমধ্যে ক্ষমার আয়াতগুলি নিয়ে পর্যালোচনা করেছি এবং অসীম ক্ষমাশীল আল্লাহ্র পক্ষ হ'তে আশানুরূপ ক্ষমার আশ্বাস পেয়েছি। অবশ্য পূর্বালোচিত ক্ষমা সম্পর্কিত আলোচনা মানুষের প্রকাশ্য ভুল-ত্রুটি বা অন্যায় কাজের দ্বারা সৃষ্ট পাপের ক্ষমার বিষয়ে, কিন্তু অন্তরের কলুষতা দ্বারা অতি সংগোপনে সৃষ্ট পাপের ক্ষমা বিষয়ে আলোচনা হয়নি। এখানে এ বিষয়টি সংক্ষেপে পেশ করতে চাই।
পৃথিবীতে অনেক মানুষ সকলকে এড়িয়ে বা ফাঁকি দিয়ে গোপনে যুক্তি পরামর্শ বা ষড়যন্ত্র করে একাকী বা দু'জনে, তিন জনে স্বার্থসিদ্ধির জন্য কোন নিরাপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা করে, কাউকে পঙ্গু করে দেয় এবং অনুরূপ আরও গুরুতর অন্যায় বা পাপ করে। তারা ভাবে নিভৃতে কৃত এত গোপন তথ্য কারও পক্ষে জানা বুঝা বা অনুমান করা সম্ভব নয়। সে সময় তারা মানুষকেই ভয় করে বা অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে, অন্তর্যামী আল্লাহ্ কথা একেবারেই ভুলে যায়। এরূপ ধারণা নিরসণকল্পেই মহান আল্লাহ বলেন,
وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ
الْوَرِيدِ
'আমি মানুষ সৃষ্টি করেছি এবং তার মন নিভৃতে যে কুচিন্তা করে সে সম্বন্ধেও আমি অবগত আছি। আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী থেকেও অধিক নিকটবর্তী' (ক্বাফ ৫০/১৬)।
অন্যত্র আল্লাহ বলেন, سَوَاءٌ مِّنكُم مَّنْ أَسَرَّ الْقَوْلَ وَمَنْ جَهَرَ بِهِ وَمَنْ هُوَ
مُسْتَخْفِ بِاللَّيْلِ وَسَارِبُ بِالنَّهَارِ - 'তোমাদের মধ্যে যে কথা গোপনে বলুক বা তা সশব্দে প্রকাশ করুক, রাতের অন্ধকারে সে আত্মগোপন করুক বা প্রকাশ্য দিবালোকে বিচরণ করুক, সবাই তাঁর নিকট সমান' (রা'দ ১৩/১০)।
رَّبُّكُمْ أَعْلَمُ بِمَا فِي نُفُوسِكُمْ إِنْ تَكُونُوا صَالِحِيْنَ فَإِنَّهُ كَانَ لِلأَوَّابِينَ غَفُوْرًا 'তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের মনে যা আছে তা ভালই জানেন। যদি তোমরা সৎ হও তবে তিনি তওবাকারীদের জন্য ক্ষমাশীল' (বানী ইসরাঈল ১৭/২৫)। একই মর্মার্থে আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রিয় হাবীব (ছাঃ)-কে বিশেষ প্রত্যাদেশ দ্বারা অবহিত করেন, 'বলে দিন, তোমরা যদি মনের কথা গোপন করে রাখ অথবা প্রকাশ করে দাও, আল্লাহ সে সবই জানতে পারেন আর আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে, সে সবও তিনি জানেন, আল্লাহ সব বিষয়ে শক্তিমান। সেদিন প্রত্যেকেই যা কিছু সে ভাল কাজ করেছে, চোখের সামনে দেখতে পাবে এবং যা কিছু মন্দ কাজ করেছে তাও। ওরা তখন কামনা করবে, যদি তার এবং এসব কর্মের মধ্যে ব্যবধান দূরের হ'ত। আল্লাহ তাঁর নিজের সম্পর্কে তোমাদের সাবধান করেছেন, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু। বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহ'লে আমাকে অনুসরণ করো, যাতে আল্লাহও তোমাদেরকে ভালবাসেন এবং তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন। আর আল্লাহ হ'লেন ক্ষমাকারী দয়ালু' (আলে ইমরান ৩/২৯-৩১)।
প্রকৃতপক্ষে মানুষের অন্তর বা মন হ'ল একটা অত্যন্ত শক্তিশালী অদৃশ্য সৃষ্টি। বিশ্বজগতে মানব জাতির সকল ভাল-মন্দ শক্তির উৎসই তার মন। আমরা একটু স্থির চিত্তে চিন্তা করলেই দেখতে পাব, এ অনন্ত চিন্তার জগতে মানুষ কিভাবে নিজ নিজ লক্ষ্য নিয়ে সাঁতার কাটছে এবং তার লক্ষ্যস্থলে পৌঁছে যাচ্ছে। অন্তর্যামী আল্লাহ এদের সবার গতিবিধি নিরীক্ষণ করছেন এবং সংরক্ষণও করছেন বিশেষ হিসাব বহিতে (আমলনামায়)। মানুষের আন্তরিক অভিযানের কর্মকাণ্ডে আল্লাহ্র স্মরণ, সম্মতি, ভীতি এবং সন্তুষ্টির সম্পৃক্ততা থাকলে বিষয়টির মধ্যে ভুল-ত্রুটি হয়ে গেলেও আল্লাহ ক্ষমার আশ্বাস দিয়েছেন।
কিন্তু মনের (জ্ঞানের) এ শক্তি নিয়ে কোন মানুষ যেন অনধিকার কোন ইচ্ছা না করে। কারণ মনের গোপন চিন্তায়ও শয়তান তার কুচক্রান্তের প্রভাব খাটায়। ঐ সময় আল্লাহকে স্মরণ করলে সঠিক পথে টিকে থাকা যায়। কিন্তু আল্লাহকে ভুলে গেলে শয়তান তার পাশে স্থান করে নেয় এবং তাকে ভুল পথে চালিত করে। অতঃপর তার জীবনের সর্বনাশ ডেকে আনে। মানুষের জীবনের চিন্তাধারা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ এবং কোন কোন ক্ষেত্রে বিশেষ করে ধর্মীয় অনুভূতি বা অনুশীলনের ক্ষেত্রে খুবই স্পর্শকাতর। এরূপ ক্ষেত্রে আল্লাহ্র দয়া, সাহায্য, সহানুভূতি ছাড়া ঈমান রক্ষা করা অসম্ভব। কারণ মানুষ মাঝে মাঝে বা কোন কোন সময় পার্থিব জগতের এমন সব লোভনীয় ও আকর্ষণীয় সৌন্দর্যমণ্ডিত বস্তুর প্রলোভনে পড়ে যায় যা বর্ণনা করাও কঠিন।
মনের বিপরীতে যে বিভ্রান্তিকর ও রোমাঞ্চকর পরিবেশ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় সে প্রসঙ্গে ইউসুফ (আঃ) যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন, পবিত্র কুরআনে তা সুন্দর ও সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে, وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِي إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوْءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّي إِنَّ رَبِّي غَفُوْرٌ رَّحِيمٌ 'আমি নিজেকে নির্দোষ বলি না। নিশ্চয়ই মানুষের মন মন্দ কর্মপ্রবণ কিন্তু সে নয় আমার পালনকর্তা যার উপর অনুগ্রহ করেন। নিশ্চয়ই আমার পালনকর্তা ক্ষমাশীল, দয়ালু' (ইউসুফ ১২/৫৩)।
ইউসুফ (আঃ)-এর উপরোক্ত উক্তি থেকে বোঝা যায় শয়তান অন্তরের অভ্যন্তরে তাঁর উপর তীব্র আক্রমণ চালিয়েছিল এবং তাঁকে হতবুদ্ধি করার উপক্রমই করে ফেলেছিল। কিন্তু আল্লাহ্র অশেষ মেহেরবানীতে ও মানসিক দৃঢ়তায় এই সর্বনাশ হ'তে তিনি রক্ষা পান। সংযমের এই অতুলনীয় ইতিহাস সারা মুসলিম মিল্লাত চিরদিন বিশেষ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে এবং একান্ত নির্জনে তাঁর শরণাপন্ন হয়ে আত্মশুদ্ধি রক্ষায় নিবেদিতপ্রাণ হয়ে পরম করুণাময় আল্লাহ্ সমীপে ক্ষমাপ্রার্থী হবে। অতঃপর ক্ষমাশীল আল্লাহ অবশ্যই ক্ষমা করে দেবেন।
যেহেতু পৃথিবীর বুকে মানুষের সকল প্রকাশ্য ও গোপনীয় চিন্তার উৎস স্থল হ'ল অন্তর, হৃদয়, মন বা নফস। তাই ইহকালীন জীবনে মানুষের সকল প্রকাশ্য ও গুপ্ত কর্ম অন্তরের পরিকল্পনায় পরিচালিত হয়। প্রকাশ্য সকল ভাল ও মন্দ কাজ দেখা, শোনা ও বোঝা যায়। কিন্তু সকল গুপ্ত ভাল ও মন্দ কাজ দেখা শোনা ও বোঝা যায় না। তবে এটা স্বতঃসিদ্ধ যে যারা প্রকাশ্যে ভাল কথা বলে, ভাল কাজ করে, সাধারণত তারাই গোপনে ভাল কথা ও ভাল কাজের চিন্তা করে, যা ইহকালেও প্রশংসিত পরকালেও প্রশংসিত। পক্ষান্তরে যারা প্রকাশ্যে মন্দ কথা বলে মন্দ কাজ করে, সাধারণত তারাই গোপনে মন্দ কথা ও মন্দ কাজের চিন্তা করে, যা ইহকালেও ঘৃণিত পরকালে আরও ঘৃণিত।
এজন্য আল্লাহ তা'আলা মানুষকে তার মানবিক, নৈতিক ও ধর্মীয় জীবনের স্বচ্ছতা রক্ষার্থে প্রকাশ্য বা গোপনে কুচিন্তার দ্বারা নিজকে কলুষিত না করার আহ্বান জানিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন, 'মুমিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই। অতএব তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করবে এবং আল্লাহকে ভয় করবে, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও। মুমিনগণ কেউ যেন অপর কাউকে উপহাস না করে। কেননা সে উপহাসকারী উপেক্ষা উত্তম হ'তে পারে এবং কোন নারী অপর নারীকেও যেন উপহাস না করে, কেননা সে উপহাসকারিণী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হ'তে পারে। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ কর না এবং একে অপরকে মন্দ নামে ডেক না। কেউ বিশ্বাস স্থাপন করলে তাকে মন্দ নামে ডাকা গোনাহ। যারা এহেন কাজ থেকে তওবা করে না তারাই যালেম। মুমিনগণ তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাক। নিশ্চয়ই কতক ধারণা গোনাহ এবং গোপনীয় বিষয় সন্ধান কর না। তোমাদের কেউ যেন কারো পশ্চাতে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভ্রাতার গোশত ভক্ষণ করা পসন্দ করবে? বস্তুতঃ তোমরা তো একে ঘৃণাই কর। আল্লাহকে ভয় কর! নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু' (হুজুরাত ৪৯/১১-১২)।
মানুষের অন্তর, মন বা হৃদয় একটি আক্রমণাত্মক অদৃশ্য শক্তি। এটা যেকোন সময় যেকোন মানুষকে আক্রমণ করতে পারে বা করে থাকে। এমতাবস্থায় যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে ও ভয় করে, তারা এ আক্রমণকে প্রতিহত করার শক্তি রাখে। কিন্তু যারা আল্লাহ বা তাঁর আদেশে সন্ধিহান তারা অন্তরের কুপ্রস্তাবে সাড়া দিয়ে ভুল পথে বা পাপের পথে লিপ্ত হয়ে যায়। ফলে এক মানুষ অপর মানুষকে অবহে'লা করে, ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে বা অনুরূপ সমালোচনা করে তাকে হেয় প্রতিপন্ন করতে চায়। কিন্তু আল্লাহ এরূপ কাজ করা হ'তে বিরত থাকতে বলেছেন। কেননা যাকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা হয় তার প্রকৃত (ভাল-মন্দ) তথ্য অন্তর্যামী আল্লাহ তা'আলাই জানেন। সে আল্লাহ্ প্রিয়পাত্র হ'তে পারে, আবার ঠাট্টাকারীর চেয়ে উত্তমও হ'তে পারে । এতদ্বতীত বহু মানুষ আন্তরিক (আক্রমণের) তাড়নায় একজন অন্যজন সম্পর্কে আনুমানিকভাবে কুচিন্তা করে, কারও গোপন বিষয় অনুসন্ধান করে, আবার কারও গীবত বা দুর্নামও করে। এরূপ গোপন অপরাধ মারাত্মক পাপ হিসাবে আখ্যায়িত করে আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে আয়াত নাযিল করেছেন। উপরোক্ত আয়াতের বর্ণনায় তা পাওয়া যায়। ঐসব অপতৎপরতার জন্য আল্লাহ অসন্তুষ্ট হয়ে এরূপ কাজকে মৃত ভ্রাতার গোশত খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। মনের কলুষিত এসব কাজ হ'তে তওবা করে আল্লাহ্র নিকট ক্ষমাপ্রার্থী হ'লে তিনি ক্ষমা করে দেবেন বলেও আয়াতে উল্লেখ রয়েছে।
সুতরাং অন্তর বা মন নিয়ে একান্ত নীরবে ও নির্জনে গভীর চিন্তা-গবেষণা করা প্রয়োজন। কারণ অন্তর বা নফসকে বশীভূত করতে পারলেই জীবন ধন্য হয়ে উঠবে এবং আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জনের পথে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হবে। সর্বজ্ঞানী আল্লাহ তা'আলা অদৃশ্য জগতের তথা অন্তর জগতেরও প্রভু কেবল এই বিশ্বাসই যে কোন মানুষকে মহত্বের শীর্ষ শিখরে উন্নীত করতে পারে, আবার কোন প্রকার ধ্বংসের হাত হ'তেও রক্ষা করতে পারে।
আল্লাহ অন্তর্যামী ও ক্ষমাশীল, এ রহস্যময় আলোচনায় প্রচুর শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। প্রত্যেক ঈমানদার নর-নারীকে অন্তিমকাল পর্যন্ত আল্লাহ্র সন্তুষ্টির গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকতে হবে। এজন্য আল্লাহ্ পথের পথিকের আদর্শের প্রতি নীরব-নিস্তব্ধ অনুকরণ ও অনুসরণ করতে হবে। কুরআন ও হাদীছের প্রতি গভীর মনোনিবেশ করতে হবে। সাফল্য লাভের প্রত্যাশায় তথা আল্লাহ্র দরবারে আশ্রয় লাভের আবেগে নিবিড় নির্জনে ক্রন্দনরত অবস্থায় আত্মনিবেদন বা দো'আ করতে হবে। কারণ অন্তরের চিন্তার প্রশস্ততা, গবেষণা বা সাধনার সমন্বয়ে অনেক উন্নত হ'তে পারে। অতএব আমাদের যে কোন দুর্বল ধ্যান-ধারণাকে উৎকৃষ্ট মর্যাদায় নিয়ে যাওয়ার ব্রত গ্রহণ করতে হবে। অন্তর্যামী দয়ালু ক্ষমাশীল আল্লাহ তা'আলা অন্তরের উদ্দেশ্যহীন বা অলীক তৎপরতা হ'তে আমাদের সকলকে হেফাযত করুন, এটাই আমাদের একান্ত কামনা।
টিকাঃ
(ক্বাফ ৫০/১৬)।
(রা'দ ১৩/১০)।
(বানী ইসরাঈল ১৭/২৫)।
(আলে ইমরান ৩/২৯-৩১)।
(ইউসুফ ১২/৫৩)।
(হুজুরাত ৪৯/১১-১২)।
📄 রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে ক্ষমার বিশেষ বার্তা
আল্লাহ তাঁর প্রিয় সৃষ্টি মানব জাতিকে নিয়ে বহু সুন্দর সুন্দর পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছেন। তন্মধ্যে মানবজাতিকে স্বচ্ছ, পবিত্র রাখার জন্য তার অনেক ভুল-ভ্রান্তি, দোষ-ত্রুটি, অপরাধ অন্যায়-অত্যাচারকে ক্ষমা করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর ক্ষমার কার্যক্রম কোন সুনির্দিষ্ট গণ্ডীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা ব্যাপক হ'তে ব্যাপকতর একটি অজ্ঞাত মহোত্তম পরিকল্পনা। এ মহৎ পরিকল্পনার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা মানুষকে যে সুযোগ-সুবিধা দান করেছেন হতভাগ্য মানুষ তা পুরোপুরিভাবে অনুভব করতে পারে না। এজন্য দয়াশীল ও ক্ষমাশীল আল্লাহ তা'আলা মানুষকে নানাভাবে সরল-সহজ ও বোধগম্য উপায়ে তাঁর নিঃস্বার্থ ক্ষমার কথাগুলি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। ইতিমধ্যে আমরা তা আলোচনাও করেছি।
আল্লাহ ক্ষমাশীল এ বিষয়ে তিনি আরো বলেন,
سُبْحَانَهُ هُوَ اللَّهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ - خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بِالْحَقِّ يُكَوِّرُ اللَّيْلَ عَلَى النَّهَارِ وَيُكَوِّرُ النَّهَارَ عَلَى اللَّيْلِ وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ كُلُّ يَجْرِي لِأَجَلٍ مُسَمًّى أَلَا هُوَ الْعَزِيزُ الْغَفَّارُ
'তিনি পবিত্র, তিনি আল্লাহ এক, পরাক্রমশালী। তিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে। তিনি রাত্রিকে দিবস দ্বারা আচ্ছাদিত করেন এবং দিবসকে রাত্রি দ্বারা আচ্ছাদিত করেন এবং তিনি সূর্য ও চন্দ্রকে কাজে নিযুক্ত করেছেন। প্রত্যেকেই বিচরণ করে নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত। জেনে রাখুন, তিনি পরাক্রমশালী ক্ষমাশীল' (যুমার ৩৯/৪, ৫)।
অনুরূপ অপর এক আয়াতে আল্লাহ বলেন,
قُلْ إِنَّمَا أَنَا مُنْذِرٌ وَمَا مِنْ إِلَهِ إِلَّا اللَّهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ - رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا الْعَزِيزُ الْغَفَّارُ
'বলুন, আমি তো একজন সতর্ককারী মাত্র এবং এক পরাক্রমশালী আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। তিনি আসমান-যমীন ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছুর পালনকর্তা, পরাক্রমশালী, মার্জনাকারী' (ছোয়াদ ৩৮/৬৫, ৬৬)।
ঈষৎ পরিবর্তিত ভাবধারায় আল্লাহ প্রত্যাদেশ করেন, পরম কল্যাণময় তিনি যিনি তাঁর বান্দার প্রতি ফায়ছালার গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন, যাতে সে বিশ্বজগতের জন্য সতর্ককারী হয়, তিনি হ'লেন যাঁর রয়েছে নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের রাজত্ব। তিনি কোন সন্তান গ্রহণ করেননি, রাজত্বে তাঁর কোন অংশীদার নেই। তিনি প্রত্যেক বস্তু সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তাকে শোধিত করেছেন পরিমিতভাবে। তারা তাঁর পরিবর্তে কত উপাস্য গ্রহণ করেছে, যারা কিছুই সৃষ্টি করে না এবং তারা নিজেরাই সৃষ্ট এবং নিজেদের ভালও করতে পারে না, মন্দও করতে পারে না এবং জীবন, মরণ ও পুনরুজ্জীবনেরও মালিক তারা নয়। কাফেররা বলে, এটা মিথ্যা বৈ নয়, যা তিনি উদ্ভাবন করেছেন এবং অন্য লোকেরা তাঁকে সাহায্য করেছে। অবশ্যই তারা অবিচার ও মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে। তারা বলে, এগুলো তো পুরাকালের রূপকথা, যা তিনি লিখে রেখেছেন। এগুলো সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর কাছে শেখানো হয়। বলুন, একে তিনিই অবতীর্ণ করেছেন, যিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের গোপন রহস্য অবগত আছেন। তিনি ক্ষমাশীল, মেহেরবান' (ফুরক্বান ২৫/১-৬)।
উপরের আয়াতগুলি দ্বারা আল্লাহ তাঁর মহাজ্ঞান, মহাক্ষমতা ও মহা সৃষ্টির দ্বারা তাঁর একচ্ছত্র মালিকানা ও একমাত্র উপাসক হওয়ার কথা নবী করীম (ছাঃ)-কে অবহিত করেন। অতঃপর তাঁকে আদেশ করা হয়, বলুন, আমি একজন সংবাদদাতা বা সতর্ককারী এই মর্মে যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই, নভোমণ্ডলের, ভূমণ্ডলের ও এতদুভয়ের মধ্যে বৃহত্তম ও ক্ষুদ্রতম সবকিছুর মালিক তিনি এবং তিনি ক্ষমাশীলও। তিনি তাঁর বান্দার প্রতি পরম হিতাকাংখী হয়ে তাদের সকল কাজের ফায়ছালার জন্য মহাপবিত্র কুরআন অবতীর্ণ করেছেন। এতদসত্ত্বেও বহু লোক আল্লাহ্র পরিবর্তে অন্যান্য উপাস্য গ্রহণ করে থাকে, যারা কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না এবং তারা জীবন মরণেরও মালিক নয়। তারা নবী করীম (ছাঃ) ও পবিত্র কুরআন সম্পর্কে নানারূপ মনগড়া কথাবার্তা বলে। পরম ধৈর্যশীল ও দয়াশীল আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূল (ছাঃ)-কে বলেন, তাদেরকে (লোকদেরকে) বলুন, এ কুরআন আল্লাহই অবতীর্ণ করেছেন। তিনি নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল বা অজ্ঞাত জগতের গোপন রহস্য জানেন। তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।
সর্বজ্ঞ আল্লাহ নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডলসহ সকল সৃষ্ট বস্তুর মালিক ও উপাস্য হয়েও তিনি নিজকে ক্ষমাশীল বলে ঘোষণা দেয়ার নেপথ্য কারণ বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। ক্ষমাশীল বলতে, যিনি সহজেই অন্যের অন্যায় অপরাধ ক্ষমা করেন বুঝায়। আল্লাহ অসীম জ্ঞান ও ক্ষমতার মালিক, তিনি ক্ষমাশীল উপাধি দ্বারা কেউ তাঁর আদেশ পালনে অন্যায় অপরাধ করে ফেললেও তিনি তাকে ক্ষমা করে দেবেন বুঝায়। কিন্তু তিনি এত ক্ষমতার মালিক হয়েও মানুষকে তার অন্যায়, অত্যাচার বা অবিচারের মত অপরাধের জন্য ক্ষমা করে দেবেন। কারণ তিনি অসীম দয়ার ভাণ্ডার ও ক্ষমাশীল। আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূলকে 'আল্লাহ ক্ষমাশীল' বাক্যের সর্বোচ্চ তাৎপর্য বোঝার জন্যই উপরোক্ত আয়াতগুলির অবতরণ করেছেন।
তিনি বলেন, 'যে গোনাহ করে কিংবা নিজের অনিষ্ট করে, অতঃপর আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল, করুণাময় পায়। যে কেউ পাপ করে, সে নিজের পক্ষেই করে। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।
যে ব্যক্তি ভুল কিংবা গোনাহ করে, অতঃপর কোন নিরপরাধের উপর অপবাদ আরোপ করে সে নিজের মাথায় বহন করে জঘন্য মিথ্যা ও প্রকাশ্য গোনাহ। যদি আপনার প্রতি আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও করুণা না হ'ত, তবে তাদের একদল আপনাকে পথভ্রষ্ট করার সংকল্প করেই ফেলেছিল। তারা পথভ্রান্ত করতে পারে না কিন্তু নিজেদেরকেই এবং আপনার কোন অনিষ্ট করতে পারে না। আল্লাহ আপনার প্রতি ঐশী গ্রন্থ ও প্রজ্ঞা অবতীর্ণ করেছেন এবং আপনাকে এমন বিষয় শিক্ষা দিয়েছেন, যা আপনি জানতেন না। আপনার প্রতি আল্লাহ্র করুণা অসীম' (নিসা ৪/১১০-১১৩)।
সকল শ্রেণীর মানুষের প্রতি আল্লাহ্র অফুরন্ত রহমত ও ভালবাসার কোন শেষ নেই। আল্লাহ পাক বিষয়গুলি রাসূলের মাধ্যমে দয়া ও ক্ষমার বিষয়টি মানুষকে অবহিত করেছেন। তাদেরকে পাপাচার থেকে হুশিয়ার করার নির্দেশও দিয়েছেন।
মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবীব (ছাঃ)-কে বিশেষ প্রত্যাদেশ মাধ্যমে বলেন, 'আপনি এ কুরআন দ্বারা তাদেরকে ভয় প্রদর্শন করুন, যারা আশঙ্কা করে স্বীয় পালনকর্তার কাছে এমতাবস্থায় একত্রিত হওয়ার যে, তাদের কোন সাহায্যকারী ও সুপারিশকারী হবে না- যাতে তারা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে। আর তাদেরকে বিতাড়িত করবেন না, যারা সকাল-বিকাল স্বীয় পালনকর্তার ইবাদত করে, তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে। তাদের হিসাব বিন্দুমাত্রও আপনার দায়িত্বে নয় এবং আপনার হিসাব বিন্দুমাত্র তাদের দায়িত্বে নয় যে আপনি তাদেরকে বিতাড়িত করবেন। নতুবা আপনি অবিচারকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন। আর এভাবেই আমি কিছু লোককে কিছু লোক দ্বারা পরীক্ষায় ফেলেছি, যাতে তারা বলে যে, এদেরকেই কি আমাদের সবার মধ্য থেকে আল্লাহ স্বীয় অনুগ্রহ দান করেছেন? আল্লাহ কি কৃতজ্ঞদের সম্পর্কে সুপরিজ্ঞাত নন? আর যখন তারা আপনার কাছে আসবে যারা আমার নিদর্শন সমূহে বিশ্বাস করে, তখন আপনি বলে দিন তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক! তোমাদের পালনকর্তা রহমত করা নিজ দায়িত্বে লিখে নিয়েছেন যে, তোমাদের যে কেউ অজ্ঞতাবশতঃ কোন মন্দ কাজ করে, অনন্তর এর পরে তওবা করে নেয় এবং সৎ হয়ে যায়, তবে তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, করুণাময়' (আন'আম ৬/৫১-৫৪)।
অত্যন্ত বাস্তব ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনা দিয়ে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূল (ছাঃ)-কে প্রত্যাদেশ করেন, 'বলুন, হে আল্লাহ! আসমান ও যমীনের স্রষ্টা, দৃশ্য ও অদৃশ্যের জ্ঞানী, আপনিই আপনার বান্দাদের মধ্যে ফায়ছালা করবেন, যে বিষয়ে তারা মতবিরোধ করত। যদি গোনাহগারদের কাছে পৃথিবীর সবকিছু থাকে এবং তার সাথে সমপরিমাণ আরও থাকে, তবে অবশ্যই তারা ক্বিয়ামতের দিন সে সব কিছুই নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য মুক্তিপণ হিসাবে দিয়ে দেবে। অথচ তারা দেখতে পাবে, আল্লাহ্ পক্ষ থেকে এমন শাস্তি, যা তারা কল্পনাও করত না। আর দেখবে তাদের দুষ্কর্মসমূহ এবং যে বিষয়ে তারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত, তা তাদেরকে ঘিরে নেবে। মানুষকে যখন দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করে, তখন সে আমাকে ডাকতে শুরু করে। এরপর যখন আমি তাকে আমার পক্ষ থেকে নে'মত দান করি, তখন সে বলে, এটা তো পূর্বের জ্ঞান মতেই প্রাপ্ত হয়েছি। অথচ এটা এক পরীক্ষা, কিন্তু তাদের অধিকাংশই বোঝে না। তাদের পূর্ববর্তীরাও তা-ই বলতো। অতঃপর তাদের কৃতকর্ম তাদের কোন উপকারে আসেনি। তাদের দুষ্কর্ম তাদেরকে বিপদে ফেলেছে। এদের মধ্যেও যারা পাপী, তাদেরকে অতিসত্বর তাদের দুষ্কর্ম বিপদে ফেলবে। তারা তা প্রতিহত করতে সক্ষম হবে না। তারা কি জানেনি যে, আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা রিযিক বৃদ্ধি করেন এবং পরিমিত দেন। নিশ্চয়ই এতে বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে। বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর যুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহ্র রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গোনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। তোমাদের পালনকর্তার অভিমুখী হও এবং তাঁর আজ্ঞাবহ হও, তোমাদের কাছে আযাব আসার পূর্বে। এরপর তোমরা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না' (যুমার ৩৯/৪৬-৫৪)।
বিশ্বজগতে সৃষ্ট সকল বস্তুর প্রতিপালক আল্লাহ, সকল বস্তুর প্রতি ক্ষমাশীলও তিনি। মানুষের মধ্যে যারা আল্লাহকে প্রতিপালক ও একমাত্র উপাস্য মনে করে বা বিশ্বাস করে, জীবনযাত্রার পথে ভুল-ত্রুটি, অন্যায়-অপরাধ করে, তাদেরকে তিনি ক্ষমা করেন। কিন্তু যারা আল্লাহ্র পরিবর্তে অন্য উপাস্য গ্রহণ করে বা অন্য উপাস্যে বিশ্বাসী তাদেরকে তিনি ক্ষমা করেন না।
ধর্মের প্রথম কাজ আল্লাহ্র আদেশ মান্য করা, দ্বিতীয় কাজ মহানবী (ছাঃ)-এর আদর্শের অনুসরণ করা। পূর্ণাঙ্গ ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে এ দু'টির একটিও বাদ দেয়া যাবে না। আল্লাহ্র আদেশ হ'ল কুরআনের বাণী এবং কুরআনের বাণীর সঠিক ব্যাখ্যাকারক ও বাস্তবায়নকারী হ'লেন মহানবী (ছাঃ)। তাই আল্লাহ্র বাণী ও বাস্তবায়নের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নিয়ে বহু লোক নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট আসতো। তাছাড়াও তাদের স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়গুলিও তারা নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট উপস্থাপন করত। ক্ষমাশীল ও দয়াশীল আল্লাহ তা'আলা তাঁর দয়ার নবী (ছাঃ)-কে সন্তোষজনক বাণীর দ্বারা, প্রত্যাদেশ করতেন। তিনি তাকে সান্ত্বনা দিতেন। এরূপ তাৎপর্যপূর্ণ এক প্রত্যাদেশে আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূলকে বলেন, 'বলে দিন, হে মানবকুল! তোমরা যদি আমার দ্বীনের ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে থাক, তবে (জেনো) আমি তাদের ইবাদত করি না যাদের ইবাদত তোমরা কর আল্লাহ ব্যতীত। কিন্তু আমি ইবাদত করি আল্লাহ তা'আলার, যিনি তুলে নেন তোমাদেরকে। আর আমার প্রতি নির্দেশ হয়েছে যাতে আমি ঈমানদারদের অন্তর্ভুক্ত থাকি। আর যেন সোজা দ্বীনের প্রতি মুখ করি সরল হয়ে এবং যেন মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত না হই। আর নির্দেশ হয়েছে আল্লাহ ব্যতীত এমন কাউকে ডাকব না, যে আমার ভাল করবে না মন্দও করবে না। বস্তুতঃ আপনি যদি এমন কাজ করেন, তাহ'লে তখন আপনিও যালেমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন। আর আল্লাহ যদি আপনার উপর কোন কষ্ট আরোপ করেন তাহ'লে কেউ নেই তা খণ্ডাবার মত তাঁকে ছাড়া। পক্ষান্তরে যদি তিনি কিছু কল্যাণ দান করেন, তবে তাঁর মেহেরবাণীকে রহিত করার মতও কেউ নেই। তিনি যার প্রতি অনুগ্রহ দান করতে চান স্বীয় বান্দাদের মধ্যে তাকেই দান করেন, বস্তুতঃ তিনিই ক্ষমাশীল, দয়ালু' (ইউনুস ১০/১০৪-১০৭)।
মহান আল্লাহ আরও বলেন, 'নিশ্চয় আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফায়ছালা করেন, যা আল্লাহ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান। আপনি বিশ্বাসঘাতকদের পক্ষ থেকে বিতর্ককারী হবেন না এবং আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল দয়ালু' (নিসা ৪/১০৫, ১০৬)।
মানবকুল শ্রেষ্ঠ ও নবী-রাসূলকুল শ্রেষ্ঠ আমাদের মহানবী (ছাঃ)-এর উপর যে ক্ষমার আয়াতগুলি অবতীর্ণ হয়েছে, সেগুলিতে তাঁর দায়িত্বের বিষয়ও তাঁকে বিশেষভাবে অবহিত করা হয়েছে। যাতে তিনি তাঁর কর্তব্যনিষ্ঠা দ্বারা পথভ্রষ্ট মানুষকে হেদায়াতের পথে ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হন এবং হেদায়াত প্রাপ্তরা হকের উপর অবিচল থাকে।
📄 নবী-রাসূলই ক্ষমাপ্রার্থী ছিলেন
আল্লাহ অসীম জ্ঞানভাণ্ডারের মালিক, তাঁর সীমাহীন জ্ঞানের বাইরে কিছুই নেই। তিনি মানুষকে সামান্য জ্ঞান দান করেছেন, কিন্তু মানুষ নিজকে অনেক জ্ঞানী বা বুদ্ধিমান মনে করে। ফলে প্রায়ই তাদের ভুল হয়ে যায়, তখন আল্লাহ্র কাছে ক্ষমাপ্রার্থী হয়। ক্ষমাশীল আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। সব মানুষের মধ্যে এ ভুল হয়, এমনকি নবী-রাসূলগণেরও ভুল হয়েছে। কারণ তাঁরাও তো মানুষ। তবে তাঁদের ভুল সাধারণতঃ অনিচ্ছাকৃতভাবে হয়ে যায়, ইচ্ছাকৃতভাবে নয় এবং ভুলের পরিমাণও কম। নবী-রাসূলগণের ভুল হয়ে গেলে তাঁরা সাথে সাথে আল্লাহ্র কাছে ক্ষমাপ্রার্থী হয়েছেন এবং ক্ষমাশীল আল্লাহ তাঁদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।
মানুষ মাত্রেরই ভুল হয়, কাজেই নবী-রাসূলগণের ভুল হওয়ায় বা ক্ষমাপ্রার্থী হওয়ায় আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কারণ আল্লাহ ইচ্ছা করলে নবী-রাসূলগণের ভুল হ'ত না বা সাধারণ মানুষেরও ভুল হত না। কিন্তু আল্লাহ তা করেননি, তিনি মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য সবার মধ্যে এক ও অভিন্ন এমন এক উপাদান মিশ্রিত করে দিয়েছেন যে মিশ্রণ হ'তে কেউ মুক্ত নয়। তাছাড়া মানুষকে ভুল পথে বা খারাপ পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য শয়তানের প্রস্তুতি ও প্রচেষ্টার কোন কমতি নেই। শয়তান সুযোগ পেলেই যে কোন মানুষের ক্ষতি সাধনে তৎপর হয়। এমনকি নবী-রাসূলগণের ক্ষতি সাধনের প্রচেষ্টায়ও বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেও ব্যর্থ হয়। সাধারণ মানুষকে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি অবহিত করে সান্ত্বনা প্রদান করাই এ অধ্যায়ের আলোচনার মূখ্য উদ্দেশ্য।
এ পৃথিবীর জীবনযাত্রার পথে কোন সময় অনাকাংখিতভাবে মানুষ ভুল-ত্রুটি, অন্যায়-অত্যাচার বা অবিচার করে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে যেতে পারে, কিন্তু সে সংশোধিত হয়ে আবার নিজ অবস্থানে বা আরও ভাল অবস্থানে ফিরে আসতে পারবে। মানুষকে তার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য বা সগৌরবে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য এ দুর্লভ আত্মত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন মহিমাময় আল্লাহ তা'আলা। সাধারণ মানুষ ত্রুটি-বিচ্যুতি, অন্যায় বা পাপ করে আল্লাহ্র নিকট তওবা করে এবং ক্ষমাপ্রার্থী হয়। নবী-রাসূলগণ কোন অন্যায় বা পাপ করেন না, তাঁরা কোন ঘটনাচক্রে ত্রুটি-বিচ্যুতিতে জড়িয়ে পড়েন। অতঃপর লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহ্র নিকট সবিনয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। আল্লাহ তাঁদেরকে ক্ষমা করে দেন।
উল্লেখ্য, আমাদের আদি পিতা আদম (আঃ) আল্লাহ্র আদেশ ভুলে গিয়ে শয়তানের মিথ্যা কথার চক্রান্তে পড়ে নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়ে আল্লাহ্র অসন্তুষ্টির মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন। অতঃপর আল্লাহ্র কাছে করুণভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। দয়াশীল আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করে দেন এবং পরবর্তী উত্তম কর্মসূচী প্রদান করেন। তাঁর ক্ষমা প্রার্থনার দো'আটি পবিত্র কুরআনে এভাবে বর্ণিত হয়েছে, قَالَا رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ 'তাঁরা উভয়ে বললেন, হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা নিজেদের প্রতি যুলুম করেছি। যদি আপনি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না করেন, তবে আমরা অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যাব' (আ'রাফ ৭/২৩)।
ইবরাহীম (আঃ) তাঁর সন্তানাদি ও কওমের জন্য দো'আ করেছিলেন,
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ اجْعَلْ هَذَا الْبَلَدَ آمِنًا وَاجْنُبْنِي وَبَنِيَّ أَن نَّعْبُدَ الأَصْنَامَ - رَبِّ إِنَّهُنَّ أَضْلَلْنَ كَثِيرًا مِّنَ النَّاسِ فَمَنْ تَبِعَنِي فَإِنَّهُ مِنِّي وَمَنْ عَصَانِي فَإِنَّكَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
'যখন ইবরাহীম বললেন, হে পালনকর্তা! এ শহরকে শান্তিময় করে দিন এবং আমাকে ও আমার সন্তান-সন্ততিকে মুর্তিপূজা থেকে দূরে রাখুন। হে পালনকর্তা! এরা অনেক মানুষকে বিপথগামী করেছে। অতএব যে আমার অনুসরণ করে, সে আমার এবং কেউ আমার অবাধ্যতা করলে নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু' (ইবরাহীম ১৪/৩৫, ৩৬)।
মূসা (আঃ) এক ঘটনা বা দুর্ঘটনার কবলে পতিত হয়ে অপরাধীর বেশে আল্লাহ্র কাছে ক্ষমাপ্রার্থী হয়েছিলেন এবং আল্লাহ তাঁকে ক্ষমাও করে দিয়েছেন। বিষয়টি পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, 'যখন মূসা যৌবনে পদার্পণ করলেন এবং পরিণত বয়স্ক হয়ে গেলেন, তখন আমি তাঁকে প্রজ্ঞা ও জ্ঞানদান করলাম। এমনিভাবে আমি সৎ কর্মীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। তিনি শহরে প্রবেশ করলেন, যখন তার অধিবাসীরা ছিল বেখবর। তথায় তিনি দুই ব্যক্তিকে লড়াইরত দেখলেন এদের একজন ছিল তাঁর নিজ দলের এবং অন্যজন তাঁর শত্রু দলের। অতঃপর যে তাঁর নিজ দলের সে তাঁর শত্রু দলের লোকটির বিরুদ্ধে তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করল। তখন মূসা তাকে ঘুষি মারলেন এবং এতেই তার মৃত্যু হয়ে গেল। মূসা বললেন, এটা শয়তানের কাজ। নিশ্চয়ই সে প্রকাশ্য শত্রু, বিভ্রান্তকারী। তিনি বললেন, হে আমার পালনকর্তা! আমি তো নিজের উপর যুলুম করে ফেলেছি। অতএব আমাকে ক্ষমা করুন। আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করলেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, দয়ালু। তিনি (মূসা) বললেন, হে আমার পালনকর্তা! আপনি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন, এরপর আমি কখনও অপররাধীদের সাহায্যকারী হব না' (ক্বাছাছ ২৮/১৪-১৭)।
নূহ (আঃ)-এর আমলে যে ঐতিহাসিক প্লাবন সংঘটিত হয়েছিল, তাকে কেন্দ্র করে আল্লাহ তা'আলা যে অহি অবতীর্ণ করেছিলেন এবং তার ভয়াবহতায় নূহ (আঃ) আল্লাহ্র নিকট যেসব প্রার্থনা করেছিলেন তা উপস্থাপন করা হ'ল। মহান আল্লাহ বলেন, নূহ (আঃ)-এর প্রতি অহি প্রেরণ করা হ'ল যে, যারা ইতিমধ্যেই ঈমান এনেছে তাদের ছাড়া আপনার জাতির অন্য কেউ ঈমান আনবে না। অতএব তাদের কার্যকলাপে বিমর্ষ হবেন না। আর আপনি আমার সম্মুখে আমারই নির্দেশ মোতাবেক একটি নৌকা তৈরী করুন এবং পাপিষ্ঠদের ব্যাপারে আমাকে কোন কথা বলবেন না। অবশ্যই তারা ডুবে মরবে। তিনি নৌকা তৈরী করতে লাগলেন, আর তাঁর কওমের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা যখন পার্শ্ব দিয়ে যেত, তখন তাঁকে বিদ্রূপ করত। তিনি বললেন, তোমরা যদি আমাকে উপহাস করে থাক, তবে তোমরা যেমন উপহাস করছ আমরাও তদ্রূপ তোমাদের উপহাস করছি। অতঃপর অচিরেই জানতে পারবে লাঞ্ছনাদায়ক আযাব কার উপর আসে এবং চিরস্থায়ী আযাব কার উপর অবতরণ করে। অবশেষে যখন আমার হুকুম এসে পৌঁছল এবং ভূ-পৃষ্ঠ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল, আমি বললাম, সর্বপ্রকার জোড়ার দু'টি করে এবং যাদের উপর পূর্বাহ্ণেই হুকুম হয়ে গেছে তাদের বাদ দিয়ে আপনার পরিজনবর্গ এবং সকল ঈমানদারগণকে নৌকায় তুলে নিন। বলা বাহুল্য, অতি অল্পসংখ্যক লোকই তাঁর সাথে ঈমান এনেছিল। আর তিনি বললেন, তোমরা এতে আরোহণ কর। আল্লাহ্ নামেই এর গতি ও স্থিতি। আমার পালনকর্তা অতি ক্ষমাপরায়ণ, মেহেরবান। আর নৌকাখানি তাদের বহন করে চলল পর্বতপ্রমাণ তরঙ্গমালার মাঝে। আর নূহ (আঃ) তাঁর পুত্রকে ডাক দিলেন, সে সরে রয়েছিল, তিনি বললেন, প্রিয় বৎস! আমাদের সাথে আরোহণ কর এবং কাফেরদের সাথে থেক না। সে বলল, আমি অচিরেই কোন পাহাড়ে আশ্রয় নেব, যা আমাকে পানি হ'তে রক্ষা করবে। নূহ (আঃ) বললেন, আজকের দিনে আল্লাহ্র হুকুম থেকে কোন রক্ষাকারী নেই। একমাত্র তিনি যাকে দয়া করবেন। এমন সময় উভয়ের মাঝে তরঙ্গ আড়াল হয়ে দাঁড়াল, ফলে সে নিমজ্জিত হ'ল। আর নির্দেশ দেয়া হ'ল, হে পৃথিবী! তোমার পানি গিলে ফেল, আর হে আকাশ ক্ষান্ত হও। আর পানি হ্রাস করা হ'ল এবং কাজ শেষ হয়ে গেল। আর জুদী পর্বতে নৌকা ভিড়ল এবং ঘোষণা করা হ'ল, দুরাত্মা কাফেররা নিপাত যাক। আর নূহ (আঃ) তাঁর পালনকর্তাকে ডেকে বললেন, হে পরওয়ারদেগার! আমার পুত্র তো আমার পরিজনদের অন্তর্ভুক্ত, আর আপনার ওয়াদাও নিঃসন্দেহে সত্য। আর আপনিই সর্বাপেক্ষা বিজ্ঞ ফায়ছালাকারী। আল্লাহ বলেন, হে নূহ! নিশ্চয়ই সে আপনার পরিবারভুক্ত নয়। নিশ্চয়ই সে দুরাচার। সুতরাং আমার কাছে এমন দরখাস্ত করবেন না, যার খবর আপনি জানেন না। আমি আপনাকে উপদেশ দিচ্ছি যে, আপনি অজ্ঞদের দলভুক্ত হবেন না। নূহ (আঃ) বলেন, হে আমার পালনকর্তা! আমার যা জানা নেই এমন কোন দরখাস্ত করা হ'তে আমি আপনার কাছেই আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আপনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন, দয়া না করেন, তাহ'লে আমি ক্ষতিগ্রস্ত হব। হুকুম হ'ল, হে নূহ! আমার পক্ষ হ'তে নিরাপত্তা এবং আপনার নিজের ও সঙ্গীয় সম্প্রদায়গুলির উপর বরকত সহকারে অবতরণ করুন' (হৃদ ১১/৩৬-৪৮)।
আল্লাহ্র কাছে ক্ষমাপ্রার্থনার ইতিহাসে দাউদ (আঃ)-এর কাহিনীও বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। এ বিষয়ের বর্ণনায় আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূল (ছাঃ)-কে বলেন, 'আমার শক্তিশালী বান্দা দাউদকে স্মরণ করুন। তিনি ছিলেন আমার প্রতি প্রত্যাবর্তনশীল। আমি পর্বতমালাকে তাঁর অনুগামী করে দিয়েছিলাম, তারা সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর সাথে পবিত্রতা ঘোষণা করত । আর পক্ষীকুলকেও, যারা তাঁর কাছে সমবেত হ'ত। সবাই ছিল তাঁর প্রতি প্রত্যাবর্তনশীল। আমি তাঁর সাম্রাজ্যকে সুদৃঢ় করেছিলাম এবং তাঁকে দিয়েছিলাম প্রজ্ঞা ও ফায়ছালাকারী বাগ্মীতা। আপনার কাছে দাবীদারদের বৃত্তান্ত পৌঁছেছে, যখন তারা প্রাচীর ডিঙিয়ে ইবাদতখানায় প্রবেশ করেছিল। যখন তারা দাউদের কাছে অনুপ্রবেশ করল, তখন তিনি সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লেন। তারা বলল, ভয় করবেন না, আমরা বিবদমান দু'টি পক্ষ, একে অপরের প্রতি বাড়াবাড়ি করেছি। অতএব আমাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করুন, অবিচার করবেন না। আমাদেরকে সরল পথ প্রদর্শন করুন। সে আমার ভাই, সে নিরানব্বইটি দুম্বার মালিক আর আমি মালিক একটি মাদী দুম্বার। এরপরও সে বলে, এটিও আমাকে দিয়ে দাও। সে কথাবার্তায় আমার উপর বলপ্রয়োগ করে। দাউদ বললেন, সে তোমার দুম্বাটিকে নিজের দুম্বাগুলির সাথে সংযুক্ত করার দাবী করে তোমার প্রতি অবিচার করেছে। শরীকদের অনেকেই একে অপরের প্রতি যুলুম করে থাকে। তবে তারা করে না, যারা আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাসী এবং সৎকর্ম সম্পাদনকারী। অবশ্য এমন লোকের সংখ্যা অল্প । দাউদের খেয়াল হ'ল যে, আমি তাকে পরীক্ষা করছি। অতঃপর সে তাঁর পালনকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করল, সিজদায় লুটিয়ে পড়ল এবং তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করলেন। আমি তাঁর সে অপরাধ ক্ষমা করলাম। নিশ্চয়ই আমার কাছে তাঁর জন্য রয়েছে উচ্চ মর্তবা ও সুন্দর আবাসস্থল' (ছোয়াদ ৩৮/১৭-২৫)।
বিগত নবী-রাসূলগণের ভুল-ত্রুটির ঐতিহাসিক কাহিনী সমূহ উম্মতে মুহাম্মাদীর অবগতিকল্পে আমাদের মহানবী (ছাঃ)-কে তা উদাহরণ স্বরূপ বর্ণনা করা হয়েছে। ঐগুলোরই অংশ হিসাবে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবীব (ছাঃ)-কে বলেন, 'স্মরণ করুণ আইয়ূবের কথা, যখন তিনি তাঁর পালনকর্তাকে আহ্বান করে বলেছিলেন, আমি দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়েছি এবং আপনি দয়াবানদের চাইতেও শ্রেষ্ঠ দয়াবান। অতঃপর আমি তাঁর আহ্বানে সাড়া দিলাম এবং তাঁর দুঃখ-কষ্ট দূর করে দিলাম এবং তাঁর পরিবারবর্গ ফিরিয়ে দিলাম। আর তাদের সাথে তাদের সমপরিমাণ আরও দিলাম আমার পক্ষ থেকে কৃপাবশতঃ। এটা ইবাদতকারীদের জন্য উপদেশ স্বরূপ। আর ইসমাঈল, ইদরীস ও যুলকিফলের কথা স্মরণ করুন, তাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন ছবরকারী। আমি তাঁদেরকে আমার রহমতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম, তাঁরা ছিলেন সৎকর্মপরায়ণ। আর মাছওয়ালার কথা স্মরণ করুন যখন তিনি ক্রুব্ধ হয়ে চলে গিয়েছিলেন। অতঃপর মনে করেছিলেন যে, আমি তাঁকে ধৃত করতে পারব না। অতঃপর তিনি অন্ধকারের মধ্যে আহ্বান করলেন। আপনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, আপনি নির্দোষ, আমি গোনাহগার। অতঃপর আমি তাঁর আহ্বানে সাড়া দিলাম এবং তাঁকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিলাম। আমি এমনিভাবে বিশ্বাসীদেরকে মুক্তি দিয়ে থাকি। যাকারিয়ার কথা স্মরণ করুন, যখন তিনি তাঁর পালনকর্তাকে আহ্বান করেছিলেন হে আমার পালনকর্তা! আমাকে একা রাখবেন না, আপনি তো উত্তম ওয়ারিছ। অতঃপর আমি তাঁর দো'আ কবুল করেছিলাম, তাঁকে দান করেছিলাম ইয়াহইয়া এবং তাঁর জন্য তাঁর স্ত্রীকে প্রসবযোগ্য করেছিলাম। তাঁরা সৎকর্মে ঝাঁপিয়ে পড়তেন, তাঁরা আশা ও ভীতি সহকারে আমাকে ডাকতেন এবং তাঁরা ছিলেন আমার কাছে বিনীত' (আম্বিয়া ২১/৮৩-৯০)।
খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের ধর্মবিশ্বাস ঈসা (আঃ)-এর উপাস্যতা খণ্ডনের এক প্রশ্নোত্তর পর্বে মহান আল্লাহ প্রত্যাদেশ করেন, 'যখন আল্লাহ বললেন, হে ঈসা ইবনে মরিয়াম! তুমি কি লোকদেরকে বলেছিলে যে, আল্লাহকে ছেড়ে আমাকে ও আমার মাতাকে উপাস্য সাব্যস্ত কর? ঈসা বললেন, আপনি পবিত্র। আমার জন্য শোভা পায় না যে, আমি এমন কথা বলি, যা বলার কোন অধিকার আমার নেই। যদি আমি বলে থাকি, তবে আপনি অবশ্যই পরিজ্ঞাত, আপনি তো আমার মনের কথাও জানেন এবং আমি জানি না যা আপনার মনে আছে। নিশ্চয়ই আপনিই অদৃশ্য বিষয়ে জ্ঞাত। আমি তো তাদেরকে কিছুই বলিনি, শুধু সে কথাই বলেছি যা আপনি বলতে আদেশ করেছিলেন যে, তোমরা আল্লাহ্র দাসত্ব কর, যিনি আমার ও তোমাদের পালনকর্তা, আমি তাদের সম্পর্কে অবগত ছিলাম যতদিন তাদের মধ্যে ছিলাম। অতঃপর যখন আপনি আমাকে লোকান্তরিত করলেন, তখন থেকে আপনিই তাদের সম্পর্কে অবগত আছেন। আপনি সব বিষয়ে পূর্ণ পরিজ্ঞাত। যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি দেন, তবে তারা আপনার দাস এবং যদি আপনি তাদের ক্ষমা করেন, তবে আপনিই পরাক্রান্ত মহাবিজ্ঞ' (মায়েদাহ ৫/১১৬-১১৮)।
আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়, যারা এই বিশ্বাসে সন্দেহ পোষণ করে বা কাউকে আল্লাহ্ অংশীদার সাব্যস্ত করে, শুধু তারাই আল্লাহ্ ক্ষমা হ'তে সম্পূর্ণ বাদ যাবে। এতদ্ব্যতীত যত বড়ই পাপী বা মহাপাপী হোক আল্লাহ তাকে মাফ করে দিতে পারেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু যে আল্লাহ্ ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব বা অনুরূপ কিছু দাবী করবে সে কখনও ক্ষমা পাবে না। উপরের আলোচনায় নবীকুলের অন্যতম সম্মানিত নবী ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের লোকেরা যে দাবী করে, তাতে ঈসা (আঃ)-এর মনোভাব পরীক্ষা করার জন্য আল্লাহ তা'আলা তাঁকে খ্রীষ্টানদের দাবীর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন করেন। ঈসা (আঃ) অন্তর্যামী আল্লাহ্র কাছে ঐ বিষয়ের পবিত্রতা ও স্বচ্ছতার সঠিক জবাবদিহিতা করেন এবং পৃথিবীতে থাকা অবস্থায় যারা আল্লাহ ও তাঁর অনুগত ছিল তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। অতঃপর তাঁকে লোকান্তরিত করার পর যা হয়েছে তা সবিনয়ে আল্লাহ্র উপর সমর্পণ করেন।
প্রোক্ত আলোচনায় বোঝা যায় খ্রীষ্টানরা ঈসা (আঃ)-কে মর্যাদা দেয়ার জন্য যা কিছু বলে তাতে যদি তিনি আনন্দিত বা বিন্দুমাত্র গর্বিত হ'তেন, তবে ইতিহাস অন্যরূপ হয়ে যেত। কিন্তু তিনি তা না করে তাঁর নবী ও মানব মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখেন। অতীতে অনেক স্বৈরাচারী ও স্বেচ্ছাচারী শক্তিবলে নিজেকেই 'আল্লাহ' বলে দাবী করেছে। কিন্তু নবী-রাসূলগণ তো তা করেনইনি, পরন্তু তাঁরা সব সময়ই আল্লাহ্র নিকট বিনীতভাবে ক্ষমাপ্রার্থনা করে গেছেন। আমাদের মহানবী (ছাঃ)ও তাঁর এবং তাঁর উম্মতবর্গের জন্য মহাক্ষমাশীল আল্লাহ্র নিকট অত্যন্ত বিনয় ও করুণভাবে প্রার্থনা করে গেছেন এবং পবিত্র কুরআনে তা বর্ণিত হয়েছে, 'যা কিছু আকাশসমূহে রয়েছে এবং যা কিছু যমীনে আছে, সব আল্লাহ্রই। যদি তোমরা মনের কথা প্রকাশ কর কিংবা গোপন কর, আল্লাহ তোমাদের কাছ থেকে তার হিসাব নেবেন। অতঃপর যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করবেন এবং যাকে ইচ্ছা তিনি শাস্তি দেবেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে শক্তিমান। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বিশ্বাস রাখেন ঐ সমস্ত বিষয় সম্পর্কে যা তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাঁর উপর অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুসলমানরাও সবাই বিশ্বাস রাখে আল্লাহ্র প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর গ্রন্থসমূহের প্রতি এবং তাঁর পয়গম্বরগণের প্রতি। তারা বলে, আমরা তাঁর পয়গম্বরগণের মধ্যে কোন তারতম্য করি না। তারা বলে, আমরা শুনেছি এবং কবুল করেছি। আমরা আপনার ক্ষমা চাই, হে আমাদের পালনকর্তা! আপনারই দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না। সে তা-ই পায় যা সে উপার্জন করে এবং তা-ই তার উপর বর্তায় যা সে করে। হে আমাদের পালনকর্তা! যদি আমরা ভুলে যাই কিংবা ভুল করি, তবে আমাদেরকে অপরাধী করবেন না। হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের উপর এমন দায়িত্ব অর্পণ করবেন না, যেমন আমাদের পূর্ববর্তীদের উপর অর্পণ করেছেন। হে আমাদের প্রভু! আমাদের দ্বারা ঐ বোঝা বহন করাবেন না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই। আমাদের পাপ মোচন করুন। আমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং আমাদের প্রতি দয়া করুন। আপনিই আমাদের প্রভু, সুতরাং কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য করুন' (বাক্বারাহ ২/২৮৪-২৮৬)। অন্যত্র ক্ষমাশীল আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূল (ছাঃ)-কে বলেন, 'বলুন, হে আমার পালনকর্তা! ক্ষমা করুন ও রহম করুন। রহমকারীদের মধ্যে আপনি শ্রেষ্ঠ রহমকারী' (মুমিনূন ২৩/১১৮)।
নবী-রাসূলগণের ক্ষমা প্রার্থনায় তাঁদের সামান্য ভুল-ত্রুটি বা ত্রুটি-বিচ্যুতির অনুরূপ বিষয়গুলি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে সাথে তুলে ধরা হয়েছে। এসব অসামান্য আলোচনায় উম্মতে মুহাম্মাদীর অফুরন্ত কল্যাণ নিহিত রয়েছে। আল্লাহ্র কাছে ক্ষমাপ্রার্থী হওয়া যে কত মহান কাজ তা হৃদয়ঙ্গম করার জন্যই নবী-রাসূলগণের ক্ষমা প্রার্থনা ও প্রার্থনার বাক্যগুলি পবিত্র কুরআনে লিপিবদ্ধ হয়েছে। এগুলির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করত বাস্তব জীবনে সুশিক্ষা গ্রহণ করায় আল্লাহ্র সন্তুষ্টির কারণ হবে বলে আশা করা যায়। তিনি তাঁর সকল বান্দার প্রতি রহম করুন এবং ক্ষমাপ্রার্থনার জ্ঞান দান করুন।
📄 আল্লাহ যাদের ক্ষমা করবেন না
আল্লাহ তা'আলার যাবতীয় আদেশের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছে, একমাত্র আল্লাহ্র আনুগত্য করা। সর্বনিকৃষ্ট পাপ হচ্ছে আল্লাহ্ শরীক সাব্যস্ত করা। যেটা আল্লাহ তা'আলার পক্ষে চরম অসন্তোষ ও অপসন্দনীয় বিষয়। কারণ এক আল্লাহ সত্য, দ্বীন ইসলাম সত্য, জন্ম-মৃত্যু, ইহকাল-পরকাল, নবী-রাসূল, ক্বিয়ামত, জান্নাত-জাহান্নাম সবই সত্য। এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ সকল সত্যের প্রবর্তক। কিন্তু বিপরীতে আল্লাহ্ শরীক মিথ্যা, জান্নাত ও জাহান্নামে অবিশ্বাস মিথ্যা, সর্বোপরি পরকাল ও অনন্তকালে অবিশ্বাসও মিথ্যা। আর শয়তান (ইবলীস) সকল মিথ্যার প্রবর্তক।
ইসলামের ঘোর শত্রু, মিথ্যার প্রবর্তক ইবলীস তার প্রচেষ্টা, প্ররোচনা-প্রবঞ্চনায় প্রাগৈতিহাসিক যুগ হ'তে ধীরে ধীরে অতি কৌশলে মানুষকে মিথ্যার পানে নিবিড়ভাবে আকৃষ্ট করছে। ফলে সারা বিশ্বে আল্লাহ্ সমকক্ষ বহু মানুষ, জ্বিন, দেব-দেবী, মূর্তি, জড়বস্তু, প্রকৃতি ইত্যাদি শক্তির উদ্ভব হয়েছে। কিন্তু আল্লাহ্র সমতুল্য বা তাঁর চেয়ে কমবেশী উপকারী বলে পূজনীয় বস্তুগুলি তাদের (পূজকদের) বিন্দু-বিসর্গও উপকার করতে পারে না। তাদের এহেন হীন ও গর্হিত সিদ্ধান্তের প্রতিফল দেওয়ার জন্য আল্লাহ দৃঢ় প্রতিজ্ঞা রয়েছেন। এরূপ শিরককারীদের আল্লাহ কখনও ক্ষমাও করবেন না। মহান আল্লাহ বলেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُوْنَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا بَعِيدًا
'নিশ্চয়ই আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে তাঁর সাথে কাউকে শরীক করে। এছাড়া যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। যে আল্লাহ্র সাথে শরীক করে, সে সুদূর ভ্রান্তিতে পতিত হয়' (নিসা ৪/১১৬)।
অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يَشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْماً عَظِيمًا
'নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে লোক তাঁর সাথে শরীক করে। তিনি ক্ষমা করেন এতদ্ব্যতীত অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন। আর যে লোক অংশীদার সাব্যস্ত করল আল্লাহ্র সাথে সে যেন অপবাদ আরোপ করল' (নিসা ৪/৪৮)।
আল্লাহ তা'আলা তাঁর সাথে শরীক স্থাপনকারীদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর এবং শাস্তি দানে দৃঢ় সংকল্প। এ বিষয়ে বিশেষ হুঁশিয়ারী প্রদান করে তিনি তাঁর প্রিয় রাসূল (ছাঃ)-কে বলেন,
فَلَا تَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَهَا آخَرَ فَتَكُوْنَ مِنَ الْمُعَذِّبِينَ
'অতএব আপনি আল্লাহ্র সাথে অন্য উপাস্যকে আহ্বান করবেন না। করলে শাস্তিতে পতিত হবেন' (শু'আরা ২৬/২১৩)।
পবিত্র কুরআন মাজীদের উপরোক্ত বাণীর প্রতি সংগত কারণেই সকল মুমিন, ধর্মভীরু ও আল্লাহভীরু বান্দার মনোযোগী ও আস্থাশীল হওয়া একান্তই বাঞ্ছনীয়। পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনে যে কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি, অন্যায়-অপরাধ বা পাপ সমূহ হ'তে শিরক অধিক মারাত্মক। কারণ আল্লাহ্র সঙ্গে শরীক স্থাপন, তাঁর একক সার্বভৌমত্বের প্রতি হস্ত ক্ষেপ করার স্পর্ধা ছাড়া কিছু নয়। আর এটা সবচেয়ে বড় সীমালংঘন। আল্লাহ্র সাথে শরীক স্থাপনকারী ছাড়া যেকোন ব্যক্তির বিশাল পাপরাশিও আল্লাহ তা'আলা ইচ্ছা করলে ক্ষমা করে দিতে পারেন।
শিরকমুক্ত বড় পাপীও সর্বশেষ সুযোগে আল্লাহ্ ওয়াদা অনুযায়ী ক্ষমাপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে অর্থাৎ ক্ষমা পেয়ে যাবে। এ সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদীছ আবু যর থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাতে আমি বের হ'লাম। আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে একাকী হেঁটে যেতে দেখলাম। আমি ভাবলাম রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সম্ভবত চান না যে, কেউ তাঁর সঙ্গী হোক। সুতরাং আমি চন্দ্রলোকে হাঁটতে লাগলাম। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) পিছনে ফিরে আমাকে দেখে বললেন, কে ওখানে? আমি বললাম, আবু যর, আল্লাহ আপনার জন্য আমাকে কোরবান করুক। তিনি বললেন, আবু যর এসো। আমি তাঁর সাথে কিছুক্ষণ চললাম, তিনি বললেন, ধনীরাই প্রকৃতপক্ষে ক্বিয়ামতের দিন দরিদ্র। তবে যে ব্যক্তিকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন, সে তা (সৎপথে) ডানে, বামে, সামনে, পিছনে খরচ করবে এবং ভাল কাজে ব্যয় করবে। (আবু যর বলেন) আমি আরও কিছুক্ষণ তাঁর সাথে চললে তিনি বললেন, এখানে বসো। এই বলে আমাকে চারদিকে পাহাড় ঘেরা ময়দানে বসিয়ে বললেন, আমি না আসা পর্যন্ত এখানে বসে থাক। (আবু যর বলেন) তিনি পাথুরে প্রান্তরের দিকে চলে গেলেন, এমনকি আমার দৃষ্টির অন্তরালে চলে গেলেন। অতঃপর দীর্ঘক্ষণ পরে আমি তাঁকে বলতে শুনলাম যে, 'যদি সে চুরি করে এবং যেনা করে! অতঃপর যখন তিনি এলেন, তখন আমার ধৈর্যচ্যুতি ঘটল, আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! আপনার জন্য আল্লাহ আমার জীবনকে কোরবান করুন! আপনি ওখানে কার সাথে কথা বলছিলেন? কাউকে তো আপনার কথার প্রতি উত্তর করতে শুনলাম না। তিনি বললেন, সে তো ছিল জিবরাঈল! ময়দানের প্রান্তেই আমার কাছে এসে বলল, 'আপনার উম্মতকে সুসংবাদ দিন, যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সাথে কাউকে শরীক না করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে'। (রাসূলুল্লাহ বলেন) আমি জিজ্ঞেস করলাম, যদি সে যেনা করে এবং চুরি করে? সে বলল, যদিও সে যেনা করে এবং চুরি করে। আমি (পুনরায়) বললাম, যদি সে যেনা করে এবং চুরি করে? সে বলল, যদি সে যেনা করে এবং চুরি করে। আমি (আবারও) বললাম, যদি সে যেনা করে এবং চুরি করে? সে বলল, যদি সে যেনা করে এবং চুরি করে, আর যদি শারাবও পান করে। আবু দারদা থেকে বর্ণিত রেওয়ায়েতে (একথাও) আছে যে, যদি সে মৃত্যুকালে 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে (বুখারী হা/৬০৭৮ ‘ধনীরাই মূলত দরীদ্র' পরিচ্ছেদ, ‘রিক্বাক’ অধ্যায়)।
উপরোল্লেখিত আয়াত ও হাদীছ হ'তে বোঝা যায় আল্লাহ্র সঙ্গে শিরক করা জঘন্যতম অপরাধ। বিষয়টিকে যদি সাধারণ অর্থেই ব্যাখ্যা করা যায়, তবে এর অর্থ দাঁড়াবে কারো নিজস্ব বস্তু বা সম্পদ অন্য লোকে জবর দখল করে নেওয়া বা ঐ বস্তুতে কিছু ভাগ বসান বুঝায়। পৃথিবীতে এরূপ ঘটনার কোন অভাব নেই। এমনকি পবিত্র কুরআনেও এরূপ নযীর এসেছে এবং গত অধ্যায়েই তা আলোচনা করেছি। সেটি হ'ল বিবাদমান দু'ব্যক্তি, একজন নিরানব্বইটি দুম্বার মালিক এবং অপরজন একটি দুম্বার মালিক। নিরানব্বই দুম্বার মালিক একটি দুম্বার মালিকের কাছে তার দুম্বাটি নেওয়ার জন্য বল প্রয়োগ করে কথা বলত। অতঃপর তারা বিচারের জন্য দাঊদ (আঃ)-এর নিকট উভয়ে গমন করে। পৃথিবীতে এ ধরনের অনধিকার চর্চা নিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য ঝগড়া-বিবাদ ও রক্তপাত ঘটছে।
সুতরাং বিশ্বজগতের তথা নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল ও জানা-অজানা অসংখ্য জগতের যিনি একক অধিপতি বা বাদশাহ, যেখানে কারও সূচাগ্র পরিমাণ অধিকার নেই, সমগ্র সৃষ্টি তাঁর পবিত্রতা, মহিমা, গরিমা ঘোষণা করে, সবাই তাঁর কাছে প্রার্থী ও ক্ষমাপ্রার্থী, শুধু সামান্য সংখ্যক মানুষ তাঁর এ অধিকারে হস্তক্ষেপ করবে, এটা অমার্জনীয় অপরাধ। শুধু এরাই আল্লাহ্ কাছে ক্ষমা পাবে না। এদেরকে ভয়াবহ জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত করবেনই। আল্লাহ বলেন,
إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ،
'নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সাথে অংশীদার স্থির করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার বাসস্থান জাহান্নাম' (মায়েদাহ ৫/৭২)।
একই মর্মার্থে অন্যত্র প্রত্যাদেশ এসেছে, 'নবী ও মুমিনদের উচিত নয় অংশীবাদীদের জন্য মাগফেরাত কামনা করা, যদিও তারা আত্মীয় হোক, একথা সুস্পষ্ট হওয়ার পর যে তারা জাহান্নামী' (তওবা ৯/১১৩)।
অংশীবাদীদের পরিণতির অপর এক বর্ণনায় সর্বজ্ঞ আল্লাহ বলেন, 'অমোঘ প্রতিশ্রুত সময় নিকটবর্তী হ'লে কাফেরদের চক্ষু উচ্চে স্থির হয়ে যাবে, হায় আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা এ বিষয়ে বেখবর ছিলাম, বরং আমরা গোনাহগারই ছিলাম। তোমরা এবং আল্লাহ্র পরিবর্তে তোমরা যাদের পূজা কর, সেগুলো জাহান্নামের ইন্ধন। তোমরাই তাতে প্রবেশ করবে। এই মূর্তিরা যদি উপাস্য হ'ত, তবে জাহান্নামে প্রবেশ করত না। প্রত্যেকেই তাতে চিরস্থায়ী হয়ে পড়ে থাকবে। তারা সেখানে চীৎকার করবে এবং সেখানে তারা কিছুই শুনতে পাবে না' (আম্বিয়া ২১/৯৭-১০০)।
তিনি আরো বলেন, 'যখন যালেমরা আযাব প্রত্যক্ষ করবে, তখন তাদের থেকে তা লঘু করা হবে না এবং তাদেরকে কোন অবকাশ দেয়া হবে না। অংশীবাদীরা যখন ঐসব বস্তুকে দেখবে, যেসবকে তারা আল্লাহ্র সাথে শরীক সাব্যস্ত করেছিল, তখন বলবে, হে আমাদের পালনকর্তা! এরাই তারা যারা আমাদের শিরকীর উপাদান, আপনাকে ছেড়ে যাদেরকে আমরা ডাকতাম। তখন ওরা তাদেরকে বলবে, তোমরা মিথ্যাবাদী। সেদিন তারা আল্লাহ্র সামনে আত্মসমর্পণ করবে এবং তারা যে মিথ্যা অপবাদ দিত তা বিস্মৃত হবে। যারা কাফের হয়েছে এবং আল্লাহ্র পথে বাধা সৃষ্টি করেছে, আমি তাদেরকে আযাবের পর আযাব বাড়িয়ে দেব। কারণ তারা অশান্তি সৃষ্টি করত' (নাহ'ল ১৬/৮৫-৮৮)।
আল্লাহ আরও বলেন, 'তারা ক্বিয়ামতকে অস্বীকার করে এবং যে ক্বিয়ামতকে অস্বীকার করে, আমি তার জন্য অগ্নি প্রস্তুত করেছি। অগ্নি যখন দূর থেকে তাদেরকে দেখবে, তখন তারা শুনতে পাবে তার গর্জন ও হুঙ্কার। যখন এক শিকলে কয়েকজন বাঁধা অবস্থায় জাহান্নামের কোন সংকীর্ণ স্থানে নিক্ষেপ করা হবে, তখন সেখানে তারা মৃত্যুকে ডাকবে। বলা হবে, আজ তোমরা এক মৃত্যুকে ডেকো না অনেক মৃত্যুকে ডাক। বলুন, এটা উত্তম, না চিরকাল বসবাসের জান্নাত, যার সুসংবাদ দেয়া হয়েছে মুত্তাকীদেরকে? সেটা হবে তাদের প্রতিদান ও প্রত্যাবর্তন স্থান, তারা চিরকাল বসবাসরত অবস্থায় সেখানে যা চাইবে, তাই পাবে। এই प्रार्थীত ওয়াদা পূরণ আপনার পালনকর্তার দায়িত্ব। সেদিন আল্লাহ একত্রিত করবেন তাদেরকে এবং তারা আল্লাহ্র পরিবর্তে যাদের ইবাদত করত তাদেরকে, সেদিন তিনি উপাস্যদেরকে বলবেন, তোমরাই কি আমার এই বান্দাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিলে, না তারা নিজেরাই পথভ্রষ্ট হয়েছিল? তারা বলবে, আপনি পবিত্র আমরা আপনার পরিবর্তে অন্যকে মুরুব্বীরূপে গ্রহণ করতে পারতাম না, কিন্তু আপনিই তো তাদেরকে এবং তাদের পিতৃপুরুষদেরকে ভোগসম্ভার দিয়েছিলেন। ফলে তারা আপনার স্মৃতি বিস্তৃত হয়েছিল এবং তারা ছিল ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতি। আল্লাহ মুশরিকদেরকে বলবেন, তোমাদের কথা তো তারা মিথ্যা সাব্যস্ত করল, এখন তোমরা শাস্তি প্রতিরোধ করতে পারবে না এবং সাহায্যও করতে পারবে না। তোমাদের মধ্যে যে গোনাহগার আমি তাকে গুরুতর শাস্তি আস্বাদন করাব' (ফুরক্বান ২৫/১১-১৯)।
অংশীবাদীদের আয়াতগুলিতে আল্লাহ্ সীমাহীন অসন্তুষ্টি প্রকাশ পেয়েছে, 'ওরা প্রত্যেকেই কি মাথার উপর স্ব স্ব কৃতকর্ম নিয়ে দণ্ডায়মান নয়? এবং তারা আল্লাহ্ জন্য অংশীদার সাব্যস্ত করে। বলুন, নাম বল অথবা খবর দাও পৃথিবীর এমন কিছু জিনিস সম্পর্কে যা তিনি জানেন না অথবা অসার কথাবার্তা বলছ? বরং সুশোভিত করা হয়েছে কাফেরদের জন্য তাদের প্রতারণাকে এবং তাদেরকে সৎপথ থেকে বাধাদান করা হয়েছে। আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তার কোন পথপ্রদর্শক নেই। দুনিয়ার জীবনেই এদের জন্য রয়েছে আযাব এবং অবশ্য আখেরাতের জীবন কঠোরতম। আল্লাহ্র কবল থেকে তাদের কোন রক্ষাকারী নেই' (রা'দ ১৩/৩৩, ৩৪)।
এ আলোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, শুধু আল্লাহ্র সাথে অংশীদার স্থাপনকারী দল ছাড়া অন্যান্য পাপী, অপরাধী এমনকি বড় বড় গোনাহগাররাও শেষ পর্যন্ত ক্ষমা পেয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে যেসব বিশ্বাসের কথা বলা হয়েছে, সেরূপ কোন বিশ্বাস সৃষ্ট কোন বস্তুর প্রতি পোষণ করাই হ'ল শিরক। শিরকের তাৎপর্য বা রহস্য হচ্ছে আল্লাহ ব্যতীত কোন সৃষ্ট বস্তুকে ইবাদত কিংবা মুহাব্বত কিংবা সম্মান প্রদর্শন বা তার মহিমা-গরিমা ও প্রশংসায় আল্লাহ্র সমতুল্য মনে করা। এসব শরীক স্থাপনকারীদেরকে আল্লাহ কখনও ক্ষমা করবেন না।
কতিপয় কৃত্রিম ঈমানদার হয়ত শিরক করে বা করে না, গোনাহ করে অতঃপর تওবা করে। আবার পৃথিবীর মোহে, প্রবৃত্তির তাড়নায়, আন্তরিক ভীতির অভাবে, পরিবেশের চাপে তওবার কথা ভুলে গিয়ে অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়ে। অতঃপর কিছুকাল পর পুনরায় তওবা করে এবং অনির্দিষ্টকাল পর পথভ্রষ্ট হয় এবং আবার তওবা করে। এভাবে বার বার কৃত্রিম তওবার মাধ্যমে আল্লাহ্র সাথে প্রহসন করে। এরূপ ব্যক্তির তওবা কখনও কবুল হবে না। এদের অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, 'আর এমন লোকদের জন্য কোন ক্ষমা নেই, যারা মন্দ কাজ করতেই থাকে, এমনকি যখন তাদের কারো মাথার উপর মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন বলতে থাকে, আমি এখন তওবা করছি। আর তওবা নেই তাদের জন্য, যারা কুফরী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। আমি তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি' (নিসা ৪/১৮)।
অন্য আয়াতে বর্ণিত হয়েছে এভাবে, 'যারা একবার মুসলমান হয়ে পুনরায় কাফের হয়ে গেছে, আবার মুসলমান হয়েছে এবং আবারও কাফের হয়েছে এবং কুফরীতেই উন্নতি লাভ করেছে, আল্লাহ তাদেরকে না ক্ষমা করবেন, না পথ দেখাবেন' (নিসা ৪/১৩৭)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, 'যারা কুফরী অবলম্বন করেছে এবং আল্লাহ্র পথে বাধা সৃষ্টি করেছে, তারা সুদূর ভ্রান্তি তে পতিত হয়েছে। যারা কুফরী অবলম্বন করেছে এবং সত্য চাপা দিয়ে রেখেছে, আল্লাহ কখনও তাদেরকে ক্ষমা করবেন না এবং সরলপথ দেখাবেন না' (নিসা ৪/১৬৭, ১৬৮)।
মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেন, 'নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের রাজত্ব আল্লাহ্ই যেদিন ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন মিথ্যাপন্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আপনি প্রত্যেক উম্মতকে দেখবেন নতজানু অবস্থায়। প্রত্যেক উম্মতকে তাদের আমলনামা দেখতে বলা হবে। তোমরা যা করতে, অদ্য তোমাদেরকে তার প্রতিফল দেয়া হবে। আমার কাছে রক্ষিত এই আমলনামা তোমাদের সম্পর্কে সত্য কথা বলবে। তোমরা যা করতে, আমি তা লিপিবদ্ধ করতাম। যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং সৎকর্ম করেছে, তাদেরকে তাদের পালনকর্তা স্বীয় রহমতে দাখিল করবেন। এটাই প্রকাশ্য সাফল্য। আর যারা কুফরী করেছে, তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে, তোমাদের কাছে কি আয়াতসমূহ পঠিত হ'ত না? কিন্তু তোমরা অহংকার করেছিলে এবং তোমরা ছিলে এক অপরাধী সম্প্রদায়। যখন বলা হ'ত, আল্লাহ্র ওয়াদা সত্য এবং ক্বিয়ামতে কোন সন্দেহ নেই, তখন তোমরা বলতে আমরা জানি না কিয়ামত কি? আমরা কেবল ধারণাই করি এবং এ বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই। তাদের মন্দ কর্মগুলো তাদের সামনে প্রকাশ হয়ে পড়বে এবং যে আযাব নিয়ে তারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত, তা তাদেরকে গ্রাস করবে। বলা হবে, আজ আমি তোমাদেরকে ভুলে যাব, যেমন তোমরা এদিনের সাক্ষাৎকে ভুলে গিয়েছিলে। তোমাদের আবাসস্থল জাহান্নাম এবং তোমাদের সাহায্যকারী নেই। এটা এজন্য যে তোমরা আল্লাহ্ আয়াত সমূহকে ঠাট্টা রূপে গ্রহণ করেছিলে এবং পার্থিব জীবন তোমাদেরকে প্রতারিত করেছিল। সুতরাং আজ তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে না এবং তাদের কাছে তওবা চাওয়া হবে না' (জাছিয়া ৪৫/২৭-৩৫)।
ইতিমধ্যে ক্ষমা প্রার্থনার আয়াতগুলোতে আমরা দেখেছি, আল্লাহ ক্ষমাপ্রার্থীকে ভালবাসেন। তিনি অন্তর্যামী, কাজেই কোন অকৃত্রিম ক্ষমাপ্রার্থীকে ফিরিয়ে দেন না। কৃত্রিম ধর্মপালন বা ক্ষমা প্রার্থনা মিথ্যার নামান্তর ছাড়া কিছুই নয়। কাজেই অন্তর্যামী আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা প্রার্থনায় অকৃত্রিম বা আন্তরিক ক্ষমাপ্রার্থনার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। অবশ্য আলোচ্য অধ্যায়ে যাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না, তাদেরকে নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তারা প্রকাশ্যভাবেই আল্লাহ্র পরিবর্তে অন্য জীব ও জড়বস্তুর ইবাদত করে এবং তাদের (উপাস্যদের) নিকট নিজেদের কাংখিত মনস্কামনা পূরণের আবেদন বা প্রার্থনা করে এবং তাদের উদ্দেশ্যে কুরবানীও করে। আবার অনেকে গোপনভাবে বা তাদের কাজের মাঝে আল্লাহ্র পরিবর্তে অন্যকে প্রাধান্য দেয় বা মান্য করে। এসব স্পর্শকাতর আলোচনার বিশদ ব্যাখ্যা দান খুবই কঠিন। তবে সবার জন্য মনে রাখা দরকার যে আন্তরিক স্বচ্ছতার কাছে শিরক-এর কোন জীবাণু প্রবেশ করা অসম্ভব। যারা নিজেদের অন্তর বা হৃদয়কে অহেতুক ঐসব (শিরক-এর) চিন্তার সুযোগ দিবে তারাই নিরাপদ থাকতে পারবে কি-না সন্দেহ। আল্লাহ পাক তাঁর সব বান্দাকে শিরকের অভিশাপ হ'তে মুক্ত রাখুন।