📄 যারা স্বীয় পাপ স্বীকার করে
৬. যারা স্বীয় পাপ স্বীকার করে তারা ক্ষমা পায়
মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় সৃষ্টি মানব জাতিকে যে জ্ঞান দান করেছেন, তা তাদের নিজেদের চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট মনে হয়, কিন্তু আসলে তা নয়। পৃথিবীতে জ্ঞানের নিদর্শনের ব্যাপকতা প্রচুর হওয়ায় মানুষের জ্ঞানের চাহিদা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং এক সময় তা আল্লাহ্ সন্তুষ্টি সাধনের উপযোগী হয়, আবার কোন সময় তা সীমালংঘনে প্রবৃত্ত করে অনেককে। এর জন্য ক্ষমাশীল আল্লাহ তা'আলা মানুষকে প্রথমেই দোষারোপ না করে তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে সংশোধন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। অতঃপর ক্ষমা প্রদর্শন ও উহার পুরোপুরি আশ্বাস প্রদান করে, তিনি নিজেকে ক্ষমাশীল বলে ঘোষণা করেছেন।
তবে তিনি মানুষকে তাঁর অনুবর্তী থাকা এবং অবাধ্য না হওয়ার ব্যাপারে যে সুন্দর ও সম্মানজনক বিধানাবলী অবতীর্ণ করেছেন, তা মেনে চলার জন্যও সে জ্ঞানকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন। যারা আল্লাহ্ এ আহ্বানে এবং সমগ্র সৃষ্টিতে বিশ্বাসী হয়ে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হ'তে চাইবে তারা তাঁর আশ্রয়ে বা সাহায্যে থাকবে। তাদের সামান্য ভুল- ত্রুটি আল্লাহ ক্ষমা করে দেবেন, কারণ তিনি ক্ষমাশীল। অতঃপর আল্লাহ্র এ বিশ্বাসী বান্দারা যদি ভুলবশতঃ বা অজ্ঞতাবশতঃ কোন বিধান লংঘন করে ফেলে, নিজেকে অপরাধী মনে করে তৎক্ষণাৎ তওবা করে, তবে আল্লাহ তার তওবা মঞ্জুর করে তাকে ক্ষমা করে দেন। এভাবে আল্লাহ্ বিশ্বাসী বান্দারা নানাভাবে গোনাহর কাজ করে ক্ষমা প্রার্থী হ'লে আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দেন। তাছাড়া যারা স্বীয় অপরাধ বা পাপ স্বীকার করে বিনীতভাবে ক্ষমাপ্রার্থী হয় তাদের প্রতিও তিনি ক্ষমাশীল। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন,
وَآخَرُوْنَ اعْتَرَفُوْا بِذُنُوبِهِمْ خَلَطُوا عَمَلاً صَالِحًا وَآخَرَ سَيِّئًا عَسَى اللَّهُ أَن
يَتُوْبَ عَلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُوْرٌ رَّحِيمٌ
'আর কোন কোন লোক রয়েছে, যারা নিজেদের পাপ স্বীকার করেছে, তারা মিশ্রিত করেছে একটি নেককাজ ও অন্য একটি বদকাজ। শীঘ্রই হয়ত আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়' (তওবা ৯/১০২)।
স্বীয় অপরাধ স্বীকারের ব্যাপারে এক উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক ঘটনায় জানা যায়, নবীকুলের মধ্যে খ্যাতনামা নবী ও রাসূল মূসা (আঃ) একদা ঘটনাচক্রে এক ব্যক্তিকে হত্যা করে ফেলেছিলেন। অতঃপর নিজেকে চরম অপরাধী ভেবে আল্লাহ্র নিকট বিনম্রচিত্তে ক্ষমাপ্রার্থী হয়েছিলেন। আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। বিষয়টি যেভাবে পবিত্র কুরআনে অবতীর্ণ হয়েছে তা হ'ল, 'যখন মূসা যৌবনে পদার্পণ করলেন এবং পরিণত বয়স্ক হয়ে গেলেন, তখন আমি তাঁকে প্রজ্ঞা ও জ্ঞানদান করলাম। এমনিভাবে আমি সৎকর্মীদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। তিনি শহরে প্রবেশ করলেন, যখন তার অধিবাসীরা ছিল বেখবর। তথায় তিনি দুই ব্যক্তিকে লড়াইরত দেখলেন। এদের একজন ছিল তাঁর নিজ দলের এবং অন্যজন তাঁর শত্রু দলের। অতঃপর যে তাঁর নিজ দলের সে তাঁর শত্রু দলের লোকটির বিরুদ্ধে তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করল। তখন মূসা তাকে ঘুষি মারলেন এবং এতেই তার মৃত্যু হয়ে গেল। মূসা বললেন, এটা শয়তানের কাজ। নিশ্চয়ই সে প্রকাশ্য শত্রু, বিভ্রান্তকারী। তিনি বললেন, হে আমার পালনকর্তা! আমি তো নিজের উপর যুলুম করে ফেলেছি, অতএব আমাকে ক্ষমা করুন। আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করলেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, দয়ালু' (ক্বাছাছ ২৮/১৪-১৬)। আলোচ্য আয়াতে বর্ণিত নিহত ব্যক্তি ছিল ইসলামের ঘোর শত্রু বা কাফের। তাকে হত্যা করা কোন অপরাধ হয়নি। কিন্তু মূসা (আঃ) তাকে হত্যার ইচ্ছা নিয়ে আঘাত করেননি, বরং তাঁর দলের লোকটির উপকারার্থে তাকে একটা ঘুষি মেরে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। আর এতেই তার মৃত্যু হয়ে গেলে মূসা (আঃ) নিজকে অপরাধী ভেবে আল্লাহ্র নিকট বিনম্র চিত্তে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। আল্লাহ তার প্রার্থনার বিনিময়ে তাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। এ ধরনের অনেক জানা ও অজানা ইতিহাস রয়েছে। ক্ষমা প্রসঙ্গে আল্লাহ প্রত্যাদেশ করেন, إِلَّا مَنْ ظَلَمَ ثُمَّ بَدَّلَ حُسْنًا بَعْدَ سُوْءٍ فَإِنِّي غَفُورٌ رَّحِيمٌ 'তবে যে বাড়াবাড়ি করে এরপর মন্দকর্মের পরিবর্তে সৎকর্ম করে, নিশ্চয়ই আমি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু' (নমল ২৭/১১)।
বস্তুতঃ তওবা, দয়া, ক্ষমা প্রভৃতির সমর্থনে যে আয়াতগুলি অবতীর্ণ হয়েছে, তা সামান্য ঈমানদার বান্দার জন্যও এক অতুলনীয় প্রত্যাদেশ। যেমন-প্রজ্ঞাময় আল্লাহ বলেন, وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ وَأَنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ حَكِيمٌ 'তোমাদের প্রতি আল্লাহ্র দয়া ও অনুগ্রহ না থাকলে এবং আল্লাহ তওবা কবুলকারী, প্রজ্ঞাময় না হ'লে কত কিছুই যে হয়ে যেত' (নূর ২৪/১০)।
অন্যত্র আল্লাহ বলেন, وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ وَأَنَّ اللَّهَ رَؤُوْفٌ رَّحِيمٌ 'যদি তোমাদের প্রতি আল্লাহ্ অনুগ্রহ ও দয়া না থাকত এবং আল্লাহ দয়ালু, মেহেরবান না হ'তেন তবে কত কিছুই হয়ে যেত' (নূর ২৪/২০)।
আল্লাহ তাঁর ঈমানদার বান্দাদের সতর্কতার প্রয়াসে অবহিত করেন, 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। যে কেউ শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে, তখন তো শয়তান নির্লজ্জতা ও মন্দ কাজেরই আদেশ করবে। যদি আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও দয়া তোমাদের প্রতি না থাকত, তবে তোমাদের কেউ কখনও পবিত্র হ'তে পারতে না। কিন্তু আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পবিত্র করেন। আল্লাহ সবকিছু শোনেন জানেন' (নূর ২৪/২১)।
আল্লাহ আরো বলেন, 'মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহ্র সামনে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও' (নূর ২৪/৩১)।
অতঃপর ঈমানদার ও মুমিন নর-নারীদের আশা-ভরসা সম্বলিত এক উজ্জ্বল প্রত্যাদেশে আল্লাহ বলেন, 'নিশ্চয়ই মুসলমান পুরুষ, অনুগত নারী, বিনীত পুরুষ, বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ, দানশীল নারী, ছিয়াম পালনকারী পুরুষ, ছিয়াম পালনকারী নারী, যৌনাঙ্গ হেফাযতকারী পুরুষ, যৌনাঙ্গ হেফাযতকারী নারী, আল্লাহ্র অধিক যিকরকারী পুরুষ ও যিকরকারী নারী- তাদের জন্য আল্লাহ প্রস্তুত রেখেছেন ক্ষমা ও মহাপুরস্কার' (আহযাব ৩৩/৩৫)।
উপরের আয়াতগুলিতে আল্লাহ তাঁর দয়া, ক্ষমা, রহমত, অনুগ্রহ প্রভৃতি সকল বান্দার উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ বলে জানিয়েছেন। তবে ঈমানদার ও মুমিন বান্দাগণকে অধিক নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। অতঃপর শর্তসাপেক্ষে সকল বান্দাকে এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আল্লাহ তাঁর মানব প্রতিনিধির জন্য বড়-ছোট অসংখ্য নে'মতরাজি সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্যে আসমান-যমীন, সূর্য-চন্দ্র, আলো-তাপ, বায়ু, পানি প্রভৃতি বড় বড় সৃষ্টিগুলির উপকারিতা দুনিয়ার ছোট-বড়, ভাল-মন্দ সব মানুষ, অতঃপর সব প্রাণীই সমানভাবে ভোগ করে থাকে। তদ্রূপ আল্লাহ্ দয়া, ক্ষমা, রহমত, অনুগ্রহ প্রভৃতির মত বড় বড় অদৃশ্য অবদানগুলিও দুনিয়ার সব মানুষ অতঃপর সকল প্রাণীই সমানভাবে ভোগ করে থাকে। কিন্তু আমরা তা বুঝি না এবং বোঝার চেষ্টাও করি না। অথচ একটু মনোযোগ সহকারে কুরআন অধ্যয়ন করলে খুব সহজেই তা বোঝা যাবে।
মানুষ ভুল পথে বা পাপের পথে চলতে চলতে এক সময়ে আল্লাহ্র দয়া, ক্ষমা, অনুগ্রহ ও ভালবাসার বিষয়গুলি মনে এলে তা বিশ্বাস করে তাঁর দরবারে সত্যিকারের তওবা করে ক্ষমা প্রার্থনা করলে তিনি তাকে ক্ষমা করে দিয়ে সৎকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করে নেবেন। এসব মানুষকে জানানো খুবই প্রয়োজন। যাতে তারা আল্লাহ্ পথে হেদায়াতের পথে, সত্য ও ন্যায়ের পথে ফিরে আসে। কেননা এ জীবনের নিশ্চয়তা নেই। আবার শয়তান তাকে বিভ্রান্তও করে। যেমন একজন সুস্থ মানুষ রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে পা পিছলে আছাড় খেয়ে পড়ে যায়, আবার দুর্ঘটনা কবলিত হয়ে হঠাৎ মৃত্যুবরণও করে। একইভাবে একজন ভাল মানুষ কোন শয়তানের পাল্লায় পড়ে খারাপ পথে চলে যায়। আবার একজন খারাপ বা পথভ্রষ্ট মানুষ সৌভাগ্যক্রমে হঠাৎ কোন ভাল পরিবেশ পেয়ে ভাল পথে ফিরে আসে। এ সহজ বিষয়গুলি সকল মানুষ বোঝে।
মধ্যমপন্থী লোকদের এক আলোচনায় মহাজ্ঞানী আল্লাহ প্রত্যাদেশ করেন, 'তারা যখন ব্যয় করে তখন অযথা ব্যয় করে না, কৃপণতাও করে না এবং তাদের পন্থা হয় এতদুভয়ের মধ্যবর্তী, যারা আল্লাহ্র সাথে অন্য উপাস্যের ইবাদত করে না, আল্লাহ যার হত্যা অবৈধ করেছেন, সঙ্গত কারণ ব্যতীত তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না। যারা একাজ করে, তারা শাস্তির সম্মুখীন হবে। ক্বিয়ামতের দিন তাদের শাস্তি দ্বিগুণ হবে এবং তথায় লাঞ্চিত অবস্থায় চিরকাল বসবাস করবে। কিন্তু যারা তওবা করে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের গোনাহকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তিত করে দেবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। যে তওবা করে ও সৎকর্ম করে, সে ফিরে আসার স্থান আল্লাহ্ দিকে ফিরে আসে' (ফুরক্বান ২৫/৬৭-৭১)।
আল্লাহ ক্ষমাশীল এ সংক্রান্ত এক প্রত্যাদেশে তিনি বলেন, 'মুনাফেকরা এ ব্যাপারে ভয় করে যে, মুসলমানদের উপর না এমন কোন সূরা নাযিল হয়, যাতে তাদের অন্তরের গোপন বিষয় অবহিত করা হবে। সুতরাং আপনি বলে দিন, ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতে থাক, আল্লাহ তা অবশ্যই প্রকাশ করবেন যার ব্যাপারে তোমরা ভয় করছ। আর যদি আপনি তাদের কাছে জিজ্ঞেস করেন, তবে তারা বলবে, আমরা তো কথার কথা বলছিলাম এবং কৌতুক করছিলাম। আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহ্র সাথে, তাঁর হুকুম- আহকামের সাথে এবং তাঁর রাসূলের সাথে ঠাট্টা করছিলে? ছলনা করো না, তোমরা যে কাফের হয়ে গেছ ঈমান প্রকাশ করার পর। তোমাদের মধ্যে কোন লোককে যদি ক্ষমা করে দেয়ও, তবে অবশ্যই কিছু লোককে আযাবও দেব। কারণ তারা ছিল গোনাহগার' (তওবা ৯/৬৪-৬৬)।
আলোচ্য আয়াতে মুনাফেক গোষ্ঠীর কথা-বার্তা বা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে যে বিরূপ ও রহস্যজনক মন্তব্য আলোচিত হয়েছে তার সঠিক মর্মার্থ ও লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য একমাত্র অন্তর্যামী আল্লাহই জানেন। তিনিই ভাল জানেন তাদের কথাবার্তা বা অন্তরের রূপ কিরূপ ছিল। তবে তাদের মধ্যে কাউকে ক্ষমা করে দেওয়া, কাউকে শাস্তি দেওয়ার ঘোষণায় বোঝা যায় তাদের মধ্যে কোন কোন হৃদয়বান ব্যক্তির মন্তব্যে আল্লাহভীতি বা আল্লাহ্র সন্তুষ্টি নিহিত ছিল এবং কোন কোন হৃদয়হীন ব্যক্তির মন্তব্যে আল্লাহ্র অসন্তুষ্টি ছিল।
একই দলভুক্ত হয়ে কাজ করা লোকদের মাঝেও কোন কোন ব্যক্তির অন্তরের স্বচ্ছতার কারণে আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন এবং তাদেরকে ক্ষমা করে দেন। এটা মানব জাতির আবহমানকালের একটি ধারাবাহিক ইতিহাস। বর্তমান কালেও এরূপ সমস্যার কোন অভাব নেই। পারিবারিক জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক জীবন ও কর্মজীবনের প্রায় সকল স্তরেই যে মিথ্যা ও মুনাফেকীর প্রতিযোগিতা চলছে তা ভাষায় প্রকাশ করা অত্যন্ত কঠিন। এখানে সত্য, সঠিক, পবিত্র ও ন্যায়পথের পথিকরা নিজেদের প্রকৃত অবস্থানে রাখতে হিমশিম খেয়ে সমস্যার দরিয়ায় হাবুডুবু খাচ্ছে। কারণ এত সভ্য সমাজে মিথ্যা ও মুনাফেকী চিহ্নিত করা একটি জটিল সমস্যা। আবার অপরাধী চক্রের মধ্য হ'তে প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে বের করাও খুব ঝুঁকিপূর্ণ ও কষ্টকর ব্যাপার। কিন্তু আল্লাহ পাকের নিকট এদের পরিচয় দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট। অবশ্য যারা এতে জড়িত তারা অন্ততঃ কিছু বোঝে। আর যদি কেউ বুঝেও অবুঝ হয় তবে তার দায়িত্ব তার উপরই থাকবে।
আল্লাহ তাঁর ন্যায়ের মানদণ্ডে প্রকৃত স্বচ্ছ ও সৎকর্মশীলদের ক্ষমা করবেন এবং প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে শাস্তি প্রদান নিশ্চত করে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব অক্ষুণ্ণ রাখবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল- এ প্রতিপাদ্যের উপর প্রতিটি ঈমানদার বান্দার অবিচল থেকে কাজ করে যেতে হবে। কারণ আল্লাহ্ সন্তুষ্টির বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য আল্লাহ তাওফীক দিলে কোন
টিকাঃ
(তওবা ৯/১০২)।
(ক্বাছাছ ২৮/১৪-১৬)।
(নমল ২৭/১১)।
(নূর ২৪/১০)।
(নূর ২৪/২০)।
(নূর ২৪/২১)।
(নূর ২৪/৩১)।
(আহযাব ৩৩/৩৫)।
(ফুরক্বান ২৫/৬৭-৭১)।
(তওবা ৯/৬৪-৬৬)।
📄 যারা আল্লাহ ও রাসূলের উপর নির্ভরশীল
৭. যারা আল্লাহ ও রাসূলের উপর নির্ভরশীল
ইসলাম ধর্মের শ্রেষ্ঠ আদেশ হ'ল এক আল্লাহ্ ইবাদত বা উপাসনা করা, তাঁর প্রতি অকৃত্রিম আত্মবিশ্বাস ও আত্মসমর্পণ করা। আর দুনিয়ার মানুষ তথা উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য রাসূল মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর একনিষ্ঠ অনুসরণ। এ দু'টি বিষয়ই পবিত্র কুরআনের প্রথম ও দ্বিতীয় আলোচ্য বিষয়। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে তাঁকেই একমাত্র উপাস্য হিসাবে তাঁর ইবাদত করার এবং তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর আদর্শের অনুসরণের আদেশ করেছেন। যা কখনও অমান্য করার যোগ্য নয়।
আল্লাহ তা'আলা তাঁর এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্যের নির্দেশ দিয়ে যে সব অমূল্যবাণী প্রত্যাদেশ করেছেন, এখানে উদাহরণ স্বরূপ তার কয়েকটির উদ্ধৃতি দেওয়া হ'ল। মহান আল্লাহ বলেন, مَّنْ يُطِعِ الرَّسُوْلَ فَقَدْ أَطَاعَ اللهُ 'যে রাসূলের আনুগত্য করে সে আল্লাহ্রই আনুগত্য করে' (নিসা ৪/৮০)।
অন্যত্র আল্লাহ বলেন,
وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوْهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ
الْعِقَابِ
'রাসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক। আল্লাহকে ভয় কর নিশ্চয়ই আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা' (হাশর ৫৯/৭)।
তিনি আলো বলেন, 'হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ্র নির্দেশ মান্য কর, মান্য কর রাসূলের নির্দেশ এবং তোমাদের মধ্যে যারা নেতৃস্থানীয় তাদের। আর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হও, তাহ'লে তা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি প্রত্যাবর্তন কর, যদি তোমরা আল্লাহ ও ক্বিয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাসী হয়ে থাক। আর এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে সর্বোত্তম' (নিসা ৪/৫৯)।
আল্লাহ তা'আলা ও রাসূল (ছাঃ)-এর হুকুম মান্যকারীদের মহা সফলতার সুসংবাদ স্বরূপ আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'যে কেউ আল্লাহ্র হুকুম এবং তাঁর রাসূলের হুকুম মান্য করবে, তাহ'লে যাদের প্রতি আল্লাহ নে'মত দান করেছেন, সে তাঁদের সঙ্গী হবে। তাঁরা হ'লেন নবী, ছিদ্দীক্ব, শহীদ ও সৎকর্মশীলগণ। আর তাঁদের সান্নিধ্যই হ'ল সর্বোত্তম' (নিসা ৪/৬৯)।
মহান আল্লাহ আরও বলেন,
وَإِنْ تُطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ لَا يَلِتْكُم مِّنْ أَعْمَالِكُمْ شَيْئًا إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
'যদি তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর, তবে তোমাদের কর্ম বিন্দুমাত্রও নিষ্ফল করা হবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু' (হুজুরাত ৪৯/১৪)।
মানব জাতির শ্রেষ্ঠত্বকে সমুন্নত রাখার বাস্তব দৃষ্টান্ত স্বরূপ সৃষ্টির প্রথম হ'তেই যুগে যুগে নবী-রাসূলগণ আগমন করেছেন। তাঁরা আল্লাহ্র বিধান অনুযায়ী নিজ নিজ এলাকায় ধর্মীয় নেতৃত্ব দান করে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। পরিশেষে শেষ নবী ও রাসূল হিসাবে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর আগমন ঘটে। শুধু আরবের জন্য নয়, বরং সারা বিশ্বের জন্য তিনি নবী ও রাসূল মনোনীত হন। তাঁর অসাধারণ গুণাবলীর জন্য জাতি ধর্ম নির্বিশেষে পৃথিবীর সব পণ্ডিত, জ্ঞানী ও বিজ্ঞানীর নিরপেক্ষ বিচারে তিনি শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মহাপণ্ডিত হিসাবে খ্যাতিমান হয়ে আছেন। তাঁর স্বচ্ছ ও অনন্য চরিত্র-মাধুর্য পৃথিবীর সকল মানুষের অনুসরণযোগ্য। বিশেষতঃ ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় মহানবী (ছাঃ)-এর অনুসরণের কোন বিকল্প নেই। আর তাঁর অনুসরণ মহান আল্লাহ্র আদেশ পালনেরই নামান্তর।
আমরা আলোচ্য অধ্যায়ে প্রমাণ সাপেক্ষে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুসরণ পদ্ধতির মৌলিক দিকগুলি তুলে ধরার চেষ্টা করব। মানুষ মহান আল্লাহ্ প্রতিনিধি ও শ্রেষ্ঠ ভালবাসার পাত্র, সৃষ্টি জগতে এ ভালবাসার কোন তুলনা নেই এবং ক্ষমারও কোন তুলনা নেই। অপ্রতিদ্বন্দ্বী এই ভালবাসার নিদর্শন স্বরূপ মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূল (ছাঃ)-কে এক প্রত্যাদেশে বলেন,
قُلْ إِنْ كُنتُمْ تُحِبُّوْنَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ
غَفُورٌ رَّحِيمٌ
'বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহ'লে আমাকে অনুসরণ কর, ফলে আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের পাপ মার্জনা করে দিবেন। আল্লাহ হ'লেন ক্ষমাকারী দয়ালু' (আলে ইমরান ৩/৩১)।
অপর এক আয়াতে আল্লাহ বলেন,
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِيْنَ أَسْرَفُوْا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ
يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُوْرُ الرَّحِيمُ
'বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর যুলুম করেছ তোমরা আল্লাহ্র রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গোনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু' (যুমার ৩৯/৫৩)।
অন্যত্র প্রত্যাদেশ এসেছে,
الَّذِينَ آمَنُواْ بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَلَمْ يُفَرِّقُوا بَيْنَ أَحَدٍ مِّنْهُمْ أُوْلَئِكَ سَوْفَ يُؤْتِيهِمْ
أُجُورَهُمْ وَكَانَ اللَّهُ غَفُوْرًا رَّحِيمًا
'যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ্র উপর, তাঁর রাসূলের উপর এবং তাঁদের কারো প্রতি ঈমান আনতে গিয়ে কাউকে বাদ দেয়নি, শীঘ্রই তাদেরকে প্রাপ্য ছওয়াব দান করা হবে। বস্তুতঃ আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু' (নিসা ৪/১৫২)।
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, 'আর কোন কোন বেদুইন হ'ল তারা, যারা ঈমান আনে আল্লাহ্র উপর, ক্বিয়ামত দিবসের উপর এবং নিজেদের ব্যয়কে আল্লাহ্ নৈকট্য এবং রাসূলের দো'আ লাভের উপায় বলে গণ্য করে। জেনো! তাই হ'ল তাদের ক্ষেত্রে নৈকট্য। আল্লাহ তাদেরকে নিজের রহমতের অন্তর্ভুক্ত করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়' (তওবা ৯/৯৯)।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সমগ্র পৃথিবীবাসীর জন্য একজন অনুকরণীয় অমর চরিত্রবান ব্যক্তিত্ব। অনাবিল চরিত্র মাধুর্যের কারণে আরবের সকল গোত্র, সকল ধর্মাবলম্বী এবং বিশ্বের পরিচিত ও অপরিচিত সকলের নিকট ছিলেন তিনি সমাদৃত। তাঁর জীবনের সমুদয় গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলীতে আল্লাহ্র পক্ষ হ'তে জিবরীল (আঃ) প্রত্যক্ষ সাহায্য ও সহযোগিতা করতেন। তিনি সমাজে বসবাসকারী মানব সম্প্রদায়ের মধ্যে পরস্পর ভ্রাতৃত্ববোধ, একে অন্যের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হয়ে সহানুভূতি প্রকাশ, সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি, বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ ও অপরিসীম ধৈর্য সহকারে সহাবস্থানের যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা পবিত্র কুরআন ও হাদীছের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে রক্ষিত আছে। তাঁর নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থায় বিধর্মী শত্রুরাও হতবাক হয়ে দলে দলে ইসলামের পতাকা তলে সমবেত হ'ত।
উপরোক্ত আয়াতগুলিতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাগণকে অকৃত্রিমভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মাধ্যমেও একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। এরূপ বিশ্বাস স্থাপনকারীর প্রতি তাঁর ক্ষমা, দয়া, অনুগ্রহ বর্ধিত করা হবে। আল্লাহ হচ্ছেন অসীম ক্ষমাশীল ও দয়াময়। তাই যথাসময় তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ পূর্বক মহানবী (ছাঃ)-এর অনুসরণ দ্বারা আল্লাহ্ নৈকট্য লাভের উপায় অনুসন্ধান করার পথ সর্বদাই উন্মুক্ত রয়েছে। ধর্মের প্রতি অগ্রবর্তী ও চিন্তাশীল লোকেরাই এর সন্ধান পায়।
মহান আল্লাহ বলেন, 'নিশ্চয়ই আসমান ও যমীন সৃষ্টিতে এবং রাত্রি ও দিনের আবর্তনে নিদর্শন রয়েছে বোধসম্পন্ন লোকদের জন্য। যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং চিন্তা-গবেষণা করে আসমান ও যমীন সৃষ্টির বিষয়ে (তারা বলে) পরওয়ারদেগার! এসব আপনি অনর্থক সৃষ্টি করেননি। সকল পবিত্রতা আপনারই, আমাদিগকে আপনি জাহান্নামের শাস্তি থেকে বাঁচান। হে আমাদের পালনকর্তা! নিশ্চয়ই আপনি যাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করলেন, তাকে সব সময়ে অপমানিত করলেন। আর যালেমদের জন্য তো কোন সাহায্যকারী নেই। হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা নিশ্চিতরূপে শুনেছি একজন আহ্বানকারীকে ঈমানের প্রতি আহ্বান করতে যে, তোমাদের পালনকর্তার প্রতি ঈমান আন, তাই আমরা ঈমান এনেছি। হে আমাদের পালনকর্তা! অতঃপর আমাদের সকল গোনাহ মাফ করুন এবং আমাদের সকল দোষত্রুটি দূর করে দিন। আর আমাদের মৃত্যু দিন নেক লোকদের সাথে। হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদেরকে দিন, যা আপনি ওয়াদা করেছেন, আপনার রাসূলগণের মাধ্যমে এবং ক্বিয়ামতের দিন আমাদিগকে আপনি অপমানিত করবেন না। নিশ্চয়ই আপনি ওয়াদা খেলাফ করেন না' (আলে ইমরান ৩/১৯০-১৯৪)।
অন্যত্র আল্লাহ বলেন, 'ঈমানদার পুরুষ আর ঈমানদার নারী একে অপরের সহায়ক। তারা ভাল কথার শিক্ষা দেয় এবং মন্দ থেকে বিরত রাখে। ছালাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ অনুযায়ী জীবন-যাপন করে। এদের উপরই আল্লাহ তা'আলা দয়া করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী সুকৌশলী' (তওবা ৯/৭১)।
উপরের আয়াতগুলিতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি নিবিড়ভাবে আত্মসমর্পণকারীর আকুল আবেদন প্রতিধ্বনিত হয়েছে। যারা বিশ্বাস স্থাপনপূর্বক সৎকর্ম সম্পাদনে আত্মনিয়োগ করে, অতঃপর নবী করীম (ছাঃ)-এর প্রতি অবতীর্ণ সত্যের সমর্থক ও অনুসারী হয়, আল্লাহ্র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, আল্লাহ পাক তাদের ভুল-ত্রুটি ও মন্দ কর্মসমূহ মার্জনা করে দেন এবং নিজের দলভুক্ত করে নেন।
কিন্তু যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে না বা ভয় করে না এবং তাঁর প্রেরিত মহানবী (ছাঃ)-কেও মান্য করে না তারা প্রকাশ্য ভ্রষ্টতায় পতিত হয় এবং অনিবার্য ধ্বংস ডেকে আনে। কারণ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে অমান্য বা অবজ্ঞা করার মত কোন অবকাশ ইসলামে নেই। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা إِنَّ الَّذِينَ يُحَادُّوْنَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُوْلَئِكَ فِي الْأَذَلِّينَ 'যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারাই লাঞ্চিতদের দলভুক্ত' (মুজদালা ৫৮/২০)। অতঃপর আল্লাহ বলেন, 'নিশ্চয়ই যারা স্বীয় ধর্মকে খণ্ড-বিখণ্ড করেছে এবং অনেক দল হয়ে গেছে, তাদের সাথে আপনার কোন সম্পর্ক নেই। তাদের ব্যাপার আল্লাহ তা'আলার নিকট সমর্পিত। অতঃপর তিনি বলে দেবেন যা কিছু তারা করে থাকে। যে একটি সৎকর্ম করবে সে তার দশগুণ পাবে এবং যে একটি মন্দ কাজ করবে, সে তার সমান শাস্তিই পাবে। বস্তুতঃ তাদের প্রতি যুলুম করা হবে না। আপনি বলে দিন, আমার প্রতিপালক আমাকে সরল পথ প্রদর্শন করেছেন- একনিষ্ঠ ইবরাহীমের বিশুদ্ধ ধর্ম। তিনি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। আপনি বলুন, আমার ছালাত, আমার কুরবানী এবং আমার জীবন ও মরণ বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহ্রই জন্য। তাঁর কোন অংশীদার নেই। আমি তাই আদিষ্ট হয়েছি এবং আমি প্রথম আনুগত্যশীল। আপনি বলুন, আমি কি আল্লাহ ব্যতীত অন্য প্রতিপালক খোঁজ করব অথচ তিনিই সবকিছুর প্রতিপালক? যে ব্যক্তি কোন গোনাহ করে, তা তারই দায়িত্বে থাকে। কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না। অতঃপর তোমাদের সবাইকে প্রতিপালকের কাছে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। অনন্তর তিনি বলে দেবেন, যেসব বিষয় তোমরা বিরোধ করতে। তিনি তোমাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছেন এবং একে অন্যের উপর মর্যাদা সমুন্নত করেছেন। যাতে তোমাদেরকে এ বিষয়ে পরীক্ষা করেন, যা তোমাদেরকে দিয়েছেন। আপনার প্রতিপালক দ্রুত শাস্তিদাতা এবং তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল দয়ালু' (আন'আম ৬/১৫৯-১৬৫)।
উপরের আয়াতে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ) উভয়ের প্রতি আনুগত্য ছাড়া উম্মতে মুহাম্মাদীর কোন ইবাদতই আল্লাহ্র দরবারে গৃহীত হবে না। আরও বলা হয়েছে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণকারীরা অবশ্যই লাঞ্ছিতদের দলভুক্ত। সংক্ষেপে প্রথম আদেশ হ'ল বান্দার জন্য এক আল্লাহ্ ইবাদত, আর দ্বিতীয় আদেশ হ'ল
টিকাঃ
(নিসা ৪/৮০)।
(হাশর ৫৯/৭)।
(নিসা ৪/৫৯)।
(নিসা ৪/৬৯)।
(হুজুরাত ৪৯/১৪)।
(আলে ইমরান ৩/৩১)।
(যুমার ৩৯/৫৩)।
(নিসা ৪/১৫২)।
(তওবা ৯/৯৯)।
(আলে ইমরান ৩/১৯০-১৯৪)।
(তওবা ৯/৭১)।
(মুজদালা ৫৮/২০)।
(আন'আম ৬/১৫৯-১৬৫)।
📄 আল্লাহ অন্তর্যামী ও ক্ষমাশীল
৮. আল্লাহ অন্তর্যামী ও ক্ষমাশীল
মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহ তা'আলা বিশ্বজগতে অগণিত দৃশ্য ও অদৃশ্য বস্তু সৃষ্টি করেছেন। তন্মধ্যে প্রাণীজগত একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যমান সৃষ্টি। আর এদের দেহের অভ্যন্তরে এক অকল্পনীয় অদৃশ্য বস্তু হৃদয়, অন্তর, মন বা নফসের সৃষ্টি করেছেন যা সকল প্রাণীরই পরিচালক, বিশেষ করে মানুষের ক্ষেত্রে এর কোন বিকল্প নেই। মানুষের মন বড় বিচিত্র, একজনের মনের সঙ্গে অন্যজনের মনের মিল নেই। পৃথিবীর শতকোটি মানুষের মনের কথা শতকোটি ধারায় প্রবাহিত। অথচ এগুলো সবই আল্লাহ্ নিয়ন্ত্রণে। তিনি সকলের (সব মানুষের) মনের খবর জানেন এবং তিনি সকলের একমাত্র প্রভু বা উপাস্য।
মানুষের মধ্যে মনের মিল না থাকায় কাজের মধ্যেও কোন মিল নেই। তাছাড়া স্বয়ং আল্লাহ তা'আলাই মানুষের রং, চেহারা, আকৃতি-প্রকৃতি প্রভৃতিতে এক জনের সঙ্গে আর এক জনের হুবহু মিল রাখেননি। কথাবার্তা, গলার স্বর, বিদ্যা, বুদ্ধিসহ মানবিক সকল কাজে কিছু কিছু অমিল রয়েছেই। এর মধ্য দিয়েই চলছে দুনিয়ার ভাল-মন্দ সহ সকল হিসাব-নিকাশ। মানুষের অন্তর স্বাধীন হওয়ায় সে প্রায় নিজের ইচ্ছামত কাজ করে। এতে ভুল-ত্রুটি হয়ে যায়, অতঃপর ক্ষমাশীল আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু সে ভুল-ত্রুটি বিবেক বহির্ভূত হয়ে গেলে অর্থাৎ আল্লাহ্ নির্ধারিত সীমার বাইরে চলে গেলে ক্ষমার অযোগ্য হয়ে যাবে। তবে আল্লাহর দয়ায় মানুষ বহু ভুল-ত্রুটি ও অন্যায় কাজের পরেও ক্ষমা পেয়ে যাবে।
'আল্লাহ ক্ষমাশীল' এ পর্যায়ে আমরা ইতিমধ্যে ক্ষমার আয়াতগুলি নিয়ে পর্যালোচনা করেছি এবং অসীম ক্ষমাশীল আল্লাহ্র পক্ষ হ'তে আশানুরূপ ক্ষমার আশ্বাস পেয়েছি। অবশ্য পূর্বালোচিত ক্ষমা সম্পর্কিত আলোচনা মানুষের প্রকাশ্য ভুল-ত্রুটি বা অন্যায় কাজের দ্বারা সৃষ্ট পাপের ক্ষমার বিষয়ে, কিন্তু অন্তরের কলুষতা দ্বারা অতি সংগোপনে সৃষ্ট পাপের ক্ষমা বিষয়ে আলোচনা হয়নি। এখানে এ বিষয়টি সংক্ষেপে পেশ করতে চাই।
পৃথিবীতে অনেক মানুষ সকলকে এড়িয়ে বা ফাঁকি দিয়ে গোপনে যুক্তি পরামর্শ বা ষড়যন্ত্র করে একাকী বা দু'জনে, তিন জনে স্বার্থসিদ্ধির জন্য কোন নিরাপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা করে, কাউকে পঙ্গু করে দেয় এবং অনুরূপ আরও গুরুতর অন্যায় বা পাপ করে। তারা ভাবে নিভৃতে কৃত এত গোপন তথ্য কারও পক্ষে জানা বুঝা বা অনুমান করা সম্ভব নয়। সে সময় তারা মানুষকেই ভয় করে বা অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে, অন্তর্যামী আল্লাহ্ কথা একেবারেই ভুলে যায়। এরূপ ধারণা নিরসণকল্পেই মহান আল্লাহ বলেন,
وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ
الْوَرِيدِ
'আমি মানুষ সৃষ্টি করেছি এবং তার মন নিভৃতে যে কুচিন্তা করে সে সম্বন্ধেও আমি অবগত আছি। আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী থেকেও অধিক নিকটবর্তী' (ক্বাফ ৫০/১৬)।
অন্যত্র আল্লাহ বলেন, سَوَاءٌ مِّنكُم مَّنْ أَسَرَّ الْقَوْلَ وَمَنْ جَهَرَ بِهِ وَمَنْ هُوَ
مُسْتَخْفِ بِاللَّيْلِ وَسَارِبُ بِالنَّهَارِ - 'তোমাদের মধ্যে যে কথা গোপনে বলুক বা তা সশব্দে প্রকাশ করুক, রাতের অন্ধকারে সে আত্মগোপন করুক বা প্রকাশ্য দিবালোকে বিচরণ করুক, সবাই তাঁর নিকট সমান' (রা'দ ১৩/১০)।
رَّبُّكُمْ أَعْلَمُ بِمَا فِي نُفُوسِكُمْ إِنْ تَكُونُوا صَالِحِيْنَ فَإِنَّهُ كَانَ لِلأَوَّابِينَ غَفُوْرًا 'তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের মনে যা আছে তা ভালই জানেন। যদি তোমরা সৎ হও তবে তিনি তওবাকারীদের জন্য ক্ষমাশীল' (বানী ইসরাঈল ১৭/২৫)। একই মর্মার্থে আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রিয় হাবীব (ছাঃ)-কে বিশেষ প্রত্যাদেশ দ্বারা অবহিত করেন, 'বলে দিন, তোমরা যদি মনের কথা গোপন করে রাখ অথবা প্রকাশ করে দাও, আল্লাহ সে সবই জানতে পারেন আর আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে, সে সবও তিনি জানেন, আল্লাহ সব বিষয়ে শক্তিমান। সেদিন প্রত্যেকেই যা কিছু সে ভাল কাজ করেছে, চোখের সামনে দেখতে পাবে এবং যা কিছু মন্দ কাজ করেছে তাও। ওরা তখন কামনা করবে, যদি তার এবং এসব কর্মের মধ্যে ব্যবধান দূরের হ'ত। আল্লাহ তাঁর নিজের সম্পর্কে তোমাদের সাবধান করেছেন, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু। বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহ'লে আমাকে অনুসরণ করো, যাতে আল্লাহও তোমাদেরকে ভালবাসেন এবং তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন। আর আল্লাহ হ'লেন ক্ষমাকারী দয়ালু' (আলে ইমরান ৩/২৯-৩১)।
প্রকৃতপক্ষে মানুষের অন্তর বা মন হ'ল একটা অত্যন্ত শক্তিশালী অদৃশ্য সৃষ্টি। বিশ্বজগতে মানব জাতির সকল ভাল-মন্দ শক্তির উৎসই তার মন। আমরা একটু স্থির চিত্তে চিন্তা করলেই দেখতে পাব, এ অনন্ত চিন্তার জগতে মানুষ কিভাবে নিজ নিজ লক্ষ্য নিয়ে সাঁতার কাটছে এবং তার লক্ষ্যস্থলে পৌঁছে যাচ্ছে। অন্তর্যামী আল্লাহ এদের সবার গতিবিধি নিরীক্ষণ করছেন এবং সংরক্ষণও করছেন বিশেষ হিসাব বহিতে (আমলনামায়)। মানুষের আন্তরিক অভিযানের কর্মকাণ্ডে আল্লাহ্র স্মরণ, সম্মতি, ভীতি এবং সন্তুষ্টির সম্পৃক্ততা থাকলে বিষয়টির মধ্যে ভুল-ত্রুটি হয়ে গেলেও আল্লাহ ক্ষমার আশ্বাস দিয়েছেন।
কিন্তু মনের (জ্ঞানের) এ শক্তি নিয়ে কোন মানুষ যেন অনধিকার কোন ইচ্ছা না করে। কারণ মনের গোপন চিন্তায়ও শয়তান তার কুচক্রান্তের প্রভাব খাটায়। ঐ সময় আল্লাহকে স্মরণ করলে সঠিক পথে টিকে থাকা যায়। কিন্তু আল্লাহকে ভুলে গেলে শয়তান তার পাশে স্থান করে নেয় এবং তাকে ভুল পথে চালিত করে। অতঃপর তার জীবনের সর্বনাশ ডেকে আনে। মানুষের জীবনের চিন্তাধারা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ এবং কোন কোন ক্ষেত্রে বিশেষ করে ধর্মীয় অনুভূতি বা অনুশীলনের ক্ষেত্রে খুবই স্পর্শকাতর। এরূপ ক্ষেত্রে আল্লাহ্র দয়া, সাহায্য, সহানুভূতি ছাড়া ঈমান রক্ষা করা অসম্ভব। কারণ মানুষ মাঝে মাঝে বা কোন কোন সময় পার্থিব জগতের এমন সব লোভনীয় ও আকর্ষণীয় সৌন্দর্যমণ্ডিত বস্তুর প্রলোভনে পড়ে যায় যা বর্ণনা করাও কঠিন।
মনের বিপরীতে যে বিভ্রান্তিকর ও রোমাঞ্চকর পরিবেশ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় সে প্রসঙ্গে ইউসুফ (আঃ) যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন, পবিত্র কুরআনে তা সুন্দর ও সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে, وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِي إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوْءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّي إِنَّ رَبِّي غَفُوْرٌ رَّحِيمٌ 'আমি নিজেকে নির্দোষ বলি না। নিশ্চয়ই মানুষের মন মন্দ কর্মপ্রবণ কিন্তু সে নয় আমার পালনকর্তা যার উপর অনুগ্রহ করেন। নিশ্চয়ই আমার পালনকর্তা ক্ষমাশীল, দয়ালু' (ইউসুফ ১২/৫৩)।
ইউসুফ (আঃ)-এর উপরোক্ত উক্তি থেকে বোঝা যায় শয়তান অন্তরের অভ্যন্তরে তাঁর উপর তীব্র আক্রমণ চালিয়েছিল এবং তাঁকে হতবুদ্ধি করার উপক্রমই করে ফেলেছিল। কিন্তু আল্লাহ্র অশেষ মেহেরবানীতে ও মানসিক দৃঢ়তায় এই সর্বনাশ হ'তে তিনি রক্ষা পান। সংযমের এই অতুলনীয় ইতিহাস সারা মুসলিম মিল্লাত চিরদিন বিশেষ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে এবং একান্ত নির্জনে তাঁর শরণাপন্ন হয়ে আত্মশুদ্ধি রক্ষায় নিবেদিতপ্রাণ হয়ে পরম করুণাময় আল্লাহ্ সমীপে ক্ষমাপ্রার্থী হবে। অতঃপর ক্ষমাশীল আল্লাহ অবশ্যই ক্ষমা করে দেবেন।
যেহেতু পৃথিবীর বুকে মানুষের সকল প্রকাশ্য ও গোপনীয় চিন্তার উৎস স্থল হ'ল অন্তর, হৃদয়, মন বা নফস। তাই ইহকালীন জীবনে মানুষের সকল প্রকাশ্য ও গুপ্ত কর্ম অন্তরের পরিকল্পনায় পরিচালিত হয়। প্রকাশ্য সকল ভাল ও মন্দ কাজ দেখা, শোনা ও বোঝা যায়। কিন্তু সকল গুপ্ত ভাল ও মন্দ কাজ দেখা শোনা ও বোঝা যায় না। তবে এটা স্বতঃসিদ্ধ যে যারা প্রকাশ্যে ভাল কথা বলে, ভাল কাজ করে, সাধারণত তারাই গোপনে ভাল কথা ও ভাল কাজের চিন্তা করে, যা ইহকালেও প্রশংসিত পরকালেও প্রশংসিত। পক্ষান্তরে যারা প্রকাশ্যে মন্দ কথা বলে মন্দ কাজ করে, সাধারণত তারাই গোপনে মন্দ কথা ও মন্দ কাজের চিন্তা করে, যা ইহকালেও ঘৃণিত পরকালে আরও ঘৃণিত।
এজন্য আল্লাহ তা'আলা মানুষকে তার মানবিক, নৈতিক ও ধর্মীয় জীবনের স্বচ্ছতা রক্ষার্থে প্রকাশ্য বা গোপনে কুচিন্তার দ্বারা নিজকে কলুষিত না করার আহ্বান জানিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন, 'মুমিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই। অতএব তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করবে এবং আল্লাহকে ভয় করবে, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও। মুমিনগণ কেউ যেন অপর কাউকে উপহাস না করে। কেননা সে উপহাসকারী উপেক্ষা উত্তম হ'তে পারে এবং কোন নারী অপর নারীকেও যেন উপহাস না করে, কেননা সে উপহাসকারিণী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হ'তে পারে। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ কর না এবং একে অপরকে মন্দ নামে ডেক না। কেউ বিশ্বাস স্থাপন করলে তাকে মন্দ নামে ডাকা গোনাহ। যারা এহেন কাজ থেকে তওবা করে না তারাই যালেম। মুমিনগণ তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাক। নিশ্চয়ই কতক ধারণা গোনাহ এবং গোপনীয় বিষয় সন্ধান কর না। তোমাদের কেউ যেন কারো পশ্চাতে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভ্রাতার গোশত ভক্ষণ করা পসন্দ করবে? বস্তুতঃ তোমরা তো একে ঘৃণাই কর। আল্লাহকে ভয় কর! নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু' (হুজুরাত ৪৯/১১-১২)।
মানুষের অন্তর, মন বা হৃদয় একটি আক্রমণাত্মক অদৃশ্য শক্তি। এটা যেকোন সময় যেকোন মানুষকে আক্রমণ করতে পারে বা করে থাকে। এমতাবস্থায় যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে ও ভয় করে, তারা এ আক্রমণকে প্রতিহত করার শক্তি রাখে। কিন্তু যারা আল্লাহ বা তাঁর আদেশে সন্ধিহান তারা অন্তরের কুপ্রস্তাবে সাড়া দিয়ে ভুল পথে বা পাপের পথে লিপ্ত হয়ে যায়। ফলে এক মানুষ অপর মানুষকে অবহে'লা করে, ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে বা অনুরূপ সমালোচনা করে তাকে হেয় প্রতিপন্ন করতে চায়। কিন্তু আল্লাহ এরূপ কাজ করা হ'তে বিরত থাকতে বলেছেন। কেননা যাকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা হয় তার প্রকৃত (ভাল-মন্দ) তথ্য অন্তর্যামী আল্লাহ তা'আলাই জানেন। সে আল্লাহ্ প্রিয়পাত্র হ'তে পারে, আবার ঠাট্টাকারীর চেয়ে উত্তমও হ'তে পারে । এতদ্বতীত বহু মানুষ আন্তরিক (আক্রমণের) তাড়নায় একজন অন্যজন সম্পর্কে আনুমানিকভাবে কুচিন্তা করে, কারও গোপন বিষয় অনুসন্ধান করে, আবার কারও গীবত বা দুর্নামও করে। এরূপ গোপন অপরাধ মারাত্মক পাপ হিসাবে আখ্যায়িত করে আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে আয়াত নাযিল করেছেন। উপরোক্ত আয়াতের বর্ণনায় তা পাওয়া যায়। ঐসব অপতৎপরতার জন্য আল্লাহ অসন্তুষ্ট হয়ে এরূপ কাজকে মৃত ভ্রাতার গোশত খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। মনের কলুষিত এসব কাজ হ'তে তওবা করে আল্লাহ্র নিকট ক্ষমাপ্রার্থী হ'লে তিনি ক্ষমা করে দেবেন বলেও আয়াতে উল্লেখ রয়েছে।
সুতরাং অন্তর বা মন নিয়ে একান্ত নীরবে ও নির্জনে গভীর চিন্তা-গবেষণা করা প্রয়োজন। কারণ অন্তর বা নফসকে বশীভূত করতে পারলেই জীবন ধন্য হয়ে উঠবে এবং আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জনের পথে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হবে। সর্বজ্ঞানী আল্লাহ তা'আলা অদৃশ্য জগতের তথা অন্তর জগতেরও প্রভু কেবল এই বিশ্বাসই যে কোন মানুষকে মহত্বের শীর্ষ শিখরে উন্নীত করতে পারে, আবার কোন প্রকার ধ্বংসের হাত হ'তেও রক্ষা করতে পারে।
আল্লাহ অন্তর্যামী ও ক্ষমাশীল, এ রহস্যময় আলোচনায় প্রচুর শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। প্রত্যেক ঈমানদার নর-নারীকে অন্তিমকাল পর্যন্ত আল্লাহ্র সন্তুষ্টির গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকতে হবে। এজন্য আল্লাহ্ পথের পথিকের আদর্শের প্রতি নীরব-নিস্তব্ধ অনুকরণ ও অনুসরণ করতে হবে। কুরআন ও হাদীছের প্রতি গভীর মনোনিবেশ করতে হবে। সাফল্য লাভের প্রত্যাশায় তথা আল্লাহ্র দরবারে আশ্রয় লাভের আবেগে নিবিড় নির্জনে ক্রন্দনরত অবস্থায় আত্মনিবেদন বা দো'আ করতে হবে। কারণ অন্তরের চিন্তার প্রশস্ততা, গবেষণা বা সাধনার সমন্বয়ে অনেক উন্নত হ'তে পারে। অতএব আমাদের যে কোন দুর্বল ধ্যান-ধারণাকে উৎকৃষ্ট মর্যাদায় নিয়ে যাওয়ার ব্রত গ্রহণ করতে হবে। অন্তর্যামী দয়ালু ক্ষমাশীল আল্লাহ তা'আলা অন্তরের উদ্দেশ্যহীন বা অলীক তৎপরতা হ'তে আমাদের সকলকে হেফাযত করুন, এটাই আমাদের একান্ত কামনা।
টিকাঃ
(ক্বাফ ৫০/১৬)।
(রা'দ ১৩/১০)।
(বানী ইসরাঈল ১৭/২৫)।
(আলে ইমরান ৩/২৯-৩১)।
(ইউসুফ ১২/৫৩)।
(হুজুরাত ৪৯/১১-১২)।
📄 রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে ক্ষমার বিশেষ বার্তা
আল্লাহ তাঁর প্রিয় সৃষ্টি মানব জাতিকে নিয়ে বহু সুন্দর সুন্দর পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছেন। তন্মধ্যে মানবজাতিকে স্বচ্ছ, পবিত্র রাখার জন্য তার অনেক ভুল-ভ্রান্তি, দোষ-ত্রুটি, অপরাধ অন্যায়-অত্যাচারকে ক্ষমা করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর ক্ষমার কার্যক্রম কোন সুনির্দিষ্ট গণ্ডীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা ব্যাপক হ'তে ব্যাপকতর একটি অজ্ঞাত মহোত্তম পরিকল্পনা। এ মহৎ পরিকল্পনার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা মানুষকে যে সুযোগ-সুবিধা দান করেছেন হতভাগ্য মানুষ তা পুরোপুরিভাবে অনুভব করতে পারে না। এজন্য দয়াশীল ও ক্ষমাশীল আল্লাহ তা'আলা মানুষকে নানাভাবে সরল-সহজ ও বোধগম্য উপায়ে তাঁর নিঃস্বার্থ ক্ষমার কথাগুলি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। ইতিমধ্যে আমরা তা আলোচনাও করেছি।
আল্লাহ ক্ষমাশীল এ বিষয়ে তিনি আরো বলেন,
سُبْحَانَهُ هُوَ اللَّهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ - خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بِالْحَقِّ يُكَوِّرُ اللَّيْلَ عَلَى النَّهَارِ وَيُكَوِّرُ النَّهَارَ عَلَى اللَّيْلِ وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ كُلُّ يَجْرِي لِأَجَلٍ مُسَمًّى أَلَا هُوَ الْعَزِيزُ الْغَفَّارُ
'তিনি পবিত্র, তিনি আল্লাহ এক, পরাক্রমশালী। তিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে। তিনি রাত্রিকে দিবস দ্বারা আচ্ছাদিত করেন এবং দিবসকে রাত্রি দ্বারা আচ্ছাদিত করেন এবং তিনি সূর্য ও চন্দ্রকে কাজে নিযুক্ত করেছেন। প্রত্যেকেই বিচরণ করে নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত। জেনে রাখুন, তিনি পরাক্রমশালী ক্ষমাশীল' (যুমার ৩৯/৪, ৫)।
অনুরূপ অপর এক আয়াতে আল্লাহ বলেন,
قُلْ إِنَّمَا أَنَا مُنْذِرٌ وَمَا مِنْ إِلَهِ إِلَّا اللَّهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ - رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا الْعَزِيزُ الْغَفَّارُ
'বলুন, আমি তো একজন সতর্ককারী মাত্র এবং এক পরাক্রমশালী আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। তিনি আসমান-যমীন ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছুর পালনকর্তা, পরাক্রমশালী, মার্জনাকারী' (ছোয়াদ ৩৮/৬৫, ৬৬)।
ঈষৎ পরিবর্তিত ভাবধারায় আল্লাহ প্রত্যাদেশ করেন, পরম কল্যাণময় তিনি যিনি তাঁর বান্দার প্রতি ফায়ছালার গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন, যাতে সে বিশ্বজগতের জন্য সতর্ককারী হয়, তিনি হ'লেন যাঁর রয়েছে নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের রাজত্ব। তিনি কোন সন্তান গ্রহণ করেননি, রাজত্বে তাঁর কোন অংশীদার নেই। তিনি প্রত্যেক বস্তু সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তাকে শোধিত করেছেন পরিমিতভাবে। তারা তাঁর পরিবর্তে কত উপাস্য গ্রহণ করেছে, যারা কিছুই সৃষ্টি করে না এবং তারা নিজেরাই সৃষ্ট এবং নিজেদের ভালও করতে পারে না, মন্দও করতে পারে না এবং জীবন, মরণ ও পুনরুজ্জীবনেরও মালিক তারা নয়। কাফেররা বলে, এটা মিথ্যা বৈ নয়, যা তিনি উদ্ভাবন করেছেন এবং অন্য লোকেরা তাঁকে সাহায্য করেছে। অবশ্যই তারা অবিচার ও মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে। তারা বলে, এগুলো তো পুরাকালের রূপকথা, যা তিনি লিখে রেখেছেন। এগুলো সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর কাছে শেখানো হয়। বলুন, একে তিনিই অবতীর্ণ করেছেন, যিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের গোপন রহস্য অবগত আছেন। তিনি ক্ষমাশীল, মেহেরবান' (ফুরক্বান ২৫/১-৬)।
উপরের আয়াতগুলি দ্বারা আল্লাহ তাঁর মহাজ্ঞান, মহাক্ষমতা ও মহা সৃষ্টির দ্বারা তাঁর একচ্ছত্র মালিকানা ও একমাত্র উপাসক হওয়ার কথা নবী করীম (ছাঃ)-কে অবহিত করেন। অতঃপর তাঁকে আদেশ করা হয়, বলুন, আমি একজন সংবাদদাতা বা সতর্ককারী এই মর্মে যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই, নভোমণ্ডলের, ভূমণ্ডলের ও এতদুভয়ের মধ্যে বৃহত্তম ও ক্ষুদ্রতম সবকিছুর মালিক তিনি এবং তিনি ক্ষমাশীলও। তিনি তাঁর বান্দার প্রতি পরম হিতাকাংখী হয়ে তাদের সকল কাজের ফায়ছালার জন্য মহাপবিত্র কুরআন অবতীর্ণ করেছেন। এতদসত্ত্বেও বহু লোক আল্লাহ্র পরিবর্তে অন্যান্য উপাস্য গ্রহণ করে থাকে, যারা কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না এবং তারা জীবন মরণেরও মালিক নয়। তারা নবী করীম (ছাঃ) ও পবিত্র কুরআন সম্পর্কে নানারূপ মনগড়া কথাবার্তা বলে। পরম ধৈর্যশীল ও দয়াশীল আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূল (ছাঃ)-কে বলেন, তাদেরকে (লোকদেরকে) বলুন, এ কুরআন আল্লাহই অবতীর্ণ করেছেন। তিনি নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল বা অজ্ঞাত জগতের গোপন রহস্য জানেন। তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।
সর্বজ্ঞ আল্লাহ নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডলসহ সকল সৃষ্ট বস্তুর মালিক ও উপাস্য হয়েও তিনি নিজকে ক্ষমাশীল বলে ঘোষণা দেয়ার নেপথ্য কারণ বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। ক্ষমাশীল বলতে, যিনি সহজেই অন্যের অন্যায় অপরাধ ক্ষমা করেন বুঝায়। আল্লাহ অসীম জ্ঞান ও ক্ষমতার মালিক, তিনি ক্ষমাশীল উপাধি দ্বারা কেউ তাঁর আদেশ পালনে অন্যায় অপরাধ করে ফেললেও তিনি তাকে ক্ষমা করে দেবেন বুঝায়। কিন্তু তিনি এত ক্ষমতার মালিক হয়েও মানুষকে তার অন্যায়, অত্যাচার বা অবিচারের মত অপরাধের জন্য ক্ষমা করে দেবেন। কারণ তিনি অসীম দয়ার ভাণ্ডার ও ক্ষমাশীল। আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূলকে 'আল্লাহ ক্ষমাশীল' বাক্যের সর্বোচ্চ তাৎপর্য বোঝার জন্যই উপরোক্ত আয়াতগুলির অবতরণ করেছেন।
তিনি বলেন, 'যে গোনাহ করে কিংবা নিজের অনিষ্ট করে, অতঃপর আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল, করুণাময় পায়। যে কেউ পাপ করে, সে নিজের পক্ষেই করে। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।
যে ব্যক্তি ভুল কিংবা গোনাহ করে, অতঃপর কোন নিরপরাধের উপর অপবাদ আরোপ করে সে নিজের মাথায় বহন করে জঘন্য মিথ্যা ও প্রকাশ্য গোনাহ। যদি আপনার প্রতি আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও করুণা না হ'ত, তবে তাদের একদল আপনাকে পথভ্রষ্ট করার সংকল্প করেই ফেলেছিল। তারা পথভ্রান্ত করতে পারে না কিন্তু নিজেদেরকেই এবং আপনার কোন অনিষ্ট করতে পারে না। আল্লাহ আপনার প্রতি ঐশী গ্রন্থ ও প্রজ্ঞা অবতীর্ণ করেছেন এবং আপনাকে এমন বিষয় শিক্ষা দিয়েছেন, যা আপনি জানতেন না। আপনার প্রতি আল্লাহ্র করুণা অসীম' (নিসা ৪/১১০-১১৩)।
সকল শ্রেণীর মানুষের প্রতি আল্লাহ্র অফুরন্ত রহমত ও ভালবাসার কোন শেষ নেই। আল্লাহ পাক বিষয়গুলি রাসূলের মাধ্যমে দয়া ও ক্ষমার বিষয়টি মানুষকে অবহিত করেছেন। তাদেরকে পাপাচার থেকে হুশিয়ার করার নির্দেশও দিয়েছেন।
মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবীব (ছাঃ)-কে বিশেষ প্রত্যাদেশ মাধ্যমে বলেন, 'আপনি এ কুরআন দ্বারা তাদেরকে ভয় প্রদর্শন করুন, যারা আশঙ্কা করে স্বীয় পালনকর্তার কাছে এমতাবস্থায় একত্রিত হওয়ার যে, তাদের কোন সাহায্যকারী ও সুপারিশকারী হবে না- যাতে তারা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে। আর তাদেরকে বিতাড়িত করবেন না, যারা সকাল-বিকাল স্বীয় পালনকর্তার ইবাদত করে, তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে। তাদের হিসাব বিন্দুমাত্রও আপনার দায়িত্বে নয় এবং আপনার হিসাব বিন্দুমাত্র তাদের দায়িত্বে নয় যে আপনি তাদেরকে বিতাড়িত করবেন। নতুবা আপনি অবিচারকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন। আর এভাবেই আমি কিছু লোককে কিছু লোক দ্বারা পরীক্ষায় ফেলেছি, যাতে তারা বলে যে, এদেরকেই কি আমাদের সবার মধ্য থেকে আল্লাহ স্বীয় অনুগ্রহ দান করেছেন? আল্লাহ কি কৃতজ্ঞদের সম্পর্কে সুপরিজ্ঞাত নন? আর যখন তারা আপনার কাছে আসবে যারা আমার নিদর্শন সমূহে বিশ্বাস করে, তখন আপনি বলে দিন তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক! তোমাদের পালনকর্তা রহমত করা নিজ দায়িত্বে লিখে নিয়েছেন যে, তোমাদের যে কেউ অজ্ঞতাবশতঃ কোন মন্দ কাজ করে, অনন্তর এর পরে তওবা করে নেয় এবং সৎ হয়ে যায়, তবে তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, করুণাময়' (আন'আম ৬/৫১-৫৪)।
অত্যন্ত বাস্তব ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনা দিয়ে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূল (ছাঃ)-কে প্রত্যাদেশ করেন, 'বলুন, হে আল্লাহ! আসমান ও যমীনের স্রষ্টা, দৃশ্য ও অদৃশ্যের জ্ঞানী, আপনিই আপনার বান্দাদের মধ্যে ফায়ছালা করবেন, যে বিষয়ে তারা মতবিরোধ করত। যদি গোনাহগারদের কাছে পৃথিবীর সবকিছু থাকে এবং তার সাথে সমপরিমাণ আরও থাকে, তবে অবশ্যই তারা ক্বিয়ামতের দিন সে সব কিছুই নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য মুক্তিপণ হিসাবে দিয়ে দেবে। অথচ তারা দেখতে পাবে, আল্লাহ্ পক্ষ থেকে এমন শাস্তি, যা তারা কল্পনাও করত না। আর দেখবে তাদের দুষ্কর্মসমূহ এবং যে বিষয়ে তারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত, তা তাদেরকে ঘিরে নেবে। মানুষকে যখন দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করে, তখন সে আমাকে ডাকতে শুরু করে। এরপর যখন আমি তাকে আমার পক্ষ থেকে নে'মত দান করি, তখন সে বলে, এটা তো পূর্বের জ্ঞান মতেই প্রাপ্ত হয়েছি। অথচ এটা এক পরীক্ষা, কিন্তু তাদের অধিকাংশই বোঝে না। তাদের পূর্ববর্তীরাও তা-ই বলতো। অতঃপর তাদের কৃতকর্ম তাদের কোন উপকারে আসেনি। তাদের দুষ্কর্ম তাদেরকে বিপদে ফেলেছে। এদের মধ্যেও যারা পাপী, তাদেরকে অতিসত্বর তাদের দুষ্কর্ম বিপদে ফেলবে। তারা তা প্রতিহত করতে সক্ষম হবে না। তারা কি জানেনি যে, আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা রিযিক বৃদ্ধি করেন এবং পরিমিত দেন। নিশ্চয়ই এতে বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে। বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর যুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহ্র রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গোনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। তোমাদের পালনকর্তার অভিমুখী হও এবং তাঁর আজ্ঞাবহ হও, তোমাদের কাছে আযাব আসার পূর্বে। এরপর তোমরা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না' (যুমার ৩৯/৪৬-৫৪)।
বিশ্বজগতে সৃষ্ট সকল বস্তুর প্রতিপালক আল্লাহ, সকল বস্তুর প্রতি ক্ষমাশীলও তিনি। মানুষের মধ্যে যারা আল্লাহকে প্রতিপালক ও একমাত্র উপাস্য মনে করে বা বিশ্বাস করে, জীবনযাত্রার পথে ভুল-ত্রুটি, অন্যায়-অপরাধ করে, তাদেরকে তিনি ক্ষমা করেন। কিন্তু যারা আল্লাহ্র পরিবর্তে অন্য উপাস্য গ্রহণ করে বা অন্য উপাস্যে বিশ্বাসী তাদেরকে তিনি ক্ষমা করেন না।
ধর্মের প্রথম কাজ আল্লাহ্র আদেশ মান্য করা, দ্বিতীয় কাজ মহানবী (ছাঃ)-এর আদর্শের অনুসরণ করা। পূর্ণাঙ্গ ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে এ দু'টির একটিও বাদ দেয়া যাবে না। আল্লাহ্র আদেশ হ'ল কুরআনের বাণী এবং কুরআনের বাণীর সঠিক ব্যাখ্যাকারক ও বাস্তবায়নকারী হ'লেন মহানবী (ছাঃ)। তাই আল্লাহ্র বাণী ও বাস্তবায়নের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নিয়ে বহু লোক নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট আসতো। তাছাড়াও তাদের স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়গুলিও তারা নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট উপস্থাপন করত। ক্ষমাশীল ও দয়াশীল আল্লাহ তা'আলা তাঁর দয়ার নবী (ছাঃ)-কে সন্তোষজনক বাণীর দ্বারা, প্রত্যাদেশ করতেন। তিনি তাকে সান্ত্বনা দিতেন। এরূপ তাৎপর্যপূর্ণ এক প্রত্যাদেশে আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূলকে বলেন, 'বলে দিন, হে মানবকুল! তোমরা যদি আমার দ্বীনের ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে থাক, তবে (জেনো) আমি তাদের ইবাদত করি না যাদের ইবাদত তোমরা কর আল্লাহ ব্যতীত। কিন্তু আমি ইবাদত করি আল্লাহ তা'আলার, যিনি তুলে নেন তোমাদেরকে। আর আমার প্রতি নির্দেশ হয়েছে যাতে আমি ঈমানদারদের অন্তর্ভুক্ত থাকি। আর যেন সোজা দ্বীনের প্রতি মুখ করি সরল হয়ে এবং যেন মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত না হই। আর নির্দেশ হয়েছে আল্লাহ ব্যতীত এমন কাউকে ডাকব না, যে আমার ভাল করবে না মন্দও করবে না। বস্তুতঃ আপনি যদি এমন কাজ করেন, তাহ'লে তখন আপনিও যালেমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন। আর আল্লাহ যদি আপনার উপর কোন কষ্ট আরোপ করেন তাহ'লে কেউ নেই তা খণ্ডাবার মত তাঁকে ছাড়া। পক্ষান্তরে যদি তিনি কিছু কল্যাণ দান করেন, তবে তাঁর মেহেরবাণীকে রহিত করার মতও কেউ নেই। তিনি যার প্রতি অনুগ্রহ দান করতে চান স্বীয় বান্দাদের মধ্যে তাকেই দান করেন, বস্তুতঃ তিনিই ক্ষমাশীল, দয়ালু' (ইউনুস ১০/১০৪-১০৭)।
মহান আল্লাহ আরও বলেন, 'নিশ্চয় আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফায়ছালা করেন, যা আল্লাহ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান। আপনি বিশ্বাসঘাতকদের পক্ষ থেকে বিতর্ককারী হবেন না এবং আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল দয়ালু' (নিসা ৪/১০৫, ১০৬)।
মানবকুল শ্রেষ্ঠ ও নবী-রাসূলকুল শ্রেষ্ঠ আমাদের মহানবী (ছাঃ)-এর উপর যে ক্ষমার আয়াতগুলি অবতীর্ণ হয়েছে, সেগুলিতে তাঁর দায়িত্বের বিষয়ও তাঁকে বিশেষভাবে অবহিত করা হয়েছে। যাতে তিনি তাঁর কর্তব্যনিষ্ঠা দ্বারা পথভ্রষ্ট মানুষকে হেদায়াতের পথে ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হন এবং হেদায়াত প্রাপ্তরা হকের উপর অবিচল থাকে।