📄 আল্লাহ ভয়ের যোগ্য ও ক্ষমার অধিকারী
শেষোক্ত আয়াতদ্বয়ের ব্যাখ্যা আরও অধিক তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে দেখা যায় সম্মানিত ফেরেশতাগণও মানুষের উপর বিপদ-আপদ বর্ষিত হওয়ার মত দুর্যোগপূর্ণ বিষয়গুলি হ'তে মানুষকে অব্যাহতি দেয়ার জন্য করণাময় আল্লাহ্র নিকট দো'আ করেন, আল্লাহ সবার দো'আ শ্রবণ করেন, অতঃপর তাঁর সন্তুষ্টির বিষয়গুলি অনুমোদন করেন। সুতরাং মানুষকে আল্লাহ্ নিকট ক্ষমা লাভের জন্য অবশ্যই অতীব স্বচ্ছ হৃদয়ে সংগোপনে অশ্রুসজল নেত্রে দো'আ করতে হবে। আল্লাহ ক্ষমাশীল- এই বিশ্বাস নিয়েই স্বীয় হৃদয়কে ধৈর্যের উপর আবদ্ধ রেখে আশার প্রদীপ নিয়ে জীবন পাড়ি দিতে হবে। জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন। আমীন!!.
মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহ তা'আলা স্বীয় সন্তুষ্টি সাধনের পরিকল্পনায় মানব ও অসংখ্য প্রাণী সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তাঁর এই বিপুল প্রাণীজগতের সুবিধার্থে অসংখ্য বৃহৎ বস্তু হ'তে শুরু করে ক্রমান্বয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দৃশ্য ও অদৃশ্য বস্তু সৃষ্টি করেছেন। এরা সবাই নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের আনাচে- কানাচে একে অপরের পাশে বসবাস করছে। এরা অধিকাংশই একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে শান্তিপূর্ণ অবস্থানে বসবাস করে, কিন্তু কিছু সংখ্যক হিংস্র প্রাণী একে অপরকে আক্রমণ করে হত্যা করে ও ভক্ষণ করে। ফলে তারা পরস্পরে শত্রুতে পরিণত হয়ে যায় এবং এতে সবল বা শক্তিশালীরাই প্রাধান্য বিস্তার করে, দুর্বলরাই চিরকালের জন্য ভীতির শিকার হয়ে যায়।
এভাবে হাযার হাযার জীব-জানোয়ার বা পশু-পাখী, কীট-পতঙ্গ, জলজ প্রাণী প্রভৃতির দুর্বলরা সর্বদাই সবলদের ভয়ে ভীত থেকে আত্মরক্ষা করে চলে। সৃষ্টির সেরা মানব জাতির মধ্যেও দুর্বলরা সবলদের দাপটে ভীত, কম্পিত এবং আতংকিত থাকে। কারণ মানুষ শ্রেষ্ঠ প্রাণী হয়েও হিংস্রতায় অনেক সময় পশুকেও হার মানায়, এটা সবার জানা কথা। কিন্তু মানুষের এ হিংস্রতার পশ্চাতেও যে একজন অদ্বিতীয় ক্ষমতাধর (আল্লাহ) নিরীক্ষক আছেন, তা সর্বদা সবার মনে রাখা উচিত। তিনি স্বয়ং স্রষ্টা আল্লাহ তা'আলা। তিনি জীব জগতের সবার প্রতি সমান দয়াশীল, কৃপাশীল ও ক্ষমাশীল। তিনি কারো প্রতি কারো অন্যায়, অত্যাচার বা অবিচার পসন্দ করেন না এবং সহ্যও করেন না। তন্মধ্যে মানুষের বিষয়টি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। যেহেতু মানুষ হ'ল সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ, কাজেই তার আচরণও হবে শ্রেষ্ঠ। মানুষকে অবশ্যই ভাল আচার-আচরণের মধ্য দিয়ে আল্লাহ্র আদেশ সহ তাঁর ইবাদত-বন্দেগী করে যেতে হবে, কোন ক্রমেই স্বেচ্ছাচারিতা চলবে না।
জীবজগতে মানুষই জ্ঞানী হিসাবে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। কিন্তু পেশী শক্তির দিক দিয়ে বহু হিংস্র বন্যপ্রাণী এবং সমুদ্রে জলজপ্রাণী রয়েছে। যারা যে কোন মানুষকে বা শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী পণ্ডিতকেও অনায়াসে গ্রাস করতে সক্ষম। কিন্তু মহাজ্ঞানী আল্লাহ মানুষকে যে যৎসামান্য জ্ঞান প্রদান করেছেন, তার দ্বারাই মানুষ বড় বড় হিংস্র প্রাণী ও বিশাল আকৃতির (১৫০ একশত পঞ্চাশ মেট্রিক টন পর্যন্ত ওজনের নীল তিমি) জলজ প্রাণীকেও ধরতে সক্ষম। শুধু হিংস্র ও জলজ প্রাণীই নয়, বর্তমান বিজ্ঞানীরা তাঁদের অসাধারণ বুদ্ধিবলে যে সব মারণাস্ত্র তৈরী করছে, তা একান্তই বিস্ময়ের বিষয়! মানুষের তৈরী একটি অস্ত্র হাযার হাযার মানুষকে হত্যা ও হাযার হাযার মানুষকে ক্ষত-বিক্ষত ও পঙ্গু করে ফেলতে পারে নিমিষেই।
মানুষের ভাল-মন্দ, ন্যায়পরায়ণতা, বিদ্বেষ, প্রবৃত্তির স্বাধীনতা প্রভৃতির কথা অন্তর্যামী আল্লাহ তা'আলা ভালভাবেই জানেন। তিনি সব কিছুর ঊর্ধ্বে তাঁর মহোত্তম আদেশ, কুরআনের আদেশ-নিষেধ মেনে চলার জন্য মানব জাতির প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান। যারা মহিমাময় আল্লাহ্র অসামান্য নিদর্শন সমূহের প্রতি বিশ্বাসী তারা তাঁর আদেশ উপদেশের প্রতি শ্রদ্ধা- ভক্তি ও অকৃত্রিম বিশ্বাস নিয়ে আত্মসমর্পণ করে। অতঃপর ক্বিয়ামতের বিচারের ভয়াবহ বর্ণনায় এবং আল্লাহ্র অলৌকিক শক্তি ভাণ্ডারের সমন্বয়ে সংগঠিত আযাব ব্যবস্থা সম্পর্কে অবতীর্ণ অহিসমূহ প্রকৃত বান্দার হৃদয়ে অসম্ভব ভীতির উদ্রেক করে।
আল্লাহ তাঁর বিচার ব্যবস্থায় শান্তি ও শাস্তির বিশদ বিবরণ দিয়ে অসংখ্য অর্থপূর্ণ আয়াতসমূহ অবতীর্ণ করেছেন এবং সেগুলি ভীতি সহকারে গ্রহণ করে বিনীত চিত্তে মান্য করার উপদেশ দিয়েছেন। যারা আল্লাহ্ এই আদেশ একনিষ্ঠভাবে মনোযোগী হয়ে ভীতি সহকারে তা পালন করে তারা অবশ্যই কৃতকার্য হবে। কারণ আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন, ফলে তারা আশার আলো দেখতে পায়। পক্ষান্তরে যাদের অন্তরে ভীতির উদয় হয় না, তাদের প্রতি আল্লাহ অসন্তুষ্টই থাকেন। ফলে তারা নিরাশার অন্ধকারে পড়ে যায়। এই নিদারুণ সংকটময় পরিস্থিতি হ'তে পরিত্রাণের জন্যই আল্লাহ তা'আলা মানব সম্প্রদায়কে তাঁর সম্মানে ও ভয়ে কাজ করে যাওয়ার পুনঃ পুনঃ প্রত্যাদেশ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, هُوَ أَهْلُ التَّقْوَى وَأَهْلُ الْمَغْفِرَةِ 'তিনিই ভয়ের যোগ্য এবং ক্ষমার অধিকারী' (মুদ্দাচ্ছির ৭৪/৫৬)।
وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ 'আল্লাহকে ভয় কর! নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু' (হুজুরাত ৪৯/১২)।
ক্ষমা প্রার্থনার প্রতি মানবজাতিকে আকৃষ্ট করার প্রয়াসে কৃপাশীল আল্লাহ প্রত্যাদেশ করেন, وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا 'আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার পাপ মোচন করেন এবং তাকে মহাপুরস্কার দেন' (তালাক্ব ৬৫/১)।
আল্লাহ ঈমানদারগণকেও ক্ষমা প্রার্থনার জন্য উৎসাহিত করেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَلْ لَّكُمْ فُرْقَانًا وَيُكَفِّرْ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ
وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ
'হে ঈমানদারগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় করতে থাক, তবে তোমাদের মধ্যে ফায়ছালা করে দেবেন এবং তোমাদের থেকে তোমাদের পাপকে সরিয়ে দেবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন। বস্তুতঃ আল্লাহ মহা অনুগ্রহের অধিকারী' (আনফাল ৮/২৯)।
إِنَّ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ بِالْغَيْبِ لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ كَبِيرٌ 'নিশ্চয়ই যারা তাদের পালনকর্তাকে না দেখে ভয় করে, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার' (মুলক ৬৭/১২)।
উপরের আয়াতগুলিতে আল্লাহ তা'আলা, তাঁকে ভয় করে চলার বা কাজ করার জন্য তাঁর বান্দাগণকে সরল-সহজ ও কঠিনভাবে আহ্বান জানিয়েছেন। কারণ তিনি যে কোন সময় (ইহকালে) অপরাধী ব্যক্তিকে শাস্তি দিতে পারেন এবং ভবিষ্যতেও (পরকালে) দিবেন। আল্লাহ্র ঘোষিত এ শাস্তি মানুষ অনুভব করতে পারে না। যদিও ইহকালেই মানুষ হঠাৎ দুর্ঘটনায় পড়ে কেউ মৃত্যুবরণ করে, কেউ চক্ষু হারায়, কেউ হাত, পা, কান হারায় এবং আরও অধিক কষ্ট পায়। অবশ্য পরকালের শাস্তি স্বীয় বিশ্বাসের দ্বারা আবৃত। তাই অবিশ্বাসীরা সেটা কিছুই মনে করে না। তবে বিশ্বাসীরা ইহকালের শাস্তিকেও ভয় করে, পরকালের আযাবকে আরো ভয়াবহ মনে করে। ইহকালে দুর্ঘটনা কবলিত শাস্তিগুলিকে দুর্ঘটনার উপর দোষারোপ করা হয়। কিন্তু কোন মানুষ যখন রাস্তায় হাটতে হাটতে শুয়ে, বসে বা স্বাভাবিক অবস্থায় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের হানির শিকার হয়, তখন সঠিক জবাব দিতে ব্যর্থ হয়। অথচ উভয় শাস্তিই আল্লাহ সম্যক অবগত এবং তাঁরই অব্যর্থ পরীক্ষা।
পৃথিবীর বুকে অধিকাংশ মানুষই সর্বদাই ভয়ে ভীত থাকে, কেউ মৃত্যু ভয়ে, কেউ অসুস্থতার ভয়ে, কেউ শত্রুর ভয়ে, কেউ শক্তিশালী রাষ্ট্রের ভয়ে, কেউ হিংস্র প্রাণীর ভয়ে, কেউ মান-সম্মানের ভয়ে এবং আরও নানা প্রকার ভয়ে ভীত থাকে। দুনিয়ার সকল ভয়-ভীতির কথা চিন্তা করলে আল্লাহ্র ভীতির বিষয়টি সহজ হয়ে যাবে। কারণ সকল ভয়ের উৎসই হ'ল মরণ ও জীবন। জীবন যুদ্ধে মৃত্যুর হাত হ'তে যে কোনভাবে বেঁচে থেকে গৌরবময় জীবনযাপনই হ'ল সার্থক জীবন। আর সেজন্যই বড় বড় রাজা- বাদশাহ-প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীরা জীবনের নিরাপত্তার জন্য নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। কিন্তু জীবন ও মরণের স্রষ্টা ও মহানিয়ন্ত্রক হ'লেন স্বয়ং মহাক্ষমতার মালিক আল্লাহ। তাঁর পরিচালিত অভিযানের সামনে পৃথিবীর যে কোন শক্তি এমনকি সমস্ত পৃথিবীর সম্মিলিত শক্তিও এক মুহূর্ত দাঁড়াতে পারবে না। রাজা-মহারাজা, প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, সেনাধ্যক্ষ, জ্ঞানী- বিজ্ঞানী, পণ্ডিত সহ বড় বড় শক্তিধর এবং ক্ষুদ্র মানুষেরাও একইভাবে মৃত্যুর সম্মুখীন হবে। কোন বাধা বা প্রচেষ্টা একে ঠেকাতে পারবে না এবং তাতে এক মুহূর্তও এদিক ওদিক হবে না। এজন্যই আল্লাহ তাঁর একত্বের কথা বলেন, أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاتَّقُوْنِ 'কোন উপাস্য নেই। সুতরাং আমাকে ভয় কর' (নাহ'ল ১৬/২)। তিনি আরো বলেন, أَنَا رَبُّكُمْ فَاتَّقُوْنِ 'আমি তোমাদের প্রতিপালক, সুতরাং আমাকেই ভয় কর' (মুমিনূন ২৩/৫২)।
অন্যত্র তিনি বলেন, وَاتَّقُوْنِ يَا أُوْلِي الألْبَاب 'হে জ্ঞানীগণ! তোমরা আমাকেই ভয় কর' (বাক্বারাহ ২/১৯৭)।
তিনি আরও বলেন, وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُوْنَ 'আল্লাহকে ভয় কর, যাতে অনুগ্রহ লাভ করতে পার' (হুজুরাত ৪৯/১০)।
বস্তুতঃ বাস্তব জগতে ভয়ের শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন হচ্ছে ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, সুনামী, হ্যারিকেন, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদির মত আক্রমণ। বর্তমানে সারা বিশ্বে এগুলির আক্রমণ হ'তে আত্মরক্ষার জন্য পূর্ব সতর্কীকরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু সেগুলিকে প্রতিহত করার সাধ্য কারো নেই। কারণ এসব দুর্যোগ বিজ্ঞানীদের মতে প্রাকৃতিক কারণে সংঘটিত হয় বলা হ'লেও আল্লাহ্ বাণী ও বিধান মতে তাঁর হুকুম ছাড়া হয় না।
অবশ্য আলোচ্য গযবগুলি ইহকালীন জীবনের, পরকালের নয়। তবে পরকালের শাস্তি হ'তে আত্মরক্ষার জন্য আল্লাহ তা'আলা বহু আয়াত অবতীর্ণ করেছেন। যারা পরকালে বিশ্বাসী তারা আল্লাহ্র ভয়ে ভীত হয়ে কাজ করে পরিত্রাণ পেয়ে যাবে। আর যারা পরকালে অবিশ্বাসী তারা আল্লাহ্র বিচারে শাস্তিযোগ্য অপরাধী হবে এবং তাদের শাস্তি ইহকালীন ভূমিকম্প, সুনামী, সিডর প্রভৃতির সমষ্টি অপেক্ষাও বহুগুণে বেশী হবে, যা কল্পনাতীত।
সুতরাং ইহকালীন বা পরকালীন ভয়ঙ্কর কোন শাস্তিকেই ভয় না করে তার স্রষ্টা ও নিয়ন্ত্রক পরাক্রমশালী আল্লাহকেই ভয় করা উচিত। তিনি চান সৃষ্টির সকল বস্তু তাঁর পরিপূর্ণ আনুগত্যে সীমাবদ্ধ থাকুক। এই আনুগত্যের পরিসরকে ত্রুটিমুক্ত করার প্রয়াসে মহান আল্লাহ তাঁকে ভয় ও স্মরণ করার জন্য বান্দাদের পুনঃ পুনঃ আদেশ দান করেছেন। উপরোক্ত সংক্ষিপ্ত আয়াতগুলিতে তার মর্মার্থ প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
অতঃপর আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবীব (ছাঃ)-কে লক্ষ্য করে বলেন, قُلْ يَا عباد الَّذِيْنَ آمَنُوا اتَّقُوْا رَبَّكُمْ 'বলুন, হে আমার বিশ্বাসী বান্দাগণ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর' (যুমার ৩৯/১০)। অপর এক আয়াতে আল্লাহ বলেন, 'আপনি এ কুরআন দ্বারা তাদেরকে ভয় প্রদর্শন করুন, যারা আশঙ্কা করে স্বীয় পালনকর্তার কাছে এমতাবস্থায় একত্রিত হওয়া যে, তাদের কোন সাহায্যকারী ও সুপারিশকারী হবে না, যাতে তারা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে' (আন'আম ৬/৫১)।
অন্যত্র তিনি বলেন, 'হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর রাসূলদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। তিনি নিজ অনুগ্রহে দ্বিগুণ অংশ তোমাদেরকে দিবেন, তোমাদেরকে দিবেন জ্যোতি, যার সাহায্যে তোমরা চলবে এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়াময়' (হাদীদ ৫৭/২৮)।
ইসলাম ধর্মের প্রধান প্রতিপাদ্য হ'ল এক আল্লাহ্ ইবাদত, তাঁর প্রতি অকৃত্রিম ভয়-ভীতি, ভালবাসা, আত্মবিশ্বাস ও আত্মসমর্পণ। অতঃপর উম্মতে মুহাম্মাদীর কর্তব্য মহানবী (ছাঃ)-এর অকৃত্রিম অনুসরণ। এ দু'টি বিষয়ই পবিত্র কুরআনের সর্বাধিক আলোচিত বিষয়। যদি কেউ এর বিকল্প চিন্তা-ভাবনা করে তবে নিঃসন্দেহে সে অপূরণীয় ক্ষতিতে নিমজ্জিত হবে। অতএব এক আল্লাহ্র ইবাদত ও নবী করীম (ছাঃ)-এর যথাযথ অনুসরণ পূর্বক আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের পথে এগিয়ে যেতে হবে। এটা অনস্বীকার্য যে, আল্লাহ প্রদত্ত এই বিধান উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ। পরম করুণাময় আল্লাহ তা'আলা আমাদের প্রিয় রাসূল (ছাঃ)-কে অত্যন্ত ভালবাসতেন এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)ও তাঁর উম্মতকে অত্যন্ত ভালবাসতেন। এ প্রেক্ষাপটে নবী করীম (ছাঃ)-কে আশ্বস্ত করার প্রয়াসে মহান আল্লাহ বলেন, 'হে মুহাম্মাদ! আপনি বলে দিন, হে আমার (আল্লাহ্) বান্দারা, যারা নিজেদের উপর বাড়াবাড়ি করেছ তোমরা আল্লাহ্র রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গোনাহ মাফ করে দিবেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও করুণাময়' (যুমার ৩৯/৫৩)।
মহান আল্লাহ আরও বলেন, 'আর আমার অনুগ্রহ সকল বস্তুকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে' (আ'রাফ ৭/১৫৬)।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর উম্মতকে কত ভালবাসেন তার নমুনাস্বরূপ একটি হাদীছের উদ্ধৃতি দেয়া হ'ল। আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনে আছ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা নবী করীম (ছাঃ) ইবরাহীম (আঃ) সম্পর্কিত মহান আল্লাহ্ এ বাণী তেলাওয়াত করেন, 'হে আমার রব! এ মূর্তিগুলো বহু মানুষকে পথভ্রষ্ট করেছে। কাজেই যে ব্যক্তি আমার অনুসরণ করবে, সে তো আমারই' (ইবরাহীম ৩৬)। আর তিনি (মুহাম্মাদ ছাঃ) ঈসা (আঃ)-এর বাণী (যা কুরআনে আছে) তেলাওয়াত করেন, 'আপনি যদি তাদের শাস্তি দেন তাহ'লে (এ শাস্তি দেবার অধিকার আপনার আছে), কারণ তারা তো আপনারই বান্দা। আর আপনি যদি তাদের মাফ করে দেন, তাহ'লে (আপনি তাও করতে পারেন কারণ) আপনি তো মহাপরাক্রমশালী ও বিজ্ঞানময়। অতঃপর তিনি তাঁর দু'হাত উঠিয়ে বললেন, 'হে আল্লাহ! আমার উম্মত! আমার উম্মত!! এই বলে তিনি কেঁদে ফেললেন। মহামহিম আল্লাহ জিবরাঈলকে ডেকে বললেন, তুমি মুহাম্মাদের কাছে যাও এবং তাঁকে কাঁদার কারণ জিজ্ঞেস কর, তবে এ ব্যাপারে তোমার রব অবহিত আছেন। অতঃপর জিবরাঈল (আঃ) তাঁর কাছে উপস্থিত হ'লেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁকে যা বলার ছিল বলে দিলেন। এ ব্যাপারে তিনি (আল্লাহ) তো সবই জানেন। সুতরাং মহান আল্লাহ জিবরাঈলকে বললেন, তুমি মুহাম্মাদের কাছে গিয়ে বল, 'আমি আপনাকে উম্মতের ব্যাপারে সন্তুষ্ট করব, চিন্তাযুক্ত করব না' (মুসলিম)।
এ জগতে মানুষ, সামাজিক, বিবেকবান প্রাণী, সাধারণত হিংস্র নয়। মানুষ ব্যতীত অনেক নিরীহ প্রাণী আছে, আবার অনেক হিংস্র প্রাণীও রয়েছে, যারা সরাসরি মানুষকে হত্যা করে খায়। এ ধরনের হিংস্র জন্তুরা মানুষের বড় শত্রু এবং মানুষ এদেরকে ভয় করে। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে মানুষই
টিকাঃ
মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫৩১৩, 'কিতাবুর রিকাকু' ‘তাওয়াক্কুল করা ও ধৈর্য ধরা' অনুচ্ছেদ।
মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১৯০৩, 'কিতাবুয যাকাত'।
মুসলিম।
📄 আল্লাহ ক্ষমাশীল ও তওবা কবুলকারী
'তওবা' (توبة) আরবী শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ প্রত্যাবর্তন করা বা ফিরে আসা। ইসলামের বিধান মতে কোন ব্যক্তি তার দৈনন্দিন জীবনে ইচ্ছাকৃত, অনিচ্ছাকৃত বা ভুলবশতঃ পাপ কাজ করে ফেলে, নিজের ভুল বুঝতে পেরে তওবা করে সঠিক পথে ফিরে আসতে পারে। মানুষ মাত্রই ভুল করে বা ভুল হয়। মহান স্রষ্টা একথা সবচাইতে ভাল জানেন। তাই তাঁর প্রিয় মানব জাতিকে তিনি তওবা করা ও ক্ষমা পাওয়ার মত এক সুবর্ণ সুযোগ দান করেছেন।
আলোচনার শুরুতেই জেনেছি যে, আল্লাহ্র নিরানব্বইটি অপূর্ব সুন্দর নাম আছে। এ নামগুলির মধ্যে দয়াশীল ও ক্ষমাশীল সমগ্র মানব জাতির জন্য এক অনন্য আশীর্বাদ রূপে প্রতিষ্ঠিত। দয়া ও ক্ষমার বদৌলতে মানুষ এক পরম সুশিক্ষা লাভ করে এবং নিজেও অনেক সময় দয়া ও ক্ষমার মত মহৎ কাজের নমুনা প্রদর্শন করে থাকে। এরপরও ছোট-বড় ভুল, অন্যায় বা পাপ করা মানব জাতির সহজাত প্রবৃত্তি। প্রবৃত্তির তাড়নায় ও শয়তানের কু-প্ররোচনায় মানুষ সাধারণত ভুল-ত্রুটি করে থাকে। আমাদের আদি পিতা আদম (আঃ)ও শয়তানের মিথ্যা প্রতারণামূলক কথায়, আল্লাহ্র কথা ভুলে গিয়ে নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়ে ফেলেছিলেন। অতঃপর আদম (আঃ) ও বিবি হাওয়ার অনুতাপ ও কান্না বিজড়িত ক্ষমা প্রার্থনায় দয়াপরবশ হয়ে আল্লাহ তা'আলা তাঁদেরকে ক্ষমা করে দেন এবং পরবর্তীতে এরূপ ভুল না করার জন্য সাবধান করে দেন।
অতঃপর মানব জাতিকে দুনিয়ার বুকে ও পরকালে সুপ্রতিষ্ঠিত ও সম্মানিত করার জন্য তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ ক্ষমার ধারা বহাল রাখেন। অর্থাৎ আদম (আঃ)-এর পরবর্তী কালেও মানুষ ভুল করে বা পাপ করে আল্লাহ্ কাছে বিনীতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা বা তওবা করলে তিনি তাকে ক্ষমা করে দেবেন বলে বহু আয়াত অবতীর্ণ করেন। মহান আল্লাহ বলেন,
وَالَّذِينَ عَمِلُوا السَّيِّئَاتِ ثُمَّ تَابُوا مِنْ بَعْدِهَا وَآمَنُوا إِنَّ رَبَّكَ مِنْ بَعْدِهَا لَغَفُوْرٌ
رَّحِيمٌ
'আর যারা মন্দ কাজ করে, তারপরে তওবা করে নেয় এবং ঈমান নিয়ে আসে, তবে নিশ্চয়ই আপনার পরওয়ারদেগার তওবার পর অবশ্যই ক্ষমাকারী, করুণাময়' (আ'রাফ ৭/১৫৩)।
অন্যত্র আল্লাহ বলেন,
ثُمَّ إِنَّ رَبَّكَ لِلَّذِينَ عَمِلُوا السُّوْءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ تَابُوْا مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ وَأَصْلَحُوْا إِنَّ
رَبَّكَ مِنْ بَعْدِهَا لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ
'অনন্তর যারা অজ্ঞতাবশতঃ মন্দ কাজ করে, অতঃপর তওবা করে এবং নিজেকে সংশোধন করে নেয়, আপনার পালনকর্তা এসবের পরে তাদের জন্য অবশ্যই ক্ষমাশীল, দয়ালু' (নাহ'ল ১৬/১১৯)।
আল্লাহ আরো বলেন,
إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللَّهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُوْنَ السُّوْء بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوبُوْنَ مِنْ قَرِيب
فَأُولَئِكَ يَتُوبُ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا
'অবশ্যই আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করবেন, যারা ভুলবশতঃ মন্দ কাজ করে অতঃপর অনতিবিলম্বে তওবা করে, এরাই হ'ল সেসব লোক যাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, রহস্যবিদ' (নিসা ৪/১৭)।
وَمَنْ يَعْمَلْ سُوءًا أَوْ يَظْلِمْ نَفْسَهُ ثُمَّ يَسْتَغْفِرِ اللَّهَ
يَجِدِ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا 'যে গোনাহ করে বা নিজের অনিষ্ট করে, অতঃপর আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল, করুণাময় পায়' (নিসা ৪/১১০)।
তওবা ইসলামের বিধানভুক্ত আল্লাহ্র অনুগ্রহ লাভের একটি অন্যতম মাধ্যম। ধর্মের পাঁচটি মৌলিক বিষয়- কালেমা, ছালাত, ছিয়াম, যাকাত ও হজ্জ ছাড়াও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধান আছে, সেগুলিও ইবাদত বা ইবাদতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যেমন সত্য কথা বলা, হালাল উপার্জন ভক্ষণ করা, মানুষের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করা, পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ করা, দুর্বলকে সাহায্য করা, দান-খয়রাত করা, চেনা-অচেনা সকলকে সালাম দেয়া, দৈনন্দিন জীবনের জানা-অজানা ত্রুটির জন্য তওবা করা। তাছাড়া আরও অনেক ইসলামী বিধান আছে। আসলে কুরআন ও হাদীছের বাণী সমূহ দ্বারা বারবার প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের অত্যধিক ভালবাসেন। তাই বান্দা যেন তাঁর ভালবাসা হ'তে দূরে সরে না যায়। এমনকি অন্যায়-অত্যাচার, অবিচার, অপরাধ করেও পুনরায় আল্লাহ্র বিধানের দিকে ফিরে আসতে পারে, সেজন্যই তওবার বিধান রাখা হয়েছে।
উপরোল্লেখিত আয়াত সমূহের আলোকে বুঝা যায়, যারা দৈনন্দিন জীবনের সরল-সহজ পথে সতর্কতা অবলম্বনে ঐকান্তিকভাবে নিয়োজিত শুধু তাদের কাছেই তাড়াতাড়ি ভুল ধরা পড়ে। যেহেতু কোন মানুষই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়, তাই কোন সময় অজ্ঞতাবশত, কোন সময় অসাবধানতাবশত, কোন সময় অসচেতনতাবশতঃ আবার কোন সময় দৈবক্রমেও অন্যায়-অত্যাচার ও অবিচারের মত অপরাধ সংঘটিত হয়ে যায়। অতঃপর নিজের ভুল ও অপরাধ বুঝতে পেরে আত্মসমালোচনার প্রেক্ষাপটে ভ্রম সংশোধনের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহ্র শরণাপন্ন হয়ে তওবা করলে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। মানুষের অপরাধের সীমাবদ্ধতাও তিনি জানেন এবং তাঁর ক্ষমার সীমাবদ্ধতাও একমাত্র তিনিই জানেন। তবে তাঁর বৈচিত্র্যময় আয়াতগুলির বর্ণনায় আমরা বিস্ময়াভূত না হয়ে পারি না।
মহান আল্লাহ বলেন, 'যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে, তাদের হাত কেটে দাও, তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসাবে। এটা আল্লাহ্ পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারী। আল্লাহ পরাক্রান্ত, জ্ঞানময়। অতঃপর যে তওবা করে স্বীয় অত্যাচারের পর এবং সংশোধিত হয়, নিশ্চয়ই আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু। আপনি কি জানেন না যে, আল্লাহ্ নিমিত্তেই নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের রাজত্ব! তিনি যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন, যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান' (মায়েদাহ ৫/৩৮-৪০)।
অন্যত্র আল্লাহ বলেন, 'আমার বান্দাদের একদল বলত, হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি। অতএব আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করুন ও আমাদের প্রতি রহম করুন। আপনি তো দয়ালুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দয়ালু! (মুমিনূন ২৩/১০৯)।
মহান আল্লাহ আরও প্রত্যাদেশ করেন যে, 'তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের মনে যা আছে তা ভালই জানেন। যদি তোমরা সৎ হও, তবে তিনি তওবাকারীদের জন্য ক্ষমাশীল' (বণী ইসরাঈল ১৭/২৫)। অন্তর্যামী আল্লাহ তা'আলা মানুষের মনের অবস্থা সম্পর্কে সম্যক অবগত আছেন। কাজেই ইসলামের যে কোন বিধান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আত্মত্যাগ, আত্মশুদ্ধি, আত্মসমর্পণ ইত্যাদির গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলামে মিথ্যা ও কৃত্রিমতার কোন স্থান নেই। উপরের আয়াত কয়টিতে বিশেষ করে শেষোক্ত আয়াতে আল্লাহ তা'আলা তা সুস্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করে দিয়েছেন। অতঃপর ক্ষমাশীল আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রতি ও তাঁর রাসূলের প্রতি ধাবমান (কতিপয়) বান্দাদের প্রতি লক্ষ্য করে প্রত্যাদেশ করেন, 'যারা আমার নিদর্শনে বিশ্বাস করে তারা যখন আপনার কাছে আসে, তখন তাদেরকে আপনি বলুন, 'তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হৌক। তোমাদের প্রতিপালক দয়া করাকে তাঁর কর্তব্য বলে স্থির করেছেন। তোমাদের মধ্যে কেউ অজ্ঞানতাবশতঃ যদি খারাপ কাজ করে তারপর তওবা করে ও নিজেকে সংশোধন করে, তবে তো আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। এভাবে আমি আয়াত বিশদভাবে বর্ণনা করি যাতে অপরাধীদের সামনে পথ প্রকাশিত হয়' (আন'আম ৬/৫৪, ৫৫)।
বিশ্বাসীদের স্বপক্ষে আল্লাহ্র অসীম করুণার বাণী যা অবিশ্বাস্য মনে হয়, তা অব্যর্থ সত্য হিসাবে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, 'যারা আরশ ধারণ করে আছে আর চারপাশ ঘিরে আছে, তারা তাদের প্রতিপালকের পবিত্র মহিমা ঘোষণা করে ও তাঁর উপর বিশ্বাস করে এবং বিশ্বাসীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার দয়া ও জ্ঞান সর্বব্যাপী। অতএব যারা তওবা করে ও আপনার পথ অবলম্বন করে, আপনি তাদেরকে ক্ষমা করুন ও জাহান্নামের শাস্তি থেকে তাদের রক্ষা করুন' (মুমিন ৪০/৭)।
وَهُوَ الَّذِي يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَعْفُو عَنِ السَّيِّئَاتِ وَيَعْلَمُ مَا تَفْعَلُوْنَ 'তিনিই তাঁর বান্দাদের তওবা গ্রহণ করেন ও পাপ মোচন করেন। আর তোমরা যা কর, তিনি তা জানেন' (শূরা ৪২/২৫)।
অতঃপর নবী করীম (ছাঃ)-কেও (কোন কোন) বান্দার পক্ষে ক্ষমা প্রার্থনা অনুমতি দিয়ে প্রত্যাদেশ করেন যে, 'হে নবী! বিশ্বাসী নারীরা যখন আপনার কাছে আনুগত্যের শপথ করতে এসে বলে, তারা আল্লাহ্র সাথে কাউকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, নিজেদের সন্তানদের হত্যা করবে না, তাদের দু'হাত ও দু'পায়ের মধ্যে বানানো মিথ্যা অপবাদ নিয়ে আসবে না ও সৎ কাজে আপনাকে অমান্য করবে না, তখন আপনি তাদের আনুগত্য গ্রহণ করুন এবং তাদের জন্য আল্লাহ্ কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু' (মুমতাহিনা ৬০/১২)।
উপরের আয়াত কয়টি দ্বারা আল্লাহ তা'আলা তাঁর কতিপয় ধর্মমুখী অজ্ঞ, অসচেতন, নবী (ছাঃ)-এর প্রতি অনুরাগী ও অনুরূপ মনোভাবাপন্ন কিছু সরল-সহজ বান্দাদের ক্ষমা লাভের উপায় বর্ণনা করেছেন। অজ্ঞতাবশতঃ বা অনিচ্ছাকৃতভাবে কেউ কোন অপরাধ করলে, অতঃপর তা বুঝতে পেরে ক্ষমা প্রার্থনা করলে দয়াশীল আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। এদের জন্য ও অন্যান্য বিশ্বাসী বা আল্লাহ অভিমুখী বান্দাদের জন্য আল্লাহ্ আরশধারী ফেরেশতারাও ক্ষমা প্রার্থনা করেন। ফেরেশতারা জানেন এতে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন এবং তাঁর বান্দারাও এই ক্ষমার আওতাভুক্ত হওয়ার প্রতি আগ্রহী ও মনোযোগী হয়। এতদ্বতীত আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূল (ছাঃ)-কেও তাঁর (রাসূলের) প্রতি আনুগত্য পোষণকারী ও দৃঢ়চিত্তের নর-নারীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার নির্দেশ দেন। এভাবে মহাক্ষমাশীল আল্লাহ তা'আলা তাঁর ক্ষমার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বান্দাকে আশ্বস্ত করেছেন।
আল্লাহ্র দয়া ও ক্ষমার ভাণ্ডার অপরিসীম। আমাদের মহানবী (ছাঃ) এ সম্পর্কে বহু হাদীছ বর্ণনা করে গেছেন। উদাহরণ স্বরূপ নিম্নে দু'টি হাদীছ পেশ করা হ'ল।
(১) ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, একদা এক ব্যক্তি একটি স্ত্রীলোককে চুমু খেয়ে বসল। অতঃপর সে নবী করীম (ছাঃ)-এর কাছে এসে এ গুনাহের কথা ব্যক্ত করল। এ সময়ে আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত নাযিল করেন, 'আর দিনের দুই প্রান্তে ও রাতের কিছু অংশে ছালাত কায়েম কর। নিশ্চয়ই সৎকাজ সমূহ গুনাহের কাজ সমূহকে মুছে ফেলে’ (হৃদ ১১৪)। একথা শুনে লোকটি বলল, আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! এটা কি শুধু আমারই জন্য? তিনি বললেন, আমার সমস্ত উম্মতের জন্যই' (মুত্তাফাকু আলাইহ, মিশকাত হা/৫৬৬, 'ছালাত' অধ্যায়)।
(২) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা জনৈক ব্যক্তি নবী করীম (ছাঃ)-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! আমি তো শাস্তিযোগ্য অপরাধ করে ফেলেছি। সুতরাং আপনি আমার উপর সেই শাস্তি বাস্তবায়ন করুন। অতঃপর ছালাতের সময় উপস্থিত হ'লে সে রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে ছালাত পড়ল। ছালাত শেষ করে সে আবার বলল, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! আমি শাস্তিযোগ্য অপরাধ করে ফেলেছি। সুতরাং আপনি আমাকে কিতাবের বিধান অনুযায়ী শাস্তি দিন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি আমাদের সাথে ছালাতে উপস্থিত হয়েছিলে? সে বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তোমার গোনাহ তো মাফ হয়ে গেছে' (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫৬৭, 'ছালাত' অধ্যায়)।
পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের উপরোক্ত বাণীগুলি দ্বারা বান্দার প্রতি মহীয়ান, গরীয়ান আল্লাহ তা'আলার শ্রেষ্ঠতম অকৃত্রিম ভালবাসার নিদর্শন প্রকাশিত হয়েছে। বস্তুতপক্ষে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে অনেক আয়াত রয়েছে যা সকল ধর্মভীরু, আখেরাতমুখী বান্দার জন্য অনুশীলনযোগ্য। মহানবী (ছাঃ)-এর হাদীছগুলিও (একই বিষয়ে) বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এগুলি জ্ঞানীদের জীবনের সর্বোত্তম চাওয়া ও পাওয়ার উৎস স্থল। মহান আল্লাহ্ আহ্বানে কুরআন মান্যকারীরা নতমস্তকে বিনয়ীভাব পোষণ করে এবং সমস্ত সৃষ্টি জগতের প্রতিপালকের পবিত্রতা ও প্রশংসা সহ ফরয ইবাদতের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত ক্ষমা প্রার্থনা করে। যেহেতু ইসলাম হ'ল প্রেমের ধর্ম এবং মুসলমানরা তাদের ধর্মের প্রতি নিষ্ঠাবান। কাজেই তওবার জন্য ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ্ প্রেমের দ্বারা ক্ষমা ও অনুগ্রহ প্রার্থনা মহান আল্লাহ্ত্রই অন্যতম আদেশ।
টিকাঃ
আ'রাফ ৭/১৫৩।
নাহ'ল ১৬/১১৯।
নিসা ৪/১৭।
নিসা ৪/১১০।
মায়েদাহ ৫/৩৮-৪০।
মুমিনূন ২৩/১০৯।
বণী ইসরাঈল ১৭/২৫।
আন'আম ৬/৫৪, ৫৫।
মুমিন ৪০/৭।
শূরা ৪২/২৫।
মুমতাহিনা ৬০/১২।
মুত্তাফাকু আলাইহ, মিশকাত হা/৫৬৬, 'ছালাত' অধ্যায়।
মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫৬৭, 'ছালাত' অধ্যায়।
'তওবা' (توبة) আরবী শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ প্রত্যাবর্তন করা বা ফিরে আসা। ইসলামের বিধান মতে কোন ব্যক্তি তার দৈনন্দিন জীবনে ইচ্ছাকৃত, অনিচ্ছাকৃত বা ভুলবশতঃ পাপ কাজ করে ফেলে, নিজের ভুল বুঝতে পেরে তওবা করে সঠিক পথে ফিরে আসতে পারে। মানুষ মাত্রই ভুল করে বা ভুল হয়। মহান স্রষ্টা একথা সবচাইতে ভাল জানেন। তাই তাঁর প্রিয় মানব জাতিকে তিনি তওবা করা ও ক্ষমা পাওয়ার মত এক সুবর্ণ সুযোগ দান করেছেন।
আলোচনার শুরুতেই জেনেছি যে, আল্লাহ্র নিরানব্বইটি অপূর্ব সুন্দর নাম আছে। এ নামগুলির মধ্যে দয়াশীল ও ক্ষমাশীল সমগ্র মানব জাতির জন্য এক অনন্য আশীর্বাদ রূপে প্রতিষ্ঠিত। দয়া ও ক্ষমার বদৌলতে মানুষ এক পরম সুশিক্ষা লাভ করে এবং নিজেও অনেক সময় দয়া ও ক্ষমার মত মহৎ কাজের নমুনা প্রদর্শন করে থাকে। এরপরও ছোট-বড় ভুল, অন্যায় বা পাপ করা মানব জাতির সহজাত প্রবৃত্তি। প্রবৃত্তির তাড়নায় ও শয়তানের কু-প্ররোচনায় মানুষ সাধারণত ভুল-ত্রুটি করে থাকে। আমাদের আদি পিতা আদম (আঃ)ও শয়তানের মিথ্যা প্রতারণামূলক কথায়, আল্লাহ্র কথা ভুলে গিয়ে নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়ে ফেলেছিলেন। অতঃপর আদম (আঃ) ও বিবি হাওয়ার অনুতাপ ও কান্না বিজড়িত ক্ষমা প্রার্থনায় দয়াপরবশ হয়ে আল্লাহ তা'আলা তাঁদেরকে ক্ষমা করে দেন এবং পরবর্তীতে এরূপ ভুল না করার জন্য সাবধান করে দেন।
অতঃপর মানব জাতিকে দুনিয়ার বুকে ও পরকালে সুপ্রতিষ্ঠিত ও সম্মানিত করার জন্য তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ ক্ষমার ধারা বহাল রাখেন। অর্থাৎ আদম (আঃ)-এর পরবর্তী কালেও মানুষ ভুল করে বা পাপ করে আল্লাহ্ কাছে বিনীতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা বা তওবা করলে তিনি তাকে ক্ষমা করে দেবেন বলে বহু আয়াত অবতীর্ণ করেন। মহান আল্লাহ বলেন,
وَالَّذِينَ عَمِلُوا السَّيِّئَاتِ ثُمَّ تَابُوا مِنْ بَعْدِهَا وَآمَنُوا إِنَّ رَبَّكَ مِنْ بَعْدِهَا لَغَفُوْرٌ
رَّحِيمٌ
'আর যারা মন্দ কাজ করে, তারপরে তওবা করে নেয় এবং ঈমান নিয়ে আসে, তবে নিশ্চয়ই আপনার পরওয়ারদেগার তওবার পর অবশ্যই ক্ষমাকারী, করুণাময়' (আ'রাফ ৭/১৫৩)।
অন্যত্র আল্লাহ বলেন,
ثُمَّ إِنَّ رَبَّكَ لِلَّذِينَ عَمِلُوا السُّوْءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ تَابُوْا مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ وَأَصْلَحُوْا إِنَّ
رَبَّكَ مِنْ بَعْدِهَا لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ
'অনন্তর যারা অজ্ঞতাবশতঃ মন্দ কাজ করে, অতঃপর তওবা করে এবং নিজেকে সংশোধন করে নেয়, আপনার পালনকর্তা এসবের পরে তাদের জন্য অবশ্যই ক্ষমাশীল, দয়ালু' (নাহ'ল ১৬/১১৯)।
আল্লাহ আরো বলেন,
إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللَّهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُوْنَ السُّوْء بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوبُوْنَ مِنْ قَرِيب
فَأُولَئِكَ يَتُوبُ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا
'অবশ্যই আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করবেন, যারা ভুলবশতঃ মন্দ কাজ করে অতঃপর অনতিবিলম্বে তওবা করে, এরাই হ'ল সেসব লোক যাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, রহস্যবিদ' (নিসা ৪/১৭)।
وَمَنْ يَعْمَلْ سُوءًا أَوْ يَظْلِمْ نَفْسَهُ ثُمَّ يَسْتَغْفِرِ اللَّهَ يَجِدِ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا 'যে গোনাহ করে বা নিজের অনিষ্ট করে, অতঃপর আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল, করুণাময় পায়' (নিসা ৪/১১০)।
তওবা ইসলামের বিধানভুক্ত আল্লাহ্র অনুগ্রহ লাভের একটি অন্যতম মাধ্যম। ধর্মের পাঁচটি মৌলিক বিষয়- কালেমা, ছালাত, ছিয়াম, যাকাত ও হজ্জ ছাড়াও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধান আছে, সেগুলিও ইবাদত বা ইবাদতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যেমন সত্য কথা বলা, হালাল উপার্জন ভক্ষণ করা, মানুষের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করা, পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ করা, দুর্বলকে সাহায্য করা, দান-খয়রাত করা, চেনা-অচেনা সকলকে সালাম দেয়া, দৈনন্দিন জীবনের জানা-অজানা ত্রুটির জন্য তওবা করা। তাছাড়া আরও অনেক ইসলামী বিধান আছে। আসলে কুরআন ও হাদীছের বাণী সমূহ দ্বারা বারবার প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের অত্যধিক ভালবাসেন। তাই বান্দা যেন তাঁর ভালবাসা হ'তে দূরে সরে না যায়। এমনকি অন্যায়-অত্যাচার, অবিচার, অপরাধ করেও পুনরায় আল্লাহ্র বিধানের দিকে ফিরে আসতে পারে, সেজন্যই তওবার বিধান রাখা হয়েছে।
উপরোল্লেখিত আয়াত সমূহের আলোকে বুঝা যায়, যারা দৈনন্দিন জীবনের সরল-সহজ পথে সতর্কতা অবলম্বনে ঐকান্তিকভাবে নিয়োজিত শুধু তাদের কাছেই তাড়াতাড়ি ভুল ধরা পড়ে। যেহেতু কোন মানুষই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়, তাই কোন সময় অজ্ঞতাবশত, কোন সময় অসাবধানতাবশত, কোন সময় অসচেতনতাবশতঃ আবার কোন সময় দৈবক্রমেও অন্যায়-অত্যাচার ও অবিচারের মত অপরাধ সংঘটিত হয়ে যায়। অতঃপর নিজের ভুল ও অপরাধ বুঝতে পেরে আত্মসমালোচনার প্রেক্ষাপটে ভ্রম সংশোধনের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহ্র শরণাপন্ন হয়ে তওবা করলে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। মানুষের অপরাধের সীমাবদ্ধতাও তিনি জানেন এবং তাঁর ক্ষমার সীমাবদ্ধতাও একমাত্র তিনিই জানেন। তবে তাঁর বৈচিত্র্যময় আয়াতগুলির বর্ণনায় আমরা বিস্ময়াভূত না হয়ে পারি না।
মহান আল্লাহ বলেন, 'যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে, তাদের হাত কেটে দাও, তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসাবে। এটা আল্লাহ্ পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারী। আল্লাহ পরাক্রান্ত, জ্ঞানময়। অতঃপর যে তওবা করে স্বীয় অত্যাচারের পর এবং সংশোধিত হয়, নিশ্চয়ই আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু। আপনি কি জানেন না যে, আল্লাহ্ নিমিত্তেই নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের রাজত্ব! তিনি যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন, যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান' (মায়েদাহ ৫/৩৮-৪০)।
অন্যত্র আল্লাহ বলেন, 'আমার বান্দাদের একদল বলত, হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি। অতএব আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করুন ও আমাদের প্রতি রহম করুন। আপনি তো দয়ালুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দয়ালু! (মুমিনূন ২৩/১০৯)। মহান আল্লাহ আরও প্রত্যাদেশ করেন যে, 'তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের মনে যা আছে তা ভালই জানেন। যদি তোমরা সৎ হও, তবে তিনি তওবাকারীদের জন্য ক্ষমাশীল' (বণী ইসরাঈল ১৭/২৫)। অন্তর্যামী আল্লাহ তা'আলা মানুষের মনের অবস্থা সম্পর্কে সম্যক অবগত আছেন। কাজেই ইসলামের যে কোন বিধান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আত্মত্যাগ, আত্মশুদ্ধি, আত্মসমর্পণ ইত্যাদির গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলামে মিথ্যা ও কৃত্রিমতার কোন স্থান নেই। উপরের আয়াত কয়টিতে বিশেষ করে শেষোক্ত আয়াতে আল্লাহ তা'আলা তা সুস্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করে দিয়েছেন। অতঃপর ক্ষমাশীল আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রতি ও তাঁর রাসূলের প্রতি ধাবমান (কতিপয়) বান্দাদের প্রতি লক্ষ্য করে প্রত্যাদেশ করেন, 'যারা আমার নিদর্শনে বিশ্বাস করে তারা যখন আপনার কাছে আসে, তখন তাদেরকে আপনি বলুন, 'তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হৌক। তোমাদের প্রতিপালক দয়া করাকে তাঁর কর্তব্য বলে স্থির করেছেন। তোমাদের মধ্যে কেউ অজ্ঞানতাবশতঃ যদি খারাপ কাজ করে তারপর তওবা করে ও নিজেকে সংশোধন করে, তবে তো আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। এভাবে আমি আয়াত বিশদভাবে বর্ণনা করি যাতে অপরাধীদের সামনে পথ প্রকাশিত হয়' (আন'আম ৬/৫৪, ৫৫)।
বিশ্বাসীদের স্বপক্ষে আল্লাহ্র অসীম করুণার বাণী যা অবিশ্বাস্য মনে হয়, তা অব্যর্থ সত্য হিসাবে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, 'যারা আরশ ধারণ করে আছে আর চারপাশ ঘিরে আছে, তারা তাদের প্রতিপালকের পবিত্র মহিমা ঘোষণা করে ও তাঁর উপর বিশ্বাস করে এবং বিশ্বাসীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার দয়া ও জ্ঞান সর্বব্যাপী। অতএব যারা তওবা করে ও আপনার পথ অবলম্বন করে, আপনি তাদেরকে ক্ষমা করুন ও জাহান্নামের শাস্তি থেকে তাদের রক্ষা করুন' (মুমিন ৪০/৭)।
وَهُوَ الَّذِي يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَعْفُو عَنِ السَّيِّئَاتِ وَيَعْلَمُ مَا تَفْعَلُوْنَ 'তিনিই তাঁর বান্দাদের তওবা গ্রহণ করেন ও পাপ মোচন করেন। আর তোমরা যা কর, তিনি তা জানেন' (শূরা ৪২/২৫)। অতঃপর নবী করীম (ছাঃ)-কেও (কোন কোন) বান্দার পক্ষে ক্ষমা প্রার্থনা অনুমতি দিয়ে প্রত্যাদেশ করেন যে, 'হে নবী! বিশ্বাসী নারীরা যখন আপনার কাছে আনুগত্যের শপথ করতে এসে বলে, তারা আল্লাহ্র সাথে কাউকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, নিজেদের সন্তানদের হত্যা করবে না, তাদের দু'হাত ও দু'পায়ের মধ্যে বানানো মিথ্যা অপবাদ নিয়ে আসবে না ও সৎ কাজে আপনাকে অমান্য করবে না, তখন আপনি তাদের আনুগত্য গ্রহণ করুন এবং তাদের জন্য আল্লাহ্ কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু' (মুমতাহিনা ৬০/১২)।
উপরের আয়াত কয়টি দ্বারা আল্লাহ তা'আলা তাঁর কতিপয় ধর্মমুখী অজ্ঞ, অসচেতন, নবী (ছাঃ)-এর প্রতি অনুরাগী ও অনুরূপ মনোভাবাপন্ন কিছু সরল-সহজ বান্দাদের ক্ষমা লাভের উপায় বর্ণনা করেছেন। অজ্ঞতাবশতঃ বা অনিচ্ছাকৃতভাবে কেউ কোন অপরাধ করলে, অতঃপর তা বুঝতে পেরে ক্ষমা প্রার্থনা করলে দয়াশীল আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। এদের জন্য ও অন্যান্য বিশ্বাসী বা আল্লাহ অভিমুখী বান্দাদের জন্য আল্লাহ্ আরশধারী ফেরেশতারাও ক্ষমা প্রার্থনা করেন। ফেরেশতারা জানেন এতে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন এবং তাঁর বান্দারাও এই ক্ষমার আওতাভুক্ত হওয়ার প্রতি আগ্রহী ও মনোযোগী হয়। এতদ্বতীত আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূল (ছাঃ)-কেও তাঁর (রাসূলের) প্রতি আনুগত্য পোষণকারী ও দৃঢ়চিত্তের নর-নারীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার নির্দেশ দেন। এভাবে মহাক্ষমাশীল আল্লাহ তা'আলা তাঁর ক্ষমার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বান্দাকে আশ্বস্ত করেছেন।
আল্লাহ্র দয়া ও ক্ষমার ভাণ্ডার অপরিসীম। আমাদের মহানবী (ছাঃ) এ সম্পর্কে বহু হাদীছ বর্ণনা করে গেছেন। উদাহরণ স্বরূপ নিম্নে দু'টি হাদীছ পেশ করা হ'ল।
(১) ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, একদা এক ব্যক্তি একটি স্ত্রীলোককে চুমু খেয়ে বসল। অতঃপর সে নবী করীম (ছাঃ)-এর কাছে এসে এ গুনাহের কথা ব্যক্ত করল। এ সময়ে আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত নাযিল করেন, 'আর দিনের দুই প্রান্তে ও রাতের কিছু অংশে ছালাত কায়েম কর। নিশ্চয়ই সৎকাজ সমূহ গুনাহের কাজ সমূহকে মুছে ফেলে’ (হৃদ ১১৪)। একথা শুনে লোকটি বলল, আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! এটা কি শুধু আমারই জন্য? তিনি বললেন, আমার সমস্ত উম্মতের জন্যই' (মুত্তাফাকু আলাইহ, মিশকাত হা/৫৬৬, 'ছালাত' অধ্যায়)।
(২) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা জনৈক ব্যক্তি নবী করীম (ছাঃ)-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! আমি তো শাস্তিযোগ্য অপরাধ করে ফেলেছি। সুতরাং আপনি আমার উপর সেই শাস্তি বাস্তবায়ন করুন। অতঃপর ছালাতের সময় উপস্থিত হ'লে সে রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে ছালাত পড়ল। ছালাত শেষ করে সে আবার বলল, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! আমি শাস্তিযোগ্য অপরাধ করে ফেলেছি। সুতরাং আপনি আমাকে কিতাবের বিধান অনুযায়ী শাস্তি দিন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি আমাদের সাথে ছালাতে উপস্থিত হয়েছিলে? সে বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তোমার গোনাহ তো মাফ হয়ে গেছে' (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫৬৭, 'ছালাত' অধ্যায়)।
পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের উপরোক্ত বাণীগুলি দ্বারা বান্দার প্রতি মহীয়ান, গরীয়ান আল্লাহ তা'আলার শ্রেষ্ঠতম অকৃত্রিম ভালবাসার নিদর্শন প্রকাশিত হয়েছে। বস্তুতপক্ষে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে অনেক আয়াত রয়েছে যা সকল ধর্মভীরু, আখেরাতমুখী বান্দার জন্য অনুশীলনযোগ্য। মহানবী (ছাঃ)-এর হাদীছগুলিও (একই বিষয়ে) বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এগুলি জ্ঞানীদের জীবনের সর্বোত্তম চাওয়া ও পাওয়ার উৎস স্থল। মহান আল্লাহ্ আহ্বানে কুরআন মান্যকারীরা নতমস্তকে বিনয়ীভাব পোষণ করে এবং সমস্ত সৃষ্টি জগতের প্রতিপালকের পবিত্রতা ও প্রশংসা সহ ফরয ইবাদতের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত ক্ষমা প্রার্থনা করে। যেহেতু ইসলাম হ'ল প্রেমের ধর্ম এবং মুসলমানরা তাদের ধর্মের প্রতি নিষ্ঠাবান। কাজেই তওবার জন্য ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ্ প্রেমের দ্বারা ক্ষমা ও অনুগ্রহ প্রার্থনা মহান আল্লাহ্ত্রই অন্যতম আদেশ।
টিকাঃ
(আ'রাফ ৭/১৫৩)।
(নাহ'ল ১৬/১১৯)।
(নিসা ৪/১৭)।
(নিসা ৪/১১০)।
(মায়েদাহ ৫/৩৮-৪০)।
(মুমিনূন ২৩/১০৯)।
(বণী ইসরাঈল ১৭/২৫)।
(আন'আম ৬/৫৪, ৫৫)।
(মুমিন ৪০/৭)।
(শূরা ৪২/২৫)।
(মুমতাহিনা ৬০/১২)।
(মুত্তাফাকু আলাইহ, মিশকাত হা/৫৬৬, 'ছালাত' অধ্যায়)।
(মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫৬৭, 'ছালাত' অধ্যায়)।
📄 ক্ষমার (প্রার্থনার) আহ্বান
উপরের হাদীছ দু'টির মর্মার্থেও দেখা যায় কুরআনের আদেশ মান্যকারীরা এবং নিয়মিত ইবাদত পালনকারীরা অনায়াসে আল্লাহ্ ক্ষমার আওতায় পড়ে যাবে। তবে এ বিষয়ে অবশ্যই সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে, ক্ষমা লাভের জন্য আন্তরিকভাবে আল্লাহ্র উপর নির্ভরশীল হ'তে হবে, তাঁর কাছে বার বার বিনীতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন
وَاللَّهِ إِنِّي لَاسْتَغْفِرُ اللَّهُ وَأَتُوْبُ إِلَيْهِ فِي الْيَوْمِ أَكْثَرَ مِنْ سَبْعِينَ مَرَّةً
'আল্লাহ্র কসম! আমি দিনে সত্তরের অধিক বার আল্লাহ্র নিকট গোনাহ হ'তে ক্ষমা চাই, আর তাঁর কাছে তওবা করি' (বুখারী, মিশকাত হা/২৩২৩ ‘তওবা ও ইস্তেগফার' অনুচ্ছেদ)।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আরও এরশাদ করেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ تُوبُوا إِلَى اللَّهِ فَإِنِّي أَتُوْبُ إِلَيْهِ فِي الْيَوْمِ مِائَةَ مَرَّةٍ
'হে মানব মণ্ডলী! তোমরা আল্লাহ্র নিকট তওবা কর। কেননা আমি দিনে ১০০ (একশত) বার তাঁর নিকট তওবা করি' (মুসলিম, মিশকাত হা/২৩২৫ 'তওবা ও ইস্তেগফার' অনুচ্ছেদ)।
আনাস ইবনু মালেক (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেছেন, 'আল্লাহ তাঁর বান্দার তওবায় তোমাদের ঐ ব্যক্তির চেয়েও বেশী আনন্দিত হন, যার উট মরুভূমিতে হারিয়ে যাওয়ার পর সে তা ফিরে পায়' (বুখারী হা/৬৩০৯ 'দো'আ সমূহ' অধ্যায়, 'তওবা' অনুচ্ছেদ)।
বিশ্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, যিনি নবী ও রাসূলগণের শিরোমণি, তিনিও আল্লাহ্ কাছে বার বার বা শত বার তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। এটা সত্য সত্যই এক অচিন্তনীয় বাস্তবতা, যা উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য এক অনন্য অনুকরণীয় উপদেশ। সুতরাং তওবা নিঃসন্দেহে দ্বীন ইসলামের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ইতিপূর্বে 'আল্লাহ ক্ষমাশীল ও তওবা কবুলকারী' বিষয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করেছি। আল্লাহ ক্ষমাশীল একটি ব্যাপক আলোচনা এবং এর অভ্যন্তরস্ত সারমর্ম উম্মতে মুহাম্মাদীর জীবন ব্যবস্থায় শরী'আত অনুমোদিত নানা সুযোগ-সুবিধার মধ্যে অন্যতম। ক্ষমা ও তওবার নীতিমালায় তেমন কোন সীমাবদ্ধতা নেই। এটা ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রাত্যহিক জীবন-যাপনে বা ধর্ম পালনের যে কোন পর্যায়ে ভুল-ত্রুটির জন্য তওবাকে ছায়ার ন্যায় অনুসরণ করা যায়। এই সুবর্ণ সুযোগ হ'তেই এক শ্রেণীর চিরাচরিত সুবিধাভোগী মানুষ পুনঃ পুনঃ তওবার মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে আল্লাহ্র সান্নিধ্য লাভ করতে চায়। কিন্তু আল্লাহ কৃত্রিমতা পসন্দ করেন না, তাই বান্দার প্রকৃত কাজ হবে প্রতিটি বিষয়ে অকৃত্রিমভাবে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি কামনা করা। সুতরাং তওবা ও ক্ষমার মত একটি মহৎ ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ক্ষেত্রেও অবশ্যই আল্লাহ্র সন্তুষ্টি সর্বাগ্রে স্থান পেতে হবে।
উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, ইসলামে তওবার প্রতি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গী পরিগ্রহণের প্রয়াস রয়েছে। এখানে ব্যক্তিগত মান-মর্যাদা, যোগ্যতা-অভিজ্ঞতা, অহংকার প্রভৃতি স্বেচ্ছাচারিতার কোন অবকাশ নেই। আত্মসমর্পণ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মশুদ্ধি ও আত্মানুশাসন মূলক প্রক্রিয়ায়কৃত তওবাই কেবল আল্লাহ্র দরবারে গৃহীত হয়। সুতরাং প্রত্যেককে নিজের কৃত অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার পর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য আল্লাহ্ কাছে পুনঃ পুনঃ আবেদন করতে হবে। তওবা ও ক্ষমার উপযোগী আবেদনমূলক আয়াতগুলির মাধ্যমে এ আবেদন করা যেতে পারে। যেমন আল্লাহ বলেন, 'হে আমাদের পালনকর্তা! সরল পথ প্রদর্শনের পর আপনি আমাদের অন্তরকে সত্য লংঘনে প্রবৃত্ত করবেন না এবং আপনার নিকট থেকে আমাদেরকে অনুগ্রহ দান করুন। আপনিই সব কিছুর দাতা। হে আমাদের পালনকর্তা! আপনি মানুষকে একদিন অবশ্যই সমবেত করবেন, এতে কোন সন্দেহ নেই। নিশ্চয়ই আল্লাহ ভঙ্গ করেন না অঙ্গীকার' (আলে ইমরান ৩/৮-৯)। বিনীত আবেদনপূর্ণ অন্য আয়াতে এসেছে, 'হে পালনকর্তা! আমরা আমাদের নফসের উপর যুলুম করেছি। যদি আপনি ক্ষমা না করেন এবং রহম না করেন, তবে আমরা অবশ্যই ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হব' (আ'রাফ ৭/২৩)।
এসব আয়াতের মাধ্যমে অন্তর্যামী আল্লাহ্র নিকট একনিষ্ঠ চিত্তে ক্ষমা প্রার্থনা করলে তিনি অনায়াসেই ক্ষমা করে দিবেন। কেননা আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনের প্রায় শতাধিক আয়াতে নিজেকে ক্ষমাশীল বলে ঘোষণা করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, نَبِّئُ عِبَادِي أَنِّي أَنَا الْغَفُورُ الرَّحِيمُ 'নবী! আপনি আমার বান্দাদেরকে জানিয়ে দিন যে, আমি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, দয়ালু' (হিজর ১৫/৪৯)।
أَفَلَا يَتُوبُوْنَ إِلَى اللَّهِ وَيَسْتَغْفِرُونَهُ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ 'তারা আল্লাহ্র কাছে তওবা করে না কেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে না কেন? আল্লাহ যে ক্ষমাশীল, দয়ালু' (মায়েদাহ ৫/৭৪)। তিনি আরো বলেন, إِنَّهُ كَانَ حَلِيمًا غَفُورًا 'নিশ্চয়ই তিনি অতি সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ' (বণী ইসরাঈল ১৭/৪৪)। এ বিষয়ে তিনি আরো বলেন, إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ 'নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, মেহেরবান' (নূর ২৪/৬২)।
আল্লাহ্ অসীম জ্ঞান সমুদ্রের সামনে মানুষের জ্ঞান যৎকিঞ্চিৎ। তাই আল্লাহ তা'আলা তাঁর বহুমুখী জ্ঞানভাণ্ডার দ্বারা কুরআনের মাধ্যমে মানুষকে বোঝাতে চেয়েছেন। অতঃপর তওবা ও ক্ষমার মাধ্যমে সৎপথ অবলম্বনের অকৃত্রিম আহ্বান জানিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন, 'হা-মীম, কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে আল্লাহ্র পক্ষ থেকে, যিনি পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ, পাপ ক্ষমাকারী, তওবা কবুলকারী, কঠোর শাস্তিদাতা ও সামর্থ্যবান' (গাফির ৪০/১-৩)।
অতঃপর প্রত্যাদেশ করেন, 'হে ঈমানদারগণ! খেয়ানত কর না আল্লাহ্ সাথে ও রাসূলের সাথে এবং খেয়ানত কর না নিজেদের পারস্পরিক আমানতে জেনে শুনে। আর জেনে রাখ, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান- সন্ততি অকল্যাণের সম্মুখীনকারী। বস্তুতঃ আল্লাহ্র নিকট রয়েছে মহা ছওয়াব। হে ঈমানদারগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় করতে থাক, তবে তিনি তোমাদের মধ্যে ফায়ছালা করে দেবেন এবং তোমাদের থেকে তোমাদের পাপকে সরিয়ে দেবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন। বস্তুতঃ আল্লাহ্র অনুগ্রহ অত্যন্ত মহান' (আনফাল ২৭/২৯)। অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'তারা কি একথা জানতে পারেনি যে, আল্লাহ নিজেই স্বীয় বান্দাদের তওবা কবুল করেন এবং যাকাত গ্রহণ করেন? বস্তুতঃ আল্লাহই তওবা কবুলকারী, করুণাময়' (তওবা ৯/১০৪)।
আল্লাহ আরো প্রত্যাদেশ করেন, 'হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ তা'আলার কাছে তওবা কর, আন্তরিক তওবা । আশা করা যায়, তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের মন্দ কর্মসমূহ মোচন করে দেবেন এবং তোমাদেরকে দাখিল করবেন জান্নাতে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। সেদিন আল্লাহ্ নবী এবং তাঁর বিশ্বাসী সহচরদের অপদস্ত করবেন না। তাদের নূর তাদের সামনে ও ডানদিকে ছুটোছুটি করবে। তারা বলবে, হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের নূরকে পূর্ণ করে দিন এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন, নিশ্চয়ই আপনি সবকিছুর উপর সর্বশক্তিমান' (আত-তাহরীম ৬৬/৮)।
এ বিষয়ে আরও অবগতির প্রয়াসে দয়াময় আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবীব (ছাঃ)- কে বলেন, 'আপনার পালনকর্তা জানেন, আপনি ইবাদতের জন্য দণ্ডায়মান হন রাত্রির প্রায় দু'তৃতীয়াংশ, অর্ধাংশ ও তৃতীয়াংশ এবং আপনার সঙ্গীদের একটি দলও দণ্ডায়মান হয়। আল্লাহ দিবা ও রাত্রি পরিমাপ করেন। তিনি জানেন, তোমরা এর পূর্ণ হিসাব রাখতে পার না। অতএব তিনি তোমাদের প্রতি ক্ষমাপরায়ণ হয়েছেন। কাজেই কুরআনে যতটুকু তোমাদের জন্য সহজ, ততটুকু আবৃত্তি কর। তিনি জানেন তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ অসুস্থ হবে, কেউ কেউ আল্লাহ্র অনুগ্রহ সন্ধানে দেশে-বিদেশে যাবে এবং কেউ কেউ আল্লাহ্ পথে জিহাদে লিপ্ত হবে। কাজেই কুরআনের যতটুকু তোমাদের জন্য সহজ, ততটুকু আবৃত্তি কর। তোমরা ছালাত কয়েম কর, যাকাত দাও এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও। তোমরা নিজেদের জন্য যা কিছু অগ্রে পাঠাবে, তা আল্লাহ্র কাছে উত্তম আকারে এবং পুরস্কার হিসাবে বর্ধিতরূপে পাবে। তোমরা আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু' (মুযযাম্মিল ৭৩/২০)।
দয়াময় ও ক্ষমাশীল আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের ক্ষমা করার বিষয়ে বহু আয়াতের অবতারণা করেছেন। এ বিষয়ে মহানবী (ছাঃ) অনেক বাণী রেখে গেছেন। উদাহরণ স্বরূপ নিম্নে কয়েকটির উদ্ধৃতি দেওয়া হ'ল।
(১) আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, 'আল্লাহ যখন সমস্ত মাখলুকাত সৃষ্টি করেন, তখন তাঁর কাছে আরশের উপর বিদ্যমান একটি কিতাবে এ কথাগুলো লিখে রাখেন, আমার রহমত আমার ক্রোধের উপর বিজয়ী হবে। অপর এক বর্ণনায় আছে, (আমার দয়া-অনুগ্রহ) আমার ক্রোধের উপর বিজয়ী হয়েছে। আরেক বর্ণনায় আছে (আমার অনুকম্পা) আমার ক্রোধের অগ্রগামী হয়েছে' (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২৩৬৪, ‘আল্লাহ্র রহমতের ব্যাপকতা' অনুচ্ছেদ, ‘দো‘আ’ অধ্যায়)।
(২) ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে কিছু সংখ্যক বন্দী হাযির করা হ'ল, তাদের মধ্যে জনৈকা বন্দিনী অস্থির হয়ে দৌড়াচ্ছিল আর বন্দীদের মধ্যে কোন একটি শিশু পেলেই সে তাকে কোলে নিয়ে পেটের সাথে মিশিয়ে দুধ পান করাচ্ছিল। এ অবস্থা দেখে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, তোমরা কি মনে করো এ মেয়েটি তার সন্তানকে আগুনে ফেলতে পারে? আমরা বললাম, আল্লাহ্র শপথ! কখনই নয়। তিনি বললেন, এ মেয়েটি তার সন্তানের প্রতি যেরূপ সদয় আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি এর চাইতেও অনেক বেশী সদয় ও অনুগ্রহশীল' (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২৩৭০, 'আল্লাহ্র রহমতের ব্যাপকতা' অনুচ্ছেদ, 'দো'আ' অধ্যায়)।
(৩) আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, যাঁর হাতে আমার জীবন, সে মহান সত্তার শপথ করে বলছি, তোমরা যদি গোনাহ না করতে, তাহ'লে আল্লাহ তোমাদেরকে নিয়ে যেতেন এবং তোমাদের জায়গায় এমন এক জাতিকে আনতেন, যারা গোনাহ করে আল্লাহ্র কাছে মাফ চাইতো। অতঃপর আল্লাহ তাদের মাফ করে দিতেন' (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২৩২৮, ‘তাওবা ও ইস্তিগফার” ‘দো‘আ' অধ্যায়)।
টিকাঃ
মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২৩২৩ ‘তওবা ও ইস্তেগফার' অনুচ্ছেদ।
মুসলিম, মিশকাত হা/২৩২৫ 'তওবা ও ইস্তেগফার' অনুচ্ছেদ।
বুখারী হা/৬৩০৯ 'দো'আ সমূহ' অধ্যায়, 'তওবা' অনুচ্ছেদ।
উপরের হাদীছ দু'টির মর্মার্থেও দেখা যায় কুরআনের আদেশ মান্যকারীরা এবং নিয়মিত ইবাদত পালনকারীরা অনায়াসে আল্লাহ্ ক্ষমার আওতায় পড়ে যাবে। তবে এ বিষয়ে অবশ্যই সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে, ক্ষমা লাভের জন্য আন্তরিকভাবে আল্লাহ্র উপর নির্ভরশীল হ'তে হবে, তাঁর কাছে বার বার বিনীতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন
وَاللَّهِ إِنِّي لَاسْتَغْفِرُ اللَّهُ وَأَتُوْبُ إِلَيْهِ فِي الْيَوْمِ أَكْثَرَ مِنْ سَبْعِينَ مَرَّةً
'আল্লাহ্র কসম! আমি দিনে সত্তরের অধিক বার আল্লাহ্র নিকট গোনাহ হ'তে ক্ষমা চাই, আর তাঁর কাছে তওবা করি' (বুখারী, মিশকাত হা/২৩২৩ ‘তওবা ও ইস্তেগফার' অনুচ্ছেদ)।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আরও এরশাদ করেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ تُوبُوا إِلَى اللَّهِ فَإِنِّي أَتُوْبُ إِلَيْهِ فِي الْيَوْمِ مِائَةَ مَرَّةٍ
'হে মানব মণ্ডলী! তোমরা আল্লাহ্র নিকট তওবা কর। কেননা আমি দিনে ১০০ (একশত) বার তাঁর নিকট তওবা করি' (মুসলিম, মিশকাত হা/২৩২৫ 'তওবা ও ইস্তেগফার' অনুচ্ছেদ)।
আনাস ইবনু মালেক (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেছেন, 'আল্লাহ তাঁর বান্দার তওবায় তোমাদের ঐ ব্যক্তির চেয়েও বেশী আনন্দিত হন, যার উট মরুভূমিতে হারিয়ে যাওয়ার পর সে তা ফিরে পায়' (বুখারী হা/৬৩০৯ 'দো'আ সমূহ' অধ্যায়, 'তওবা' অনুচ্ছেদ)।
বিশ্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, যিনি নবী ও রাসূলগণের শিরোমণি, তিনিও আল্লাহ্ কাছে বার বার বা শত বার তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। এটা সত্য সত্যই এক অচিন্তনীয় বাস্তবতা, যা উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য এক অনন্য অনুকরণীয় উপদেশ। সুতরাং তওবা নিঃসন্দেহে দ্বীন ইসলামের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
৪. ক্ষমা প্রার্থনার আহ্বান
ইতিপূর্বে 'আল্লাহ ক্ষমাশীল ও তওবা কবুলকারী' বিষয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করেছি। আল্লাহ ক্ষমাশীল একটি ব্যাপক আলোচনা এবং এর অভ্যন্তরস্ত সারমর্ম উম্মতে মুহাম্মাদীর জীবন ব্যবস্থায় শরী'আত অনুমোদিত নানা সুযোগ-সুবিধার মধ্যে অন্যতম। ক্ষমা ও তওবার নীতিমালায় তেমন কোন সীমাবদ্ধতা নেই। এটা ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রাত্যহিক জীবন-যাপনে বা ধর্ম পালনের যে কোন পর্যায়ে ভুল-ত্রুটির জন্য তওবাকে ছায়ার ন্যায় অনুসরণ করা যায়। এই সুবর্ণ সুযোগ হ'তেই এক শ্রেণীর চিরাচরিত সুবিধাভোগী মানুষ পুনঃ পুনঃ তওবার মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে আল্লাহ্র সান্নিধ্য লাভ করতে চায়। কিন্তু আল্লাহ কৃত্রিমতা পসন্দ করেন না, তাই বান্দার প্রকৃত কাজ হবে প্রতিটি বিষয়ে অকৃত্রিমভাবে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি কামনা করা। সুতরাং তওবা ও ক্ষমার মত একটি মহৎ ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ক্ষেত্রেও অবশ্যই আল্লাহ্র সন্তুষ্টি সর্বাগ্রে স্থান পেতে হবে।
উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, ইসলামে তওবার প্রতি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গী পরিগ্রহণের প্রয়াস রয়েছে। এখানে ব্যক্তিগত মান-মর্যাদা, যোগ্যতা-অভিজ্ঞতা, অহংকার প্রভৃতি স্বেচ্ছাচারিতার কোন অবকাশ নেই। আত্মসমর্পণ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মশুদ্ধি ও আত্মানুশাসন মূলক প্রক্রিয়ায়কৃত তওবাই কেবল আল্লাহ্র দরবারে গৃহীত হয়। সুতরাং প্রত্যেককে নিজের কৃত অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার পর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য আল্লাহ্ কাছে পুনঃ পুনঃ আবেদন করতে হবে। তওবা ও ক্ষমার উপযোগী আবেদনমূলক আয়াতগুলির মাধ্যমে এ আবেদন করা যেতে পারে। যেমন আল্লাহ বলেন, 'হে আমাদের পালনকর্তা! সরল পথ প্রদর্শনের পর আপনি আমাদের অন্তরকে সত্য লংঘনে প্রবৃত্ত করবেন না এবং আপনার নিকট থেকে আমাদেরকে অনুগ্রহ দান করুন। আপনিই সব কিছুর দাতা। হে আমাদের পালনকর্তা! আপনি মানুষকে একদিন অবশ্যই সমবেত করবেন, এতে কোন সন্দেহ নেই। নিশ্চয়ই আল্লাহ ভঙ্গ করেন না অঙ্গীকার' (আলে ইমরান ৩/৮-৯)। বিনীত আবেদনপূর্ণ অন্য আয়াতে এসেছে, 'হে পালনকর্তা! আমরা আমাদের নফসের উপর যুলুম করেছি। যদি আপনি ক্ষমা না করেন এবং রহম না করেন, তবে আমরা অবশ্যই ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হব' (আ'রাফ ৭/২৩)।
এসব আয়াতের মাধ্যমে অন্তর্যামী আল্লাহ্র নিকট একনিষ্ঠ চিত্তে ক্ষমা প্রার্থনা করলে তিনি অনায়াসেই ক্ষমা করে দিবেন। কেননা আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনের প্রায় শতাধিক আয়াতে নিজেকে ক্ষমাশীল বলে ঘোষণা করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, نَبِّئُ عِبَادِي أَنِّي أَنَا الْغَفُورُ الرَّحِيمُ 'নবী! আপনি আমার বান্দাদেরকে জানিয়ে দিন যে, আমি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, দয়ালু' (হিজর ১৫/৪৯)।
أَفَلَا يَتُوبُوْنَ إِلَى اللَّهِ وَيَسْتَغْفِرُونَهُ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ 'তারা আল্লাহ্র কাছে তওবা করে না কেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে না কেন? আল্লাহ যে ক্ষমাশীল, দয়ালু' (মায়েদাহ ৫/৭৪)। তিনি আরো বলেন, إِنَّهُ كَانَ حَلِيمًا غَفُورًا 'নিশ্চয়ই তিনি অতি সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ' (বণী ইসরাঈল ১৭/৪৪)। এ বিষয়ে তিনি আরো বলেন, إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ 'নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, মেহেরবান' (নূর ২৪/৬২)।
আল্লাহ্ অসীম জ্ঞান সমুদ্রের সামনে মানুষের জ্ঞান যৎকিঞ্চিৎ। তাই আল্লাহ তা'আলা তাঁর বহুমুখী জ্ঞানভাণ্ডার দ্বারা কুরআনের মাধ্যমে মানুষকে বোঝাতে চেয়েছেন। অতঃপর তওবা ও ক্ষমার মাধ্যমে সৎপথ অবলম্বনের অকৃত্রিম আহ্বান জানিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন, 'হা-মীম, কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে আল্লাহ্র পক্ষ থেকে, যিনি পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ, পাপ ক্ষমাকারী, তওবা কবুলকারী, কঠোর শাস্তিদাতা ও সামর্থ্যবান' (গাফির ৪০/১-৩)।
অতঃপর প্রত্যাদেশ করেন, 'হে ঈমানদারগণ! খেয়ানত কর না আল্লাহ্ সাথে ও রাসূলের সাথে এবং খেয়ানত কর না নিজেদের পারস্পরিক আমানতে জেনে শুনে। আর জেনে রাখ, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান- সন্ততি অকল্যাণের সম্মুখীনকারী। বস্তুতঃ আল্লাহ্র নিকট রয়েছে মহা ছওয়াব। হে ঈমানদারগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় করতে থাক, তবে তিনি তোমাদের মধ্যে ফায়ছালা করে দেবেন এবং তোমাদের থেকে তোমাদের পাপকে সরিয়ে দেবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন। বস্তুতঃ আল্লাহ্র অনুগ্রহ অত্যন্ত মহান' (আনফাল ২৭/২৯)। অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'তারা কি একথা জানতে পারেনি যে, আল্লাহ নিজেই স্বীয় বান্দাদের তওবা কবুল করেন এবং যাকাত গ্রহণ করেন? বস্তুতঃ আল্লাহই তওবা কবুলকারী, করুণাময়' (তওবা ৯/১০৪)।
আল্লাহ আরো প্রত্যাদেশ করেন, 'হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ তা'আলার কাছে তওবা কর, আন্তরিক তওবা । আশা করা যায়, তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের মন্দ কর্মসমূহ মোচন করে দেবেন এবং তোমাদেরকে দাখিল করবেন জান্নাতে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। সেদিন আল্লাহ্ নবী এবং তাঁর বিশ্বাসী সহচরদের অপদস্ত করবেন না। তাদের নূর তাদের সামনে ও ডানদিকে ছুটোছুটি করবে। তারা বলবে, হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের নূরকে পূর্ণ করে দিন এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন, নিশ্চয়ই আপনি সবকিছুর উপর সর্বশক্তিমান' (আত-তাহরীম ৬৬/৮)।
এ বিষয়ে আরও অবগতির প্রয়াসে দয়াময় আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবীব (ছাঃ)- কে বলেন, 'আপনার পালনকর্তা জানেন, আপনি ইবাদতের জন্য দণ্ডায়মান হন রাত্রির প্রায় দু'তৃতীয়াংশ, অর্ধাংশ ও তৃতীয়াংশ এবং আপনার সঙ্গীদের একটি দলও দণ্ডায়মান হয়। আল্লাহ দিবা ও রাত্রি পরিমাপ করেন। তিনি জানেন, তোমরা এর পূর্ণ হিসাব রাখতে পার না। অতএব তিনি তোমাদের প্রতি ক্ষমাপরায়ণ হয়েছেন। কাজেই কুরআনে যতটুকু তোমাদের জন্য সহজ, ততটুকু আবৃত্তি কর। তিনি জানেন তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ অসুস্থ হবে, কেউ কেউ আল্লাহ্র অনুগ্রহ সন্ধানে দেশে-বিদেশে যাবে এবং কেউ কেউ আল্লাহ্ পথে জিহাদে লিপ্ত হবে। কাজেই কুরআনের যতটুকু তোমাদের জন্য সহজ, ততটুকু আবৃত্তি কর। তোমরা ছালাত কয়েম কর, যাকাত দাও এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও। তোমরা নিজেদের জন্য যা কিছু অগ্রে পাঠাবে, তা আল্লাহ্র কাছে উত্তম আকারে এবং পুরস্কার হিসাবে বর্ধিতরূপে পাবে। তোমরা আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু' (মুযযাম্মিল ৭৩/২০)। দয়াময় ও ক্ষমাশীল আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের ক্ষমা করার বিষয়ে বহু আয়াতের অবতারণা করেছেন। এ বিষয়ে মহানবী (ছাঃ) অনেক বাণী রেখে গেছেন। উদাহরণ স্বরূপ নিম্নে কয়েকটির উদ্ধৃতি দেওয়া হ'ল।
(১) আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, 'আল্লাহ যখন সমস্ত মাখলুকাত সৃষ্টি করেন, তখন তাঁর কাছে আরশের উপর বিদ্যমান একটি কিতাবে এ কথাগুলো লিখে রাখেন, আমার রহমত আমার ক্রোধের উপর বিজয়ী হবে। অপর এক বর্ণনায় আছে, (আমার দয়া-অনুগ্রহ) আমার ক্রোধের উপর বিজয়ী হয়েছে। আরেক বর্ণনায় আছে (আমার অনুকম্পা) আমার ক্রোধের অগ্রগামী হয়েছে' (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২৩৬৪, ‘আল্লাহ্র রহমতের ব্যাপকতা' অনুচ্ছেদ, ‘দো‘আ’ অধ্যায়)।
(২) ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে কিছু সংখ্যক বন্দী হাযির করা হ'ল, তাদের মধ্যে জনৈকা বন্দিনী অস্থির হয়ে দৌড়াচ্ছিল আর বন্দীদের মধ্যে কোন একটি শিশু পেলেই সে তাকে কোলে নিয়ে পেটের সাথে মিশিয়ে দুধ পান করাচ্ছিল। এ অবস্থা দেখে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, তোমরা কি মনে করো এ মেয়েটি তার সন্তানকে আগুনে ফেলতে পারে? আমরা বললাম, আল্লাহ্র শপথ! কখনই নয়। তিনি বললেন, এ মেয়েটি তার সন্তানের প্রতি যেরূপ সদয় আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি এর চাইতেও অনেক বেশী সদয় ও অনুগ্রহশীল' (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২৩৭০, 'আল্লাহ্র রহমতের ব্যাপকতা' অনুচ্ছেদ, 'দো'আ' অধ্যায়)।
(৩) আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, যাঁর হাতে আমার জীবন, সে মহান সত্তার শপথ করে বলছি, তোমরা যদি গোনাহ না করতে, তাহ'লে আল্লাহ তোমাদেরকে নিয়ে যেতেন এবং তোমাদের জায়গায় এমন এক জাতিকে আনতেন, যারা গোনাহ করে আল্লাহ্র কাছে মাফ চাইতো। অতঃপর আল্লাহ তাদের মাফ করে দিতেন' (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২৩২৮, ‘তাওবা ও ইস্তিগফার” ‘দো‘আ' অধ্যায়)। পবিত্র কুরআনে অবতীর্ণ অহি-র ব্যাখ্যাই হাদীছ। মহানবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) হ'লেন হাদীছের একমাত্র প্রবক্তা। সুতরাং উপরে বর্ণিত হাদীছের ব্যাখ্যাগুলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পবিত্র কুরআনের ব্যাখ্যা। আসলে বান্দাহ তার বিবেক বর্হিভূত কোন কাজে অন্ধ হয়ে অংশ গ্রহণ না করলেই তা ক্ষমার যোগ্য হয়ে যাবে বলে আশা করা যায়। আর যারা আল্লাহ্ ক্ষমার আশাবাদী তারা কখনই বিবেকহীন হয়ে কাজ করবে না। তবে মানুষ মাত্রেরই ভুল হয় বা পাপ করে। তাছাড়া এ পাপ কাজের জন্য শয়তানের কুমন্ত্রণা ও তৎপরতার কোন কমতি নেই। অতঃপর আল্লাহ্র নিকট ক্ষমাপ্রার্থী হ'লে তিনি দয়াপরবশ হয়ে ক্ষমা করে দেন।
রাসূল (ছাঃ)ও নিজেকে সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত মনে করতেন না, বরং আল্লাহ্ ভয়ে সর্বদাই ভীত থাকতেন। তাই তিনি স্বীয় দোষ বা অপরাধ হ'তে মুক্ত হওয়ার জন্য করুণাময় আল্লাহ্র সমীপে বার বার (সত্তর বার বা একশত বার) তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। এগুলি লক্ষ্য করলে বা গভীরভাবে চিন্তা করলে সাধারণ মানুষের কি করা উচিত তা বোধগম্যে আনা সম্ভব। তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুসারী কোন ঈমানদার বান্দাই তাঁর অনুসরণ হ'তে বিন্দুমাত্রও বিচ্ছিন্ন হবে না। তারা তাদের প্রিয় রাসূলের আদর্শের অনুসরণ ও আল্লাহ্র প্রেমময় আহ্বানগুলো বার বার অনুসন্ধান করবে এবং তাঁর ক্ষমার দিকে এগিয়ে যাবে। মহান আল্লাহ বলেন, الَّذِيْنَ يَجْتَنِبُوْنَ كَبَائِرَ الْإِثْمِ وَالْفَوَاحِشَ إِلَّا اللَّمَمَ إِنَّ رَبَّكَ وَاسِعُ الْمَغْفِرَةِ 'বড় বড় গোনাহ ও অশ্লীল কাজ থেকে বেঁচে থাকে, ছোট-খাট অপরাধ করলেও নিশ্চয়ই আপনার পালনকর্তার ক্ষমা সুদূর বিস্তৃত' (নাজম ৫৩/৩২)।
অন্যত্র আল্লাহ বলেন,
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِيْنَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي
سَيَدْخُلُوْنَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ 'তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি সাড়া দেব। যারা আমার ইবাদতে অহংকার করে তারা সত্বরই জাহান্নামে দাখিল হবে লাঞ্ছিত হয়ে' (মুমিন ৪০/৬০)।
অন্যত্র আল্লাহ আরো বলেন,
وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُوْ عَن كَثِيرٍ -
'তোমাদের উপর যেসব বিপদ-আপদ পতিত হয়, তা তোমাদের কর্মেরই ফল এবং তিনি তোমাদের অনেক গোনাহ ক্ষমা করে দেন' (শূরা ৪২/৩০)।
তিনি আরো বলেন, إِنَّ رَبَّكَ لَذُو مَغْفِرَةٍ وَذُو عِقَابِ أَلِيْمٍ “নিশ্চয়ই আপনার পালনকর্তার কাছে রয়েছে ক্ষমা এবং রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি' (হা-মীম-সিজদাহ ৪১/৪৩)।
মহান আল্লাহ আরও বলেন, وَهُوَ الْغَفُوْرُ الْوَدُوْدُ، ذُو الْعَرْشِ الْمَجِيْدُ، فَعَّالٌ لِّمَا يُرِيدُ 'তিনি ক্ষমাশীল, প্রেমময়, মহান আরশের অধিকারী। তিনি যা চান, তাই করেন' (বুরূজ ৮৫/১৪-১৬)।
আল্লাহ প্রতিটি মানুষের পাপ-পুণ্য ও ভাল-মন্দের খবর রাখেন। যারা বড় বড় পাপ, অশ্লীল, অসামাজিক ও লজ্জাহীন কাজ থেকে বিরত থাকে তাদের ছোট-খাট অন্যায়-অপরাধ বা পাপ তিনি ক্ষমা করে দেন। আর যারা বিনীত অন্তরে আল্লাহ্ ইবাদত করে এবং ভীতির মাধ্যমে ক্ষমার আশা পোষণ করে তাদের অনেক পাপও তিনি ক্ষমা করে দেন। পক্ষান্তরে যারা তাদের ইবাদতে অহংকার করে অর্থাৎ নিজকে বড় ইবাদতকারী মনে করে অথচ ইবাদতের মাঝে বিনয় ও নম্রতা পোষণ করে না, তারা আল্লাহ্র দয়া ও রহমতের সম্মুখে ক্ষমার অনুপযুক্ত হয়ে যায়।
আল্লাহকে একমাত্র উপাস্য হিসাবে ভীতি সহকারে মান্যকারীদের জন্য তিনি সীমাহীন ও শর্তহীন ক্ষমাশীল। তবে তাঁকে অস্বীকারকারী, তাঁর শরীক স্থাপনকারী ও সীমালংঘনকারীদের জন্য নয়।
টিকাঃ
(বুখারী, মিশকাত হা/২৩২৩ ‘তওবা ও ইস্তেগফার' অনুচ্ছেদ)।
(মুসলিম, মিশকাত হা/২৩২৫ 'তওবা ও ইস্তেগফার' অনুচ্ছেদ)।
(বুখারী হা/৬৩০৯ 'দো'আ সমূহ' অধ্যায়, 'তওবা' অনুচ্ছেদ)।
(আলে ইমরান ৩/৮-৯)।
(আ'রাফ ৭/২৩)।
(হিজর ১৫/৪৯)।
(মায়েদাহ ৫/৭৪)।
(বণী ইসরাঈল ১৭/৪৪)।
(নূর ২৪/৬২)।
(গাফির ৪০/১-৩)।
(আনফাল ২৭/২৯)।
(তওবা ৯/১০৪)।
(আত-তাহরীম ৬৬/৮)।
(মুযযাম্মিল ৭৩/২০)।
(মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২৩৬৪, ‘আল্লাহ্র রহমতের ব্যাপকতা' অনুচ্ছেদ, ‘দো‘আ’ অধ্যায়)।
(মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২৩৭০, 'আল্লাহ্র রহমতের ব্যাপকতা' অনুচ্ছেদ, 'দো'আ' অধ্যায়)।
(মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২৩২৮, ‘তাওবা ও ইস্তিগফার” ‘দো‘আ' অধ্যায়)।
(নাজম ৫৩/৩২)।
(মুমিন ৪০/৬০)।
(শূরা ৪২/৩০)।
(হা-মীম-সিজদাহ ৪১/৪৩)।
(বুরূজ ৮৫/১৪-১৬)।
📄 আল্লাহ নেককার ও দুর্বল পাপীকে ক্ষমা করেন
পবিত্র কুরআনে অবতীর্ণ অহি-র ব্যাখ্যাই হাদীছ। মহানবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) হ'লেন হাদীছের একমাত্র প্রবক্তা। সুতরাং উপরে বর্ণিত হাদীছের ব্যাখ্যাগুলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পবিত্র কুরআনের ব্যাখ্যা। আসলে বান্দাহ তার বিবেক বর্হিভূত কোন কাজে অন্ধ হয়ে অংশ গ্রহণ না করলেই তা ক্ষমার যোগ্য হয়ে যাবে বলে আশা করা যায়। আর যারা আল্লাহ্ ক্ষমার আশাবাদী তারা কখনই বিবেকহীন হয়ে কাজ করবে না। তবে মানুষ মাত্রেরই ভুল হয় বা পাপ করে। তাছাড়া এ পাপ কাজের জন্য শয়তানের কুমন্ত্রণা ও তৎপরতার কোন কমতি নেই। অতঃপর আল্লাহ্র নিকট ক্ষমাপ্রার্থী হ'লে তিনি দয়াপরবশ হয়ে ক্ষমা করে দেন।
রাসূল (ছাঃ)ও নিজেকে সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত মনে করতেন না, বরং আল্লাহ্ ভয়ে সর্বদাই ভীত থাকতেন। তাই তিনি স্বীয় দোষ বা অপরাধ হ'তে মুক্ত হওয়ার জন্য করুণাময় আল্লাহ্র সমীপে বার বার (সত্তর বার বা একশত বার) তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। এগুলি লক্ষ্য করলে বা গভীরভাবে চিন্তা করলে সাধারণ মানুষের কি করা উচিত তা বোধগম্যে আনা সম্ভব। তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুসারী কোন ঈমানদার বান্দাই তাঁর অনুসরণ হ'তে বিন্দুমাত্রও বিচ্ছিন্ন হবে না। তারা তাদের প্রিয় রাসূলের আদর্শের অনুসরণ ও আল্লাহ্র প্রেমময় আহ্বানগুলো বার বার অনুসন্ধান করবে এবং তাঁর ক্ষমার দিকে এগিয়ে যাবে। মহান আল্লাহ বলেন, الَّذِيْنَ يَجْتَنِبُوْنَ كَبَائِرَ الْإِثْمِ وَالْفَوَاحِشَ إِلَّا اللَّمَمَ إِنَّ رَبَّكَ وَاسِعُ الْمَغْفِرَةِ 'বড় বড় গোনাহ ও অশ্লীল কাজ থেকে বেঁচে থাকে, ছোট-খাট অপরাধ করলেও নিশ্চয়ই আপনার পালনকর্তার ক্ষমা সুদূর বিস্তৃত' (নাজম ৫৩/৩২)।
অন্যত্র আল্লাহ বলেন,
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِيْنَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي
سَيَدْخُلُوْنَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ
'তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি সাড়া দেব। যারা আমার ইবাদতে অহংকার করে তারা সত্বরই জাহান্নামে দাখিল হবে লাঞ্ছিত হয়ে' (মুমিন ৪০/৬০)।
অন্যত্র আল্লাহ আরো বলেন,
وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُوْ عَن كَثِيرٍ -
'তোমাদের উপর যেসব বিপদ-আপদ পতিত হয়, তা তোমাদের কর্মেরই ফল এবং তিনি তোমাদের অনেক গোনাহ ক্ষমা করে দেন' (শূরা ৪২/৩০)।
তিনি আরো বলেন, إِنَّ رَبَّكَ لَذُو مَغْفِرَةٍ وَذُو عِقَابِ أَلِيْمٍ “নিশ্চয়ই আপনার পালনকর্তার কাছে রয়েছে ক্ষমা এবং রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি' (হা-মীম-সিজদাহ ৪১/৪৩)।
মহান আল্লাহ আরও বলেন, وَهُوَ الْغَفُوْرُ الْوَدُوْدُ، ذُو الْعَرْشِ الْمَجِيْدُ، فَعَّالٌ لِّمَا يُرِيدُ 'তিনি ক্ষমাশীল, প্রেমময়, মহান আরশের অধিকারী। তিনি যা চান, তাই করেন' (বুরূজ ৮৫/১৪-১৬)।
আল্লাহ প্রতিটি মানুষের পাপ-পুণ্য ও ভাল-মন্দের খবর রাখেন। যারা বড় বড় পাপ, অশ্লীল, অসামাজিক ও লজ্জাহীন কাজ থেকে বিরত থাকে তাদের ছোট-খাট অন্যায়-অপরাধ বা পাপ তিনি ক্ষমা করে দেন। আর যারা বিনীত অন্তরে আল্লাহ্ ইবাদত করে এবং ভীতির মাধ্যমে ক্ষমার আশা পোষণ করে তাদের অনেক পাপও তিনি ক্ষমা করে দেন। পক্ষান্তরে যারা তাদের ইবাদতে অহংকার করে অর্থাৎ নিজকে বড় ইবাদতকারী মনে করে অথচ ইবাদতের মাঝে বিনয় ও নম্রতা পোষণ করে না, তারা আল্লাহ্র দয়া ও রহমতের সম্মুখে ক্ষমার অনুপযুক্ত হয়ে যায়।
আল্লাহকে একমাত্র উপাস্য হিসাবে ভীতি সহকারে মান্যকারীদের জন্য তিনি সীমাহীন ও শর্তহীন ক্ষমাশীল। তবে তাঁকে অস্বীকারকারী, তাঁর শরীক স্থাপনকারী ও সীমালংঘনকারীদের জন্য নয়।
আল্লাহ্ নিরানব্বইটি নামের মধ্যে 'ক্ষমাশীল' একটি বিশেষ গুণসম্পন্ন নাম এবং এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের ব্যাপকতা বর্ণনা করা সম্ভব নয়। কারণ আল্লাহ তাঁর মহাজ্ঞানের দ্বারা উহার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিভাজন ও মূল্যায়ন করে তা ধীরে ধীরে সহজভাবেই অবতীর্ণ করেছেন মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে। এগুলির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ স্বাভাবিক দৃষ্টিতে সহজ মনে হ'লেও এর তাৎপর্য স্বয়ং আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। তিনি বলেন, رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا الْعَزِيزُ الْغَفَّارُ 'নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের, সবকিছুর পালনকর্তা, পরাক্রমশালী, মার্জনাকারী' (ছোয়াদ ৩৮/৬৬)।
অন্যত্র আল্লাহ বলেন, وَلَهُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ كُلٌّ لَّهُ قَانِتُوْنَ 'নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে যা কিছু আছে সব তাঁরই। সবাই তাঁর আজ্ঞাবহ' (রূম ৩০/২৬)।
অপর এক আয়াতে প্রত্যাদেশ এসেছে,
إِنَّ اللَّهَ يُمْسِكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ أَنْ تَزُوْلًا وَلَئِنْ زَالَتَا إِنْ أَمْسَكَهُمَا مِنْ
أَحَدٍ مِّنْ بَعْدِهِ إِنَّهُ كَانَ حَلِيمًا غَفُوْرًا
'নিশ্চয়ই আল্লাহ আসমান ও যমীনকে স্থির রাখেন, যাতে টলে না যায়। যদি এগুলি টলে যায়, তবে তিনি ব্যতীত কে এগুলো স্থির রাখবেন? তিনি সহনশীল, ক্ষমাশীল' (ফাতির ৩৫/৪১)।
উপরোল্লেখিত আয়াতগুলি দ্বারা মহাক্ষমাশীল আল্লাহ তা'আলার অসীম ও অপার মহিমার প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের আহ্বান জানান হয়েছে। মানুষের দৃষ্টিতে দৃশ্যমান বস্তুসমূহের মধ্যে আল্লাহ্র বৃহত্তম সৃষ্টি আসমান-যমীন এবং ক্ষুদ্রতম সৃষ্টি পিপীলিকা জাতীয় কীট-পতঙ্গ, যার সঠিক পরিচয় বা নাম জানা অসম্ভব। অদৃশ্য বস্তুর মধ্যে বৃহত্তম হ'ল জ্ঞান- বিজ্ঞান, আলো-অন্ধকার, বায়ু, তাপ, শব্দ প্রভৃতি এবং ক্ষুদ্রতম হ'ল মিথ্যা, প্রতারণা, প্রবঞ্চনা প্রভৃতির ন্যায় অসংখ্য বস্তু।
টিকাঃ
নাজম ৫৩/৩২।
মুমিন ৪০/৬০।
শূরা ৪২/৩০।
হা-মীম-সিজদাহ ৪১/৪৩।
বুরূজ ৮৫/১৪-১৬।
ছোয়াদ ৩৮/৬৬।
রূম ৩০/২৬।
ফাতির ৩৫/৪১।
৫. আল্লাহ নেককার ও দুর্বল পাপীকেও ক্ষমা করেন
আল্লাহ্ নিরানব্বইটি নামের মধ্যে 'ক্ষমাশীল' একটি বিশেষ গুণসম্পন্ন নাম এবং এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের ব্যাপকতা বর্ণনা করা সম্ভব নয়। কারণ আল্লাহ তাঁর মহাজ্ঞানের দ্বারা উহার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিভাজন ও মূল্যায়ন করে তা ধীরে ধীরে সহজভাবেই অবতীর্ণ করেছেন মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে। এগুলির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ স্বাভাবিক দৃষ্টিতে সহজ মনে হ'লেও এর তাৎপর্য স্বয়ং আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। তিনি বলেন, رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا الْعَزِيزُ الْغَفَّارُ 'নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের, সবকিছুর পালনকর্তা, পরাক্রমশালী, মার্জনাকারী' (ছোয়াদ ৩৮/৬৬)।
অন্যত্র আল্লাহ বলেন, وَلَهُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ كُلٌّ لَّهُ قَانِتُوْنَ 'নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে যা কিছু আছে সব তাঁরই। সবাই তাঁর আজ্ঞাবহ' (রূম ৩০/২৬)।
অপর এক আয়াতে প্রত্যাদেশ এসেছে,
إِنَّ اللَّهَ يُمْسِكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ أَنْ تَزُوْلًا وَلَئِنْ زَالَتَا إِنْ أَمْسَكَهُمَا مِنْ
أَحَدٍ مِّنْ بَعْدِهِ إِنَّهُ كَانَ حَلِيمًا غَفُوْرًا
'নিশ্চয়ই আল্লাহ আসমান ও যমীনকে স্থির রাখেন, যাতে টলে না যায়। যদি এগুলি টলে যায়, তবে তিনি ব্যতীত কে এগুলো স্থির রাখবেন? তিনি সহনশীল, ক্ষমাশীল' (ফাতির ৩৫/৪১)।
উপরোল্লেখিত আয়াতগুলি দ্বারা মহাক্ষমাশীল আল্লাহ তা'আলার অসীম ও অপার মহিমার প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের আহ্বান জানান হয়েছে। মানুষের দৃষ্টিতে দৃশ্যমান বস্তুসমূহের মধ্যে আল্লাহ্র বৃহত্তম সৃষ্টি আসমান-যমীন এবং ক্ষুদ্রতম সৃষ্টি পিপীলিকা জাতীয় কীট-পতঙ্গ, যার সঠিক পরিচয় বা নাম জানা অসম্ভব। অদৃশ্য বস্তুর মধ্যে বৃহত্তম হ'ল জ্ঞান- বিজ্ঞান, আলো-অন্ধকার, বায়ু, তাপ, শব্দ প্রভৃতি এবং ক্ষুদ্রতম হ'ল মিথ্যা, প্রতারণা, প্রবঞ্চনা প্রভৃতির ন্যায় অসংখ্য বস্তু। আল্লাহ্র সৃষ্ট দৃশ্য ও অদৃশ্য বস্তুসমূহের নাম আকার-আকৃতি, প্রকৃতি, পরিসংখ্যান, অবস্থান, কার্যক্রম, পারস্পরিক সম্পর্ক প্রভৃতি বিষয়ে মানুষের জ্ঞান খুবই সামান্য। অথচ এ বিষয়েও মানুষ নিজেকে (বা অন্য মানুষকে) অনেক বড় জ্ঞানী মনে করে, গবেষণা চালায় জলে-স্থলে, মহাশূন্যে ও ভূগর্ভের বিভিন্ন দৃশ্য-অদৃশ্য বস্তু সম্পর্কে, অতঃপর যৎসামান্য জ্ঞান লাভ করে যা অসীম সৃষ্টির তুলনায় নেহাৎ নগণ্য, তবে মানুষের জ্ঞানে তা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এ বিষয়ে মানুষকে তাঁর প্রতি আত্মসমর্পণ করার কথা বলেন, وَإِنْ تَعُدُّوا نِعْمَةَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا إِنَّ اللَّهَ لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ 'যদি আল্লাহ্র নে'মত গণনা কর, শেষ করতে পারবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু' (নাহ'ল ১৬/১৮)।
মহান স্রষ্টা আল্লাহ তা'আলা মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সৃষ্ট বস্তুগুলির বর্ণনা দিতে গিয়ে মানুষকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাঁর সৃষ্ট বস্তুসমূহ সংখ্যায় এত অধিক যে মানুষের পক্ষে তা গণনা করা সম্ভব নয়। কিন্তু আল্লাহ্ পক্ষে তা সহজ এবং বেশীও নয়। এগুলির পরিসংখ্যান রয়েছে এবং প্রতিটি বস্তু সৃষ্টির উদ্দেশ্য রয়েছে, বিনা কারণে একটিরও সৃষ্টি হয়নি। জগত সৃষ্টির বা মানুষ সৃষ্টির প্রথম হ'তে আজ পর্যন্ত শুধু মানুষের হিসাব (পরিসংখ্যান) রাখা কোন জ্ঞানী-বিজ্ঞানীর পক্ষে সম্ভব হয়নি এবং শেষ পর্যন্ত রাখা তো আরও অসম্ভব। অথচ আল্লাহ্র কাছে এর সঠিক পরিসংখ্যান রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, 'নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে কেউ নেই যে, দয়াময় আল্লাহ্র কাছে দাস হয়ে উপস্থিত হবে না। তাঁর কাছে তাদের পরিসংখ্যান রয়েছে এবং তিনি তাদেরকে গণনা করে রেখেছেন। ক্বিয়ামতের দিন তাদের সবাই তাঁর কাছে একাকী অবস্থায় আসবে' (মারিয়াম ১৯/৯৩-৯৫)।
মানুষ ব্যতীত অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রেও কোন ব্যতিক্রম নেই, অর্থাৎ সকল সৃষ্ট বস্তুই তার পরিসংখ্যানে রয়েছে। এসব বড় বড় বিষয়ে ভুল চিন্তা পরিহার করে আল্লাহ্র উপর আত্মসমর্পণপূর্বক ক্ষমাপ্রার্থী হ'লে তিনি ক্ষমা করবেন।
প্রেমময় আল্লাহ তা'আলা মানুষের প্রতি মৌলিক আদেশগুলি ছাড়াও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিধানাবলী নাযিল করেছেন এবং দয়া, ক্ষমা, রহমত, অনুগ্রহ, অনুকম্পা প্রভৃতির মত বহু আশা ভরসার বাণীও অবতীর্ণ করেছেন মানব জাতির জন্য। এতদ্বতীত তাদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও অনুশীলনের জন্যও বহু শিক্ষণীয় পৃথক পৃথক উপদেশ বাণী প্রেরণ করেছেন। এগুলি জানা ও মান্য করা সবার জন্য সমভাবে আবশ্যক। কিন্তু অজ্ঞতাবশতঃ অনেকেই আল্লাহ্র অবতীর্ণ বিধানাবলী জানে না বা বোঝে না। এক্ষেত্রে যারা জানে তাদের দায়িত্ব হ'ল, যারা জানে না বা বোঝে না তাদেরকে জানিয়ে দেওয়া বা বুঝিয়ে দেওয়া। যদি কোন পণ্ডিত ব্যক্তি অহংকারবশতঃ আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞানপ্রাপ্ত হয়ে তা গোপন রাখে, কাউকে শিক্ষা না দেয় তবে সে নিঃসন্দেহে আল্লাহ্র শাস্তির সম্মুখীন হবে। তবে এ বিষয়ে নিজের ভুল বুঝতে পেরে তওবা করলে পরম ক্ষমাশীল আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিবেন।
এ বিষয়ে মহান আল্লাহ্ বাণী, 'নিশ্চয়ই যারা গোপন করে, আমি যেসব বিস্তারিত তথ্য এবং হেদায়াতের কথা নাযিল করেছি মানুষের জন্য, কিতাবের মধ্যে বিস্তারিত বর্ণনা করার পরও, সে সমস্ত লোকের প্রতিই আল্লাহ্র অভিসম্পাত এবং অন্যান্য অভিসম্পাতকারীগণেরও। তবে যারা তওবা করে এবং বর্ণিত তথ্যাদির সংশোধন করে মানুষের কাছে তা বর্ণনা করে দেয়, সে সমস্ত লোকের তওবা আমি কবুল করি এবং আমি তওবা কবুলকারী পরম দয়ালু' (বাক্বারাহ ২/১৫৯-১৬০)।
অন্যত্র আল্লাহ বলেন, 'অবশ্যই মুনাফেকরা প্রতারণা করছে আল্লাহ্র সাথে, অথচ তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতারিত করে । বস্তুতঃ তারা যখন ছালাতে দাঁড়ায় তখন দাঁড়ায় একান্ত শিথিলভাবে লোক দেখানোর জন্য। আর তারা আল্লাহকে অল্পই স্মরণ করে। এরা দোদুল্যমান অবস্থায় ঝুলন্ত, এদিকেও নয় ওদিকেও নয়। বস্তুতঃ যাকে আল্লাহ গোমরাহ করে দেন, আপনি তাদের জন্য কোন পথই পাবেন না কোথাও। হে ঈমানদারগণ! তোমরা কাফেরদেরকে বন্ধু বানিও না মুসলমানদের বাদ দিয়ে। তোমরা কি এমনটি করে নিজের উপর আল্লাহ্র প্রকাশ্য দলীল কায়েম করে দেবে? নিঃসন্দেহে মুনাফেকরা রয়েছে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে। আর তোমরা তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী কখনও পাবে না। অবশ্য যারা তওবা করে নিয়েছে নিজেদের অবস্থার সংস্কার করেছে এবং আল্লাহ্র পথকে সুদৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে আল্লাহ্র ফরমানবরদার হয়েছে, তারা থাকবে মুসলমানদেরই সাথে। বস্তুতঃ আল্লাহ শীঘ্রই ঈমানদারগণকে মহাপূণ্য দান করবেন। তোমাদের আযাব দিয়ে আল্লাহ কি করবেন, যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর এবং ঈমানের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক? আর আল্লাহ হচ্ছেন সমুচিত মূল্যদানকারী সর্বজ্ঞ' (নিসা ৪/১৪২-১৪৭)।
মহান আল্লাহ আরও বলেন, وَإِنَّ رَبَّكَ لَذُوْ مَغْفِرَةٍ لِّلنَّاسِ عَلَى ظُلْمِهِمْ وَإِنَّ رَبَّكَ لَشَدِيدُ الْعِقَابِ 'নিশ্চয়ই আপনার পালনকর্তা মানুষের অন্যায় সত্ত্বেও ক্ষমা করেন এবং আপনার পালনকর্তা কঠিন শাস্তিদাতাও বটে' (রা'দ ১৩/৬)।
ইতিমধ্যে আমরা অবগত হয়েছি যে, আল্লাহ্র নে'মত বা সৃষ্ট বস্তু সমূহ গণনা করে শেষ করা যাবে না। অর্থাৎ মানুষের উপকারের জন্য যে সমস্ত বস্তু সৃষ্টি করা হয়েছে তা কখনও কোন মানুষের পক্ষে গণনা করা সম্ভব হ'তে পারে না। শুধু তাই নয়, তাঁর যে গুণাবলী রয়েছে সেগুলিরও এক একটির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বা অভ্যন্তরস্থ তাৎপর্য জানা বা বর্ণনা করা সম্ভব নয়।
উপরের আলোচনায় দেখা যায় বান্দার কৃতকর্মে আল্লাহ অসন্তুষ্ট রয়েছেন এমন ব্যক্তিও যখন পবিত্র মন-মানসিকতা নিয়ে তওবা করে ও আল্লাহ্র নিকট ক্ষমাপ্রার্থী হয়, তখন আল্লাহ সব ভুলে গিয়ে তাকে ক্ষমা করে দেন। অভিশপ্ত মুনাফেকদের কোন সাহায্যকারী নেই, আল্লাহ তাঁর প্রত্যাদেশে এ আভাস দিয়েছেন। কিন্তু তারাও যদি আল্লাহ্র ভয়ে ভীত হয়ে তওবা করে ও ক্ষমাপ্রার্থী হয়, তবে তারাও আল্লাহ্র দয়া ও ক্ষমার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। এমনকি তাঁর প্রতি সামান্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী ঈমানদার বান্দাদেরকেও আল্লাহ আযাব হ'তে রক্ষা করার আশ্বাস দিয়েছেন।
আল্লাহ্ ক্ষমা ও রহমত লাভের বর্ণনা দিয়ে প্রত্যাদেশ এসেছে, 'তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহ ও রাসূলের, যাতে তোমাদের উপর রহমত করা হয়। তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা এবং জান্নাতের দিকে ছুটে যাও যার সীমানা হচ্ছে আসমান ও যমীন, যা তৈরী করা হয়েছে পরহেযগারদের জন্য। যারা সচ্ছলতায় ও অভাবের সময় ব্যয় করে, যারা নিজেদের রাগকে সংবরণ করে আর মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে, বস্তুতঃ আল্লাহ সৎকর্মশীলদেরকেই ভালবাসেন। তারা কখনও কোন অশ্লীল কাজ করে ফেললে কিংবা কোন মন্দ কাজে জড়িত হয়ে নিজের উপর যুলুম করে ফেললে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ছাড়া আর কে পাপ ক্ষমা করবেন? তারা নিজের কৃতকর্মের জন্য হঠকারিতা প্রদর্শন করে না এবং জেনে শুনে তা-ই করতে থাকে না। তাদেরই জন্য প্রতিদান হ'ল তাদের পালনকর্তার ক্ষমা ও জান্নাত, যার তলদেশে প্রবাহিত হচ্ছে প্রস্রবণ যেখানে তারা থাকবে অনন্তকাল। যারা কাজ করে তাদের জন্য কতই না চমৎকার প্রতিদান' (আলে ইমরান ৩/১৩২- ১৩৬)।
আলোচ্য আয়াত কয়টিতে আল্লাহ তাঁর ক্ষমাযোগ্য বান্দাদের বৈশিষ্ট্য সমূহ বর্ণনা করেছেন। কিছু সৎ মনোভাবাপন্ন বা পূণ্যবান লোক আছে, যারা সচ্ছলতার সময়ও দান-খয়রাত করে, অভাবের সময়ও দান-খয়রাত করে। কোন সময় রাগান্বিত হ'লে রাগ সংবরণ করে আর মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে। আবার কোন সময় কোন খারাপ বা অশ্লীল কাজ করলে বা খারাপ কাজে জড়িত হয়ে পড়লে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজের ভুলের জন্য বা পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। এরূপ লোকদের আল্লাহ ক্ষমা করে দেবেন। পবিত্র কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী এরূপ লোকের সংখ্যা হবে অনেক যার পরিসংখ্যান আল্লাহপাকই ভাল জানেন।
এতদ্বতীত এদের সাদৃশ্যপূর্ণ চরিত্র বৈশিষ্ট্যের আরও বহু বান্দা রয়েছে তারাও আল্লাহ্ দয়া ও ক্ষমার আওতাভুক্ত হয়ে যাবে। মানুষের অবগতিকল্পে করুণাময় আল্লাহ বলেন, 'দুর্বল, রুগ্ন, ব্যয়ভার বহনে অসমর্থ লোকদের জন্য কোন অপরাধ নেই, যখন তারা মনের দিক থেকে পবিত্র হবে আল্লাহ ও রাসূলের সাথে। নেককারদের উপর অভিযোগের কোন পথ নেই। আর আল্লাহ হচ্ছেন ক্ষমাকারী দয়ালু (তাওবাহ ৯/৯১)। অনুরূপ প্রত্যাদেশ হয়েছে, 'কোন কোন বেদুঈন এমনও রয়েছে যারা নিজেদের ব্যয় করাকে জরিমানা বলে গণ্য করে এবং আপনার উপর কোন দুর্দিন আসে কিনা সে অপেক্ষায় থাকে। তাদেরই উপর দুর্দিন আসুক। আর আল্লাহ হচ্ছেন শ্রবণকারী, পরিজ্ঞাত। আর কোন কোন বেদুঈন হ'ল তারা, যারা ঈমান আনে আল্লাহ্র উপর কিয়ামতের দিনের উপর এবং নিজেদের ব্যয়কে আল্লাহ্র নৈকট্য এবং রাসূলের দো'আ লাভের উপায় বলে গণ্য করে। জেনো তাই হ'ল তাদের ক্ষেত্রে নৈকট্য। আল্লাহ তাদেরকে নিজের রহমতের অন্তর্ভুক্ত করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়' (তাওবাহ ৯/৯৮-৯৯)।
ধর্ম নিয়ে মতভিন্নতা, প্রতারণা, মুনাফেকী বা ছলচাতুরী একটি চিরাচরিত ইতিহাস। এ বিষয়ে আমাদের মহানবী (ছাঃ)-কে বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রদানের প্রয়াসে প্রত্যাদেশ হয়েছে, 'কিছু কিছু লোক আপনার আশেপাশের মুনাফেক এবং কিছু লোক মদীনাবাসী কঠোর মুনাফেকীতে অনড়। আপনি তাদের জানেন না, আমি তাদের জানি। আমি তাদেরকে আযাব দান করব দু'বার, তারপর তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হবে মহা আযাবের দিকে। আর কোন কোন লোক রয়েছে যারা নিজেদের পাপ স্বীকার করেছে, তারা মিশ্রিত করেছে একটি নেক কাজ ও একটি বদ কাজ। শীঘ্রই আল্লাহ হয়ত তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়। তাদের মালামাল থেকে যাকাত গ্রহণ করুন যাতে আপনি সেগুলোকে পবিত্র করতে এবং সেগুলোকে বরকতময় করতে পারেন এর মাধ্যমে। আর আপনি তাদের জন্য দো'আ করুন, নিঃসন্দেহে আপনার দো'আ তাদের জন্য সান্ত্বনা স্বরূপ। বস্তুতঃ আল্লাহ সবকিছুই শোনেন, জানেন। তারা কি একথা জানতে পারেনি যে, আল্লাহ নিজেই স্বীয় বান্দাদের তওবা কবুল করেন এবং যাকাত গ্রহণ করেন? বস্তুতঃ আল্লাহই তওবা কবুলকারী, করুণাময়। আর আপনি বলে দিন, তোমরা আমল করে যাও, তার পরবর্তীতে আল্লাহ দেখবেন তোমাদের কাজ এবং দেখবেন রাসূল ও মুসলমানগণ। তাছাড়া তোমরা শীঘ্রই প্রত্যাবর্তিত হবে তাঁর সান্নিধ্যে যিনি গোপন ও প্রকাশ্য বিষয়ে অবগত। তারপর তিনি জানিয়ে দেবেন তোমাদেরকে তোমরা যা করতে। আবার অনেক লোক রয়েছে যাদের কাজকর্ম আল্লাহ্র নির্দেশের উপর স্থগিত রয়েছে, তিনি হয় তাদের আযাব দেবেন, না হয় তাদের ক্ষমা করে দেবেন। বস্তুতঃ আল্লাহ সব কিছুই জ্ঞাত, বিজ্ঞতাসম্পন্ন' (তওবা ৯/১০১-১০৬)। আল্লাহ ক্ষমাশীল করুণাময়। যারা এ বিশ্বাস নিয়ে পৃথিবীতে কর্ম সম্পাদন করে তারা কখনও আল্লাহ্র দয়া, ক্ষমা ও রহমত হ'তে নিরাশ হয় না। এ বিষয়ে একটি হাদীছে এসেছে, আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আমি নবী করীম (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ্র এক বান্দা গোনাহ করল। (রাবীর কথা- কোন কোন সময় তিনি 'আছাবা যামবান' কথাটি না বলে বলেছেন, 'আযনাবা যামবান') তারপর দো'আ করল, হে রব! আমি গোনাহ করে ফেলেছি (রাবীর কথা- কোন কোন সময় 'আযনাবতু' না বলে 'আছাবতু' বলেছেন)। অতঃপর বলল, আমার গোনাহ মাফ করে দিন। তার রব তখন বলল, আমার বান্দা কি জানে যে তার এমন একজন রব আছেন, যিনি গোনাহ মাফ করে থাকেন আর উক্ত গোনাহ্ কারণে পাকড়াও করেও থাকেন। আমি আমার বান্দাকে মাফ করে দিলাম। এরপর যতদিন আল্লাহ্র ইচ্ছা ততদিন সে এ অবস্থায় থাকল এবং আবার গোনাহ করল (বর্ণনাকারীর সন্দেহ যে, এখানে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) 'আছাবা যামবান' বলেছেন, না 'আযনাবা যামবান' বলেছেন, তা স্মরণ নেই)। এবার সে বলল, হে রব! আমি গোনাহ করে ফেলেছি, (বর্ণনাকারীর কথা তিনি এখানে 'আছাবতু' অথবা 'আযনাবুত' বলেছেন) আমার এ গোনাহ আপনি মাফ করে দিন। তখন আল্লাহ বললেন, আমার বান্দা কি জানে যে, তার একজন রব আছেন, যিনি গোনাহ মাফ করেন আবার গোনাহর কারণে পাকড়াও করেন। আমি আমার বান্দাকে মাফ করে দিলাম। এরপর সে আল্লাহ্র ইচ্ছামত কিছুদিন এ অবস্থায় থাকল এবং পুনরায় গোনাহ লিপ্ত হ'ল (রাবী বলেন- কখনো তিনি 'আযনাবা যামবান' বলেছেন, আবার কখনো 'আছাবা যামবান' বলেছেন)। এবার সে বলল, হে রব! আমি আরেকটি গোনাহ করে ফেলেছি। (রাবী বলেন- অথবা তিনি 'আযাবত'-এর স্থানে 'আযনাবুত' বলেছেন)। (সে বলল) আমার এ গোনাহ মাফ করে দিন। তখন আল্লাহ বললেন, আমার বান্দা কি জানে, যে তার এমন একজন রব আছেন যিনি গোনাহ মাফ করেন আবার গোনাহের কারণে শাস্তিও দেন? আচ্ছা আমি আমার বান্দাকে মাফ করে দিলাম। তিনবার এরূপ বলবেন' (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২৩৩৩, 'তাওবা ও ইস্তিগফার' পরিচ্ছেদ, 'দো'আ' অধ্যায়)। বস্তুতঃ দয়া, ক্ষমা, রহমত-অনুগ্রহ, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, পাপ-পুণ্য, শাস্তি প্রভৃতি সবই অদৃশ্য বস্তু। এগুলি কেবল আল্লাহ জানেন। তিনিই প্রয়োজনবোধে যথাসময়ে এগুলি প্রকাশ করে থাকেন। মানুষ এ সম্বন্ধে খুব অল্পই চিন্তা-ভাবনা করে। যারা আল্লাহ্র একচ্ছত্র ক্ষমতায় বিশ্বাসী তারা এজগতে নিজ গৃহে ফিরে যাওয়ার ন্যায়ই মৃত্যুর পরে আল্লাহ্র কাছে ফিরে যাওয়ায় বিশ্বাসী। অতঃপর প্রতিফলিত হবে পবিত্র কুরআন ও হাদীছের বর্ণিত ক্ষমাশীল অধ্যায়ের অনুকূল প্রশান্তির জগত অথবা প্রতিকূল অশান্তি বা শাস্তির জগতের সূচনা। সুতরাং আল্লাহ ক্ষমাশীল- এ প্রতিপাদ্যকে অন্ত রে রেখে কাজ করে যাওয়ার ব্রত গ্রহণ করাই আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের উপায়।