📘 আল্লাহ ক্ষমাশীল > 📄 ভূমিকা

📄 ভূমিকা


আমাদের প্রিয় রাসূল মুহাম্মাদ (ছাঃ) বলেছেন, 'আল্লাহ তা'আলার এক কম একশত নাম আছে। যে ব্যক্তি আল্লাহ্র ঐ নামগুলি মুখস্থ করবে সে জান্নাতে যাবে' (বুখারী, মুসলিম)। তাঁর নামগুলির অন্যতম হচ্ছে- গফুর (ক্ষমাশীল), গফফার (অধিক ক্ষমাশীল) প্রভৃতি। এ নামগুলির যে কোনটি পৃথক পৃথকভাবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করলে প্রত্যেকটিই এক একটি মহাগ্রন্থের রূপ নিবে, যা কোন মানুষের পক্ষেই সঠিকভাবে রচনা করা সম্ভব নয়।
তাঁর সব নামই গুণবাচক, তবে আমাদের বোধগম্যের মধ্যে সহজ নামগুলির অন্যতম হ'ল 'আল্লাহ ক্ষমাশীল'। অথচ তিনিই একমাত্র পরাক্রমশালী, সর্বশক্তিমান ও মহাজ্ঞানী। তিনি জগতের বুকে সংঘটিত প্রতিটি ন্যায় কাজের প্রতিদান ও অন্যায় কাজের প্রতিফল দিতে সক্ষম। কিন্তু তিনি তা করেন না, তিনি মানুষকে তাঁর আদেশ পালন করার পুনঃ পুনঃ পরামর্শ, উপদেশ প্রদান করেন। অতঃপর যারা তাঁর কথায় বিশ্বাস করে কাজ করে যায়, তাদের প্রতি তিনি সন্তুষ্ট হন, তাদের ছোটখাট ত্রুটি- বিচ্যুতিকে তিনি ক্ষমা করে দেন এবং সৎপথ প্রদর্শন করেন। কিন্তু যারা আল্লাহ্ অবতীর্ণ বাণীতে বিশ্বাস করে না, তাঁর আদেশ-নিষেধ, উপদেশ, পরামর্শ ইত্যাদিতে কোন গুরুত্ব দেয় না, পৃথিবীর মোহে নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, আল্লাহ তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হন। তাদেরকে ক্ষমাও করেন না এবং সৎপথ প্রদর্শনও করেন না।
মানুষের জীবন প্রবাহের এই ক্রান্তিলগ্নে সঠিক পথ অবলম্বনের জন্য অদৃশ্যের মহাজ্ঞানী আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর শ্রেষ্ঠ উপদেশভাণ্ডার হিসাবে পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ করেন। উদ্দেশ্য প্রতিটি মানুষকে ভালভাবে কুরআন শিক্ষা করে, কুরআনের আদেশ-নিষেধ, নিয়ম-কানুন ইত্যাদি মেনে চলতে হবে। এতে কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি বা ভুল-ভ্রান্তি হয়ে গেলে পরম করুণাময় আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করে দিবেন। কিন্তু পরবর্তীতে যেন এরূপ বা তদপেক্ষা বড় কোন অপরাধ না হয় সেজন্য সাবধান করে দিয়েছেন। তাহ'লে সে ক্ষমাশীল আল্লাহ্র নিকট ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে আল্লাহ্ সান্নিধ্যে স্থান পেয়ে যাবে। পক্ষান্তরে যারা আল্লাহ্র পবিত্র বাণী কুরআন শিক্ষা করে না, কুরআনের আদেশ-নিষেধ, নিয়ম-কানুনকে বিশ্বাস করে না, বরং অমান্য করে নিজ প্রবৃত্তি বা অন্য কোন মনীষীর আদর্শ পসন্দ করে বা সেই অনুযায়ী জীবন-যাপন করে তারা আল্লাহ্র রহমত হ'তে বঞ্চিত হয়। আল্লাহ তাদের সুপথ প্রদর্শন করেন না, ক্ষমাও করেন না। ফলে শয়তান তাদের পথপ্রদর্শক হিসাবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অভিভাবক হয়ে যায় এবং পরকালেও তারা শয়তানের সঙ্গেই স্থান লাভ করবে।
ক্ষমাশীল একটি ব্যাপকার্থক শব্দ। এর অর্থ- যিনি সহজেই অন্যের অন্যায়, অপরাধ ক্ষমা করেন। এখানে ক্ষমাশীল সীমাহীন অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। শুধু মহান স্রষ্টা আল্লাহ তা'আলাকে অবিশ্বাস ও অস্বীকারকারীরা ব্যতীত সবাই এই ক্ষমাশীল অর্থের আওতায় পড়ে যাবে।
যেদিন এই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে, অতঃপর মানুষকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে, সেদিন একমাত্র ক্ষমাপ্রাপ্তরাই উপকৃত হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে। অপর দিকে যারা ক্ষমার বাইরে থাকবে তারা কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে এবং জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
বস্তুতঃ ইহজগত ও পরজগত মানুষের জন্য অত্যন্ত নিকটতম ও পাশাপাশি দু'টি পৃথক আবাসস্থল। ইহজগত স্বল্পস্থায়ী এবং পরজগত দীর্ঘস্থায়ী। এ সম্পর্কে পবিত্র আল-কুরআনে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। অত্র রচনার মাধ্যমে আমরা এ ক্ষণস্থায়ী জগতের অসারতা এবং চিরস্থায়ী পরজগতের সার্থকতা খুঁজে পাওয়ার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ আমাদের সকলকে সঠিক জ্ঞান লাভের তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!
রফীক আহমাদ।

📘 আল্লাহ ক্ষমাশীল > 📄 আল্লাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন

📄 আল্লাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন


পরম করুণাময় আল্লাহ হচ্ছেন মহাজ্ঞানী। তাঁর জ্ঞান হ'ল সম্পূর্ণরূপে পবিত্র ও ত্রুটিমুক্ত। তাঁর মহাজ্ঞান সম্পর্কে আলোচনা করার অধিকার আছে কিন্তু সমালোচনা করার কোন মানুষেরই নেই। তাঁর অসীম ও অনন্ত জ্ঞানে সৃষ্ট নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল ও এতদুভয়ের অন্তর্বর্তী অগণিত সৃষ্টিরাজির অস্তিত্ব, অবস্থান ও কার্যক্রম যেকোন জ্ঞানী মানুষকে কৃতজ্ঞতায় অবনত করে দিতে সক্ষম। এমতবস্থায় যারা আল্লাহ্র মহা জ্ঞানভাণ্ডারের প্রতি কৃতজ্ঞতায় নুইয়ে পড়বে আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হবেন এবং তাদের ভুল-ত্রুটিগুলিকে ক্ষমা করে দিবেন। কারণ এরা ভুল- ত্রুটি করলেও আল্লাহ্র অস্তিত্ব, তাঁর বিপুলায়তন সৃষ্টিরাজিতে বিস্ময়াভিভূত হয়ে তাঁকে স্মরণ রাখে। আল্লাহ্র সার্বভৌমত্ব ও একচ্ছত্র বাদশাহীতে তারা বিশ্বাসী এবং তাঁকেই একমাত্র উপাস্য হিসাবে অকৃত্রিমভাবে বিশ্বাস করে ও মান্য করে।
কিন্তু কিছু মানুষ নিজ জ্ঞানের প্রতিভায় বা পূর্বপুরুষদের শ্রুত সংবাদের ভিত্তিতে আল্লাহ্ অস্তিত্ব ও মহাজ্ঞান নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক কথাবার্তা বলে থাকে। কিছু মানুষ বলে, আল্লাহ নিরাকার। মোটকথা তারা আল্লাহ্র অসীম সত্তা, তাঁর মহাজ্ঞান, মহাক্ষমতা ও সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী নয়। পৃথিবীর অনেক মানুষ তাদের পসন্দের দেব-দেবীকে বিভিন্ন ক্ষমতার উৎস হিসাবে শ্রদ্ধাভরে প্রতি বছর পূজা করে। এভাবে সমগ্র বিশ্বে এমনকি আমাদের দেশেও অনেক মানুষ আল্লাহ্র পরিবর্তে অন্য শক্তির অনুসরণ করে। অন্তর্যামী আল্লাহ তা'আলা সকল মানুষের মনের খবর ভালভাবেই জানেন। তাঁর কাছে পৃথিবীর বা পৃথিবীর মানুষের সূচাগ্রপরিমাণ কথা, চিন্তা বা কল্পনাও গোপন থাকে না। আর এসবের মধ্যে আল্লাহ্র সংযোজন ও বিয়োজনের বিষয়টি অঙ্গীভূত থাকে। যেখানে বা যাদের মধ্যে আল্লাহ্ সংযোজন থাকে না তাদের প্রতি তাঁর কোন রহমতই থাকে না; বরং অভিশম্পাত বর্ষিত হয় সর্বদাই। এই শ্রেণীর লোককে আল্লাহ কখনও ক্ষমা করবেন না।
উপরোক্ত আলোচনার বাস্তব প্রেক্ষাপট হ'তে সৃষ্ট পরিবেশ পরিস্থিতির বিষয় সমূহ সর্বজ্ঞানী আল্লাহ তা'আলা সবচাইতে ভাল জানেন। তিনি তাঁর সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিচারের নিরিখে একাকী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিবেন যে, তিনি কাকে ক্ষমা করবেন এবং কাকে শাস্তি দিবেন। সুতরাং এ বিষয়ে সকল মানুষই অজ্ঞ। একমাত্র তিনিই জানেন কাকে ক্ষমা করবেন এবং কাকে শাস্তি দিবেন। আল্লাহ্র বাণীর প্রতি কারও হস্তক্ষেপ করার কোন অধিকার নেই। যদিও তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি দিবেন। তিনি অত্যাধিক ক্ষমাশীল। মহান আল্লাহ বলেন,
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَلَهُ الْحَمْدُ فِي الْآخِرَةِ
وَهُوَ الْحَكَيْمُ الْخَبِيرُ - يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنْزِلُ
مِنَ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا وَهُوَ الرَّحِيمُ الْغَفُوْرُ
'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্, যিনি নভোমণ্ডলে যা আছে এবং ভূমণ্ডলে যা আছে সবকিছুর মালিক এবং তাঁরই প্রশংসা পরকালে। তিনি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ। তিনি জানেন যা ভূগর্ভে প্রবেশ করে, যা সেখান থেকে নির্গত হয়, যা আকাশ থেকে বর্ষিত হয় এবং যা আকাশে উত্থিত হয়। তিনি পরম দয়ালু ক্ষমাশীল' (সাবা ২৪/১-২)।
একই মর্মার্থে অন্যত্র আল্লাহ বলেন,
تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ - الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ
وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلاً وَهُوَ الْعَزِيزُ الْغَفُوْرُ -
'পুণ্যময় তিনি, যাঁর হাতে রাজত্ব। তিনি সবকিছুর উপর সর্বশক্তিমান। যিনি সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন, যাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ? তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল' (মুলক ৬৭/১-২)।
ঈষৎ পরিবর্তিত অর্থে সর্বজ্ঞ আল্লাহ বলেন, 'আমি আকাশ পৃথিবী ও পর্বতমালার সামনে এই আমানত (কুরআন) পেশ করেছিলাম। অতঃপর তারা একে বহন করতে অস্বীকার করল এবং এতে ভীত হ'ল, কিন্তু মানুষ তা বহন করল। নিশ্চয়ই সে যালেম অজ্ঞ। যাতে আল্লাহ মুনাফিক পুরুষ, মুনাফিক নারী, মুশরিক পুরুষ, মুশরিক নারীদেরকে শাস্তি দেন এবং মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে ক্ষমা করেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু' (আহযাব ৩৩/৭২-৭৩)।
উপরের আয়াতগুলিতে মহান আল্লাহ তাঁর অসীম মহা রাজত্বের মধ্যে তাঁর একক সার্বভৌম ক্ষমতার বিষয়, মানুষের জন্ম-মৃত্যুর বিষয়, তাকে পরীক্ষা করার বিষয় সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন। অতঃপর তিনি যে দয়ালু ও ক্ষমাশীল তার পুনরুল্লেখ করেছেন। তাঁর দয়া ও ক্ষমার আদর্শ নিয়ে জীবন গড়ার জন্য পবিত্র কুরআনে বহু আয়াত অবতীর্ণ করেছেন। যারা কুরআনের অনুসারী তারা তাঁর ক্ষমার যোগ্য বলে বিবেচিত হবে এবং যারা কুরআনের অনুসারী নয় বরং অবিশ্বাসী তারা শাস্তির যোগ্য হবে। এজন্য আল্লাহ তা'আলা মানুষকে অবহিত করেছেন যে, তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি দিবেন। এ রহস্যপূর্ণ ও অর্থপূর্ণ বাণীর সঠিক ব্যাখ্যা দান কোন মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়। তবে এ বাণীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করত সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করা উচিত। কারণ 'তিনিই তোমাদেরকে কর্ণ, চক্ষু ও হৃদয় দিয়েছেন' (মু'মিনূন ২৩/৭৮) এবং তিনিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন আর তোমাদের দিয়েছেন দেখার ও শোনার শক্তি ও অন্তকরণ' (মুলক ৬৭/২৩)।
সুতরাং ইহকাল শেষে পরকালের বিচার দিবসে জবাবদিহিতার বিষয়টি যারপরনাই গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে আমাদের মহানবী (ছাঃ) বহু অমিয় বাণী রেখে গেছেন। উদাহরণ স্বরূপ দু'একটির উদ্ধৃতি দেওয়া হ'ল। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট থেকে শুনেছি যে, আল্লাহ যেদিন রহমত সৃষ্টি করেছেন, সেদিন রহমতকে একশত ভাগে ভাগ করে একভাগ সমস্ত সৃষ্টিকে দিয়েছেন, আর বাকী নিরানব্বই ভাগ নিজের কাছে রেখেছেন। যদি কোন কাফের আল্লাহ্র নিকট যে রহমত আছে, তার পরিমাণ সম্পর্কে জানতো তাহ'লে সে জান্নাতের ব্যাপারে নিরাশ হ'ত না। অপর পক্ষে কোন মুমিন যদি আল্লাহ্ কাছে যে শাস্তি রয়েছে তার পরিমাণ সম্পর্কে জানতো তবে (জাহান্নামের) আগুন থেকে নিজেকে নিরাপদ মনে করত না (বুখারী)।
অপর এক হাদীছে আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে কেউ তার কাজের দ্বারা নাজাত পাবে না। লোকেরা বলল আপনিও (আপনার কাজের দ্বারা নাজাত) পাবেন না? তিনি বললেন না, আমিও না। তবে আল্লাহ তাঁর রহমত দিয়ে আমাকে ঢেকে রেখেছেন। সুতরাং সঠিক এবং কর্তব্যনিষ্ঠভাবে কাজ করে আল্লাহ্র নৈকট্য অর্জন কর। সকাল-বিকাল এবং রাতের শেষাংশে আল্লাহ্ ইবাদত কর। (এসব কাজে) মধ্যমপন্থা অবলম্বন করো, মধ্যম পন্থাই তোমাদেরকে লক্ষ্যে পৌঁছাবে (বুখারী)।
পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের সকল বাণীই আমাদের দৃষ্টিতে শ্রদ্ধা ও সম্মানের বিষয়। তবে সহজ বোধগম্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় বিষয়গুলি অধিক আলোচনা করা শ্রেয়। পক্ষান্তরে কঠিন ও দুর্বোধ্য অংশগুলির প্রতি আত্মবিশ্বাস ও আত্মসমর্পণই উত্তম। উপরে বর্ণিত হাদীছ দু'টির মর্মার্থই হ'ল আল্লাহ্র রহমত লাভের জন্য তাঁর দয়া, ক্ষমা, অনুগ্রহ ইত্যাদি অপরিহার্য। এজন্যই 'আল্লাহ ক্ষমাশীল' শিরোনাম দিয়ে আলোচ্য রচনার অবতারণা করেছি।
'আল্লাহ ক্ষমাশীল' সাধারণ অর্থেও এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ যেমন ব্যাপক অনুরূপভাবে বিশেষ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণেও তা ব্যাপক। মহান আল্লাহ বলেন,
وَمَن لَّمْ يُؤْمِنْ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ فَإِنَّا أَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ سَعِيرًا - وَلِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ
وَالْأَرْضِ يَغْفِرُ لِمَنْ يَشَاءُ وَيُعَذِّبُ مَنْ يَشَاءُ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا
'যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে বিশ্বাস করে না, আমি সেসব কাফেরের জন্য জ্বলন্ত অগ্নি প্রস্তুত রেখেছি। নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের রাজত্ব আল্লাহ্রই। তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন। তিনি ক্ষমাশীল পরম মেহেরবান' (ফাতহ ৪৮/১৩-১৪)।
একই মর্মার্থে অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,
وَلِلَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ يَغْفِرُ لِمَنْ يَشَاءُ وَيُعَذِّبُ مَنْ يَشَاءُ
وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
'যা কিছু আসমান ও যমীনে রয়েছে, সবই আল্লাহ্। তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন, যাকে ইচ্ছা আযাব দান করবেন। আর আল্লাহ হচ্ছেন ক্ষমাকারী করুণাময়' (আলে ইমরান ৩/১২৯)।
তিনি আরো বলেন, 'যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে, তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসাবে। আল্লাহ্র পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারী। আল্লাহ পরাক্রান্ত জ্ঞানময়। অতঃপর যে তওবা করে স্বীয় অত্যাচারের পর এবং সংশোধিত হয়, নিশ্চয়ই আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু। আপনি কি জানেন না যে, আল্লাহ্ নিমিত্তেই নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের আধিপত্য। তিনি যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন এবং যাকে ইচ্ছা করেন। আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান' (মায়েদাহ ৫/৩৮-৪০)।
পবিত্র কুরআনের এসব অমূল্য আদেশের আলোকে নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)ও তাঁর মূল্যবান বাণী প্রকাশ করে গেছেন। উদাহরণতঃ কয়েকটি পেশ করা হ'ল- (১) আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, বণী ইসরাঈলের মধ্যে একজন লোক ছিল, যে নিরানববই জন মানুষকে হত্যা করেছে। অতঃপর নাজাতের উপায় আছে কি-না তা জানার জন্য জিজ্ঞেস করতে বেরিয়েছে। প্রথমে সে একজন পাদ্রীর নিকট আসল এবং তাকে জিজ্ঞেস করল যে, আমার 'তাওবা' কবুল হবে কি? পাদ্রী বলল, না। তখন সে তাকেও হত্যা করল। এরপরেও সে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করতেই থাকল। কোন এক ব্যক্তি তাকে বলল, অমুক লোকালয়ে যাও। সেখানে একজন আলেম আছেন তাঁকে জিজ্ঞেস করে নাও। সুতরাং লোকটি রওয়ানা দিল, কিন্তু পথেই তার মৃত্যু হয়ে গেল। মরণকালে সে আপন বুকটি সেই লোকালয়ের দিকে বাড়িয়ে দিল। এখন তাকে নিয়ে রহমতের ফেরেশতা ও আযাবের ফেরেশতা ঝগড়া ও বিতর্ক শুরু করে দিল। এমনি সময় আল্লাহ যে লোকালয়ের দিকে লোকটি (তওবা করার জন্য) রওয়ানা দিয়েছিল তাকে হুকুম করলেন হে গ্রাম! লোকটির নিকটবর্তী হয়ে যাও। আর যেখানে সে হত্যার কাজ করেছিল, সে গ্রামকে হুকুম করলেন হে গ্রাম! তার থেকে দূরে সরে যাও। তারপর ফেরেশতাদ্বয়কে বললেন, তোমরা উভয় লোকালয়ের দূরত্ব মেপে দেখ লোকটি কোন লোকালয়ের বেশী নিকটে। সুতরাং পরিমাপের পর দেখা গেল, মৃত লোকটি যে লোকালয়ে তাওবা করতে যাচ্ছিল অপর লোকালয়টির তুলনায় তা এক বিঘত অধিক নিকটবর্তী। তখন আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিলেন' (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২৩২৭, 'কিতাবুদ দাওয়াত', 'তওবা ও ইস্তিগফার' অনুচ্ছেদ)।
(২) আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, এক সময় একটি কুকুর একটি কুয়ার চারদিকে ঘুরছিল। মনে হচ্ছিল যে, পানির পিপাসায় এখনই সে মারা পড়বে। এমনি সময় বনী ইসরাঈলের এক পতিতা রমণী কুকুরটি দেখল। তখন সে তার জুতা খুলে নিল এবং তা দিয়ে পানি উঠিয়ে কুকুরটিকে পানি পান করালো। এ কারণে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিলেন' (বুখারী হা/৩৪৬৭, 'কিতাবু আহাদীছিল আম্বিয়া', অনুচ্ছেদ-৫৪)।
(৩) উকবা (রাঃ) হুযাইফাকে বললেন, আপনি নবী করীম (ছাঃ) থেকে যা শুনেছেন তা আমাদের নিকট বর্ণনা করেন না কেন? তখন তিনি বর্ণনা করলেন, আমি নবী করীম (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, (অতীত যুগে) এক ব্যক্তি ছিল। তার মৃত্যুর সময় উপস্থিত হ'ল। যখন সে জীবন সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিরাশ হয়ে গেল, তখন সে তার পরিজনদেরকে অছিয়ত করল, আমি মারা গেলে, তোমরা অনেকগুলো লাকড়ি জমা করে আগুনে জ্বালিয়ে দিও এবং আমাকে তাতে ফেলে দিও। এমনকি যখন আগুন আমার সব গোশত খেয়ে ফেলবে (পুড়িয়ে ফেলবে) এবং আমার হাড্ডি পর্যন্ত পৌঁছে যাবে, তখন তোমরা হাড্ডিগুলো পিষে ফেলবে। তারপর আমাকে অর্থাৎ আমার হাড্ডির গুঁড়াকে প্রচণ্ড গরমের দিন কিংবা তীব্র হাওয়া প্রবাহের দিন নদীতে ফেলে দিবে। তারা তাই করল। আল্লাহ আবার তাকে একত্রিত করলেন এবং জানতে চাইলেন, তুমি এমন কেন করলে? সে জবাব দিল, আপনার ভয়ে। তখন আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিলেন' (বুখারী হা/৩৪৫২, 'কিতাবু আহাদীছিল আম্বিয়া', অনুচ্ছেদ-৫০)।
(৪) আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন, আমি এখনও নবী করীম (ছাঃ)- কে দেখতে পাচ্ছি, তিনি (অতীত যুগের) নবীগণের মধ্যে একজন নবীর ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে, সেই নবীকে তাঁর জাতি ভীষণভাবে মারল এবং রক্তাক্ত করে দিল। আর তিনি আপন চেহারা থেকে রক্ত মুছে ফেলছেন

টিকাঃ
মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২৩২৭, 'কিতাবুদ দাওয়াত', 'তওবা ও ইস্তিগফার' অনুচ্ছেদ।
বুখারী হা/৩৪৬৭, 'কিতাবু আহাদীছিল আম্বিয়া', অনুচ্ছেদ-৫৪।
বুখারী হা/৩৪৫২, 'কিতাবু আহাদীছিল আম্বিয়া', অনুচ্ছেদ-৫০।

📘 আল্লাহ ক্ষমাশীল > 📄 আল্লাহ ভয়ের যোগ্য ও ক্ষমার অধিকারী

📄 আল্লাহ ভয়ের যোগ্য ও ক্ষমার অধিকারী


শেষোক্ত আয়াতদ্বয়ের ব্যাখ্যা আরও অধিক তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে দেখা যায় সম্মানিত ফেরেশতাগণও মানুষের উপর বিপদ-আপদ বর্ষিত হওয়ার মত দুর্যোগপূর্ণ বিষয়গুলি হ'তে মানুষকে অব্যাহতি দেয়ার জন্য করণাময় আল্লাহ্র নিকট দো'আ করেন, আল্লাহ সবার দো'আ শ্রবণ করেন, অতঃপর তাঁর সন্তুষ্টির বিষয়গুলি অনুমোদন করেন। সুতরাং মানুষকে আল্লাহ্ নিকট ক্ষমা লাভের জন্য অবশ্যই অতীব স্বচ্ছ হৃদয়ে সংগোপনে অশ্রুসজল নেত্রে দো'আ করতে হবে। আল্লাহ ক্ষমাশীল- এই বিশ্বাস নিয়েই স্বীয় হৃদয়কে ধৈর্যের উপর আবদ্ধ রেখে আশার প্রদীপ নিয়ে জীবন পাড়ি দিতে হবে। জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন। আমীন!!.
মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহ তা'আলা স্বীয় সন্তুষ্টি সাধনের পরিকল্পনায় মানব ও অসংখ্য প্রাণী সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তাঁর এই বিপুল প্রাণীজগতের সুবিধার্থে অসংখ্য বৃহৎ বস্তু হ'তে শুরু করে ক্রমান্বয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দৃশ্য ও অদৃশ্য বস্তু সৃষ্টি করেছেন। এরা সবাই নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের আনাচে- কানাচে একে অপরের পাশে বসবাস করছে। এরা অধিকাংশই একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে শান্তিপূর্ণ অবস্থানে বসবাস করে, কিন্তু কিছু সংখ্যক হিংস্র প্রাণী একে অপরকে আক্রমণ করে হত্যা করে ও ভক্ষণ করে। ফলে তারা পরস্পরে শত্রুতে পরিণত হয়ে যায় এবং এতে সবল বা শক্তিশালীরাই প্রাধান্য বিস্তার করে, দুর্বলরাই চিরকালের জন্য ভীতির শিকার হয়ে যায়।
এভাবে হাযার হাযার জীব-জানোয়ার বা পশু-পাখী, কীট-পতঙ্গ, জলজ প্রাণী প্রভৃতির দুর্বলরা সর্বদাই সবলদের ভয়ে ভীত থেকে আত্মরক্ষা করে চলে। সৃষ্টির সেরা মানব জাতির মধ্যেও দুর্বলরা সবলদের দাপটে ভীত, কম্পিত এবং আতংকিত থাকে। কারণ মানুষ শ্রেষ্ঠ প্রাণী হয়েও হিংস্রতায় অনেক সময় পশুকেও হার মানায়, এটা সবার জানা কথা। কিন্তু মানুষের এ হিংস্রতার পশ্চাতেও যে একজন অদ্বিতীয় ক্ষমতাধর (আল্লাহ) নিরীক্ষক আছেন, তা সর্বদা সবার মনে রাখা উচিত। তিনি স্বয়ং স্রষ্টা আল্লাহ তা'আলা। তিনি জীব জগতের সবার প্রতি সমান দয়াশীল, কৃপাশীল ও ক্ষমাশীল। তিনি কারো প্রতি কারো অন্যায়, অত্যাচার বা অবিচার পসন্দ করেন না এবং সহ্যও করেন না। তন্মধ্যে মানুষের বিষয়টি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। যেহেতু মানুষ হ'ল সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ, কাজেই তার আচরণও হবে শ্রেষ্ঠ। মানুষকে অবশ্যই ভাল আচার-আচরণের মধ্য দিয়ে আল্লাহ্র আদেশ সহ তাঁর ইবাদত-বন্দেগী করে যেতে হবে, কোন ক্রমেই স্বেচ্ছাচারিতা চলবে না।
জীবজগতে মানুষই জ্ঞানী হিসাবে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। কিন্তু পেশী শক্তির দিক দিয়ে বহু হিংস্র বন্যপ্রাণী এবং সমুদ্রে জলজপ্রাণী রয়েছে। যারা যে কোন মানুষকে বা শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী পণ্ডিতকেও অনায়াসে গ্রাস করতে সক্ষম। কিন্তু মহাজ্ঞানী আল্লাহ মানুষকে যে যৎসামান্য জ্ঞান প্রদান করেছেন, তার দ্বারাই মানুষ বড় বড় হিংস্র প্রাণী ও বিশাল আকৃতির (১৫০ একশত পঞ্চাশ মেট্রিক টন পর্যন্ত ওজনের নীল তিমি) জলজ প্রাণীকেও ধরতে সক্ষম। শুধু হিংস্র ও জলজ প্রাণীই নয়, বর্তমান বিজ্ঞানীরা তাঁদের অসাধারণ বুদ্ধিবলে যে সব মারণাস্ত্র তৈরী করছে, তা একান্তই বিস্ময়ের বিষয়! মানুষের তৈরী একটি অস্ত্র হাযার হাযার মানুষকে হত্যা ও হাযার হাযার মানুষকে ক্ষত-বিক্ষত ও পঙ্গু করে ফেলতে পারে নিমিষেই।
মানুষের ভাল-মন্দ, ন্যায়পরায়ণতা, বিদ্বেষ, প্রবৃত্তির স্বাধীনতা প্রভৃতির কথা অন্তর্যামী আল্লাহ তা'আলা ভালভাবেই জানেন। তিনি সব কিছুর ঊর্ধ্বে তাঁর মহোত্তম আদেশ, কুরআনের আদেশ-নিষেধ মেনে চলার জন্য মানব জাতির প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান। যারা মহিমাময় আল্লাহ্র অসামান্য নিদর্শন সমূহের প্রতি বিশ্বাসী তারা তাঁর আদেশ উপদেশের প্রতি শ্রদ্ধা- ভক্তি ও অকৃত্রিম বিশ্বাস নিয়ে আত্মসমর্পণ করে। অতঃপর ক্বিয়ামতের বিচারের ভয়াবহ বর্ণনায় এবং আল্লাহ্র অলৌকিক শক্তি ভাণ্ডারের সমন্বয়ে সংগঠিত আযাব ব্যবস্থা সম্পর্কে অবতীর্ণ অহিসমূহ প্রকৃত বান্দার হৃদয়ে অসম্ভব ভীতির উদ্রেক করে।
আল্লাহ তাঁর বিচার ব্যবস্থায় শান্তি ও শাস্তির বিশদ বিবরণ দিয়ে অসংখ্য অর্থপূর্ণ আয়াতসমূহ অবতীর্ণ করেছেন এবং সেগুলি ভীতি সহকারে গ্রহণ করে বিনীত চিত্তে মান্য করার উপদেশ দিয়েছেন। যারা আল্লাহ্ এই আদেশ একনিষ্ঠভাবে মনোযোগী হয়ে ভীতি সহকারে তা পালন করে তারা অবশ্যই কৃতকার্য হবে। কারণ আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন, ফলে তারা আশার আলো দেখতে পায়। পক্ষান্তরে যাদের অন্তরে ভীতির উদয় হয় না, তাদের প্রতি আল্লাহ অসন্তুষ্টই থাকেন। ফলে তারা নিরাশার অন্ধকারে পড়ে যায়। এই নিদারুণ সংকটময় পরিস্থিতি হ'তে পরিত্রাণের জন্যই আল্লাহ তা'আলা মানব সম্প্রদায়কে তাঁর সম্মানে ও ভয়ে কাজ করে যাওয়ার পুনঃ পুনঃ প্রত্যাদেশ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, هُوَ أَهْلُ التَّقْوَى وَأَهْلُ الْمَغْفِرَةِ 'তিনিই ভয়ের যোগ্য এবং ক্ষমার অধিকারী' (মুদ্দাচ্ছির ৭৪/৫৬)।
وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ 'আল্লাহকে ভয় কর! নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু' (হুজুরাত ৪৯/১২)।
ক্ষমা প্রার্থনার প্রতি মানবজাতিকে আকৃষ্ট করার প্রয়াসে কৃপাশীল আল্লাহ প্রত্যাদেশ করেন, وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا 'আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার পাপ মোচন করেন এবং তাকে মহাপুরস্কার দেন' (তালাক্ব ৬৫/১)।
আল্লাহ ঈমানদারগণকেও ক্ষমা প্রার্থনার জন্য উৎসাহিত করেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَلْ لَّكُمْ فُرْقَانًا وَيُكَفِّرْ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ
وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ
'হে ঈমানদারগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় করতে থাক, তবে তোমাদের মধ্যে ফায়ছালা করে দেবেন এবং তোমাদের থেকে তোমাদের পাপকে সরিয়ে দেবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন। বস্তুতঃ আল্লাহ মহা অনুগ্রহের অধিকারী' (আনফাল ৮/২৯)।
إِنَّ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ بِالْغَيْبِ لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ كَبِيرٌ 'নিশ্চয়ই যারা তাদের পালনকর্তাকে না দেখে ভয় করে, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার' (মুলক ৬৭/১২)।
উপরের আয়াতগুলিতে আল্লাহ তা'আলা, তাঁকে ভয় করে চলার বা কাজ করার জন্য তাঁর বান্দাগণকে সরল-সহজ ও কঠিনভাবে আহ্বান জানিয়েছেন। কারণ তিনি যে কোন সময় (ইহকালে) অপরাধী ব্যক্তিকে শাস্তি দিতে পারেন এবং ভবিষ্যতেও (পরকালে) দিবেন। আল্লাহ্র ঘোষিত এ শাস্তি মানুষ অনুভব করতে পারে না। যদিও ইহকালেই মানুষ হঠাৎ দুর্ঘটনায় পড়ে কেউ মৃত্যুবরণ করে, কেউ চক্ষু হারায়, কেউ হাত, পা, কান হারায় এবং আরও অধিক কষ্ট পায়। অবশ্য পরকালের শাস্তি স্বীয় বিশ্বাসের দ্বারা আবৃত। তাই অবিশ্বাসীরা সেটা কিছুই মনে করে না। তবে বিশ্বাসীরা ইহকালের শাস্তিকেও ভয় করে, পরকালের আযাবকে আরো ভয়াবহ মনে করে। ইহকালে দুর্ঘটনা কবলিত শাস্তিগুলিকে দুর্ঘটনার উপর দোষারোপ করা হয়। কিন্তু কোন মানুষ যখন রাস্তায় হাটতে হাটতে শুয়ে, বসে বা স্বাভাবিক অবস্থায় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের হানির শিকার হয়, তখন সঠিক জবাব দিতে ব্যর্থ হয়। অথচ উভয় শাস্তিই আল্লাহ সম্যক অবগত এবং তাঁরই অব্যর্থ পরীক্ষা।
পৃথিবীর বুকে অধিকাংশ মানুষই সর্বদাই ভয়ে ভীত থাকে, কেউ মৃত্যু ভয়ে, কেউ অসুস্থতার ভয়ে, কেউ শত্রুর ভয়ে, কেউ শক্তিশালী রাষ্ট্রের ভয়ে, কেউ হিংস্র প্রাণীর ভয়ে, কেউ মান-সম্মানের ভয়ে এবং আরও নানা প্রকার ভয়ে ভীত থাকে। দুনিয়ার সকল ভয়-ভীতির কথা চিন্তা করলে আল্লাহ্র ভীতির বিষয়টি সহজ হয়ে যাবে। কারণ সকল ভয়ের উৎসই হ'ল মরণ ও জীবন। জীবন যুদ্ধে মৃত্যুর হাত হ'তে যে কোনভাবে বেঁচে থেকে গৌরবময় জীবনযাপনই হ'ল সার্থক জীবন। আর সেজন্যই বড় বড় রাজা- বাদশাহ-প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীরা জীবনের নিরাপত্তার জন্য নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। কিন্তু জীবন ও মরণের স্রষ্টা ও মহানিয়ন্ত্রক হ'লেন স্বয়ং মহাক্ষমতার মালিক আল্লাহ। তাঁর পরিচালিত অভিযানের সামনে পৃথিবীর যে কোন শক্তি এমনকি সমস্ত পৃথিবীর সম্মিলিত শক্তিও এক মুহূর্ত দাঁড়াতে পারবে না। রাজা-মহারাজা, প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, সেনাধ্যক্ষ, জ্ঞানী- বিজ্ঞানী, পণ্ডিত সহ বড় বড় শক্তিধর এবং ক্ষুদ্র মানুষেরাও একইভাবে মৃত্যুর সম্মুখীন হবে। কোন বাধা বা প্রচেষ্টা একে ঠেকাতে পারবে না এবং তাতে এক মুহূর্তও এদিক ওদিক হবে না। এজন্যই আল্লাহ তাঁর একত্বের কথা বলেন, أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاتَّقُوْنِ 'কোন উপাস্য নেই। সুতরাং আমাকে ভয় কর' (নাহ'ল ১৬/২)। তিনি আরো বলেন, أَنَا رَبُّكُمْ فَاتَّقُوْنِ 'আমি তোমাদের প্রতিপালক, সুতরাং আমাকেই ভয় কর' (মুমিনূন ২৩/৫২)।
অন্যত্র তিনি বলেন, وَاتَّقُوْنِ يَا أُوْلِي الألْبَاب 'হে জ্ঞানীগণ! তোমরা আমাকেই ভয় কর' (বাক্বারাহ ২/১৯৭)।
তিনি আরও বলেন, وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُوْنَ 'আল্লাহকে ভয় কর, যাতে অনুগ্রহ লাভ করতে পার' (হুজুরাত ৪৯/১০)।
বস্তুতঃ বাস্তব জগতে ভয়ের শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন হচ্ছে ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, সুনামী, হ্যারিকেন, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদির মত আক্রমণ। বর্তমানে সারা বিশ্বে এগুলির আক্রমণ হ'তে আত্মরক্ষার জন্য পূর্ব সতর্কীকরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু সেগুলিকে প্রতিহত করার সাধ্য কারো নেই। কারণ এসব দুর্যোগ বিজ্ঞানীদের মতে প্রাকৃতিক কারণে সংঘটিত হয় বলা হ'লেও আল্লাহ্ বাণী ও বিধান মতে তাঁর হুকুম ছাড়া হয় না।
অবশ্য আলোচ্য গযবগুলি ইহকালীন জীবনের, পরকালের নয়। তবে পরকালের শাস্তি হ'তে আত্মরক্ষার জন্য আল্লাহ তা'আলা বহু আয়াত অবতীর্ণ করেছেন। যারা পরকালে বিশ্বাসী তারা আল্লাহ্র ভয়ে ভীত হয়ে কাজ করে পরিত্রাণ পেয়ে যাবে। আর যারা পরকালে অবিশ্বাসী তারা আল্লাহ্র বিচারে শাস্তিযোগ্য অপরাধী হবে এবং তাদের শাস্তি ইহকালীন ভূমিকম্প, সুনামী, সিডর প্রভৃতির সমষ্টি অপেক্ষাও বহুগুণে বেশী হবে, যা কল্পনাতীত।
সুতরাং ইহকালীন বা পরকালীন ভয়ঙ্কর কোন শাস্তিকেই ভয় না করে তার স্রষ্টা ও নিয়ন্ত্রক পরাক্রমশালী আল্লাহকেই ভয় করা উচিত। তিনি চান সৃষ্টির সকল বস্তু তাঁর পরিপূর্ণ আনুগত্যে সীমাবদ্ধ থাকুক। এই আনুগত্যের পরিসরকে ত্রুটিমুক্ত করার প্রয়াসে মহান আল্লাহ তাঁকে ভয় ও স্মরণ করার জন্য বান্দাদের পুনঃ পুনঃ আদেশ দান করেছেন। উপরোক্ত সংক্ষিপ্ত আয়াতগুলিতে তার মর্মার্থ প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
অতঃপর আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবীব (ছাঃ)-কে লক্ষ্য করে বলেন, قُلْ يَا عباد الَّذِيْنَ آمَنُوا اتَّقُوْا رَبَّكُمْ 'বলুন, হে আমার বিশ্বাসী বান্দাগণ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর' (যুমার ৩৯/১০)। অপর এক আয়াতে আল্লাহ বলেন, 'আপনি এ কুরআন দ্বারা তাদেরকে ভয় প্রদর্শন করুন, যারা আশঙ্কা করে স্বীয় পালনকর্তার কাছে এমতাবস্থায় একত্রিত হওয়া যে, তাদের কোন সাহায্যকারী ও সুপারিশকারী হবে না, যাতে তারা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে' (আন'আম ৬/৫১)।
অন্যত্র তিনি বলেন, 'হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর রাসূলদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। তিনি নিজ অনুগ্রহে দ্বিগুণ অংশ তোমাদেরকে দিবেন, তোমাদেরকে দিবেন জ্যোতি, যার সাহায্যে তোমরা চলবে এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়াময়' (হাদীদ ৫৭/২৮)।
ইসলাম ধর্মের প্রধান প্রতিপাদ্য হ'ল এক আল্লাহ্ ইবাদত, তাঁর প্রতি অকৃত্রিম ভয়-ভীতি, ভালবাসা, আত্মবিশ্বাস ও আত্মসমর্পণ। অতঃপর উম্মতে মুহাম্মাদীর কর্তব্য মহানবী (ছাঃ)-এর অকৃত্রিম অনুসরণ। এ দু'টি বিষয়ই পবিত্র কুরআনের সর্বাধিক আলোচিত বিষয়। যদি কেউ এর বিকল্প চিন্তা-ভাবনা করে তবে নিঃসন্দেহে সে অপূরণীয় ক্ষতিতে নিমজ্জিত হবে। অতএব এক আল্লাহ্র ইবাদত ও নবী করীম (ছাঃ)-এর যথাযথ অনুসরণ পূর্বক আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের পথে এগিয়ে যেতে হবে। এটা অনস্বীকার্য যে, আল্লাহ প্রদত্ত এই বিধান উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ। পরম করুণাময় আল্লাহ তা'আলা আমাদের প্রিয় রাসূল (ছাঃ)-কে অত্যন্ত ভালবাসতেন এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)ও তাঁর উম্মতকে অত্যন্ত ভালবাসতেন। এ প্রেক্ষাপটে নবী করীম (ছাঃ)-কে আশ্বস্ত করার প্রয়াসে মহান আল্লাহ বলেন, 'হে মুহাম্মাদ! আপনি বলে দিন, হে আমার (আল্লাহ্) বান্দারা, যারা নিজেদের উপর বাড়াবাড়ি করেছ তোমরা আল্লাহ্র রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গোনাহ মাফ করে দিবেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও করুণাময়' (যুমার ৩৯/৫৩)।
মহান আল্লাহ আরও বলেন, 'আর আমার অনুগ্রহ সকল বস্তুকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে' (আ'রাফ ৭/১৫৬)।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর উম্মতকে কত ভালবাসেন তার নমুনাস্বরূপ একটি হাদীছের উদ্ধৃতি দেয়া হ'ল। আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনে আছ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা নবী করীম (ছাঃ) ইবরাহীম (আঃ) সম্পর্কিত মহান আল্লাহ্ এ বাণী তেলাওয়াত করেন, 'হে আমার রব! এ মূর্তিগুলো বহু মানুষকে পথভ্রষ্ট করেছে। কাজেই যে ব্যক্তি আমার অনুসরণ করবে, সে তো আমারই' (ইবরাহীম ৩৬)। আর তিনি (মুহাম্মাদ ছাঃ) ঈসা (আঃ)-এর বাণী (যা কুরআনে আছে) তেলাওয়াত করেন, 'আপনি যদি তাদের শাস্তি দেন তাহ'লে (এ শাস্তি দেবার অধিকার আপনার আছে), কারণ তারা তো আপনারই বান্দা। আর আপনি যদি তাদের মাফ করে দেন, তাহ'লে (আপনি তাও করতে পারেন কারণ) আপনি তো মহাপরাক্রমশালী ও বিজ্ঞানময়। অতঃপর তিনি তাঁর দু'হাত উঠিয়ে বললেন, 'হে আল্লাহ! আমার উম্মত! আমার উম্মত!! এই বলে তিনি কেঁদে ফেললেন। মহামহিম আল্লাহ জিবরাঈলকে ডেকে বললেন, তুমি মুহাম্মাদের কাছে যাও এবং তাঁকে কাঁদার কারণ জিজ্ঞেস কর, তবে এ ব্যাপারে তোমার রব অবহিত আছেন। অতঃপর জিবরাঈল (আঃ) তাঁর কাছে উপস্থিত হ'লেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁকে যা বলার ছিল বলে দিলেন। এ ব্যাপারে তিনি (আল্লাহ) তো সবই জানেন। সুতরাং মহান আল্লাহ জিবরাঈলকে বললেন, তুমি মুহাম্মাদের কাছে গিয়ে বল, 'আমি আপনাকে উম্মতের ব্যাপারে সন্তুষ্ট করব, চিন্তাযুক্ত করব না' (মুসলিম)।
এ জগতে মানুষ, সামাজিক, বিবেকবান প্রাণী, সাধারণত হিংস্র নয়। মানুষ ব্যতীত অনেক নিরীহ প্রাণী আছে, আবার অনেক হিংস্র প্রাণীও রয়েছে, যারা সরাসরি মানুষকে হত্যা করে খায়। এ ধরনের হিংস্র জন্তুরা মানুষের বড় শত্রু এবং মানুষ এদেরকে ভয় করে। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে মানুষই

টিকাঃ
মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫৩১৩, 'কিতাবুর রিকাকু' ‘তাওয়াক্কুল করা ও ধৈর্য ধরা' অনুচ্ছেদ।
মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১৯০৩, 'কিতাবুয যাকাত'।
মুসলিম।

📘 আল্লাহ ক্ষমাশীল > 📄 আল্লাহ ক্ষমাশীল ও তওবা কবুলকারী

📄 আল্লাহ ক্ষমাশীল ও তওবা কবুলকারী


'তওবা' (توبة) আরবী শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ প্রত্যাবর্তন করা বা ফিরে আসা। ইসলামের বিধান মতে কোন ব্যক্তি তার দৈনন্দিন জীবনে ইচ্ছাকৃত, অনিচ্ছাকৃত বা ভুলবশতঃ পাপ কাজ করে ফেলে, নিজের ভুল বুঝতে পেরে তওবা করে সঠিক পথে ফিরে আসতে পারে। মানুষ মাত্রই ভুল করে বা ভুল হয়। মহান স্রষ্টা একথা সবচাইতে ভাল জানেন। তাই তাঁর প্রিয় মানব জাতিকে তিনি তওবা করা ও ক্ষমা পাওয়ার মত এক সুবর্ণ সুযোগ দান করেছেন।
আলোচনার শুরুতেই জেনেছি যে, আল্লাহ্র নিরানব্বইটি অপূর্ব সুন্দর নাম আছে। এ নামগুলির মধ্যে দয়াশীল ও ক্ষমাশীল সমগ্র মানব জাতির জন্য এক অনন্য আশীর্বাদ রূপে প্রতিষ্ঠিত। দয়া ও ক্ষমার বদৌলতে মানুষ এক পরম সুশিক্ষা লাভ করে এবং নিজেও অনেক সময় দয়া ও ক্ষমার মত মহৎ কাজের নমুনা প্রদর্শন করে থাকে। এরপরও ছোট-বড় ভুল, অন্যায় বা পাপ করা মানব জাতির সহজাত প্রবৃত্তি। প্রবৃত্তির তাড়নায় ও শয়তানের কু-প্ররোচনায় মানুষ সাধারণত ভুল-ত্রুটি করে থাকে। আমাদের আদি পিতা আদম (আঃ)ও শয়তানের মিথ্যা প্রতারণামূলক কথায়, আল্লাহ্র কথা ভুলে গিয়ে নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়ে ফেলেছিলেন। অতঃপর আদম (আঃ) ও বিবি হাওয়ার অনুতাপ ও কান্না বিজড়িত ক্ষমা প্রার্থনায় দয়াপরবশ হয়ে আল্লাহ তা'আলা তাঁদেরকে ক্ষমা করে দেন এবং পরবর্তীতে এরূপ ভুল না করার জন্য সাবধান করে দেন।
অতঃপর মানব জাতিকে দুনিয়ার বুকে ও পরকালে সুপ্রতিষ্ঠিত ও সম্মানিত করার জন্য তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ ক্ষমার ধারা বহাল রাখেন। অর্থাৎ আদম (আঃ)-এর পরবর্তী কালেও মানুষ ভুল করে বা পাপ করে আল্লাহ্ কাছে বিনীতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা বা তওবা করলে তিনি তাকে ক্ষমা করে দেবেন বলে বহু আয়াত অবতীর্ণ করেন। মহান আল্লাহ বলেন,
وَالَّذِينَ عَمِلُوا السَّيِّئَاتِ ثُمَّ تَابُوا مِنْ بَعْدِهَا وَآمَنُوا إِنَّ رَبَّكَ مِنْ بَعْدِهَا لَغَفُوْرٌ
رَّحِيمٌ
'আর যারা মন্দ কাজ করে, তারপরে তওবা করে নেয় এবং ঈমান নিয়ে আসে, তবে নিশ্চয়ই আপনার পরওয়ারদেগার তওবার পর অবশ্যই ক্ষমাকারী, করুণাময়' (আ'রাফ ৭/১৫৩)।
অন্যত্র আল্লাহ বলেন,
ثُمَّ إِنَّ رَبَّكَ لِلَّذِينَ عَمِلُوا السُّوْءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ تَابُوْا مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ وَأَصْلَحُوْا إِنَّ
رَبَّكَ مِنْ بَعْدِهَا لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ
'অনন্তর যারা অজ্ঞতাবশতঃ মন্দ কাজ করে, অতঃপর তওবা করে এবং নিজেকে সংশোধন করে নেয়, আপনার পালনকর্তা এসবের পরে তাদের জন্য অবশ্যই ক্ষমাশীল, দয়ালু' (নাহ'ল ১৬/১১৯)।
আল্লাহ আরো বলেন,
إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللَّهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُوْنَ السُّوْء بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوبُوْنَ مِنْ قَرِيب
فَأُولَئِكَ يَتُوبُ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا
'অবশ্যই আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করবেন, যারা ভুলবশতঃ মন্দ কাজ করে অতঃপর অনতিবিলম্বে তওবা করে, এরাই হ'ল সেসব লোক যাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, রহস্যবিদ' (নিসা ৪/১৭)।
وَمَنْ يَعْمَلْ سُوءًا أَوْ يَظْلِمْ نَفْسَهُ ثُمَّ يَسْتَغْفِرِ اللَّهَ
يَجِدِ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا 'যে গোনাহ করে বা নিজের অনিষ্ট করে, অতঃপর আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল, করুণাময় পায়' (নিসা ৪/১১০)।
তওবা ইসলামের বিধানভুক্ত আল্লাহ্র অনুগ্রহ লাভের একটি অন্যতম মাধ্যম। ধর্মের পাঁচটি মৌলিক বিষয়- কালেমা, ছালাত, ছিয়াম, যাকাত ও হজ্জ ছাড়াও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধান আছে, সেগুলিও ইবাদত বা ইবাদতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যেমন সত্য কথা বলা, হালাল উপার্জন ভক্ষণ করা, মানুষের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করা, পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ করা, দুর্বলকে সাহায্য করা, দান-খয়রাত করা, চেনা-অচেনা সকলকে সালাম দেয়া, দৈনন্দিন জীবনের জানা-অজানা ত্রুটির জন্য তওবা করা। তাছাড়া আরও অনেক ইসলামী বিধান আছে। আসলে কুরআন ও হাদীছের বাণী সমূহ দ্বারা বারবার প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের অত্যধিক ভালবাসেন। তাই বান্দা যেন তাঁর ভালবাসা হ'তে দূরে সরে না যায়। এমনকি অন্যায়-অত্যাচার, অবিচার, অপরাধ করেও পুনরায় আল্লাহ্র বিধানের দিকে ফিরে আসতে পারে, সেজন্যই তওবার বিধান রাখা হয়েছে।
উপরোল্লেখিত আয়াত সমূহের আলোকে বুঝা যায়, যারা দৈনন্দিন জীবনের সরল-সহজ পথে সতর্কতা অবলম্বনে ঐকান্তিকভাবে নিয়োজিত শুধু তাদের কাছেই তাড়াতাড়ি ভুল ধরা পড়ে। যেহেতু কোন মানুষই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়, তাই কোন সময় অজ্ঞতাবশত, কোন সময় অসাবধানতাবশত, কোন সময় অসচেতনতাবশতঃ আবার কোন সময় দৈবক্রমেও অন্যায়-অত্যাচার ও অবিচারের মত অপরাধ সংঘটিত হয়ে যায়। অতঃপর নিজের ভুল ও অপরাধ বুঝতে পেরে আত্মসমালোচনার প্রেক্ষাপটে ভ্রম সংশোধনের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহ্র শরণাপন্ন হয়ে তওবা করলে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। মানুষের অপরাধের সীমাবদ্ধতাও তিনি জানেন এবং তাঁর ক্ষমার সীমাবদ্ধতাও একমাত্র তিনিই জানেন। তবে তাঁর বৈচিত্র্যময় আয়াতগুলির বর্ণনায় আমরা বিস্ময়াভূত না হয়ে পারি না।
মহান আল্লাহ বলেন, 'যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে, তাদের হাত কেটে দাও, তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসাবে। এটা আল্লাহ্ পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারী। আল্লাহ পরাক্রান্ত, জ্ঞানময়। অতঃপর যে তওবা করে স্বীয় অত্যাচারের পর এবং সংশোধিত হয়, নিশ্চয়ই আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু। আপনি কি জানেন না যে, আল্লাহ্ নিমিত্তেই নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের রাজত্ব! তিনি যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন, যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান' (মায়েদাহ ৫/৩৮-৪০)।
অন্যত্র আল্লাহ বলেন, 'আমার বান্দাদের একদল বলত, হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি। অতএব আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করুন ও আমাদের প্রতি রহম করুন। আপনি তো দয়ালুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দয়ালু! (মুমিনূন ২৩/১০৯)।
মহান আল্লাহ আরও প্রত্যাদেশ করেন যে, 'তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের মনে যা আছে তা ভালই জানেন। যদি তোমরা সৎ হও, তবে তিনি তওবাকারীদের জন্য ক্ষমাশীল' (বণী ইসরাঈল ১৭/২৫)। অন্তর্যামী আল্লাহ তা'আলা মানুষের মনের অবস্থা সম্পর্কে সম্যক অবগত আছেন। কাজেই ইসলামের যে কোন বিধান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আত্মত্যাগ, আত্মশুদ্ধি, আত্মসমর্পণ ইত্যাদির গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলামে মিথ্যা ও কৃত্রিমতার কোন স্থান নেই। উপরের আয়াত কয়টিতে বিশেষ করে শেষোক্ত আয়াতে আল্লাহ তা'আলা তা সুস্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করে দিয়েছেন। অতঃপর ক্ষমাশীল আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রতি ও তাঁর রাসূলের প্রতি ধাবমান (কতিপয়) বান্দাদের প্রতি লক্ষ্য করে প্রত্যাদেশ করেন, 'যারা আমার নিদর্শনে বিশ্বাস করে তারা যখন আপনার কাছে আসে, তখন তাদেরকে আপনি বলুন, 'তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হৌক। তোমাদের প্রতিপালক দয়া করাকে তাঁর কর্তব্য বলে স্থির করেছেন। তোমাদের মধ্যে কেউ অজ্ঞানতাবশতঃ যদি খারাপ কাজ করে তারপর তওবা করে ও নিজেকে সংশোধন করে, তবে তো আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। এভাবে আমি আয়াত বিশদভাবে বর্ণনা করি যাতে অপরাধীদের সামনে পথ প্রকাশিত হয়' (আন'আম ৬/৫৪, ৫৫)।
বিশ্বাসীদের স্বপক্ষে আল্লাহ্র অসীম করুণার বাণী যা অবিশ্বাস্য মনে হয়, তা অব্যর্থ সত্য হিসাবে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, 'যারা আরশ ধারণ করে আছে আর চারপাশ ঘিরে আছে, তারা তাদের প্রতিপালকের পবিত্র মহিমা ঘোষণা করে ও তাঁর উপর বিশ্বাস করে এবং বিশ্বাসীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার দয়া ও জ্ঞান সর্বব্যাপী। অতএব যারা তওবা করে ও আপনার পথ অবলম্বন করে, আপনি তাদেরকে ক্ষমা করুন ও জাহান্নামের শাস্তি থেকে তাদের রক্ষা করুন' (মুমিন ৪০/৭)।
وَهُوَ الَّذِي يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَعْفُو عَنِ السَّيِّئَاتِ وَيَعْلَمُ مَا تَفْعَلُوْنَ 'তিনিই তাঁর বান্দাদের তওবা গ্রহণ করেন ও পাপ মোচন করেন। আর তোমরা যা কর, তিনি তা জানেন' (শূরা ৪২/২৫)।
অতঃপর নবী করীম (ছাঃ)-কেও (কোন কোন) বান্দার পক্ষে ক্ষমা প্রার্থনা অনুমতি দিয়ে প্রত্যাদেশ করেন যে, 'হে নবী! বিশ্বাসী নারীরা যখন আপনার কাছে আনুগত্যের শপথ করতে এসে বলে, তারা আল্লাহ্র সাথে কাউকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, নিজেদের সন্তানদের হত্যা করবে না, তাদের দু'হাত ও দু'পায়ের মধ্যে বানানো মিথ্যা অপবাদ নিয়ে আসবে না ও সৎ কাজে আপনাকে অমান্য করবে না, তখন আপনি তাদের আনুগত্য গ্রহণ করুন এবং তাদের জন্য আল্লাহ্ কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু' (মুমতাহিনা ৬০/১২)।
উপরের আয়াত কয়টি দ্বারা আল্লাহ তা'আলা তাঁর কতিপয় ধর্মমুখী অজ্ঞ, অসচেতন, নবী (ছাঃ)-এর প্রতি অনুরাগী ও অনুরূপ মনোভাবাপন্ন কিছু সরল-সহজ বান্দাদের ক্ষমা লাভের উপায় বর্ণনা করেছেন। অজ্ঞতাবশতঃ বা অনিচ্ছাকৃতভাবে কেউ কোন অপরাধ করলে, অতঃপর তা বুঝতে পেরে ক্ষমা প্রার্থনা করলে দয়াশীল আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। এদের জন্য ও অন্যান্য বিশ্বাসী বা আল্লাহ অভিমুখী বান্দাদের জন্য আল্লাহ্ আরশধারী ফেরেশতারাও ক্ষমা প্রার্থনা করেন। ফেরেশতারা জানেন এতে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন এবং তাঁর বান্দারাও এই ক্ষমার আওতাভুক্ত হওয়ার প্রতি আগ্রহী ও মনোযোগী হয়। এতদ্বতীত আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূল (ছাঃ)-কেও তাঁর (রাসূলের) প্রতি আনুগত্য পোষণকারী ও দৃঢ়চিত্তের নর-নারীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার নির্দেশ দেন। এভাবে মহাক্ষমাশীল আল্লাহ তা'আলা তাঁর ক্ষমার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বান্দাকে আশ্বস্ত করেছেন।
আল্লাহ্র দয়া ও ক্ষমার ভাণ্ডার অপরিসীম। আমাদের মহানবী (ছাঃ) এ সম্পর্কে বহু হাদীছ বর্ণনা করে গেছেন। উদাহরণ স্বরূপ নিম্নে দু'টি হাদীছ পেশ করা হ'ল।
(১) ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, একদা এক ব্যক্তি একটি স্ত্রীলোককে চুমু খেয়ে বসল। অতঃপর সে নবী করীম (ছাঃ)-এর কাছে এসে এ গুনাহের কথা ব্যক্ত করল। এ সময়ে আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত নাযিল করেন, 'আর দিনের দুই প্রান্তে ও রাতের কিছু অংশে ছালাত কায়েম কর। নিশ্চয়ই সৎকাজ সমূহ গুনাহের কাজ সমূহকে মুছে ফেলে’ (হৃদ ১১৪)। একথা শুনে লোকটি বলল, আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! এটা কি শুধু আমারই জন্য? তিনি বললেন, আমার সমস্ত উম্মতের জন্যই' (মুত্তাফাকু আলাইহ, মিশকাত হা/৫৬৬, 'ছালাত' অধ্যায়)।
(২) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা জনৈক ব্যক্তি নবী করীম (ছাঃ)-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! আমি তো শাস্তিযোগ্য অপরাধ করে ফেলেছি। সুতরাং আপনি আমার উপর সেই শাস্তি বাস্তবায়ন করুন। অতঃপর ছালাতের সময় উপস্থিত হ'লে সে রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে ছালাত পড়ল। ছালাত শেষ করে সে আবার বলল, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! আমি শাস্তিযোগ্য অপরাধ করে ফেলেছি। সুতরাং আপনি আমাকে কিতাবের বিধান অনুযায়ী শাস্তি দিন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি আমাদের সাথে ছালাতে উপস্থিত হয়েছিলে? সে বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তোমার গোনাহ তো মাফ হয়ে গেছে' (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫৬৭, 'ছালাত' অধ্যায়)।
পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের উপরোক্ত বাণীগুলি দ্বারা বান্দার প্রতি মহীয়ান, গরীয়ান আল্লাহ তা'আলার শ্রেষ্ঠতম অকৃত্রিম ভালবাসার নিদর্শন প্রকাশিত হয়েছে। বস্তুতপক্ষে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে অনেক আয়াত রয়েছে যা সকল ধর্মভীরু, আখেরাতমুখী বান্দার জন্য অনুশীলনযোগ্য। মহানবী (ছাঃ)-এর হাদীছগুলিও (একই বিষয়ে) বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এগুলি জ্ঞানীদের জীবনের সর্বোত্তম চাওয়া ও পাওয়ার উৎস স্থল। মহান আল্লাহ্ আহ্বানে কুরআন মান্যকারীরা নতমস্তকে বিনয়ীভাব পোষণ করে এবং সমস্ত সৃষ্টি জগতের প্রতিপালকের পবিত্রতা ও প্রশংসা সহ ফরয ইবাদতের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত ক্ষমা প্রার্থনা করে। যেহেতু ইসলাম হ'ল প্রেমের ধর্ম এবং মুসলমানরা তাদের ধর্মের প্রতি নিষ্ঠাবান। কাজেই তওবার জন্য ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ্ প্রেমের দ্বারা ক্ষমা ও অনুগ্রহ প্রার্থনা মহান আল্লাহ্ত্রই অন্যতম আদেশ।

টিকাঃ
আ'রাফ ৭/১৫৩।
নাহ'ল ১৬/১১৯।
নিসা ৪/১৭।
নিসা ৪/১১০।
মায়েদাহ ৫/৩৮-৪০।
মুমিনূন ২৩/১০৯।
বণী ইসরাঈল ১৭/২৫।
আন'আম ৬/৫৪, ৫৫।
মুমিন ৪০/৭।
শূরা ৪২/২৫।
মুমতাহিনা ৬০/১২।
মুত্তাফাকু আলাইহ, মিশকাত হা/৫৬৬, 'ছালাত' অধ্যায়।
মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫৬৭, 'ছালাত' অধ্যায়।

'তওবা' (توبة) আরবী শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ প্রত্যাবর্তন করা বা ফিরে আসা। ইসলামের বিধান মতে কোন ব্যক্তি তার দৈনন্দিন জীবনে ইচ্ছাকৃত, অনিচ্ছাকৃত বা ভুলবশতঃ পাপ কাজ করে ফেলে, নিজের ভুল বুঝতে পেরে তওবা করে সঠিক পথে ফিরে আসতে পারে। মানুষ মাত্রই ভুল করে বা ভুল হয়। মহান স্রষ্টা একথা সবচাইতে ভাল জানেন। তাই তাঁর প্রিয় মানব জাতিকে তিনি তওবা করা ও ক্ষমা পাওয়ার মত এক সুবর্ণ সুযোগ দান করেছেন।
আলোচনার শুরুতেই জেনেছি যে, আল্লাহ্র নিরানব্বইটি অপূর্ব সুন্দর নাম আছে। এ নামগুলির মধ্যে দয়াশীল ও ক্ষমাশীল সমগ্র মানব জাতির জন্য এক অনন্য আশীর্বাদ রূপে প্রতিষ্ঠিত। দয়া ও ক্ষমার বদৌলতে মানুষ এক পরম সুশিক্ষা লাভ করে এবং নিজেও অনেক সময় দয়া ও ক্ষমার মত মহৎ কাজের নমুনা প্রদর্শন করে থাকে। এরপরও ছোট-বড় ভুল, অন্যায় বা পাপ করা মানব জাতির সহজাত প্রবৃত্তি। প্রবৃত্তির তাড়নায় ও শয়তানের কু-প্ররোচনায় মানুষ সাধারণত ভুল-ত্রুটি করে থাকে। আমাদের আদি পিতা আদম (আঃ)ও শয়তানের মিথ্যা প্রতারণামূলক কথায়, আল্লাহ্র কথা ভুলে গিয়ে নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়ে ফেলেছিলেন। অতঃপর আদম (আঃ) ও বিবি হাওয়ার অনুতাপ ও কান্না বিজড়িত ক্ষমা প্রার্থনায় দয়াপরবশ হয়ে আল্লাহ তা'আলা তাঁদেরকে ক্ষমা করে দেন এবং পরবর্তীতে এরূপ ভুল না করার জন্য সাবধান করে দেন।
অতঃপর মানব জাতিকে দুনিয়ার বুকে ও পরকালে সুপ্রতিষ্ঠিত ও সম্মানিত করার জন্য তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ ক্ষমার ধারা বহাল রাখেন। অর্থাৎ আদম (আঃ)-এর পরবর্তী কালেও মানুষ ভুল করে বা পাপ করে আল্লাহ্ কাছে বিনীতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা বা তওবা করলে তিনি তাকে ক্ষমা করে দেবেন বলে বহু আয়াত অবতীর্ণ করেন। মহান আল্লাহ বলেন,
وَالَّذِينَ عَمِلُوا السَّيِّئَاتِ ثُمَّ تَابُوا مِنْ بَعْدِهَا وَآمَنُوا إِنَّ رَبَّكَ مِنْ بَعْدِهَا لَغَفُوْرٌ
رَّحِيمٌ
'আর যারা মন্দ কাজ করে, তারপরে তওবা করে নেয় এবং ঈমান নিয়ে আসে, তবে নিশ্চয়ই আপনার পরওয়ারদেগার তওবার পর অবশ্যই ক্ষমাকারী, করুণাময়' (আ'রাফ ৭/১৫৩)।
অন্যত্র আল্লাহ বলেন,
ثُمَّ إِنَّ رَبَّكَ لِلَّذِينَ عَمِلُوا السُّوْءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ تَابُوْا مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ وَأَصْلَحُوْا إِنَّ
رَبَّكَ مِنْ بَعْدِهَا لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ
'অনন্তর যারা অজ্ঞতাবশতঃ মন্দ কাজ করে, অতঃপর তওবা করে এবং নিজেকে সংশোধন করে নেয়, আপনার পালনকর্তা এসবের পরে তাদের জন্য অবশ্যই ক্ষমাশীল, দয়ালু' (নাহ'ল ১৬/১১৯)।
আল্লাহ আরো বলেন,
إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللَّهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُوْنَ السُّوْء بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوبُوْنَ مِنْ قَرِيب
فَأُولَئِكَ يَتُوبُ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا
'অবশ্যই আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করবেন, যারা ভুলবশতঃ মন্দ কাজ করে অতঃপর অনতিবিলম্বে তওবা করে, এরাই হ'ল সেসব লোক যাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, রহস্যবিদ' (নিসা ৪/১৭)।
وَمَنْ يَعْمَلْ سُوءًا أَوْ يَظْلِمْ نَفْسَهُ ثُمَّ يَسْتَغْفِرِ اللَّهَ يَجِدِ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا 'যে গোনাহ করে বা নিজের অনিষ্ট করে, অতঃপর আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল, করুণাময় পায়' (নিসা ৪/১১০)।
তওবা ইসলামের বিধানভুক্ত আল্লাহ্র অনুগ্রহ লাভের একটি অন্যতম মাধ্যম। ধর্মের পাঁচটি মৌলিক বিষয়- কালেমা, ছালাত, ছিয়াম, যাকাত ও হজ্জ ছাড়াও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধান আছে, সেগুলিও ইবাদত বা ইবাদতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যেমন সত্য কথা বলা, হালাল উপার্জন ভক্ষণ করা, মানুষের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করা, পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ করা, দুর্বলকে সাহায্য করা, দান-খয়রাত করা, চেনা-অচেনা সকলকে সালাম দেয়া, দৈনন্দিন জীবনের জানা-অজানা ত্রুটির জন্য তওবা করা। তাছাড়া আরও অনেক ইসলামী বিধান আছে। আসলে কুরআন ও হাদীছের বাণী সমূহ দ্বারা বারবার প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের অত্যধিক ভালবাসেন। তাই বান্দা যেন তাঁর ভালবাসা হ'তে দূরে সরে না যায়। এমনকি অন্যায়-অত্যাচার, অবিচার, অপরাধ করেও পুনরায় আল্লাহ্র বিধানের দিকে ফিরে আসতে পারে, সেজন্যই তওবার বিধান রাখা হয়েছে।
উপরোল্লেখিত আয়াত সমূহের আলোকে বুঝা যায়, যারা দৈনন্দিন জীবনের সরল-সহজ পথে সতর্কতা অবলম্বনে ঐকান্তিকভাবে নিয়োজিত শুধু তাদের কাছেই তাড়াতাড়ি ভুল ধরা পড়ে। যেহেতু কোন মানুষই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়, তাই কোন সময় অজ্ঞতাবশত, কোন সময় অসাবধানতাবশত, কোন সময় অসচেতনতাবশতঃ আবার কোন সময় দৈবক্রমেও অন্যায়-অত্যাচার ও অবিচারের মত অপরাধ সংঘটিত হয়ে যায়। অতঃপর নিজের ভুল ও অপরাধ বুঝতে পেরে আত্মসমালোচনার প্রেক্ষাপটে ভ্রম সংশোধনের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহ্র শরণাপন্ন হয়ে তওবা করলে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। মানুষের অপরাধের সীমাবদ্ধতাও তিনি জানেন এবং তাঁর ক্ষমার সীমাবদ্ধতাও একমাত্র তিনিই জানেন। তবে তাঁর বৈচিত্র্যময় আয়াতগুলির বর্ণনায় আমরা বিস্ময়াভূত না হয়ে পারি না।
মহান আল্লাহ বলেন, 'যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে, তাদের হাত কেটে দাও, তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসাবে। এটা আল্লাহ্ পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারী। আল্লাহ পরাক্রান্ত, জ্ঞানময়। অতঃপর যে তওবা করে স্বীয় অত্যাচারের পর এবং সংশোধিত হয়, নিশ্চয়ই আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু। আপনি কি জানেন না যে, আল্লাহ্ নিমিত্তেই নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের রাজত্ব! তিনি যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন, যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান' (মায়েদাহ ৫/৩৮-৪০)।
অন্যত্র আল্লাহ বলেন, 'আমার বান্দাদের একদল বলত, হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি। অতএব আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করুন ও আমাদের প্রতি রহম করুন। আপনি তো দয়ালুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দয়ালু! (মুমিনূন ২৩/১০৯)। মহান আল্লাহ আরও প্রত্যাদেশ করেন যে, 'তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের মনে যা আছে তা ভালই জানেন। যদি তোমরা সৎ হও, তবে তিনি তওবাকারীদের জন্য ক্ষমাশীল' (বণী ইসরাঈল ১৭/২৫)। অন্তর্যামী আল্লাহ তা'আলা মানুষের মনের অবস্থা সম্পর্কে সম্যক অবগত আছেন। কাজেই ইসলামের যে কোন বিধান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আত্মত্যাগ, আত্মশুদ্ধি, আত্মসমর্পণ ইত্যাদির গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলামে মিথ্যা ও কৃত্রিমতার কোন স্থান নেই। উপরের আয়াত কয়টিতে বিশেষ করে শেষোক্ত আয়াতে আল্লাহ তা'আলা তা সুস্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করে দিয়েছেন। অতঃপর ক্ষমাশীল আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রতি ও তাঁর রাসূলের প্রতি ধাবমান (কতিপয়) বান্দাদের প্রতি লক্ষ্য করে প্রত্যাদেশ করেন, 'যারা আমার নিদর্শনে বিশ্বাস করে তারা যখন আপনার কাছে আসে, তখন তাদেরকে আপনি বলুন, 'তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হৌক। তোমাদের প্রতিপালক দয়া করাকে তাঁর কর্তব্য বলে স্থির করেছেন। তোমাদের মধ্যে কেউ অজ্ঞানতাবশতঃ যদি খারাপ কাজ করে তারপর তওবা করে ও নিজেকে সংশোধন করে, তবে তো আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। এভাবে আমি আয়াত বিশদভাবে বর্ণনা করি যাতে অপরাধীদের সামনে পথ প্রকাশিত হয়' (আন'আম ৬/৫৪, ৫৫)।
বিশ্বাসীদের স্বপক্ষে আল্লাহ্র অসীম করুণার বাণী যা অবিশ্বাস্য মনে হয়, তা অব্যর্থ সত্য হিসাবে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, 'যারা আরশ ধারণ করে আছে আর চারপাশ ঘিরে আছে, তারা তাদের প্রতিপালকের পবিত্র মহিমা ঘোষণা করে ও তাঁর উপর বিশ্বাস করে এবং বিশ্বাসীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার দয়া ও জ্ঞান সর্বব্যাপী। অতএব যারা তওবা করে ও আপনার পথ অবলম্বন করে, আপনি তাদেরকে ক্ষমা করুন ও জাহান্নামের শাস্তি থেকে তাদের রক্ষা করুন' (মুমিন ৪০/৭)।
وَهُوَ الَّذِي يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَعْفُو عَنِ السَّيِّئَاتِ وَيَعْلَمُ مَا تَفْعَلُوْنَ 'তিনিই তাঁর বান্দাদের তওবা গ্রহণ করেন ও পাপ মোচন করেন। আর তোমরা যা কর, তিনি তা জানেন' (শূরা ৪২/২৫)। অতঃপর নবী করীম (ছাঃ)-কেও (কোন কোন) বান্দার পক্ষে ক্ষমা প্রার্থনা অনুমতি দিয়ে প্রত্যাদেশ করেন যে, 'হে নবী! বিশ্বাসী নারীরা যখন আপনার কাছে আনুগত্যের শপথ করতে এসে বলে, তারা আল্লাহ্র সাথে কাউকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, নিজেদের সন্তানদের হত্যা করবে না, তাদের দু'হাত ও দু'পায়ের মধ্যে বানানো মিথ্যা অপবাদ নিয়ে আসবে না ও সৎ কাজে আপনাকে অমান্য করবে না, তখন আপনি তাদের আনুগত্য গ্রহণ করুন এবং তাদের জন্য আল্লাহ্ কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু' (মুমতাহিনা ৬০/১২)।
উপরের আয়াত কয়টি দ্বারা আল্লাহ তা'আলা তাঁর কতিপয় ধর্মমুখী অজ্ঞ, অসচেতন, নবী (ছাঃ)-এর প্রতি অনুরাগী ও অনুরূপ মনোভাবাপন্ন কিছু সরল-সহজ বান্দাদের ক্ষমা লাভের উপায় বর্ণনা করেছেন। অজ্ঞতাবশতঃ বা অনিচ্ছাকৃতভাবে কেউ কোন অপরাধ করলে, অতঃপর তা বুঝতে পেরে ক্ষমা প্রার্থনা করলে দয়াশীল আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। এদের জন্য ও অন্যান্য বিশ্বাসী বা আল্লাহ অভিমুখী বান্দাদের জন্য আল্লাহ্ আরশধারী ফেরেশতারাও ক্ষমা প্রার্থনা করেন। ফেরেশতারা জানেন এতে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন এবং তাঁর বান্দারাও এই ক্ষমার আওতাভুক্ত হওয়ার প্রতি আগ্রহী ও মনোযোগী হয়। এতদ্বতীত আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূল (ছাঃ)-কেও তাঁর (রাসূলের) প্রতি আনুগত্য পোষণকারী ও দৃঢ়চিত্তের নর-নারীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার নির্দেশ দেন। এভাবে মহাক্ষমাশীল আল্লাহ তা'আলা তাঁর ক্ষমার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বান্দাকে আশ্বস্ত করেছেন।
আল্লাহ্র দয়া ও ক্ষমার ভাণ্ডার অপরিসীম। আমাদের মহানবী (ছাঃ) এ সম্পর্কে বহু হাদীছ বর্ণনা করে গেছেন। উদাহরণ স্বরূপ নিম্নে দু'টি হাদীছ পেশ করা হ'ল।
(১) ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, একদা এক ব্যক্তি একটি স্ত্রীলোককে চুমু খেয়ে বসল। অতঃপর সে নবী করীম (ছাঃ)-এর কাছে এসে এ গুনাহের কথা ব্যক্ত করল। এ সময়ে আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত নাযিল করেন, 'আর দিনের দুই প্রান্তে ও রাতের কিছু অংশে ছালাত কায়েম কর। নিশ্চয়ই সৎকাজ সমূহ গুনাহের কাজ সমূহকে মুছে ফেলে’ (হৃদ ১১৪)। একথা শুনে লোকটি বলল, আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! এটা কি শুধু আমারই জন্য? তিনি বললেন, আমার সমস্ত উম্মতের জন্যই' (মুত্তাফাকু আলাইহ, মিশকাত হা/৫৬৬, 'ছালাত' অধ্যায়)।
(২) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা জনৈক ব্যক্তি নবী করীম (ছাঃ)-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! আমি তো শাস্তিযোগ্য অপরাধ করে ফেলেছি। সুতরাং আপনি আমার উপর সেই শাস্তি বাস্তবায়ন করুন। অতঃপর ছালাতের সময় উপস্থিত হ'লে সে রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে ছালাত পড়ল। ছালাত শেষ করে সে আবার বলল, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! আমি শাস্তিযোগ্য অপরাধ করে ফেলেছি। সুতরাং আপনি আমাকে কিতাবের বিধান অনুযায়ী শাস্তি দিন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি আমাদের সাথে ছালাতে উপস্থিত হয়েছিলে? সে বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তোমার গোনাহ তো মাফ হয়ে গেছে' (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫৬৭, 'ছালাত' অধ্যায়)।
পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের উপরোক্ত বাণীগুলি দ্বারা বান্দার প্রতি মহীয়ান, গরীয়ান আল্লাহ তা'আলার শ্রেষ্ঠতম অকৃত্রিম ভালবাসার নিদর্শন প্রকাশিত হয়েছে। বস্তুতপক্ষে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে অনেক আয়াত রয়েছে যা সকল ধর্মভীরু, আখেরাতমুখী বান্দার জন্য অনুশীলনযোগ্য। মহানবী (ছাঃ)-এর হাদীছগুলিও (একই বিষয়ে) বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এগুলি জ্ঞানীদের জীবনের সর্বোত্তম চাওয়া ও পাওয়ার উৎস স্থল। মহান আল্লাহ্ আহ্বানে কুরআন মান্যকারীরা নতমস্তকে বিনয়ীভাব পোষণ করে এবং সমস্ত সৃষ্টি জগতের প্রতিপালকের পবিত্রতা ও প্রশংসা সহ ফরয ইবাদতের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত ক্ষমা প্রার্থনা করে। যেহেতু ইসলাম হ'ল প্রেমের ধর্ম এবং মুসলমানরা তাদের ধর্মের প্রতি নিষ্ঠাবান। কাজেই তওবার জন্য ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ্ প্রেমের দ্বারা ক্ষমা ও অনুগ্রহ প্রার্থনা মহান আল্লাহ্ত্রই অন্যতম আদেশ।

টিকাঃ
(আ'রাফ ৭/১৫৩)।
(নাহ'ল ১৬/১১৯)।
(নিসা ৪/১৭)।
(নিসা ৪/১১০)।
(মায়েদাহ ৫/৩৮-৪০)।
(মুমিনূন ২৩/১০৯)।
(বণী ইসরাঈল ১৭/২৫)।
(আন'আম ৬/৫৪, ৫৫)।
(মুমিন ৪০/৭)।
(শূরা ৪২/২৫)।
(মুমতাহিনা ৬০/১২)।
(মুত্তাফাকু আলাইহ, মিশকাত হা/৫৬৬, 'ছালাত' অধ্যায়)।
(মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫৬৭, 'ছালাত' অধ্যায়)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00