📄 আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়
আল্লাহ তায়ালার নামসমূহের একটি হলো ‘আলিম’। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা জানেন যা অতীতে হয়েছে, বর্তমানে হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে হবে। যিনি জানেন তার সৃষ্টিজগতের সকল গোপন ও প্রকাশ্য বিষয়সমূহ। যিনি জানেন মানুষের ঈমান ও কুফর, জানেন তাদের সকল প্রকার কল্যাণ ও অকল্যাণ।
عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ
‘তিনি অন্তরের বিষয়াদি জানেন।’ ¹⁰³
ইমাম সাদি বলেন, ‘আলিম’ হলেন ওই সত্তা যিনি বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ, প্রকাশ্য ও গোপন, ঊর্ধ্ব জগত, নিম্ন জগত, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সবকিছু সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান রাখেন। কোনোকিছুই তার ইলমের বাহিরে নয়।’
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ ۖ مَا يَكُونُ مِن نَّجْوَىٰ ثَلَاثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ وَلَا خَمْسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُهُمْ وَلَا أَدْنَىٰ مِن ذَٰلِكَ وَلَا أَكْثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمْ أَيْنَ مَا كَانُوا ۖ ثُمَّ يُنَبِّئُهُم بِمَا عَمِلُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ ۚ إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
‘তুমি কি দেখোনা, আসমান ও জমিনে যা-কিছু আছে আল্লাহ তা জানেন? যে কোনো তিনজনের গোপন কথা হলে তিনি থাকেন তাদের মাঝে চতুর্থ জন এবং পাঁচজনের হলে তিনি থাকেন তাদের মাঝে ষষ্ঠজন। আবার এর চেয়ে কম কিংবা বেশি জনের হলেও তারা যেখানেই থাকুক, তিনি তাদের সঙ্গে থাকেন। অতঃপর কেয়ামতের দিন তিনি তাদের কাজের ফলাফল তাদের জানিয়ে দিবেন। আল্লাহ সবকিছুই অবগত। ¹⁰⁴
وَهُوَ الَّذِي يَتَوَفَّاكُم بِاللَّيْلِ وَيَعْلَمُ مَا جَرَحْتُم بِالنَّهَارِ ثُمَّ يَبْعَثُكُمْ فِيهِ لِيُقْضَى أَجَلٌ مُّسَمًّى ثُمَّ إِلَيْهِ مَرْجِعُكُمْ ثُمَّ يُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ، وَهُوَ الْقَاهِرُ فَوْقَ عِبَادِهِ وَيُرْسِلُ عَلَيْكُم حَفَظَةٌ حَتَّى إِذَا جَاء أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ تَوَفَّتْهُ رُسُلُنَا وَهُمْ لَا يُفَرِّطُونَ، ثُمَّ رُدُّوا إِلَى اللَّهِ مَوْلَاهُمُ الْحَقِّ أَلَا لَهُ الْحُكْمُ وَهُوَ أَسْرَعُ الْحَاسِبِينَ.
'তিনিই রাতে তোমাদের প্রাণহীন করেন। আর দিনে তোমরা যা-কিছু করছো তাও জানেন। অতঃপর দিনে তিনি তোমাদের জাগ্রত করেন, যাতে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ পূর্ণ হয়। তারপর তারই কাছে তোমাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর তোমরা যা-কিছু করেছিলে তিনি তোমাদের তা অবহিত করবেন। ¹⁰⁵
টিকাঃ
১০৩. সুরা মুলক: ১৩।
১০৪. সুরা মুজাদালা: ৭।
১০৫. সুরা আনআম: ৬০।
📄 হৃদয়ে আল্লাহর নামসমূহের প্রভাব
এগুলো আল্লাহর পবিত্র নামসমূহ থেকে কতিপয় নাম। কিন্তু কোথায় আমাদের জীবনে এসবের প্রভাব? কেন আল্লাহর পবিত্র নামের প্রভাব আমাদের জীবনে পড়ে না? কেন আমরা আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করি না। তিনি আমাদের সকল কিছু দেখেন, সকল কিছু জানেন, সকল কিছু শোনেন; তবুও আমরা অন্যায় ও নাফরমানি থেকে বেঁচে থাকি না। কোথায় আমাদের ঈমান। কোথায় আমাদের লেনদেন ও ইবাদতের মধ্যে ইহসান?
যদি প্রকৃতার্থেই মুমিন হয়ে থাকো তাহলে নির্জনে, একাকী, গোপনে ও প্রকাশ্যে সকল প্রকার অন্যায় ও পাপাচার থেকে বিরত থাকো। ঈমান কেবল বাহ্যিকতার নাম নয়। শুধু দুই রাকাত নামাজ বা দিনের বেলা রোজা রাখার নামই ঈমান নয়। ঈমান হলো, অন্তরের চেষ্টা ও মুজাহাদার নাম। সকল ফরজ, ওয়াজিব পালন করার নাম। সকল হারাম ও নাজায়েজ থেকে সর্বতোভাবে বেঁচে থাকার নাম।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى، فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى
'যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সামনে দাঁড়ানোকে ভয় পায় এবং নিজেকে প্রবৃত্তির (অনুসরণ) থেকে বিরত রাখে তার ঠিকানা হলো জান্নাত।'¹⁰⁶
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, সাত প্রকার ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন আরশের ছায়াতলে জায়গা দেবেন। সেদিন আরশের ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া থাকবে না। সাত প্রকার ব্যক্তির মধ্যে এক প্রকার হলো, যারা একাকী গোপনে আল্লাহর জিকির করে এবং তাদের চোখ অশ্রুসজল হয়। আরেক প্রকার হলো, যাকে কোনো সুন্দরী ও সম্ভ্রান্ত বংশের মহিলা অন্যায় কাজের জন্য ডেকেছে কিন্তু সে তাতে সাড়া না দিয়ে বলেছে, আমি আল্লাহকে ভয় করি। সে বলল আমি আল্লাহকে ভয় করি।
হযরত আবু জর রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুরা দাহর থেকে তিলাওয়াত করছিলেন,
هَلْ أَتَى عَلَى الْإِنسَانِ حِينٌ مِّنَ الدَّهْرِ لَمْ يَكُن شَيْئاً مَّذْكُوراً
'মানুষের ওপর কি এমন কিছু সময় অতিবাহিত হয়েছে যখন সে কোনো উল্লেখযোগ্য বস্তু ছিল না?'¹⁰⁷
সুরার শুরু থেকে পড়তে পড়তে পূর্ণ সুরা পড়ে শেষ করলেন। অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি যা দেখি তোমরা তা দেখো না। আমি যা শ্রবণ করি তোমরা তা শ্রবণ করো না। আল্লাহর কসম! আমি যা জানি তা যদি তোমরা জানতে তাহলে কম হাসতে এবং কাঁদতে বেশি।'
কিয়ামতের দিন গোনাহগার ও পাপাচারীরা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে। সেদিন তারা চূড়ান্তভাবে অপদস্থ হবে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
الْيَوْمَ نَخْتِمُ عَلَى أَفْوَاهِهِمْ وَتُكَلِّمُنَا أَيْدِيهِمْ وَتَشْهَدُ أَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
'আজ আমি তাদের মুখে মোহর মেরে দেব। তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে এবং তাদের পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে। ¹⁰⁸
সুতরাং তোমরা ভয় করো সে দিনকে যেদিন তোমাদের কেউ থাকবে না। থাকবে না কোনো আপনজন। তোমাদের থাকবে না কোনো ক্ষমতা। থাকবে না কোনো প্রভাব-প্রতিপত্তি। থাকবে না কোনো সম্পদ। সেদিন তোমরা হবে চূড়ান্ত অসহায়। সেদিন আল্লাহ তায়ালার দয়া ও করুণা ছাড়া আর কিছুই থাকবে না। সেদিন আল্লাহ কতক মানুষকে সম্মানিত করবেন। কতক মানুষকে তার আরশের ছায়ার নিচে আশ্রয় দিবেন। কতক মানুষকে তিনি করবেন লাঞ্ছিত ও অপদস্থ। সেদিন মানুষ হবে চূড়ান্ত অসহায়। হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা ভয় করো কিয়ামতের বিভীষিকাময় দিনকে। হে আল্লাহর বান্দাগণ! আমি তোমাদের কীভাবে বোঝাবো? কীভাবে বোঝাবো আমি তোমাদের? আমার হৃদয় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা ফিরে এসো আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার দিকে। তিনি তোমাদের সবকিছু দেখছেন, শুনছেন এবং পর্যবেক্ষণ করছেন। তোমরা কেউ তার নিয়ন্ত্রণের বাহিরে নও। কিয়ামতের দিন তোমাদের প্রতিটি কাজকর্মের হিসাব দিতে হবে। সেদিন প্রতিটি কাজের হিসাব ব্যতীত এক কদম সামনে এগুতে পারবে না। হে আল্লাহর বান্দা! সেদিন যে ব্যক্তি সফল সেই প্রকৃত সফল। তার চেয়ে সৌভাগ্যবান আর কেউ নেই। কিন্তু সেদিন যে ব্যর্থ হবে তার চেয়ে দুর্ভাগা আর কেউ নেই। আল্লাহর কসম! তার চেয়ে দুর্ভাগা আর কেউ নেই।
হে আল্লাহর বান্দারা! ফিরে এসো। ফিরে এসো তোমাদের রবের দিকে। তিনি ছাড়া আর কেউ নেই। তোমার মুরাকাবায় আল্লাহ আল্লাহ। তোমার ধ্যানে আল্লাহ আল্লাহ। তোমার গোপনে আল্লাহ আল্লাহ। তোমার প্রকাশ্যে আল্লাহ আল্লাহ। তোমার নিয়তে আল্লাহ আল্লাহ। তোমার কাজে আল্লাহ আল্লাহ। কেবলই আল্লাহ আল্লাহ। জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ও আরাধ্য হবে আল্লাহ। তার অনুসরণ, তার আনুগত্য এবং তার সন্তুষ্টি অর্জনই হবে মুমিনের সকল সাধনার কেন্দ্রবিন্দু।
الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ، وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ، إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
'যিনি তোমাকে দেখতে পান যখন তুমি নামাজে দাঁড়াও এবং দেখতে পান সিজদাকারীদের সাথে তোমার ওঠা-বসা। নিশ্চয় তিনি সবকিছু শোনেন, সবকিছু দেখেন। '¹⁰⁹
فَمَا لَهُمْ عَنِ التَّذْكِرَةِ مُعْرِضِينَ، كَأَنَّهُمْ حُمُرٌ مُّسْتَنفِرَةٌ، فَرَّتْ مِن قَسْوَرَةٍ، بَلْ يُرِيدُ كُلُّ امْرِئٍ مِّنْهُمْ أَن يُؤْتَى صُحُفاً مُّنَشَّرَةٌ، كَلَّا بَل لَا يَخَافُونَ الْآخِرَةَ، كَلَّا إِنَّهُ تَذْكِرَةٌ، فَمَن شَاء ذَكَرَهُ، وَمَا يَذْكُرُونَ إِلَّا أَن يَشَاءَ اللَّهُ هُوَ أَهْلُ التَّقْوَى وَأَهْلُ الْمَغْفِرَةِ
'তাদের কী হয়েছে যে, তারা উপদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়? যেন তারা ভয় পেয়ে পলায়নকারী গাধা। যারা কোনো সিংহের ভয়ে পালিয়ে এসেছে। বরং তাদের প্রত্যেকেই চায় যে, তাকে উন্মুক্ত আসমানি কিতাব দেওয়া হোক। কখনো নয়, আসলে তারা পরকালকে ভয় করে না। কখনো নয়, নিশ্চয় এটি একটি উপদেশ। অতএব, যে চায় সে যেন এ থেকে উপদেশ গ্রহণ করে। তবে আল্লাহ চাইলেই কেবল তারা উপদেশ গ্রহণ করবে। তিনি ভয় করার হকদার ও ক্ষমার মালিক। '¹¹⁰
হে আল্লাহর বান্দা! কোন শরীর নিয়ে তুমি আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে? কোন মুখে তুমি আল্লাহর সম্মুখে তোমার কৃতকর্মের হিসাব দেবে? আখেরাতের কঠিন শাস্তি থেকে মুক্তিলাভের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো। জেনে রেখো, আখেরাতের শাস্তি অত্যন্ত কঠিন ও ভয়াবহ। এর থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো, আল্লাহর আনুগত্য করা। অন্তরে তাকওয়া এবং খোদাভীতি সৃষ্টি করা।
টিকাঃ
১০۶. সুরা নাযিআত: ৪০।
১০৭. সুরা দাহর: ১।
১০৮. সুরা ইয়াসিন: ৬৫।
১০৯. সুরা শুয়ারা: ২১৮।
১১০. সুরা মুদ্দাছছির: ৪৮-৫৬।