📘 আল্লাহ আপনাকে দেখছেন > 📄 আল্লাহ শ্রবণ করছেন আপনার কথা

📄 আল্লাহ শ্রবণ করছেন আপনার কথা


আল্লাহ তায়ালার পবিত্র ও গুণবাচক নামসমূহের একটি হলো, 'সামিউন'। অর্থাৎ তিনি ঐ সত্তা যিনি তার বান্দাদের যাবতীয় কিছু শ্রবণ করেন। গোপন-প্রকাশ্য, দৃশ্য-অदृश्य কোনোকিছু তার শ্রবণের বাহিরে নয়。

رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
'হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদের কবুল করে নিন। নিশ্চয় আপনি সবকিছু শোনেন ও জানেন।' ⁹²

إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ
'নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।' ⁹³

إِنَّهُ سَمِيعٌ قَرِيبٌ
'নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও নিকটবর্তী। ⁹⁴

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকল কথা শোনেন। আমাদের কথার উত্তর প্রদান করেন। সমগ্র সৃষ্টিজগতের কথা তিনি শ্রবণ করেন। তাদের নড়াচড়া, তাদের গোপন ও প্রকাশ্য কথা সবকিছু তিনি শ্রবণ করেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,

سَوَاء مِّنكُم مَّنْ أَسَرَّ الْقَوْلَ وَمَن جَهَرَ بِهِ وَمَنْ هُوَ مُسْتَخْفِ بِاللَّيْلِ وَسَارِبُ بِالنَّهَارِ، لَهُ مُعَقِّبَاتٌ مِّن بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ يَحْفَظُونَهُ مِنْ أَمْرِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ وَإِذَا أَرَادَ اللَّهِ بِقَوْمٍ سُوءاً فَلَا مَرَدَّ لَهُ وَمَا لَهُم مِّن دُونِهِ مِن وَالِ، هُوَ الَّذِي يُرِيكُمُ الْبَرْقَ خَوْفًا وَطَمَعاً وَيُنْشِئُ السَّحَابَ الثَّقَالَ، وَيُسَبِّحُ الرَّعْدُ بِحَمْدِهِ وَالْمَلَائِكَةُ مِنْ خِيفَتِهِ وَيُرْسِلُ الصَّوَاعِقَ فَيُصِيبُ بِهَا مَن يَشَاءُ وَهُمْ يُجَادِلُونَ فِي اللَّهُ وَهُوَ شَدِيدُ الْمِحَالِ
'তোমাদের মধ্যে যে কথা গোপন করে আর যে তা প্রকাশ করে এবং রাতে লুকিয়ে থাকে আর যে দিনে অবাধে বিচরণ করে তার কাছে সবাই সমান। মানুষের জন্য তার সামনে ও পেছনে রয়েছে একের-পর-এক আগমনকারী ফেরেশতাবৃন্দ তারা আল্লাহর নির্দেশে তাকে পাহারা দিয়ে রাখে। আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। আর আল্লাহ যখন কোনো জনগোষ্ঠীকে শাস্তি দিতে চান তখন কেউ তা ফেরাতে পারে না। তিনি ছাড়া তাদের কোনো বন্ধু নেই। তিনিই ভয় ও আশা সঞ্চার করার জন্য তোমাদের বিজলি দেখান এবং তিনিই ভারী মেঘমালা সৃষ্টি করেন। তিনি পৃথিবীতে বজ্রপাত করেন এবং এর দ্বারা যাকে চান তাকে আঘাত করেন। তবুও তারা আল্লাহ সম্পর্কে বিতর্ক করে, অথচ তিনি প্রচণ্ড প্রতাপশালী।'⁹⁵

একবার জনৈক মহিলা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে তার স্বামীর ব্যাপারে অভিযোগ করে বলল, আমার স্বামী আমাকে

أنت علي كظهر أمي
'তুমি আমার মায়ের পিঠের মতো' বলেছে। ⁹⁶ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুস্পষ্ট ভাষায় মহিলাকে এর হুকুম বলে দিলেন। আল্লাহর শপথ! তুমি তার ওপর হারাম হয়ে গেছ। মহিলা বলল, আপনি আল্লাহর নিকট সুপারিশ করুন। আমার একটি কোলের শিশু রয়েছে। তাকে যদি তাদের নিকট পাঠিয়ে দিই তাহলে নষ্ট হয়ে যাবে। আর যদি আমার নিকট রাখি তাহলে তারা ক্ষুধার্ত থাকবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর শপথ! সে তোমার জন্য হারাম হয়ে গেছে। উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা রা. বলেন, আল্লাহর শপথ! আমার ও সে মহিলার মাঝে ব্যবধান ছিল একটি পর্দা। আমি তার কিছু শ্রবণ করেছি এবং কিছু কথা আমার নিকট অস্পষ্ট ছিল। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা আয়াত অবতীর্ণ করেন।

قَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّتِي تُجَادِلُكَ فِي زَوْجِهَا وَتَشْتَكِي إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ يَسْمَعُ تَحَاوُرَكُمَا إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ ، الَّذِينَ يُظَاهِرُونَ مِنكُم مِّن نِّسَائِهِم مَّا هُنَّ أُمَّهَاتِهِمْ إِنْ أُمَّهَاتُهُمْ إِلَّا اللَّائِي وَلَدْنَهُمْ وَإِنَّهُمْ لَيَقُولُونَ مُنكَراً مِّنَ الْقَوْلِ وَزُوراً وَإِنَّ اللَّهَ لَعَفُوٌّ غَفُورُ
'যে মহিলা তার স্বামী সম্বন্ধে আপনার সাথে বাদানুবাদ করছে এবং আল্লাহর নিকট অভিযোগ পেশ করছে আল্লাহ তার কথা শুনেছেন। আল্লাহ তোমাদের দুজনের কথাবার্তাই শুনছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু শোনেন, সবকিছু দেখেন। তোমাদের মধ্যে যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে যিহার করে তারা তাদের মা নয়। তাদের মা তো তারাই যারা তাদের জন্মদান করেছে। বস্তুত তারা এক জঘন্য কথা আর মিথ্যা বলে থাকে। আল্লাহ মার্জনাকারী ও ক্ষমাশীল। ⁹⁷

বুখারি শরিফে হযরত আবু মুসা আশআরি রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা এক সফরে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে ছিলাম। হঠাৎ আমরা অত্যন্ত উচ্চকণ্ঠে তাকবির দিতে থাকি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বললেন, তোমরা আস্তে তাকবির দাও। আল্লাহ তো বধির নন। তিনি তোমাদের সাথেই আছে। তিনি তোমাদের কথা শোনেন, তোমাদের দেখেন।'

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,

وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ
'আমি মানুষ সৃষ্টি করেছি এবং তার মন তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয় তা আমি জানি। ঘাড়ের শিরার চেয়েও আমি তার কাছে রয়েছি। ⁹⁸

একদা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. কোথাও যাচ্ছিলেন। সঙ্গে ছিলেন হযরত আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রা.। চলতে চলতে পথিমধ্যে মদিনার এক অপরিচিত মহিলার সাথে তাদের সাক্ষাৎ হলো। মহিলাটি হযরত উমর রা.-কে বলল, হে উমর! আপনি আল্লাহকে ভয় করুন। আল্লাহ আপনাকে প্রজাদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন। মহিলার কথা শুনে হযরত উমর রা. কাঁদতে থাকেন। এটা দেখে হযরত আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রা. মহিলাকে তিরস্কার করতে লাগলেন। হযরত উমর রা. তাকে বাধা প্রদান করে বললেন, হে আবু উবায়দা! মহিলাকে ছেড়ে দাও। সে যা বলেছে আল্লাহ তায়ালা সাত আসমান উপর থেকে তা শুনেছেন।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আমাদের সকল কথা শোনেন। আমরা আস্তে বলি কিংবা জোরে, প্রকাশ্যে বলি কিংবা গোপনে। বিশাল জগতের সকল কিছুই তার শক্তি ও কর্তৃত্বের অধীন। তাই হে আল্লাহর বান্দারা! আল্লাহ তায়ালা অপছন্দ করেন এমন কিছু বলা থেকে বিরত থাকো।

টিকাঃ
৯১. সুরা মায়েদা: ৮৯।
৯২. সুরা বাকারা: ১২৭।
৯৩. সুরা লুকমান: ২৮।
৯৪. সুরা সাবা: ৫০।
৯৫. সুরা রাদ: ১০-১৩।
৯৬. নিজের স্ত্রী অথবা তার কোনো অঙ্গকে মায়ের সাথে অথবা স্থায়ীভাবে বিবাহ হারাম এমন কোনো মহিলার পৃষ্ঠদেশতুল্য বলে আখ্যায়িত করাকে ইসলামি আইনের পরিভাষায় যিহার বলে। এ কথা বলার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, মায়ের সাথে যেমন মেলামেশা হারাম, তেমনি স্ত্রীর সাথেও হারাম করা। কেউ যদি এমনটি করে তাহলে তার জন্য করণীয় হলো, স্ত্রীকে স্পর্শের পূর্বে কাফফারা আদায় করা। যিহারের কাফফারা হলো, রমজান মাসে স্বেচ্ছায় রোজা ভাঙ্গার কাফফারার ন্যায়। একজন গোলাম আজাদ করবে। যদি গোলাম আজাদ করার সামর্থ্য না থাকে তাহলে টানা দুই মাস রোজা রাখবে। যদি তাও না পারে তাহলে ষাটজন মিসকিনকে খাবার খাওয়াবে।
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, 'তোমাদের মধ্যে যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে যিহার করে তারা যেন জেনে রাখে যে, তারা তাদের মা নয়। তাদের মা তো তারাই যারা তাদের প্রসব করেছে। তারা তো কেবল অসঙ্গত ও মিথ্যা কথা বলে। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল ও মার্জনাকারী।' সুরা মুজাদালা: ২। যিহারের কাফফারা সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে যিহার করে, তারপর তাদের উক্তি প্রত্যাহার করে নেয়, তাদের জন্য পারস্পরিক স্পর্শের পূর্বে একটি দাসমুক্তির বিধান দেওয়া হলো। এটি তোমাদের জন্য নির্দেশ। আর তোমরা যা-কিছু করো সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবগত। অতঃপর যে সেটার সামর্থ্য রাখে না তাকে পারস্পরিক স্পর্শের পূর্বে একটানা দু-মাস রোজা রাখতে হবে। যে তারও সামর্থ্য রাখে না তাকে ষাটজন মিসকিনকে খাওয়াতে হবে। এ বিধান এজন্য যে, আল্লাহ ও তার রাসুলের ওপরে তোমরা যেন ঈমান রাখো। এটি আল্লাহর সীমারেখা।' সুরা মুজাদালা: ৩-৪। [অনুবাদক]
৯৭. সুরা মুজাদালা: ১-২।
৯৮. সুরা কাফ: ১৬।

📘 আল্লাহ আপনাকে দেখছেন > 📄 আল্লাহ আপনাকে দেখছেন

📄 আল্লাহ আপনাকে দেখছেন


আল্লাহ তায়ালার পবিত্র নামসমূহের একটি হলো, 'বাসির'। অর্থাৎ তিনি ওই সত্তা যিনি বিশ্বজগতের সবকিছু দেখেন। ছোট-বড়, প্রকাশ-অপ্রকাশ্য কোনোকিছুই তার দৃষ্টির বাহিরে নয়। তিনি দেখেন যা রয়েছে জমিনের নিচে এবং যা রয়েছে আসমানের উপর। সাগরের গভীর তলদেশেও তিনি দেখেন। দেখেন গর্তের পিপীলিকার বিচরণও।

لَا تُدْرِكُهُ الأَبْصَارُ وَهُوَ يُدْرِكُ الأَبْصَارَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ
'কোনো দৃষ্টি তার নাগাল পায় না, তবে তিনি সব দৃষ্টির নাগাল পান। আর তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মদর্শী ও সবকিছুর খবর রাখেন।' ⁹⁹

খলিফাতুল মুসলিমিন হযরত উমর রা. গভীর রাতে মদিনার পথ ধরে বিচরণ করছেন। চলতে চলতে হঠাৎ একটি গৃহের পেছনে এসে দাঁড়িয়ে যান। এক বৃদ্ধা মহিলা তার মেয়েকে বলছে দুধে পানি মেশাতে। তখন মেয়েটি তার মাকে বলল, হে আমার মা! তুমি কি জানো না, খলিফা দুধে পানি মেশাতে নিষেধ করেছেন। মেয়ের কথা শুনে মা বলল, খলিফা কি এত রাতে তোমাকে দেখবে? তখন মেয়েটি বলল, খলিফা না দেখুক কিন্তু আল্লাহ তো দেখবেন।

এটি তো একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা। ছোট-বড় সকইে তা জানে। কিন্তু এ গল্পের যে শিক্ষা, যে প্রভাব তা আমাদের জীবনে কেন বাস্তবায়িত হচ্ছে না? কেন এ গল্পের শিক্ষা আমাদের জীবনে প্রতিফলিত হচ্ছে না? কেন আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করছি না আমরা? কেন আমরা বিরত থাকছি না সকল অন্যায় ও পাপচার থেকে?

আমি আপনাদের আরো একটি গল্প বলছি। যা আমাদের অন্তরকে ভাবিয়ে তুলবে। আমাদের হৃদয়কে অধিক প্রভাবিত করবে। একদা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. মরুভূমির পথ দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। পথে এক রাখাল বালককে দেখতে পেলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-এর অন্তরে হঠাৎ কৌতূহল জাগল। তিনি বালককে পরীক্ষা করতে চাইলেন। বললেন, তোমার পাল থেকে একটি বকরি আমার নিকট বিক্রি করে দাও। বালকটি বলল, আমি তো এসবের মালিক নই, মালিকের পক্ষ থেকে আমানতদার মাত্র। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বললেন, তোমার মালিককে বলে দেবে, একটি বকরি নেকড়ে খেয়ে ফেলেছে। তখন সে রাখাল বালক, যার অন্তর আল্লাহর ভয়ে পূর্ণ, সে বলল, আমি আমার ছোট মালিককে না হয় ধোঁকা দেব, কিন্তু আমার যিনি প্রকৃত মালিক-আল্লাহ-তাকে আমি কীভাবে ধোঁকা দেব। এ কথা শুনে ইবনে উমর রা. কাঁদতে লাগলেন।

আল্লাহর কসম! সে রাখাল বালক যে উত্তর দিয়েছে এর চেয়ে সত্য ও সুন্দর উত্তর আর হতে পারে না। এর চেয়ে সত্য জবাব আর কিছুই নেই।

يَوْمَ تَشْهَدُ عَلَيْهِمْ أَلْسِنَتُهُمْ وَأَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ، يَوْمَئِذٍ يُوَفِّيهِمُ اللَّهُ دِينَهُمُ الْحَقَّ وَيَعْلَمُونَ أَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ الْمُبِينُ
'যেদিন তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে তাদের জিহ্বা, তাদের হাত ও তাদের পা তাদেরই বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে। সেদিন আল্লাহ তাদের যথার্থ কর্মফল পুরোপুরি দেবেন এবং তারা জানবে যে, আল্লাহই সত্য এবং সবকিছু প্রকাশকারী।' ¹⁰⁰

একজন সাধারণ রাখাল বালকের অন্তরে আল্লাহর প্রতি যে ভয় তা আমাদের অন্তরে নেই কেন? একজন মরু বালকের অন্তরে যদি আল্লাহর এত অধিক ভয় থাকে তাহলে আমাদের অন্তর কেন আল্লাহর ভয় থেকে শূন্য?

আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার সবকিছু দেখছেন। তাই হে আল্লাহর বান্দা! তোমার রবের অবাধ্যতা পরিত্যাগ করো। সকল প্রকার নাফরমানি ও পাপাচার ছেড়ে দাও। তোমার সকল অন্যায় অপকর্ম তিনি দেখছেন। একদিন অবশ্যই এর পরিপূর্ণ হিসাব দিতে হবে। তোমার সকল কৃতকর্ম সম্পর্কে তিনি অবগত। কিছুই তার ইলমের বাহিরে নয়।

إِنَّهُ بِعِبَادِهِ خَبِيرٌ بَصِيرٌ
'নিশ্চয় তিনি বান্দাদের সম্পর্কে অবগত এবং তিনি তাদের সবকিছু দেখেন। '¹⁰¹

وَكَفَىٰ بِرَبِّكَ بِذُنُوبِ عِبَادِهِ خَبِيرًا بَصِيرًا
'বান্দাদের পাপের খবর রাখা এবং তা দেখার জন্য তোমার প্রভুই যথেষ্ট।' ¹⁰²

টিকাঃ
৯৯. সুরা আনআম: ১০৩।
১০০. সূরা নূর: ২৪।
১০১. সুরা শুরা: ২৭।
১০২. সুরা ইসরা: ১৭।

📘 আল্লাহ আপনাকে দেখছেন > 📄 আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়

📄 আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়


আল্লাহ তায়ালার নামসমূহের একটি হলো ‘আলিম’। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা জানেন যা অতীতে হয়েছে, বর্তমানে হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে হবে। যিনি জানেন তার সৃষ্টিজগতের সকল গোপন ও প্রকাশ্য বিষয়সমূহ। যিনি জানেন মানুষের ঈমান ও কুফর, জানেন তাদের সকল প্রকার কল্যাণ ও অকল্যাণ।

عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ
‘তিনি অন্তরের বিষয়াদি জানেন।’ ¹⁰³

ইমাম সাদি বলেন, ‘আলিম’ হলেন ওই সত্তা যিনি বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ, প্রকাশ্য ও গোপন, ঊর্ধ্ব জগত, নিম্ন জগত, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সবকিছু সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান রাখেন। কোনোকিছুই তার ইলমের বাহিরে নয়।’

أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ ۖ مَا يَكُونُ مِن نَّجْوَىٰ ثَلَاثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ وَلَا خَمْسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُهُمْ وَلَا أَدْنَىٰ مِن ذَٰلِكَ وَلَا أَكْثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمْ أَيْنَ مَا كَانُوا ۖ ثُمَّ يُنَبِّئُهُم بِمَا عَمِلُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ ۚ إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
‘তুমি কি দেখোনা, আসমান ও জমিনে যা-কিছু আছে আল্লাহ তা জানেন? যে কোনো তিনজনের গোপন কথা হলে তিনি থাকেন তাদের মাঝে চতুর্থ জন এবং পাঁচজনের হলে তিনি থাকেন তাদের মাঝে ষষ্ঠজন। আবার এর চেয়ে কম কিংবা বেশি জনের হলেও তারা যেখানেই থাকুক, তিনি তাদের সঙ্গে থাকেন। অতঃপর কেয়ামতের দিন তিনি তাদের কাজের ফলাফল তাদের জানিয়ে দিবেন। আল্লাহ সবকিছুই অবগত। ¹⁰⁴

وَهُوَ الَّذِي يَتَوَفَّاكُم بِاللَّيْلِ وَيَعْلَمُ مَا جَرَحْتُم بِالنَّهَارِ ثُمَّ يَبْعَثُكُمْ فِيهِ لِيُقْضَى أَجَلٌ مُّسَمًّى ثُمَّ إِلَيْهِ مَرْجِعُكُمْ ثُمَّ يُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ، وَهُوَ الْقَاهِرُ فَوْقَ عِبَادِهِ وَيُرْسِلُ عَلَيْكُم حَفَظَةٌ حَتَّى إِذَا جَاء أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ تَوَفَّتْهُ رُسُلُنَا وَهُمْ لَا يُفَرِّطُونَ، ثُمَّ رُدُّوا إِلَى اللَّهِ مَوْلَاهُمُ الْحَقِّ أَلَا لَهُ الْحُكْمُ وَهُوَ أَسْرَعُ الْحَاسِبِينَ.
'তিনিই রাতে তোমাদের প্রাণহীন করেন। আর দিনে তোমরা যা-কিছু করছো তাও জানেন। অতঃপর দিনে তিনি তোমাদের জাগ্রত করেন, যাতে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ পূর্ণ হয়। তারপর তারই কাছে তোমাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর তোমরা যা-কিছু করেছিলে তিনি তোমাদের তা অবহিত করবেন। ¹⁰⁵

টিকাঃ
১০৩. সুরা মুলক: ১৩।
১০৪. সুরা মুজাদালা: ৭।
১০৫. সুরা আনআম: ৬০।

📘 আল্লাহ আপনাকে দেখছেন > 📄 হৃদয়ে আল্লাহর নামসমূহের প্রভাব

📄 হৃদয়ে আল্লাহর নামসমূহের প্রভাব


এগুলো আল্লাহর পবিত্র নামসমূহ থেকে কতিপয় নাম। কিন্তু কোথায় আমাদের জীবনে এসবের প্রভাব? কেন আল্লাহর পবিত্র নামের প্রভাব আমাদের জীবনে পড়ে না? কেন আমরা আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করি না। তিনি আমাদের সকল কিছু দেখেন, সকল কিছু জানেন, সকল কিছু শোনেন; তবুও আমরা অন্যায় ও নাফরমানি থেকে বেঁচে থাকি না। কোথায় আমাদের ঈমান। কোথায় আমাদের লেনদেন ও ইবাদতের মধ্যে ইহসান?

যদি প্রকৃতার্থেই মুমিন হয়ে থাকো তাহলে নির্জনে, একাকী, গোপনে ও প্রকাশ্যে সকল প্রকার অন্যায় ও পাপাচার থেকে বিরত থাকো। ঈমান কেবল বাহ্যিকতার নাম নয়। শুধু দুই রাকাত নামাজ বা দিনের বেলা রোজা রাখার নামই ঈমান নয়। ঈমান হলো, অন্তরের চেষ্টা ও মুজাহাদার নাম। সকল ফরজ, ওয়াজিব পালন করার নাম। সকল হারাম ও নাজায়েজ থেকে সর্বতোভাবে বেঁচে থাকার নাম।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى، فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى
'যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সামনে দাঁড়ানোকে ভয় পায় এবং নিজেকে প্রবৃত্তির (অনুসরণ) থেকে বিরত রাখে তার ঠিকানা হলো জান্নাত।'¹⁰⁶

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, সাত প্রকার ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন আরশের ছায়াতলে জায়গা দেবেন। সেদিন আরশের ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া থাকবে না। সাত প্রকার ব্যক্তির মধ্যে এক প্রকার হলো, যারা একাকী গোপনে আল্লাহর জিকির করে এবং তাদের চোখ অশ্রুসজল হয়। আরেক প্রকার হলো, যাকে কোনো সুন্দরী ও সম্ভ্রান্ত বংশের মহিলা অন্যায় কাজের জন্য ডেকেছে কিন্তু সে তাতে সাড়া না দিয়ে বলেছে, আমি আল্লাহকে ভয় করি। সে বলল আমি আল্লাহকে ভয় করি।

হযরত আবু জর রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুরা দাহর থেকে তিলাওয়াত করছিলেন,

هَلْ أَتَى عَلَى الْإِنسَانِ حِينٌ مِّنَ الدَّهْرِ لَمْ يَكُن شَيْئاً مَّذْكُوراً
'মানুষের ওপর কি এমন কিছু সময় অতিবাহিত হয়েছে যখন সে কোনো উল্লেখযোগ্য বস্তু ছিল না?'¹⁰⁷

সুরার শুরু থেকে পড়তে পড়তে পূর্ণ সুরা পড়ে শেষ করলেন। অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি যা দেখি তোমরা তা দেখো না। আমি যা শ্রবণ করি তোমরা তা শ্রবণ করো না। আল্লাহর কসম! আমি যা জানি তা যদি তোমরা জানতে তাহলে কম হাসতে এবং কাঁদতে বেশি।'

কিয়ামতের দিন গোনাহগার ও পাপাচারীরা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে। সেদিন তারা চূড়ান্তভাবে অপদস্থ হবে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,

الْيَوْمَ نَخْتِمُ عَلَى أَفْوَاهِهِمْ وَتُكَلِّمُنَا أَيْدِيهِمْ وَتَشْهَدُ أَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
'আজ আমি তাদের মুখে মোহর মেরে দেব। তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে এবং তাদের পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে। ¹⁰⁸

সুতরাং তোমরা ভয় করো সে দিনকে যেদিন তোমাদের কেউ থাকবে না। থাকবে না কোনো আপনজন। তোমাদের থাকবে না কোনো ক্ষমতা। থাকবে না কোনো প্রভাব-প্রতিপত্তি। থাকবে না কোনো সম্পদ। সেদিন তোমরা হবে চূড়ান্ত অসহায়। সেদিন আল্লাহ তায়ালার দয়া ও করুণা ছাড়া আর কিছুই থাকবে না। সেদিন আল্লাহ কতক মানুষকে সম্মানিত করবেন। কতক মানুষকে তার আরশের ছায়ার নিচে আশ্রয় দিবেন। কতক মানুষকে তিনি করবেন লাঞ্ছিত ও অপদস্থ। সেদিন মানুষ হবে চূড়ান্ত অসহায়। হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা ভয় করো কিয়ামতের বিভীষিকাময় দিনকে। হে আল্লাহর বান্দাগণ! আমি তোমাদের কীভাবে বোঝাবো? কীভাবে বোঝাবো আমি তোমাদের? আমার হৃদয় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা ফিরে এসো আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার দিকে। তিনি তোমাদের সবকিছু দেখছেন, শুনছেন এবং পর্যবেক্ষণ করছেন। তোমরা কেউ তার নিয়ন্ত্রণের বাহিরে নও। কিয়ামতের দিন তোমাদের প্রতিটি কাজকর্মের হিসাব দিতে হবে। সেদিন প্রতিটি কাজের হিসাব ব্যতীত এক কদম সামনে এগুতে পারবে না। হে আল্লাহর বান্দা! সেদিন যে ব্যক্তি সফল সেই প্রকৃত সফল। তার চেয়ে সৌভাগ্যবান আর কেউ নেই। কিন্তু সেদিন যে ব্যর্থ হবে তার চেয়ে দুর্ভাগা আর কেউ নেই। আল্লাহর কসম! তার চেয়ে দুর্ভাগা আর কেউ নেই।

হে আল্লাহর বান্দারা! ফিরে এসো। ফিরে এসো তোমাদের রবের দিকে। তিনি ছাড়া আর কেউ নেই। তোমার মুরাকাবায় আল্লাহ আল্লাহ। তোমার ধ্যানে আল্লাহ আল্লাহ। তোমার গোপনে আল্লাহ আল্লাহ। তোমার প্রকাশ্যে আল্লাহ আল্লাহ। তোমার নিয়তে আল্লাহ আল্লাহ। তোমার কাজে আল্লাহ আল্লাহ। কেবলই আল্লাহ আল্লাহ। জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ও আরাধ্য হবে আল্লাহ। তার অনুসরণ, তার আনুগত্য এবং তার সন্তুষ্টি অর্জনই হবে মুমিনের সকল সাধনার কেন্দ্রবিন্দু।

الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ، وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ، إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
'যিনি তোমাকে দেখতে পান যখন তুমি নামাজে দাঁড়াও এবং দেখতে পান সিজদাকারীদের সাথে তোমার ওঠা-বসা। নিশ্চয় তিনি সবকিছু শোনেন, সবকিছু দেখেন। '¹⁰⁹

فَمَا لَهُمْ عَنِ التَّذْكِرَةِ مُعْرِضِينَ، كَأَنَّهُمْ حُمُرٌ مُّسْتَنفِرَةٌ، فَرَّتْ مِن قَسْوَرَةٍ، بَلْ يُرِيدُ كُلُّ امْرِئٍ مِّنْهُمْ أَن يُؤْتَى صُحُفاً مُّنَشَّرَةٌ، كَلَّا بَل لَا يَخَافُونَ الْآخِرَةَ، كَلَّا إِنَّهُ تَذْكِرَةٌ، فَمَن شَاء ذَكَرَهُ، وَمَا يَذْكُرُونَ إِلَّا أَن يَشَاءَ اللَّهُ هُوَ أَهْلُ التَّقْوَى وَأَهْلُ الْمَغْفِرَةِ
'তাদের কী হয়েছে যে, তারা উপদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়? যেন তারা ভয় পেয়ে পলায়নকারী গাধা। যারা কোনো সিংহের ভয়ে পালিয়ে এসেছে। বরং তাদের প্রত্যেকেই চায় যে, তাকে উন্মুক্ত আসমানি কিতাব দেওয়া হোক। কখনো নয়, আসলে তারা পরকালকে ভয় করে না। কখনো নয়, নিশ্চয় এটি একটি উপদেশ। অতএব, যে চায় সে যেন এ থেকে উপদেশ গ্রহণ করে। তবে আল্লাহ চাইলেই কেবল তারা উপদেশ গ্রহণ করবে। তিনি ভয় করার হকদার ও ক্ষমার মালিক। '¹¹⁰

হে আল্লাহর বান্দা! কোন শরীর নিয়ে তুমি আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে? কোন মুখে তুমি আল্লাহর সম্মুখে তোমার কৃতকর্মের হিসাব দেবে? আখেরাতের কঠিন শাস্তি থেকে মুক্তিলাভের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো। জেনে রেখো, আখেরাতের শাস্তি অত্যন্ত কঠিন ও ভয়াবহ। এর থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো, আল্লাহর আনুগত্য করা। অন্তরে তাকওয়া এবং খোদাভীতি সৃষ্টি করা।

টিকাঃ
১০۶. সুরা নাযিআত: ৪০।
১০৭. সুরা দাহর: ১।
১০৮. সুরা ইয়াসিন: ৬৫।
১০৯. সুরা শুয়ারা: ২১৮।
১১০. সুরা মুদ্দাছছির: ৪৮-৫৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00