📄 দুনিয়ার দৃষ্টান্ত
বর্ণিত আছে, একদা হযরত ইসা আলাইহিস সালামের সামনে দুনিয়াকে এক বৃদ্ধ মহিলার আকৃতিতে উপস্থিত করা হলো। আর তাকে সাজানো হয়েছে পার্থিব সকল প্রকার সৌন্দর্য দিয়ে। হযরত ইসা আলাইহিস সালাম সে বৃদ্ধাকে জিজ্ঞেস করলেন, দুনিয়ার কতজন পুরুষের সাথে তোমার বিয়ে হয়েছে? বৃদ্ধা জবাব দিলো, সুদীর্ঘ জীবনে অনেকের সাথেই আমি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি। এ শুনে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম বললেন, তাহলে তোমার স্বামীরা কোথায়? তাদের সকলে কি মারা গেছে নাকি তারা তোমাকে তালাক দিয়ে চলে গেছে? বৃদ্ধা বলল, না, বরং আমি তাদের হত্যা করেছি। এখন কেবল একজন আছে আমার সঙ্গে। হযরত ইসা আলাইহিস সালাম বললেন, এখন যে তোমার নিকট আছে সে কেন তাদের দেখে শিক্ষা গ্রহণ করছে না? সে কি মৃত্যুর ভয় করছে না? আফসোস তার জন্য, যে বহু লোককে মরতে দেখেও নিজের মৃত্যুর ব্যাপারে শঙ্কিত নয়।'
হে আল্লাহর বান্দাগণ! এই হলো দুনিয়ার দৃষ্টান্ত। এ ঘটনার মাধ্যমে দুনিয়ার মানুষের পরিচয় দেওয়া হয়েছে। দুনিয়াতে যারাই আগমন করেছে তাদের সকলকে চলে যেতে হয়েছে। কেউ এখানে থাকতে চিরদিন পারেনি। যতই ক্ষমতাবান হোক না কেন, যতই সম্পদের অধিকারী হোক না কেন পৃথিবীকে চিরস্থায়ী আবাস বানাতে পারবে না। সকল সম্পর্ক, সকল মোহ, সকল সম্পদ রেখে চলে যেতে হবে। দুনিয়া থাকার জায়গা নয়। পার্থিব জীবন নির্দিষ্ট ক-দিনের ভ্রমণ মাত্র। আমাদের সকলকে আল্লাহ পরীক্ষার জন্য দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন। ক্ষণস্থায়ী দুনিয়া ছেড়ে আখেরাতের অনন্ত যাত্রায় প্রতিনিয়ত আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছে কেউ না কেউ। আমরা নিজ হাতে বিদায় জানাচ্ছি তাদের। রেখে আসছি একাকী অন্ধকার কবরে। কিন্তু আফসোস আমাদের জন্য, আমরা তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করছি না। আমাদের বোধোদয় ঘটছে না। মনের আকাশে উদিত হচ্ছে না চিন্তার প্রখর সূর্য। আমরা সামান্যতম সতর্ক হচ্ছি না। আমাদের দৃষ্টান্ত তো বৃদ্ধা মহিলার বেঁচে থাকা স্বামীর মতো যে অগণিত মৃত্যু দেখেও নির্বিকার।
📄 দুঃখের পর রয়েছে অনাবিল সুখ
হযরত বিশর আল হাফি থেকে বর্ণিত। একদা তিনি কোথাও সফর করছিলেন। সঙ্গে ছিল একজন সফরসঙ্গী। পথ ছিল দীর্ঘ। মরুভূমির পথ। প্রচণ্ড রোদে তেতে আছে মরু আকাশ। চলতে চলতে সফরসঙ্গী লোকটি ক্লান্ত হয়ে গেল। প্রচণ্ড পিপাসা পেল তার। একটি কূপের নিকট দিয়ে যাতায়াত করার সময় লোকটি বিশর আল হাফির নিকট পানি পান করার আবেদন জানাল। বিশর আল হাফি তাকে বললেন, ধৈর্যধারণ করো। সামনের কূপ থেকে তোমাকে পানি পান করাব। অতঃপর যখন তারা পরবর্তী কূপের নিকটবর্তী হলো, তখন লোকটি বলল, হে বিশর আল হাফি! আমি এ কূপ থেকে পানি পান করব। আমার প্রচণ্ড পিপাসা পেয়েছে। বিশর আল হাফি এবারও তাকে বিরত রাখলেন। বললেন, ধৈর্যধারণ করো, সামনের কূপ থেকে সুমিষ্ট পানি পান করাব তোমাকে। অতঃপর চলতে চলতে তারা যখন পরবর্তী কূপের নিকটবর্তী হলো, তখনও বিশর আল হাফি তাকে একই উত্তর দিলেন। এভাবে তারা একের-পর-এক অনেকগুলো কূপ অতিক্রম করলেন। দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে গন্তব্যস্থলে পৌঁছার পর বিশর আল হাফি তাকে সুমিষ্ট ও সুপেয় পানি পান করতে দিলেন। অতঃপর বিশর আল হাফি তাকে বললেন, তুমি প্রবল তৃষ্ণার্ত হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছ। পেছনে ফেলে এসেছি বহু কূপ। প্রচণ্ড পিপাসায় কাতর হয়ে অবশেষে আমরা আমাদের গন্তব্যে পৌঁছেছি। এবং তুমি সুমিষ্ট পানি পান করেছ। বিশর আল হাফি বললেন, হে মুসাফির! জেনে রেখো, দুনিয়ার উপমা তেমনই। পার্থিব এ জীবন আমাদের তৃষ্ণার্ত ভ্রমণের মতোই। এখানে বিপদে, কষ্টে, ক্ষুধায় ও প্রবল তৃষ্ণায় ধৈর্যধারণ করতে হবে। বিচলিত হওয়া যাবে না। অধৈর্য ও অসহিষ্ণু হওয়া যাবে না। সর্বদা আল্লাহর সাহায্য কামনা করতে হবে। একদিন ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার ভ্রমণ শেষ হয়ে যাবে। শুরু হবে আখেরাতের ভ্রমণ, যা অনন্ত ও অসীম। এর কোনো শেষ নেই। হে মুসাফির! দুনিয়ার জীবন যদি ধৈর্যধারণ করে পাড়ি দিতে পারো তাহলে আখেরাতের সুমিষ্ট ও সুপেয় পানি পান করতে পারবে।'
হযরত বিশর আল হাফি (রহঃ) এমন লোকটিকে পথের ধারে লোনা ও ময়লা পানি পান করা থেকে বিরত রেখেছেন, অবশেষে সে পান করেছে সুমিষ্ট পানি। তেমনি উলামায়ে কেরাম, বুযুর্গানে দ্বীন লোকদের দুনিয়ার লালসা, হারাম ও নাজায়েজ কাজ থেকে বিরত রাখে, তাদের গোনাহ থেকে দূরে রাখে। এর দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য হলো, লোকদের আখেরাতের সুমিষ্ট ও সুপেয় পানি পান করানো। তাদের জাহান্নামের আজাব থেকে বাঁচিয়ে জান্নাতে নিয়ে যাওয়া।
হযরত আবু যায়েদ বলেন, 'আমি আমার নফসকে ক্রমাগত কষ্ট দিই, তাকে আল্লাহর আদেশ পালনে বাধ্য করি, পার্থিব কষ্টের সামনে নতি স্বীকার করি না। আমি জানি, আমার নফস যেদিন দুনিয়ার সফর শেষ করে আখেরাতের সুমিষ্ট পানি পান করবে সেদিন সীমাহীন খুশি হবে।'
দুনিয়ার জীবনে মানুষ যদি সকল প্রকার হারাম ও নাজায়েজ থেকে বিরত থাকে এবং আল্লাহর যাবতীয় আদেশ পালন করতে গিয়ে যদি কষ্ট স্বীকার করে তাহলে মৃত্যুর পর সে লাভ করবে অনন্ত সুখের জীবন। তার পরকাল হবে সুন্দর। সেখানে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাকে দান করবেন অনন্ত নেয়ামতের জান্নাত। তা দেখে সে খুশি হয়ে যাবে। দুনিয়ার সমূহ কষ্ট ভুলে যাবে। সুতরাং যারা দুনিয়ার আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাস পরিত্যাগ করবে, আখেরাতে সে চির সুখের জান্নাতে অনন্ত আরাম আয়েশ ভোগ করবে। আর যে দুনিয়ার আরাম আয়েশে মত্ত হয়ে পড়বে, আখেরাতের ওপর দুনিয়াকে প্রাধান্য দিবে, সে আখেরাতে লাভ করবে কষ্টের জীবন। তার জীবন হবে অনন্ত কষ্ট ও দুঃখের।
📄 চেয়ে নিন তার কাছে
আমি আপনাদের সামনে পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত তিলাওয়াত করছি,
وَتَوَكَّلْ عَلَى الْعَزِيزِ الرَّحِيمِ الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ، وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ، إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ.
'আর পরাক্রমশালী ও দয়াময় আল্লাহর ওপর ভরসা করো, যিনি তোমাকে দেখতে পান যখন তুমি নামাজে দাঁড়াও এবং (দেখতে পান) সেজদাকারীর মাঝে তোমার ওঠাবসা। তিনি সবকিছু শ্রবণ করেন, সবকিছু জানেন। ⁵¹
ইমাম সাদি বলেন, 'যার অন্তরে আল্লাহর প্রতি অগাধ আস্থা ও পরিপূর্ণ ভরসা রয়েছে সে ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা বেশি বেশি ইবাদত করার তাওফিক দান করেন। তাই আমাদের উচিত, আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ভরসা ও অগাধ আস্থা তৈরির জন্য তার নিকট প্রার্থনা করা। ইরশাদ হয়েছে,
وَتَوَكَّلْ عَلَى الْعَزِيزِ الرَّحِيمِ
'মহাপরাক্রমশালী দয়ালু আল্লাহর ওপর ভরসা করো। ⁵²
টিকাঃ
৫১. সুরা শুআরা: ২১৭-২২০।
৫২. সুরা শুআরা: ২১৭।
📄 তাওয়াক্কুলের অর্থ
তাওয়াক্কুলের অর্থ হলো, উপকার লাভ এবং ক্ষতি থেকে বাঁচার ক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহ তায়ালার ওপর ভরসা রাখা। আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করা। নিশ্চয় তিনি পরাক্রমশালী, বান্দার প্রতি দয়ালু। তাঁর একক ক্ষমতা ও শক্তিবলে তিনি বান্দাকে কল্যাণ দান এবং ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সক্ষম। আর এ সবকিছু বান্দার তার অপরিসীম রহমত ও সীমাহীন দয়া।
وَتَوَكَّلْ عَلَى الْعَزِيزِ الرَّحِيمِ الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ، وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ، إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ.
'আর পরাক্রমশালী ও দয়াময় আল্লাহর ওপর ভরসা করো, যিনি তোমাকে দেখতে পান যখন তুমি নামাজে দাঁড়াও এবং (দেখতে পান) সেজদাকারীর মাঝে তোমার ওঠাবসা। তিনি সবকিছু শোনেন, সবকিছু জানেন। ⁵³
টিকাঃ
৫৩. সুরা শুআরা: ২১৭-২২০।