📄 আল্লাহ আপনাকে দেখছেন
إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرْهُ وَنَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا، وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَنْ يَهْدِهِ اللَّهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ، وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ
আজ একটি চমৎকার ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আপনাদের সামনে আলোকপাত করব। বিষয়টি অত্যন্ত সারগর্ভ ও প্রাণবন্ত। বহু আলোচনার সারনির্যাস। বহু কথার সারমর্ম। বহু ইবাদতের সমষ্টি। মনোজগতে আমাদের জীবন ও জগতের দর্শনকে পরিবর্তন করে দেবে। আলোচনার জন্য এর চেয়ে সুন্দর ও চমকপ্রদ আর কোনো বিষয় হতে পারে না।
বিষয়টি হলো,
وَتَوَكَّلْ عَلَى الْعَزِيزِ الرَّحِيمِ الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ، وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ، إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ.
‘আর পরাক্রমশালী ও দয়াময় আল্লাহর উপর ভরসা করো, যিনি তোমাকে দেখতে পান যখন তুমি নামাজে দাঁড়াও এবং (দেখতে পান) সেজদাকারীর মাঝে তোমার ওঠাবসা। তিনি সবকিছু শ্রবণ করেন, সবকিছু জানেন। ⁴⁸
সত্যিই, বিষয়বস্তুর দিক থেকে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যমণ্ডিত একটি বিষয়। অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর ও প্রাণবন্ত এর আলোচনা যা হৃদয়কে করে বিমোহিত। অন্তরকে করে প্রভাবিত। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে মানুষ এর আলোচনা শুনতে থাকে। আর কে আছে এমন যে তার প্রিয় বিষয়ের আলোচনা শুনতে অপছন্দ করে? পছন্দনীয় কথা-বার্তা থেকে কে মুখ ফিরিয়ে নেয়? মুমিনের নিকট আল্লাহর চেয়ে অধিক প্রিয় আর কেউ নেই। সকল মুমিনই মনে-প্রাণে কামনা ও প্রার্থনা করে আল্লাহর নিকট প্রিয় হতে। ঈমানদারদের সমগ্র জীবনের সাধনা একীভূত হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জন করার প্রতি।
আজকের আলোচনায় আল্লাহ তায়ালার বড়ত্ব, তার মর্যাদা, তার শ্রেষ্ঠত্ব ও আমাদের প্রতি তার অপরিসীম দয়া-অনুগ্রহের কথা সবিস্তারে তুলে ধরব।
সবিস্তারে বর্ণনা করব কীভাবে আমরা হতে পারব তার প্রিয়। কীভাবে আমাদের হৃদয়ে জাগ্রত হবে তাকওয়া-খোদাভীতি। দুনিয়ার যাপিত জীবনে আমরা কীভাবে লাভ করব তার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য। সেইসঙ্গে বর্ণনা করব কতিপয় ক্ষতিকর বিষয়, যা আমাদের ঈমান, জীবন ও সমাজকে করে তুলছে অন্ধকারাচ্ছন্ন। আমাদের চারপাশকে বানিয়ে রেখেছে বিভীষিকাময়। অশ্লীলতা ও মন্দকাজ সম্পর্কে সতর্ক করব; যা আমার ওপর অত্যাবশ্যকীয় কর্তব্য। সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করব, যা আমার প্রতি মহান রবের নির্দেশ। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে যেসব হারাম বিষয়ের অনুপ্রবেশ ঘটেছে সেসব নিয়ে কথা বলব। সুদ-ঘুস, মদপান, ব্যভিচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে কথা বলব। এসব বিষয় আমাদের জীবনে অত্যন্ত ভয়াবহ বিপর্যয় নিয়ে এসেছ। অথচ মানুষের সে ব্যাপারে কোনো চিন্তাই নেই। তাদের নেই কোনো অনুভূতি। দুনিয়ার গড্ডলিকাপ্রবাহে গা ভাসিয়ে দিয়েছে। যে যেভাবে পারছে সম্পদ উপার্জন করছে। হালাল- হারামের কোনো বাছ-বিচার করছে না। হাতের মুঠোয় যা পাচ্ছে তাই খাচ্ছে। একটিবার ভেবে দেখছে না এটি বৈধ কী অবৈধ। দীর্ঘ পরিক্রমায় তাদের হৃদয় মরে গেছে। দ্বীনের ব্যাপারে সামান্য বোধশক্তিটুকুও আর অবশিষ্ট নেই। পবিত্র কুরআনের ভাষায় তাদের বলা হয়েছে,
كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ
'তারা হলো চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায়; বরং এর চেয়েও নিকৃষ্টতর।'⁴⁹
তাদের জীবনে ইসলাম ও শরিয়তের বিধি-বিধান পালনের প্রতি নেই ন্যূনতম দায়িত্ববোধ। আল্লাহর আদেশ-নিষেধ ও নবীজির সুন্নত পালনের সামান্যতম পাবন্দি নেই। দ্বীনকে তারা প্রদর্শন করেছে বৃদ্ধাঙ্গুলি। ঈমানকে তারা বানিয়েছে পরিত্যক্ত বস্তু। শরিয়তের যেসব বিষয় তাদের অনুকূল হয় তারা সেগুলো গ্রহণ করে। আর যেগুলো তাদের মত ও চিন্তার বিরুদ্ধে যায়, সেগুলো সহজেই এড়িয়ে চলে। তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণকে বাহ্যত করে শরিয়তের ওইসব বিধি-নিষেধকে তারা তাদের আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করে না। তাদের জীবনের একমাত্র মাকসাদ হলো, দুনিয়ার সুখ-সমৃদ্ধি, প্রভাব- প্রতিপত্তি ও খ্যাতি অর্জন। টাকা-পয়সা তাদেরকে অন্ধ করে রেখেছে।
বস্তুবাদ তাদের হৃদয়কে করে রেখেছে ঘোরতর আচ্ছন্ন। তাদের সকল ধ্যান-ধারণাজুড়ে আছে ভোগ আর বিলাস। আজকের পৃথিবীতে বস্তুবাদের আক্রমণ সবচেয়ে বড় আক্রমণ। মুসলিমদের জন্য এ এক ভয়ংকর রকমের ফেতনা। বস্তুবাদ আজকের পাশ্চাত্য মতবাদের মূল ভিত্তির একটি। পাশ্চাত্য সভ্যতা থেকে মুসলিম সভ্যতায় এ চিন্তার আমদানি ঘটছে এবং মারাত্মকভাবে এর প্রচার-প্রসার হচ্ছে। মুসলমানরা এর স্রোতে ভেসে যাচ্ছে বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়া খড়কুটোর মতো।
সালাফের দৃষ্টিতে ঈমান ও আখেরাত থেকে দূরে সরে যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো দুনিয়ার মোহ ও আসক্তি। মুসলমান সমাজের অধঃপতনের তীব্রতা তাই প্রকট হচ্ছে প্রতিনিয়ত। দিনদিন মুসলিম উম্মাহ বিচ্যুত হচ্ছে সিরাতে মুস্তাকিম থেকে। ছিটকে পড়ছে ইসলামের শাশ্বত রাজপথ থেকে। আর ক্রমান্বয়ে তাদের জীবনকে ঘিরে নিচ্ছে কুফর ও শিরকের অন্ধকার। অজান্তেই তারা হয়ে যাচ্ছে মুলহিদ ও মুরতাদ।
টিকাঃ
৪৮. সুরা শুআরা: ২১৭-২২০।
৪৯. সুরা ফুরকান: ৪৪।
📄 মানব সৃষ্টির রহস্য
হে আল্লাহর বান্দাগণ! হে আমার প্রিয় মুসলিম ভাইয়েরা! আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে আমাদের প্রেরণ করেছেন সুনির্দিষ্ট একটি লক্ষ্য দিয়ে। দুনিয়াতে এসে আল্লাহর সৃষ্টি প্রভূত নাজ-নেয়ামত ভোগ করাই শুধু উদ্দেশ্য নয়। বরং এর পেছনে রয়েছে এক মহাপরিকল্পনা। কিন্তু দুনিয়াতে আগমনের পর আমরা ভুলে গেছি আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য। আমরা বিচ্যুত হয়ে গেছি আমাদের প্রতিশ্রুতি থেকে। জীবন থেকে কেটে যাচ্ছে দিনের পর দিন। মাসের পর মাস। কেটে যাচ্ছে বহু বছর। কিন্তু আমরা হয়ে আছি আমাদের জীবন ও জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত গাফেল। আমাদের সকল লক্ষ্য পুঞ্জিভূত হয়েছে একটিমাত্র লক্ষ্যে। আমাদের সকল চিন্তা এসে একত্রিত হয়েছে একটিমাত্র চিন্তায়। আর তা হলো, সম্পদ, সম্পদ আর সম্পদ। আমরা প্রচুর সম্পদের মালিক হতে চাই। সমগ্র দুনিয়া হাতের মুঠোয় পেতে চাই। হতে চাই প্রবল ক্ষমতার অধিকারী। আমাদের সকল সৌন্দর্য এসে জমা হয়েছে সম্পদের সৌন্দর্যে। আর সম্পদের অন্ধ মোহে পড়ে করে যাচ্ছি অনবরত পাপাচার। গোনাহের দিকে আমরা কোনো ভ্রুক্ষেপই করছি না। গোনাহের পাহাড় জমা হচ্ছে আমলনামায়। এভাবেই শেষ হয়ে যাচ্ছে জীবনের অফুরন্ত সময়। হায়াত ফুরিয়ে যাচ্ছে। ক্রমশ কবরের দিকে যাত্রা করছি আমরা।