📘 আল্লাহ আপনাকে দেখছেন > 📄 ভালোবাসার মিথ্যা দাবিদার

📄 ভালোবাসার মিথ্যা দাবিদার


যারা নিজেদের আল্লাহর প্রেমিক বলে দাবি করে কিন্তু আল্লাহ যেসব কাজের আদেশ করেছেন তারা সেগুলো পালন করে না, আল্লাহ যেসব কাজ থেকে নিষেধ করেছেন সেগুলো থেকে বিরত থাকে না, প্রকৃতার্থে তারা মিথ্যাবাদী। তাদের ভালোবাসা নিছক মুখের বুলি ছাড়া আর কিছু নয়। তারা তাদের দাবির ক্ষেত্রে অসত্য। তাদের অন্তর একমাত্র আল্লাহ ও তার রাসুলের জন্য পরিপূর্ণ নয়। তাদের অন্তরে রয়েছে দুনিয়া ও দুনিয়ার মানুষকে সন্তুষ্ট করার প্রবণতা। তারা দাবি করে যদিও আল্লাহকে ভালোবাসার, কিন্তু তারা সন্তুষ্ট করে মানুষকে। তারা আল্লাহর নাফরমানি ও অবাধ্যতা করে। এর দ্বারা আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালাকে অসন্তুষ্ট করে, খুশি করে মানুষকে। হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমাদের অন্তরে আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত করো। আল্লাহ ও তার রাসুলের ব্যাপারে গভীর আত্মমর্যাদা তৈরি করো। দ্বীন ও শরিয়তের ব্যাপারে আত্মমর্যাদা তৈরি করো।

জেনে রেখো, যাদের অন্তরে আল্লাহ ও তার রাসুলের ব্যাপারে আত্মমর্যাদাবোধ তৈরি হয়নি তার হৃদয় শূন্য। আত্মমর্যাদাহীন বান্দা যদি নিজেকে আল্লাহর ভালোবাসার ব্যাপারে দাবি করে তাহলে সে বড় মিথ্যাবাদী।

যে নিজেকে আল্লাহর প্রেমিক বলে দাবি করে কিন্তু তার চিন্তা-চেতনার মাঝে কোনো পরিবর্তন হয়নি, আল্লাহর আদেশ-নিষেধকে লঙ্ঘন করে, আল্লাহ তায়ালা যা করতে বলেছেন তা করে না, যা থেকে নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকে না, তাহলে তার মাঝে আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত হয়নি।

জেনে রেখো, যার অন্তর থেকে আত্মমর্যাদা হারিয়ে গেছে তার অন্তর থেকে দ্বীন হারিয়ে গেছে। তার অন্তর থেকে আল্লাহর ভালোবাসা হারিয়ে গেছে। জেনে রেখো, দ্বীনি আত্মমর্যাদাবোধ মুমিনের মূল ভিত্তি ও স্তম্ভ। আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা, সৎকাজের আদেশ করা, অন্যায় থেকে নিষেধ করা। এসবকিছুই হলো দ্বীনি আত্মমর্যাদা। যার অন্তরে আত্মমর্যাদা নেই সে জিহাদে যায় না, সৎকাজের আদেশ করে না, লোকদের অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করে না।

যারা আল্লাহকে প্রকৃতার্থে ভালোবাসে তারা নিন্দুকের নিন্দাকে পরোয়া করে না। তারা লোকদের কটু কথায় ভ্রুক্ষেপ করে না। তারা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাজ করে যায়। মানুষের সন্তুষ্টি ও নিন্দা তাদের বিচলিত করে না। পাছে কথায় তারা বিব্রতবোধ করে না। লোকদের কটাক্ষ ও নিন্দার তীব্র ঝড়ও তাদেরকে বিন্দু পরিমাণ টলাতে পারে না। তাদের ধ্যানে-জ্ঞানে থাকে একমাত্র আল্লাহ ও তার সন্তুষ্টি অর্জন।

আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَن يَرْتَدَّ مِنكُمْ عَن دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لائِمٍ ذَلِكَ فَضْلُ اللَّهُ يُؤْتِيهِ مَن يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ
'হে ঈমানদারগণ! তোমাদের মধ্যে যারা স্বীয় ধর্ম ত্যাগ করবে তাদের স্থলে আল্লাহ এমন একদল লোক নিয়ে আসবেন, যাদের তিনি ভালোবাসবেন এবং তারাও তাকে ভালোবাসবে। তারা মুমিনদের প্রতি নরম আর কাফেরদের প্রতি হবে কঠোর। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে এবং কোনো নিন্দুকের নিন্দায় ভীত হবে না। এটি আল্লাহর অনুগ্রহ। তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করেন। আল্লাহ বড় দানশীল ও মহাজ্ঞানী। ⁴⁵

টিকাঃ
৪৫. সুরা মায়েদা: ৫৪

📘 আল্লাহ আপনাকে দেখছেন > 📄 আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের তীব্র আকাঙ্ক্ষা

📄 আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের তীব্র আকাঙ্ক্ষা


জেনে রেখো, মৃত্যু ব্যতীত তোমরা আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করতে পারবে না। তাই প্রকৃতার্থে আল্লাহকে যে ভালোবাসে তার উচিত হলো, মৃত্যুকে ভালোবাসা। মৃত্যু থেকে পলায়নের চেষ্টা না করা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

‎ مَنْ أَحَبَّ لِقَاءَ اللهِ أَحَبَّ اللهُ لِقَاءَهُ...وَمَنْ كَرِهَ لِقَاءَ اللهِ كَرِهَ اللهُ لِقَاءَهُ ‎
'যে আল্লাহর সাক্ষাৎ কামনা করে আল্লাহও তার সাক্ষাৎ কামনা করেন। আর যে আল্লাহর সাক্ষাৎ অপছন্দ করে, আল্লাহও তার সাক্ষাৎ অপছন্দ করেন। ⁴⁶

তাই মনে-প্রাণে আল্লাহর সাক্ষাৎ কামনা করা উচিত। আর তা কেবল মৃত্যুর মাধ্যমে সম্ভব। তাই মুমিনগণের উচিত মৃত্যুর অপেক্ষা করা। মৃত্যু থেকে পলায়ন না করা।

আল্লাহর সাক্ষাৎ কেবল ওইসকল বান্দারাই অপছন্দ করে যাদের আকিদা ও আমল নষ্ট হয়ে গেছে। যাদের অন্তর নষ্ট হয়ে গেছে। যারা প্রকৃতার্থে আল্লাহকে ভালোবাসে তারা সর্বদা মৃত্যুকে স্মরণ করে। কেননা, মৃত্যুর মাধ্যমে তারা আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভে ধন্য হবে।

আল্লাহর কসম! এর চেয়ে দারুণ ও চমৎকার কথা আর কিছু হতে পারে না।

টিকাঃ
৪৬. সহিহ মুসলিম।

📘 আল্লাহ আপনাকে দেখছেন > 📄 যে কথায় হৃদয় জাগে

📄 যে কথায় হৃদয় জাগে


আমি আপনাদের একটি ছোট তবে খুবই প্রভাব সৃষ্টিকারী একটি সত্য ঘটনা বলছি যা সকলের হৃদয়কে ভাবিয়ে তুলবে। হযরত আজরাইল আলাইহিস সালাম হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের জান কবজ করার জন্য এলেন। হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম আজরাইল আলাইহিস সালামকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি এমন কোনো বন্ধু দেখেছেন যে নিজের প্রিয় বন্ধুর জান কবজ করে? আপনি কি জানেন না, আমি আল্লাহর খলিল, তার বন্ধু। তখন হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম বললেন, আপনি কি কখনো এমন বন্ধুকে দেখেছেন যে তার বন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ অপছন্দ করে? এ কথা শুনে হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম বললেন, হে মালাকুল মওত! আপনি দ্রুত আমার জান কবজ করুন।

وَلَمَّا خُيِّرَ نَبِيُّنَا صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَيْنَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا، وَ لِقَاءِ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ، قَالَ بَلْ الرَّفِيقِ الْأَعْلَى بَلْ الرَّفِيقِ الْأَعْلَى
'রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখন পার্থিব জীবন এবং আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের কোনো একটি বেছে নিতে বলা হলো তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
بَلْ الرَّفِيقِ الْأَعْلَى بَلْ الرَّفِيقِ الْأَعْلَى
'আমি বরং আল্লাহর সাক্ষাৎ চাই। আমি বরং আল্লাহর সাক্ষাৎ চাই।'

হযরত রাবি ইবনে হাইছাম বলেন, 'আমার পিতা যখন মৃত্যুশয্যায় তখন আমার বোন তার শিয়রে বসে অঝোরে কান্নাকাটি করছিল। আমার পিতা তখন তাকে বললেন, হে আমার মেয়ে! তুমি কেঁদো না। আমার জন্য আজ বড় সুসংবাদ যে, আজ আমি আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সাক্ষাতে যাব। এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে! পার্থিব জীবনের প্রতি আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। আমার মন ও হৃদয় পরম প্রিয় প্রভুর সাক্ষাতের জন্য ব্যাকুল হয়ে আছে। আমি অস্থিরতা অনুভব করছি আল্লাহর সাক্ষাতের জন্য। দুনিয়ার সকল কিছুর চেয়ে আমার নিকট আল্লাহর সাক্ষাৎ এখন অধিক প্রিয়।'

জনৈক বেদুইন একবার কঠিন রোগাক্রান্ত হলো। তখন তাকে বলা হলো তুমি মারা যাবে। মৃত্যুর কথা শুনে বেদুইন বলল, মৃত্যুর পর আমাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে? উপস্থিত লোকেরা বলল, আল্লাহ তায়ালার নিকট। এ কথা শুনে বেদুইনের মুখমণ্ডল আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। প্রফুল্লচিত্তে সে বলল, তাহলে কতই-না উত্তম এ মৃত্যু যা আমাকে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ করে দিচ্ছে!

হযরত আহমদ ইবনে হাওয়ারি রহ. বলেন, আমি হযরত সুলাইমান আদ দারেমিকে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার নিকট মুনাজাতরত অবস্থায় দেখেছি। আমি শুনেছি, তিনি কেঁদে কেঁদে আল্লাহকে বলছেন, 'হে আল্লাহ! তুমি যদি আমাকে জাহান্নামে দাও, তাহলে আমি জাহান্নামকে বলব, হে জাহান্নাম! আমি আল্লাহকে ভালোবাসি।' আহমদ ইবনে হাওয়ারি বলেন, আমি বহু আল্লাহ প্রেমিকের কথা শুনেছি। তারা আল্লাহর রহমতের আশা করতেন। তারা আল্লাহ তায়ালার অফুরান দয়া ও অনুগ্রহ প্রার্থনা করতেন। সমগ্র পৃথিবী তাদের নিকট তুচ্ছ মনে হতো। সবকিছুর বিনিময়ে তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য কামনা করতেন। পার্থিব জীবনের প্রতি তাদের কোনো মোহ ছিল না। তাদের ধ্যানজ্ঞান ছিল একমাত্র আল্লাহ। একমাত্র আল্লাহ। কেবলই আল্লাহ।

হযরত আবু আইয়ুব সাখতিয়ানি বলেন, আল্লাহ তায়ালা তার সকল নেয়ামতকে দুনিয়ার লোকদের মাঝে বণ্টন করে দিয়েছেন। সেসব নেয়ামত থেকে আমাকে তিনি দিয়েছেন ইসলামের নেয়ামত। আমি আমার প্রভুর নিকট আরো একটি নেয়ামতের জন্য প্রার্থনা করি, সেটি হলো, আল্লাহর সাক্ষাৎ ও তার দর্শন। দুনিয়ার সকল নেয়ামত থেকে আমার নিকট তা মূল্যবান।

প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকিহ হযরত আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ. বলেন, একরাতে আমি সুফিয়ান সাওরির নিকট গেলাম। দেখি তিনি হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে মাথা জমিনের দিকে দিয়ে চুপচাপ বসে আছেন। চোখ দুটি বিমর্ষ। সুফিয়ান সাওরিকে তখন নিদারুণ বিষণ্ণ ও অসহায় দেখাচ্ছিল। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'আপনার এ অবস্থা কেন? কোন জিনিস আপনাকে বিষণ্ণ করে তুলেছে? তিনি বললেন, 'আমি ধারণা করছি আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবেন না। পরকালের ভয় আমাকে অস্থির করে তুলেছে। আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. বলেন, আমি তখন তাকে কুরআনের এই আয়াত স্মরণ করিয়ে দিলাম,

وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ
'আমার অনুগ্রহ সবকিছুতে পরিব্যাপ্ত। ⁴⁷

তখন সুফিয়ান সাওরি হেসে উঠলেন। তার চোখে-মুখে ফুটে উঠল আনন্দের দীপ্তি। প্রশান্তচিত্তে তিনি বললেন, ঐ আল্লাহর শপথ! যিনি আমাকে দান করেছেন অফুরন্ত নেয়ামত। সে-সব নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা আল্লাহর তাওফিক ও অনুগ্রহ ছাড়া আদায় করা সম্ভব নয়।

হযরত রাবি ইবনে আনাস বলেন, আল্লাহকে ভালোবাসার নিদর্শন হলো, বেশি বেশি জিকির করা। অন্তরে আল্লাহর সাক্ষাতের তীব্র আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা। সুতরাং, আল্লাহকে যে বেশি ভালোবাসতে চায় সে যেন বেশি বেশি জিকির করে এবং অন্তরে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের আকাঙ্ক্ষা রাখে।'

টিকাঃ
৪৭. সুরা আরাফ: ১৫৬।

📘 আল্লাহ আপনাকে দেখছেন > 📄 আল্লাহ আপনাকে দেখছেন

📄 আল্লাহ আপনাকে দেখছেন


إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرْهُ وَنَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا، وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَنْ يَهْدِهِ اللَّهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ، وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ

আজ একটি চমৎকার ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আপনাদের সামনে আলোকপাত করব। বিষয়টি অত্যন্ত সারগর্ভ ও প্রাণবন্ত। বহু আলোচনার সারনির্যাস। বহু কথার সারমর্ম। বহু ইবাদতের সমষ্টি। মনোজগতে আমাদের জীবন ও জগতের দর্শনকে পরিবর্তন করে দেবে। আলোচনার জন্য এর চেয়ে সুন্দর ও চমকপ্রদ আর কোনো বিষয় হতে পারে না।

বিষয়টি হলো,

وَتَوَكَّلْ عَلَى الْعَزِيزِ الرَّحِيمِ الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ، وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ، إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ.
‘আর পরাক্রমশালী ও দয়াময় আল্লাহর উপর ভরসা করো, যিনি তোমাকে দেখতে পান যখন তুমি নামাজে দাঁড়াও এবং (দেখতে পান) সেজদাকারীর মাঝে তোমার ওঠাবসা। তিনি সবকিছু শ্রবণ করেন, সবকিছু জানেন। ⁴⁸

সত্যিই, বিষয়বস্তুর দিক থেকে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যমণ্ডিত একটি বিষয়। অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর ও প্রাণবন্ত এর আলোচনা যা হৃদয়কে করে বিমোহিত। অন্তরকে করে প্রভাবিত। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে মানুষ এর আলোচনা শুনতে থাকে। আর কে আছে এমন যে তার প্রিয় বিষয়ের আলোচনা শুনতে অপছন্দ করে? পছন্দনীয় কথা-বার্তা থেকে কে মুখ ফিরিয়ে নেয়? মুমিনের নিকট আল্লাহর চেয়ে অধিক প্রিয় আর কেউ নেই। সকল মুমিনই মনে-প্রাণে কামনা ও প্রার্থনা করে আল্লাহর নিকট প্রিয় হতে। ঈমানদারদের সমগ্র জীবনের সাধনা একীভূত হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জন করার প্রতি।

আজকের আলোচনায় আল্লাহ তায়ালার বড়ত্ব, তার মর্যাদা, তার শ্রেষ্ঠত্ব ও আমাদের প্রতি তার অপরিসীম দয়া-অনুগ্রহের কথা সবিস্তারে তুলে ধরব।

সবিস্তারে বর্ণনা করব কীভাবে আমরা হতে পারব তার প্রিয়। কীভাবে আমাদের হৃদয়ে জাগ্রত হবে তাকওয়া-খোদাভীতি। দুনিয়ার যাপিত জীবনে আমরা কীভাবে লাভ করব তার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য। সেইসঙ্গে বর্ণনা করব কতিপয় ক্ষতিকর বিষয়, যা আমাদের ঈমান, জীবন ও সমাজকে করে তুলছে অন্ধকারাচ্ছন্ন। আমাদের চারপাশকে বানিয়ে রেখেছে বিভীষিকাময়। অশ্লীলতা ও মন্দকাজ সম্পর্কে সতর্ক করব; যা আমার ওপর অত্যাবশ্যকীয় কর্তব্য। সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করব, যা আমার প্রতি মহান রবের নির্দেশ। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে যেসব হারাম বিষয়ের অনুপ্রবেশ ঘটেছে সেসব নিয়ে কথা বলব। সুদ-ঘুস, মদপান, ব্যভিচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে কথা বলব। এসব বিষয় আমাদের জীবনে অত্যন্ত ভয়াবহ বিপর্যয় নিয়ে এসেছ। অথচ মানুষের সে ব্যাপারে কোনো চিন্তাই নেই। তাদের নেই কোনো অনুভূতি। দুনিয়ার গড্ডলিকাপ্রবাহে গা ভাসিয়ে দিয়েছে। যে যেভাবে পারছে সম্পদ উপার্জন করছে। হালাল- হারামের কোনো বাছ-বিচার করছে না। হাতের মুঠোয় যা পাচ্ছে তাই খাচ্ছে। একটিবার ভেবে দেখছে না এটি বৈধ কী অবৈধ। দীর্ঘ পরিক্রমায় তাদের হৃদয় মরে গেছে। দ্বীনের ব্যাপারে সামান্য বোধশক্তিটুকুও আর অবশিষ্ট নেই। পবিত্র কুরআনের ভাষায় তাদের বলা হয়েছে,
كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ

'তারা হলো চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায়; বরং এর চেয়েও নিকৃষ্টতর।'⁴⁹

তাদের জীবনে ইসলাম ও শরিয়তের বিধি-বিধান পালনের প্রতি নেই ন্যূনতম দায়িত্ববোধ। আল্লাহর আদেশ-নিষেধ ও নবীজির সুন্নত পালনের সামান্যতম পাবন্দি নেই। দ্বীনকে তারা প্রদর্শন করেছে বৃদ্ধাঙ্গুলি। ঈমানকে তারা বানিয়েছে পরিত্যক্ত বস্তু। শরিয়তের যেসব বিষয় তাদের অনুকূল হয় তারা সেগুলো গ্রহণ করে। আর যেগুলো তাদের মত ও চিন্তার বিরুদ্ধে যায়, সেগুলো সহজেই এড়িয়ে চলে। তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণকে বাহ্যত করে শরিয়তের ওইসব বিধি-নিষেধকে তারা তাদের আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করে না। তাদের জীবনের একমাত্র মাকসাদ হলো, দুনিয়ার সুখ-সমৃদ্ধি, প্রভাব- প্রতিপত্তি ও খ্যাতি অর্জন। টাকা-পয়সা তাদেরকে অন্ধ করে রেখেছে।

বস্তুবাদ তাদের হৃদয়কে করে রেখেছে ঘোরতর আচ্ছন্ন। তাদের সকল ধ্যান-ধারণাজুড়ে আছে ভোগ আর বিলাস। আজকের পৃথিবীতে বস্তুবাদের আক্রমণ সবচেয়ে বড় আক্রমণ। মুসলিমদের জন্য এ এক ভয়ংকর রকমের ফেতনা। বস্তুবাদ আজকের পাশ্চাত্য মতবাদের মূল ভিত্তির একটি। পাশ্চাত্য সভ্যতা থেকে মুসলিম সভ্যতায় এ চিন্তার আমদানি ঘটছে এবং মারাত্মকভাবে এর প্রচার-প্রসার হচ্ছে। মুসলমানরা এর স্রোতে ভেসে যাচ্ছে বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়া খড়কুটোর মতো।

সালাফের দৃষ্টিতে ঈমান ও আখেরাত থেকে দূরে সরে যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো দুনিয়ার মোহ ও আসক্তি। মুসলমান সমাজের অধঃপতনের তীব্রতা তাই প্রকট হচ্ছে প্রতিনিয়ত। দিনদিন মুসলিম উম্মাহ বিচ্যুত হচ্ছে সিরাতে মুস্তাকিম থেকে। ছিটকে পড়ছে ইসলামের শাশ্বত রাজপথ থেকে। আর ক্রমান্বয়ে তাদের জীবনকে ঘিরে নিচ্ছে কুফর ও শিরকের অন্ধকার। অজান্তেই তারা হয়ে যাচ্ছে মুলহিদ ও মুরতাদ।

টিকাঃ
৪৮. সুরা শুআরা: ২১৭-২২০।
৪৯. সুরা ফুরকান: ৪৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00