📄 আনুগত্যের প্রতিদান
হে আল্লাহর বান্দা! তুমি নিজেকে আল্লাহর প্রেমিক বলে দাবি করো, কিন্তু তুমি তার আনুগত্য করো না, তার নাফরমানি থেকে বেঁচে থাকো না তাহলে তোমার ভালোবাসা প্রকৃত ভালোবাসা নয়। তুমি দাবি করো ভালোবাসার, অথচ কাজ করো তার বিপরীত। তোমার কথা ও কাজে কোনো প্রকার মিল নেই। মুখে ভালোবাসার দাবি যে কেউ করতে পারে। যে কেউ বলতে পারে আমি ভালোবাসি অমুককে। হ্যাঁ, তোমার ভালোবাসা তখনই প্রকৃত ভালোবাসা বলে গণ্য হবে যদি তুমি তোমার ভালোবাসাকে আমলে পরিণত করতে পারো। সুতরাং, তুমি যদি সত্যিই আল্লাহ তায়ালাকে ভালোবাসো তাহলে তার আনুগত্য করো। তিনি যেসব কাজের আদেশ করেছেন তা পালন করো এবং যেসব কাজ থেকে বিরত থাকতে বলেছেন সেসব থেকে বিরত থাকো। আল্লাহর আনুগত্যের পুরস্কার এবং অবাধ্যতার পরিণাম কী হবে সে সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে,
أُوْلَئِكَ يُجْزَوْنَ الْغُرْفَةَ بِمَا صَبَرُوا وَيُلَقَّوْنَ فِيهَا تَحِيَّةٌ وَسَلَامًا خَالِدِينَ فِيهَا حَسُنَتْ مُسْتَقَرًّا وَمُقَامًا • قُلْ مَا يَعْبَأُ بِكُمْ رَبِّي لَوْلَا دُعَاؤُكُمْ فَقَدْ كَذَّبْتُمْ فَسَوْفَ يَكُونُ لِزَامًا
'তাদের প্রতিদান দেওয়া হবে জান্নাতের সুউচ্চ কক্ষ যেহেতু তারা ছিল ধৈর্যশীল। তাদেও সেখানে সংবর্ধনা প্রদান করা হবে অভিবাদন ও সালাম সহকারে। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আশ্রয়স্থল ও বসতি হিসেবে তা কতই-না উৎকৃষ্ট! (হে নবী) আপনি বলুন, তোমরা আমার প্রতিপালককে না ডাকলে তার কিছুই আসে যায় না। তোমরা অস্বীকার করেছ, ফলে অচিরেই তোমাদের ওপর নেমে আসবে অপরিহার্য শাস্তি। ⁴¹
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ يَهْدِيهِمْ رَبُّهُمْ بِإِيمَانِهِمْ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهِمُ الْأَنْهَارُ فِي جَنَّاتِ النَّعِيمِ * دَعْوَاهُمْ فِيهَا سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَتَحِيَّتُهُمْ فِيهَا سَلَامٌ وَآخِرُ دَعْوَاهُمْ أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
'যারা মুমিন ও সৎকর্মপরায়ণ তাদের প্রতিপালক তাদের ঈমানের দ্বারা তাদের পথপ্রদর্শন করবেন। জান্নাতে তাদের তলদেশে প্রবাহিত হবে নহরসমূহ। সেখানে তাদের ধ্বনি হবে, হে আল্লাহ আপনি মহান, পবিত্র! এবং সেখানে তাদের অভিবাদন হবে সালাম, এবং তাদের শেষ ধ্বনি হবে, সকল প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। ⁴²
قَالُوا إِنْ هِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا وَمَا نَحْنُ بِمَبْعُوثِينَ * وَلَوْ تَرَى إِذْ وُقِفُوا عَلَى رَبِّهِمْ قَالَ أَلَيْسَ هَذَا بِالْحَقِّ قَالُوا بَلَى وَرَبِّنَا قَالَ فَذُوقُوا الْعَذَابَ بِمَا كُنتُمْ تَكْفُرُونَ * قَدْ خَسِرَ الَّذِينَ كَذَّبُوا بِلِقَاءِ اللَّهِ حَتَّى إِذَا جَاءَتْهُمُ السَّاعَةُ بَغْتَةً قَالُوا يَا حَسْرَتَنَا عَلَى مَا فَرَّطْنَا فِيهَ وَهُمْ يَحْمِلُونَ أَوْزَارَهُمْ عَلَى ظُهُورِهِمْ أَلَّا سَاءَ مَا يَزِرُونَ * وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَلَلدَّارُ الْآخِرَةُ خَيْرٌ لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ أَفَلا تَعْقِلُونَ . قَدْ نَعْلَمُ إِنَّهُ لَيَحْزُنُكَ الَّذِي يَقُولُونَ فَإِنَّهُمْ لَا يُكَذِّبُونَكَ وَلَكِنَّ الظَّالِمِينَ بِآيَاتِ اللَّهِ يَجْحَدُونَ
'তারা বলে, আমাদের পার্থিব জীবনই একমাত্র জীবন। আমরা কখনো পুনরুত্থিত হবো না। তুমি যদি দেখতে পেতে তাদের যখন তাদের প্রতিপালকের সম্মুখে দাঁড় করানো হবে এবং তিনি বলবেন, এটি কি প্রকৃত সত্য নয়? তারা বলবে, আমাদের প্রতিপালকের শপথ! নিশ্চয়ই সত্য। তিনি বলবেন, তবে তোমরা যে কুফরি করতে তার জন্য এখন শাস্তি ভোগ করো।
যারা আল্লাহর সম্মুখীন হওয়াকে মিথ্যা বলেছে তারা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি অকস্মাৎ তাদের নিকট যখন কিয়ামত উপস্থিত হবে তখন তারা বলবে, হায়! আমরা যে তাকে অবহেলা করেছি তার জন্য আক্ষেপ। তারা তাদের পিঠে নিজেদের পাপ বহন করবে। তারা যা বহন করবে তা অতি নিকৃষ্ট। পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক ব্যতীত আর কিছু নয়। তারা তাকওয়া অবলম্বন করে তাদের জন্য আখেরাতের আবাসই শ্রেয়। তোমরা কি তা অনুধাবন করো না? আমি অবশ্যই জানি যে, তারা যা বলে তা তোমাকে নিশ্চিত কষ্ট দেয়। কিন্তু তারা তো তোমাকে মিথ্যাবাদী বলে না। বরং যারা জালেম তারা আল্লাহর আয়াতকে অস্বীকার করে। ⁴³
টিকাঃ
৪১. সুরা ফুরকান: ৭৫-৭৭।
৪২. সুরা ইউনুস: ৯-১০।
৪৩. সুরা আনআম: ২৮-৩৩।
📄 শামিল হয়েছ আজ ফজরের জামাতে?
তুমি যদি সত্যিই আল্লাহকে ভালোবেসে থাকো তাহলে তুমি কেন আজ ফজরের নামাজ পড়লে না? ফজরের নামাজের সময় তুমি কোথায় হারিয়ে ছিলে? কোথায় কোন কাজে বিভোর ছিলে? জিজ্ঞেস করো তুমি নিজেকে। তাহলেই এর উত্তর তুমি পেয়ে যাবে। তুমি নিজেই নিজের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নাও যে, তুমি কি সত্যিই আল্লাহকে ভালোবাসো। তখন দেখবে, তুমি তোমার দাবির ক্ষেত্রে মিথ্যাবাদী। তোমার দাবি অসত্য। প্রকৃতার্থে, তুমি ধোঁকার মাঝে আছ। শয়তান তোমাকে ভুলিয়ে রেখেছে কল্যাণ ও সত্যের পথ থেকে।
আল্লাহকে প্রকৃতার্থে ভালোবাসে এমন কোনো মুমিনকে জিজ্ঞেস করো, সে আজকে ফজরের সালাত আদায় করেছে কি না। তুমি শুনতে পাবে, সে বলবে কেবল আজকের নয়, বিগত চল্লিশ বছর আমার তাকবিরে উলা ছুটেনি। চল্লিশ বছর আমি ইমামের আল্লাহু আকবার বলার সাথে সাথে সালাতে শামিল হয়েছি। আরেক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করে দেখো, সে বলবে, পঞ্চাশ বছর সে জামাতের সাথে নামাজ পড়ছে। পঞ্চাশ বছর তার জামাত ছুটেনি। যে প্রকৃত ভালোবাসার দাবি করে তার তো এমনই হবে। ভালোবাসার দাবি তো এটিই। আর তুমি যা করছ তা উল্টো। তুমি আল্লাহকে ভালোবাসার দাবি করছ অথচ তোমার আমল সম্পূর্ণ বিপরীত। জেনে রেখো, যারা আল্লাহকে ভালোবাসার দাবি করে এবং উক্ত ভালোবাসার পক্ষে যথাযথ প্রমাণ পেশ করে একমাত্র তাদের জন্য আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ
'আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন এবং তারাও ভালোবাসে আল্লাহকে। '⁴⁴
তোমার ভালোবাসা তখনই সত্য বলে প্রমাণিত হবে, যখন তুমি আল্লাহ ও তার রাসুলের ভালোবাসাকে দুনিয়ার সকল ভালোবাসার ওপর প্রাধান্য দিবে।
টিকাঃ
৪৪. সুরা মায়েদা: ৫৪।
📄 ভালোবাসার মিথ্যা দাবিদার
যারা নিজেদের আল্লাহর প্রেমিক বলে দাবি করে কিন্তু আল্লাহ যেসব কাজের আদেশ করেছেন তারা সেগুলো পালন করে না, আল্লাহ যেসব কাজ থেকে নিষেধ করেছেন সেগুলো থেকে বিরত থাকে না, প্রকৃতার্থে তারা মিথ্যাবাদী। তাদের ভালোবাসা নিছক মুখের বুলি ছাড়া আর কিছু নয়। তারা তাদের দাবির ক্ষেত্রে অসত্য। তাদের অন্তর একমাত্র আল্লাহ ও তার রাসুলের জন্য পরিপূর্ণ নয়। তাদের অন্তরে রয়েছে দুনিয়া ও দুনিয়ার মানুষকে সন্তুষ্ট করার প্রবণতা। তারা দাবি করে যদিও আল্লাহকে ভালোবাসার, কিন্তু তারা সন্তুষ্ট করে মানুষকে। তারা আল্লাহর নাফরমানি ও অবাধ্যতা করে। এর দ্বারা আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালাকে অসন্তুষ্ট করে, খুশি করে মানুষকে। হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমাদের অন্তরে আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত করো। আল্লাহ ও তার রাসুলের ব্যাপারে গভীর আত্মমর্যাদা তৈরি করো। দ্বীন ও শরিয়তের ব্যাপারে আত্মমর্যাদা তৈরি করো।
জেনে রেখো, যাদের অন্তরে আল্লাহ ও তার রাসুলের ব্যাপারে আত্মমর্যাদাবোধ তৈরি হয়নি তার হৃদয় শূন্য। আত্মমর্যাদাহীন বান্দা যদি নিজেকে আল্লাহর ভালোবাসার ব্যাপারে দাবি করে তাহলে সে বড় মিথ্যাবাদী।
যে নিজেকে আল্লাহর প্রেমিক বলে দাবি করে কিন্তু তার চিন্তা-চেতনার মাঝে কোনো পরিবর্তন হয়নি, আল্লাহর আদেশ-নিষেধকে লঙ্ঘন করে, আল্লাহ তায়ালা যা করতে বলেছেন তা করে না, যা থেকে নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকে না, তাহলে তার মাঝে আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত হয়নি।
জেনে রেখো, যার অন্তর থেকে আত্মমর্যাদা হারিয়ে গেছে তার অন্তর থেকে দ্বীন হারিয়ে গেছে। তার অন্তর থেকে আল্লাহর ভালোবাসা হারিয়ে গেছে। জেনে রেখো, দ্বীনি আত্মমর্যাদাবোধ মুমিনের মূল ভিত্তি ও স্তম্ভ। আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা, সৎকাজের আদেশ করা, অন্যায় থেকে নিষেধ করা। এসবকিছুই হলো দ্বীনি আত্মমর্যাদা। যার অন্তরে আত্মমর্যাদা নেই সে জিহাদে যায় না, সৎকাজের আদেশ করে না, লোকদের অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করে না।
যারা আল্লাহকে প্রকৃতার্থে ভালোবাসে তারা নিন্দুকের নিন্দাকে পরোয়া করে না। তারা লোকদের কটু কথায় ভ্রুক্ষেপ করে না। তারা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাজ করে যায়। মানুষের সন্তুষ্টি ও নিন্দা তাদের বিচলিত করে না। পাছে কথায় তারা বিব্রতবোধ করে না। লোকদের কটাক্ষ ও নিন্দার তীব্র ঝড়ও তাদেরকে বিন্দু পরিমাণ টলাতে পারে না। তাদের ধ্যানে-জ্ঞানে থাকে একমাত্র আল্লাহ ও তার সন্তুষ্টি অর্জন।
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَن يَرْتَدَّ مِنكُمْ عَن دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لائِمٍ ذَلِكَ فَضْلُ اللَّهُ يُؤْتِيهِ مَن يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ
'হে ঈমানদারগণ! তোমাদের মধ্যে যারা স্বীয় ধর্ম ত্যাগ করবে তাদের স্থলে আল্লাহ এমন একদল লোক নিয়ে আসবেন, যাদের তিনি ভালোবাসবেন এবং তারাও তাকে ভালোবাসবে। তারা মুমিনদের প্রতি নরম আর কাফেরদের প্রতি হবে কঠোর। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে এবং কোনো নিন্দুকের নিন্দায় ভীত হবে না। এটি আল্লাহর অনুগ্রহ। তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করেন। আল্লাহ বড় দানশীল ও মহাজ্ঞানী। ⁴⁵
টিকাঃ
৪৫. সুরা মায়েদা: ৫৪
📄 আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের তীব্র আকাঙ্ক্ষা
জেনে রেখো, মৃত্যু ব্যতীত তোমরা আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করতে পারবে না। তাই প্রকৃতার্থে আল্লাহকে যে ভালোবাসে তার উচিত হলো, মৃত্যুকে ভালোবাসা। মৃত্যু থেকে পলায়নের চেষ্টা না করা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَنْ أَحَبَّ لِقَاءَ اللهِ أَحَبَّ اللهُ لِقَاءَهُ...وَمَنْ كَرِهَ لِقَاءَ اللهِ كَرِهَ اللهُ لِقَاءَهُ
'যে আল্লাহর সাক্ষাৎ কামনা করে আল্লাহও তার সাক্ষাৎ কামনা করেন। আর যে আল্লাহর সাক্ষাৎ অপছন্দ করে, আল্লাহও তার সাক্ষাৎ অপছন্দ করেন। ⁴⁶
তাই মনে-প্রাণে আল্লাহর সাক্ষাৎ কামনা করা উচিত। আর তা কেবল মৃত্যুর মাধ্যমে সম্ভব। তাই মুমিনগণের উচিত মৃত্যুর অপেক্ষা করা। মৃত্যু থেকে পলায়ন না করা।
আল্লাহর সাক্ষাৎ কেবল ওইসকল বান্দারাই অপছন্দ করে যাদের আকিদা ও আমল নষ্ট হয়ে গেছে। যাদের অন্তর নষ্ট হয়ে গেছে। যারা প্রকৃতার্থে আল্লাহকে ভালোবাসে তারা সর্বদা মৃত্যুকে স্মরণ করে। কেননা, মৃত্যুর মাধ্যমে তারা আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভে ধন্য হবে।
আল্লাহর কসম! এর চেয়ে দারুণ ও চমৎকার কথা আর কিছু হতে পারে না।
টিকাঃ
৪৬. সহিহ মুসলিম।