📘 আল্লাহ আপনাকে দেখছেন > 📄 আসমান-জমিনে ছড়িয়ে পড়ে ভালোবাসার বার্তা

📄 আসমান-জমিনে ছড়িয়ে পড়ে ভালোবাসার বার্তা


বান্দা যখন আল্লাহ তায়ালাকে ভালোবাসে তখন ভালোবাসার সকল প্রমাণ পেশ করে। ভালোবাসার পরীক্ষায় বান্দা যখন উত্তীর্ণ হয় আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তখন আসমানের ফেরেশতা ও জমিনের অধিবাসীদের নিকট বার্তা প্রেরণ করেন যে, আমার অমুক বান্দা আমাকে ভালোবাসে, তোমরাও তাকে ভালোবাসো। সে আমার সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক স্থাপন করেছে, তোমরাও তার সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক স্থাপন করো। সে আমাকে স্মরণ করে, তোমরাও তাকে স্মরণ করো।

إِنَّ الله إذا أحب عبداً دعا جبريل فقال : إني أحب فلاناً فأحبه قال فيحبه جبريل ثم ينادي في السماء فيقول : إنَّ الله يحب فلاناً فأحبوه فيحبه أهل السماء ثم يوضع له القبول في الأرض.

'আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন তখন জিবরাইলকে ডেকে বলেন, আমি অমুক বান্দাকে ভালোবাসি, তুমিও তাকে ভালোবাসো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তখন জিবরাইল তাকে ভালোবাসেন। অতঃপর জিবরাইল আসমানে ঘোষণা দেন, আল্লাহ অমুক বান্দাকে ভালোবাসেন, তোমরাও তাকে ভালোবাসো। ফলে আসমানের অধিবাসীরা তাকে ভালোবাসে। অতঃপর দুনিয়ার লোকদের অন্তরেও তার প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেন।'¹⁹

আসমানের ফেরেশতা ও জমিনের অধিবাসীরা তখন ডেকে বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! সে-সমস্ত লোকদের চেনার উপায় কী যারা আপনাকে ভালোবাসে এবং আপনি তাদের ভালোবাসেন?

আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পবিত্র কুরআনুল কারিমে তাদের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে,

وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلاماً، وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّداً وَقِيَاماً
'আল্লাহর বান্দা তারা, যারা পৃথিবীতে বিচরণ করে নম্রভাবে। মূর্খ ব্যক্তিরা যখন তাদের ডাকে তখন তারা বলে সালাম। এবং যারা রাত অতিবাহিত করে তাদের প্রতিপালককে সেজদা ও দাঁড়ানো অবস্থায়।'²⁰

وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَقِيَامًا ، وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا اصْرِفْ عَنَّا عَذَابَ جَهَنَّمَ إِنَّ عَذَابَهَا كَانَ غَرَامًا إِنَّهَا سَاءَتْ مُسْتَقَرًّا وَمُقَامٌ ۚ وَالَّذِينَ إِذَا أَنفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا • وَالَّذِينَ لَا يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَهَا آخَرَ وَلَا يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَا يَزْنُونَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ يَلْقَ أَثَامًا
'যারা রাত্রি অতিবাহিত করে তাদের প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সিজদাবনত হয়ে এবং দণ্ডায়মান থেকে। আর বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের থেকে জাহান্নামের শাস্তি দূর করে দিন। জাহান্নামের শাস্তি নিশ্চয় বিনাশ। নিশ্চয় তা অস্থায়ী ও স্থায়ী আবাসস্থল হিসেবে নিকৃষ্ট। যখন তারা ব্যয় করে তখন অপব্যয় করে না। কার্পণ্যও করে না। বরং তারা এ উভয়ের মাঝামাঝি অবস্থায়। তারা আল্লাহর সাথে কোনো উপাস্যকে ডাকে না। আল্লাহ যাদের হত্যা করতে নিষেধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে তাদের হত্যা করে না এবং তারা ব্যভিচার করে না। যে এগুলো করে সে শাস্তি ভোগ করবে। ²¹

وَالَّذِينَ لَا يَشْهَدُونِ الزُّورَ وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا
'যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না এবং বাজে কথা শুনতে পেলে সম্মান বাঁচিয়ে চলে যায়। '²²

যাদের মধ্যে এসব গুণ পাওয়া যাবে তারাই আল্লাহর বিশেষ বান্দা। তারাই অধিকতর ভালোবাসে আল্লাহকে। তাদের অন্তরে রয়েছে আল্লাহ তায়ালার প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা। তারা আল্লাহর মৌখিক স্তুতি ও বন্দনার পাশাপাশি আমলের মাধ্যমেও আল্লাহর ভালোবাসার প্রমাণ পেশ করে।

টিকাঃ
১৯. সহিহ বুখারি: ৩২০৯।
২০. সুরা ফুরকান: ৬৩।
২১. সুরা ফুরকান: ৬৪-৬৮।
২২. সুরা ফুরকান: ৭২।

📘 আল্লাহ আপনাকে দেখছেন > 📄 নিঝুম রাতের আঁধারে

📄 নিঝুম রাতের আঁধারে


যাদের নিকট রাত্রির শেষ প্রহরে ঘুম ও গল্প-গুজব আল্লাহর ইবাদতের চেয়ে অধিক প্রিয়, যাদের নিকট গভীর রাতে একান্তে আল্লাহর নিকট মুনাজাত করার চেয়ে অযথা কার্যকলাপ অধিক আনন্দের তারা আল্লাহর প্রিয় বান্দা নয়। যাদের মাঝে উল্লিখিত গুণাবলি নেই তাদের ভালোবাসার স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। তাদের কাছে যদি কোনো প্রমাণ থাকেও তা আল্লাহ তায়ালার নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। তারা যদি সত্যিই আল্লাহ তায়ালাকে ভালোবাসত তাহলে অবশ্যই তাদের নিকট শেষ রাতের প্রার্থনা প্রিয় ও আনন্দের বলে গণ্য হতো। তারা যদি প্রকৃতার্থেই আল্লাহকে ভালোবাসত তাহলে অবশ্যই তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অশ্রুসিক্ত প্রার্থনা করত। রাত্রির অখণ্ড নীরবতায় আল্লাহর প্রেমে মশগুল থাকত। এসবের মাধ্যমে অর্জন করত রবের সন্তুষ্টি।

কেননা, ভালোবাসার দাবি হলো, যাকে ভালোবাসবে তার সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা অর্জনে আপ্রাণ চেষ্টা করবে। বান্দা যদি প্রকৃতই আল্লাহকে ভালোবাসে তাহলে রাতের অন্ধকার দেখে সে খুশি হবে। কেননা রাতের অন্ধকারে মুনাজাত, কান্নাকাটি ও প্রার্থনা দুনিয়া ও আসমানের সকল বস্তু থেকে অধিক প্রিয় ও অত্যন্ত সুমিষ্ট। আল্লাহ প্রেমিকের নিকট রাতের নির্জন প্রহরের চেয়ে অধিক আনন্দের আর কোনো সময় নেই। রাতের সামান্য এক প্রহর নীরবতা তার নিকট দুনিয়া ও দুনিয়ার ভেতর যা আছে তার থেকে অত্যধিক মূল্যবান। কেননা, এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন এবং তার দিদার লাভ করা যায়। মোটকথা, আল্লাহকে ভালোবাসার সর্বাধিক বড় প্রমাণ হলো, বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের প্রচেষ্টায় অহর্নিশ مত্ত থাকবে। তার পূর্ণ আনুগত্য করবে। অবাধ্যতা ও পাপাচার থেকে বিরত থাকবে। নামাজ পড়বে। রোজা রাখবে। সদকাহ করবে। তার যাবতীয় আদেশ পালন করবে। সকল প্রকার নিষেধ থেকে সর্বতোভাবে বেঁচে থাকবে।

আল্লাহর প্রিয় বান্দা যারা আল্লাহকে ভালোবাসার দাবি করে, তাদের নিকট রাত অত্যন্ত প্রিয় মুহূর্ত। তাদের নিকট রাতের চেয়ে উত্তম সময় আর নেই। কেননা, রাতে প্রভুর সাক্ষাতে ধন্য হওয়া যায়। রাতের শেষ প্রহরে প্রভু তার বান্দাকে অনবরত ডাকতে থাকেন। বলতে থাকেন, কেউ আছো কি ক্ষমা প্রার্থনাকারী, আমি তাকে ক্ষমা করব। কেউ আছো কি তওবাকারী, আমি তার তওবা কবুল করব। কেউ আছো কি রিজিক প্রার্থনাকারী, আমি তার রিজিক বাড়িয়ে দেব। ভালোবাসার দাবি তো এটিই যে, প্রেমাস্পদের আহ্বানে সবকিছু পেছনে ফেলে ছুটে যাবে তার নিকট। আল্লাহকে ভালোবাসার দাবিকারী সে-সমস্ত বান্দাদের জন্য রাতের শেষ প্রহর হলো প্রেমাস্পদের ডাকে সাড়ে দিয়ে তার নিকট ছুটে যাওয়ার ন্যায়। নামাজ হলো আল্লাহর সাথে বান্দার কথোপকথন। প্রার্থনা হলো আল্লাহর সাথে বান্দার একান্তে আলাপন।

📘 আল্লাহ আপনাকে দেখছেন > 📄 খোদাপ্রেম পাগল এক দাসী

📄 খোদাপ্রেম পাগল এক দাসী


আবু আবদুল্লাহ নাবাজি বাজার থেকে একটি কালো দাসী ক্রয় করলেন। ক্রয় করার পর তিনি দাসীটিকে বললেন, 'আমি তোমাকে তোমার মালিকের নিকট থেকে ক্রয় করেছি। এখন আমি তোমার মালিক। এ কথা শুনে দাসীটি হাসল। আবু আবদুল্লাহ দাসীটিকে পাগল ধারণা করলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি পাগল? দাসী বলল, না আমি পাগল নই। এবার আবু আবদুল্লাহকে তার দাসী জিজ্ঞেস করল, আপনি কি আল্লাহর কিতাব কুরআন পড়তে পারেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি কুরআন পড়তে পারি। দাসী বলল, তাহলে কুরআন থেকে কিছু অংশ পড়ুন। তিনি পড়লেন কুরআনের কিছু আয়াত। আবদুল্লাহর কণ্ঠে কুরআনের তিলাওয়াত শুনে দাসী কাঁদতে লাগল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, কুরআন পড়ার স্বাদ যদি এত মধুর ও সুমিষ্ট হয়, তাহলে আল্লাহকে দেখার স্বাদ না জানি কত মধুর!

আবু, আবদুল্লাহ দাসীটিকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। যখন রাতের এক তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হলো আবু আবদুল্লাহ ঘুমের জন্য বিছানা তৈরি করলেন। এটা দেখে দাসী বলল, হে আমার মনিব, আপনার কি লজ্জা হয় না যে, আপনার প্রভু ঘুমান না, অথচ আপনি রাতের শুরুতেই ঘুমের জন্য তোড়জোড় শুরু করে দিলেন? এ তো ভারি আশ্চর্য! আপনি নিজেকে আল্লাহ তায়ালার বান্দা বলে দাবি করেন। দাবি করেন তাকে ভালোবাসার। অথচ তিনি ঘুমান না, আর আপনি রাতের শুরুতেই ঘুমের ঘোরে হারিয়ে যাচ্ছেন। হে আমার মনিব, যদি মুক্তি চান তো আল্লাহকে সন্তুষ্ট করুন। আর রাত হলো আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার সর্বাধিক উত্তম সময়।'

আবু আবদুল্লাহ বলেন, তারপর দাসীটি নামাজে দাঁড়িয়ে গেল। দীর্ঘ সময় নামাজ পড়ল। প্রতি রাকাতে দীর্ঘক্ষণ কুরআন তিলাওয়াত করল। প্রতিটি রুকু-সিজদা ছিল তার দীর্ঘ। নামাজ শেষে দু-হাত তুলে প্রার্থনা শুরু করে আল্লাহর নিকট। আমি দূর থেকে দেখছি চোখ তার অশ্রুসিক্ত। তার প্রার্থনার অশ্রুতে চোখ-মুখ ভেসে যাচ্ছিল। যেন পাহাড়ি ঝরনা থেকে গড়িয়ে পড়ছে অফুরন্ত পানির ফোয়ারা। আমার কর্ণকুহরে ভেসে আসছে তার প্রার্থনার ভাষা, সে কেঁদে কেঁদে বলছে আল্লাহর নিকট, 'হে আমার রব, আমার প্রতি তোমার ভালোবাসার শপথ করে বলছি, আমাকে তুমি ক্ষমা করে দাও। আমাকে তুমি কোনো প্রকার শাস্তি দিয়ো না। তোমার শাস্তি বড় মর্মন্তুদ।'

আবু আবদুল্লাহ বলেন, যখন সে তার দোয়া শেষ করল, আমি তাকে বললাম, তুমি কীভাবে বুঝলে যে, আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসেন? দাসী বলল, 'তিনি আমাকে তার সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ দিয়েছেন, আমাকে তার সামনে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার তাওফিক দিয়েছেন। অথচ এখন ঘুমের সময়। আল্লাহ আমাকে ঘুমের বিছানা থেকে তুলে তার ইবাদত করার জন্য নির্বাচিত করেছেন। এটিই এ কথার প্রমাণ যে, আমার প্রভু আমাকে ভালোবাসেন। তিনি আমাকে ভালোবাসেন বলেই আমাকে তার ইবাদত করার সুযোগ দিয়েছেন। সবাই যখন ঘুমের কোলে হারিয়ে যাচ্ছে তখন তিনি আমাকে জায়ানামাজে দাঁড়ানোর তাওফিক দিয়েছেন। এর মাধ্যমে আমি বুঝেছি, তিনি আমাকে ভালোবাসেন। হে আমার মনিব, আল্লাহ কি কুরআনে বলেননি এ কথা,
يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ

'আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন এবং তারা আল্লাহকে ভালোবাসে।'²³

টিকাঃ
২৩. সুরা মায়েদা: ৫৪।

📘 আল্লাহ আপনাকে দেখছেন > 📄 ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া

📄 ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া


বান্দা আল্লাহকে ভালোবাসার প্রমাণ ও নিদর্শন হলো, পার্থিব জীবনে বান্দা সকল বিপদ-মুসিবতে ধৈর্যধারণ করা। যাবতীয় বিপদ-মুসিবতকে আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা মনে করা। ভালোবাসার পরীক্ষায় বান্দাকে পাশ করতে হবে প্রবল ধৈর্যধারণের মাধ্যমে। হে আল্লাহর বান্দা! তাই জীবনের ওপর যত বিপদ-মুসিবত আসুক না কেন, চাই তা নিজের ওপর হোক, চাই পরিবার-পরিজনের ওপর হোক অথবা চাই ধন-সম্পদের উপর। সকলপ্রকার বিপদ-মুসিবতে ধৈর্যধারণ করা বান্দা আল্লাহকে ভালোবাসার প্রমাণ স্বরূপ। এর চেয়ে উত্তম আর কী রয়েছে যে, আল্লাহর সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়ে বান্দা ধৈর্যধারণ করবে? এর মাধ্যমে বান্দার আল্লাহকে ভালোবাসার প্রমাণ পাওয়া যায়। আর ধৈর্য একটি উত্তম ইবাদতও বটে। যার মাধ্যমে অর্জিত হয় আল্লাহর ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি।

কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, আজ অধিকাংশ মানুষ আল্লাহকে ভালোবাসার মিথ্যা দাবিদার। তারা আল্লাহকে ভালোবাসার যে দাবি করে তা আদৌ সত্য নয়। কেননা, আল্লাহ তায়ালা যখন তাদের বিপদ-আপদের মাধ্যমে পরীক্ষা করেন, তখন তাদের বাস্তবতা ফুটে ওঠে। তখন ভালোবাসার কোনো নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায় না। বিপদে তারা ধৈর্যধারণ করতে পারে না। ফলে ভালোবাসার পরীক্ষায় তারা অকৃতকার্য হয়। আর তারা নিজেদের দাবির ক্ষেত্রে প্রমাণিত হয় মিথ্যুক ও প্রতারক।

আল্লাহ তায়ালা বিপদ-মুসিবতে ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে বান্দাদের ভালোবাসা পরখ করেন। পার্থিব দুঃখ-কষ্টের মাধ্যমে পরীক্ষা করেন, কারা প্রকৃতার্থে আল্লাহকে ভালোবাসে। কারা তার প্রিয় ও নৈকট্যশীল বান্দা। আর কারা তার অবাধ্য। কারা ভালোবাসার দাবির ক্ষেত্রে অসত্য। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পবিত্র কুরআনে হযরত আইয়ুব আলাইহিস সালামের দীর্ঘ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তার ওপর একের-পর-এক আপতিত বিপদ ও মুসিবতের বিবরণ দিয়েছেন। অতঃপর ইরশাদ করেছেন,

إِنَّا وَجَدْنَاهُ صَابِراً

'আমি তাকে ধৈর্যধারণকারী হিসেবে পেয়েছি। ²⁴

অপর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,

وَاصْبِرْ لِحُكْمِ رَبِّكَ فَإِنَّكَ بِأَعْيُنِنَا

'তুমি তোমার প্রভুর নির্দেশের জন্য ধৈর্যধারণ করো, তুমি তো আমার চোখের সামনেই রয়েছ।'²⁵

আরো ইরশাদ করেন,

وَاصْبِرْ وَمَا صَبْرُكَ إِلَّا بِاللَّه

'আপনি ধৈর্যধারণ করুন। আপনার ধৈর্যধারণ একমাত্র আল্লাহর জন্য।'²⁶

আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ধৈর্যশীলদের প্রশংসা করে বলেন,

وَالصَّابِرِينَ فِي الْبَأْسَاء والضَّرَّاء وَحِينَ الْبَأْسِ أُولَئِكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

'যারা দুঃখ কষ্টে, অভাব-অনটনে, ও ভয়ের সময়ে ধৈর্যধারণ করে তারাই খাঁটি মুমিন এবং তারাই মুত্তাকি।'²⁷

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
وما أعطي أحد عطاء خير وأوسع من الصبر
'ধৈর্যের চেয়ে অধিক উত্তম কিছু কাউকে দেওয়া হয়নি।'

হযরত আলি রা. বলেন, 'তুমি কখনো পার্থিব দুঃখ-কষ্টের ব্যাপারে কারো নিকট অভিযোগ করো না এবং তোমার বিপদ ও মুসিবতের কথা আলোচনা করো না। জেনে রাখো, ধৈর্যই উত্তম সমাধান।'

আল্লাহ তায়ালা ধৈর্যধারণকারীদের সুসংবাদ দিয়েছেন,

وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ

'হে নবী! আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।'²⁸

কতই-না উত্তম সুসংবাদ ধৈর্যধারণকারীদের জন্য! আল্লাহপ্রদত্ত সুসংবাদের চেয়ে উত্তম সুসংবাদ আর কী হতে পারে? বান্দা বিপদ-মুসিবতে ধৈর্যধারণ করে আল্লাহকে ভালোবাসার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। আর তার পুরস্কার স্বরূপ আল্লাহ তাদের দুনিয়া-আখেরাতে শুভ পরিণাম এবং উত্তম বিনিময়ের সুসংবাদ দিয়েছেন। বান্দা যেমন আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালাকে ভালোবাসে, তেমনি আল্লাহও তার বান্দাকে ভালোবাসেন। কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা সে দ্বিপাক্ষিক ভালোবাসার ঘোষণা দিয়ে বলেন,
يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ
'আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন এবং তারা আল্লাহকে ভালোবাসেন।' ²⁹

তব নামের জিকিরে ধ্যানমগ্ন

আল্লাহ তায়ালাকে বান্দা ভালোবাসার প্রমাণ ও নিদর্শন হলো, বান্দা বেশি বেশি তার জিকির করা। সকাল-সন্ধ্যায়, দিনে-রাতে সর্বদা আল্লাহর জিকির করা। বান্দার জবান কখনো আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ হবে না। কখনো বান্দার অন্তর আল্লাহর ভালোবাসা থেকে খালি থাকবে না। বান্দার মন ও হৃদয়ের তৃষ্ণা নিবারণ হবে পবিত্র সে নামের জিকিরের মাধ্যমে। কেননা, কেউ যখন কাউকে ভালোবাসে, তখন ভালোবাসার নিদর্শন স্বরূপ সে তাকে বারবার স্মরণ করে। তার নাম যতই উচ্চারণ করে ততই মুখে ও অন্তরে অপার্থিব মিষ্টতা অনুভব করে। কখনো তার স্মরণ থেকে সে বিমুখ হয় না। রাত-দিন অষ্টপ্রহর অন্তরে তার উপস্থিতি উপলব্ধি করে। এর মাধ্যমে সে মানসিক ও শারীরিক উৎফুল্লতা অনুভব করে। তার মন ও হৃদয় থাকে সতেজ। সর্বদা তার অন্তরে বিরাজ করে অপার আনন্দ। ভালোবাসা এমনই দাবি করে। তদ্রূপ, বান্দা যখন আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালাকে ভালোবাসবে তখন বান্দা আল্লাহ তায়ালার জিকির করবে। অন্তরে ও মুখে ক্রমাগত স্মরণ করবে প্রেমাস্পদ আল্লাহকে। তার চোখ-মুখ, হাত-পা, ভেতর-বাহির সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে আল্লাহর আনুগত্য প্রকাশ পাবে। তার চোখ কোনো হারাম জিনিসের দিকে তাকাবে না। তার মুখ কখনো গিবত করবে না। অশ্লীল কথা বলবে না। তার হাত কারো জিনিস অন্যায়ভাবে ধরবে না। কারো ওপর জুলুম করবে না। তার পা কোনো নাজায়েজ স্থান মাড়াবে না। তার অন্তর কোনো মন্দকাজের কল্পনা করবে না। আল্লাহ যেহেতু হারাম থেকে বেঁচে থাকতে আদেশ করেছেন, তাই সে-সকল হারাম থেকে বেঁচে থাকবে। আল্লাহ যে-সমস্ত কাজের আদেশ করেছেন, সে-সব পালনে অধিকতর সচেষ্ট হবে। সকল অন্যায় ও পাপাচার থেকে একনিষ্ঠভাবে বিরত থাকবে। আল্লাহ তায়ালা অসন্তুষ্ট হবেন এমন কোনো কাজ সে করবে না। বরং আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা খুশি ও সন্তুষ্ট হবে এমন কাজে সর্বদা সে ব্যস্ত থাকবে। আর সে এসব তখনই করতে পারবে যখন বান্দা বেশি বেশি আল্লাহকে স্মরণ করবে অন্তরে ও জবানে।

আল্লাহর জিকির ও স্মরণের মাঝে রয়েছে আশ্চর্য প্রভাব। এর মাধ্যমে বান্দার অন্তর শক্তিশালী ও সুদৃঢ় হয়। বান্দার অন্তর থেকে সকল প্রকার চিন্তা-পেরেশানি ও অস্থিরতা দূর হয়ে যায়। বান্দা তখন হয়ে ওঠে ফুরফুরে ও প্রশান্তময়। জিকিরের মাধ্যমে বান্দার হৃদয় হয়ে ওঠে আলো বিভাময়। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা কুরআনুল কারিমে জিকির প্রসঙ্গে ইরশাদ করেন,

أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
'জেনে রাখো, আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।³⁰

আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বান্দাদের বেশি বেশি জিকির করার আদেশ করেছেন। দাঁড়ানো অবস্থায় জিকির করতে বলেছেন। বসা অবস্থায় জিকির করতে বলেছেন। হৃদয় যখন প্রশান্ত থাকে তখন জিকির করতে বলেছেন। আমাদের হৃদয় যখন অস্থির ও বেকারার থাকে তখনও জিকির করতে বলেছেন। একটি মুহূর্তও যেন আল্লাহ তায়ালার জিকির থেকে বান্দা গাফেল না থাকে। বান্দা যে আল্লাহকে ভালোবাসার দাবি করে, সে ভালোবাসার স্বপক্ষে তো এটিই উত্তম দলিল ও নিদর্শন।

টিকাঃ
২৪. সুরা সাদ: ৪৪।
২৫. সুরা তুর: ৪৮।
২৬. সুরা নাহল: ১২৭।
২৭. সুরা বাকারা: ১৭৭।
২৮. সুরা বাকারা: ১৫৫।
২৯. সুরা মায়েদা: ৫৪।
৩০. সুরা রাদ: ২৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00