📄 নির্জনতা ও একাকীত্বকে ভালোবাসা
বান্দা আল্লাহকে ভালোবাসার প্রমাণ হলো, বান্দা একাত্ব ও নির্জনতাকে পছন্দ করা। একাকী নীরবে অত্যন্ত সঙ্গোপনে আল্লাহর ইবাদত ও প্রার্থনা করা। আল্লাহ তায়ালা আসমান থেকে যে কুরআন অবতীর্ণ করেছেন সে কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত করা। রাত্রি যখন গভীর হবে, পৃথিবী ছেয়ে যাবে নীরব-নিস্তব্ধতায়। সমগ্র জগৎ ঘুমিয়ে পড়বে রাত্রির নিকষ অন্ধকারে। বান্দা তখন চুপিচুপি জায়নামাজে দাঁড়াবে। অত্যন্ত বিনয় ও নম্রতার সাথে নামাজ আদায় করবে। রুকু করবে পরম ভালোবাসার সাথে। প্রতিটি তাসবিহ পাঠ করবে মধুরতার সাথে। সিজদা করবে ভালোবাসার সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটিয়ে। বান্দা সিজদায় নিজেকে মিটিয়ে দেবে প্রভুর কুদরতি কদমের সামনে। বিশ্বাস ও ভালোবাসার সাথে সিজদায় পড়ে প্রার্থনা করবে। আল্লাহর সামনে প্রবাহিত করবে আবেগ ও ভালোবাসার ঝরনা। আল্লাহকে ভালোবাসার জন্য বান্দা গোপন সময়ের অপেক্ষা করবে। একাকি শুধু আল্লাহকে ডেকে চলবে। কেউ শুনবে না সে ডাক। বান্দা ও প্রভুর মাঝে থাকবে না কোনো ব্যবধান। বান্দা অবিরত ডেকে যাবে প্রভু নামের তাসবিহ। সে ডাক শুনবেন আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা।
📄 আসমান-জমিনে ছড়িয়ে পড়ে ভালোবাসার বার্তা
বান্দা যখন আল্লাহ তায়ালাকে ভালোবাসে তখন ভালোবাসার সকল প্রমাণ পেশ করে। ভালোবাসার পরীক্ষায় বান্দা যখন উত্তীর্ণ হয় আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তখন আসমানের ফেরেশতা ও জমিনের অধিবাসীদের নিকট বার্তা প্রেরণ করেন যে, আমার অমুক বান্দা আমাকে ভালোবাসে, তোমরাও তাকে ভালোবাসো। সে আমার সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক স্থাপন করেছে, তোমরাও তার সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক স্থাপন করো। সে আমাকে স্মরণ করে, তোমরাও তাকে স্মরণ করো।
إِنَّ الله إذا أحب عبداً دعا جبريل فقال : إني أحب فلاناً فأحبه قال فيحبه جبريل ثم ينادي في السماء فيقول : إنَّ الله يحب فلاناً فأحبوه فيحبه أهل السماء ثم يوضع له القبول في الأرض.
'আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন তখন জিবরাইলকে ডেকে বলেন, আমি অমুক বান্দাকে ভালোবাসি, তুমিও তাকে ভালোবাসো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তখন জিবরাইল তাকে ভালোবাসেন। অতঃপর জিবরাইল আসমানে ঘোষণা দেন, আল্লাহ অমুক বান্দাকে ভালোবাসেন, তোমরাও তাকে ভালোবাসো। ফলে আসমানের অধিবাসীরা তাকে ভালোবাসে। অতঃপর দুনিয়ার লোকদের অন্তরেও তার প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেন।'¹⁹
আসমানের ফেরেশতা ও জমিনের অধিবাসীরা তখন ডেকে বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! সে-সমস্ত লোকদের চেনার উপায় কী যারা আপনাকে ভালোবাসে এবং আপনি তাদের ভালোবাসেন?
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পবিত্র কুরআনুল কারিমে তাদের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে,
وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلاماً، وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّداً وَقِيَاماً
'আল্লাহর বান্দা তারা, যারা পৃথিবীতে বিচরণ করে নম্রভাবে। মূর্খ ব্যক্তিরা যখন তাদের ডাকে তখন তারা বলে সালাম। এবং যারা রাত অতিবাহিত করে তাদের প্রতিপালককে সেজদা ও দাঁড়ানো অবস্থায়।'²⁰
وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَقِيَامًا ، وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا اصْرِفْ عَنَّا عَذَابَ جَهَنَّمَ إِنَّ عَذَابَهَا كَانَ غَرَامًا إِنَّهَا سَاءَتْ مُسْتَقَرًّا وَمُقَامٌ ۚ وَالَّذِينَ إِذَا أَنفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا • وَالَّذِينَ لَا يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَهَا آخَرَ وَلَا يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَا يَزْنُونَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ يَلْقَ أَثَامًا
'যারা রাত্রি অতিবাহিত করে তাদের প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সিজদাবনত হয়ে এবং দণ্ডায়মান থেকে। আর বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের থেকে জাহান্নামের শাস্তি দূর করে দিন। জাহান্নামের শাস্তি নিশ্চয় বিনাশ। নিশ্চয় তা অস্থায়ী ও স্থায়ী আবাসস্থল হিসেবে নিকৃষ্ট। যখন তারা ব্যয় করে তখন অপব্যয় করে না। কার্পণ্যও করে না। বরং তারা এ উভয়ের মাঝামাঝি অবস্থায়। তারা আল্লাহর সাথে কোনো উপাস্যকে ডাকে না। আল্লাহ যাদের হত্যা করতে নিষেধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে তাদের হত্যা করে না এবং তারা ব্যভিচার করে না। যে এগুলো করে সে শাস্তি ভোগ করবে। ²¹
وَالَّذِينَ لَا يَشْهَدُونِ الزُّورَ وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا
'যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না এবং বাজে কথা শুনতে পেলে সম্মান বাঁচিয়ে চলে যায়। '²²
যাদের মধ্যে এসব গুণ পাওয়া যাবে তারাই আল্লাহর বিশেষ বান্দা। তারাই অধিকতর ভালোবাসে আল্লাহকে। তাদের অন্তরে রয়েছে আল্লাহ তায়ালার প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা। তারা আল্লাহর মৌখিক স্তুতি ও বন্দনার পাশাপাশি আমলের মাধ্যমেও আল্লাহর ভালোবাসার প্রমাণ পেশ করে।
টিকাঃ
১৯. সহিহ বুখারি: ৩২০৯।
২০. সুরা ফুরকান: ৬৩।
২১. সুরা ফুরকান: ৬৪-৬৮।
২২. সুরা ফুরকান: ৭২।
📄 নিঝুম রাতের আঁধারে
যাদের নিকট রাত্রির শেষ প্রহরে ঘুম ও গল্প-গুজব আল্লাহর ইবাদতের চেয়ে অধিক প্রিয়, যাদের নিকট গভীর রাতে একান্তে আল্লাহর নিকট মুনাজাত করার চেয়ে অযথা কার্যকলাপ অধিক আনন্দের তারা আল্লাহর প্রিয় বান্দা নয়। যাদের মাঝে উল্লিখিত গুণাবলি নেই তাদের ভালোবাসার স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। তাদের কাছে যদি কোনো প্রমাণ থাকেও তা আল্লাহ তায়ালার নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। তারা যদি সত্যিই আল্লাহ তায়ালাকে ভালোবাসত তাহলে অবশ্যই তাদের নিকট শেষ রাতের প্রার্থনা প্রিয় ও আনন্দের বলে গণ্য হতো। তারা যদি প্রকৃতার্থেই আল্লাহকে ভালোবাসত তাহলে অবশ্যই তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অশ্রুসিক্ত প্রার্থনা করত। রাত্রির অখণ্ড নীরবতায় আল্লাহর প্রেমে মশগুল থাকত। এসবের মাধ্যমে অর্জন করত রবের সন্তুষ্টি।
কেননা, ভালোবাসার দাবি হলো, যাকে ভালোবাসবে তার সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা অর্জনে আপ্রাণ চেষ্টা করবে। বান্দা যদি প্রকৃতই আল্লাহকে ভালোবাসে তাহলে রাতের অন্ধকার দেখে সে খুশি হবে। কেননা রাতের অন্ধকারে মুনাজাত, কান্নাকাটি ও প্রার্থনা দুনিয়া ও আসমানের সকল বস্তু থেকে অধিক প্রিয় ও অত্যন্ত সুমিষ্ট। আল্লাহ প্রেমিকের নিকট রাতের নির্জন প্রহরের চেয়ে অধিক আনন্দের আর কোনো সময় নেই। রাতের সামান্য এক প্রহর নীরবতা তার নিকট দুনিয়া ও দুনিয়ার ভেতর যা আছে তার থেকে অত্যধিক মূল্যবান। কেননা, এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন এবং তার দিদার লাভ করা যায়। মোটকথা, আল্লাহকে ভালোবাসার সর্বাধিক বড় প্রমাণ হলো, বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের প্রচেষ্টায় অহর্নিশ مত্ত থাকবে। তার পূর্ণ আনুগত্য করবে। অবাধ্যতা ও পাপাচার থেকে বিরত থাকবে। নামাজ পড়বে। রোজা রাখবে। সদকাহ করবে। তার যাবতীয় আদেশ পালন করবে। সকল প্রকার নিষেধ থেকে সর্বতোভাবে বেঁচে থাকবে।
আল্লাহর প্রিয় বান্দা যারা আল্লাহকে ভালোবাসার দাবি করে, তাদের নিকট রাত অত্যন্ত প্রিয় মুহূর্ত। তাদের নিকট রাতের চেয়ে উত্তম সময় আর নেই। কেননা, রাতে প্রভুর সাক্ষাতে ধন্য হওয়া যায়। রাতের শেষ প্রহরে প্রভু তার বান্দাকে অনবরত ডাকতে থাকেন। বলতে থাকেন, কেউ আছো কি ক্ষমা প্রার্থনাকারী, আমি তাকে ক্ষমা করব। কেউ আছো কি তওবাকারী, আমি তার তওবা কবুল করব। কেউ আছো কি রিজিক প্রার্থনাকারী, আমি তার রিজিক বাড়িয়ে দেব। ভালোবাসার দাবি তো এটিই যে, প্রেমাস্পদের আহ্বানে সবকিছু পেছনে ফেলে ছুটে যাবে তার নিকট। আল্লাহকে ভালোবাসার দাবিকারী সে-সমস্ত বান্দাদের জন্য রাতের শেষ প্রহর হলো প্রেমাস্পদের ডাকে সাড়ে দিয়ে তার নিকট ছুটে যাওয়ার ন্যায়। নামাজ হলো আল্লাহর সাথে বান্দার কথোপকথন। প্রার্থনা হলো আল্লাহর সাথে বান্দার একান্তে আলাপন।
📄 খোদাপ্রেম পাগল এক দাসী
আবু আবদুল্লাহ নাবাজি বাজার থেকে একটি কালো দাসী ক্রয় করলেন। ক্রয় করার পর তিনি দাসীটিকে বললেন, 'আমি তোমাকে তোমার মালিকের নিকট থেকে ক্রয় করেছি। এখন আমি তোমার মালিক। এ কথা শুনে দাসীটি হাসল। আবু আবদুল্লাহ দাসীটিকে পাগল ধারণা করলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি পাগল? দাসী বলল, না আমি পাগল নই। এবার আবু আবদুল্লাহকে তার দাসী জিজ্ঞেস করল, আপনি কি আল্লাহর কিতাব কুরআন পড়তে পারেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি কুরআন পড়তে পারি। দাসী বলল, তাহলে কুরআন থেকে কিছু অংশ পড়ুন। তিনি পড়লেন কুরআনের কিছু আয়াত। আবদুল্লাহর কণ্ঠে কুরআনের তিলাওয়াত শুনে দাসী কাঁদতে লাগল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, কুরআন পড়ার স্বাদ যদি এত মধুর ও সুমিষ্ট হয়, তাহলে আল্লাহকে দেখার স্বাদ না জানি কত মধুর!
আবু, আবদুল্লাহ দাসীটিকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। যখন রাতের এক তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হলো আবু আবদুল্লাহ ঘুমের জন্য বিছানা তৈরি করলেন। এটা দেখে দাসী বলল, হে আমার মনিব, আপনার কি লজ্জা হয় না যে, আপনার প্রভু ঘুমান না, অথচ আপনি রাতের শুরুতেই ঘুমের জন্য তোড়জোড় শুরু করে দিলেন? এ তো ভারি আশ্চর্য! আপনি নিজেকে আল্লাহ তায়ালার বান্দা বলে দাবি করেন। দাবি করেন তাকে ভালোবাসার। অথচ তিনি ঘুমান না, আর আপনি রাতের শুরুতেই ঘুমের ঘোরে হারিয়ে যাচ্ছেন। হে আমার মনিব, যদি মুক্তি চান তো আল্লাহকে সন্তুষ্ট করুন। আর রাত হলো আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার সর্বাধিক উত্তম সময়।'
আবু আবদুল্লাহ বলেন, তারপর দাসীটি নামাজে দাঁড়িয়ে গেল। দীর্ঘ সময় নামাজ পড়ল। প্রতি রাকাতে দীর্ঘক্ষণ কুরআন তিলাওয়াত করল। প্রতিটি রুকু-সিজদা ছিল তার দীর্ঘ। নামাজ শেষে দু-হাত তুলে প্রার্থনা শুরু করে আল্লাহর নিকট। আমি দূর থেকে দেখছি চোখ তার অশ্রুসিক্ত। তার প্রার্থনার অশ্রুতে চোখ-মুখ ভেসে যাচ্ছিল। যেন পাহাড়ি ঝরনা থেকে গড়িয়ে পড়ছে অফুরন্ত পানির ফোয়ারা। আমার কর্ণকুহরে ভেসে আসছে তার প্রার্থনার ভাষা, সে কেঁদে কেঁদে বলছে আল্লাহর নিকট, 'হে আমার রব, আমার প্রতি তোমার ভালোবাসার শপথ করে বলছি, আমাকে তুমি ক্ষমা করে দাও। আমাকে তুমি কোনো প্রকার শাস্তি দিয়ো না। তোমার শাস্তি বড় মর্মন্তুদ।'
আবু আবদুল্লাহ বলেন, যখন সে তার দোয়া শেষ করল, আমি তাকে বললাম, তুমি কীভাবে বুঝলে যে, আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসেন? দাসী বলল, 'তিনি আমাকে তার সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ দিয়েছেন, আমাকে তার সামনে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার তাওফিক দিয়েছেন। অথচ এখন ঘুমের সময়। আল্লাহ আমাকে ঘুমের বিছানা থেকে তুলে তার ইবাদত করার জন্য নির্বাচিত করেছেন। এটিই এ কথার প্রমাণ যে, আমার প্রভু আমাকে ভালোবাসেন। তিনি আমাকে ভালোবাসেন বলেই আমাকে তার ইবাদত করার সুযোগ দিয়েছেন। সবাই যখন ঘুমের কোলে হারিয়ে যাচ্ছে তখন তিনি আমাকে জায়ানামাজে দাঁড়ানোর তাওফিক দিয়েছেন। এর মাধ্যমে আমি বুঝেছি, তিনি আমাকে ভালোবাসেন। হে আমার মনিব, আল্লাহ কি কুরআনে বলেননি এ কথা,
يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ
'আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন এবং তারা আল্লাহকে ভালোবাসে।'²³
টিকাঃ
২৩. সুরা মায়েদা: ৫৪।