📄 বান্দার হৃদয়কে করেন দয়ার্দ্র ও কোমল
আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে ভালোবাসার আরো প্রমাণ হলো, তিনি বান্দার অন্তরকে কোমল ও দয়ার্দ্র বানিয়ে দেন। বান্দার হৃদয়কে করে দেন অতিশয় দয়াবান ও সহানুভূতিশীল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
إنَّ الله إذا أحب أهل بيت أدخل عليهم الرفق
'আল্লাহ যখন কাউকে ভালোবাসেন তখন তার অন্তরে কোমলতা দান করেন।'⁸
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন তখন তিনি তাকে দয়ালু ও কোমল হৃদয়ের অধিকারী বানিয়ে দেন। মুমিনদের প্রতি সে দয়ালু হয়। বিপদে তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে। তাদের প্রয়োজন পূরণে সচেষ্ট হয়। আন্তরিকতা ও ভালোবাসার সাথে তাদের পাশে দাঁড়ায়। আর শত্রুদের প্রতি হয় কঠোর চিত্তের অধিকারী। কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা একে মুমিনের অন্যতম গুণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
أَشِدَّاء عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاء بَيْنَهُمْ
'তারা কাফেরদের ব্যাপারে হয় কঠিন আর পরস্পরে (মুমিনদের) প্রতি হয় দয়ালু।'⁹
অপর আয়াতে আরো ইরশাদ করেন,
أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ
'মুমিনদের ক্ষেত্রে তারা হয় নরম এবং কাফেরদের বিরুদ্ধে হয় রূঢ়।'¹⁰
যাদের অন্তরে দয়া ও অনুগ্রহ রয়েছে আল্লাহ তায়ালা তাদের ওপর দয়া ও অনুগ্রহ করেন। যাদের অন্তরে রয়েছে নম্রতা আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রতি নম্রতা প্রদর্শন করেন। যারা দয়ালু আচরণ করে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাদের সাথে দয়ালু আচরণ করেন। অন্যদের ওপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করেন।
টিকাঃ
৭. আস-সহিহাহ: ২৭১৪।
৮. সহিহ বুখারি: ৬৩৯৫।
৯. সুরা ফাতাহ: ২৯।
১০. সুরা মায়েদা: ৫৪।
📄 বান্দার ডাকে তিনি সাড়া দেন
আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে ভালোবাসার প্রমাণ ও নিদর্শন হলো, বান্দা যখন দোয়া করে তখন তিনি বান্দার দোয়া কবুল করেন। বান্দা যখন আল্লাহকে একান্তচিত্তে ডাকতে থাকে তখন তিনি বান্দার ডাকে সাড়া দেন। বান্দা যখন আল্লাহর নিকট কোনো প্রয়োজন পূরণের আরজি পেশ করে তখন তিনি বান্দার আরজি গ্রহণ করেন। বান্দা যখন অসুস্থতা থেকে আরোগ্য লাভের প্রার্থনা করে তখন তিনি বান্দাকে সুস্থতার নেয়ামত দান করেন। বান্দা যখন রিজিকের প্রশস্ততার কথা বলে তখন তিনি বান্দার রিজিক বাড়িয়ে দেন। মোটকথা, বান্দা যখন আল্লাহর নিকট প্রকাশ্যে ও গোপনে, একাকী ও নিবৃত্তে কিছু কামনা করে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বান্দাকে তা দিতে কোনো প্রকার কুণ্ঠিত হন না।
📄 বান্দার তিনি প্রশংসা করেন
আল্লাহ তার যে বান্দাকে ভালোবাসেন তার প্রতি তিনি সন্তুষ্ট হোন। তার প্রশংসা করেন। কেননা, ভালোবাসার প্রমাণ হলো, প্রিয় মানুষটি তার প্রতি সন্তুষ্ট হওয়া। তার প্রশংসা করা। তার স্তুতি ও বন্দনা গাওয়া। তাই ভালোবাসার নিদর্শন স্বরূপ আল্লাহ তায়ালা উক্ত বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হোন। নিজে তার প্রশংসা করেন। শুধু তাই নয়, আসমান ও জমিনের সকলের হৃদয়ে তার জন্য ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেন। ফলে তারাও তাকে ভালোবাসে।
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ الله إذا أحب عبداً دعا جبريل فقال : إني أحب فلاناً فأحبه قال فيحبه جبريل ثم ينادي في السماء فيقول : إنَّ الله يحب فلاناً فأحبوه فيحبه أهل السماء ثم يوضع له القبول في الأرض.
'আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন তখন জিবরাইলকে ডেকে বলেন, আমি অমুক বান্দাকে ভালোবাসি, তুমিও তাকে ভালোবাসো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তখন জিবরাইল তাকে ভালোবাসেন। অতঃপর জিবরাইল আসমানে ঘোষণা দেন, আল্লাহ অমুক বান্দাকে ভালোবাসেন, তোমরাও তাকে ভালোবাসো। ফলে আসমানের অধিবাসীরা তাকে ভালোবাসে। অতঃপর দুনিয়ার লোকদের অন্তরেও তার প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেন।'¹¹
অপর হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
ما من عبد إلا وله صيت في السماء فإذا كان صيته في السماء حسناً وضع في الأرض وإن كان صيته في السماء سيئاً وضع في الأرض.
'আসমানে (ফেরেশতাদের নিকট) সকল মানুষের প্রশংসা রয়েছে। কারো প্রশংসা যদি ভালো হয় তাহলে পৃথিবীতে (মানুষের মাঝে) অনুরূপ তার ভালো প্রশংসা ছড়িয়ে পড়ে। আর যদি মন্দ হয় তাহলে অনুরূপ মন্দ প্রশংসা ছড়িয়ে পড়ে। ¹²
হযরত আবু জর রা. থেকে বর্ণিত, একদা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো,
أرأيت الرجل يعمل العمل من الخير ويحمده الناس وفي رواية ويحبه الناس عليه.. قال : تلك عاجل بشرى المؤمن.
'আপনি কি ঐ ব্যক্তিকে দেখেছেন, যে সৎকাজ করে এবং লোকেরা তার সৎকাজের জন্য প্রশংসা করে? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিনের জন্য তা অগ্রিম সুসংবাদ (পুরস্কার)। ¹³
টিকাঃ
১১. সহিহ বুখারি: ৩২০৯।
১২. আল-জামে: ৫৭৩২।
১৩. সহিহ মুসলিম: ৪৯০৯।
📄 সমূহ বিপদ-মুসিবত দ্বারা পরীক্ষা করেন
আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে ভালোবাসার প্রমাণ ও নিদর্শন হলো, তিনি বান্দাকে অসংখ্য বিপদ-আপদ দিয়ে পরীক্ষা করেন যা তার গোনাহসমূহ মিটিয়ে দেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
ما يزال البلاء بالمؤمن والمؤمنة في نفسه، وولده، وماله حتى يلقى الله وما عليه خطيئة
'মুমিন নারী-পুরুষের তার জীবন, তার সন্তান-সন্ততি, তার মাল-সম্পদের ওপর মৃত্যু পর্যন্ত বিভিন্ন বিপদ-মুসিবত আসতে থাকে। এবং সেগুলো তার গোনাহকে মিটিয়ে দেয়। ¹⁴
হ্যাঁ, আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা যখন কোনো সম্প্রদায়কে ভালোবাসেন তখন তিনি তাদের নানান পরীক্ষায় ফেলেন। কখনো দুনিয়াকে তাদের ওপর সংকীর্ণ করে দেন। কখনো তাদের জীবিকা ও রিজিক সংকুচিত করে দেন। আবার কখনো তাদের জান-মাল, পরিবার-পরিজনের ওপর চাপিয়ে দেন বিপদ মুসিবত। বস্তুত এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা তাদের অন্তরকে পার্থিব সকল অনুরাগ ও ব্যস্ততা থেকে মুক্ত করে কেবল তার একনিষ্ঠ ভালোবাসা দ্বারা পরিপূর্ণ করেন। বান্দা যখন বিপদ-আপদের নানামুখী পরীক্ষার সম্মুখীন হয় তখন পূর্বের চেয়ে অধিক বেশি আল্লাহর দিকে ধাবিত হয়। তার অন্তর তখন সর্বদা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে স্মরণ করতে থাকে। রাতের গভীরে, দিনের আলোতে, সালাতের পর আল্লাহ তায়ালাকে সে একান্তে হৃদয়ের আবেগ ও মাধুরী মিশিয়ে ডাকতে থাকে।
আনুগত্য ও ইবাদত অধিকতর বাড়িয়ে দেয়। রাতের শেষ প্রহরে অশ্রুভেজা প্রার্থনা করে মহান প্রভুর দরবারে। এভাবে বান্দা আল্লাহর অধিকতর নৈকট্য লাভ করে। তার সন্তুষ্টি অর্জন করে। পার্থিব জীবনে মুমিনদের ওপর যত বিপদ-মুসিবত আপতিত হয় এর সবকিছু তাদের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ। এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা পরীক্ষা করে দেখেন বান্দাদের মধ্যে কারা তার অনুগত এবং কারা তার অবাধ্য। কারা ধৈর্যশীল আর কারা অসহিষ্ণুপ্রবণ। যারা সকল বিপদ-মুসিবতে ধৈর্যধারণ করে, আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার আনুগত্য ও ইবাদত বাড়িয়ে দেয় তারা হলো আল্লাহর প্রিয় ও অনুগত বান্দা। তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়া-আখেরাতে বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা। পক্ষান্তরে যারা পার্থিব বিপদ-মুসিবতে অধৈর্য হয়ে পড়ে, আল্লাহর ওপর ভরসা হারিয়ে ফেলে, ইবাদত-আনুগত্য ছেড়ে দেয় তারা আল্লাহর অপ্রিয় বান্দা। দুনিয়া-আখেরাতে তাদের জন্য রয়েছে সীমাহীন লাঞ্ছনা ও মর্মন্তুদ শাস্তি। কথায় আছে, বিপদে বন্ধুর পরিচয়। সংকটের মুহূর্তে পার্থক্য হয় কে উত্তম বন্ধু আর কে ধোঁকাবাজ।
ভালোবাসার দাবি তো এটিই যে, বিপদ-মুসিবতের মাধ্যমে তাকে পরীক্ষা করা হবে। তাই মুমিনদের উচিত, পার্থিব জীবনের সকল বিপদ-মুসিবতে ধৈর্যধারণ করা। সুদিনে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করার পাশাপাশি দুর্দিনে ধৈর্য ধারণ করা। সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর ভরসা স্থাপন করা। সকল দুঃখ- কষ্ট, অভাব-অনটনকে আল্লাহর পরীক্ষা হিসেবে গ্রহণ করা এবং তাতে সফলভাবে উত্তীর্ণ হওয়া।
আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারিমে ইরশাদ করেন,
وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ حَتَّى نَعْلَمَ الْمُجَاهِدِينَ مِنكُمْ وَالصَّابِرِينَ وَنَبْلُوَ أَخْبَارَكُمْ
'আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব, যতক্ষণ না তোমাদের মধ্য থেকে জিহাদকারী ও ধৈর্যশীলদের বেছে নেই এবং তোমাদের তথ্যসমূহ যাচাই করি।'¹⁵
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
وإنَّ الله إذا أحب قوماً ابتلاهم
'আল্লাহ যখন কোনো সম্প্রদায়কে ভালোবাসেন তখন তাদের তিনি পরীক্ষা করেন।'¹⁶
অপর হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
وعلى قدر الإيمان يكون البلاء.
'আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে তার ঈমান অনুযায়ী পরীক্ষা করেন।'
টিকাঃ
১৪. সুনানুত তিরমিযি: ২৩৯৯।
১৫. সুরা মুহাম্মদ: ৩১।
১৬. ইবনে মাজাহঃ ৪০৩১।