📄 উত্তম পদ্ধতিতে লালন-পালন
আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে ভালোবাসার প্রমাণ হলো, দুনিয়াতে তিনি তার বান্দাকে সুন্দর ও অতি উত্তম পদ্ধতিতে লালন-পালন করেন। তিনি বান্দাকে শৈশব, কৈশোর, যৌবন, বার্ধক্য ও মৃত্যু পর্যন্ত একটি সুন্দর ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার ভেতর লালন-পালন করেন। আল্লাহ তায়ালা বান্দার অন্তরকে ঈমানের রশ্মি দ্বারা আলোকিত করেন। তাকে দান করেন শানিত জ্ঞান, প্রখর মেধা ও পরিণত বোধ-বুদ্ধি। আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে তার ইবাদতের জন্য নির্বাচন করেছেন। বান্দার অন্তর ও জিহ্বাকে দিবা-রাত্রি তার জিকির ও স্মরণে ব্যস্ত রাখেন। বান্দার সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে তার সেবা ও সন্তুষ্টি অর্জনে ব্যতিব্যস্ত রাখেন। বান্দার সকল কাজ-কর্ম তিনি অত্যন্ত সহজভাবে সম্পাদন করে দেন। তাদের বাহির ও ভেতরকে সুন্দর ও সুসজ্জিত করে দেন। তাদের তিনি সরল ও সঠিক পথে পরিচালিত করেন। বর্ণিত হয়েছে,
عن ابن مسعود رضي الله عنه قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : إنَّ الله قسم بينكم أخلاقكم كما قسم بينكم أرزاقكم.. وإنَّ الله يعطي الدنيا من يحب، ومن لا يحب.. ولا يعطي الإيمان إلا من يحب .. ولن تؤمن والله حتى.. يكون الله ورسوله أحب إليك مما سواهما
'হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আল্লাহ তায়ালা রিজিক যেমন তোমাদের মাঝে বণ্টন করেছেন, তেমনি বণ্টন করেছেন তোমাদের স্বভাব-চরিত্রকেও। তিনি যাকে ভালোবাসেন এবং যাকে ভালোবাসেন না সকলকেই দুনিয়ার নেয়ামত দান করেন। কিন্তু ঈমান কেবল তাদেরকেই দান করেন যাদের তিনি ভালোবাসেন। আল্লাহর শপথ! তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আল্লাহ ও তার রাসুলকে সকল কিছু থেকে অধিক ভালোবাসবে।''
📄 বান্দার হৃদয়কে করেন দয়ার্দ্র ও কোমল
আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে ভালোবাসার আরো প্রমাণ হলো, তিনি বান্দার অন্তরকে কোমল ও দয়ার্দ্র বানিয়ে দেন। বান্দার হৃদয়কে করে দেন অতিশয় দয়াবান ও সহানুভূতিশীল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
إنَّ الله إذا أحب أهل بيت أدخل عليهم الرفق
'আল্লাহ যখন কাউকে ভালোবাসেন তখন তার অন্তরে কোমলতা দান করেন।'⁸
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন তখন তিনি তাকে দয়ালু ও কোমল হৃদয়ের অধিকারী বানিয়ে দেন। মুমিনদের প্রতি সে দয়ালু হয়। বিপদে তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে। তাদের প্রয়োজন পূরণে সচেষ্ট হয়। আন্তরিকতা ও ভালোবাসার সাথে তাদের পাশে দাঁড়ায়। আর শত্রুদের প্রতি হয় কঠোর চিত্তের অধিকারী। কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা একে মুমিনের অন্যতম গুণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
أَشِدَّاء عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاء بَيْنَهُمْ
'তারা কাফেরদের ব্যাপারে হয় কঠিন আর পরস্পরে (মুমিনদের) প্রতি হয় দয়ালু।'⁹
অপর আয়াতে আরো ইরশাদ করেন,
أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ
'মুমিনদের ক্ষেত্রে তারা হয় নরম এবং কাফেরদের বিরুদ্ধে হয় রূঢ়।'¹⁰
যাদের অন্তরে দয়া ও অনুগ্রহ রয়েছে আল্লাহ তায়ালা তাদের ওপর দয়া ও অনুগ্রহ করেন। যাদের অন্তরে রয়েছে নম্রতা আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রতি নম্রতা প্রদর্শন করেন। যারা দয়ালু আচরণ করে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাদের সাথে দয়ালু আচরণ করেন। অন্যদের ওপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করেন।
টিকাঃ
৭. আস-সহিহাহ: ২৭১৪।
৮. সহিহ বুখারি: ৬৩৯৫।
৯. সুরা ফাতাহ: ২৯।
১০. সুরা মায়েদা: ৫৪।
📄 বান্দার ডাকে তিনি সাড়া দেন
আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে ভালোবাসার প্রমাণ ও নিদর্শন হলো, বান্দা যখন দোয়া করে তখন তিনি বান্দার দোয়া কবুল করেন। বান্দা যখন আল্লাহকে একান্তচিত্তে ডাকতে থাকে তখন তিনি বান্দার ডাকে সাড়া দেন। বান্দা যখন আল্লাহর নিকট কোনো প্রয়োজন পূরণের আরজি পেশ করে তখন তিনি বান্দার আরজি গ্রহণ করেন। বান্দা যখন অসুস্থতা থেকে আরোগ্য লাভের প্রার্থনা করে তখন তিনি বান্দাকে সুস্থতার নেয়ামত দান করেন। বান্দা যখন রিজিকের প্রশস্ততার কথা বলে তখন তিনি বান্দার রিজিক বাড়িয়ে দেন। মোটকথা, বান্দা যখন আল্লাহর নিকট প্রকাশ্যে ও গোপনে, একাকী ও নিবৃত্তে কিছু কামনা করে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বান্দাকে তা দিতে কোনো প্রকার কুণ্ঠিত হন না।
📄 বান্দার তিনি প্রশংসা করেন
আল্লাহ তার যে বান্দাকে ভালোবাসেন তার প্রতি তিনি সন্তুষ্ট হোন। তার প্রশংসা করেন। কেননা, ভালোবাসার প্রমাণ হলো, প্রিয় মানুষটি তার প্রতি সন্তুষ্ট হওয়া। তার প্রশংসা করা। তার স্তুতি ও বন্দনা গাওয়া। তাই ভালোবাসার নিদর্শন স্বরূপ আল্লাহ তায়ালা উক্ত বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হোন। নিজে তার প্রশংসা করেন। শুধু তাই নয়, আসমান ও জমিনের সকলের হৃদয়ে তার জন্য ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেন। ফলে তারাও তাকে ভালোবাসে।
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ الله إذا أحب عبداً دعا جبريل فقال : إني أحب فلاناً فأحبه قال فيحبه جبريل ثم ينادي في السماء فيقول : إنَّ الله يحب فلاناً فأحبوه فيحبه أهل السماء ثم يوضع له القبول في الأرض.
'আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন তখন জিবরাইলকে ডেকে বলেন, আমি অমুক বান্দাকে ভালোবাসি, তুমিও তাকে ভালোবাসো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তখন জিবরাইল তাকে ভালোবাসেন। অতঃপর জিবরাইল আসমানে ঘোষণা দেন, আল্লাহ অমুক বান্দাকে ভালোবাসেন, তোমরাও তাকে ভালোবাসো। ফলে আসমানের অধিবাসীরা তাকে ভালোবাসে। অতঃপর দুনিয়ার লোকদের অন্তরেও তার প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেন।'¹¹
অপর হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
ما من عبد إلا وله صيت في السماء فإذا كان صيته في السماء حسناً وضع في الأرض وإن كان صيته في السماء سيئاً وضع في الأرض.
'আসমানে (ফেরেশতাদের নিকট) সকল মানুষের প্রশংসা রয়েছে। কারো প্রশংসা যদি ভালো হয় তাহলে পৃথিবীতে (মানুষের মাঝে) অনুরূপ তার ভালো প্রশংসা ছড়িয়ে পড়ে। আর যদি মন্দ হয় তাহলে অনুরূপ মন্দ প্রশংসা ছড়িয়ে পড়ে। ¹²
হযরত আবু জর রা. থেকে বর্ণিত, একদা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো,
أرأيت الرجل يعمل العمل من الخير ويحمده الناس وفي رواية ويحبه الناس عليه.. قال : تلك عاجل بشرى المؤمن.
'আপনি কি ঐ ব্যক্তিকে দেখেছেন, যে সৎকাজ করে এবং লোকেরা তার সৎকাজের জন্য প্রশংসা করে? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিনের জন্য তা অগ্রিম সুসংবাদ (পুরস্কার)। ¹³
টিকাঃ
১১. সহিহ বুখারি: ৩২০৯।
১২. আল-জামে: ৫৭৩২।
১৩. সহিহ মুসলিম: ৪৯০৯।