📄 যে নারী জাহান্নামে প্রবেশ করবে খেজুরের পাকানো রশি গলায় দিয়ে
تَبَّتْ يَدًا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ. مَا أَغْنَى عَنْهُ مَالُهُ وَمَا كَسَبَ. سَيَصْلَى نَارًا ذَاتَ لَهَبٍ. وَامْرَأَتُهُ حَتَّالَةَ الْحَطَبِ فِي جِيْدِهَا حَبْلٌ مِّن مَّسَدٍ.
অর্থ: ভেঙে গেছে আবু লাহাবের দুই হাত এবং ব্যর্থ হয়েছে সে। তার ধন-সম্পদ এবং যা কিছু সে উপার্জন করেছে তা তার কোনো কাজে লাগেনি। অবশ্যই সে লেলিহান আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে এবং (তার সাথে) তার স্ত্রীও, লাগানো ভাঙানো চোগলখুরী করে বেড়ানো যার কাজ, তার গলায় থাকবে খেজুর ডালের আঁশের পাকানো শক্ত রশি। (সূরা লাহাব: আয়াত: ১-৫)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: আবু লাহাবের আসল নাম ছিল আবদুল উযযা। তাকে আবু লাহাব বলে ডাকার কারণ, তার গায়ের রং ছিল উজ্জ্বল সাদা লালে মেশানো। লাহাব বলা হয় আগুনের শিখাকে। কাজেই আবু লাহাবের মানে হচ্ছে আগুন বরণ মুখ। এখানে তার আসল নামের পরিবর্তে ডাক নামে উল্লেখ করার কয়েকটি কারণ রয়েছে। যেমন-
• মূল নামের পরিবর্তে ডাকনামেই সে বেশি পরিচিত ছিল。
• দ্বিতীয় কারণ, তার আবদুল উযযা (অর্থাৎ উযযার দাস) নামটি ছিল একটি মুশরিকী নাম। কুরআনে তাকে এ নামে উল্লেখ করা পছন্দ করা হয়নি。
• তৃতীয় কারণ, এ সূরায় তার যে পরিণতি বর্ণনা করা হয়েছে তার সাথে তার এ ডাকনামই বেশি সম্পর্কিত。
تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ এর অর্থ কোন কোন তাফসীরকার করেছেন, "ভেঙে যাক আবু লাহাবের হাত " এবং رَّبَّ শব্দের মানে করেছেন, "সে ধ্বংস হয়ে যাক " অথবা "সে ধবংস হয়ে গেছে।" কিন্তু আসলে এটা তার প্রতি কোনো ধিক্কার নয়; বরং এটা একটা ভবিষ্যদ্বাণী। এখানে ভবিষ্যতে যে ঘটনাটি ঘটবে তাকে অতীতে কালের অর্থ প্রকাশক শব্দের সাহায্যে বর্ণনা করা হয়েছে। এর মানে, তার হওয়াটা যেন এত বেশি নিশ্চিত যেমন তা হয়ে গেছে। আর আসলে শেষ পর্যন্ত তাই হলো যা এ সূরায় কয়েক বছর আগে বর্ণনা করা হয়েছিল। হাত ভেঙে যাওয়ার মানে শরীরের একটি অংগ যে হাত সেটি ভেঙে যাওয়া নয়; বরং কোনো ব্যক্তি যে উদ্দেশ্য সম্পন্ন করার জন্য তার সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে তাতে পুরোপুরি ও চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়ে যাওয়াই এখানে বুঝানো হয়েছে। আর আবু লাহাব রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দাওয়াতকে ক্ষতিগ্রস্ত করা জন্য যথার্থই নিজের সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল। কিন্তু এ সূরাটি নাযিল হবার মাত্র সাত আট বছর পরেই বদরের যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। এ যুদ্ধে কুরাইশদের অধিকাংশ বড় বড় সরদার নিহত হয়। তারা সবাই ইসলাম বিরোধিতা ও ইসলামের প্রতি শত্রুতার ক্ষেত্রে আবু লাহাবের সহযোগী ছিল। এ পরাজয়ের খবর মক্কায় পৌঁছার পর সে এত বেশি মর্মাহত হয় যে,
এরপর সে সাত দিনের বেশি জীবিত থাকতে পারেনি। তার মৃত্যুর ছিল বড়ই ভয়াবহ ও শিক্ষাপ্রদ। তার শরীরে সাংঘাতিক ধরনের ফুসকুড়ি (Malignant pustule) দেখা দেয়। রোগ সংক্রমণের ভয়ে পরিবারের লোকেরা তাকে ছেড়ে পালিয়ে যায়। মরার পরও তিন দিন পর্যন্ত তার ধারে কাছে কেউ ঘেঁসেনি। ফলে তার লাশে পচন ধরে। চারদিকে দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে। শেষে লোকেরা তার ছেলেদেরকে ধিক্কার দিতে থাকে। একটি বর্ণনা অনুসারে তখন তারা মজুরীর বিনিময়ে তার লাশ দাফন করার জন্য কয়েকজন হাবশীকে নিয়োগ করে এবং তারা তার লাশ দাফন করে। অন্য এক বর্ণনা অনুসারে, তারা গর্ত খুঁড়ে লম্বা লাঠি দিয়ে তার লাশ তার মধ্যে ফেলে দেয় এবং ওপর থেকে তার ওপর মাটি চাপা দেয়। যে দীনের অগ্রগতির পথ রোধ করার জন্য সে তার সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল তার সন্তানদের সেই দীন গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে তার আরো বেশি ও পূর্ণ পরাজয় সম্পন্ন হয়। সর্বপ্রথম তার মেয়ে দাররা হিজরাত করে মক্কা থেকে মদীনায় চলে যান এবং ইসলাম গ্রহণ করেন। আর মক্কা বিজয়ের পর তার দুই ছেলে উতবা ও মু'আত্তাব আব্বাসের করেন এবং তাঁর হাতে বাইআত করেন。
আবু লাহাব ছিল হাড়কৃপণ ও অর্থলোলুপ। ইবনে আসীরর বর্ণনা মতে, জাহেলী যুগে একবার তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল যে, সে কা'বা ঘরের কোষাগার থেকে দু'টি সোনার হরিণ চুরি করে নিয়েছে। যদিও পরবর্তী পর্যায়ে সেই হরিণ দু'টি অন্য একজনের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় তবুও তার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আনার ফলে তার সম্পর্কে মক্কার লোকদের মনোভাব উপলব্ধি করা যায়। তার ধনাঢ্যতা সম্পর্কে কাজী রশীদ ইবনে যুবাইর তাঁর " আযযাখায়ের ওয়াত'তুহাফ" )الذَّخَابِرُ وَالتَّحَف( গ্রন্থে লিখেছেন, কুরাইশদের মধ্যে যে চারজন লোক এক কিনতার (এক কিনতার = দু'শো আওকিয়া আর এক আওকিয়া = সোয়া তিন তোলা কাজেই এক কিনতার সমান ৮০ তোলার সেরের ওজনে ৮ সের ১০ তোলা) সোনার মালিক ছিল আবু লাহাব তাদের একজন। তার অর্থ লোলুপতা কী পরিমাণ ছিল বদর যুদ্ধের সময়ের ঘটনা থেকে তা আন্দাজ করা যেতে পারে। এ যুদ্ধে তার ধর্মের ভাগ্যের ফায়সালা হতে যাচ্ছিল। কুরাইশদের সব সরদার এ যুদ্ধে অংশ নেবার জন্য রওয়ানা হয়। কিন্তু আবু লাহাব নিজে না গিয়ে নিজের পক্ষ থেকে আস ইবনে হিশামকে পাঠায়। তাকে বলে দেয়, তার কাছে সে যে চার হাজার দিরহাম পায় এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার কারণে এর বদলে তার সেই ঋণ পরিশোধ হয়েছে বলে ধরে নেয়া হবে। এভাবে সে নিজের ঋণ আদায় করার একটা কৌশল বের করে নেয়। কারণ আস দেওলিয়া হয়ে গিয়েছিল। ঋণ পরিশোধের কোনো ক্ষমতাই তার ছিল না。
কোনো কোনো তাফসীরকার مَا كَسَبَ শব্দটিকে উপার্জন অর্থে নিয়েছেন। অর্থাৎ নিজের অর্থ থেকে সে যে মুনাফা অর্জন করেছে তা তার উপার্জন। আবার অন্য কয়েকজন
তাফসীরকার এর অর্থ নিয়েছেন সন্তান-সন্ততি। কারণ রাসূলুল্লাহ বলেছেন, সন্তানরা মানুষের উপার্জন (আবু দাউদ ও ইবনে আবী হাতেম)। এ দু'টি অর্থই আবু লাহাবের পরিণতির সাথে সম্পর্কিত। কারণ সে মারাত্মক ফুসকুড়ি রোগে আক্রান্ত হলে তার সম্পদ তার কোনো কাজে লাগেনি এবং তার সন্তানরা ও তাকে অসহায়ভাবে মৃত্যুবরণ করার জন্য ফেলে রেখে গিয়েছিল। তার ছেলেরা তার লাশটি মর্যাদা সহকারে কাঁধে উঠাতেও চাইল না। এভাবে এ সূরায় আবু লাহাব সম্পর্কে যে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই তা সত্য হতে দেখলো。
আবু লাহাবের স্ত্রীর নাম ছিল 'আরদা'। 'উম্মে জামীল' ছিল তার ডাক নাম। সে ছিল আবু সুফিয়ানের বোন। রাসূলুল্লাহ -এর সাথে শত্রুতার ব্যাপারে সে তার স্বামী আবু লাহাবের চাইতে কোনো অংশে কম ছিল না। আবু বকরের মেয়ে আসমা বর্ণনা করেছেন, এ সূরাটি নাযিল হবার পর উম্মে জামীল যখন এটি শুনলো, সে ক্রোধে ক্ষিপ্ত হয়ে রাসূলুল্লাহ -এর খোঁজে বের হলো। তার হাতের মুঠোয় পাথর ভরা ছিল রাসূলুল্লাহকে গালাগালি করতে করতে নিজের রচিত কিছু কবিতা পড়ে চলছিল। এ অবস্থায় সে কা'বা ঘরে পৌঁছে গেলো। সেখানে রাসূলুল্লাহ আবু বকরের সাথে বসেছিলেন। আবু বকর বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! দেখুন সে আসছে। আমার আশঙ্কা হচ্ছে, সে আপনাকে দেখে কিছু অভদ্র আচরণ করবে। তিনি বললেন, সে আমাকে দেখতে পাবে না। বাস্তবে হলোও তাই। তাঁর উপস্থিতি সত্ত্বেও সে তাঁকে দেখতে পেলো না। সে আবু বকরকে জিজ্ঞেস করলো, শুনলাম তোমার সাথী আমার নিন্দা করেছে। আবু বকর জবাব দিলেন, এ ঘরের রবের কসম, তিনি তো তোমার কোনো নিন্দা করেননি। একথা শুনে সে ফিরে গেলো (ইবনে আবু হাতেম, সীরাতে ইবন হিশাম। বাযযারও প্রায় একই ধরনের একটি রেওয়ায়াত আবুদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে উদ্ধৃত করেছেন)। আবু বকরের এ জবাবের অর্থ ছিল, নিন্দা তো আল্লাহ করেছেন রাসূলুল্লাহ করেননি。
মূল শব্দ হচ্ছে حَبَّالَةَ الْحَطَبَ এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে, "কাঠ বহনকারিণী।" মুফাসসিরগণ এর বহু বর্ণনা করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস ইবনে যায়েদ, যাহহাক ও রাবী ইবনে আনাস বলেন, সে রাতের বেলা কাঁটা গাছের ডালপালা এনে রাসূলুল্লাহ-এর দরজায় ফেলে রাখতো। তাই তাকে কাঠ বহনকারিণী বলা হয়েছে। কাতাদাহ, ইকরামা, হাসান বরসী, মুজাহিদ ও সুফিয়ান সওরী বলেন, সে লোকদের মধ্যে ফিতনা ফাসাদ সৃষ্টি করার জন্য চোগলখুরী করে বেড়াতো। তাই আরবী প্রবাদ অনুযায়ী তাকে কাঠ বহনকারিণী বলা হয়েছে। কারণ যারা এর কথা ওর কাছে বলে এবং লাগানো ভাঙানোর কাজ করে ফিতনা-ফাসাদের আগুন জ্বালাবার চেষ্টা করে আরবরা তাদেরকে কাঠ বহনকারিণী বলে থাকে। এ প্রবাদ অনুযায়ী "হাম্মালাতাল হাতাব" শব্দের সঠিক অনুবাদ হচ্ছে, "যে লাগানো ভাঙানোর কাজ করে।" সাঈদ ইবনে জুবাইর বলেন, যে ব্যক্তি নিজের পিঠে গোনাহের বোঝা বহন করে আরবী প্রবাদ অনুসারে তার সম্পর্কে
বলা হয়, فُلَانٌ يَحْطَتِبُ عَلَى ظَهْرِهِ (অর্থাৎ অমুক ব্যক্তি নিজের পিঠে কাঠ বহন করছে)। কাজেই হাম্মালাতাল হাতাব (حَالَةَ الْحَطَبَ) মানে হচ্ছে, "গোনাহের বোঝা বহনকারিণী।" মুফাসসিরগণ এর আরো একটি অর্থও বর্ণনা করেছেন। সেটি হচ্ছে, আখেরাতে তার এ অবস্থা হবে। অর্থাৎ সেখানে যে আগুনে আবু লাহাব পুড়তে থাকবে তাতে সে (উম্মে জামীল) কাঠ বহন করে এনে ফেলতে থাকবে。
তার গলার জন্য জীদ جِیْدٌ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। আরবী ভাষায় যে গলায় অলংকার পরানো হয়েছে তাকে জীদ বলা হয়। সাঈদ ইবনুল মুসাইয়েব, হাসান বসরী ও কাতাদা বলেন, এ হার বিক্রি করে আমি এর মূল্য বাবদ পাওয়া সমস্ত অর্থ মুহাম্মাদের বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক কাজ করার জন্য ব্যয় করবো। এ কারণে জীদ শব্দটি এখানে ব্যবহার করা হয়েছে ব্যঙ্গার্থে। অর্থাৎ এ অলংকার পরিহিত সুসজ্জিত গলায়, যেখানে পরিহিত হার নিয়ে সে গর্ব করে বেড়ায়, কিয়ামতের দিন সেখানে রশি বাঁধা হবে। এটা ঠিক সমপর্যায়েরই ব্যাঙ্গাত্মক বক্তব্য যেমন কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বলা হয়েছে : بَشِّرُهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيْمٍ "তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আযাবের সুসংবাদ দাও।"
তার গলায় বাঁধা রশিটির জন্য حَبْلٌ مِّنْ مَّسَدِ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ সে রশিটি হবে 'মাসাদ' ধরনের। অভিধানবিদ ও মুফাসসিরগণ এ শব্দটির বহু অর্থ বর্ণনা করেছেন। এ সম্পর্কিত একটি বক্তব্য হচ্ছে, খুব মজবুত করে পাকানো রশিকে মাসাদ বলা হয়। দ্বিতীয় বক্তব্য হচ্ছে, খেজুর গাছের (ডালের) ছাল থেকে তৈরি রশি মাসাদ নামে পরিচিত। এ সম্পর্কে তৃতীয় বক্তব্য হচ্ছে, এর মানে খেজুরের ডালের গোড়ার দিকের মোটা অংশ থেঁতলে যে সরু আঁশ পাওয়া যায় তা দিয়ে পাকানো রশি অথবা উটের চামড়া বা পশম দিয়ে তৈরি রশি। আর একটি বক্তব্য হচ্ছে, এর অর্থ লোহার তারের পাকানো রশি।