📄 নাযিলের সময়
মুফাসসির ও মুহাদ্দিসগণ একযোগে এ সূরা নাযিলের নিম্নরূপ কারণ বর্ণনা করেছেন। একবার নবী-এর মজলিসে মক্কা মুয়ায্যমার কয়েক জন বড় বড় সরদার বসেছিলেন। তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে উদ্যোগী করার জন্য তিনি তাদের সামনে ইসলামের দাওয়াত পেশ করছিলেন। এমন সময় ইবনে উম্মে মাকতুম নামক একজন অন্ধ তাঁর খেদমতে হাজির হলেন এবং তাঁর কাছে ইসলাম সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করতে চাইলেন। তার এই প্রশ্নে সরদারদের সাথ আলাপে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় নবী বিরুক্ত হলেন। তিনি তার কথায় কান দিলেন না। এই ঘটনায় আল্লাহর পক্ষ থেকে এ ই সূরাটি নাযিল হয়। এ ঐতিহাসিক ঘটনার কারণে এ সূরা নাযিলের সময় কাল সহজেই নির্দিষ্ট হয়ে যায়。
এ ব্যাপারে প্রথম কথা হচ্ছে, ইবনে উম্মে মাকতুম একেবারেই প্রথম দিকে ইসলাম গ্রহণকারীদের একজন。
দ্বিতীয়, যেসব হাদীসে এ ঘটনাটি বর্ণনা করা হয়েছে তার কোনো কোনোটি থেকে জানা যায়, এ ঘটনাটির আগেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। আবার কোনো কোনো হাদীস থেকে প্রকাশ হয়, এ সময় তিনি ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন এবং সত্যের সন্ধানেই নবী-এর কাছে এসেছিলেন। আয়েশার বর্ণনা মতে, তিনি এসে বলেছিলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে সত্য সরল পথ দেখিয়ে দিন।" (তিরমিয, হাকেম ইবনে হিব্বান, ইবনে জারীর, আবু লাইলা)
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেছেন, তিনি এসেই কুরআনের একটি আয়াতের অর্থ জিজ্ঞেস করতে থাকেন এবং নবীকে বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আপানাকে যে জ্ঞান শিখিয়েছেন আমাকে সেই জ্ঞান শেখান।" (ইবনে জারীর, ইবনে আবী হাতেম)
এসব বর্ণনা থেকে জানা যায়, তিনি নবীকে আল্লাহর নবী এবং কুরআনকে আল্লাহর কিতাব বলে মেনে নিয়েছিলেন। অন্যদিকে ইবনে যায়েদ তৃতীয় আয়াতে উল্লেখিত "হয়তো সে ইসলাম গ্রহণ করবে”। (ইবনে জারীর)
আবার আল্লাহ নিজেই বলেছেন, "তুমি কী জানো হয়তো, সে সংশোধিত হয়ে যাবে অথবা উপদেশের প্রতি মনোযোগী হবে এবং উপদেশ দেয়া তার জন্য উপকারী হবে?"
এ ছাড়া আল্লাহ এও বলেছেন, "যে নিজে তোমার কাছে দৌড়ে আসে এবং ভীত হয় তার কথায় তুমি কান দিচ্ছো না।" একথা থেকে ইংগিত পাওয়া যায়, তখন তার মধ্যে সত্য অনুসন্ধানের গভীরতর প্রেরণা সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। তিনি নবীকেই হেদায়েতের উৎস মনে করে তাঁর খেদমতে হাযির হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর কাছেই নিজের চাহিদা পূরণ হবে বলে মনে করছিলেন। তাঁর অবস্থা একথা প্রকাশ করছিল যে, তাঁকে সত্য সরল পথের সন্ধান দেয়া হলে তিনি সে পথে চলবেন。
তৃতীয়ত, নবী-এর মজলিসে সে সময় যারা উপস্থিত ছিল বিভিন্ন রেওয়ায়াতে তাদের নাম উল্লেখিত হয়েছে। তারা ছিল উতবা, শাইবা, আবু জেহেল, উমাইয়া ইবনে খালফ প্রমুখ ইসলামের ঘোর শত্রুরা। এ থেকে জানা যায়, এ ঘটনাটি তখনই ঘটেছিল যখন রাসূলুল্লাহ-এর সাথে এই লোকগুলোর মেলামেশা বন্ধ হয়নি। তাদের সাথে বিরোধ ও সংঘাত তখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছেনি যে, তাঁর কাছে তাদের আসা যাওয়া এবং তাঁর সাথে তাদের মেলামেশা বন্ধ হয়ে গিয়ে থাকবে। এসব বিষয় প্রমাণ করে, এ সূরাটি একেবারেই প্রথম দিকে নাযিলকৃত সূরাগুলোর অন্তর্ভুক্ত।
📄 বিষয়বস্তু ও মূল বক্তব্য
আপাতদৃষ্টিতে ভাষণের সূচনায় যে বর্ণনা পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে তা দেখে মনে হয়, অন্ধের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন ও তার কথায় কান না দিয়ে বড় বড় সরদারদের প্রতি মনোযোগ দেবার কারণে এই সূরায় নবীকে তিরস্কার ও তাঁর প্রতি ক্রোধ প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু পুরো সূরাটির সমস্ত বিষয়বস্তুকে একসাথে সামনে রেখে চিন্তা করলে দেখা যাবে, আসলে এখানে ক্রোধ প্রকাশ করা হয়েছে কুরাইশদের কাফের সরদারদের বিরুদ্ধে। কারণ এই সরদাররা তাদের অহংকার, হঠধর্মিতা ও সত্য বিমুখতার কারণে রাসূলুল্লাহ-এর সত্যের দাওয়াতকে অবজ্ঞা ও ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করছিল। এই সঙ্গে এখানে নবীকে তাঁর সত্য দীনের দাওয়াত দেবার সঠিক পদ্ধতি শেখবার সাথে সাথে নবুওয়াত লাভের প্রথম অবস্থায় নিজের কাজ সম্পন্ন করার ব্যাপারে তিনি যে পদ্ধতিগত ভুল করে যাচ্ছিলেন তা তাকে বুঝানো হয়েছে। একজন অন্ধের প্রতি তাঁর অমনোযোগিতা ও তার কথায় কান না দিয়ে কুরাইশ সরদারদের প্রতি মনোযোগী হওয়ার কারণ এ ছিল না যে, তিনি বড়লোকদের বেশি সম্মানিত মনে করতেন এবং একজন অন্ধকে তুচ্ছ জ্ঞান করতেন, নাউযুবিল্লাহ তাঁর চরিত্রে এই ধরনের কোনো বক্রতা ছিল না যার ফলে আল্লাহ তাঁকে পকড়াও করতে পারেন; বরং আসল ব্যাপার এই ছিল, একজন সত্য দীনের দাওয়াত দানকারী যখন তাঁর দাওয়াতের কাজ শুরু করেন তখন স্বাভাবিকভাবেই তাঁর দৃষ্টি চলে যায় জাতির প্রভাবশালী লোকদের দিকে। তিনি চান, এই প্রভাবশালী লোকেরা তাঁর দাওয়াত গ্রহণ করুক। এভাবে তাঁর কাজ সহজ হয়ে যাবে। আর অন্যদিকে দুর্বল, অক্ষম ও সমাজে প্রভাব প্রতিপত্তিহীন লোকদের মধ্যে তাঁর দাওয়াত ছড়িয়ে পড়লেও তাতে সমাজ ব্যবস্থায় কোনো বড় রকমের পার্থক্য দেখা দেয় না। প্রথম দিকে রাসূল্লাল্লাহও প্রায় এই একই ধরনের
কর্মপদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন। তাঁর এই কর্মপদ্ধতি গ্রহণের পেছনে একান্তভাবে কাজ করেছিল তাঁর আন্তরিকতা ও সত্য দীনের দাওয়াতকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেবার প্রেরণা। বড়লোকদের প্রতি সম্মাবোধ এবং গরীব, দুর্বল ও প্রভাবহীন লোকদেরকে তুচ্ছ জ্ঞান করার ধারণা এর পেছনে মোটেই সক্রিয় ছিল না। কিন্তু আল্লাহ তাঁকে বুঝালেন, এটা ইসলামী দাওয়াতের সঠিক পদ্ধতি নয়; বরং এই দাওয়াতের দৃষ্টিতে এমন প্রত্যেক ব্যক্তিই গুরুত্বের অধিকারী, যে সত্যের সন্ধানে ফিরছে, সে যতই দুর্বল, প্রভাবহীন ও অক্ষম হোক না কেন আবার এর দৃষ্টিতে এমন প্রত্যেক ব্যক্তিই গুরুত্বহীন, যে নিজেই সত্যবিমুখ, সে সমাজে যত বড় মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন। তাই ইসলামের দাওয়াত আপনি জোরে সোরে সবাইকে দিয়ে যান কিন্তু যাদের মধ্যে সত্যের গ্রহণ করার আগ্রহ পাওয়া যায় তারাই হবে আপনার আগ্রহের আসল কেন্দ্রবিন্দু। আর যেসব আত্মম্ভরী লোক নিজেদের অহংকারে মত্ত হয়ে মনে করে, আপনি ছাড়া তাদের চলবে কিন্তু তারা ছাড়া আপনার চলবে না, তাদের সামনে আপনার এই দাওয়াত পেশ করা এই দাওয়াতের উন্নত মর্যাদার সাথে মোটেই খাপ খায় না。
সূরার প্রথম থেকে ১৬ আয়াত পর্যন্ত এই বিষয়বস্তুই আলোচিত হয়েছে। তারপর ১৭ আয়াত থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দাওয়াত প্রত্যাখ্যানকারী কাফেরদের প্রতি ক্রোধ প্রকাশ করা হয়েছে। তারা নিজেদের স্রষ্টা ও রিযিকদাতা আল্লাহর মোকাবিলায় যে দৃষ্টিভংগী ও কর্মনীতি অবলম্বন করেছিল প্রথমে সে জন্য তাদের নিন্দা ও তিরস্কার করা হয়েছে। সবশেষে তাদেরকে এই মর্মে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন তারা নিজেদের এই কর্মনীতির অত্যন্ত ভয়াবহ পরিণাম দেখতে পাবে।
📄 যেদিন মানুষ একান্ত আপনজন এমনকি স্ত্রী থেকে পালাতে চাইবে
فَإِذَا جَاءَتِ الصَّاخَّةُ يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ لِكُلِّ امْرِي مِنْ هُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنْ يُغْنِيهِ.
অবশেষে যখন সেই কান ফাটানো আওয়াজ আসবে সেদিন মানুষ পালাতে থাকবে নিজের ভাই, বোন, মা, বাপ, স্ত্রী ও ছেলে মেয়েদের থেকে। তাদের প্রত্যেকে সেদিন এমন কঠিন সময়ের মুখোমুখি হবে যে, নিজের ছাড়া আর কারোর কথা তার মনে থাকবে না। (সূরা আবাসা আয়াত: ৩৩-৩৭)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: আলোচ্য আয়াতসমূহে হাশরের ময়দানের ভয়াবহতার তীব্রতা সম্পর্কে বলা হয়েছে। এখানে প্রথম আয়াতে (৩৩) ইসরাফিলের শিংগা ফুঁকের ফলে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার কথাটা তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে- فَإِذَا جَاءَتِ الصَّاخَةُ “যখন আসবে মহানাদ।” এখানে الصَّاخَةُ মানে 'কান বধিরকারী আওয়ায' অর্থাৎ ইসরাফিলের শিঙ্গার এমন কঠোর আওয়ায যাতে মানুষের কান বধির হয়ে যাবে। তরজমায় শব্দটির অর্থ করা হয়েছে 'কিয়ামত' শব্দ দিয়ে। দ্বিতীয় আয়াত
(৩৪) থেকে হাশরের দিন সকল মানুষের মহাসমাবেশের দিন মানুষের ব্যস্ততা, অস্থিরতা ও প্রত্যেকের নিজ নিজ মুক্তির অস্থিরতা সম্পর্কে বলা হয়েছে。
সেদিন প্রত্যেক মানুষ আপন চিন্তায় বিভোর হবে। দুনিয়ার জীবনে যেসব আত্মীয়তা ও সম্পর্কের কারণে মানুষ একে অপরের জন্য জীবন পর্যন্ত দিতে কুণ্ঠিত হয় না, হাশরের ময়দানে তারাই নিজ নিজ চিন্তায় এমন নিমগ্ন হবে যে, কেউ কারো খবরই নিতে পারবে না; বরং সামনে দেখলেও মুখ লুকাবে। প্রত্যেকেই তার ভাই থেকে পালাবে, আপন মা-বাপ থেকেও লুকাবে। এক কথায়, প্রত্যেক মানুষ নিজের নিস্তার ও নিষ্কৃতির চিন্তায় এমন অস্থির ও হয়রান থাকবে যে, নিজের প্রাণপ্রিয় সকল প্রকার আত্মীয়দের থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখবে。
দুনিয়ার জীবনে পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা ভাইদের মধ্যে হয়ে থাকে। এর চেয়ে বেশি পিতা-মাতাকে সাহায্য করায় চিন্তা হয় এবং স্বভাবগত কারণে এর চেয়েও বেশি স্ত্রী ও সন্তানের সাথে সম্পর্ক স্থাপিত হয়। আয়াতগুলোতে নীচ থেকে উপরের সম্পর্ক যথাক্রমে উল্লেখ করা হয়েছে। (তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন)
পালাবার মানে এও হতে পারে যে, সেদিন মানুষ নিজের ঐসব প্রিয়তম আত্মীয় স্বজনকে বিপদ সাগরে হাবুডুবু খেতে দেখে তাদের সাহায্যার্থে দৌড়ে যাবার পরিবর্তে উল্টে তাদের থেকে দূরে পালিয়ে যেতে থাকবে, যাতে তারা সাহায্যের জন্য তাকে ডাকতে না থাকে। আবার এর এ মানেও হতে পারে যে, দুনিয়ার আল্লাহর ভয় না পরস্পরকে গোমরাহ করতে থেকেছে, তার কুফল সামনে স্বমূর্তিতে প্রকাশিত দেখে তাদের প্রত্যেক যাতে অন্যের গোমরাহী ও গোনাহের দায়িত্ব কেউ তার ঘাড়ে না চাপিয়ে দেয় এই ভয়ে অন্যের থেকে পালাতে থাকবে। ভাই ভাইকে, সন্তান মা বাপকে, স্বামী স্ত্রীকে এবং মা বাপ সন্তানকে এই মর্মে ভয় করতে থাকবে যে, নিশ্চয়ই এবার আমার বিরুদ্ধে মামলায় এরা সাক্ষী দেবে。
হাদীস গ্রন্থগুলোতে বিভিন্ন পদ্ধতিতে ও সনদ পরস্পরায় বর্ণিত বিভিন্ন হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'কিয়ামতের দিন সমস্ত মানুষ একেবারেই উলংঙ্গ হয়ে উঠবে। "একথা শুনে তাঁর পবিত্র স্ত্রীদের মধ্য থেকে কোনো একজন (কোনো বর্ণনা মতে আয়েশা, কোনো বর্ণনা মতে সওদা আবার কোনো বর্ণনা অনুযায়ী অন্য একজন মহিলা) ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের লজ্জাস্থান কি সেদিন সবার সামনে খোলা থাকবে। জবাবে রাসূলুল্লাহ এই আয়াতটি তেলাওয়াত করে বলেন, সেদিন অন্যের দিকে তাকাবার মতো হুঁশ ও চেতনা করো থাকবে না। (নাসাঈ, তিরমিযী, ইবনে আবী হাতেম, ইবনে জারীর, তাবারানী, ইবনে মারদুইয়া)