📄 স্ত্রী বা কারো কথায় আল্লাহর হালালকৃত জিনিস নিজের জন্য হারাম করা বৈধ নয়
يَأَيُّهَا النَّبِيُّ لِمَ تُحَرِّمُ مَا أَحَلَّ اللهُ لَكَ تَبْتَغِي مَرْضَاتَ أَزْوَاجِكَ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ.
হে নবী! আল্লাহ তোমার জন্যে যা হালাল করেছেন তুমি তা হারাম করছো কেন? তুমি তোমার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি চাচ্ছ? আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা তাহরীম: আয়াত-১)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: এটা মূলত প্রশ্ন নয়; বরং অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ। অর্থাৎ এর উদ্দেশ্য নবীকে এ কথা জিজ্ঞেস করা নয় যে, আপনি এ কাজ কেন করেছেন; বরং তাঁকে এ ব্যাপারে সতর্ক করে দেয়াই উদ্দেশ্য যে, আল্লাহর হালালকৃত জিনিসকে নিজের জন্য হারাম করে নেয়ার যে কাজ আপনার দ্বারা হয়েছে, তা আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয়। এ থেকে স্বতস্ফূর্তভাবে বুঝা যায় যে, আল্লাহর হালালকৃত জিনিস হারাম করার অধিকার কারো নেই, এমন কি স্বয়ং নবী-এর নিজেরও এ ইখতিয়ার নেই। নবী ঐ জিনিসটিকে যদিও আকীদাগতভাবে হারাম মনে করেননি কিংবা শরীয়াতসম্মতভাবে হারাম বলে সাব্যস্ত করেননি; বরং নিজের জন্য তা ব্যবহার করা হরাম করে নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর মর্যাদা যেহেতু সাধারণ একজন মানুষের মত ছিল না; বরং তিনি আল্লাহর রাসূলের মর্যাদায় অভিসিক্ত ছিলেন। তাই তাঁর নিজের পক্ষ
থেকে নিজের ওপর কোনো জিনিস হারাম করে নেয়াতে এই আশঙ্কা ছিল যে, তাঁর উম্মতও ঐ জিনিসকে হারাম অথবা অন্তত মাকরূহ বলে মনে করতে আরম্ভ করবে অথবা উম্মতের লোকেরা মনে করতে শুরু করবে যে, আল্লাহর হালালকৃত কোনো জিনিস নিজের জন্য হারাম করে নেয়ায় কোনো দোষ নেই। এ কারণে আল্লাহ তা'আলা এ কাজের জন্য তাঁকে তিরস্কার করেছেন এবং নিজে হারাম করে নেয়ার এই কাজ থেকে বিরত থাকার হুকুম দিয়েছেন。
এ থেকে জানা যায় যে, হারাম করে নেয়ার এই কাজটি নবী নিজের ইচ্ছায় করেননি; বরং তাঁর স্ত্রীগণ চেয়েছিলেন তিনি যেন এরূপ করেন। আর তাই তিনি শুধু তাঁদের খুশি করার জন্য একটি হালাল বস্তুকে নিজের জন্য হারাম করে নিয়েছিলেন। এখানে প্রশ্ন দেখা দেয় যে, হারাম করে নেয়ার এ কাজটি সম্পর্কে তিরস্কার করার সাথে আল্লাহ তা'আলা বিশেষভাবে তার এই কারণটি কেন উল্লেখ করলেন? এ বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, আল্লাহর বাণীর উদ্দেশ্য যদি শুধু হালালকে হারাম করে নেয়া থেকে নবীকে বিরত রাখা হতো তাহলে আয়াতের প্রথমাংশ দ্বারাই এ উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে যেতো। যে কারণে তিনি এ কাজ করেছিলেন তা স্পষ্ট করে বলার কোনো প্রয়োজন ছিল না। তা বিশেষভাবে বর্ণনা করায় স্পষ্ট বুঝা যায় যে, হালালকে হারাম করে নেয়ার কারণে শুধু নবীকেই তিরস্কার করা উদ্দেশ্য নয়; বরং সাথে সাথে তাঁর পবিত্র স্ত্রীগণকেও এ বিষয়ে সতর্ক করে দেয়া যে, নবীর স্ত্রী হওয়ার কারণে যে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তাঁদের ছিল তা তাঁরা উপলব্ধি করেননি এবং তাঁকে দিয়ে এমন একটি কাজ করিয়েছেন যার দ্বারা একটি হালাল জিনিস হারাম হয়ে যাওয়ার বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হতে পারতো。
নবী নিজের জন্য যে জিনিসটি হারাম করে নিয়েছিলেন সেটি কী ছিল কুরআন মাজীদে যদিও তা বলা হয়নি কিন্তু মুহাদ্দিসও মুফাস্সিরগণ এ আয়াত নাযিলের কারণ হিসেবে দুটি ভিন্ন ঘটনার উল্লেখ করেছেন। একটি ঘটনা মারিয়া কিবতিয়া সম্পর্কিত এবং অপর ঘটনাটি হলো নবীর মধু পান না করার শপথ করেছিলেন。
মারিয়ার ঘটনা হলো, হুদায়বিয়ার সন্ধির পর রাসূলুল্লাহ আশপাশের বাদশাহদের কাছে যেসব পত্র দিয়েছিলেন তার মধ্যে আলোকজন্দ্রিয়ার রোমান খ্রিস্টান ধর্মযাজকের (Patriarch) কাছেও একটি পত্র দিয়েছিলেন। আরবরা তাকে মুকাওকিস বলে অভিহিত করত। হাতেব ইবনে আবী বালতা'আ এই মহামূল্যবান পত্রখানা নিয়ে তার কাছে পৌঁছলে তিনি ইসলাম কবুল করেননি কিন্তু তাঁর সাথে ভাল ব্যবহার করলেন এবং পত্রের উত্তরে লিখলেন, "আমি জানি আরো একজন নবী আসতে এখনো বাকি। তবে আমার ধারণা ছিল তিনি সিরিয়ায় আসবেন। তা সত্ত্বেও আমি আপনার দূতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেছি এবং কিবতীদের মধ্যে অত্যন্ত মর্যাদার অধিকারী দুটি মেয়ে পাঠাচ্ছি।" (ইবনে সা'দ) মেয়ে দুটির মধ্যে একজনের নাম সিরীন এবং অপর জনের নাম মারিয়া। মিসর থেকে ফেরার পথে হাতিব তাদের উভয়কে ইসলাম গ্রহণের আহবান জানালে তারা ইসলাম গ্রহণ করেন। অতপর রসূলুল্লাহ-এর কাছে হাজির
হলে তিনি সিরীনকে হাসসান ইবনে সাবেতের মালিকানায় দিয়ে দেন এবং মারিয়াকে তাঁর হারামের অন্তর্ভুক্ত করেন। ৮ম হিজরীর যুলহাজ্জ মাসে তাঁর গর্ভে নবীর পুত্র ইবরাহীম জন্মলাভ করেন (আল ইসতিয়াব আল ইসাবা)। এই মহিলা ছিলেন অত্যন্ত সুন্দরী। হাফেজ ইবনে হাজার তাঁর আল ইসাবা গ্রন্থে তাঁর সম্পর্কে আয়েশার এ উক্তিটি উদ্ধৃত করেছেন। মারিয়ার আগমন আমার কাছে যতটা অপছন্দয়ী হয়েছে অন্য কোনো মহিলার আগমন ততটা অপছন্দনীয় হয়নি। কারণ, তিনি ছিলেন অতিব সুন্দরী এবং নবী তাঁকে খুব পছন্দ করেছিলেন। বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হাদীসসমূহে তাঁর সম্পর্কে যে কাহিনী উদ্ধৃত হয়েছে তার সংক্ষিপ্ত সার হচ্ছে- নবী একদিন হাফসার ঘরে গেলে তিনি সেখানে ছিলেন না। সেই সময় মারিয়া সেখানে তাঁর কাছে আসেন এবং তাঁর সাথে নির্জনে কাটান। হাফসা তা অপছন্দ করলেন এবং তিনি এ বিষয়ে কঠোর ভাষায় নবীর কাছে অভিযোগ করলেন। তাঁকে সন্তুষ্ট করার জন্য নবী তাঁর কাছে ওয়াদা করলেন যে, তিনি ভবিষ্যতে মারিয়ার সাথে কোনো প্রকার দাম্পত্য সম্পর্ক রাখবেন না। কিছু সংখ্যক রেওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি মারিয়াকে নিজের জন্য হারাম করে নিলেন। আবার কোনো কোনো রেওয়ায়াতে বর্ণনা করা হয়েছে যে, এ ব্যাপারে তিনি শপথও করেছিলেন। এসব হাদীস বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাবেয়ীদের থেকে 'মুরসাল' হাদীস হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু তার মধ্যে কিছু সংখ্যক হাদীস উমর, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস এবং আবু হুরাইরা থেকেও বর্ণিত হয়েছে। এসব হাদীসের সনদের আধিক্য দেখে এর কোনো না কোনো ভিত্তি আছে বলে হাফেজ ইবনে হাজার ফাতহুল বারীতে ধারণা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু সিহাহ সিত্তার কোনো গ্রন্থেই এ কাহিনী উদ্ধৃত হয়নি। নাসায়ীতে আনাস থেকে শুধু এতটুকু উদ্ধৃত হয়েছে যে, নবীর একটি দাসী ছিল যার সাথে তিনি দাম্পত্য সম্পর্ক রাখতেন。
এই ঘটনার পর হাফসার এবং আয়েশা তাঁর পিছে লাগলেন। যার কারণে নবী তাকে নিজের জন্য হারাম করে নিলেন। এ কারণে এ আয়াত নাযিল হয়- হে নবী! আল্লাহ যে জিনিস তোমার জন্য হালাল করেছেন, তা তুমি হারাম করে নিচ্ছ কেন?
দ্বিতীয় ঘটনাটি বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসায়ী এবং অপর কিছু সংখ্যক হাদীস গ্রন্থে স্বয়ং আয়েশা থেকে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে তার সারসংক্ষেপ এই যে, রাসূলুল্লাহ সাধারণত প্রতিদিন আসরের পর পবিত্র স্ত্রীগণের সবার কাছে যেতেন। একবার তিনি যয়নাব বিতনে জাহাশের কাছে গিয়ে অনেকক্ষণ পর্যন্ত বসলেন। কারণ, কোথাও থেকে তাঁর কাছে মধু পাঠানো হয়েছিল। আর নবী মিষ্টি খুব ভালবাসতেন। তাই তিনি তাঁর কাছে মধুর শরবত পান করতেন。
আয়েশা বর্ণনা করেন, এ কারণে খুব হিংসা হলো এবং আমি হাফসা, সওদা ও সাফিয়ার সাথে মিলিত হয়ে এ মর্মে সিদ্ধান্ত নিলাম যে, নবী আমাদের যার কাছেই আসবেন সেই তাঁকে বলবে, আপনার মুখ থেকে মাগাফিরের গন্ধ আসছে। মাগাফির এক প্রকার ফুল যার মধ্যে কিছুটা দুর্গন্ধ থাকে। মৌমাছি উক্ত ফুল থেকে মধু
আহরণ করলে তার মধ্যেও ঐ দুর্গন্ধের কিছুটা লেশ বর্তমান থাকে। এ কথা সবাই জানতেন যে, নবী অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও রুচিশীল ছিলেন। তাঁর শরীর থেকে কোনো প্রকার দুর্গন্ধ আসুক তিনি তা একেবারেই পছন্দ করতেন না। তাই যয়নাবের কাছে তাঁর দীর্ঘ অবস্থানকে বন্ধ করার জন্য এই কৌশল অবলম্বন করা হলো এবং তা ফলবতী হলো। যখন কয়েকজন স্ত্রী তাঁকে বললেন যে, তাঁর মুখ থেকে মাগফিরের গন্ধ আসে তখন তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন যে, আর কখনো তিনি মধু পান করবেন না। একটি হাদীসে তাঁর বক্তব্যের ভাষা উদ্ধৃত হয়েছে এরূপ- فَلَنْ أَعُوْدَ لَهُ وَقَدْ حَلَفْتُ "আমি আর কখনো এ জিনিস পান করবো না, আমি শপথ করেছি"। অপর একটি হাদীসে শুধু فَلَنْ أَعُوْدَ لَهُ কথাটি আছে وَقَدْ حَلَفْتُ কথাটির উল্লেখ নেই। ইবনে আব্বাস থেকে যে হাদীসটি ইবনুল মুনযির। ইবনে আবী হাতেম, তাবারানী এবং ইবনে মারদুয়া বর্ণনা করেছেন তাতে বক্তব্যের ভাষা হলো- اللهِ لَا أَشْرَبُهُ, আল্লাহর কসম, আমি আর তা পান করবো না。
বড় বড় মনীষী এই দুটি কাহিনীর মধ্যে দ্বিতীয় কাহিনীটিকে সঠিক বলে মেনে নিয়েছেন এবং প্রথম কাহিনীটিকে অনির্ভরযোগ্য বলে সাব্যস্ত করেছেন। ইমাম নাসায়ী বলেন, "মধুর ঘটনা সম্পর্কিত ব্যাপারে আয়েশার বর্ণিত হাদীস বিশুদ্ধ এবং মারিয়াকে হারাম করে নেয়ার ঘটনা কোনো উত্তম সনদে বর্ণিত হয়নি"। কাজী আয়াজ বলেন, "নির্ভুল কথা এই যে, এ আয়াতটি মারিয়াকে ব্যাপারে নয়; বরং মধু সম্পর্কিত ব্যাপারে নাযিল হয়েছে"। কাজী আবু বকর ইবনুল আরাবীও মধু সম্পর্কিত কাহিনীকেই বিশুদ্ধ বলে মনে করেন এবং ইমাম নববী এ হাফেজ বদরুদ্দীন আইনীও এই মতটিই পোষণ করেন। ফাতহুল কাদির নামক ফিকহ গ্রন্থে ইমাম ইবনে হুমাম বলেন, মধু হারাম করে নেয়ার কাহিনী বুখারী ও মুসলিম হাদিস গ্রন্থে আয়েশা নিজে বর্ণনা করেছেন যাঁকে নিয়ে এ ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল। সুতরাং এ বর্ণনাটিই অধিক নির্ভরযোগ্য। হাফেজ ইবনে কাসীর বলেন, সঠিক কথা হলো, নিজের জন্য মধু পান হারাম করে নেয়া সম্পর্কে এ আয়াতটি নাযিল হয়েছে。
স্ত্রীদের সন্তুষ্টির জন্য একটি হালাল জিনিসকে হারাম করে নেয়ার যে কাজ আপনার দ্বারা হয়েছে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল পদমর্যাদার দিক দিয়ে তা যদিও যথোচিত হয়নি, কিন্তু তা গোনাহর কাজও নয় যে, সে জন্য পাকড়াও করা যেতে পারে। তাই আল্লাহ তা'আলা শুধু সে ভুল দেখিয়ে দিয়ে সংশোধন করে দেয়াকেই যথেষ্ট মনে করেছেন এবং তাঁর এই ত্রুটি মাফ করে দিয়েছেন।
📄 স্ত্রীদের পারস্পরিক ঈর্ষা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা রাসূলের মনো কষ্টের কারণ এবং সংশোধনে আল্লাহর হুশিয়ারী
عَلَى رَبَّهُ إِنْ طَلَّقَكُنَّ أَنْ يُبْدِلَةَ أَزْوَاجًا خَيْرًا مِنْكُنَّ مُسْلِمَةٍ مُّؤْمِنَتٍ قنت تثبت عُبِدَتٍ سَئِحَتٍ ثَيْبَتٍ وَ أَبْكَارًا.
নবী যদি তোমাদের মত সব স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেন তাহলে অসম্ভব নয় যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের পরিবর্তে তাকে এমন সব স্ত্রী দান করবেন যারা তোমাদের চেয়ে উত্তম হবে। সত্যিকার মুসলমান, ঈমানদার, অনুগত, তাওবাকারিণী, ইবাদাত গোজার এবং রোযাদার। তারা পূর্বে বিবাহিত বা কুমারী যাই হোক না কেন। (সূরা তাহরীম: আয়াত-৫)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: এ থেকে জানা যায় যে, আয়েশা সিবা এবং হাফসা শুধু ভুল করেছিলেন না; বরং নবীর অন্যান্য স্ত্রীগণও কিছু না কিছু ভুল করেছিলেন। এ কারণেই আয়াতে তাঁদের দু'জনকে ছাড়াও নবীর অন্যান্য স্ত্রীদেরকে সাবধান করে দেয়া হয়েছে। এসব ভুল আচরণের ধরন সম্পর্কে কুরআন মাজীদে কোনো প্রকার আলোকপাত করা হয়নি। তবে এ সম্পর্কে বিভিন্ন হাদীসে কিছু বিস্তারিত বর্ণনা এসেছে। এখানে আমরা তা উদ্ধৃত করলাম-
বুখারীতে আনাস রাদিয়াল্লাহু থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, উমর রাদিয়াল্লাহু বলেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর স্ত্রীদের পারস্পরিক ঈর্ষা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা নবীকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। হাদীসের মূল ভাষা হচ্ছে-
اجْتَمَعَ نِسَاءُ النَّبِيِّ لا فِي الْغَيْرَةِ عَلَيْهِ
তাই আমি তাঁদের বললাম, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি তোমাদের তালাক দিয়ে দেন তাহলে আল্লাহ তা'আলা তাঁকে তোমাদের চেয়ে উত্তম স্ত্রী দান করা অসম্ভব নয়। আনাসের বরাত দিয়ে ইবনে আবী হাতেম উমরের বর্ণনা নিম্নোক্ত ভাষায় উদ্ধৃত করেছেন, আমার কাছে এ মর্মে খবর পৌঁছল যে, নবী ও উম্মুল মু'মিনীনদের মধ্যে কিছুটা তিক্ততার সৃষ্টি হয়েছে। এ কথা শুনে আমি তাদের প্রত্যেকের কাছে গিয়ে বললাম, তোমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে অতিষ্ঠ করা থেকে বিরত থাক। তা না হলে আল্লাহ তা'আলা নবীকে তোমাদের পরিবর্তে উত্তম স্ত্রী দান করবেন। এমনকি আমি যখন উম্মুল মু'মিনীনদের মধ্যে শেষ জনের কাছে গেলাম [বুখারীর একটি হাদীসের বর্ণনা অনুসারে তিনি ছিলেন উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা।] তখন তিনি আমাকে বললেন, হে উমর! রাসূলুল্লাহ কি স্ত্রীদেরকে উপদেশ দেয়ার জন্য যথেষ্ট নন যে, তুমি তাঁদেরকে উপদেশ দিতে চলেছ? এতে আমি চুপ হয়ে গেলাম। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত নাযিল করলেন。
মুসলিমে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে, উমর তাঁর কাছে বর্ণনা করেছেন যে, নবী যখন সাময়িকভাবে তাঁর স্ত্রীদের সাথে মেলামেশা বন্ধ করলেন তখন আমি মসজিদে নববীতে পৌছে দেখলাম লোকজন চিন্তাক্লিষ্ট হয়ে বসে নুড়ি পাথর তুলছে এবং নিক্ষেপ করেছে এবং পরস্পর বলাবলি করছে যে, রাসূলুল্লাহ তাঁর স্ত্রীদের তালাক দিয়েছেন। এরপর উমর আয়েশা ও হাফসার কাছে তাঁর যাওয়ার এবং তাঁদের উপদেশ দেয়ার কথা উল্লেখ করলেন। তারপর বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ -এর খেদমতে হাজির হয়ে আরজ করলাম, স্ত্রীদের ব্যাপারে আপনি চিন্তিত হচ্ছেন কেন? আপনি যদি তাঁদের তালাক দেন তাহলে আল্লাহ তা'আলা আপনার সাথে আছেন, সমস্ত ফেরেশতা, জিবরাঈল ও মিকাঈল আপনার সাথে আছেন, আর আমি, আবু বকর এবং সমস্ত ঈমানাদার আপনার সাথে আছেন। আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি। কারণ খুব কমই এ রকম হয়েছে যে, আমি কোনো কথা বলেছি এবং আল্লাহ তা'আলা তা সত্যায়ন ও সমর্থন করবেন বলে আশা করি নি। বস্তুত এরপর সূরা তাহরীমের এ আয়াতগুলো নাযিল হয়। এরপর আমি নবীকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি স্ত্রীদের তালাক দিয়েছেন? তিনি বললেন, না। এ কথা শুনে মসজিদে নববীর দরজায় দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে ঘোষণা করলাম যে, নবী তাঁর স্ত্রীদের তালাক দেন নি。
বুখারীতে আনাস থেকে এবং মুসনাদে আহমাদে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আয়েশা এবং আবু হুরাইরা থেকে এ বিষয়ে বহু সংখ্যক হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, নবী এক মাস পর্যন্ত তাঁর স্ত্রীদের থেকে আলাদা থাকার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন এবং নিজের কুঠরিতে অবস্থান করতে শুরু করেছিলেন। ২৯ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর জিবরাঈল আলাইহিস সালাম এসে বললেন, আপনার কসম পূরণ হয়েছে, মাস পূর্ণ হয়ে গিয়েছে。
হাফেজ বদরুদ্দীন আইনী উমদাতুল কারী গ্রন্থে আয়েশা, বরাত দিয়ে বর্ণনা করেছেন যে, নবীর পবিত্র স্ত্রীগণের মধ্যে দুটি দলের সৃষ্টি হয়েছিল। একটিতে ছিলেন আয়েশা, হাফসা, সাওদা ও সাফিয়া। আর অপরটিতে ছিলেন যয়নাব, উম্মে সালামা এবং অবশিষ্ট উম্মুল মু'মিনীনগণ。
ঐ সময় রাসূলুল্লাহ -এর পারিবারিক জীবনে কী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল এসব বর্ণনা থেকে তা কিছুটা আন্দাজ করা যেতে পারে। তাই আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে হস্তক্ষেপ করে নবীর স্ত্রীদের কর্মপদ্ধতি ও আচরণ সংশোধন করা জরুরি হয়ে পড়েছিল। নবীর স্ত্রীগণ যদিও সমাজের মহিলাদের মধ্যে সর্বোত্তম মহিলা ছিলেন, তথাপি তাঁরা ছিলেন মানুষ। তাই তাঁরা মানসিক চাহিদা ও দুর্বলতা থেকে মুক্ত ছিলেন না। নিরবিচ্ছিন্নভাবে কষ্টকর জীবন যাপন কোনো কোনো সময় তাঁদের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়াত। তাই তাঁরা অধৈর্য হয়ে নবীর কাছে খোরপোষের দাবী করতে শুরু করতেন। এ অবস্থায় সূরা আহযাবের ২৮-২৯ আয়াত নাযিল করে আল্লাহ তা'আলা তাঁদের উপদেশ দিয়েছেন যে, পার্থিব স্বাচ্ছন্দই যদি তোমাদের কাম্য হয়ে থাকে তাহলে
আমার রাসূল তোমাদেরকে উত্তম পন্থায় বিদায় দিয়ে দেবেন। আর যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং আখেরাতের জীবন কামনা করো তাহলে রাসূলের সাহচর্যে থাকার কারণে যেসব দুঃখ কষ্ট, আসবে তা বরদাশত করো তাছাড়া কোনো কোনো সময় নারী প্রকৃতির কারণে তাদের থেকে স্বভাবতই এমনসব বিষয় প্রকাশ পেত যা সাধারণ মানবীয় বৈশিষ্ট্যের পরিপন্থী ছিল না। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাঁদেরকে যে ঘরের স্ত্রী হওয়ার মর্যাদা দান করেছিলেন তার মর্যাদা ও গৌরব এবং মহান দায়িত্ব ও কর্তব্যের সাথে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না。
এসব কারণে যখন এ আশঙ্কা দেখা দিল যে, তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লামের পারিবারিক জীবনকে বিষিয়ে তুলতে পারে এবং আল্লাহ তা'আলা নবীর দ্বারা যে মহৎ কাজ আঞ্জাম দিচ্ছিলেন তার ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে, তাই কুরআন মাজীদের এ আয়াত নাযিল করে তাঁদের সংশোধন করলেন। যাতে তাঁর পবিত্র স্ত্রীদের মধ্যে সেই মর্যাদা ও দায়িত্বানুভূতি সৃষ্টি হয় যা তাঁরা আল্লাহর সর্বশেষ রাসূলের জীবন সঙ্গীনি হওয়ার কারণে লাভ করার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। আর তাঁরা যেন নিজেদেরকে সাধারণ নারীদের মত এবং নিজেদের পারিবারিক সাধারণ পরিবারসমূহের মত মনে করে না বসেন। এ আয়াতের প্রথম অংশটিই এমন যা শুনে হয়তো নবীর পবিত্র স্ত্রীদের হৃদয়-মন কেঁপে উঠে থাকবে। তাঁদের জন্য এ কথাটির চেয়ে বড় হুঁশিয়ারী আর কী হবে যে, নবী যদি তোমাদের তালাক দেন তাহলে আল্লাহর তাঁকে তোমাদের পরিবর্তে উত্তম স্ত্রী দান করাটা অসম্ভব নয়। প্রথমত নবীর কাছে থেকে তালাক পাওয়ার চিন্তা বা কল্পনাই তাদের কাছে অসহনীয় ব্যাপার। তাছাড়া আরো বলা হয়েছে যেসব উম্মুল মু'মিনীন হওয়ার মর্যাদা হাতছাড়া হয়ে যাবে এবং অন্য যেসব নারীকে আল্লাহ তা'আলা নবী-এর স্ত্রী হিসেবে আনবেন তারা তোমাদের চেয়ে উত্তম হবেন। এরপরে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তিরস্কার যোগ্য হতে পারে এমন কোনো কাজ নবী-এর পবিত্র স্ত্রীদের দ্বারা সংঘটিত হওয়া সম্ভবই ছিল না। এ কারণে আমরা কুরআন মাজীদে শুধু দুটি যায়গায় এমন দেখতে পাই যেখানে মহা সম্মানিত এই নারীদেরকে হুঁশিয়ার দেয়া হয়েছে। উক্ত জায়গা দুটির একটি সূরা আহযাবে এবং অপরটি সূরা তাহরীমে।
📄 দু'জন নবীর স্ত্রী ছিল বিশ্বাসঘাতক নারী
۞ ضَرَبَ اللهُ مَثَلًا لِلَّذِينَ كَفَرُوا امْرَأَتَ نُوحٍ وَامْرَأَتَ لُوطٍ كَانَتَا تَحْتَ عَبْدَيْنِ مِنْ عِبَادِنَا صَالِحَيْنِ فَخَانَتَاهُمَا فَلَمْ يُغْنِيَا عَنْهُمَا مِنَ اللَّهِ شَيْئًا وَقِيلَ ادْخُلَ النَّارَ مَعَ الدَّاخِلِينَ.
অর্থ: আল্লাহ কাফেরদের ব্যাপারে নূহ এবং লূতের স্ত্রীদেরকে উদাহরণ হিসেবে পেশ করেছেন। তারা আমার দুই নেক্কার বান্দার স্ত্রী ছিল। কিন্তু তারা তাদের স্বামীর সাথে খেয়ানত করেছিল। তারা আল্লাহর মোকাবিলায় তাদের কোনো কাজেই আসতে পারেনি। দু'জনকেই বলে দেয়া হয়েছে- যাও, আগুনে প্রবেশকারীদের সাথে তুমিও প্রবেশ কর। (সূরা তাহরীম: আয়াত-১০)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা কাফিরদের ব্যাপারে দু'জন নবীর স্ত্রীর দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। সেই দুই নারী হলো নূহ ও লূত -এর স্ত্রী। এরা দু'জনই ছিল নিজ নিজ স্বামীর প্রতি বিশ্বাসঘাতককারিণী। নূহ-এর স্ত্রী 'ওয়াগেলা' আর লূত -এর স্ত্রীর নাম 'ওয়ালেহা'। এ দু'জন মহিলা তাদের স্বামীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। এখানে খেয়ানতের অর্থ এ নয় যে, তারা ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছিল। এখানে খেয়ানতের অর্থ হচ্ছে তারা নূহ ও লূতের সাথে ঈমানের পথে চলেনি; বরং তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তারা দীন ইসলামের শত্রুদের সহযোগিতা করে এসেছে। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, কোনো নবীর স্ত্রী কখনো ব্যভিচারী ছিল না। প্রকৃতপক্ষে এ দু'জন মহিলার খেয়ানত ছিল দীনের ব্যাপারে। তারা নূহ ও লূতের দীন গ্রহণ করেনি। নূহের স্ত্রী তার কওমের জালেমদের কাছে ঈমান গ্রহণকারী সম্পর্কে খবর পৌঁছাত এবং লূতের স্ত্রী তার স্বামীর কাছে আগত লোকদের খবর তার কওমের দুশ্চরিত্র লোকদের কাছে পৌঁছে দিত। (ইবনে জারীর)
📄 আল্লাহ ভক্ত দু'নারী আসিয়া ও মারইয়াম
وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا لِلَّذِينَ آمَنُوا امْرَأَتَ فِرْعَوْنَ إِذْ قَالَتْ رَبِّ ابْنِ لِي عِندَكَ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ وَنَجِّنِي مِنْ فِرْعَوْنَ وَعَمَلِهِ وَنَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّلِمِينَ. وَمَرْيَمَ ابْنَتَ عِمْرَانَ الَّتِي أَحْصَنَتْ فَرْجَهَا فَنَفَخْنَا فِيْهِ مِنْ رُوحِنَا وَصَدَّقَتُ بِكَلِمَاتِ رَبِّهَا وَكُتُبِهِ وَكَانَتْ مِنَ الْقَانِتِينَ.
অর্থ: আর ঈমানদারদের ব্যাপারে ফেরাউনের স্ত্রীর উদাহরণ পেশ করছেন। যখন সে দোয়া করলো, হে আমার রব! আমার জন্য তোমার কাছে জান্নাতে একটি ঘর বানিয়ে দাও। আমাকে ফেরাউন ও তার কাজকর্ম থেকে রক্ষা করো এবং জালেম কওমের হাত থেকে বাঁচাও। ইমরানের কন্যা মারয়ামের উদাহরণও পেশ করেছেন, যে তার লজ্জাস্থানকে হিফাজত করেছিল। অতঃপর আমি আমার পক্ষ থেকে তার মধ্যে রূহ ফুঁৎকার করেছিলাম। সে তার বাণীসমূহ এবং কিতাবসমূহের সত্যতা প্রতিপন্ন করেছে। সে ছিল আনুগত্যকারীদের অন্তর্ভুক্ত। (সূরা তাহরীম: আয়াত: ১১-১২)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: আলোচ্য আয়াতে ফিরাউন পত্নী আছিয়া বিনতে মুযাহিমের দৃষ্টান্ত বর্ণিত হয়েছে। মূসা যখন যাদুকরদের মুকাবিলায় সফল হন, ফলে যাদুকররা মুসলমান হয়ে যায়, তখন বিবি আছিয়া তাঁর ঈমান প্রকাশ করেন। এতে ফিরাউন ক্রুব্ধ হয়ে তাঁকে ভীষণ শাস্তি দিতে চাইলো। কতক রেওয়াতে আছে ফিরাউন আছিয়ার দু'হাত ও দু'পায়ে পেরেক মেরে বুকের উপর ভারী পাথর রেখে দিল, যাতে তিনি নড়াচড়া পর্যন্ত করতে না পারেন। এমতাবস্থায় তিনি আল্লাহ তায়ালার কাছে এ আয়াতে বর্ণিত দোয়া করেন। কোনো কোনো রেওয়াতে আছে, ফিরাউন উপর থেকে একটি ভারী পাথর তাঁর মাথার উপর ফেলে দিতে মনস্থ করলে তিনি এ দোয়া করেন। ফলে আল্লাহ তায়ালা তাঁর রূহ কবজ করে নেন এবং পাথরটি নিষ্প্রাণ দেহের উপর পতিত হয়। তাঁর দোয়ার বাংলা অর্থ- “হে আমার পালনকর্তা! আপনি নিজের সান্নিধ্যে জান্নাতে আমার জন্যে একটি গৃহ নির্মাণ করুন।" আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতেই তাঁকে জান্নাতের ঘর দেখিয়ে দেন। (তাফসীরে মাযহারী)
আয়াতে বর্ণিত আছিয়ার দোয়ার মধ্যে ছিল "আমাকে ফিরাউন ও তার কার্যকলাপ থেকে রক্ষা করো।” অর্থাৎ আমাকে তোমার শত্রু ও মুসলমানদের শত্রু ফিরাউন থেকে হিফাযাত করো, আর তার আমল অর্থাৎ তার অন্যায়-অনাচার, যুলুম ও স্বেরাচারী কার্যকলাপ থেকেও আমাকে রক্ষা করো। তার এসব যুলুমের অশুভ পরিণতিতে আমাকে পরীক্ষা করো না।"
আলোচ্য আয়াতে ফিরাউন পত্নী আছিয়ার এ দৃষ্টান্ত পেশ করা হয়েছে ঈমানদারদের জন্যে। অর্থাৎ তাদের জন্য এ দৃষ্টান্ত দেয়ার উদ্দেশ্যে তাদের ঈমানের প্রতি উৎসাহিত করা, দীনের কাজে তাদের প্রেরণা দেয়া, ইসলামের পথে তাদের দৃঢ়পদ রাখা, দীনের
ব্যাপারে কঠিন বিপদে সবর করার জন্যে। তাছাড়া এজন্যও যে, কুফরির প্রতিবন্ধকতা ও কঠোরতা ঈমানের এতটুকুনও ক্ষতি করতে পারে না, যেমন পারেনি ফিরাউন পত্নী আছিয়ার ব্যাপারে। যেই আছিয়া ছিল তৎকালীন সর্ববৃহৎ কাফিরের স্ত্রী। সেই কাফিরও তার স্ত্রীকে ঈমান থেকে ফিরাতে পারেনি। মূলত আল্লাহ তায়ালা এখানে এ মযবুত ঈমানের অধিকারী নারী বিবি আছিয়ার ঈমানের দৃঢ়তার কথাটা তুলে ধরেছেন। এ থেকে বিশ্বের নিপীড়িত নির্যাতিত নারীর জন্য শিক্ষা গ্রহণের উদাহরণ-উপকরণ পাওয়া যায়, ঈমানের পথে দৃঢ় থাকার প্রেরণা মিলে। (আল কুরআনুল করীম: সালাহুদ্দীন ইউসুফ।) আছিয়া যুগশ্রেষ্ঠ ইসলামের শত্রু ফিরাউনের স্ত্রী হয়েও হতে পেরেছেন একজন খাঁটি ঈমানদার, আল্লাহর ওলী। আলোচ্য আয়াতে তিনি আল্লাহর কাছে চারটি বিষয়ে দোয়া করেছেন বলে দেখা যায়。
• আল্লাহর নৈকট্যলাভ এবং জান্নাতে তার জন্য স্থান নির্ধারণ。
• ফিরাউনের অধীনতা থেকে নাজাত দেয়া。
• ফিরাউনের বেঈমানী ও যুলুম অত্যাচারী ইত্যাদির পরিণতি থেকে বিবি আছিয়াকে মুক্ত রাখা。
• সকল বিধর্মী যালিম কওম থেকে তাকে নাজাত দেয়া। আয়াতের বাহ্যিক অর্থ থেকেই এটা বুঝা যায়。
এখানে ফিরাউনের স্ত্রী বিবি আছিয়াকে ইমরানের কন্যা মারইয়ামের সাথে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যে, ফিরাউনের স্ত্রী আল্লাহ কাছে কত উচ্চমর্যাদার অধিকারী ছিলেন, যার বদৌলতে তিনি মারইয়ামের সাথে উল্লেখের যোগ্য হয়েছিলেন। তাঁর এ মহত্ব ও উচ্চমর্যাদার একমাত্র কারণ তাঁর জীবনের স্বতন্ত্র ঈমানী বৈশিষ্ট্য। এারা দুজন সতী, ঈমানদার, চরিত্রবান ও অনুগত মহিলার দৃষ্টান্ত স্বরূপ কুরআনে উল্লিখিত হয়েছে। এ দুজন নারীর দৃষ্টান্তকে আল্লাহ আল কুরআনে রাসূল্লাহ -এর স্ত্রীগণের সামনে এবং পরবর্তী সকল প্রজম্মের মুমিন নারীদের সামনে তুলে ধরেছেন। (ফী যিলালিল কুরআন)