📘 আল কুরআনে নারীদের ২৫ সূরা > 📄 তালাকের ক্ষেত্রে কতিপয় বিধি-নিষেধ

📄 তালাকের ক্ষেত্রে কতিপয় বিধি-নিষেধ


يَأَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ وَأَحْصُوا الْعِدَّةَ وَاتَّقُوا اللهَ رَبَّكُمْ لَا تُخْرِجُوهُنَّ مِنْ بُيُوتِهِنَّ وَلَا يَخْرُجُنَ إِلَّا أَنْ يَأْتِينَ بِفَاحِشَةٍ مُبَيِّنَةٍ وَ تِلْكَ حُدُودُ اللهِ وَ مَنْ يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَقَدْ ظَلَمَ نَفْسَهُ لَا تَدْرِي لَعَلَّ اللَّهَ يُحْدِثُ بَعْدَ ذَلِكَ أَمْرًا.
অর্থ: হে নবী! তোমরা যখন তোমাদের স্ত্রীদেরকে তালাক দিতে ইচ্ছা কর তবে তাদেরকে তালাক দিয়ো ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে, ইদ্দতের হিসাব রেখো এবং তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করো; তোমরা তাদেরকে তাদের বাসগৃহ হতে বের করে দিও না এবং তারাও যেন বের না হয়, যদি না তারা লিপ্ত হয় স্পষ্ট অশ্লীলতায়; এগুলো আল্লাহর বিধান; যে আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন করে সে নিজের উপরই যুলুম করে। তুমি জান না, হয়তো আল্লাহ এর পর কোনো উপায় বের করে দিবেন। (সূরা তালাক: আয়াত-১)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: তালাক দেয়ার ব্যাপারে তোমরা তাড়াহুড়া করো না যে, স্বামী স্ত্রীর মধ্যে কোনো ঝগড়া বিবাদ হওয়া মাত্রই রাগান্বিত হয়ে তালাক দিয়ে ফেললে এবং এক আঘাতে বিবাহ বন্ধনে এমনভাবে ছিন্ন করে ফেললে যে, ফিরিয়ে নেয়ার সুযোগও আর অবশিষ্ট থাকলো না এমনভাবে তালাক দিও না; বরং স্ত্রীদের তালাক দিতে হলে ইদ্দত পালনের জন্য তালাক দাও। ইদ্দত পালনের জন্য তালাক দেয়ার দুটি অর্থ আছে এবং এখানে দুটি অর্থই প্রযোজ্য-
একটি অর্থ হচ্ছে, ইদ্দত শুরু করার জন্য তালাক দাও। অন্য কথায় এমন সময় তালাক দাও যে সময় থেকে তাদের ইদ্দত শুরু হয়ে থাকে। সূরা বাকারার ২২৮ আয়াতে বলা হয়েছে যেসব স্ত্রীলোকের স্বামীর সাথে দৈহিক মিলন হয়েছে এবং মাসিকও হয়ে থাকে তালাক প্রাপ্তির পর তিনবার মাসিক হওয়ার সময়-কালই তাদের ইদ্দত। এই নির্দেশের
প্রতি লক্ষ্য রেখে বিচার করলে ইদ্দত শুরু করার জন্য তালাক দেয়ার অপরিহার্য যে অর্থ হতে পারে তা হচ্ছে স্ত্রীকে ঋতুস্রাবকালে তালাক দেয়া যাবে না। কারণ যে, ঋতুস্রাবকালে তাকে তালাক দেয়া হয়েছে তার ইদ্দত সেই ঋতুস্রাব থেকে গণনা করা যাবে না। তাই এ অবস্থায় তালাক দেয়ার অর্থ দাঁড়ায় এই যে, আল্লাহর হুকুমের বিপরীতে নারীর ইদ্দতের সময়-কাল তিন হায়েজের পরিবর্তে চার হায়েয হয়ে যায়。
তাছাড়া এ নির্দেশের আরো একটি দাবী হলো যে 'তুহুরে' (স্ত্রী ঋতু থেকে পবিত্র থাকার অবস্থা) স্বামী স্ত্রীর সাথে দৈহিক মিলন করেছে সেই 'তুহুরে' তালাক দেয়া যাবে না। কারণ এ ক্ষেত্রে তালাক দেয়ার সময় স্বামী ও স্ত্রীর মিলনের ফলে গর্ভসঞ্চার হয়েছে কী না তা তাদের দু'জনের কেউ জানতে পারে না। এ কারণে অনুমানের ওপর নির্ভর করে যেমন ইদ্দত গণনা শুরু হতে পারে না তেমনি মহিলাকে গর্ভবতী ধরে নিয়েও ইদ্দত গণনা হতে পারে না। সুতরাং এই নির্দেশটি একই সাথে দুটি বিষয় দাবী করে। একটি হলো, হায়েয অবস্থায় স্ত্রীকে তালাক দেয়া যাবে না। দ্বিতীয়টি হলো, তালাক দিতে হবে এমন, 'তুহুরে' সে 'তুহুরে' দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করা হয়নি কিংবা যখন স্ত্রীর গর্ভবতী হওয়ার বিষয়টি জানা আছে। তালাক দেয়ার ক্ষেত্রে এসব বাধ্যবাধকতার মধ্যে যে অনেক কল্যাণ নিহিত আছে তা একটু চিন্তা-ভাবনা করলেই বুঝা যায়। ঋতু অবস্থায় তালাক না দেয়ার কল্যাণকর দিক হলো, এটি এমন এক অবস্থা যখন স্বামী ও স্ত্রীর দৈহিক মিলন নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে তাদের মধ্যে এক ধরনের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টি কোণ থেকেও এটা প্রমাণিত যে, এই অবস্থায় নারীর মেজাজ স্বাভাবিক থাকে না। তাই সেই সময় যদি তাদের মধ্যে কোনো ঝগড়া-বিবাদ হয় তাহলে তা মিটমাট করার ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ উভয়েই অনেকটা অসহায় হয়ে পড়ে। আর পরিস্থিতিকে ঝগড়া-বিবাদ থেকে তালাক পর্যন্ত না গড়িয়ে যদি স্ত্রীর ঋতু থেকে পবিত্র হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয় তাহলে স্ত্রীর মেজাজ প্রকৃতি স্বাভাবিক হওয়া এবং নারী ও পুরুষের মধ্যে আল্লাহ যে স্বাভাবিক আকর্ষণ দিয়েছেন তা তৎপর ও কার্যকর হয়ে পুনরায় দুজনের মধ্যে সুসম্পর্ক সৃষ্টি করার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকে। যে 'তুহুরে' দৈহিক মিলন হয়েছে সেই 'তুহুরে'ই তালাক নিষিদ্ধ হওয়ার কল্যাণকর দিক হচ্ছে, সেই সময় যদি গর্ভসঞ্চার হয়ে থাকে তাহলে স্বামী ও স্ত্রী কারো পক্ষেই তা জানা সম্ভব হয় না। তাই তা তালাক দেয়ার উপযুক্ত সময় নয়। আর গর্ভসঞ্চার হয়েছে এ বিষয়ে জানার পর যে নারীর গর্ভে তার সন্তান বেড়ে উঠেছে তাকে তালাক দেবে কি দেবে না সে সম্পর্কে পুরুষটি অন্তত দশবার ভেবে দেখবে। অপরদিকে নারীও তার নিজের ও সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে স্বামীর অসন্তুষ্টির কারণ দূর করার জন্য পুরোপুরি চেষ্টা করবে। কিন্তু চিন্তা-ভাবনা না করে অন্ধকারে তীর নিক্ষেপ করার পর যদি একথা জানতে পারে যে, গর্ভসঞ্চার হয়েছিল তাহলে উভয়কেই পরে অনুশোচনা করতে হবে。
এটা হচ্ছে ইদ্দতের জন্য তালাক দেয়ার প্রথম তাৎপর্য। দৈহিক মিলন হয়েছে এমন ঋতুবতী এবং গর্ভধারণ সক্ষম নারীদের জন্য এটি প্রযোজ্য। এখন থাকলো এর দ্বিতীয়
তাৎপর্যটি। এ তাৎপর্যটি হলো, তালাক দিতে হলে ইদ্দত পর্যন্ত সময়ের জন্য তালাক দাও। অর্থাৎ একসাথে তিন তালাক দিয়ে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্য তালাক দিয়ে ফেল না; বরং এক বা বড় জোর দুই তালাক দিয়ে ইদ্দত পর্যন্ত অপেক্ষা করো যাতে এই সময়-কালের মধ্যে যে কোন সময় 'রুজু' করার বা ফিরিয়ে নেয়ার সুযোগ তোমার থাকে। এই তাৎপর্য অনুসারে এই নির্দেশটি দৈহিক মিলন হয়েছে এমন ঋতুবতী মহিলাদের জন্য যেমন কল্যাণকর তেমনি যাদের ঋতু বন্ধ হয়ে গিয়েছে বা এখনো যাদের ঋতু আসেনি অথবা তালাক দেয়ার সময় যাদের গর্ভসঞ্চার হয়েছে বলে জানা গেছে তাদের সবার জন্য সমানভাবে কল্যাণকর। আল্লাহর এই নির্দেশের অনুসরণ করলে তালাক দেয়ার পর কাউকেই পস্তাতে হবে না। কারণ এভাবে তালাক দিলে ইদ্দতের মধ্যে 'রুজু' করা বা ফিরিয়ে নেয়া যায় এবং ইদ্দত শেষ হওয়ার পরেও পূর্বতন স্বামী-স্ত্রী যদি পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে চায় তাহলে পুনরায় বিয়ের মাধ্যমে তা করা সম্ভব。
বড় বড় মুফাস্সির উপরিউক্ত আয়াতংশের যে অর্থ বর্ণনা করেছেন তা এই। এর তাফসীর করতে গিয়ে ইবনে আব্বাস বলেন, ঋতু অবস্থায় তালাক দেবে না এবং যে 'তুহুরে' স্বামী দৈহিক মিলন করেছে সে 'তুহুরে'ও দেবে না; বরং তাকে ঋতুস্রাব থেকে মুক্ত ও পবিত্র হওয়ার সুযোগ দেবে। অতঃপর তাকে এক তালাক দেবে। এ ক্ষেত্রে স্বামী যদি রুজু নাও করে এবং এমতাবস্থায় ইদ্দতের সময় অতিবাহিত হয়ে যায় তাহলে স্ত্রী কেবল এক তালাক দ্বারা বিচ্ছিন্ন হবে (ইবনে জারীর)। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন, "ইদ্দতের জন্য তালাক দেয়ার অর্থ হলো, 'তুহুরে' তথা পবিত্রাবস্থায় দৈহিক মিলন না করেই তালাক দেবে"। আবদুল্লাহ ইবনে উমর, 'আতা, মুজাহিদ, মায়মুন ইবনে মাহরান মুকাতিল ইবনে হাইয়ান এবং দাহহাক রাহিমাহুল্লাহ থেকে এ তাফসীর বর্ণিত হয়েছে (ইবনে কাসীর)। ইকরিমা এর অর্থ বর্ণনা করে বলেছেন, "নারীর গর্ভসঞ্চার হয়েছে এ বিষয়ে জেনে তালাক দেবে। দৈহিক মিলন হয়েছে এ অবস্থায় নারীর গর্ভসঞ্চার হয়েছে কি হয়নি সে বিষয়ে না জেনে তালাক দেবে না"। (ইবনে কাসীর)। হাসান বসরী ও ইবনে সিরীন বলেন, 'তুহুর' অবস্থায় দৈহিক মিলন না করে তালাক দেবে কিংবা গর্ভ যখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তখন তালাক দেবে। (ইবনে জারীর)
আবদুল্লাহ ইবনে উমর তাঁর স্ত্রীকে মাসিক চলাকালে তালাক দিলে রাসূলুল্লাহ অত্যন্ত স্পষ্ট করে এ আয়াতের উদ্দেশ্য ও অভিপ্রায় ব্যাখ্যা করেছিলেন। প্রায় সবগুলো হাদীসগ্রন্থেই এ ঘটনা বিস্তারিতরূপে বর্ণিত হয়েছে। এসব বিষয়ে আইনের উৎস মূলত এটিই। ঘটনাটা হলো, আবদুল্লাহ ইবনে উমর তাঁর স্ত্রীকে ঋতুবতী অবস্থায় তালাক দিলে উমর নবী -এর কাছে গিয়ে তা বর্ণনা করলেন। এ কথা শুনে নবী খুব অসন্তুষ্ট হলেন এবং বললেন, "স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য তাকে নির্দেশ দাও। পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত সে যেন তাকে স্ত্রী হিসেবেই রাখে। এরপর যখন তার মাসিক
হবে এবং তা থেকেও পবিত্র হবে তখণ যদি সে তাকে তালাক দিতে চায় তাহলে সেই পবিত্রাবস্থায় দৈহিক মিলন না করে তালাক দেবে। মহান আল্লাহ যে ইদ্দতের জন্য তালাক দিতে বলেছেন এটিই সেই ইদ্দত"। একটি হাদীসের ভাষ্য হলো, "পবিত্রাবস্থায় দৈহিক মিলন না করে তালাক দেবে অথবা এমন অবস্থায় তালাক দেবে যখন তার গর্ভ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে"。
বড় বড় সাহাবী কর্তৃক রাসূলুল্লাহ থেকে বর্ণিত আরো কতিপয় হাদীসও এ আয়াতের উদ্দেশ্য ও তাৎপর্যের ওপর অধিক আলোকপাত করে। নাসায়ী হাদীসগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহকে জানানো হলো যে, এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে একসাথে তিন তালাক দিয়ে ফেলেছে। একথা শুনে নবী ক্রোধে দাঁড়িয়ে পড়লেন এবং বললেন, "আমি তোমাদের মধ্য বর্তমান থাকাতেই আল্লাহর কিতাব নিয়ে খেলা হচ্ছে?"
এ ধরনের আচরণে নবী-এর ক্রোধের মাত্রা দেখে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলো, আমি কি তাকে হত্যা করবো না? আবদুর রাযযাক উবাদা ইবনে সামেত সম্পর্কে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, তাঁর পিতা নিজের স্ত্রীকে হাজার তালাক দিয়ে ফেললে তিনি রাসূলুল্লাহকে গিয়ে বিষয়টি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, "সে আল্লাহর নাফরমানি করেছে আর ঐ স্ত্রী তিন তালাক দ্বারা তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। এখন নয় শত সাতানব্বই তালাক যুলুম ও সীমালংঘন হিসেবে অবশিষ্ট আছে। আল্লাহ চাইলে এ জন্য তাকে আযাব দিতে পারেন কিংবা ক্ষমাও করতে পারেন"。
আবদুল্লাহ ইবনে উমর সম্পর্কিত ঘটনার বিস্তারিত যে বিবরণ দারুকুতনী ও ইবনে আবী শায়বা হাদীসগ্রন্থ দ্বয়ে বর্ণিত হয়েছে তাতে এ কথাটিও আছে যে, নবী আবদুল্লাহ ইবনে উমরকে তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দিলে আবদুল্লাহ ইবনে উমর জিজ্ঞেস করলেন, আমি যদি তাকে তিন তালাক দিতাম তাহলেও কি ফিরিয়ে নিতে পারতাম। নবী জবাব দিলেন, "না এ অবস্থায় সে তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো। তবে এটি হতো একটি গোনাহের কাজ"। একটি হাদীসে নবীর বক্তব্যের ভাষা বর্ণিত হয়েছে এভাবে, "এরূপ করলে তুমি তোমার রবের নাফরমানি করতে। কিন্তু তোমার স্ত্রী তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত"。
এ ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরাম থেকে যেসব ফতোয়া বর্ণিত হয়েছে তাও নবী-এর বাণী ও নির্দেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মুয়াত্তা হাদীসগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে, এক ব্যক্তি এসে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদকে বলল। আমি আমার স্ত্রীকে আট তালাক দিয়ে ফেলেছি। ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এ বিষয়ে তোমাকে কি ফতোয়া দেয়া হয়েছে। সে বলল, "আমাকে বলা হয়েছে যে, স্ত্রীকে আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে"। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বললেন, "তারা ঠিকই বলেছে। তারা মাসায়ালার যে সমাধান দিয়েছে তাই ঠিক।" আবদুর রাযযাক ইবনে মাসউদকে বলল, আমি আমার স্ত্রীকে ৯৯ তালাক দিয়ে ফেলেছি। তিনি বললেন, "তিনটি তালাক তাকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। অবশিষ্ট সবগুলোই বাড়াবাড়ি"। ওয়াকী ইবনুল জাররাহ
তাঁর সুনান গ্রন্থে এটি আলী ও উসমানের মত বলে উল্লেখ করেছেন। এক ব্যক্তি এসে উসমানকে বললযে, সে তার স্ত্রীকে এক হাজার তালাক দিয়ে ফেলেছে। উসমান বললেন, "সে তিন তালাক দ্বারা তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে"। আলীর সামনে অনুরূপ ঘটনা উপস্থাপিত হলে তিনি বলেছিলেন, "সে তো তিন তালাক দ্বারা তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। এখন অবশিষ্ট তালাকগুলো তোমার অন্যসব স্ত্রীদের জন্য বন্টন করে দাও"। আবু দাউদ ও ইবনে জারীর কিছুটা শাব্দিক তারতম্যসহ এ মর্মে মুজাহিদের একটি রেওয়ায়াত উদ্ধৃত করেছেন যে, তিনি ইবনে আব্বাসের কাছে বসেছিলেন। ইতোমধ্যে এক ব্যক্তি এসে বলল, আমি আমার স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে ফেলেছি। এ কথা শুনে ইবনে আব্বাস নীরব থাকলেন। এতে আমার ধারণা জন্মালো যে, হয়তো তিনি তার স্ত্রীকে তার কাছে ফিরিয়ে দিতে চাচ্ছেন। এরপর তিনি বললেন, "তোমরা একেকটি লোক তালাক দেয়ার ব্যাপারে প্রথমে বোকামি করে বসো এবং পরে এসে হে ইবনে আব্বাস! হে ইবনে আব্বাস বলতে থাক। অথচ আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, যে ব্যক্তিই আল্লাহর ভয় মনে রেখে কাজ করবে আল্লাহর তার জন্য সমস্যা থেকে বের হয়ে আসার উপায় করে দেবেন। তুমি তো আল্লাহকে ভয় করো নি। এখন আমি তোমার জন্য কোনো উপায় দেখছি না। তুমি তোমার রবের নাফরমানি করেছো এবং তোমার স্ত্রী তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে"। মুয়াত্তা হাদীসগ্রন্থে এবং তাফসীরে ইবনে জারীরে মুজাহিদ থেকেই আরো একটি হাদীস কিছুটা শাব্দিক তারতম্যসহ বর্ণিত হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে একশত তালাক দেয়ার পর ইবনে আব্বাসের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "তিন তালাক দ্বারা সে তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। অবশিষ্ট ৯৭ তালাক দ্বারা তুমি আল্লাহর আয়াতকে খেলার বস্তু বানিয়েছ"। এটি মুয়াত্তার ভাষা। ইবনে জারীর ইবনে আব্বাসের বক্তব্যের যে ভাষা উদ্ধৃত করা হয়েছে তা হচ্ছে- "তুমি আল্লাহকে ভয় কর নি। আল্লাহকে ভয় করলে এই কঠিন অবস্থা থেকে বাঁচার কোন উপায় আল্লাহ সৃষ্টি করতেন"। ইমাম তাহাবী একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন যে, এক ব্যক্তি ইবনে আব্বাসের কাছে এসে তাঁকে বলল, আমার চাচা তার স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে ফেলেছেন। ইবনে আব্বাস বললেন, তোমার চাচা আল্লাহর নাফরমানি করে গোনায় লিপ্ত হয়েছে এবং শয়তানের আনুগত্য করেছে। তাই আল্লাহ তার জন্য এই কঠিন অবস্থা থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো পথ রাখেননি"。
আবু দাউদ ও মুয়াত্তা হাদীসগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে, এক ব্যক্তি নির্জনবাসের আগেই তার স্ত্রীকে তিন তালাক দেয়ার পর আবার তাকে বিয়ে করতে আগ্রহী হলো এবং এ উদ্দেশ্যে সে ফতোয়া জানতে বের হলো। হাদীসের রাবী মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াস ইবনে বুকাইর বলেন, আমি তার সাথে ইবনে আব্বাসের ও আবু হুরাইরা এর কাছে গেলাম। তাঁরা উভয়েই যে জবাব দিয়েছিলেন তাহলো "তোমার জন্য যে সুযোগ ছিল তা তুমি হাতছাড়া করে ফেলেছো"। জামাখশারী তাঁর কাশশাফ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন
যে, স্ত্রীকে তিন তালাক প্রদানকারী যে ব্যক্তিই উমরের কাছে আসত তিনি তাকে প্রহার করতেন এবং তার প্রদত্ত তালাক কার্যকরী বলে গণ্য করতেন। সাঈদ ইবনে মনসূর আনাসের বর্ণনা থেকে সহীহ সনদে এ কথাটি উদ্ধৃত করেছেন। এ ব্যাপারে সাহাবা কিরাম যে সাধারণ মত পোষণ করতেন তা ইবনে আবী শায়বা ও ইমাম মুহাম্মাদ ইবরাহীম নাখয়ী রাহমাতুল্লাহ আলাইহি থেকে উদ্ধৃত করেছেন। মতটি হলো- "সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহু চাইতেন, স্বামী স্ত্রীকে প্রথমে এক তালাক দিক এবং তারপর তিনটি ঋতুকাল অতিবাহিত হোক"。
এটি ইবনে আবী শায়বার বক্তব্যের ভাষা। ইমাম মুহাম্মাদের বক্তব্যের ভাষা হলো, "একসাথে এক তালাকের বেশি না দেয়া এবং এভাবে ইদ্দত পূর্ণ হতে দেয়া ছিল সাহাবায়ে কিরামের পছন্দনীয় পন্থা "。
এসব হাদীস, সাহাবায়ে কেরামের মতামত ও বক্তব্যের আলোকে কুরআন মাজীদের উপরিউক্ত আয়াতের অর্থ ও তাৎপর্য উপলব্ধি করে ইসলামী ফিকহবিদগণ বিস্তারিত যে বিধান তৈরি করেছেন তা নীচে বর্ণনা করছি-
১. হানাফী ফিক্‌হবিদগণের মতে তালাক তিন প্রকার। যেমন- আহসান, হাসান এবং বেদয়ী। আহসান তালাক হলো- যে 'তুহুরে' স্বামী স্ত্রীর সাথে সহবাস করেনি সেই 'তুহুরে' শুধু এক তালাক দিয়ে 'ইদ্দত' পূর্ণ হতে দেবে। হাসান তালাক হলো- প্রত্যেক 'তুহুরে' একটি করে তালাক দেবে। এই নিয়মে তিন 'তুহুরে' তিন তালাক দেয়াও সুন্নাতের পরিপন্থী নয়। যদিও একটি তালাক দিয়ে 'ইদ্দত' পূর্ণ হতে দেয়াটাই সর্বোত্তম। বিদআত তালাক হলো- ব্যক্তির এক সাথে তিন তালাক দিয়ে দেয়া কিংবা একই 'তুহুরে' ভিন্ন ভিন্ন সময়ে তিন তালাক দিয়ে দেয়া বা হায়েয অবস্থায় তিন তালাক দেয়া অথবা যে 'তুহুরে' সহবাস করেছে সেই 'তুহুরে' তিন তালাক দেয়া। সে এর যেটিই করুক না কেন গোনাহগার হবে। ঋতুবতী ও দৈহিক মিলন হয়েছে এমন স্ত্রীলোকের জন্য এ বিধানটি প্রযোজ্য। এখন বাকি থাকে দৈহিক মিলন হয়নি এমন স্ত্রীকে তালাকের ব্যাপারটি। এরূপ স্ত্রীকে 'তুহুর' ও 'হায়েয' উভয় অবস্থায় সুন্নাত অনুসারে তালাক দেয়া যেতে পারে। কিন্তু স্ত্রী যদি এমন হয় যে, তার সাথে দৈহিক মিলন হয়েছে কিন্তু তার ঋতুস্রাব হওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছে অথবা এখনো ঋতুস্রাব হয়নি তাহলে মিলনের পরেও তাকে তালাক দেয়া যেতে পারে। কেননা, তার গর্ভবতী হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আর স্ত্রী গর্ভবতী হলে সহবাসের পরেও তাকে তালাক দেয়া যেতে পারে। কারণ, তার গর্ভবতী হওয়ার বিষয়টি আগে থেকেই জানা আছে। কিন্তু এই তিন শ্রেণির স্ত্রীলোককে তালাক দেয়ার সুন্নাত পন্থা হলো এক মাস পর পর তালাক দেয়া। আর আহসান তালাক হলো, এক তালাক দিয়ে 'ইদ্দত' অতিবাহিত হতে দেয়া। (হিদায়া, ফাতহুল কাদীর, আহকামুল কুরআন-জাসসাস, উমদাতুল কারী)
> ইমাম মালেকের (র) মতেও তালাক তিন প্রকার যথা- সুন্নী, বিদয়ী মাকরূহ এবং বিদয়ী হারাম। সুন্নাত অনুসারে তালাক হলো, নিয়মিত ঋতুস্রাব হয় এমন সহবাসকৃত স্ত্রীকে 'তুহুর' অবস্থায় সহবাস না করে এক তালাক দিয়ে ইদ্দত অতিবাহিত হতে দেয়া। বিদয়ী মাকরূহ তালাক হলো, যে 'তুহুরে' সহবাস করা হয়েছে সেই তুহুরে তালাক দেয়া, কিংবা সহবাস না করে এক 'তুহুরে' একাধিক তালাক দেয়া বা ইদ্দত পালনকালে ভিন্ন ভিন্ন তুহুরে তিন তালাক দেয়া অথবা একসাথে তিন তালাক দিয়ে দেয়া। আর বিদয়ী হারাম, তালাক হলো, ঋতুস্রাবকালে তালাক দেয়া। (হাশিয়াতুদ দুসুকী আলাশশরাহিল কাবীর, আহকামুল কুরআন-ইবনুল আরাবী)।
> ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের (র) নির্ভরযোগ্য মত: হাম্বলী মাযহাবের অধিকাংশ ফিকহবিদ যে বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন-তা হলো নিয়মিত মাসিক স্রাব হয় এবং স্বামীর সাথে দৈহিক মিলন হয়েছে এমন স্ত্রীলোককে সুন্নাত অনুসারে তালাক দেয়ার নিয়ম হচ্ছে 'তুহুর' অবস্থায় তার সাথে সহবাস না করে তালাক দিতে হবে এবং 'ইদ্দত' অতিবাহিত হওয়ার জন্য এই অবস্থায়ই রেখে দিতে হবে। তবে তাকে যদি তিন 'তুহুরে' আলাদাভাবে তিন তালাক দেয়া হয় কিংবা একই 'তুহুরে' তিন তালাক দেয়া হয় বা একই সাথে তিন তালাক দেয়া হয় অথবা ঋতুস্রাবকালে তালাক দেয়া হয় অথবা যে তুহুরে সহবাস করা হয়েছে সেই তুহুরেই' তালাক দেয়া কিন্তু তার গর্ভবতী হওয়ার বিষয় প্রকাশ না পায় তাহলে এসব তালাক বিদআত ও হারাম। তবে নারী যদি এমন হয় যার সাথে সহবাস করা হয়নি অথবা সহবাস করা হয়েছে কিন্তু তার ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে গিয়েছে অথবা ঋতুস্রাব এখানো শুরু হয়নি অথবা গর্ভবতী, তাহলে তার ক্ষেত্রে না সময়ের বিবেচনায় সুন্নাত ও বিদআত বলে কোনো পার্থক্য আছে, না তালাকের সংখ্যার বিবেচনায় কোনো পার্থক্য আছে। (আল ইনসাফ ফী মারিফাতির রাজেহ মিনাল খেলাফ আলা মাযাহাবি আহমাদ ইবনে হাম্বল)।
> ইমাম শাফেয়ী (র)-এর মতে তালাককে সুন্নাত ও বিদআত হিসেবে পৃথক করা যেতে পারে কেবল সময়ের বিচারে, সংখ্যার বিচারে নয়। অর্থাৎ নিয়মিত ঋতুস্রাব হয় এবং দৈহিক মিলন হয়েছে এমন নারীকে ঋতুস্রাবকালে তালাক দেয়া অথবা গর্ভধারণে সক্ষম নারীকে যে তুহুরে সহবাস হয়েছে সেই তুহুরে তালাক দেয়া কিন্তু তার গর্ভবস্থায় প্রকাশ পায়নি, বিদআত ও হারাম। এরপর থাকে তালাকের সংখ্যা সম্পর্কিত বিষয়টি। এ ক্ষেত্রে একই সাথে তিন তালাক দেয়া হোক অথবা একই 'তুহুরে' বা ভিন্ন ভিন্ন 'তুহুরে' দেয়া হোক কোনো অবস্থায়ই তা সুন্নাতের পরিপন্থী নয়। আর দৈহিক মিলন হয়নি এমন নারী অথবা এমন নারী যার ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে গিয়েছে অথবা এখনো শুরু হয়নি অথবা গর্ভবতী হওয়া প্রকাশ পেয়েছে তাকে দেয়া তালাকের ক্ষেত্রে সুন্নাত বিদআতের প্রার্থক্য প্রযোজ্য নয়। (মুগনিউল মুহতাজ)।
২. কোনো তালাক বিদআত, মাকরূহ, হারাম বা গোনাহের কাজ হওয়ার অর্থ চার ইমামের নিকট এই নয় যে, তা কার্যকর হবে না। তালাক মাসিক অবস্থায় দেয়া হয়ে থাকুক অথবা একসাথে তিন তালাক দেয়া হয়ে থাকুক, অথবা যে তুহুরে দৈহিক মিলন হয়েছে সেই তুহুরে দেয়া হয়ে থাকুক, কিন্তু গর্ভ প্রকাশ পায়নি অথবা কোনো ইমামের দৃষ্টিতে বিদআত এমন কোনো পন্থায় দেয়া হয়ে থাকুক সর্বাবস্থায় তা কার্যকরী হবে। আর তালাকদাতা ব্যক্তি গোনাহগার হবে। কিন্তু কিছু সংখ্যক মুজতাহিদ এ ব্যাপারে চার ইমামের সাথে মতানৈক্য পোষণ করেছেন。
সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যেব এবং আরো কিছু সংখ্যক তাবেয়ীর মতে যে ব্যক্তি সুন্নাতের পরিপন্থী কাজ করে ঋতু অবস্থায় তালাক দেবে অথবা একই সাথে তিন তালাক দেবে তার তালাক আদৌ কার্যকর হয় না। ইমামিয়া মাযাহাবের অনুসারীরাও এ মত পোষণ করেন। এ মতের ভিত্তি হলো, এরূপ করা যেহেতু নিষিদ্ধ এবং হারাম বিদআত তাই তা কার্যকর নয়। অথবা আমরা উপরে যেসব হাদীস উদ্ধৃত করেছি তাতে বলা হয়েছে যে, আবদুল্লাহ ইবনে উমর মাসিক অবস্থায় স্ত্রীকে তালাক দিলে নবী তাকে রুজু করার বা ফিরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ তালাক যদি আদৌ কার্যকর না হয়ে থাকবে তাহলে রুজু করার নির্দেশ দেয়ার কী অর্থ থাকতে পারে? তাছাড়া বহু সংখ্যক হাদীস থেকে একথা প্রমাণিত যে, নবী এবং বড় বড় সাহাবী একের অধিক তালাক দানকারীকে গোনাহগার বললেও তার দেয়া তালাককে অকার্যকর বলেননি。
তাউস ও ইকরিমা বলেন, একসাথে তিন তালাক দিলে সে ক্ষেত্রে শুধু এক তালাক কার্যকর হবে। ঈমাম ইবনে তাইমিয়া (র) ও এ সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করেছেন। একটি রেওয়ায়াত তাদের এ মতের উৎস ও ভিত্তি। রেওয়ায়াতটি হলো, আবুস সাহাবা ইবনে আব্বাসকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি জানেন না রাসূলুল্লাহ ও আবু বকরের সময়ে এবং উমরের আর যুগের প্রথম ভাগে তিন তালাককে এক তালাক বলে গণ্য করা হতো? "তিনি জবাব দিলেন, হ্যাঁ (বুখারী ও মুসলিম)।
তাছাড়া মুসলিম, আবু দাউদ এবং মুসনাদে আহমাদে ইবনে আব্বাসের এ উক্তি উদ্ধৃত করা হয়েছেযে, রসূলুল্লাহ ও আবু বকরের যুগে এবং উমরের যুগে প্রথম দুই বছরে তিন তালাককে এক তালাক বলে গণ্য করা হতো। পরবর্তী সময়ে উমর বললেন যে, মানুষ এমন এমন একটি বিষয়ে তাড়াহুড়া করতে শুরু করেছে, যে বিষয়ে ভেবে চিন্তেও বুঝে সুজে কাজ করার অবকাশ দেয়া হয়েছিল। এখন আমরা তাদের এ কাজকে কার্যকর করবো না কেন? সুতরাং তিনি তা কার্যকর বলে ঘোষণা করলেন。
কিন্তু কয়েকটি কারণে এ মতটি গ্রহণযোগ্য নয়। প্রথমত কয়েকটি রেওয়ায়াত অনুসারে ইবনে আব্বাসের নিজের ফতোয়াই এর পরিপন্থী ছিল। এ কথা আমরা ওপরে উদ্ধৃত করেছি। দ্বিতীয়ত এ মতটি নবীর এবং বড় বড় সাহাবী থেকে বর্ণিতযেসব হাদীসে তিন তালাক দানকারী সম্পর্কে ফতোয়া দেয়া হয়েছে যে, তার
দেয়া তিন তালাকই কার্যকর হবে তার পরিপন্থী। আমরা ওপরে ঐ হাদীসগুলোর উদ্ধৃত করেছি। তৃতীয়ত ইবনে আব্বাসের নিজের রেওয়ায়াতে থেকে জানা যায়, উমর সাহাবায়ে কিরামের সমাবেশে তিন তালাক কার্যকর করার কথা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু সে সময় বা পরবর্তীকালে কোনো সময়ই সাহাবীদের মধ্যে থেকে কেউ এর সাথে দ্বিমত পোষণ করেননি। এখন কথা হলো, উমর সুন্নাতের পরিপন্থী কোনো কাজ করেছেন এ কথা কি মেনে নেয়া যেতে পারে। আর সে বিষয়ে সমস্ত সাহাবী নিশ্চুপ থাকবেন এ কথাও কি মেনে নেয়া যেতে পারে? তাছাড়া রুকানা ইবনে আবদে ইয়াযীদের ঘটনা সম্পর্কে আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজা, ইমাম শাফেয়ী (র), দারেমী এবং হাকেম বর্ণনা করেছেন যে, রুকান তার স্ত্রীকে একই সাথে তিন তালাক দিলে রাসূলুল্লাহ তাকে হলফ করিয়ে জিজ্ঞেস করলেন যে, সত্যিই কি তার এক তালাক দেয়ার নিয়ত ছিল? (অর্থাৎ অন্য দুটি তালাক প্রথম তালাকটির ওপর জোর দেয়া এবং গুরুত্ব আরোপ করার জন্য তার মুখ থেকে বেরিয়ে ছিল এবং তিন তালাক দিয়ে চিরদিনের জন্য বিচ্ছিন্ন করে দেয়া তার উদ্দেশ্য ছিল না) তিনি হলফ করে এ বর্ণনা দিলে নবী তাকে রুজু করার বা ফিরিয়ে নেয়ার অধিকার দিয়েছিলেন। ইসলামের প্রাথমিক যুগে কোন প্রকারের তালাকসমূহকে এক তালাক হিসেবে গণ্য করা হতো তার প্রকৃতি এসব ঘটনা থেকে জানা যায়। এ কারণে হাদীসের ব্যাখ্যাকারগণ ইবনে আব্বাসের রেওয়ায়াতের এই অর্থ গ্রহণ করেছেন যে, যেহেতু প্রাথমিক যুগে দীনি ব্যাপারে মানুষের মধ্যে খিয়ানত প্রায় ছিল না বললেই চলে তাই তিন তালাক দানকারীর এ বক্তব্য মেনে নেয়া হতো, যে তার প্রকৃত নিয়ত ছিল এক তালাক দেয়ার। অন্য দুটি তালাক প্রথম তালাকের ওপর জোর দেয়ার জন্যই তার মুখ থেকে বেরিয়েছিল। কিন্তু উমর দেখলেন যে, মানুষ তাড়াহুড়া করে প্রথমে তিন তালাক দিয়ে বসে এবং পরে প্রথম তালাকের ওপর জোর দেয়ার বা গুরুত্ব আরোপ করার বাহানা করে। তাই তিনি এ বাহানা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন। ইমাম নববী ও ইমাম সুবকী এ ব্যাখ্যাটিকে ইবনে আব্বাসের রেওয়ায়াতের উত্তম ব্যাখ্যা বলে অভিহিত করেছেন। শেষ কথা হলো, ইবনে আব্বাসের বক্তব্য সম্পর্কে আবুস সাহবা বলে কর্তৃক যেসব হাদীস বর্ণিত হয়েছে তাতেও অসামঞ্জস্য রয়েছে। মুসলিম, আবু দাউদ ও নাসায়ী, আবুস সাহবা থেকে অপর যে হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন তাতে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি জিজ্ঞেস করায় ইবনে আব্বাস বললেন, "নির্জন বাসের পূর্বেই কেউ তার স্ত্রীকে তিন তালাক দিলে রাসূলুল্লাহ ও আবু বকরের যুগে এবং উমরের যুগের প্রথম দিকে তাকে এক তালাক বলে গণ্য করা হতো"। এভাবে একই বর্ণনাকারী ইবনে আব্বাস থেকে দুটি পরস্পর বিরোধী রেওয়ায়াত উদ্ধৃত করেছেন। এই পরস্পর বিরোধীতা দুটি রেওয়ায়াতকেই দুর্বল করে দেয়。
৩. স্ত্রীর ঋতুস্রাব চলাকালে তালাকদাতাকে যেহেতু রাসূলুল্লাহ ﷺ রুজু করার আদেশ দিয়েছিলেন তাই এ নির্দেশকে কোন অর্থে গ্রহণ করা হবে সে বিষয়ে ফিকহবিদদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ইমাম আবু হানীফা, ইমাম শাফেয়ী, ইমাম আহমাদ, ইমাম আওযায়ী, ইবনে আবী লায়লা, ইসহাক ইবনে রাহাবিয়া এবং আবু সাওর বলেন, "ঐ ব্যক্তিকে 'রুজু' করার নির্দেশ দেয়া হবে তবে 'রুজু' করতে বাধ্য করা হবে না"। (উমদাতুল কারী)। হিদায়া গ্রন্থে হানাফী মাযহাবের অনুসারীদের যে মত বর্ণনা করা হয়েছে সে অনুসারে 'রুজু' করা শুধু মুস্তাহাব নয়; বরং ওয়াজিব। মুগনিউল মুহতাজ গ্রন্থে শাফেয়ী মাযহাবের যে মত বর্ণিত হয়েছে তা হচ্ছে, যে ব্যক্তি মাসিক চলাকালে স্ত্রীকে তালাক দিয়েছে কিন্তু তিন তালাק দেয়নি তার জন্য সুন্নাত পন্থা হলো, সে রুজু করবে এবং এর পরবর্তী তুহুরেই তালাק না দিয়ে তা অতিবাহিত হতে দেবে এবং তা অতিবাহিত হওয়ার পর স্ত্রী পুনরায় যখন মাসিক থেকে পবিত্র হবে তখন চাইলে তালাক দেবে, যাতে ঋতুকালে প্রদত্ত তালাক থেকে 'রুজু' করা খেলার বস্তুতে পরিণত না হয়। আল ইনসাফ গ্রন্থে হাম্বলী মাযহাবের অনুসারীদের যে মত বর্ণিত হয়েছে তা হচ্ছে, এ অবস্থায় তালাক দানকারীর জন্য 'রুজু' করা মুস্তাহাব। কিন্তু ইমাম মালেক ও তাঁর সঙ্গীদের মতে ঋতু চলাকালে তালাক দেয়া পুলিশের হস্তক্ষেপ যোগ্য অপরাধ। স্ত্রী দাবী করুক বা না করুক সর্বাবস্থায় শাসকের অবশ্য কর্তব্য হলো যখন কোনো ব্যক্তির এ ধরনের কাজ সম্পর্কে তিনি জানতে পারবেন তখনই তাকে 'রুজু' করতে বাধ্য করবেন এবং ইদ্দতের শেষ সময় পর্যন্ত তাকে চাপ দিতে থাকবেন। সে অস্বীকৃতি জানালে তাকে বন্দী করবেন। এরপরও অস্বীকৃতি জানালে প্রহার করবেন। তারপরও সে যদি না মানে তাহলে শাসক নিজেই সিদ্ধান্ত দেবেন যে, তিনি তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। শাসক বা বিচারকের এই সিদ্ধান্ত 'রুজু' বলে গণ্য হবে। এরপর স্বামীর রুজু করার নিয়ত থাক বা না থাক তার জন্য ঐ স্ত্রীর সাথে সহবাস বৈধ হবে। কারণ শাসক বা বিচারকের নিয়ত তার নিয়তের বিকল্প (হাশিয়াতুদ দুসুকী)।
মালেকীরা এ কথাও বলেন যে, যে ব্যক্তি ঋতুস্রাবকালে প্রদত্ত তালাক থেকে ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় রুজু করেছে সে যদি তালাক দিতেই চায় তাহলে তার জন্য মুস্তাহাব পন্থা হলো, সে যে হায়েজে তালাক দিয়েছে তার পরের 'তুহুরেই' তালাক দেবেনা; বরং পুনরায় হায়েজ আসার পর যখন পবিত্র হবে তখন তালাক দেবে। তালাকের পরবর্তী তুহুরেই তালাক না দেয়ার নির্দেশ মূলত এজন্য দেয়া হয়েছে যে, হায়েজ অবস্থায় তালাক দানকারীর 'রুজু' করা যেন কেবল মৌখিক না হয়; বরং স্ত্রীর পবিত্রতার সময় তার স্ত্রীর সাথে দৈহিক মিলিত হওয়া উচিত। তারপর যে 'তুহুরে' দৈহিক মিলন হয়েছে সেই 'তুহুরে' তালাক দেয়া যেহেতু নিষিদ্ধ তাই তালাক দেয়ার সঠিক সময় তার পরবর্তী 'তুহুরে'। (হাশিয়াতুদ দুসুকী)।
৪. 'রজয়ী' তালাকদাতার জন্য 'রুজু' করার সুযোগ কতক্ষণ? এ বিষয়েও ফিকহবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। সূরা বাকারার ২২৮ আয়াতের ثَلَثَةُ قُرُوْمِ অর্থ তিন হায়েজ না তিন 'তুহুর' এ প্রশ্নের ভিত্তিতেই এ মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে। ইমাম শাফেঈ (র) এবং ইমাম মালেকের (র) মতে সূর্য শব্দের অর্থ তুহুর'। আয়েশা, ইবনে উমর এবং যায়েদ ইবনে সাবেত রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকেও এ মতটিই বর্ণিত হয়েছে। হানাফীদের মত হলো, সূর্য শব্দের অর্থ হায়েজ। এটিই ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের নির্ভরযোগ্য মত। খোলাফায়ে রাশেদীনের চার খলীফা ও আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, উবাই ইবনে কা'ব, মু'য়ায ইবনে জাবাল' আবুদ দারদা, উবাদা ইবনে সামেত এবং আবু মূসা আশ'আরী রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকে এ মতটি বর্ণিত হয়েছে। ইমাম মুহাম্মাদ তাঁর মুয়াত্তা গ্রন্থে শা'বীর উক্তির উদ্ধৃত করেছেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ-এর ১৩ জন সাহাবীর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। তাঁরাও সবাই এমত পোষণ করেছেন। তাছাড়া বহু সংখ্যক তাবেয়ীও এ মত পোষণ করেছেন。
এ মতভেদের ওপর ভিত্তি করে শাফেয়ী এবং মালেকীদের মতে তৃতীয় হায়েজ শুরু হওয়া মাত্রই স্ত্রীর ইদ্দতকাল শেষ হয়ে যায় এবং স্বামীর রুজু করার অধিকার বাতিল হয়ে যায়। তবে যদি হায়েজ অবস্থায় তালাক দেয়া হয়ে থাকে তাহলে ঐ হায়েজ ইদ্দতের মধ্যে গণ্য হবে না; বরং চতুর্থ হায়েজ শুরু হওয়া মাত্র ইদ্দতকাল শেষ হয়ে যাবে (মুগনিউল মুহতাজ, হাশিয়াতুদ দুসুকী)। হানাফীদের মত হলো তৃতীয় হায়েজের দশদিন অতিবাহিত হওয়ার পর যদি রক্তস্রাব বন্ধ হয়ে যায় তবে নারী গোসল করুক বা না করুক তার ইদ্দতকাল শেষ হয়ে যাবে। আর যদি দশ দিনের কম সময়ের মধ্যে রক্তস্রাব বন্ধ হয় তাহলে গোসল না করা পর্যন্ত অথবা এক ওয়াক্ত নামাযের পুরো সময় অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত ইদ্দতকাল শেষ হবে না। পানি না থাকার পরিস্থিতিতে ইমাম আবু হানিফা (র) ও ইমাম আবু ইউসুফের (র) মতে নারী যখন তায়াম্মুম করে নামায পড়ে নিবে তখন স্বামীর রুজু করার অধিকার শেষ হয়ে যাবে। আর ইমাম মুহাম্মাদের মতে তায়াম্মুম করা মাত্রই রুজু করার অধিকার শেষ হয়ে যাবে। (হিদায়া)। ইমাম আহমাদের নির্ভরযোগ্য যে মতটি সম্পর্কে হাম্বলী মাযহাবের অধিকাংশ অনুসারী একমত তা হচ্ছে, স্ত্রী যতক্ষণ পর্যন্ত তৃতীয় হায়েজ থেকে মুক্ত হয়ে গোসল না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত স্বামীর রুজু করার অধিকার থাকবে (আল ইনসাফ)।
রুজু কীভাবে হয় আর কীভাবে হয় না? এ মাসায়ালার ক্ষেত্রে ফিকাহবিদদের মধ্যে এ বিষয়ে ঐকমত্য আছে যে, যে ব্যক্তি তার স্ত্রীকে রিজয়ী তালাক দিয়েছে স্ত্রী সম্মত হোক বা না হোক ইদ্দত শেষ হওয়ার পূর্বে সে যখন ইচ্ছা 'রুজু' করতে পারে。
কেননা কুরআন মাজীদে (সূরা বাকারাহ আয়াত ২২৮) বলা হয়েছে,
وَبُعُولَتُهُنَّ أَحَقُّ بِرَدِهِنَّ فِي ذَلِكَ
অর্থ: "এই সময়ের মধ্যে তাদের স্বামী তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়ার পূর্ণ অধিকার রাখে"。
এ থেকে স্বতই এ সিদ্ধান্ত উপনীত হওয়া যায় যে, 'ইদ্দত' শেষ হওয়ার পর্ব পর্যন্ত তাদের বিবাহ বন্ধান বহাল থাকে এবং চূড়ান্তভাবে ছেড়ে দেয়ার পূর্বে সে তাকে ফিরিয়ে নিতে পারে। অন্য কথায় 'রুজু' করা বিবাহ নবায়ন করা নয় যে, সেজন্য স্ত্রীর সম্মতি প্রয়োজন হবে। এতটুকু পর্যন্ত ঐকমত্য পোষণ করার পর ফিকাহবিদগণ' রুজু' করার পন্থা ও পদ্ধতি সম্পর্কে ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। শাফেয়ী মাযহাবের মতে, 'রুজু' করা শুধু কথার দ্বারাই হতে পারে, কাজ দ্বারা নয়। ' আমি তোমাকে রুজু করলাম অর্থাৎ ফিরিয়ে নিলাম' এ কথা যদি তালাকদাতা না বলে তাহলে দৈহিক মিলন বা মেলামেশার মত কোনো কাজ 'রুজু' করার নিয়তে করা হলেও তাকে 'রূজু' বলে গণ্য করা হবে না বরং এক্ষত্রে নারীকে যে কোনো পন্থায় উপভোগ করা এবং তার থেকে তৃপ্তি লাভ করা হারাম এমনকি তা যৌন উত্তেজনা ছাড়া হয়ে থাকলেও। কিন্তু রজিয়ী তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর সাথে সহবাস করলে সে জন্য কোনো হদ বা শাস্তি হবে না। কারণ, রিজয়ী তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর সাথে সহবাস হারাম হওয়ার ব্যাপারে সকল ওলামা একমত নন। তবে যে ব্যক্তি এক্ষেত্রে সহবাস হারাম বলে মনে করে তাকে তাযীর করা হবে। তাছাড়া শাফেয়ী মাযহাব অনুসারে রিজয়ী তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর সাথে সহবাস করার কারণে সর্বাবস্থায় মহরে 'মিসাল' বা সমতুল্য মহরানা পরিশোধ করা অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। সহবাস করার পর স্বামী মৌখিকভাবে 'রুজু' করুক বা না করুক তাতে কিছু এসে যায় না। (মুগনিউল মুহতাজ)
মালেকী মাযহাবের অনুসারীদের মতে 'রুজু' কথা ও কাজ উভয়ভাবেই হতে পারে। কথার দ্বারা রুজু করার ক্ষেত্রে ব্যক্তি যদি স্পষ্ট ভাষা প্রয়োগ করে তাহলে 'রুজু' করার নিয়ত তার থাক বা না থাক 'রুজু' হয়ে যাবে। এমনকি স্পষ্টভাবে রুজু করা বুঝায় এমন শব্দ যদি সে তামাসাচ্ছলেও বলে তবুও তা 'রুজু' বলে গণ্য হবে। তবে কথা যদি সুস্পষ্ট না হয় তাহলে কেবল 'রুজু'র নিয়তে বলা হয়ে থাকলে তবেই তা রুজু বলে গণ্য হবে। এরপর থাকে কোনো কাজ দ্বারা 'রুজু' করার বিষয়টি। এক্ষেত্রে মেলামেশা হোক বা সহবাস হোক ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো কাজকে 'রুজু হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে না যতক্ষণ না তা 'রুজু'র নিয়তে করা হবে। (হাশিয়াতুদ দুসুকী, আহকামুল কুরআন-ইবনুল আরাবী)
কথা দ্বারা মৌখিকভাবে রুজু করার বেলায় হানাফীও হাম্বলী মাজহারে মতামত মালেকী মাযহাবের অনুরুপ। কিন্তু কাজ দ্বারা রুজু করার ক্ষেত্রে তাদের মতামত মালেকীদের বিপরীত। এক্ষেত্রে হানাফী ও হাম্বলী উভয় মাযহাবের ফতোয়া হলো স্বামী যদি ইদ্দতের মধ্যই রিজয়ী 'তালাকপ্রাপ্তা' স্ত্রীর সাথে সহবাস করে তাহলে এক্ষেত্রে সে 'রুজু করার নিয়তে করুক বা না করুক তার এ কাজ আপনা থেকেই রুজু বলে গন্য হবে। তবে উভয় মাযহাবের সিদ্ধান্তের মধ্যে পার্থক্য এতটুকু যে, হানাফীদের মতে, মেলামেশার যে কোনো কাজ 'রুজু' বলে গণ্য হবে এমনকি যদি তা সহবাসের চেয়ে নিম্নস্তরের কোনো কাজও হয়। কিন্তু হাম্বলী মাযহাবের অনুসারীগণ শুধু মেলামেশাকে রুজু বলে স্বীকার করেন না।" (হিদায়া, ফাতহুল কাদীল, উমদাতুল কারী, আল ইনসাফ)
ছয়: ফলাফলের দিক দিয়ে সুন্নাত তালাক ও বিদআত তালাকের মধ্যে পার্থক্য এই যে, এক তালাক বা দুই তালাক দেয়ার ইদ্দতকাল শেষ হয়ে গেলেও তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী এবং তার পূর্ব স্বামীর মধ্যে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে পুনরায় বিয়ে হতে পারে। কিন্তু কেউ যদি তিন তালাক দিয়ে ফেলে তাহলে ইদ্দতের মধ্যে যেমন 'রুজু' করা সম্ভব নয় তেমনি ইদ্দত শেষে পুনরায় বিয়ে হওয়াও সম্ভব নয়। তবে উক্ত মহিলার যদি অন্য কোনো পুরুষের সাথে যথাযথভাবে বিয়ে হয়ে থাকে আর সে তার সাথে সহবাস করে এবং পরে তালাক দেয় কিংবা মরে যায় এবং তারপর সেই মহিলা ও তার পূর্ব স্বামী পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে নতুনভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে চায় তাহলে তা করতে পারবে। অধিকাংশ হাদীস গ্রন্থে সহীহ সনদে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, একব্যক্তি তার স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়েছে। এরপর সে মহিলা অন্য এক পুরুষকে বিয়ে করেছে। দ্বিতীয় স্বামীর সাথে তার নির্জনবাসও হয়েছে কিন্তু সহবাস হয়নি। এমতাবস্থায় সে তাকে তালাক দিয়েছে। এখন এ মহিলার কি তার পূর্ব স্বামীর সাথে পুনরায় বিয়ে হতে পারে? নবী জবাব দিলেন。
لا حَتَّى يَذُوقَ الْآخَرُ مِنْ عُسَيْلَتِهَا مَا ذَاقَ الْأَوَّلُ "না ততক্ষণ পর্যন্ত হতে পারে না যতক্ষণ তার দ্বিতীয় স্বামী প্রথম স্বামীর মতো দৈহিক মিলন না করবে।"
এরপর থাকে পাতানো বিয়ে সম্পর্কে কথা। এ ধরনের বিয়েতে আগে থেকেই শর্ত থাকে যে, নারীকে তার পূর্ব স্বামীর জন্য হালাল করার নিমিত্তে এক ব্যক্তি তাকে বিয়ে করবে এবং সহবাস করার পর তালাক দেবে। ইমাম আবু ইউসুফ র.-এর মতে এ ধরনের শর্তযুক্ত বিয়ে আদৌ বৈধ হয় না। ইমাম আবু হানীফা (র.)-এর মতে, এভাবে তাহলীল হয়ে যাবে, তবে কাজটি মাকরূহ তাহরিমী বা হারাম পর্যায়ের মাকরূহ। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন。
لَعَنَ اللهُ المُحَلِّلَ وَالْمُحَلِّلَ لَهُ "যে তাহলীল করে এবং যে তাহলীল করায় তাহলীল করায় তাদের উভয়কে আল্লাহ তা'আলা লা'নত করেছেন।" (আবু দাউদ: ২০৭৮)
উকবা ইবনে আমেরী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাহাবাদের জিজ্ঞেস করলেন: الا أُخْبِرُكُمْ بِالتَّيْسِ الْمُتَعَاوِرِ. " আমি কি তোমাদেরকে ভাড়াটে ষাঁড় সম্পর্কে অবহিত করবো না? সাহাবাগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! অবশ্যই করবেন। (ইবনে মাজাহ: ১৯৩৬)
তিনি বললেন。
هُوَ الْمُحَلِّلُ ، لَعَنَ اللَّهُ الْمُحَلَّلَ وَالْمُحَلَّلَ لَهُ.
"ভাড়াটে ষাঁড় হচ্ছে তাহলীলকারী। যে তাহলীল করে এবং যে তাহলীল করায় আল্লাহ তাদের উভয়কে লা'নত করেছেন। (ইবনে মাজা: হাদীস-১৯৩৬)
৫. 'ইদ্দতের হিসাব রেখো' এই নির্দেশ পুরুষ, নারী ও তাদের পরিবারের লোকজনের উদ্দেশ্য করে দেয়া হয়েছে। এর অর্থ হলো, তালাককে এমন খেলার বস্তু মনে করো না যে, তালাকের মত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর কবে তালাক দেয়া হয়েছে, কবে ইদ্দত শুরু হয়েছে এবং কবে তা শেষ হবে তাও মনে রাখা হবে না। তালাক একটি অত্যন্ত নাজুক ব্যাপার। এ থেকে স্বামী, স্ত্রী, তাদের সন্তান-সন্ততি এবং গোটা পরিবারের জন্য বহু আইনগত সমস্যার সৃষ্টি হয়। তাই তালাক দেয়া হলে তার সময় ও তারিখ মনে রাখতে হবে, কী অবস্থায় নারীকে তালাক দেয়া হয়েছে তাও মনে রাখতে হবে। সাথে সাথে হিসেব করে দেখতে হবে ইদ্দত কবে শুরু হয়েছে, কত সময় এখনো অবশিষ্ট আছে এবং কবে তা শেষ হয়েছে। এই হিসেবে ওপরেই এ সিদ্ধান্ত নির্ভর করে যে, কোন সময় পর্যন্ত স্বামীর 'রুজু' করার অধিকার আছে, কোন সময় পর্যন্ত নারীকে তার বাড়িতে রাখতে হবে এবং কতদিন পর্যন্ত তাকে খোরপোষ দিতে হবে, কতদিন পর্যন্ত সে নারীর উত্তরাধিকারী হবে এবং নারী তার উত্তরাধিকারিণী হবে। কখন নারী তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এবং দ্বিতীয় বিয়ে করার অধিকার পাবে। তাছাড়া ব্যাপারটি যদি মামলা-মোকাদ্দামা পর্যন্ত গড়ায় তাহলে সঠিক রায় দানের জন্য আদালতকেও তালাকের যথার্থ তারিখ ও সময় এবং নারীর অবস্থা জানার প্রয়োজন হবে। কারণ এ ছাড়া আদালত সহবাসকৃতা ও সহবাসকৃতা নয় এমন নারী, গর্ভবতী ও অগর্ভবতী, ঋতুবতী ও অঋতুবতী এবং রিজয়ী তালাকপ্রাপ্তা ও অন্য প্রকার তালাকপ্রাপ্তা নারীদের ক্ষেত্রে তালাক থেকে সৃষ্ট সমস্যাবলির যথার্থ ফায়সালা করতে অক্ষম。
'তোমরা তাদেরকে তাদের বাসগৃহ হতে বের করে দিও না এবং তারাও যেন বের না হয়' অর্থাৎ রাগান্বিত হয়ে স্বামী স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দেবে না কিংবা রাগান্বিত হয়ে স্ত্রী নিজেও বাড়ি ছেড়ে যাবে না। ইদ্দত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাড়ি তার। ঐ বাড়িতেই তাদের উভয়কে থাকতে হবে পারস্পরিক সমঝোতার কোনো সম্ভব্য উপায় সৃষ্টি হলে তা কাজে লাগিয়ে উপকৃত হওয়া যায়। রিজয়ী তালাকের ক্ষেত্রে স্বামী যে কোনো সময় স্ত্রীর প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে এবং স্ত্রীও বিরোধের কারণসমূহ দূর করে স্বামীকে সন্তুষ্ট করার জন্য সচেষ্ট হতে পারে। উভয়ে যদি একই বাড়িতে থাকে তাহলে তিন মাস পর্যন্ত অথবা তিনবার মাসিক আসা পর্যন্ত অথবা গর্ভবতী হওয়ার ক্ষেত্রে সন্তান প্রসবকাল পর্যন্ত ও সুযোগ বার বার আসতে পারে। কিন্তু স্বামী যদি তাড়াহুড়া করে স্ত্রীকে বের করে দেয় অথবা স্ত্রী যদি চিন্তা-ভাবনা না করে পিতৃগৃহে চলে যায় তাহলে সে
ক্ষেত্রে 'রুজু' করার সম্ভবনা খুবই কমই থাকে এবং সাধারণত শেষ পর্যন্ত তালাকের পরিণাম স্থায়ী বিচ্ছেদের রূপান্তরিত হয়। এ জন্য ফিকাহবিদগণ এ কথাও বলেছেন যে, যে স্ত্রী রিজয়ী তালাকের ইদ্দত পালন করেছে তার সাজসজ্জা ও রূপচর্চা করা উচিত, যাতে স্বামী তার প্রতি আকৃষ্ট হয়। (হিদায়া, আল ইনসাফ)।
সমস্ত ফিক্‌হবিদ এ ব্যাপারে একমত যে, ইদ্দতকালে রিজয়ী তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর বাসগৃহ এবং খোরপোষ পাওয়ার অধিকার আছে। স্বামীর অনুমতি ছাড়া এই সময় বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া স্ত্রীর জন্য জায়েজ নয় এবং স্বামীর জন্য স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়াও জায়েজ নয়। স্বামী তাকে বের করে দিলে গোনাহগার হবে। আর স্ত্রী নিজেই যদি বের হয়ে যায় তাহলে সেও গোনাহগার হবে এবং খোরপোষ ও বাসগৃহ পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে。
যারা বলেন, হায়েজ অবস্থায় তালাক দিলে বা একই সঙ্গে তিন তালাক দিলে আদৌ তালাক হয়না এ দুটি আয়াতাংশ তাদের ধারণা খণ্ডন করে। সাথে সাথে তাদের ধারণাও মিথ্যা প্রমাণ করে, যারা মনে করে এক সাথে তিন তালাক দিলে তা এক তালাক বলে গণ্য হয়। এখন প্রশ্ন হলো, বিদআতী অর্থাৎ সুন্নাত বিরোধী পন্থায় দেয়া তালাক যদি আদৌ কার্যকর না হয় অথবা তিন তালাক যদি এক তালাক রিজয়ী বলে গণ্য হয় তাহলে এ কথা বলার প্রয়োজন কী যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর সীমাসমূহ অর্থাৎ সুন্নাত নির্দেশিত পন্থা ও নিয়ম লংঘন করবে সে নিজের ওপর যুলুম করবে এবং তোমরা জাননা এর পরে আল্লাহ তা'আলা হয়তো সমঝোতার কোনো উপায় সৃষ্টি করে দেবেন এ দুটি কথা কেবল তখনই অর্থপূর্ণ হতে পারে, যখন সুন্নাতের পরিপন্থী পন্থায় তালাক দেয়ার কারণে সত্যি কোনো ক্ষতি হয় এবং যে কারণে, ব্যক্তিকে অনুশোচনা করতে হয় এবং এক সাথে তিন তালাক দিয়ে দেয়ার কারণে 'রুজু' করার কোনো সুযোগ আর না থাকে। অন্যথায় এ বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, যে তালাক আদৌ কার্যকরী হয় না তা দ্বারা আল্লাহর সীমাসমূহও লংঘণ হয় না। তাইতো নিজের প্রতি যুলুম বলেও গণ্য হতে পারে না। আর রিজয়ী তালাক হয়ে যাওয়ার পর সমঝোতার পথ অবশ্যই থেকে যায়। সুতরাং এ কথার বলার কোনো প্রয়োজন নেই যে, আল্লাহ তাআলা এরপর সমঝোতার কোনো উপায় সৃষ্টি করে দেবেন。
এখানে পুনরায় সূরা বাকারার ২২৮ থেকে ২৩০ আয়াত এবং সূরা তালাকের আলোচ্য আয়াতগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক ভালভাবে বুঝে নেয়া দরকার। সূরা বাকারায় তালাকের হিসাব বা নির্দিষ্ট সীমা বলা হয়েছে তিন। এর মধ্যে দুই তালাকের পর রুজু করা অধিকার এবং 'ইদ্দত' পূরণ হওয়ার পর 'তাহলীল' ছাড়াই পুনরায় বিয়ে করার অধিকার থাকে। কিন্তু তৃতীয় তালাক দেয়ার পর এই দুটি অধিকারই নষ্ট হয়ে যায়। এই নির্দেশটিকে বাতিল বা এর মধ্যে কোন প্রকার পরিবর্তন পরিবর্ধনের জন্য সূরা তালাকের এ আয়াতগুলো নাযিল হয়নি, বরং নাযিল হয়েছে এ কথা জানিয়ে দেয়ার জন্য যে, স্ত্রীদের তালাক দেয়ার যে অধিকার ও ইখতিয়ার স্বামীদের দেয়া হয়ছে তা প্রয়োগ
করার বিজ্ঞোজিত পন্থা কি, যা অনুসরণ করলে দাম্পত্য বন্ধন ছিন্ন হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, তালাক দিয়ে অনু অনুশোচনা করার মত পরিস্থিতি আসতে পারে না। সমঝোতা ও আপোষরফা হওয়ার সর্বাধিক সুযোগ থাকে এবং শেষ পর্যন্ত যদি বিচ্ছেদ হয়েও যায় তাহলে পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আবার মিলিত হওয়ার শেষ পথটি খোলা থাকে। কিন্তু অজ্ঞতা বশত কেউ যদি তার ইখতিয়ারসমূহ ভুল পন্থায় প্রয়োগ করে বসে তাহলে সে নিজের ওপর যুলুম করবে এবং ক্ষতিপূরণ ও সংশোধনের সমস্ত সুযোগ হারিয়ে ফেলবে। এর উপমা দেয়া যায় এভাবে যে, কোনো এক পিতা তার ছেলেকে তিন শত টাকা দিয়ে বললেন, তুমিই এ টাকার মালিক, যেভাবে ইচ্ছা তুমি এ টাকা খরচ করতে পার। এরপর তিনি তাকে উপদেশ দিয়ে বললেন, যে অর্থ আমি তোমাকে দিলাম তা তুমি সতর্কতার সাথে উপযুক্ত ক্ষেত্রে ক্রমান্বয়ে খরচ করবে যাতে তা থেকে যথাযথ উপকার পেতে পার। আমার উপদেশের তোয়াক্কা না করে তুমি যদি অসতর্কভাবে অন্যায় ক্ষেত্রে তা খরচ করো কিংবা সমস্ত অর্থ একসাথে খরচ করে ফেল তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এরপর আমি খরচ করার জন্য আর কোনো টাকা পয়সা তোমাকে দিব না। এখন পিতা যদি এই অর্থের পুরোটা ছেলেকে আদৌ না দেয় তাহলে সে ক্ষেত্রে এসব উপদেশের কোনো অর্থই হয় না। যদি এমন হয় যে, উপযুক্ত ক্ষেত্র ছাড়াই ছেলে তা খচর করতে চাচ্ছে, কিন্তু টাকা তার পকেট থেকে বেরই হচ্ছে না, অথবা পুরো তিন শত টাকা খরচ করে ফেলা সত্ত্বেও মাত্র একশত টাকাই তার পকেট থেকে রেব হচ্ছে এবং সর্বাবস্থায় দুইশত টাকা তার পকেটেই থেকে যাচ্ছে, তাহলে এই উপদেশের আদৌ কোনো প্রয়োজন থাকে কি?

📘 আল কুরআনে নারীদের ২৫ সূরা > 📄 তালাকের ক্ষেত্রে ইদ্দতের বিধান

📄 তালাকের ক্ষেত্রে ইদ্দতের বিধান


وَالْنِي يَئِسْنَ مِنَ الْمَحِيضِ مِنْ نِسَائِكُمْ إِنِ ارْتَبْتُمْ فَعِدَّتُهُنَّ ثَلَثَةُ أَشْهُرٍ وَالَّتِي لَمْ يَحِضْنَ وَأُولَاتُ الْأَحْمَالِ أَجَلُهُنَّ أَنْ يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا.
অর্থ: তোমাদের যেসব স্ত্রীর ঋতুবতী হবার আশা নেই তাদের ইদ্দত সম্পর্কে তোমরা সন্দেহ করলে তাদের ইদ্দতকাল হবে তিন মাস এবং যাদের এখনো ঋতুকাল শুরু হয়নি তারাও (তিন মাস ইদ্দত) পালন করবে এবং গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত। আল্লাহকে যে ভয় করে আল্লাহ তার কাজ-কর্ম সহজ করে দিবেন। (সূরা তালাক: আয়াত-৪)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: যেসব মহিলার ঋতুস্রাব একেবারেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে এবং অধিক বয়সের কারণে যারা ঋতুস্রাব হওয়ার আশা করে না তাদেরকে যেদিন তালাক দেয়া হয়েছে সেদিন থেকে তাদের 'ইদ্দত' গণনা শুরু হবে। আর তিন মাস বলতে তিনটি চান্দ্র মাস বুঝানো হয়েছে। তালাক যদি চান্দ্র মাসের শুরুতে দেয়া হয়ে থাকে তাহলে চাঁদ দেখা যাওয়া অনুসারে ইদ্দত গণনা হবে। আর যদি মাসের মাঝে কোনো সময় তালাক দেয়া হয়ে থাকে তাহলে ইমাম আবু হানিফার (র) মতে ৩০ দিনে মাস ধরে তিন মাস পূরণ করতে হবে। ('বাদায়েউস সানয়ে')
যেসব মহিলার ঋতুস্রাবের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার অনিয়ম আছে তাদের ব্যাপারে ফিকহবিদগণ ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। যেমন- সাঈদ ইবনুল মুসাইয়েব বর্ণনা করেছেন যে, 'উমর (রাঃ) বলেছেন, যে মহিলাকে তালাক দেয়া হয়েছে দুই একবার ঋতুস্রাব হওয়ার পর যদি তার ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে সে ৯ মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। এ সময়ে যদি তার গর্ভ প্রকাশ পায় তাহলে ভাল। অন্যথায় ৯ মাস অতিবাহিত হওয়ার পর সে আরো তিন মাস ইদ্দত পালন করবে। এরপর সে অন্য কোনো পুরুষের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্য উপযুক্ত ও বৈধ হবে。
ইবনে আব্বাস, কাতাদা ও ইকরিমার মতে, যে মহিলার এক বছর পর্যন্ত ঋতুস্রাব হয়নি তার ইদ্দতের সময়-কাল তিন মাস। তাউসের মতে, যে মহিলার বছরে একবার ঋতুস্রাব হয় তার ইদ্দতকাল তিনবার ঋতুস্রাব হওয়া। উসমান (রাঃ), আলী (রাঃ) এবং যায়েদ ইবনে সাবেত এই মত পোষণ করতেন বলে বর্ণিত হয়েছে。
ইমাম মালেক বর্ণনা করেছেন যে, হাব্বান নামক এক ব্যক্তি এমন অবস্থায় তার স্ত্রীকে তালাক দেয় যখন সে তার সন্তানকে দুধ দিচ্ছিল। এমতাবস্থায় এক বছর চলে যায় কিন্তু তার ঋতুস্রাব হয় না। এরপর ঐ ব্যক্তি মারা যায়। তালাকপ্রাপ্তা তার
উত্তরাধিকারিণী হওয়ার দাবী পেশ করে। বিষয়টি উসমানের সামনে পেশ করা হলে তিনি আলী ও যায়েদ ইবনে সাবেতের কাছে পরামর্শ চান। তাঁদের উভয়ের সাথে পরামর্শ করে উসমান ফায়সালা দিলেন যে, নারী উক্ত স্বামীর উত্তরাধিকারিণী হবে। তাঁর দলীল ছিল এই যে, যে সব মহিলা ঋতুস্রাব হবে না বলে নিরাশ হয়ে গিয়েছে সে তাদের মত নয় আবার যেসব মহিলাদের এখনো ঋতুস্রাব হয়নি তাদের মতও নয়। সুতরাং যে ঋতুস্রাব চলাকালে তাকে তালাক দেয়া হয়েছে স্বামীর মৃত্যু পর্যন্ত সে উক্ত ঋতুস্রাবেই ছিল। তার ইদ্দত কাল এখনো শেষ হয়নি; বরং অবশিষ্ট আছে。
হানাফিদের মতে, স্ত্রীলোকের ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে গিয়েছে কিন্তু তা অধিক বয়স জনিত কারণে বন্ধ হয়নি যা পরে আবার শুরু হওয়ার আশাই থাকে না এমন স্ত্রীলোকের ইদ্দত গণনা করতে হবে ঋতুস্রাব দ্বারা যদি তা পরে শুরু কিংবা যে বয়সে ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যায় সেই বয়সের বিচারে। এ রকম বয়সে উপনীত হয়ে থাকলে সে তিন মাস ইদ্দত পালন করার পর বিবাহ বন্ধনে থেকে মুক্ত হয়ে যাবে এটাই ইমাম শাফেয়ীর (র), ইমাম সাওরী এবং ইমাম লাইসের মত। আলী, উসমান এবং যায়েদ ইবনে সাবেতের মাযহাবও এটাই。
ইমাম মালেক উমর এবং আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের মত গ্রহণ করেছেন। তাদের মত হচ্ছে, স্ত্রী প্রথমে ৯ মাস অতিবাহিত করবে। যদি এই সময়ের মধ্যে ঋতুস্রাব শুরু না হয় তাহলে সে বার্ধক্য জনিত করণে স্থায়ীভাবে ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া স্ত্রীলোকের মত তিন মাস ইদ্দত পালন করবে। ইবনুল কাসেম ইমাম মালেকের অনুসৃত মতের ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে যখন শেষবারের মত স্ত্রীলোকটির ঋতুস্রাব বন্ধ হয়েছিল তখন থেকে ৯ মাসের গণনা শুরু হবে, তালাক দেয়ার সময় থেকে নয়। (জাস্সাসের আহকামুল কুরআন এবং কাসানীর বাদায়েউস সানায়ে গ্রন্থদ্বয় থেকে এসব বিবরণ গৃহীত হয়েছে।)
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের মাযহাব হচ্ছে, যে নারীর ইদ্দতের হিসেব হায়েজ থেকে শুরু হয়েছিল ইদ্দত চলাকালে তার ঋতুস্রাব যদি বার্ধক্যজনিত কারণে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায় তাহলে সে ঋতুবতী নারীদের মত ইদ্দত পালন না করে বৃদ্ধাদের মত ইদ্দত পালন করবে। যদি তার ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যায় কিন্তু কী কারণে বন্ধ হয়েছে তা জানা না যায় তাহলে প্রথমে গর্ভসঞ্চারের সন্দেহে ৯ মাস সময়-কাল অতিবাহিত করবে এবং পরে তিন মাস ইদ্দত পূরণ করতে হবে। তবে ঋতুস্রাব কেন বন্ধ হয়েছে তা যদি জানা যায়, যেমন- কোনো রোগে আক্রান্ত হয় অথবা সন্তানকে স্তন্যদান করে অথবা অন্য কোনো কারণ থাকে তাহলে যতদিন ঋতুস্রাব পুনরায় শুরু না হবে এবং ঋতুস্রাবের হিসেবে ইদ্দত গণনা শুরু না হতে পারবে অথবা সে ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়ার মত বৃদ্ধাবয়সে উপনীত হবে এবং ঋতুস্রাব বৃদ্ধা স্ত্রীলোকের মত ইদ্দত পালন করতে পারবে ততো দিন পর্যন্ত ইদ্দত পালন করবে। (আল ইনসাফ)।
ঋতুস্রাব যদি অল্প বয়সের জন্য না হয়ে থাকে অথবা কিছু সংখ্যক মহিলাদের অনেক দেরীতে হয়ে থাকে বলে না হয়ে থাকে এবং বিরল কিছু ঘটনা এমনও হয়ে থাকে যে সারা জীবন কোনো স্ত্রীলোকের ঋতুস্রাব হয় না এরূপ সর্ব ক্ষেত্রে এ রকম স্ত্রীলোকদের ইদ্দত রুদ্ধস্রাব বৃদ্ধা স্ত্রীলোকের মত। অর্থাৎ তাদের ইদ্দত তালাকের সময় থেকে তিন মাস。
এ ক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার যে, কুরআন মাজীদের স্পষ্ট বক্তব্য অনুসারে যে স্ত্রীর সাথে তার স্বামী নির্জনবাস করেছে কেবল তার ক্ষেত্রেই ইদ্দত পালনের প্রশ্ন আসে। কারণ, নির্জনবাসের পূর্বে তালাক হলে আদৌ কোনো ইদ্দত পালন করতে হয় না。
সুতরাং যেসব মেয়েদের এখনো ঋতুস্রাব শুরু হয়নি তাদের ইদ্দত বর্ণনা করা স্পষ্টত, এ কথাই প্রমাণ করে যে, এ বয়সে মেয়েদের বিয়ে শুধু জায়েজই নয়; রবং তার সাথে স্বামীর নির্জনবাস এবং মেলামেশাও জায়েয। এখন একথা স্পষ্ট যে, কুরআন যে জিনিসকে জায়েজ বলে ঘোষণা করেছে তা নিষিদ্ধ ঘোষণা করার অধিকার কোনো মুসলমানের নেই。
এখনো ঋতুস্রাব হয়নি এমন কোনো মেয়েকে যদি তালাক দেয়া হয় এবং ইদ্দত চলাকালে তার ঋতুস্রাব শুরু হয় তাহলে সে উক্ত ঋতুস্রাব থেকে পুনরায় ইদ্দত শুরু করবে। তার ইদ্দত হবে ঋতুবতী মহিলাদের মত。
সমস্ত আলেম এ বিষয়ে একমত যে, তালাকপ্রাপ্তা গর্ভবতী স্ত্রীলোকের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত। কিন্তু যে মহিলার স্বামী গর্ভকালে মারা গিয়েছে তার ব্যাপারেও এ নির্দেশ প্রযোজ্য কি না সে বিষয়ে তাদের মধ্যে মতভেদ হয়েছে। এ মতভেদের কারণ হলো, যে স্ত্রীলোকের স্বামী মারা যায় সূরা বাকারার ২৩৪ আয়াতে তার ইদ্দতকাল ৪ মাস দশ দিন বলা হয়েছে। এ নির্দেশ সমস্ত বিধবা মহিলাদের জন্য সাধারণভাবে প্রযোজ্য না কেবল গর্ভবতী মহিলাদের জন্য বিশেষভাবে প্রযোজ্য সে ব্যাপারে সেখানে কোনো স্পষ্ট বক্তব্য নেই。
আলী এবং আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস এ দুটি আয়াতের বক্তব্যের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, তালাকপ্রাপ্তা গর্ভবতী নারীর ইদ্দত সন্তান প্রসব হওয়া পর্যন্ত তো বটেই। কিন্তু গর্ভবতী বিধবা নারীর ইদ্দত হচ্ছে দুটি সময়কালের মধ্যে বিলম্বিত দীর্ঘতর সময়টি। অর্থাৎ তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দত এবং গর্ভবতী নারীর ইদ্দতের মধ্যে যেটি বেশি দীর্ঘতর সেটিই তার ইদ্দত। উদাহরণ স্বরূপ, তার গর্ভস্থ সন্তান যদি ৪ মাস দশ দিন অতিবহিত হওয়ার পূর্বেই ভূমিষ্ঠ হয় তাহলে তাকে ৪ মাস দশ দিন ইদ্দত পালন করতে হবে। কিন্তু তার সন্তান যদি উক্ত সময়ের মধ্যে ভূমিষ্ঠ না হয় তাহলে যে সময় তার সন্তান প্রসব হবে তখন তার ইদ্দত পূরণ হবে। ইমামিয়াগণ এ মতটি অনুসরণ করে থাকেন。
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের মতে, সূরা তালাকের এই আয়াতটি সূরা বাকারার আয়াতের পরে নাযিল হয়েছে। অতএব পরে নাযিল হওয়া নির্দেশ পূর্বে নাযিল হওয়া আয়াতের
নির্দেশকে গর্ভহীনা বিধবাদের জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছে এবং তালাকপ্রাপ্তা বা বিধবা যাই হোক না কেন গর্ভবতী সমস্ত নারীর ইদ্দত সন্তান প্রসব পর্যন্ত নির্দিষ্ট করে দিয়েছে。
এই মত অনুসারে গর্ভবতী নারীর সন্তান প্রসব স্বামী মৃত্যুর পরপরই হোক কিংবা ৪ মাস দশ দিন দীর্ঘায়িত হোক সর্বাবস্থায় সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া মাত্র সে ইদ্দত থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। উবাই ইবনে কা'বের একটি রেওয়ায়াত এ মতের সমর্থন করে। তিনি বর্ণনা করেন সূরা তালাকের এ আয়াত নাযিল হলে আমি রাসূলুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলাম তালাকপ্রাপ্তা ও বিধবা উভয় শ্রেণির নারীর জন্যই কি এ নির্দেশ? তিনি জবাব দিলেন, হ্যাঁ। অন্য একটি হাদীস অনুসারে নবী আরো স্পষ্ট করে বললেন, "সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত সময় প্রত্যেক গর্ভবতী নারীর ইদ্দতকাল"। (ইবনে জারীর, ইবনে আবী হাতেম, ইবনে হাজার বলেন, এ হাদীসের সনদ সম্পর্কে ভিন্ন মত পোষণের অবকাশ থাকলেও হাদীসটি যেহেতু বেশ কিছু সংখ্যক সনদের মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে তাই স্বীকার করে নিতে হয় যে, এর কোনো ভিত্তি অবশ্যই আছে।) এর স্বপক্ষে এর চেয়েও মজবুত সমর্থন পাওয়া যায় সুবইআ আসলামিয়ার ঘটনা থেকে। ঘটনাটি ঘটেছিল রাসূলুল্লাহ -এর পবিত্র যুগে। সুবাইআ আসলামিয়া গর্ভবতী অবস্থায় বিধবা হয়েছিলেন。
স্বামীর মৃত্যুর কিছুদিন পর (কিছু সংখ্যক রেওয়ায়াতে ২০ দিন। কোনোটিতে ২৩ দিন কোনোটিতে ২৫ দিন, কোনোটিতে ৪০ দিন এবং কোনোটিতে ৩৫ দিন)। তার সন্তান প্রসব হয়েছিল। তার ব্যাপারে নবীর কাছে ফতোয়া জানতে চাওয়া হলে তিনি তাকে বিয়ে করার অনুমতি দিয়েছিলেন। বুখারী ও মুসলিম উম্মে সালামা থেকে কয়েকটি সূত্রে এ ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন। আবার এ ঘটনাটি বুখারী, মুসলিম, ইমাম আহমাদ, আবু দাউদ, নাসায়ী ও ইবনে মাজা বিভিন্ন সনদে মিসওয়ার ইবনে মাখরামা থেকেও বর্ণনা করেছেন। মুসলিম সুবাইআ আসলামিয়ার নিজের এ বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন, আমি সা'দ ইবনে খাওলার স্ত্রী ছিলাম। বিদায় হজ্জের সময় আমার স্বামী মারা গিয়েছিলেন, আমি তখন গর্ভবতী ছিলাম। স্বামীর মৃত্যুর কয়েকদিন পরই আমার গর্ভস্থ সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। একজন আমাকে বললো, তুমি ৪ মাস দশ দিন অতিবাহিত হওয়ার পূর্বে বিয়ে করতে পারবে না। আমি কাছে গিয়ে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি ফতোয়া দিলেন, সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া মাত্র তুমি হালাল হয়ে গিয়েছ, এখন ইচ্ছা করলে বিয়ে করতে পার। বুখারীও এ হাদীসটি সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণনা করেছেন。
বিপুল সংখ্যক সাহাবী থেকে এ মতটিই বর্ণিত হয়েছে। ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ী, আবদুর রাযযাক, ইবনে আবী শায়বা এবং ইবনুল মুনযির বর্ণনা করেছেন যে, আবদুল্লাহ ইবনে উমরকে গর্ভবতী বিধবা নারীর ইদ্দত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত সময় তার ইদ্দত। এ কথা শুনে আনসারদের একজন লোক বললো, উমর তো এ কথাও বলেছিলেন যে, স্বামীর দাফন কাফন পর্যন্ত হয়ে সারেনি; বরং তার লাশ তখনো মৃত্যু শয্যায় পড়ে আছে এমতাবস্থায়ও যদি স্ত্রীর গর্ভস্থ সন্তান ভূমিষ্ঠ হয় তাহলে তখনই সে পুনরায় বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্য হালাল হবে。
আবু হুরাইরা, আবু মাসউদ বদরী এবং আয়েশা ও এ মত পোষণ করেছেন। চার ইমাম এবং অন্য সব বড় বড় ফিকহবিদও এমতটি গ্রহণ করেছেন。
শাফেয়ী মাযহাবের মতে, গর্ভবতী স্ত্রীর পেটে যদি একাধিক বাচ্চা থাকে তাহলে সর্বশেষ বাচ্চাটি ভূমিষ্ঠ হওয়ার সাথে সাথে তার ইদ্দতকাল শেষ হয়ে যাবে। এমন কি মৃত বাচ্চা ভূমিষ্ঠ হলেও তার ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় থেকে ইদ্দত শেষ হয়ে যাবে। গর্ভপাতের ক্ষেত্রে ধাত্রী যদি তার ধাত্রী বিদ্যার আলোকে একথা বলে যে, তা শুধু রক্তপিণ্ড ছিল না; বরং তা মানুষের আকৃতি লাভ করেছিল, অথবা গর্ভস্থ বস্তুর গিট ছিল না; বরং মানবদেহে সৃষ্টির উপাদান ছিল, তাহলে তাদের কথা গ্রহণ করা হবে এবং ইদ্দকাল শেষ হয়ে যাবে। (মুগনিউল মুহতাজ)। হাম্বলী ও হানাফী মাযহাবের মতামতও প্রায় অনুরূপ। তবে গর্ভপাতের ক্ষেত্রে তাদের মত হলো, মানুষের দেহকাঠামো স্পষ্ট হয়ে না উঠলে শুধুমাত্র "তা মানবদেহ সৃষ্টির মূল উপাদান ছিল"। ধাত্রীদের এই বক্তব্যের ওপর নির্ভর করা হবে এবং এভাবে ইদ্দতও শেষ হবে না। (বাদায়েউস সানায়ে-আল ইনসাফ)।
কিন্তু বর্তমান সময়ে ডাক্তারী পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে এ কথা জানা আর কঠিন নয় যে গর্ভ থেকে বেরিয়ে আসা বস্তু আদতেই মানব আকৃতির মত কোনো কিছু ছিল, না গর্ভস্থ পদার্থের কোনো গিট বা জটপাকানো কিছু ছিল অথবা জমাট বাঁধা রক্তের মত কোনো কিছু ছিল। তাই বর্তমানের যেসব ক্ষেত্রে ডাক্তারের মতামত জানা সম্ভব সেসব ক্ষেত্রে সহজেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যেতে পারে যে, যাকে গর্ভপাত বলা হচ্ছে তা প্রকৃতই গর্ভপাত কি না এবং তা দ্বারা ইদ্দতকাল শেষ হয়েছে না হয়নি। তবে যেসব ক্ষেত্রে এ রকম ডাক্তারী পরীক্ষা নিরীক্ষা সম্ভব নয় সেসব ক্ষেত্রে হাম্বলী ও হানাফী মাযহাবের মতামতই অধিক সতর্কতামূলক। এ ক্ষেত্রে ও অনভিজ্ঞ ধাত্রীদের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।

📘 আল কুরআনে নারীদের ২৫ সূরা > 📄 তালাক প্রাপ্তা স্ত্রীদের কষ্ট না দেয়া এবং ইদ্দতকালীন ভরণ-পোষণের বিধান

📄 তালাক প্রাপ্তা স্ত্রীদের কষ্ট না দেয়া এবং ইদ্দতকালীন ভরণ-পোষণের বিধান


أَسْكِنُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ سَكَنْتُمْ مِّنْ وُجْدِكُمْ وَلَا تُضَارُوهُنَّ لِتُضَيِّقُوا عَلَيْهِنَّ ۚ وَإِنْ كُنَّ أُولَاتِ حَمْلٍ فَأَنْفِقُوا عَلَيْهِنَّ حَتَّى يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ ۚ فَإِنْ أَرْضَعْنَ لَكُمْ فَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ ۖ وَأْتَمِرُوا بَيْنَكُمْ بِمَعْرُوفٍ ۖ وَإِنْ تَعَاسَرْتُمْ فَسَتُرْضِعُ لَهُ أُخْرَىٰ
অর্থ: তোমরা তোমাদের সামর্থ অনুযায়ী যে স্থানে বাস করো, তাদেরকে সে স্থানে বাস করতে দিয়ো; তাদেরকে কষ্ট দিওনা সংকটে ফেলার জন্যে, তারা গর্ভবতী থাকলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত তাদের জন্যে ব্যয় করবে, যদি তারা তোমাদের সন্তানদেরকে স্তন্যদান করে তবে তাদেরকে পারিশ্রমিক দিবে এবং সন্তানের কল্যাণ সম্পর্কে তোমরা সঙ্গতভাবে
নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করবে; তোমরা যদি নিজ নিজ দাবীতে অনমনীয় হও তাহলে অন্য নারী তার পক্ষে স্তন্য দান করবে। (সূরা তালাক: আয়াত-৬)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: স্ত্রীকে 'রিজয়ী' তালাক দেয়া হয়ে থাকলে স্বামীর ওপর তাকে বাসস্থান ও খোরপোষ দেয়ার দায়িত্ব বর্তায়। এ বিষয়ে সমস্ত ফিকহবিদ একমত। স্ত্রী গর্ভবতী হলে তাকে 'রজয়ী' তালাক দেয়া হয়ে থাকুক বা চূড়ান্ত বিচ্ছেদকারী বায়েন তালাক দেয়া হয়ে থাকুক, সর্বাবস্থায় সন্তান প্রসব পর্যন্ত তাকে বাসস্থান ও খোরপোষ দেয়ার দায়িত্ব স্বামীর, এ বিষয়েও তারা একমত। তাদের মধ্যে যে বিষয়ে মতভেদ হয়েছে তা হলো, অগর্ভবতী চূড়ান্ত তালাকপ্রাপ্তা (অর্থাৎ যাকে চূড়ান্ত বিচ্ছেদকারী তালাক দেয়া হয়েছে) সে কি বাসস্থান ও খোরপোষ উভয়টিই পাওয়ার অধিকারিণী না কেবল বাসস্থান লাভের অধিকারিণী অথবা দু'টির কোনোটির অধিকারিণী নয়?
একদল ফিকহবিদের মতে, সে বাসস্থান ও খোরপোষ উভয়টিই লাভের অধিকারিনী। এ মত পোষণ করেছেন উমর, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আলী ইবনে হুসাইন (ইমাম যায়নুল আবেদীন), কাজী শুরাইহ এবং ইবরাহীম নাখয়ী। হানাফী মাযহাবের আলেমগণ এ মতটি গ্রহণ করেছেন। ইমাম সুফিয়ান সওরী এবং হাসান ইবনে সালেহ-এর মাযহাবও এটিই। দারু কুতনীর একটি হাদীসে এ মতের সমর্থন পাওয়া যায়。
হাদীসটিতে জাবের ইবনে আবদুল্লাহ বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "তিন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীলোক ইদ্দতকালে বাসস্থান ও খোরপোষ লাভের অধিকারিণী "। এ মতের পক্ষে আরো সমর্থন পাওয়া যায় সেসব হাদীস থেকে যাতে বলা হয়েছে, ফাতেমা বিনতে কায়েসের হাদীসকে উমর এই বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন যে, একজন মাত্র নারীর কথার ওপর নির্ভর করে আমি আমার রবের কিতাব ও আমার নবীর সুন্নাত পরিত্যাগ করতে পারি না। এ থেকে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ সুন্নাতটি উমরের অবশ্যই জানা ছিল যে, এরূপ স্ত্রীলোকের বাসস্থান ও খোরপোষ লাভের অধিকার আছে; বরং ইবরাহীম নাখয়ীর একটি বর্ণনায় এ কথাও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, উমর ফাতেমা বিনতে কায়েসের হাদীসটি প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, "আমি রাসূলুল্লাহকে বলতে শুনেছি যে, এরূপ স্ত্রীলোক বাসস্থান ও খোরপোষ উভয়টি লাভ করার অধিকারিণী "。
ইমাম আবু বকর জাস্সাস তাঁর আহকামুল কুরআন গ্রন্থে এ মাসয়ালা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এ মতের পক্ষে প্রথম প্রমাণ পেশ করেছেন এই যে, আল্লাহ তা'আলা সরাসরি কেবল এতটুকু বলেছেন, "তাদেরকে তাদের ইদ্দতের জন্য তালাক দাও"। আল্লাহ তা'আলার এই নির্দেশ সেই ব্যক্তির জন্যেও তো প্রযোজ্য যে প্রথমে দুই তালাক দিয়ে তারপর 'রুজু' করেছে এবং এখন তার কেবল এক তালাক দেয়ার অধিকার আছে। তাঁর দ্বিতীয় প্রমাণ হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ যখন তালাক দেয়ার এ পদ্ধতি বলে দিয়েছেন যে, যে তুহুরে সহবাস করা হয়নি হয় সেই তুহুরে তালাক দেবে, অথবা এমন অবস্থায় তালাক দেবে যখন নারীর গর্ভবতী হওয়ার বিষয় প্রকাশ হয়ে
গিয়েছে। এ ক্ষেত্রে তিনি প্রথম, দ্বিতীয় এবং শেষ তালাকের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেন নি। অতএব, আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ তোমরা যেখানে থাক তাদেরকেও সেখানেই রাখ সর্ব প্রকার তালাকের সাথেই সম্পর্কিত বলে ধরে নেয়া হবে। তিনি তৃতীয় যে দলীলটি পেশ করেন তা হচ্ছে, তালাকপ্রাপ্তা গর্ভবতী মহিলা সে ‘রজয়ী’ তালাকপ্রাপ্তা হোক বা চূড়ান্ত বিচ্ছেদকারী তালাকাপ্রাপ্তা হোক, তাকে বাসস্থান ও খোরপোষ দেয়া স্বামীর জন্য ওয়াজিব। ‘রজয়ী’ তালাকপ্রাপ্তা অগর্ভবতী নারীকেও এ দুটি দেয়া স্বামীর জন্য ওয়াজিব। এ থেকে বুঝা যায় যে, বাসস্থানও খোরপোষ দেয়া গর্ভবতী হওয়ার কারণে ওয়াজিব নয়; বরং তা এ কারণে ওয়াজিব যে, এ দুই শ্রেণির তালাকপ্রাপ্তা শরয়ী বিধান অনুসারেই স্বামীর বাড়ি থাকতে বাধ্য। এখন অগর্ভবতী তিন তালাকপ্রাপ্তা নারীর ক্ষেত্রেও যদি এ নির্দেশ হয়ে থাকে তাহলে তার বাসস্থান ও খোরপোষ দেয়া স্বামীর দায়িত্ব ও কর্তব্য না হওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে না。
অপর একদল ফিকহবিদের মতে, তিন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর ইদ্দতকাল বাসস্থান পাওয়ার অধিকার অবশ্যই আছে কিন্তু খোরপোষ পাওয়ার অধিকার নেই। সাঈদ ইবনুল মুসাইয়েব, সুলায়মান ইবনে ইয়াসার, আতা, শা'বী আওযায়ী, লাইস এবং আবু উবাইদ রহিমাহুমুল্লাহ এ মত পোষণ করেছেন। আর ইমাম মালেকও এ মতটি গ্রহণ করেছেন। কিন্তু ইমাম শাফেয়ী যে এ মত থেকে ভিন্ন মত পোষণ করতেন মুগনিউল মুহতাজ গ্রন্থে তা বর্ণিত হয়েছে। এ বিষয়ে পরে আলোচনা করা হবে。
তৃতীয় আরেকটি দলের মতে, তিন তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দত চলাকালে বাসস্থান ও খোরপোষ কোনোটা লাভের অধিকার নেই। এ মত হাসান বাসরী, হাম্মাদ ইবনে আবী লায়লা, আমর ইবনে দীনার, তাউস, ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ এবং আবু সাওরের। ইবনে জারীরের বর্ণনা মতে ইবনে আব্বাসও এ মত পোষণ করতেন। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল এবং ইমামিয়াগণও এমত গ্রহণ করেছেন। মুগনিউল মুহতাজ গ্রন্থে শাফেয়ী মাযহাবের এমত বর্ণনা করে বলা হয়েছে যে, "যে নারী তালাকের কারণে ইদ্দত পালন করেছে সে গর্ভবতী হোক বা না হোক তার বাসস্থান লাভের অধিকার আছে এবং তা দেয়া ওয়াজিব, তবে বায়েন তালাকপ্রাপ্তা অগর্ভবতী নারীর বাসস্থান ও কাপড় চোপড় কোনো কিছুই পাওয়ার অধিকার নেই"。
এ মতের স্বপক্ষে একদিকে কুরআনের আয়াত "তুমি জান না, এরপরে আল্লাহ তা'আলা হয়তো সমঝোতা ও বুঝাপড়ার কোনো উপায় সৃষ্টি করে দেবেন"। এ থেকে তারা যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেন তা হচ্ছে, এ কথা রিজয়ী তালাকপ্রাপ্তা নারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে, তিন তালাকপ্রাপ্তাদের ক্ষেত্রে নয়। তাই তালাকপ্রাপ্তা নারীকে বাড়িতে রাখার আদেশও রিজয়ী তালাকপ্রাপ্তাদের জন্যই নির্দিষ্ট। তাদের দ্বিতীয় প্রমাণ হচ্ছে, হাদীস গ্রন্থসমূহে বিপুল সংখ্যক সহীহ সনদে বর্ণিত ফাতেমা বিনতে কায়েসের হাদীস。
এই ফাতেমা বিনতে কায়েস আল ফিহরিয়া ছিলেন প্রথম পর্যায়ে হিজরাতকারী মহিলাদের একজন। তাঁকে অত্যন্ত বুদ্ধিমতী মহিলা বলে মনে করা হতো। হযরত
উমরের শাহাদাতের পর তাঁর বাড়িতেই মজলিসে শুরার অধিবেশন হয়েছিল। প্রথমে তিনি আবু আমর ইবনে হাফস ইবনুল মুগীরাতুল মাখযূমীর স্ত্রী ছিলেন। তাঁর স্বামী তাঁকে তিন তালাক দিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম তাঁকে উসামা ইবনে যায়েদের সাথে বিয়ে দেন। তার ঘটনা হলো, তাঁর স্বামী আবু আমর তাঁকে প্রথমে দুই তালাক দিয়েছিলেন। পরে আলীর সাথে যখন তাকে ইয়ামানে পাঠানো হলো, তখন তিনি সেখান থেকে অবশিষ্ট তৃতীয় তালাকটিও দিয়ে দেন। কোনো কোনো রেওয়ায়াতে উল্লেখিত হয়েছে যে, আবু আমর নিজেই তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের পত্র মারফত জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, ইদ্দত পালনকালে তারা যেন তাঁকে বাড়িতেই রাখে এবং তার ব্যয়ভার বহন করে। কোনো কোনো রেওয়ায়াতে উল্লেখ আছে যে, তিনি নিজেই খোরপোষ ও বাসস্থানের দাবী করেছিলেন। তবে ঘটনা যাই ঘটুক না কেন, স্বামীর আত্মীয়-স্বজন তাঁর অধিকার স্বীকার করলেন না। এরপর তিনি দাবী নিয়ে নবীর কাছে গেলেন। নবী এই বলে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন যে, তুমি খোরপোষ ও বাসস্থান কিছুই পাওয়ার অধিকারী নও। একটি রেওয়ায়াতে আছে যে, নবী বলেছিলেন, "স্বামীর ওপর স্ত্রীর খোরপোষ ও বাসস্থান পাওয়ার অধিকার থাকে তখন যখন স্বামীর রুজু করার অধিকার থাকে। কিন্তু যখন রুজু করার অধিকার থাকে না তখন খোরপোষ ও বাসস্থানলাভের অধিকারও থাকে না। (মুসনাদে আহমাদ)
তাবারানী এবং নাসায়ীও প্রায় অনুরূপ রেওয়ায়াত উদ্ধৃত করেছেন। উক্ত রেওয়ায়াতের শেষ দিকের ভাষা হলো- "কিন্তু যে ক্ষেত্রে সে অন্য কোনো পুরুষের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আগে আর পূর্ব স্বামীর জন্য হালাল হচ্ছে না সে ক্ষেত্রে তার খোরপোষ ও বাসস্থানের কোনো অধিকার নেই"。
এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার পর নবী প্রথমে তাকে উম্মে শারীকের গৃহে থাকার নির্দেশ দেন; কিন্তু পরে তাঁকে বলেন, তুমি ইবনে উম্মে মাকতূমের গৃহে অবস্থা করো। কিন্তু যারা এ হাদীস গ্রহণ করেননি তাদের যুক্তি হলো-
• প্রথমত, তাঁকে স্বামীর আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি ছাড়তে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল এ জন্য যে, তিনি ছিলেন অত্যন্ত কর্কশ ভাষী। স্বামীর আত্মীয়-স্বজন তাঁর বদ মেজাজের কারণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। সাঈদ ইবনুল মুসাইয়েব বলেন, ঐ মহিলা তাঁর হাদীস বর্ণনা করে মানুষকে ফিতনার মধ্যে ফেলে দিয়েছেন। প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে তিনি ছিলেন খুব মুখড়া। তাই তাঁকে ইবনে মাকতূমের গৃহে রাখা হয়েছিল (আবু দাউদ)।
• আরেকটি রেওয়ায়াতে সাঈদ ইবনুল মুসাইয়েবের এ উক্তি উদ্ধৃত হয়েছে যে, তিনি তাঁর স্বামীর আত্মীয়-স্বজনদের কটু কথা বলেছিলেন। তাই তাঁকে বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল (জাসসাস)। সুলায়মান ইবনে ইয়াসার বলেন, "প্রকৃতপক্ষে বদ মেজাজীর কারণে তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন"। (আবু দাউদ)
দ্বিতীয়ত উমর এমন এক যুগে তাঁর বর্ণিত হাদীস প্রত্যাখ্যান করেছিলেন যখন বহু সংখ্যক সাহাবী বেঁচেছিলেন এবং এ বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ খবর নেয়া এবং যাঁচাই বাছাই করা পুরোপুরি সম্ভবপর ছিল। ইবরাহীম নাখয়ী বলেন, উমর যখন ফাতেমার এই হাদীস শুনলে তখন বললেন, "এমন একজন নারীর কথা অনুসারে আমরা আল্লাহর কিতাবের একটি আয়াত এবং রাসূলুল্লাহ-এর বাণী পরিত্যাগ করতে পারি না, যার হয়তো ভুল ধারণা হয়েছে- আমি নিজে রাসূলুল্লাহ কে বলতে শুনেছি, তিন তালাকপ্রাপ্তা নারীর বাসস্থান ও খোরপোষ উভয়টি লাভের অধিকার আছে" (জাসসাস)। আবু ইসহাক বলেন, আমি কুফার মসজিদে আসওয়াদ ইবনে ইয়াযীদের পাশে বসে ছিলাম। সেখানে শা'বী ফাতেমা বিনতে কায়েসের হাদীস উল্লেখ করলে আসওয়াদ পাথরের টুকরো তুলে শা'বীর প্রতি ছুঁড়ে মেরে বললেন, উমরের সময়ে যখন ফাতেমার বর্ণিত এ হাদীস পেশ করা হয়েছিল তখন তিনি বলেছিলেন, একজন নারীর কথায় আমরা আল্লাহর কিতাব এবং নবীর সুন্নাতকে পরিত্যাগ করতে পারি না। আমরা জানি না সে সঠিকভাবে মনে রাখতে পেরেছে না ভুলে গিয়েছে। সে খোরপোষ ও বাসগৃহ লাভ করবে। আল্লাহ তা'আলা আদেশ দিয়েছিলেন, لَا تُخْرِجُوْهُنَّ مِنْ بُيُوتِهِنَّ মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী এবং নাসায়ীতে শাব্দিক তারতম্যসহ এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে。
তৃতীয়ত, মারওয়ানের শাসন আমলে তিনি তালাকপ্রাপ্তা নারী সম্পর্কে এক বিতর্কের সূত্রপাত হলে আয়েশা ফাতেমা বিনতে কায়েসের বর্ণিত হাদীস সম্পর্কে তীব্র আপত্তি জানিয়েছিলেন। কাসেম ইবনে মুহাম্মাদ বলেনঃ আমি আয়েশাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি ফাতেমার কাহিনী জানেন না। তিনি জবাব দিলেন, ফাতেমার বর্ণিত হাদীসের কথা না বলাই ভাল (বুখারী)। বুখারী অপর যে হাদীসটি বর্ণনা করেছিলেন তাতে আয়েশার বক্তব্যের ভাষা হলো, ফাতেমার কী হয়েছে সে কি আল্লাহকে ভয় করে না? তৃতীয় একটি হাদীসে উরওয়া ইবনে যুবায়ের বলেন যে, আয়েশা বলেছেন, এ হাদীস বর্ণনা করার মধ্যে ফাতেমার কোনো কল্যাণ নেই। অপর এক বর্ণনায় হযরত উরওয়া বলেন, আয়েশা ফাতেমার প্রতি তাঁর চরম অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এবং বলেন, "প্রকৃতপক্ষে সে একটি নির্জন গৃহে অবস্থান করেছিল সেখানে তার কোনো প্রিয়জন বা বন্ধবী ছিল না। সুতরাং তার নিরাপত্তা ও প্রশান্তির জন্য নবী তাকে গৃহ পরিবর্তনের আদেশ দিয়েছিলেন"。
চতুর্থত, পরে উসামা ইবনে যায়েদের সাথে ঐ মহিলার বিয়ে হয়েছিল। উসামার ছেলে মুহাম্মাদ বলেন, ফাতেমা যখনই এ হাদীস বলতেন তখনই আমার পিতা হাতের কাছে যা পেতেন তাই তার প্রতি নিক্ষেপ করতেন। (জাসসাস)। এ কথা স্পষ্ট যে, উসামার জানা মতে, তা রাসূলের সুন্নাতের পরিপন্থী না হলে এ হাদীসটি বর্ণনা করার জন্য তিনি এতটা অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতে পারতেন না。
'তারা গর্ভবতী থাকলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত তাদের জন্যে ব্যয় করবে' এ বিষয়টি
সর্বসম্মত যে, তালাকপ্রাপ্তা মহিলা যদি গর্ভবতী হয় তাহলে সে রিজয়ী তালাকপ্রাপ্তা হোক বা বায়েন তালাকপ্রাপ্তা হোক সর্ববস্থায় সন্তান প্রসব পর্যন্ত তার বাসস্থান ও খোরপোষের দায়িত্ব স্বামীর ওপর ন্যস্ত থাকবে। তবে যে ক্ষেত্রে গর্ভবতী মহিলার স্বামী মারা যাবে সে ক্ষেত্রে এ বিষয়ে মতভেদ আছে। এ ক্ষেত্রে সে তালাক দেয়ার পরে মারা গিয়ে থাকুক, অথবা কোনো তালাক না দিয়ে মারা গিয়ে থাকুক এবং স্ত্রী গর্ভবতী অবস্থায় বিধবা হয়ে থাকুক তাকে কিছু এসে যায় না। এ ব্যাপারে ফিকাহবিদদের মতামত হলো-
* হযতর আলী এবং আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের মতে, স্বামীর পরিত্যাক্ত মোট সম্পদের ওপর থেকে তাকে খোরপোষ দেয়া ওয়াজিব। আবদুল্লাহ ইবনে উমর, কাজী শুরাইহ, আবুল আলীয়া, শা'বী এবং ইবরাহীম নাখায়ী থেকেও মতটি বর্ণিত হয়েছে এবং হযতর আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের একটি মত এ মতের সমর্থন করে (আলুসী, জাসসাস)। ইবনে জারীর আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের দ্বিতীয় যে মতটি বর্ণনা করেছেন তা হচ্ছে, মৃত ব্যক্তি যদি কোনো সম্পদ রেখে গিয়ে থাকে তাহলে সেই সম্পদে তার গর্ভস্থ সন্তানের অংশ থেকে তার জন্য ব্যয় করতে হবে। কিন্তু মৃত ব্যক্তি কোনো সম্পদ না রেখে গিয়ে থাকলে মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদেকে তার জন্য খরচ করা কর্তব্য। কারণ, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَعَلَى الْوَارِثِ مِثْلُ ذَلِكَ “আর উত্তরাধিকারীগণের প্রতিও অনুরূপ বিধান।" (সূরা বাকারা আয়াত ২৩৩)
* জাবের ইবনে আবদুল্লাহ, আবদুল্লাহ ইবনুয যুবায়ের আল, হাসান বসরী, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়েব এবং আতা ইবনে আবী রাবিয়াহর মতে, মৃত স্বামীর সম্পদে তার খোরপোষ লাভের কোনো অধিকার নেই। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত তৃতীয় মতটিও এ মতটিরই অনুরূপ। (জাসসাস)। এর অর্থ, স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পদে উত্তরাধিকারী হিসেবে সে যে অংশ লাভ করেছে তা থেকে সে নিজের ব্যয় নির্বাহ করতে পারে। কিন্তু স্বামীর রেখে যাওয়া মোট সম্পদের ওপর তার খোরপোষের দায়িত্ব বর্তায় না। কারণ, তাতে সমস্ত উত্তরাধিকারীকেই সে বোঝা বহন করতে হয়。
* ইবনে আবী লায়লার মতে, মৃত স্বামীর সম্পদ থেকে তার খোরপোষ দেয়া ঠিক তেমনি ওয়াজিব যেমন কোনো ঋণদাতার ঋণ পরিশোধ করা ওয়াজিব (জাসসাস)। অর্থাৎ পরিত্যাক্ত মোট সম্পদ থেকে যেভাবে ঋণ পরিশোধ করা হয় সেভাবে তাকে খোরপোষও দিতে হবে。
* ইমাম আবু হানীফা (র), ইমাম আবু ইউসূফ (র), ইমাম মুহাম্মাদ (র) ও ইমাম যুফারের মতে, মৃত স্বামীর সম্পদ থেকে তার বাসস্থান বা খোরপোষ কোনোটাই পাওয়ার অধিকার নেই। কারণ, মৃত্যুর পর মৃত ব্যক্তির কোনো মালিকানা স্বত্ব থাকে না। মৃত্যুর পর তা ওয়ারিশদের সম্পদ। তাই তাদের সম্পদে মৃত ব্যক্তির
গর্ভবতী বিধবার খোরপোষ কী করে ওয়াজিব হতে পারে? (হিদায়া), জাসসাস)। ইমাম আহমাদ রা. ইবনে হাম্বলও এ মত পোষণ করেন (আল-ইনসাফ)।
* ইমাম শাফেয়ীর (র) মতে, সে খোরপোষ পেতে পারে না, তবে বাসস্থান পাওয়ার অধিকারী (মুগনিউল মুহতাজ)। তার দলীল হচ্ছে, আবু সাঈদ খুদরীর বোন ফুরাইবার স্বামীকে হত্যা করা হলে রাসূলুল্লাহ্ তাকে তার স্বামীর বাড়িতেই ইদ্দতকাল কাটানো নির্দেশ দিয়েছিলেন। (আবু দাউদ, নাসায়ী, তিরমিযী)। তাছাড়া দারু কুতনীর একটি হাদীস থেকেও তিনি প্রমাণ দিয়েছেন। উক্ত হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ বলেছেন, গর্ভবতী বিধবার জন্য কোনো খোরপোষ নেই। ইমাম মালেকও (র) এ মত পোষণ করেছেন (হাশিয়াতুদ দুসুকী)।
'যদি তারা তোমাদের সন্তানদেরকে স্তন্যদান করে তবে তাদেরকে পারিশ্রমিক দিবে এবং সন্তানের কল্যাণ সম্পর্কে তোমরা সঙ্গতভাবে নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করবে' এই নির্দেশ থেকে কতকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা যায়।
* নারী নিজেই তার বুকের দুধের মালিক। তাহলে এ কথা স্পষ্ট যে, সে তার দুধের বিনিময় গ্রহণ করতে পারতো না এবং সে জন্য তাকে অনুমতিও দেয়া হতো না。
* গর্ভস্থ সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া মাত্রই সে তার পূর্বতন স্বামীর বিবাহ বন্ধনে থেকে মুক্ত হয়ে যাওয়ার কারণে সন্তানকে দুধ পান করাতে আইনগত বাধ্য নয়; বরং শিশুর পিতা যদি তার দুধ পান করাতে চায় এবং সেও সম্মত হয় তাহলে সন্তানকে দুধ পান করাবে এবং সে জন্য বিনিময় লাভের অধিকারী হবে。
* পিতাও সন্তানকে আইনগত মায়ের দুধ পান করাতে বাধ্য নয়。
* সন্তানের ব্যয়ভার পিতার ওপর বর্তায়。
* সন্তানকে দুধ পান করানোর সর্বাগ্নে অধিকার মায়ের। কিন্তু মা যদি এতে রাজী না হয় কিংবা সে জন্য এতটা মূল্য দাবী করে যা পূরণ করার সামর্থ পিতার নেই তাহলে কেবল সেই ক্ষেত্রে অন্য কোনো নারী দ্বারা তাকে দুধ পান করানোর কাজে নেয়া যেতে পারে। এ নির্দেশ থেকে ষষ্ঠ যে মূলনীতি পাওয়া যায় তা হচ্ছে, মা যে অর্থ দাবী করছে অপর কোনো মহিলাকেও যদি সেই অর্থই দিতে হয় তাহলে সে ক্ষেত্রে মায়ের অধিকার অগ্রগণ্য হবে。
এ বিষয়ে ফিকহবিদদের মতামত নীচে বর্ণনা করা হলো-
দাহহাকের মতে, শিশুকে দুধদানের সর্বাধিক অধিকার মায়ের। কিন্তু দুধ পান করানো এবং না কারানোর ব্যাপারে তার ইখতিয়ার আছে। তবে শিশু যদি অন্য কোন মহিলার স্তন গ্রহণ না করে তাহলে তাকে দুধ পান করানোর জন্য মাকে বাধ্য করা হবে। কাতাদা, ইবরাহীম নাখয়ী এবং সুফিয়ান সাওরীর মত প্রায় অনুরূপ। ইবরাহীম নাখয়ী এ কথাও বলেন যে, দুধ পান করানো জন্য মাকে বাধ্য করা হবে। (ইবনে জারীর)।
হিদায়াগ্রন্থে বলা হয়েছে, পিতা মাতার বিচ্ছেদের সময় যদি দুগ্ধপোষ্য শিশু সন্তান থাকে
তাহলে তাকে দুধ পান করানো মায়ের জন্য ফরজ নয়। তবে যদি দুগ্ধদাত্রী অন্য কোনো মহিলাকে পাওয়া না যায়, তাহলে তাকে দুগ্ধদানে বাধ্য করা হবে। আর বাপ যদি বলে, শিশুর মাকে বিনিময় দিয়ে দুধ পান করানোর পরিবর্তে অন্য কোন মহিলাকে বিনিময় দিয়ে এ কাজ করবো, অথব শিশুর মা উক্ত মহিলার দাবীকৃত অর্থের সমপরিমাণ অর্থই দাবী করেছে কিংবা বিনামূল্যে এ কাজ করতে সম্মত হচ্ছে তাহলে এ ক্ষেত্রে তার অধিকারই অগ্রগণ্য হবে। আর শিশুর মা যদি অধিক বিনিময় দাবী করে তাহলে পিতাকে সে জন্য বাধ্য করা হবে না。
এর মধ্যে পিতামাতা উভয়ের জন্য এক ধরনের তিরস্কার বিদ্যমান। বাচনভঙ্গি থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, অতীতে যে তিক্ততার কারণে শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি তালাক পর্যন্ত গড়িয়েছে তার কারণে তারা যদি উত্তম পন্থায় শিশুর দুধ পানের বিষয়টি মীমাংসা করতে না পারে তাহলে তা আল্লাহর কাছে পছন্দীয় ব্যাপার নয়। নারীকে সতর্ক করা হয়েছে যে, যদি অধিক বিনিময় দাবী করে পুরুষকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করে, তাহলে সে যেন জেনে রাখে, শিশুর প্রতিপালন শুধু তার ওপরেই নির্ভর করে না। সে ক্ষেত্রে অন্য কোনো নারী তাকে দুধ পান করাবে। সাথে সাথে পুরুষকেও সাবধান করা হয়েছে এই বলে যে, সে যদি মায়ের মাতৃত্বের দুর্বলতাকে অবৈধভাবে কাজে লাগিয়ে তাকে বিপাকে ফেলতে চায় তাহলে তা ভদ্র জনোচিত কাজ হবে না। সূরা বাকারার ২৩৩ আয়াতে প্রায় অনুরূপ বিষয়ই আরো বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00