📘 আল কুরআনে নারীদের ২৫ সূরা > 📄 নাযিলের সময়

📄 নাযিলের সময়


এ সূরা এমন দুটো ঘটনার সাথে সম্পর্কিত, যা ইতিহাসে বিখ্যাত। তাই এর নাযিলের সময়কাল সঠিকভাবে জানা সহজ।
প্রথমত: হাতিব বিন আমি বালতায়া নামক এক সাহাবী রাসূল-এর মক্কা অভিযানের খবর কুরাইশদেরকে জানানোর জন্য গোপনে এক চিঠি পাঠিয়েছিলেন। এ ঘটনা মক্কা বিজয়ের কিছু আগেই ঘটে থাকবে।
দ্বিতীয়ত: এ সূরায় হিজরতকারী মহিলাদের কথা বলা হয়েছে। হুদাইবিয়ার সন্ধির পর মক্কা বিজয় পর্যন্তই হিজরত চালু ছিল। তাই নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, অষ্টম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের কিছু আগেই এ সূরাটি নাযিল হয়েছে।

এ সূরা এমন দুটো ঘটনার সাথে সম্পর্কিত, যা ইতিহাসে বিখ্যাত। তাই এর নাযিলের সময়কাল সঠিকভাবে জানা সহজ。
প্রথমত: হাতিব বিন আমি বালতায়া নামক এক সাহাবী রাসূল-এর মক্কা অভিযানের খবর কুরাইশদেরকে জানানোর জন্য গোপনে এক চিঠি পাঠিয়েছিলেন। এ ঘটনা মক্কা বিজয়ের কিছু আগেই ঘটে থাকবে。
দ্বিতীয়ত: এ সূরায় হিজরতকারী মহিলাদের কথা বলা হয়েছে। হুদাইবিয়ার সন্ধির পর মক্কা বিজয় পর্যন্তই হিজরত চালু ছিল। তাই নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, অষ্টম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের কিছু আগেই এ সূরাটি নাযিল হয়েছে।

📘 আল কুরআনে নারীদের ২৫ সূরা > 📄 বিষয়বস্তু ও মূল বক্তব্য

📄 বিষয়বস্তু ও মূল বক্তব্য


এ সূরাটির তিনটি অংশ। যেমন- • প্রথম অংশ সূরার শুরু থেকে ৯ আয়াত পর্যন্ত। সূরার সমাপ্তি পর্বের ১৩ নং আয়াতটিও এর সাথে সম্পর্কিত। হাতেব ইবনে আবু বালতা'আ শুধু তার পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ-এর অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি গোপন সামরিক তথ্য শত্রুদের জানিয়ে দেয়ার চেষ্ট করেছিলেন। এটি যথাসময়ের ব্যর্থ করে দেয়া না গেলে মক্কা বিজয়ের সময় ব্যাপক রক্তপাত হতো। مسلمانوںও বহু মূল্যবান প্রাণ নষ্ট হতো এবং কুরাইশদেরও এমন বহু লোক মারা যেতো, যাদের দ্বারা পরবর্তী সময়ে ইসলামের ব্যাপক খেদমত পাওয়ার ছিল। শান্তিপূর্ণ উপায়ে মক্কা বিজিত হলে যেসব সুফল অর্জিত হতে পারতো তা সবই পণ্ড হয়ে যেতো। এসব বিরাট ও ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হতো শুধু এ কারণে যে, مسلمانوںই এক ব্যক্তি যুদ্ধের বিপদ থেকে নিজের সন্তান-সন্তুতিকে নিরাপদ রাখতে চেয়েছিল। এ আয়াতে হাতেব ইবনে আবু বালতা'আর এ কাজের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। মারাত্মক এই ভুল সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়ে আল্লাহ তা'আলা সমস্ত ঈমানদারদের এ শিক্ষা দিয়েছেন যে, কোনো ঈমানদারের কোনো অবস্থায় কোনো উদ্দেশ্যেই ইসলামের শত্রু কাফেরদের সাথে ভালবাসা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক না রাখা উচিত এবং এমন কোনো কাজও না করা উচিত যা কুফর ও ইসলামের সংঘাতে কাফেরদের জন্য সুফল বয়ে আনে। তবে যেসব কাফের কার্যত ইসলাম ও مسلمانوں বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক ও নির্যাতনমূলক কোনো আচরণ করছে না তাদের সাথে প্রীতিপূর্ণ ও অনুগ্রহের আচরণ করায় কোনো দোষ নেই।
• ১০ ও ১১ আয়াত হলো, সূরাটির দ্বিতীয় অংশ। সেই সময় মারাত্মক জটিলতার সৃষ্টি করছিল এমন একটি সামাজিক সমস্যার সমাধান পেশ করা হয়েছে এ অংশে। মক্কায় বহু মুসলমান মহিলা ছিল যাদের স্বামীরা ছিল কাফের। এসব মহিলা কোনো না কোনোভাবে হিজরত করে মদীনায় এসে হাজির হতো। অনুরূপ মদীনায় বহুসংখ্যক মুসলমান পুরুষ ছিল যাদের স্ত্রীরা ছিল কাফের এবং তারা মক্কাতেই রয়ে গিয়েছিল। এসব লোকের দাম্পত্য বন্ধন অক্ষুণ্ণ আছে কিনা এ বিষয়ে প্রশ্ন দেখা দিতো। আল্লাহ তাআলা এ বিষয়ে চিরদিনের জন্য ফায়সালা দিলেন যে, মুসলমান নারীর জন্য কাফের স্বামী হালাল নয় এবং মুসলমান পুরুষের জন্যও মুশরিক স্ত্রীকে বিবাহ বন্ধনে রাখা জায়েজ নয়। এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনগত ফলাফলের ধারক।
• ১২ নং আয়াত হলো সূরাটি তৃতীয় অংশ। এতে রাসূলুল্লাহকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, জাহেলী যুগের আরব সমাজে যেসব বড় বড় দোষ-ত্রুটি ও গোনাহের কাজ নারী সমাজের মধ্যে বিস্তার লাভ করেছিল যেসব নারী ইসলাম গ্রহণ করবে তা থেকে মুক্ত থাকার জন্য তাদের থেকে প্রতিশ্রুতি নিতে হবে এবং এ বিষয়েও অঙ্গীকার নিতে হবে যে, আল্লাহর রাসূলের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে যেসব কল্যাণ ও সুকৃতির পথ, পন্থা ও নিয়ম-কানুন মেনে চলার আদেশ দেয়া হবে তা তারা মেনে চলবে।

এ সূরাটির তিনটি অংশ। যেমন-
• প্রথম অংশ সূরার শুরু থেকে ৯ আয়াত পর্যন্ত। সূরার সমাপ্তি পর্বের ১৩ নং আয়াতটিও এর সাথে সম্পর্কিত। হাতেব ইবনে আবু বালতা'আ শুধু তার পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ-এর অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি গোপন সামরিক তথ্য শত্রুদের জানিয়ে দেয়ার চেষ্ট করেছিলেন। এটি যথাসময়ের ব্যর্থ করে দেয়া না গেলে মক্কা বিজয়ের সময় ব্যাপক রক্তপাত হতো। মুসলমানদেরও বহু মূল্যবান প্রাণ নষ্ট হতো এবং কুরাইশদেরও এমন বহু লোক মারা যেতো, যাদের দ্বারা পরবর্তী সময়ে ইসলামের ব্যাপক খেদমত পাওয়ার ছিল। শান্তিপূর্ণ উপায়ে মক্কা বিজিত হলে যেসব সুফল অর্জিত হতে পারতো তা সবই পণ্ড হয়ে যেতো। এসব বিরাট ও ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হতো শুধু এ কারণে যে, মুসলমানদেরই এক ব্যক্তি যুদ্ধের বিপদ থেকে নিজের সন্তান-সন্তুতিকে নিরাপদ রাখতে চেয়েছিল। এ আয়াতে হাতেব ইবনে আবু বালতা'আর এ কাজের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। মারাত্মক এই ভুল সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়ে আল্লাহ তা'আলা সমস্ত ঈমানদারদের এ শিক্ষা দিয়েছেন যে, কোনো ঈমানদারের কোনো অবস্থায় কোনো উদ্দেশ্যেই ইসলামের শত্রু কাফেরদের সাথে ভালবাসা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক না রাখা উচিত এবং এমন কোনো কাজও না করা উচিত যা কুফর ও ইসলামের সংঘাতে কাফেরদের জন্য সুফল বয়ে আনে। তবে যেসব কাফের কার্যত ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক ও নির্যাতনমূলক কোনো আচরণ করছে না তাদের সাথে প্রীতিপূর্ণ ও অনুগ্রহের আচরণ করায় কোনো দোষ নেই。
• ১০ ও ১১ আয়াত হলো, সূরাটির দ্বিতীয় অংশ। সেই সময় মারাত্মক জটিলতার সৃষ্টি করছিল এমন একটি সামাজিক সমস্যার সমাধান পেশ করা হয়েছে এ অংশে। মক্কায় বহু মুসলমান মহিলা ছিল যাদের স্বামীরা ছিল কাফের। এসব মহিলা কোনো না কোনোভাবে হিজরত করে মদীনায় এসে হাজির হতো। অনুরূপ মদীনায় বহুসংখ্যক মুসলমান পুরুষ ছিল যাদের স্ত্রীরা ছিল কাফের এবং তারা মক্কাতেই রয়ে গিয়েছিল। এসব লোকের দাম্পত্য বন্ধন অক্ষুণ্ণ আছে কিনা এ বিষয়ে প্রশ্ন দেখা দিতো। আল্লাহ তাআলা এ বিষয়ে চিরদিনের জন্য ফায়সালা দিলেন যে, মুসলমান নারীর জন্য কাফের স্বামী হালাল নয় এবং মুসলমান পুরুষের জন্যও মুশরিক স্ত্রীকে বিবাহ বন্ধনে রাখা জায়েজ নয়। এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনগত ফলাফলের ধারক。
• ১২ নং আয়াত হলো সূরাটি তৃতীয় অংশ। এতে রাসূলুল্লাহকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, জাহেলী যুগের আরব সমাজে যেসব বড় বড় দোষ-ত্রুটি ও গোনাহের কাজ নারী সমাজের মধ্যে বিস্তার লাভ করেছিল যেসব নারী ইসলাম গ্রহণ করবে তা থেকে মুক্ত থাকার জন্য তাদের থেকে প্রতিশ্রুতি নিতে হবে এবং এ বিষয়েও অঙ্গীকার নিতে হবে যে, আল্লাহর রাসূলের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে যেসব কল্যাণ ও সুকৃতির পথ, পন্থা ও নিয়ম-কানুন মেনে চলার আদেশ দেয়া হবে তা তারা মেনে চলবে।

📘 আল কুরআনে নারীদের ২৫ সূরা > 📄 রাসূলের নিকট নারীদের আনুগত্যের শপথ

📄 রাসূলের নিকট নারীদের আনুগত্যের শপথ


يَأَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا جَاءَكَ الْمُؤْمِنَتُ يُبَايِعْنَكَ عَلَى أَنْ لَّا يُشْرِكْنَ بِاللَّهِ شَيْئًا وَلَا يَسْرِقُنَ وَلَا يَزْنِينَ وَلَا يَقْتُلُنَ أَوْلَادَهُنَّ وَ لَا يَأْتِينَ بِبُهْتَانٍ يَفْتَرِيْنَهُ بَيْنَ أَيْدِيهِنَّ وَأَرْجُلِهِنَّ وَلَا يَعْصِيْنَكَ فِي مَعْرُوفٍ فَبَايِعُهُنَّ وَ اسْتَغْفِرْ لَهُنَّ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ.
অর্থ: হে নবী! মু'মিন নারীরা যখন তোমার নিকট এসে বায়'আত করে এই মর্মে যে, তারা আল্লাহর সাথে কোনো শরীক স্থির করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, নিজেদের সন্তানদের হত্যা করবে না, তারা সজ্ঞানে কোনো অপবাদ রচনা করে রটাবে না এবং সৎকাজে তোমাকে অমান্য করবে না তখন তাদের বায়'য়াত গ্রহণ করো এবং তাদের জন্যে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো। আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা মুমতাহানা: আয়াত-১২)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: এ আয়াতে মুসলিম নারীদের থেকে একটি বিস্তারিত আনুগত্যের শপথ নেয়ার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এ শপথ ছিল ঈমান ও আকায়িদসহ শরীয়তের বিধান পালনের ব্যাপারে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার। পূর্ববর্তী আয়াতে যদিও এ শপথ মুহাজির নারীদের ঈমান পরীক্ষা পরিশিষ্ট হিসেবে বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু ভাষায় ব্যাপকতার কারণে এটা শুধু তাদের বেলায়ই প্রযোজ্য নয়; বরং সকল মুসলিম নারীর জন্য ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য। বাস্তব ক্ষেত্রে তাই ঘটেছে। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ এর কাছে শুধু মুহাজির নারীরাই নয়, অন্যান্য নারীরাও শপথ গ্রহণ করেছে। সহীহ বুখারীর রেওয়ায়াতে উমায়মা বর্ণনা করেন, আমি এবং আরও কয়েকজন মহিলাসহ রাসূলুল্লাহ-এর কাছে শপথ করেছি। তিনি আমাদের কাছ থেকে শরীয়তের বিধি-বিধান পালনের অঙ্গীকার নেন এবং সাথে সাথে এ বাক্য ও উচ্চারণ করেন, فِيمَا اسْتَطَعْنَ وَأَطَقْتُنَّ অর্থাৎ আমরা এসব বিষয়ে অঙ্গীকার করি যে পর্যন্ত আমাদের সাধ্যে কুলায়। উমায়মা এরপর বলেন, এ থেকে জানা গেল যে, আমাদের প্রতি রাসূলুল্লাহ -এর স্নেহ-মমতা আমাদের নিজেদের চেয়েও বেশি ছিল। আমরা তো নিঃশর্ত অঙ্গীকার করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তিনি আমাদেরকে শর্তযুক্ত অঙ্গীকার শিক্ষা দিলেন। ফলে অপারগ অবস্থায় বিরুদ্ধাচরণ হয়ে গেলে তা অঙ্গীকার ভঙ্গের শামিল হবে না। (তাফসীরে মাযহারী)
আয়াতটি মক্কা বিজয়ের পূর্বে নাযিল হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে মক্কা বিজিত হলে কুরাইশরা বাইয়াতের জন্য দলে দলে রাসূলুল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে এসে হাজির হতে থাকল। তিনি নিজে সাফা পাহাড়ের ওপর পুরুষদের থেকে বাইয়াত গ্রহণ করলেন এবং তাঁর নিজের পক্ষ থেকে মহিলাদের 'বাইয়াত' গ্রহণ এবং এ আয়াতে যে বিষয়গুলো বর্ণিত হয়েছে সে বিষয়ে প্রতিশ্রুতি নিতে উমরকে নির্দেশ দিলেন। (ইবনে আব্বাসের বর্ণনা সূত্রে ইবনে জারীর কাতাদার বর্ণনা সূত্রে ইবনে হাতেম)।
এরপর তিনি মদীনায় ফিরে গিয়ে আনসারী মহিলাদের এক জায়গায় জমায়েত করার নির্দেশ দিলেন এবং তাদের বাইয়াত গ্রহণের জন্য উমরকে পাঠান। (ইবনে জারীর, ইবনে মারদইয়া, বাযযার, ইবনে হিব্বান উম্মে আতিয়া আনসারিয়ার বর্ণনা সূত্রে) তিনি ঈদের দিনেও পুরুষদের সমাবেশে বক্তৃতা করার পর মহিলাদের সমাবেশে গিয়েছিলেন এবং সেখানেও বক্তৃতার মধ্যে এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন। এর মধ্যে যেসব বিষয়ের উল্লেখ আছে সেসব বিষয়ে তিনি মহিলাদের নিকট থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন। (বুখারী ইবনে আব্বাসের বর্ণনা সূত্রে) এসব ক্ষেত্র ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে মহিলারা ব্যক্তিগতভাবেও এবং সমষ্টিগতভাবেও তাঁর কাছে হাজির হয়ে বাইয়াত গ্রহণ করত যা বিভিন্ন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।
মক্কায় যে সময় মহিলাদের নিকট থেকে বাইয়াত নেয়া হচ্ছিল সেই সময় আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা বিনতে উতবা এই নির্দেশটির ব্যাখ্যা জানতে চেয়ে নবী -এর কাছে আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আবু সুফিয়ান কিছুটা কৃপণ প্রকৃতির লোক। আমি যদি তাকে না জানিয়ে আমার এবং আমার সন্তানদের প্রয়োজন পূরণের জন্য তার সম্পদ থেকে কিছু নেই তাতে কি আমার কোনো গোনাহ হবে? তিনি বললেন, না, তবে ন্যায়সংগত সীমার মধ্যে থেকে। অর্থাৎ ঠিক এতটা অর্থ নাও যা প্রকৃত অর্থে বৈধ প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট। (আহকামূল কুরআন, ইবনে আরাবী)।
রাসূল-এর যুগের মুসলিম নারীগণ তাঁর কাছে যেসব বিষয়ে শপথ করেছিলেন, আয়াতে বর্ণিত সেসব বিষয়াবলি নিম্নরূপ-
১. আল্লাহর সাতে কাউকে শরীক না করা, নির্ভেজাল তাওহীদী জিন্দেগী যাপন করা।
২. 'চুরি না করা' আবু সুফিয়ানের স্ত্রী এ বিষয়েরই ব্যাখ্যা চেয়েছিলেন রাসূলে করীম -এর কাছে। নারীদের অনেকেই স্বামীর অর্থ-সম্পদ চুরি করতে অভ্যস্ত ছিল বিধায় বিষয়টি উল্লেখযোগ্য ছিল।
৩. যিনা বা ব্যভিচার না করা- নারীরা এ ব্যাপারে কঠোর ভূমিকা রাখতে পারলে পুরুষদের জন্য আত্মরক্ষা করাও সহজতর হতে পারে।
৪. নিজেদের সন্তানদের হত্যা না করা। জাহেলিয়াতের যুগে কন্যা সন্তানকে জীবন্ত প্রোথিত করার অমানবিক কাজের প্রচলন ছিল বিধায় মুসলিম নারীদের তা থেকে কঠোরভাবে বারণ করা হয়।
৫. মিথ্যা অপবাদ ও কলংক আরোপ থেকে বিরত থাকা। এ বুহতান বা অপবাদ সম্বলিত আয়াতে দু'ধরনের মিথ্যা দোষারোপ বুঝায়।
• কোনো নারীর অন্য কোনো নারীর প্রতি পরপুরুষের সাথে প্রেম-প্রণয় করার অপবাদ করা এবং এ ধরনের কল্পকাহিনী মানুষের মধ্যে ছড়ান। কারণ এসব কথা বলে বেড়ানোর একটা রোগ মহিলাদের মধ্যে দেখা যায়।
• কোনো নারীর অন্য পুরুষদের ঔরসজাত সন্তান প্রসব করে স্বামীকে বিশ্বাস করানো যে, সেটা তারই সন্তান- এটাও অপবাদের অন্তর্ভুক্ত। আবু দাউদে আবু হুরাইরা কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, তিনি নবীকে বলতে শুনেছেন যে, যে নারী কোনো পরিবারে এমন কোনো সন্তান প্রবেশ করায় যে সেই বংশের সন্তান নয় সেই নারীর আল্লাহর সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। আল্লাহ তাকে কখনো জান্নাতে প্রবেশ করাবেন না।
সংক্ষিপ্ত এই আয়াতাংশে আইনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সূক্ষ্ম বিষয় বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন- প্রথম বিষয়টি হলো, নবী-এর আনুগত্যের ব্যাপারেও "ভাল কাজে আনুগত্য করা" কথাটি যোগ করা হয়েছে। অথচ নবী সম্পর্কে এ বিষয়ে সামান্যতম সন্দেহেরও অবকাশ ছিল না যে, তিনি কখনো মুনকার বা মন্দ কাজের নির্দেশও দিতে পারেন। এভাবে আপনা থেকেই একথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আল্লাহর আইন ও নির্দেশের বাইরে গিয়ে পৃথিবীতে কোনো মানুষের আনুগত্য করা যেতে পারে না। কারণ আল্লাহর রাসূলের আনুগত্যের ব্যাপারেও যখন মারূফ বা ভাল কাজ হওয়ার শর্তযুক্ত করা হয়েছে তখন শর্তহীন আনুগত্য লাভের মর্যাদা অন্য কারো কীভাবে থাকতে পারে। কিংবা তার এমন কোনো নির্দেশ অথবা আইন অথবা নিয়ম-কানুন এবং আচার অনুষ্ঠানের আনুগত্য কীভাবে করা হবে যা আল্লাহর বিধানের পরিপন্থী? এই মৌলিক নীতিটাকে নবী এভাবে বর্ণনা করেছেন,
"আল্লাহর নাফরমানী করে কারো আনুগত্য করা যেতে পারে না। মারূফ বা সৎ কাজেই কেবল আনুগত্য করা যেতে পারে। (মুসলিম, আবু দাউদ নাসায়ী)।
বড় বড় জ্ঞানী-গুণী ও মনীষীগণ এ আয়াতের মূল প্রতিপাদ্য হিসেবে এই বিষয়টিকেই গ্রহণ করেছেন।
আবদুর রহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম বলেন, "আল্লাহ তা'আলা একথা বলেননি যে, তারা যেন আদৌ তোমার নাফরমানী না করে; বরং বলেছেন যে, মারূফ বা ভাল কাজে তারা যেন তোমার নাফরমানী না করে। আল্লাহ তা'আলা যখন নবীর আনুগত্যের ক্ষেত্রে পর্যন্ত এ শর্ত যুক্ত করেছেন তখন মারূফ ছাড়া অন্য কোন ব্যাপারে অন্যদের আনুগত্য করা যাবে তা কি করে হতে পারে। "(ইবনে জারীর)।
ইমাম আবু বকর জাসস্স লিখেছেন, আল্লাহ জানতেন, তাঁর নবী মারূফ ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে নির্দেশ দেন না। তা সত্ত্বেও তিনি তাঁর নবীর নাফরমানী করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিতে গিয়ে মারূফ বা ভাল কাজের শর্ত আরোপ করেছেন। যাতে আল্লাহর আনুগত্যমূলক নির্দেশ না হওয়া সত্ত্বেও কেউ কখনো কোনো রাজশক্তির আনুগত্যের অবকাশ খুঁজে বের করতে না পারে।
কিছু সংখ্যক নির্ভরযোগ্য হাদীস থেকে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ -এর যুগে মহিলাদের থেকে বাইয়াত গ্রহণের পদ্ধতি পুরুষদের থেকে বাইয়াত গ্রহণের পদ্ধতি থেকে ভিন্ন ছিল। পুরুষদের থেকে বাইয়াত গ্রহণের সিদ্ধান্ত ছিল এই যে, বাইয়াত গ্রহণকারী নবীর হাতে হাত দিয়ে প্রতিজ্ঞা করত। কিন্তু মহিলাদের থেকে বইয়াত গ্রহণের সময় তিনি কখনো তাঁর হাত দিয়ে কোনো মহিলার হাত ধরেননি; বরং ভিন্ন পদ্ধতিতে গ্রহণ করেছেন। এ বিষয়ে যেসব হাদীস উল্লেখিত হয়েছে তা নীচে বর্ণনা করছি-
আয়েশা বলেন, "আল্লাহর শপথ, বাইয়াত গ্রহণের সময় নবীর হাত কোনো মহিলার হাতকে স্পর্শ করেননি। মহিলাদের বাইয়াত গ্রহণের সময় তিনি মুখে শুধু একথাটুকু বলতেন যে, আমি তোমার থেকে বাইয়াত নিয়েছি। "(বুখারী, ইবনে জারীর)।
"উমাইমা বিনতে রুকাইকা বলেন, আমি আরো কয়েকজন মহিলার সাথে বাইয়াতের জন্য নবীর খেদমতে হাজির হলে তিনি কুরআনের এই আয়াতের নির্দেশ অনুসারে আমাদের থেকে প্রতিশ্রুতি নিলেন। যখন আমরা বললাম, মারূফ বা ভাল কাজে আমরা আপনার নাফরমানী করব না। "তখন তিনি বললেন, "যতটা তোমাদের পক্ষে সম্ভব হবে ও সাধ্যে কুলাবে। "আমরা বললাম, আমাদের জন্য আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল আমাদের নিজেদের চেয়েও বেশি দয়াপরবশ। "তারপর আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! হাত বাড়িয়ে দিন। আমরা আপনার হাতে বাইয়াত করব। তিনি বললেন, আমি মহিলাদের সাথে মোসাফাহা করি না। আচ্ছা, আমি তোমাদের থেকেও প্রতিশ্রুতি নিচ্ছি। সুতরাং তিনি আমাদের থেকে প্রতিশ্রুতি নিলেন। আর একটি হাদীসে তাঁর বর্ণনা হলো, নবী আমাদের মধ্যকার কোনো মহিলার সাথেই মোসাফাহা করলেন না। (মুসনাদে আহমাদ, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনে মাজা, ইবনে জারীর, ইবনে আবী হাতেম)।
আবু দাউদ তাঁর 'মারাসীল' গ্রন্থে শা'বী থেকে রেওয়ায়াত করেছেন যে, মহিলাদের বাইয়াত নেয়ার সময় নবীর দিকে একখানা কাপড় এগিয়ে দেয়া হলো। তিনি শুধু তা হাতে নিলেন এবং বললেন, আমি মহিলাদের সাথে মোসাফাহা করি না। ইবনে আবী হামেব, শা'বী থেকে, আবদুর রাযযাক নাখয়ী থেকে এবং সায়ীদ ইবনে মনসূর কায়েস ইবনে আবী হাযেম থেকে প্রায় একই বিষয়বস্তু বর্ণনা করেছেন।
ইবনে ইসহাক মাগাযীতে আবান ইবনে সালেহ থেকে উদ্ধৃত করেছেন যে, মহিলাদের বাইয়াত নেয়ার সময় নবী পানির একটি পাত্রে নিজের হাত ডুবাতেন এবং মহিলারাও সেই একই পাত্র হাত ডুবাতো।
বুখারীতে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, ঈদের খুতবা দেয়ার পর নবী পুরুষদের কাতারের মধ্যে দিয়ে মহিলারা যেখানে বসে ছিল সেখানে গিয়ে হাজির হলেন। সেখানে বক্তৃতা করার সময় তিনি কুরআন মজীদের এ আয়াতটি পড়লেন। তারপর মহিলাদেরকে প্রশ্ন করলেন, তোমরা কি এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছো? সমাবেশের মধ্যে থেকে এক মহিলা জবাব দিল হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।
ইবনে হিব্বান, ইবনে জারীর এবং বাযযার প্রমুখের একটি রেওয়ায়াতের উম্মে আতিয়া আনসারিয়ার একটি বর্ণনা পাওয়া যায় যাতে বলা হয়েছে, নবী ঘরের বাইরে থেকে হাত বাড়িয়ে দিলেন এবং আমরা ভেতর থেকে হাত বাড়িয়ে দিলাম। কিন্তু এ বক্তব্য থেকে একথা বুঝা যায় না যে, মহিলারা তাঁর সাথে মোসাফাহাও করেছিল। কেননা, উম্মে আতিয়া মোসাফাহা করার কথা স্পষ্ট করে বলেননি। সম্ভবত সে সময় অবস্থা ছিল এই প্রতিশ্রুতি গ্রহণের সময় নবী বাইরে থেকে তাঁর হাত বাড়িয়ে দিয়ে থাকবেন এবং ভেতর থেকে মহিলারাও প্রত্যেকে তাদের হাত বাড়িয়ে দিয়ে থাকবে। কিন্তু তাদের কারো হাতই রাসূলুল্লাহ-এর হাত স্পর্শ করেনি।

يَأَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا جَاءَكَ الْمُؤْمِنَتُ يُبَايِعْنَكَ عَلَى أَنْ لَّا يُشْرِكْنَ بِاللَّهِ شَيْئًا وَلَا يَسْرِقُنَ وَلَا يَزْنِينَ وَلَا يَقْتُلُنَ أَوْلَادَهُنَّ وَ لَا يَأْتِينَ بِبُهْتَانٍ يَفْتَرِيْنَهُ بَيْنَ أَيْدِيهِنَّ وَأَرْجُلِهِنَّ وَلَا يَعْصِيْنَكَ فِي مَعْرُوفٍ فَبَايِعُهُنَّ وَ اسْتَغْفِرْ لَهُنَّ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ.
অর্থ: হে নবী! মু'মিন নারীরা যখন তোমার নিকট এসে বায়'আত করে এই মর্মে যে, তারা আল্লাহর সাথে কোনো শরীক স্থির করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, নিজেদের সন্তানদের হত্যা করবে না, তারা সজ্ঞানে কোনো অপবাদ রচনা করে রটাবে না এবং সৎকাজে তোমাকে অমান্য করবে না তখন তাদের বায়'য়াত গ্রহণ করো এবং তাদের জন্যে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো। আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা মুমতাহানা: আয়াত-১২)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: এ আয়াতে মুসলিম নারীদের থেকে একটি বিস্তারিত আনুগত্যের শপথ নেয়ার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এ শপথ ছিল ঈমান ও আকায়িদসহ শরীয়তের বিধান পালনের ব্যাপারে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার। পূর্ববর্তী আয়াতে যদিও এ শপথ মুহাজির নারীদের ঈমান পরীক্ষা পরিশিষ্ট হিসেবে বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু ভাষায় ব্যাপকতার কারণে এটা শুধু তাদের বেলায়ই প্রযোজ্য নয়; বরং সকল মুসলিম নারীর জন্য ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য। বাস্তব ক্ষেত্রে তাই ঘটেছে। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ এর কাছে শুধু মুহাজির নারীরাই নয়, অন্যান্য নারীরাও শপথ গ্রহণ করেছে। সহীহ বুখারীর রেওয়ায়াতে উমায়মা বর্ণনা করেন, আমি এবং আরও কয়েকজন মহিলাসহ রাসূলুল্লাহ-এর কাছে শপথ করেছি। তিনি আমাদের কাছ থেকে শরীয়তের বিধি-বিধান পালনের অঙ্গীকার নেন এবং সাথে সাথে এ বাক্য ও উচ্চারণ করেন, فِيمَا اسْتَطَعْنَ وَأَطَقْتُنَّ অর্থাৎ আমরা এসব বিষয়ে অঙ্গীকার করি যে পর্যন্ত আমাদের সাধ্যে কুলায়। উমায়মা এরপর বলেন, এ থেকে জানা গেল যে, আমাদের প্রতি রাসূলুল্লাহ -এর স্নেহ-মমতা আমাদের নিজেদের চেয়েও বেশি ছিল। আমরা তো নিঃশর্ত অঙ্গীকার করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তিনি আমাদেরকে শর্তযুক্ত অঙ্গীকার শিক্ষা দিলেন। ফলে অপারগ অবস্থায় বিরুদ্ধাচরণ হয়ে গেলে তা অঙ্গীকার ভঙ্গের শামিল হবে না। (তাফসীরে মাযহারী)
আয়াতটি মক্কা বিজয়ের পূর্বে নাযিল হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে মক্কা বিজিত হলে কুরাইশরা বাইয়াতের জন্য দলে দলে রাসূলুল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে এসে হাজির হতে থাকল। তিনি নিজে সাফা পাহাড়ের ওপর পুরুষদের থেকে বাইয়াত গ্রহণ করলেন এবং তাঁর নিজের পক্ষ থেকে মহিলাদের 'বাইয়াত' গ্রহণ এবং এ আয়াতে যে বিষয়গুলো বর্ণিত হয়েছে সে বিষয়ে প্রতিশ্রুতি নিতে উমরকে নির্দেশ দিলেন। (ইবনে আব্বাসের বর্ণনা সূত্রে ইবনে জারীর কাতাদার বর্ণনা সূত্রে ইবনে হাতেম)।
এরপর তিনি মদীনায় ফিরে গিয়ে আনসারী মহিলাদের এক জায়গায় জমায়েত করার নির্দেশ দিলেন এবং তাদের বাইয়াত গ্রহণের জন্য উমরকে পাঠান। (ইবনে জারীর, ইবনে মারদইয়া, বাযযার, ইবনে হিব্বান উম্মে আতিয়া আনসারিয়ার বর্ণনা সূত্রে) তিনি ঈদের দিনেও পুরুষদের সমাবেশে বক্তৃতা করার পর মহিলাদের সমাবেশে গিয়েছিলেন এবং সেখানেও বক্তৃতার মধ্যে এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন। এর মধ্যে যেসব বিষয়ের উল্লেখ আছে সেসব বিষয়ে তিনি মহিলাদের নিকট থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন। (বুখারী ইবনে আব্বাসের বর্ণনা সূত্রে) এসব ক্ষেত্র ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে মহিলারা ব্যক্তিগতভাবেও এবং সমষ্টিগতভাবেও তাঁর কাছে হাজির হয়ে বাইয়াত গ্রহণ করত যা বিভিন্ন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে。
মক্কায় যে সময় মহিলাদের নিকট থেকে বাইয়াত নেয়া হচ্ছিল সেই সময় আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা বিনতে উতবা এই নির্দেশটির ব্যাখ্যা জানতে চেয়ে নবী -এর কাছে আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আবু সুফিয়ান কিছুটা কৃপণ প্রকৃতির লোক। আমি যদি তাকে না জানিয়ে আমার এবং আমার সন্তানদের প্রয়োজন পূরণের জন্য তার সম্পদ থেকে কিছু নেই তাতে কি আমার কোনো গোনাহ হবে? তিনি বললেন, না, তবে ন্যায়সংগত সীমার মধ্যে থেকে। অর্থাৎ ঠিক এতটা অর্থ নাও যা প্রকৃত অর্থে বৈধ প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট। (আহকামূল কুরআন, ইবনে আরাবী)।
রাসূল-এর যুগের মুসলিম নারীগণ তাঁর কাছে যেসব বিষয়ে শপথ করেছিলেন, আয়াতে বর্ণিত সেসব বিষয়াবলি নিম্নরূপ-
১. আল্লাহর সাতে কাউকে শরীক না করা, নির্ভেজাল তাওহীদী জিন্দেগী যাপন করা。
২. 'চুরি না করা' আবু সুফিয়ানের স্ত্রী এ বিষয়েরই ব্যাখ্যা চেয়েছিলেন রাসূলে করীম -এর কাছে। নারীদের অনেকেই স্বামীর অর্থ-সম্পদ চুরি করতে অভ্যস্ত ছিল বিধায় বিষয়টি উল্লেখযোগ্য ছিল。
৩. যিনা বা ব্যভিচার না করা- নারীরা এ ব্যাপারে কঠোর ভূমিকা রাখতে পারলে পুরুষদের জন্য আত্মরক্ষা করাও সহজতর হতে পারে。
৪. নিজেদের সন্তানদের হত্যা না করা। জাহেলিয়াতের যুগে কন্যা সন্তানকে জীবন্ত প্রোথিত করার অমানবিক কাজের প্রচলন ছিল বিধায় মুসলিম নারীদের তা থেকে কঠোরভাবে বারণ করা হয়。
৫. মিথ্যা অপবাদ ও কলংক আরোপ থেকে বিরত থাকা। এ বুহতান বা অপবাদ সম্বলিত আয়াতে দু'ধরনের মিথ্যা দোষারোপ বুঝায়।
• কোনো নারীর অন্য কোনো নারীর প্রতি পরপুরুষের সাথে প্রেম-প্রণয় করার অপবাদ করা এবং এ ধরনের কল্পকাহিনী মানুষের মধ্যে ছড়ান। কারণ এসব কথা বলে বেড়ানোর একটা রোগ মহিলাদের মধ্যে দেখা যায়।
• কোনো নারীর অন্য পুরুষদের ঔরসজাত সন্তান প্রসব করে স্বামীকে বিশ্বাস করানো যে, সেটা তারই সন্তান- এটাও অপবাদের অন্তর্ভুক্ত। আবু দাউদে আবু হুরাইরা কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, তিনি নবীকে বলতে শুনেছেন যে, যে নারী কোনো পরিবারে এমন কোনো সন্তান প্রবেশ করায় যে সেই বংশের সন্তান নয় সেই নারীর আল্লাহর সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। আল্লাহ তাকে কখনো জান্নাতে প্রবেশ করাবেন না。
সংক্ষিপ্ত এই আয়াতাংশে আইনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সূক্ষ্ম বিষয় বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন- প্রথম বিষয়টি হলো, নবী-এর আনুগত্যের ব্যাপারেও "ভাল কাজে আনুগত্য করা" কথাটি যোগ করা হয়েছে। অথচ নবী সম্পর্কে এ বিষয়ে সামান্যতম সন্দেহেরও অবকাশ ছিল না যে, তিনি কখনো মুনকার বা মন্দ কাজের নির্দেশও দিতে পারেন। এভাবে আপনা থেকেই একথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আল্লাহর আইন ও নির্দেশের বাইরে গিয়ে পৃথিবীতে কোনো মানুষের আনুগত্য করা যেতে পারে না। কারণ আল্লাহর রাসূলের আনুগত্যের ব্যাপারেও যখন মারূফ বা ভাল কাজ হওয়ার শর্তযুক্ত করা হয়েছে তখন শর্তহীন আনুগত্য লাভের মর্যাদা অন্য কারো কীভাবে থাকতে পারে। কিংবা তার এমন কোনো নির্দেশ অথবা আইন অথবা নিয়ম-কানুন এবং আচার অনুষ্ঠানের আনুগত্য কীভাবে করা হবে যা আল্লাহর বিধানের পরিপন্থী? এই মৌলিক নীতিটাকে নবী এভাবে বর্ণনা করেছেন,
"আল্লাহর নাফরমানী করে কারো আনুগত্য করা যেতে পারে না। মারূফ বা সৎ কাজেই কেবল আনুগত্য করা যেতে পারে। (মুসলিম, আবু দাউদ নাসায়ী)।
বড় বড় জ্ঞানী-গুণী ও মনীষীগণ এ আয়াতের মূল প্রতিপাদ্য হিসেবে এই বিষয়টিকেই গ্রহণ করেছেন。
আবদুর রহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম বলেন, "আল্লাহ তা'আলা একথা বলেননি যে, তারা যেন আদৌ তোমার নাফরমানী না করে; বরং বলেছেন যে, মারূফ বা ভাল কাজে তারা যেন তোমার নাফরমানী না করে। আল্লাহ তা'আলা যখন নবীর আনুগত্যের ক্ষেত্রে পর্যন্ত এ শর্ত যুক্ত করেছেন তখন মারূফ ছাড়া অন্য কোন ব্যাপারে অন্যদের আনুগত্য করা যাবে তা কি করে হতে পারে। "(ইবনে জারীর)।
ইমাম আবু বকর জাসস্স লিখেছেন, আল্লাহ জানতেন, তাঁর নবী মারূফ ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে নির্দেশ দেন না। তা সত্ত্বেও তিনি তাঁর নবীর নাফরমানী করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিতে গিয়ে মারূফ বা ভাল কাজের শর্ত আরোপ করেছেন। যাতে আল্লাহর আনুগত্যমূলক নির্দেশ না হওয়া সত্ত্বেও কেউ কখনো কোনো রাজশক্তির আনুগত্যের অবকাশ খুঁজে বের করতে না পারে。
কিছু সংখ্যক নির্ভরযোগ্য হাদীস থেকে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ -এর যুগে মহিলাদের থেকে বাইয়াত গ্রহণের পদ্ধতি পুরুষদের থেকে বাইয়াত গ্রহণের পদ্ধতি থেকে ভিন্ন ছিল। পুরুষদের থেকে বাইয়াত গ্রহণের সিদ্ধান্ত ছিল এই যে, বাইয়াত গ্রহণকারী নবীর হাতে হাত দিয়ে প্রতিজ্ঞা করত। কিন্তু মহিলাদের থেকে বইয়াত গ্রহণের সময় তিনি কখনো তাঁর হাত দিয়ে কোনো মহিলার হাত ধরেননি; বরং ভিন্ন পদ্ধতিতে গ্রহণ করেছেন। এ বিষয়ে যেসব হাদীস উল্লেখিত হয়েছে তা নীচে বর্ণনা করছি-
আয়েশা বলেন, "আল্লাহর শপথ, বাইয়াত গ্রহণের সময় নবীর হাত কোনো মহিলার হাতকে স্পর্শ করেননি। মহিলাদের বাইয়াত গ্রহণের সময় তিনি মুখে শুধু একথাটুকু বলতেন যে, আমি তোমার থেকে বাইয়াত নিয়েছি। "(বুখারী, ইবনে জারীর)।
"উমাইমা বিনতে রুকাইকা বলেন, আমি আরো কয়েকজন মহিলার সাথে বাইয়াতের জন্য নবীর খেদমতে হাজির হলে তিনি কুরআনের এই আয়াতের নির্দেশ অনুসারে আমাদের থেকে প্রতিশ্রুতি নিলেন। যখন আমরা বললাম, মারূফ বা ভাল কাজে আমরা আপনার নাফরমানী করব না। "তখন তিনি বললেন, "যতটা তোমাদের পক্ষে সম্ভব হবে ও সাধ্যে কুলাবে। "আমরা বললাম, আমাদের জন্য আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল আমাদের নিজেদের চেয়েও বেশি দয়াপরবশ। "তারপর আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! হাত বাড়িয়ে দিন। আমরা আপনার হাতে বাইয়াত করব। তিনি বললেন, আমি মহিলাদের সাথে মোসাফাহা করি না। আচ্ছা, আমি তোমাদের থেকেও প্রতিশ্রুতি নিচ্ছি। সুতরাং তিনি আমাদের থেকে প্রতিশ্রুতি নিলেন। আর একটি হাদীসে তাঁর বর্ণনা হলো, নবী আমাদের মধ্যকার কোনো মহিলার সাথেই মোসাফাহা করলেন না। (মুসনাদে আহমাদ, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনে মাজা, ইবনে জারীর, ইবনে আবী হাতেম)।
আবু দাউদ তাঁর 'মারাসীল' গ্রন্থে শা'বী থেকে রেওয়ায়াত করেছেন যে, মহিলাদের বাইয়াত নেয়ার সময় নবীর দিকে একখানা কাপড় এগিয়ে দেয়া হলো। তিনি শুধু তা হাতে নিলেন এবং বললেন, আমি মহিলাদের সাথে মোসাফাহা করি না। ইবনে আবী হামেব, শা'বী থেকে, আবদুর রাযযাক নাখয়ী থেকে এবং সায়ীদ ইবনে মনসূর কায়েস ইবনে আবী হাযেম থেকে প্রায় একই বিষয়বস্তু বর্ণনা করেছেন。
ইবনে ইসহাক মাগাযীতে আবান ইবনে সালেহ থেকে উদ্ধৃত করেছেন যে, মহিলাদের বাইয়াত নেয়ার সময় নবী পানির একটি পাত্রে নিজের হাত ডুবাতেন এবং মহিলারাও সেই একই পাত্র হাত ডুবাতো。
বুখারীতে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, ঈদের খুতবা দেয়ার পর নবী পুরুষদের কাতারের মধ্যে দিয়ে মহিলারা যেখানে বসে ছিল সেখানে গিয়ে হাজির হলেন। সেখানে বক্তৃতা করার সময় তিনি কুরআন মজীদের এ আয়াতটি পড়লেন। তারপর মহিলাদেরকে প্রশ্ন করলেন, তোমরা কি এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছো? সমাবেশের মধ্যে থেকে এক মহিলা জবাব দিল হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি。
ইবনে হিব্বان, ইবনে জারীর এবং বাযযার প্রমুখের একটি রেওয়ায়াতের উম্মে আতিয়া আনসারিয়ার একটি বর্ণনা পাওয়া যায় যাতে বলা হয়েছে, নবী ঘরের বাইরে থেকে হাত বাড়িয়ে দিলেন এবং আমরা ভেতর থেকে হাত বাড়িয়ে দিলাম। কিন্তু এ বক্তব্য থেকে একথা বুঝা যায় না যে, মহিলারা তাঁর সাথে মোসাফাহাও করেছিল। কেননা, উম্মে আতিয়া মোসাফাহা করার কথা স্পষ্ট করে বলেননি। সম্ভবত সে সময় অবস্থা ছিল এই প্রতিশ্রুতি গ্রহণের সময় নবী বাইরে থেকে তাঁর হাত বাড়িয়ে দিয়ে থাকবেন এবং ভেতর থেকে মহিলারাও প্রত্যেকে তাদের হাত বাড়িয়ে দিয়ে থাকবে। কিন্তু তাদের কারো হাতই রাসূলুল্লাহ-এর হাত স্পর্শ করেনি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00