📘 আল কুরআনে নারীদের ২৫ সূরা > 📄 নাযিল হওয়ার সময়

📄 নাযিল হওয়ার সময়


মদীনার খাজরায গোত্রের খাওলা বিনতে সালাবা নামক এক আনসার মহিলা সাহাবী তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে 'যিহার' করার অভিযোগ নিয়ে রাসূল -এর সাথে তর্ক করছিলেন। ঐ 'যিহার' নামক কুপথা সম্পর্কে এ সূরার শুরুতে আলোচনা করা হয়েছে। এ ঘটনাটি থেকে এ সূরা নাযিল হওয়ার সময় ঠিকভাবে জানা যায়।
এ সূরাটি যে খন্দক যুদ্ধের পর নাযিল হয় সে কথাও 'যিহার' সম্পর্কে দেওয়া বিধান থেকে বোঝা যায়। খন্দকের যুদ্ধের সময় সূরা আহযাব নাযিল হয়। তাতে এটুকু মন্তব্য করা হয়েছিল যে, যিহার দ্বারা স্ত্রী মা হয়ে যায় না। যিহার সম্পর্কে আল্লাহর কী হুকুম তা এ সূরায় নেই। এ সূরায় সে হুকুম দেওয়া হয়েছে। তাই নিশ্চিতভাবে জানা গেল, খন্দক যুদ্ধের পর এ সূরাটি নাযিল হয়েছে। হিজরী পাঁচ সনের শাওয়ালে ঐ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে।

📘 আল কুরআনে নারীদের ২৫ সূরা > 📄 বিষয়বস্তু ও মূল বক্তব্য

📄 বিষয়বস্তু ও মূল বক্তব্য


সেসময় মুসলমানগণ যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন এ সূরায় সেসব সমস্যা সম্পর্কে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সূরার শুরু থেকে ৬ নং আয়াত পর্যন্ত যিহারের শরয়ী হুকুম আহকাম বর্ণনা করা হয়েছে। সে সাথে مسلمانوں কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে যে, ইসলাম গ্রহণ করার পর জাহেলী রীতিনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকা এবং আল্লাহর নির্ধারিত সীমাসমূহ লংঘন করা অথবা তা মেনে চলতে অস্বীকার করা অথবা তার পরিবর্তে নিজের ইচ্ছা মাফিক অন্য নিয়ম নীতি ও আইন কানুন তৈরি করে নেয়া ঈমানের চরম পরিপন্থী কাজ ও আচরণ। এর শাস্তি হচ্ছে পার্থিব জীবনের লাঞ্ছনা। এ ব্যাপারে আখেরাতেও কঠোর জবাবদিহি করতে হবে।
৭ থেকে ১০ আয়াতে মুনাফিকদের আচরণের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। তারা পরস্পর গোপন সলা পরামর্শ করে নানারূপ ক্ষতি সাধনের পরিকল্পনা করতো। তাদের মনে যে গোপন হিংসা বিদ্বেষ ছিল তার কারণে তারা রাসূলুল্লাহ-কে ইহুদীদের মত এমন কায়দায় সালাম দিতো যা দ্বারা দোয়ার পরিবর্তে বদ দোয়া প্রকাশ পেতো। এ ক্ষেত্রে মুসলমানদেরকে এই বলে সান্তনা দেয়া হয়েছে যে, মুনাফিকদের ঐ সলা পরামর্শ তোমাদের কোনো ক্ষতিই করতে পারবে না। সুতরাং তোমরা আল্লাহর ওপর ভরসা করে নিজেদের কাজ করতে থাক। সাথে সাথে তাদেরকে এই নৈতিক শিক্ষাও দেয়া হয়েছে যে, গোনাহ জুলুম বাড়াবাড়ি এবং নাফরমানীর কাজে সলা পরামর্শ করা ঈমানদারদের কাজ নয়। তারা গোপনে বসে কোনো কিছু করলে তা নেকী ও পরহেজগারীর কাজ হওয়া উচিত।
১১ থেকে ১৩ আয়াতে মুসলমানদের কিছু মজলিসী সভ্যতা ও বৈঠকী আদব-কায়দা শেখানো হয়েছে। তাছাড়া এমন কিছু সামাজিক দোষ-ত্রুটি দূর করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে যা মানুষের মধ্যে আগেও ছিল এবং এখনো আছে। কোনো মজলিসে যদি বহু সংখ্যক লোক বসে থাকে এমতাবস্থায় যদি বাইরে থেকে কিছুলোক আসে তাহলে মজলিসে পূর্ব থেকে বসে থাকা ব্যক্তিগণ নিজেরা কিছুটা গুটিয়ে বসে তাদের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়ার কষ্টটুকু স্বীকার করতেও রাজী হয় না। ফলে পরে আগমনকারীগণ দাঁড়িয়ে থাকেন, অথবা দহলিজে বসতে বাধ্য হয় অথবা ফিরে চলে যায় অথবা মজলিসে এখনো যথেষ্ট স্থান আছে দেখে উপস্থিত লোকজনকে ডিঙ্গিয়ে ভিতরে চলে আসেন। নবী -এর মজলিসে প্রায়ই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো। তাই আল্লাহ তা'আলা সবাইকে হাদিয়াত বা নির্দেশনা দিয়েছেন যে, মজলিসে আত্মস্বার্থ এবং সংকীর্ণ মনের পরিচয় দিও না; বরং খোলা মনে পরবর্তী আগমনকারীদের জন্য স্থান করে দাও।
অনুরূপ আরো একটি ত্রুটি মানুষের মধ্যে দেখা যায়। কেউ কারো কাছে গেলে বিশেষ করে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কাছে গেলে জেঁকে বসে থাকে এবং এদিকে মোটেই লক্ষ্য করে না যে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় নেয়া তার কষ্টের কারণ হবে। তিনি যদি বলেন, জনাব এখন যান তাহলে সে খারাপ মনে করবে। তাকে ছেড়ে উঠে গেলে অভদ্র আচরণের অভিযোগ করবে। ইশারা ইংগিতে যদি বুঝাতে চান যে, অন্য কিছু জরুরি কাজের জন্য তার এখন কিছু সময় পাওয়া দরকার তাহলে শুনেও শুনবে না। নবী নিজেও মানুষের এ আচরণের সম্মুখীন হতেন আর তাঁর সাহচর্য থেকে উপকৃত হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় আল্লাহর বান্দারা মোটেই খেয়াল করতেন না যে, তারা অতি মূল্যবান কাজের সময় নষ্ট করেছেন। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা এ কষ্টদায়ক বদঅভ্যাস পরিত্যাগ করার জন্য নির্দেশ দিলেন যে, যখন বৈঠক শেষ করার জন্য উঠে যাওয়ার কথা বলা হবে তখন উঠে চলে যাবে।
মানুষের মধ্যে আরো একটি বদঅভ্যাস ছিল। তা হচ্ছে, কেউ হয়তো নবীর সাথে অযথা নির্জনে কথা বলতে চাইতো অথবা বড় মজলিসে তাঁর নিকটে গিয়ে গোপনীয় কথা বলার ঢংয়ে কথা বলতে চাইতো। এটি নবীর জন্য যেমন কষ্টদায়ক ছিল। তাই যে ব্যক্তিই নির্জনে একাকী তাঁর কথা বলতে চায়, আল্লাহ তা'আলা তার জন্য কথা বলার আগে সাদকা দেয়া বাধ্যতামূলক করে দিলেন। লোকজনকে তাদের এ বদঅভ্যাস সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়াই ছিল এর উদ্দেশ্য। যাতে তারা এ বদঅভ্যাস পরিত্যাগ করে।
সুতরাং এ বাধ্যবাধকতা মাত্র অল্প দিন কার্যকর রাখা হয়েছিল। মানুষ তাদের কার্যধারা ও অভ্যাস সংশোধন করে নিলে এ নির্দেশ বাতিল করে দেয়া হলো।
মুসলিম সমাজের মানুষের মধ্যে নিঃস্বার্থ ঈমানদার, মুনাফিক এবং দোদুল্যমান তথা সিদ্ধান্তহীনতার রোগে আক্রান্ত মানুষ সবাই মিলে মিশে একাকার হয়েছিল। তাই কারো সত্যিকার ও নিঃস্বার্থ ঈমানদার হওয়ার মানদণ্ড কী তা ১৪ আয়াত থেকে সূরার শেষ পর্যন্ত তা স্পষ্টভাষায় বলে দেয়া হয়েছে। এক শ্রেণির মুসলমান ইসলামের শত্রুদের সাথে বন্ধুত্ব রাখে, সে যে দীনের ওপর ঈমান আনার দাবী করে নিজের স্বার্থের খাতিরে তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতেও দ্বিধাবোধ করে না এবং ইসলামের বিরুদ্ধে নানারকম সন্দেহ-সংশয় এবং দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছড়িয়ে আল্লাহর পথে আসতে বাধা দেয়। তবে যেহেতু তারা مسلمانوں দলে অর্ন্তভুক্ত তাই ঈমান গ্রহণের মিথ্যা স্বীকৃতি তাদের জন্য ঢালের কাজ করে। আরেক শ্রেণির মুসলমান তাদের দীনের ব্যাপারে অন্য কারো পরোয়া করা তো দূরের কথা নিজের বাপ, ভাই, সন্তান-সন্তুতি এবং গোষ্ঠীকে পর্যন্ত পরোয়া করে না। তাদের অবস্থা হলো, যে আল্লাহ, রাসূল এবং তার দীনের শত্রু তার জন্য তার মনে কোনো ভালবাসা নেই। এ আয়াতসমূহে আল্লাহ তা'আলা স্পষ্ট বলে দিয়েছেন প্রথম শ্রেণির এই মুসলমানরা যতই শপথ করে তাদের মুসলমান হওয়ার নিশ্চয়তা দিক না কেন প্রকৃতপক্ষে তারা শয়তানের দলের লোক। সুতরাং শুধু দ্বিতীয় প্রকার মুসলমানগণই আল্লাহর দলে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মর্যাদা লাভ করেছে। তারাই খাঁটি মুসলমান। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই লাভ করবে সফলতা।

📘 আল কুরআনে নারীদের ২৫ সূরা > 📄 যে নারীর অভিযোগ আল্লাহর কাছে পৌঁছেছে এবং গৃহীত হয়েছে

📄 যে নারীর অভিযোগ আল্লাহর কাছে পৌঁছেছে এবং গৃহীত হয়েছে


قَدْ سَمِعَ اللهُ قَوْلَ الَّتِي تُجَادِلُكَ فِي زَوْجِهَا وَتَشْتَكِي إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ يَسْمَعُ تَحَاوُرَ كُمَا إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ.
অর্থ: আল্লাহ অবশ্যই ঐ স্ত্রী লোকটির কথা শুনেছেন, যে তার স্বামীর ব্যাপারে আপনার সাথে বিতর্ক করছিল, আর আল্লাহর দরবারেও অভিযোগ করছিল। আর আল্লাহ আপনাদের উভয়ের কথা-বার্তা শুনেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। (আল মুজাদালাহ: আয়াত-১)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: যে মহিলার ব্যাপার সম্পর্কে এ আয়াত ও তৎপরবর্তী ক'টি আয়াত নাযিল হয়েছিল তিনি ছিলেন খাজরাজ গোত্রের খাওলাহ বিনতে সা'লাবা। তাঁর স্বামীর নাম ছিল আওস ইবনে সামেত আনসারী। মহিলার স্বামী 'যিহার' করেছিলেন। 'জিহার' শব্দ 'জাহরুন' শব্দ থেকে নির্গত। অর্থ পিঠ। তৎকালীন আরব সমাজে প্রায় এমন ঘটতো যে স্বামী-স্ত্রী ঝগড়া-বিবাদ হলে স্বামী রাগান্বিত হয়ে স্ত্রীকে বলতো, اَنْتِ عَلَى كَظَهْرِ أُمِّي তুমি আমার জন্য আমার মায়ের পিঠের তুল্য। একথার তাৎপর্য হলো, তোমার সাথে সহবাস করা আমার জন্য নিজের মায়ের সাথে সহবাস করার সমান। অর্থাৎ তুমি আমার জন্য হারাম।
অনুবাদকগণ সাধারণভাবে এ স্থানে অনুবাদ করেছেন, মহিলা ঝগড়া করছিল, অভিযোগ করছিল। আর এ অনুবাদ পড়ে পাঠক এ অর্থ গ্রহণ করে যে, মহিলাটি তার অভিযোগ পেশ করে হয়তো চলে গিয়েছিল এবং পরে কোনো এক সময় রাসূলুল্লাহ -এর ওপর অহী নাযিল হয়েছিল। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, আমি সে মহিলার কথা শুনেছি, যে তোমার কাছে অনুনয় বিনয় ও ফরিয়াদ করছিল। সে সময় আমি তোমাদের উভয়ের কথাবার্তা শুনছিলাম। কিন্তু এ ঘটনা সম্পর্কে হাদীসসমূহে যেসব বর্ণনা আছে তার অধিকাংশ বর্ণনাতেই বলা হয়েছে, যে সময় সেই মহিলা তার স্বামীর "যিহারের" ঘটনা শুনিয়ে নবীর কাছে বারবার এ বলে আবেদন করছিল যে তাদের মধ্যে যদি বিচ্ছেদ হয়ে যায় তাহলে সে বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়বে এবং তার সন্তান-সন্ততি ধ্বংস হয়ে যাবে। ঠিক এ সময়েই রাসূলুল্লাহ -এর ওপর অহী নাযিল হওয়ার লক্ষণ পরিস্ফুট হয়ে উঠলো এবং এ আয়াতগুলো নাযিল হলো।
আল্লাহর দরবারে এ সাহাবিয়ার অভিযোগে গৃহীত হওয়া এবং আল্লাহর তরফ থেকে সাথে সাথে তাঁর অভিযোগের প্রতিকার করে নির্দেশ নাযিল হওয়া ছিল এমন একটি ঘটনা যার কারণে সাহাবী কিরামের মধ্যে তিনি বিশেষ একটি সম্মান ও মর্যাদার স্থান লাভ করেছিলেন। ইবনে আবী হাতেম ও বায়হাকী একটি হাদীসে বর্ণনা করেছেন যে, একবার 'উমর কিছুসংখ্যক সংগী-সাথীর সাথে কোথাও যাচ্ছিলেন। পথে এক মহিলার সাথে দেখা হলে সে তাঁকে থামতে বললে তিনি সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেলেন। মাথা নিচু করে দীর্ঘ সময় তার কথা শুনলেন এবং সে নিজে কথা শেষ না করা পর্যন্ত তিনি দাঁড়িয়ে থাকলেন। সংগীদের মধ্যে একজন জিজ্ঞেস করলো, হে আমীরুল মু'মিনীন! এ বুড়ীর জন্য আপনি কুরাইশ নেতৃবৃন্দকে এত সময় থামিয়ে রেখেছেন কেন? তিনি বললেন, সে কে তা কি জান? এ যে, খাওলা বিনতে সা'লাবা। এ তো সে মহিলা, সাত আসমানের ওপরে যার অভিযোগ গৃহীত হয়েছে। আল্লাহর কসম, তিনি যদি আমাকে সারা রাত দাঁড় করিয়ে রাখতেন তাহলে আমি সারা রাতই দাঁড়িয়ে থাকতাম। শুধু নামাযের সময় ওযর পেশ করতাম। ইবনে আব্দুল বার তাঁর 'ইসতিয়াব' গ্রন্থে কাতাদার একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন যে, রাস্তায় উমরের সাথে এ মহিলার সাক্ষাত হলে তিনি তাকে সালাম দিলেন। সালামের জবাব দেয়ার পর তিনি বলতে থাকলেন, "ওহ্ উমর এমন এক সময় ছিল যখন আমি তোমাকে "উকাযের" বাজারে দেখেছিলাম। তখন তোমাকে উমায়ের বলে ডাকা হতো। তখন তুমি লাঠি হাতে নিয়ে বকরী চরিয়ে বেড়াতে। এর অল্প দিন পর তোমাকে "উমর' নামে ডাকা হতে থাকলো। অতঃপর এমন এক সময় আসলো যখন তোমাকে 'আমীরুল মু'মিনীন' বলে সম্বোধন করা শুরু হলো। প্রজাদের ব্যপারে অন্তত কিছুটা আল্লাহকে ভয় করো। মনে রেখো, যে আল্লাহর আযাব সম্পর্কিত সাবধানবাণীকে ভয় পায় দূরের মানুষও তাঁর নিকটাত্মীয়ের মত হয়ে যায়। আর যে মৃত্যুকে ভয় পায় তার ব্যাপারে আশঙ্কা হয় যে, সে এমন জিনিসও হারিয়ে ফেলবে যা সে রক্ষা করতে চায়"। উমরের সাথে ছিলেন জারুদ আবদী। একথা শুনে তিনি বললেন, হে নারী! তুমি আমীরুল মু'মিনের সাথে অনেক বে-আদবী করেছো। 'উমর বললেন, তাকে বলতে দাও। তুমি কি জান সে কে? তাঁর কথা তো সাত আসমানের ওপরে গৃহীত হয়েছিল। 'উমরকে তো তাঁর কথা শুনতেই হবে। 'ইমাম বুখারীও তাঁর লিখিত ইতিহাস (আল বিদায়া ওয়ান্নিহায়া গ্রন্থে সংক্ষেপে এ ঘটনার প্রায় অনুরূপ উদ্ধৃত করেছেন।

📘 আল কুরআনে নারীদের ২৫ সূরা > 📄 স্ত্রীকে মায়ের মত বললে স্ত্রী মা হয়ে যায় না

📄 স্ত্রীকে মায়ের মত বললে স্ত্রী মা হয়ে যায় না


الَّذِينَ يُظْهِرُوْنَ مِنْكُمْ مِنْ نِسَائِهِمْ مَّا هُنَّ أُمَّهْتِهِمْ إِنْ أُمَّهُتُهُمْ إِلَّا الَّتِي وَلَدْنَهُمْ وَإِنَّهُمْ لَيَقُولُونَ مُنْكَرًا مِّنَ الْقَوْلِ وَزُورًا وَإِنَّ اللَّهَ لَعَفُوٌّ غَفُورٌ.
অর্থ: তোমাদের মধ্যে যারা স্বীয় স্ত্রীদের সাথে যিহার করে (তারা জেনে রাখুক), তাদের স্ত্রীগণ তাদের মাতা নয়। তাদের মাতা তো কেবল তারাই যারা তাদেরকে জন্মদান করেছেন। তারা তো একটি অসঙ্গত ও মিথ্যা কথাই বলছে। আর আল্লাহ তো অতীব গুনাহ মোচনকারী, পরম ক্ষমাশীল। (সূরা আল মুজাদালাহ: আয়াত-২)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: আরবে অনেক সময় এমন ঘটনা ঘটতো যে, স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া বিবাদ হলে স্বামী রাগান্বিত হয়ে বলতো أَنْتَ عَلَى كَظَهْرِ أُمِّي এর আভিধানিক অর্থ হলো, "তুমি আমার জন্য ঠিক আমার মায়ের পিঠের মত" কিন্তু এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে, আমার তোমার সাথে সহবাস ঠিক আমার মায়ের সাথে সহবাস করার মত। এযুগেও বহু নির্বোধ মানুষ স্ত্রীর সাথে ঝগড়া বিবাদ করে তাদের মা, বোন ও মেয়ের মত বলে ফেলে। এর স্পষ্ট অর্থ দাঁড়ায় স্বামী এখন আর তাকে স্ত্রী মনে করে না; বরং যেসব স্ত্রীলোক তার জন্য হারাম তাদের মত মনে করে। এরূপ করাকেই "যিহার" বলা হয়। যিহার আরবী ভাষায় রূপক অর্থে বাহনকে বলা হয়। উদাহরণ স্বরূপ সওয়ারী জন্তুকে যিহার বলা হয়। কেননা, মানুষ তার পিঠে আরোহণ করে। মানুষ যেহেতু স্ত্রীকে নিজের জন্য হারাম করে নেয়ার উদ্দেশ্যে বলতো যে, যিহার বানানো আমার জন্য আমার মাকে যিহার বানানোর মতই হারাম। সুতরাং তাদের মুখ থেকে এসব কথা উচ্চারণ করাকেই তাদের ভাষায় "যিহার" বলা হতো। জাহেলী যুগে আরবদের কাছে এটা তালাক বা তার চেয়ে অত্যন্ত কঠোর প্রকৃতির সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা বলে মনে করা হতো। কারণ, তাদের দৃষ্টিতে এর অর্থ ছিল এই যে, স্বামী তার স্ত্রীর সাথে দাম্পত্য সম্পর্কই ছিন্ন করছে না; বরং তাকে নিজের মায়ের মত হারাম করে নিচ্ছে। এ কারণে আরবদের মতে তালাক দেয়ার পর তা প্রত্যাহার করা যেতো। কিন্তু "যিহার" প্রত্যাহার করার কোনো সম্ভাবনাই অবশিষ্ট থাকতো না।
এটা যিহার সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা প্রথম ফায়সালা। এর অর্থ হলো, কেউ যদি মুখ ফুটে স্ত্রীকে মায়ের মত বলে বসে তাহলে তার বলার কারণ, স্ত্রী তার মা হতে পারে না। কোনো মহিলার কারো মা হওয়া একটা সত্য ও বাস্তব প্রমাণ ব্যপার। কারণ, সে তাকে প্রসব করেছে। এ কারণে সে স্থায়ীভাবে হারাম হওয়ার মর্যাদা লাভ করেছে। কিন্তু যে নারী তাকে প্রসব করেনি, শুধু মৌখিক কথাতেই সে কীভাবে তার মা হয়ে যাবে? বুদ্ধি-বিবেক, নৈতিকতা এবং আইন-কানুন যে কোনো বিচারেই হোক সে কীভাবে প্রকৃত প্রসবকারিণী মায়ের মত হারাম হবে? আল্লাহ তা'আলা এভাবে এ কথাটি ঘোষণা করে সেসব জাহেলী আইন-কানুনকে বাতিল করে দিয়েছেন যার ভিত্তিতে যিহারকারী স্বামীর সাথে তার স্ত্রীর সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যেতো এবং স্ত্রীকে স্বামীর জন্য মায়ের মত অলংঘনীয় হারাম মনে করা হতো।
স্ত্রীকে মায়ের সাথে তুলন করা প্রথমত এমন একটি অর্থহীন ও লজ্জাজনক কথা যা মুখে উচ্চারণ করা তো দূরের কথা কোনো পবিত্র মানুষের যার কল্পনাও করা উচিত নয়। দ্বিতীয়ত, এটি একটি মিথ্যা কথাও বটে। কারণ, যে এরূপ কথা বলছে সে যদি এর দ্বারা বুঝিয়ে থাকে যে, তার স্ত্রী এখন তার মা হয়ে গিয়েছে তাহলে সে মিথ্যা বলছে। আর সে যদি এ কথাটি তার সিদ্ধান্ত হিসেবে শুনিয়ে থাকে যে, আজ থেকে সে তার স্ত্রীকে মায়ের মর্যাদা দান করেছে তাহলেও তার এ দাবী মিথ্যা। কারণ, আল্লাহ তাকে অধিকার দেননি যে, যতদিন ইচ্ছা সে একজন নারীকে স্ত্রী হিসেবে রাখবে এবং যখন ইচ্ছা তাকে মায়ের মর্যাদা দান করবে। সে নিজে আইন রচয়িতা নয়; বরং আইন রচয়িতা হলেন আল্লাহ। আল্লাহ তা'আলা প্রসবকারিণী মায়ের সাথে দাদী, নানী, শাশুড়ি, দুধ মা এবং নবী -এর স্ত্রীগণকেও মাতৃত্বের মর্যাদা দান করেছেন। নিজের স্ত্রীকে তো দূরের কথা নিজের পক্ষ থেকে অন্য কোনো নারীকেও এ মর্যাদায় অন্তর্ভুক্ত করার অধিকার কারোরই নেই। একথা থেকে আরো একটি আইনগত বিধান যা পাওয়া যায় তাহলো, 'যিহার' করা একটি গুরুতর গোনাহ এবং হারাম কাজ। যে এ কাজ করবে সে শাস্তির উপযুক্ত।
এটি এমন একটি কাজ যে জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কঠিন শাস্তি পাওয়া উচিত। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার মেহেরবাণী যে, তিনি প্রথমত যিহারের ব্যাপারে জাহেলী আইন-কানুন বাতিল করে তোমাদের পারিবারিক জীবনকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। দ্বিতীয়ত এ অপরাধে অপরাধী ব্যক্তির জন্য সর্বাধিক লঘু শাস্তির ব্যবস্থা করেছেন। তার সবচেয়ে বড় মেহেরবানী এই যে, জেল খাটা বা মারপিট আকারে এ অপরাধের শাস্তি বিধান করেননি; বরং এমন কিছু ইবাদত ও নেকীর কাজকে এ অপরাধের শাস্তি নির্ধারিত করেছেন যা তোমাদের প্রবৃত্তির সংশোধন করে এবং সমাজে কল্যাণ ও সুকৃতির বিস্তার ঘটে। এ ক্ষেত্রে এ বিষয়টিও বুঝা উচিত যে, কোন কোন অপরাধ এ গোনাহর জন্য যেসব ইবাদতকে কাফ্ফারা নির্ধারণ করা হয়েছে তা ইবাদতের চেতনাবিহীন নিরেট শাস্তি নয়। আবার নিছক এমন ইবাদতও নয় যে, তার মধ্যে শাস্তির কষ্টকর কোনো দিক আদৌ নেই। এর মধ্যে ইবাদাত ও শাস্তি উভয়টিই একত্রিত করা হয়েছে, যাতে ব্যক্তি যুগপত কষ্টও ভোগ করে এবং সাথে সাথে একটি ইবাদাত ও নেকীর কাজ করে তার কৃত গোনাহরও প্রতিকার করে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00