📄 নামকরণ
সূরার প্রথম আয়াতের 'তুজাদিলু' শব্দ থেকে নামটি চয়ন করা হয়েছে। 'মুজাদালাহ' অর্থ বাদানুবাদ, তর্ক-বিতর্ক, ঝগড়া-বিবাদ।
📄 নাযিল হওয়ার সময়
মদীনার খাজরায গোত্রের খাওলা বিনতে সালাবা নামক এক আনসার মহিলা সাহাবী তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে 'যিহার' করার অভিযোগ নিয়ে রাসূল -এর সাথে তর্ক করছিলেন। ঐ 'যিহার' নামক কুপথা সম্পর্কে এ সূরার শুরুতে আলোচনা করা হয়েছে। এ ঘটনাটি থেকে এ সূরা নাযিল হওয়ার সময় ঠিকভাবে জানা যায়।
এ সূরাটি যে খন্দক যুদ্ধের পর নাযিল হয় সে কথাও 'যিহার' সম্পর্কে দেওয়া বিধান থেকে বোঝা যায়। খন্দকের যুদ্ধের সময় সূরা আহযাব নাযিল হয়। তাতে এটুকু মন্তব্য করা হয়েছিল যে, যিহার দ্বারা স্ত্রী মা হয়ে যায় না। যিহার সম্পর্কে আল্লাহর কী হুকুম তা এ সূরায় নেই। এ সূরায় সে হুকুম দেওয়া হয়েছে। তাই নিশ্চিতভাবে জানা গেল, খন্দক যুদ্ধের পর এ সূরাটি নাযিল হয়েছে। হিজরী পাঁচ সনের শাওয়ালে ঐ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে।
📄 বিষয়বস্তু ও মূল বক্তব্য
সেসময় মুসলমানগণ যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন এ সূরায় সেসব সমস্যা সম্পর্কে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সূরার শুরু থেকে ৬ নং আয়াত পর্যন্ত যিহারের শরয়ী হুকুম আহকাম বর্ণনা করা হয়েছে। সে সাথে مسلمانوں কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে যে, ইসলাম গ্রহণ করার পর জাহেলী রীতিনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকা এবং আল্লাহর নির্ধারিত সীমাসমূহ লংঘন করা অথবা তা মেনে চলতে অস্বীকার করা অথবা তার পরিবর্তে নিজের ইচ্ছা মাফিক অন্য নিয়ম নীতি ও আইন কানুন তৈরি করে নেয়া ঈমানের চরম পরিপন্থী কাজ ও আচরণ। এর শাস্তি হচ্ছে পার্থিব জীবনের লাঞ্ছনা। এ ব্যাপারে আখেরাতেও কঠোর জবাবদিহি করতে হবে।
৭ থেকে ১০ আয়াতে মুনাফিকদের আচরণের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। তারা পরস্পর গোপন সলা পরামর্শ করে নানারূপ ক্ষতি সাধনের পরিকল্পনা করতো। তাদের মনে যে গোপন হিংসা বিদ্বেষ ছিল তার কারণে তারা রাসূলুল্লাহ-কে ইহুদীদের মত এমন কায়দায় সালাম দিতো যা দ্বারা দোয়ার পরিবর্তে বদ দোয়া প্রকাশ পেতো। এ ক্ষেত্রে মুসলমানদেরকে এই বলে সান্তনা দেয়া হয়েছে যে, মুনাফিকদের ঐ সলা পরামর্শ তোমাদের কোনো ক্ষতিই করতে পারবে না। সুতরাং তোমরা আল্লাহর ওপর ভরসা করে নিজেদের কাজ করতে থাক। সাথে সাথে তাদেরকে এই নৈতিক শিক্ষাও দেয়া হয়েছে যে, গোনাহ জুলুম বাড়াবাড়ি এবং নাফরমানীর কাজে সলা পরামর্শ করা ঈমানদারদের কাজ নয়। তারা গোপনে বসে কোনো কিছু করলে তা নেকী ও পরহেজগারীর কাজ হওয়া উচিত।
১১ থেকে ১৩ আয়াতে মুসলমানদের কিছু মজলিসী সভ্যতা ও বৈঠকী আদব-কায়দা শেখানো হয়েছে। তাছাড়া এমন কিছু সামাজিক দোষ-ত্রুটি দূর করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে যা মানুষের মধ্যে আগেও ছিল এবং এখনো আছে। কোনো মজলিসে যদি বহু সংখ্যক লোক বসে থাকে এমতাবস্থায় যদি বাইরে থেকে কিছুলোক আসে তাহলে মজলিসে পূর্ব থেকে বসে থাকা ব্যক্তিগণ নিজেরা কিছুটা গুটিয়ে বসে তাদের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়ার কষ্টটুকু স্বীকার করতেও রাজী হয় না। ফলে পরে আগমনকারীগণ দাঁড়িয়ে থাকেন, অথবা দহলিজে বসতে বাধ্য হয় অথবা ফিরে চলে যায় অথবা মজলিসে এখনো যথেষ্ট স্থান আছে দেখে উপস্থিত লোকজনকে ডিঙ্গিয়ে ভিতরে চলে আসেন। নবী -এর মজলিসে প্রায়ই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো। তাই আল্লাহ তা'আলা সবাইকে হাদিয়াত বা নির্দেশনা দিয়েছেন যে, মজলিসে আত্মস্বার্থ এবং সংকীর্ণ মনের পরিচয় দিও না; বরং খোলা মনে পরবর্তী আগমনকারীদের জন্য স্থান করে দাও।
অনুরূপ আরো একটি ত্রুটি মানুষের মধ্যে দেখা যায়। কেউ কারো কাছে গেলে বিশেষ করে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কাছে গেলে জেঁকে বসে থাকে এবং এদিকে মোটেই লক্ষ্য করে না যে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় নেয়া তার কষ্টের কারণ হবে। তিনি যদি বলেন, জনাব এখন যান তাহলে সে খারাপ মনে করবে। তাকে ছেড়ে উঠে গেলে অভদ্র আচরণের অভিযোগ করবে। ইশারা ইংগিতে যদি বুঝাতে চান যে, অন্য কিছু জরুরি কাজের জন্য তার এখন কিছু সময় পাওয়া দরকার তাহলে শুনেও শুনবে না। নবী নিজেও মানুষের এ আচরণের সম্মুখীন হতেন আর তাঁর সাহচর্য থেকে উপকৃত হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় আল্লাহর বান্দারা মোটেই খেয়াল করতেন না যে, তারা অতি মূল্যবান কাজের সময় নষ্ট করেছেন। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা এ কষ্টদায়ক বদঅভ্যাস পরিত্যাগ করার জন্য নির্দেশ দিলেন যে, যখন বৈঠক শেষ করার জন্য উঠে যাওয়ার কথা বলা হবে তখন উঠে চলে যাবে।
মানুষের মধ্যে আরো একটি বদঅভ্যাস ছিল। তা হচ্ছে, কেউ হয়তো নবীর সাথে অযথা নির্জনে কথা বলতে চাইতো অথবা বড় মজলিসে তাঁর নিকটে গিয়ে গোপনীয় কথা বলার ঢংয়ে কথা বলতে চাইতো। এটি নবীর জন্য যেমন কষ্টদায়ক ছিল। তাই যে ব্যক্তিই নির্জনে একাকী তাঁর কথা বলতে চায়, আল্লাহ তা'আলা তার জন্য কথা বলার আগে সাদকা দেয়া বাধ্যতামূলক করে দিলেন। লোকজনকে তাদের এ বদঅভ্যাস সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়াই ছিল এর উদ্দেশ্য। যাতে তারা এ বদঅভ্যাস পরিত্যাগ করে।
সুতরাং এ বাধ্যবাধকতা মাত্র অল্প দিন কার্যকর রাখা হয়েছিল। মানুষ তাদের কার্যধারা ও অভ্যাস সংশোধন করে নিলে এ নির্দেশ বাতিল করে দেয়া হলো।
মুসলিম সমাজের মানুষের মধ্যে নিঃস্বার্থ ঈমানদার, মুনাফিক এবং দোদুল্যমান তথা সিদ্ধান্তহীনতার রোগে আক্রান্ত মানুষ সবাই মিলে মিশে একাকার হয়েছিল। তাই কারো সত্যিকার ও নিঃস্বার্থ ঈমানদার হওয়ার মানদণ্ড কী তা ১৪ আয়াত থেকে সূরার শেষ পর্যন্ত তা স্পষ্টভাষায় বলে দেয়া হয়েছে। এক শ্রেণির মুসলমান ইসলামের শত্রুদের সাথে বন্ধুত্ব রাখে, সে যে দীনের ওপর ঈমান আনার দাবী করে নিজের স্বার্থের খাতিরে তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতেও দ্বিধাবোধ করে না এবং ইসলামের বিরুদ্ধে নানারকম সন্দেহ-সংশয় এবং দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছড়িয়ে আল্লাহর পথে আসতে বাধা দেয়। তবে যেহেতু তারা مسلمانوں দলে অর্ন্তভুক্ত তাই ঈমান গ্রহণের মিথ্যা স্বীকৃতি তাদের জন্য ঢালের কাজ করে। আরেক শ্রেণির মুসলমান তাদের দীনের ব্যাপারে অন্য কারো পরোয়া করা তো দূরের কথা নিজের বাপ, ভাই, সন্তান-সন্তুতি এবং গোষ্ঠীকে পর্যন্ত পরোয়া করে না। তাদের অবস্থা হলো, যে আল্লাহ, রাসূল এবং তার দীনের শত্রু তার জন্য তার মনে কোনো ভালবাসা নেই। এ আয়াতসমূহে আল্লাহ তা'আলা স্পষ্ট বলে দিয়েছেন প্রথম শ্রেণির এই মুসলমানরা যতই শপথ করে তাদের মুসলমান হওয়ার নিশ্চয়তা দিক না কেন প্রকৃতপক্ষে তারা শয়তানের দলের লোক। সুতরাং শুধু দ্বিতীয় প্রকার মুসলমানগণই আল্লাহর দলে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মর্যাদা লাভ করেছে। তারাই খাঁটি মুসলমান। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই লাভ করবে সফলতা।
📄 যে নারীর অভিযোগ আল্লাহর কাছে পৌঁছেছে এবং গৃহীত হয়েছে
قَدْ سَمِعَ اللهُ قَوْلَ الَّتِي تُجَادِلُكَ فِي زَوْجِهَا وَتَشْتَكِي إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ يَسْمَعُ تَحَاوُرَ كُمَا إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ.
অর্থ: আল্লাহ অবশ্যই ঐ স্ত্রী লোকটির কথা শুনেছেন, যে তার স্বামীর ব্যাপারে আপনার সাথে বিতর্ক করছিল, আর আল্লাহর দরবারেও অভিযোগ করছিল। আর আল্লাহ আপনাদের উভয়ের কথা-বার্তা শুনেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। (আল মুজাদালাহ: আয়াত-১)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: যে মহিলার ব্যাপার সম্পর্কে এ আয়াত ও তৎপরবর্তী ক'টি আয়াত নাযিল হয়েছিল তিনি ছিলেন খাজরাজ গোত্রের খাওলাহ বিনতে সা'লাবা। তাঁর স্বামীর নাম ছিল আওস ইবনে সামেত আনসারী। মহিলার স্বামী 'যিহার' করেছিলেন। 'জিহার' শব্দ 'জাহরুন' শব্দ থেকে নির্গত। অর্থ পিঠ। তৎকালীন আরব সমাজে প্রায় এমন ঘটতো যে স্বামী-স্ত্রী ঝগড়া-বিবাদ হলে স্বামী রাগান্বিত হয়ে স্ত্রীকে বলতো, اَنْتِ عَلَى كَظَهْرِ أُمِّي তুমি আমার জন্য আমার মায়ের পিঠের তুল্য। একথার তাৎপর্য হলো, তোমার সাথে সহবাস করা আমার জন্য নিজের মায়ের সাথে সহবাস করার সমান। অর্থাৎ তুমি আমার জন্য হারাম।
অনুবাদকগণ সাধারণভাবে এ স্থানে অনুবাদ করেছেন, মহিলা ঝগড়া করছিল, অভিযোগ করছিল। আর এ অনুবাদ পড়ে পাঠক এ অর্থ গ্রহণ করে যে, মহিলাটি তার অভিযোগ পেশ করে হয়তো চলে গিয়েছিল এবং পরে কোনো এক সময় রাসূলুল্লাহ -এর ওপর অহী নাযিল হয়েছিল। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, আমি সে মহিলার কথা শুনেছি, যে তোমার কাছে অনুনয় বিনয় ও ফরিয়াদ করছিল। সে সময় আমি তোমাদের উভয়ের কথাবার্তা শুনছিলাম। কিন্তু এ ঘটনা সম্পর্কে হাদীসসমূহে যেসব বর্ণনা আছে তার অধিকাংশ বর্ণনাতেই বলা হয়েছে, যে সময় সেই মহিলা তার স্বামীর "যিহারের" ঘটনা শুনিয়ে নবীর কাছে বারবার এ বলে আবেদন করছিল যে তাদের মধ্যে যদি বিচ্ছেদ হয়ে যায় তাহলে সে বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়বে এবং তার সন্তান-সন্ততি ধ্বংস হয়ে যাবে। ঠিক এ সময়েই রাসূলুল্লাহ -এর ওপর অহী নাযিল হওয়ার লক্ষণ পরিস্ফুট হয়ে উঠলো এবং এ আয়াতগুলো নাযিল হলো।
আল্লাহর দরবারে এ সাহাবিয়ার অভিযোগে গৃহীত হওয়া এবং আল্লাহর তরফ থেকে সাথে সাথে তাঁর অভিযোগের প্রতিকার করে নির্দেশ নাযিল হওয়া ছিল এমন একটি ঘটনা যার কারণে সাহাবী কিরামের মধ্যে তিনি বিশেষ একটি সম্মান ও মর্যাদার স্থান লাভ করেছিলেন। ইবনে আবী হাতেম ও বায়হাকী একটি হাদীসে বর্ণনা করেছেন যে, একবার 'উমর কিছুসংখ্যক সংগী-সাথীর সাথে কোথাও যাচ্ছিলেন। পথে এক মহিলার সাথে দেখা হলে সে তাঁকে থামতে বললে তিনি সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেলেন। মাথা নিচু করে দীর্ঘ সময় তার কথা শুনলেন এবং সে নিজে কথা শেষ না করা পর্যন্ত তিনি দাঁড়িয়ে থাকলেন। সংগীদের মধ্যে একজন জিজ্ঞেস করলো, হে আমীরুল মু'মিনীন! এ বুড়ীর জন্য আপনি কুরাইশ নেতৃবৃন্দকে এত সময় থামিয়ে রেখেছেন কেন? তিনি বললেন, সে কে তা কি জান? এ যে, খাওলা বিনতে সা'লাবা। এ তো সে মহিলা, সাত আসমানের ওপরে যার অভিযোগ গৃহীত হয়েছে। আল্লাহর কসম, তিনি যদি আমাকে সারা রাত দাঁড় করিয়ে রাখতেন তাহলে আমি সারা রাতই দাঁড়িয়ে থাকতাম। শুধু নামাযের সময় ওযর পেশ করতাম। ইবনে আব্দুল বার তাঁর 'ইসতিয়াব' গ্রন্থে কাতাদার একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন যে, রাস্তায় উমরের সাথে এ মহিলার সাক্ষাত হলে তিনি তাকে সালাম দিলেন। সালামের জবাব দেয়ার পর তিনি বলতে থাকলেন, "ওহ্ উমর এমন এক সময় ছিল যখন আমি তোমাকে "উকাযের" বাজারে দেখেছিলাম। তখন তোমাকে উমায়ের বলে ডাকা হতো। তখন তুমি লাঠি হাতে নিয়ে বকরী চরিয়ে বেড়াতে। এর অল্প দিন পর তোমাকে "উমর' নামে ডাকা হতে থাকলো। অতঃপর এমন এক সময় আসলো যখন তোমাকে 'আমীরুল মু'মিনীন' বলে সম্বোধন করা শুরু হলো। প্রজাদের ব্যপারে অন্তত কিছুটা আল্লাহকে ভয় করো। মনে রেখো, যে আল্লাহর আযাব সম্পর্কিত সাবধানবাণীকে ভয় পায় দূরের মানুষও তাঁর নিকটাত্মীয়ের মত হয়ে যায়। আর যে মৃত্যুকে ভয় পায় তার ব্যাপারে আশঙ্কা হয় যে, সে এমন জিনিসও হারিয়ে ফেলবে যা সে রক্ষা করতে চায়"। উমরের সাথে ছিলেন জারুদ আবদী। একথা শুনে তিনি বললেন, হে নারী! তুমি আমীরুল মু'মিনের সাথে অনেক বে-আদবী করেছো। 'উমর বললেন, তাকে বলতে দাও। তুমি কি জান সে কে? তাঁর কথা তো সাত আসমানের ওপরে গৃহীত হয়েছিল। 'উমরকে তো তাঁর কথা শুনতেই হবে। 'ইমাম বুখারীও তাঁর লিখিত ইতিহাস (আল বিদায়া ওয়ান্নিহায়া গ্রন্থে সংক্ষেপে এ ঘটনার প্রায় অনুরূপ উদ্ধৃত করেছেন।