📄 রাসূল কর্তৃক জায়নককে বিবাহের মাধ্যমে সামাজিক কুসংস্কারের অপনোদন
وَإِذْ تَقُولُ لِلَّذِي أَنْعَمَ اللهُ عَلَيْهِ وَاَنْعَمْتَ عَلَيْهِ أَمْسِكَ عَلَيْكَ زَوْجَكَ وَاتَّقِ اللهَ وَتُخْفِي فِي نَفْسِكَ مَا اللَّهُ مُبْدِيْهِ وَ تَخْشَى النَّاسَ وَاللَّهُ أَحَقُّ أَنْ تَخْشُهُ فَلَمَّا قَضَى زَيْدٌ مِنْهَا وَطَرًا زَوَّجُنُكَهَا لِكَى لَا يَكُونَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ حَرَجٌ فِي أَزْوَاجِ أَدْعِيَائِهِمْ إِذَا قَضَوْا مِنْهُنَّ وَطَرًا وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ مَفْعُولًا.
অর্থ: আর স্মরণ করুন, আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন এবং আপনিও যাকে অনুগ্রহ করেছেন, আপনি তাকে বলেছিলেন, "তুমি তোমার স্ত্রীকে স্বীয় বিবাহাধীনে থাকতে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর।" লোকের ভয়ে আপনি আপনার অন্তরে এমন বিষয় গোপন করেছিলেন যা আল্লাহ প্রকাশ করে দিবেন, অথচ আল্লাহকেই ভয় করা আপনার পক্ষে অধিকতর উচিত ছিল। তারপর যায়িদ যখন জায়নাবের সাথে বিবাহ সম্পর্ক ছিন্ন করল, তখন আমি তাকে আপনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলাম। যাতে মু'মিনদের কোনো সমস্যা না থাকে। আল্লাহর নির্দেশ কার্যকরী হয়েই থাকে। (আহযাব: আয়াত-৩৭)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: এখান থেকে ৪৮ আয়াত পর্যন্তকার বিষয়বস্তু এমন সময় নাযিল হয় যখন নবী যয়নবকে বিয়ে করে ফেলেছিলেন এবং একে ভিত্তি করে মুনাফিক, ইহুদী ও মুশরিকরা রাসূলের বিরুদ্ধে তুমূল অপপ্রচার শুরু করে দিয়েছিল। এ আয়াত গুলো অধ্যায়ন করার সময় একটি কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে। যে শত্রুরা নবী-এর বিরুদ্ধে ইচ্ছা করেই দুর্নাম রটাবার এবং নিজেদের অন্তরজ্বালা মিটাবার জন্য মিথ্যা, অপবাদ, গালমন্দ ও নিন্দাবাদের অভিযান চালাচ্ছিল তাদেরকে বুঝাবার উদ্দেশ্যে এগুলো বলা হয়নি; বরং এর আসল উদ্দেশ্য ছিল তাদের এ অভিযানের প্রভাব থেকে মুসলমানদেরকে রক্ষ করা এবং ছড়ানো সন্দেহ-সংশয় থেকে তাদেরকে সংরক্ষিত রাখা। একথা স্পষ্ট, আল্লাহর কালাম অস্বীকারকারীদেরকে নিশ্চিন্ত করতে পারতো না। এ কালাম যদি কাউকে নিশ্চিন্ত করতে পারতো, তাহলে তারা হচ্ছে এমন সব লোক যারা একে আল্লাহর কালাম বলে জানতো এবং সে হিসেবে একে মেনে চলতো। শত্রুদের আপত্তি কোনোভাবে তাদের মনেও সন্দেহ-সংশয় এবং তাদের মস্তিষ্কেরও জটিলতা ও সংকট সৃষ্টিতে সক্ষম না হয়ে পড়ে, সম্ভাব্য সকল সন্দেহ নিরসন করেছেন।
অন্যদিকে মুসলমানদেরকেও এবং স্বয়ং নবী কেও এ ধরনের অবস্থায় তাদের ভূমিকা কী হওয়া উচিত তা জানিয়ে দিয়েছেন।
এটা সে সময়ের কথা যখন যায়েদ ও যয়নবের সম্পর্ক তিক্ততার চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল এবং তিনি বারবার অভিযোগ করার পর শেষ পর্যন্ত নবী এর কাছে নিবেদন করেন, আমি তাকে তালাক দিতে চাই। যয়নব যদিও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের হুকুম মেনে নিয়ে তাকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যান কিন্তু নিজের মন থেকে এ অনুভূতিটি তিনি কখনো মুছে ফেলতে পারেননি যে, যায়েদ একজন মুক্তিপ্রাপ্ত দাস, তাদের নিজোদের পরিবারের অনুগ্রহে লালিত এবং তিনি নিজে আরবের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও এ ধরনের একজন নিম্নমানের লোকের সাথে তার বিয়ে দেয়া হয়েছে। এ অনুভূতির কারণে দাম্পত্য জীবনে তিনি কখনো যায়েদকে নিজের সমকক্ষ ভাবেননি। এ কারণে উভয়ের মধ্যে তিক্ততা বেড়ে যেতে থাকে। এক বছরের কিছু বেশি দিন অতিবাহিত হতে না হতেই অবস্থা তালাক দেয়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
কেউ কেউ এ বাক্যটির উল্টা অর্থ গ্রহণ করেছেন এভাবে, নবী নিজেই যয়নবকে বিয়ে করতে ইচ্ছুক ছিলেন এবং তাঁর মন চচ্ছিল যায়েদ তাকে তালাক দিয়ে দিক। কিন্তু যখন যায়েদ এসে বললেন, আমি স্ত্রীকে তালাক দিতে চাই তখন তিনি নাউযুবিল্লাহ আসল কথা মনের মধ্যে চেপে রেখে কেবলমাত্র মুখেই তাকে নিষেধ করলেন। একথায় আল্লাহ বলছেন, তুমি মনের মধ্যে যে কথা লুকিয়ে রাখছিলে আল্লাহ তা প্রকাশ করতে চাচ্ছিলেন। অথচ আসল ব্যাপারটা এর সম্পূর্ণ উল্টো। যদি এ সূরার ১,২,৩,ও ৭ আয়াতের সাথে এ বাক্যটি মিলিয়ে পড় হয়, তাহলে পরিষ্কার অনুভূত হবে যে, যায়েদ ও তার স্ত্রীর মধ্যে যে সময় তিক্ততা বেড়ে যাচ্ছিল সে সময়ই আল্লাহ নবী কে এ মর্মে ইংগিত দিয়েছিলেন যে, যায়েদ যখন তার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেবে তখন তোমাকে তার তালাক প্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করতে হবে। কিন্তু যেহেতু আরবের সে সমাজে পালকপুত্রের তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করার অর্থ কী তা নবী জানতেন এবং তাও এমন এক অবস্থায় যখন মুষ্টিমেয় কিছু সংখ্যক মুসলমান ছাড়া বাকি সমগ্র আরব দেশ তাঁর বিরুদ্ধে ধনুকভাঙাপণ করে বসেছিল- এ অবস্থায় তিনি এ কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে ইতঃস্তত করছিলেন। এ কারণে যায়েদ যখন স্ত্রীকে তালাক দেবার সংকল্প প্রকাশ করেন তখন নবী করীম তাঁকে বলেন আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজের স্ত্রীকে তালাক দিয়ো না। তার উদ্দেশ্য ছিল, যায়েদ যদি তালাক না দেন, তাহলে তিনি এ বিপদের মুখোমুখী হওয়া থেকে বেঁচে যাবেন। নয়তো যায়েদ তালাক দিলেই তাকে হুকুম পালন করতে হবে এবং তারপর তাঁর বিরুদ্ধে খিস্তি-খেউড় ও অপপ্রচারের ভয়াবহ তুফান সৃষ্টি করা হবে। কিন্তু মহান আল্লাহ তাঁর নবীকে উচ্চ মনোবল, দৃঢ় সংকল্প ও আল্লাহর ফায়সালায় রাজি থাকার যে উচ্চমর্যাদার আসনে দেখতে চাচ্ছিলেন সে দৃষ্টিতে নবী করীমের ইচ্ছা করে যায়েদকে তালাক থেকে বিরত রাখ নিম্নমানের কাজ বিবেচিত হয়। তিনি আসলে ভাবছিলেন যে, এর ফলে তিনি এমন কাজ করা থেকে বেঁচে যাবেন যাতে তাঁর দুর্নামের আশঙ্কা ছিল। অথচ আল্লাহ একটি বড় উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তাঁকে দিয়ে সে কাজটি করাতে চাচ্ছিলেন। "তুমি লোক ভয় করছ অথচ আল্লাহকে ভয় করাই অধিকতর সংগত"- এ কথাগুলো পরিষ্কারভাবে এ বিষয়বস্তুর দিকে ইংগিত করছে।
ইমাম যয়নুল আবেদীন আলী ইবনে হোসাইন এ আয়াতের ব্যাখ্যায় একথাই বলেছেন। তিনি বলেন, "আল্লাহ নবী -কে এই মর্মে খবর দিয়েছিলেন যে, যয়নব আপনার স্ত্রী মধ্যে শামিল হতে যাচ্ছেন। কিন্তু যায়েদ যখন এসে তাঁর কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেন তখন তিনি বললেন, আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজের স্ত্রী ত্যাগ করো না। এ কথায় আল্লাহ বলেলেন, আমি তোমাকে পূর্বেই জানিয়ে দিয়েছিলাম, আমি তোমাকে যয়নবের সাথে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছি অথচ তুমি যায়েদের সাথে কথা বলার সময় আল্লাহ যেকথা প্রকাশ করতে চান তা গোপন করছিলে। (ইবনে জারীর ও ইবনে কাসীর ইবনে আবী হাতেমের বরাত দিয়ে)
আল্লামা আলুসীও তাফসীর রুহুল মা'আনীতে এর একই অর্থ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, এটি হচ্ছে শ্রেয়তর কাজ পরিত্যাগ করার জন্য ক্রোধ প্রকাশ। নবী নিশ্চুপ থাকতেন অথবা যায়েদকে বলতেন, তুমি যা চাও করতে পারো, এ অবস্থায় এটিই ছিল শ্রেয়তর। অভিব্যক্তি ক্রোধের সারৎসার হচ্ছে তুমি কেন যায়েদকে বললে তোমার স্ত্রীকে ত্যাগ করো না? অথচ আমি তোমাকে আগেই জানিয়ে দিয়েছি যে, যয়নব তোমার স্ত্রীদের মধ্যে শামিল হবে।"
যায়েদ যখন নিজের স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিলেন এবং তার ইদ্দত পুরা হয়ে গেলো। প্রয়োজন পূর্ণ করলো শব্দগুলো স্বতস্ফূর্তভাবে একথাই প্রকাশ করে যে, তাঁর কাছে যায়েদের আর কোনো প্রয়োজন থাকলো না। কেবলমাত্র তালাক দিলেই এ অবস্থাটির সৃষ্টি হয় না। কারণ স্বামীর আর কোনো আকর্ষণ থেকে গেলে ইদ্দতের মাঝখানে তাকে ফিরিয়ে নিতে পারে। আর তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর গর্ভবতী হওয়া বা না হওয়ার কথা জানতে পারার মধ্যেও স্বামীর প্রয়োজন থেকে যায়। তাই যখন ইদ্দত খতম হয়ে যায় একমাত্র তখনই তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর মধ্যে স্বামীর প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়।
আল্লাহ এ কাজ নবী-এর মাধ্যমে এমন একটি প্রয়োজন ও উদ্দেশ্য সম্পাদনের জন্য করিয়েছিলেন যা এ পদ্ধতিতে ছাড়া অন্য কোনোভাবে সম্পাদিত হতে পারতো না। আরবে পালক পুত্রদের সম্পর্কিত আত্মীয়তার ব্যাপারে যে সমস্ত ভ্রান্ত রসম-রেওয়াজের প্রচলন হয়ে গিয়েছিল আল্লাহর রাসূল নিজে অগ্রসর হয়ে না ভাঙলে সেগুলো ভেঙে ফেলার ও উচ্ছেদ করার আর কোনো পথ ছিল না। কাজেই আল্লাহ নিছক নবীর গৃহে আর একজন স্ত্রী বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে নয়; বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য পূর্ণ করার জন্য এ বিয়ে করিয়েছিলেন।
📄 পালক পুত্রের স্ত্রী প্রকৃত পুত্রবধূ নয়
مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّنَ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا.
অর্থ: মুহাম্মদ তোমাদের মধ্যকার কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লহর রাসূল এবং সর্বশেষ নবী। আল্লাহ সকল বিষয়ে সর্বজ্ঞ। (সূরা আহযাব: আয়াত-৪০)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: বিরোধীরা নবী -এর এ বিয়ের ব্যাপারে যেসব আপত্তি উঠাচ্ছিল এ একটি বাক্যের মাধ্যমে সেসবের মূলোচ্ছেদ করে দেয়া হয়েছে।
তাদের প্রথম অভিযোগ ছিল, তিনি নিজের পুত্রবধূকে বিয়ে করেন, অথচ তাঁর নিজের শরীয়াতেও পুত্রের স্ত্রী পিতার জন্য হারাম। এর জবাবে বলা হয়েছে, "মুহাম্মাদ তোমাদের পুরুষদের কারো পিতা নন।" অর্থাৎ যে ব্যক্তির তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করা হয়েছে তিনি মুহাম্মাদ -এর পুত্রই ছিলেন না, কাজেই তার তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করা হারাম হবে কেন? তোমরা নিজেরাই জানো মুহাম্মাদ-এর আদতে কোনো পুত্র সন্তানই নেই। তাদের দ্বিতীয় আপত্তি ছিল, ঠিক আছে, পালক পুত্র যদি আসল পুত্র না হয়ে থাকে তাহলেও তার তালাক প্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করা বড় জোর বৈধই হতে পারতো কিন্তু তাকে বিয়ে করার এমন কী প্রয়োজন ছিল? এর জবাবে বলা হয়েছে, "কিন্তু তিনি আল্লাহর রাসূল।" অর্থাৎ রাসূল হবার কারণে তাঁর ওপর এ দায়িত্ব ও কর্তব্য আরোপিত হয়েছিল যে তোমাদের রসম রেওআজ যে হালাল জিনিসটিকে অযথা হারাম গণ্য করে রেখেছে সে ব্যাপারে সকল রকমের স্বার্থপ্রীতির তিনি অবসান ঘটিয়ে দেবেন এবং তার হালাল হাবার ব্যাপারে কোনো প্রকার সন্দেহ-সংশয়ের অবকাশই রাখবে না।
আবার অতিরিক্ত তাকিদ সহকারে বলা হয়েছে, "এবং তিনি শেষ নবী।" অর্থাৎ যদি কোনো আইন ও সামাজিক সংস্কার তাঁর আমলে প্রবর্তিত না হয়ে থাকে তাহলে তাঁর পরে আগমনকারী নবী তার প্রবর্তন করতে পারতেন, কিন্তু তাঁর পরে আর কোনো রাসূল তো দূরের কথা কোনো নবীই আসবেন না। কাজেই তিনি নিজেই জাহেলিয়াতের এ রসমটির মূলোচ্ছেদ করে যাবেন, এটা আরো অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল।
এরপর আরো বেশি জোর দিয়ে বলা হয়েছে, "আল্লাহ প্রত্যেটি বিষয়ের জ্ঞান রাখেন।" অর্থাৎ আল্লাহ জানেন, এ সময় মুহাম্মাদ -এর মাধ্যমে জাহেলিয়াতের এ রসমটির মূলোচ্ছেদ করা কেন জরুরি ছিল এবং এমনটি না করলে কী মহা অনর্থ হতো। তিনি জানেন, এখন আর তাঁর পক্ষ থেকে কোনো নবী আসবেন না, কাজেই নিজের শেষ নবীর মাধ্যমে এখন যদি তিনি এ রসমটিকে উৎখাত না করেন তাহলে এমন দ্বিতীয় আর কোন সত্তাই নেই যিনি এটি ভঙ্গ করলে সারা দুনিয়ার মুসলমানদের মধ্য থেকে চিরকালেন জন্য এটি মূলোৎপাটিত হয়ে যাবে। পরবর্তী সংস্কারকগণ যদি এটি ভাঙেন, তাহলে তাদের মধ্য থেকে আরো কর্মও তাঁর ইন্তিকালের পরে এমন কোনো বিশ্বজনীন ও চিরন্তন কর্তৃত্বের অধিকারী হবে না যার ফলে প্রত্যেক দেশের প্রত্যেক যুগের লোকেরা তার অনুসরণ করতে থাকবে এবং তাদের মধ্য থেকে কারো ব্যক্তিত্ব ও তাঁর নিজের মধ্যে এমন কোনো পবিত্রতার বাহন হবে না যার ফলে তাঁর কোনো কাজ নিছক তাঁর সুন্নাত হবার কারণে মানুষের মন থেকে অপছন্দনীয়তার সকল প্রকার ধারণার মূলোচ্ছেদ করতে সক্ষম হবে।
📄 মুমিন-নারী-পুরুষকে কষ্ট দেয়ার পরিণতি
وَ الَّذِيْنَ يُؤْذُوْنَ الْمُؤْمِنِيْنَ وَ الْمُؤْمِنٰتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوْا فَقَدِ احْتَمَلُوْا بُهْتَانًا وَّ اِثْمًا مُّبِيْنًا.
অর্থ: আর অপরাধবিহীন মু'মিনাহ নারীকে যারা কষ্ট দেয় তারা তো বহন করে মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা। (সূরা আহযাব: আয়াত-৫৮)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: আলোচ্য আয়াতে কোনো মুসলিম পুরুষ অথবা নারীকে শরীয়তসম্মত কারণ ছাড়া তোহমত বা মিথ্যা অপবাদ দেয়ার চরম পরিণতি সম্পর্কে সাবধান করা হয়েছে। মদীনায় এক শ্রেণির লোকেরা মুসলিম নর-নারীর বিরুদ্ধে এ ধরনের অপবাদ আরোপ করতো যা প্রকৃতপক্ষে মুসলিম নর-নারীগণ করতেন না। তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে নানা কুৎসা ও অপবাদ রটাতো দেখা যায়। বিবৃত ও গর্হিত রুচীর মুনাফিক ও দুষ্কৃতকারীদের এমন ধরনের দুরভিসন্ধির কবলে পড়ে মুসলিম নারী-পুরুষ সর্বত্রই হেস্তনেস্ত হয়ে থাকে। আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাদের যাবতীয় ষড়যন্ত্র ও দুরভিসন্ধির জবাব দেন এবং তাদের অপবাদ খণ্ডন করেন। (ফী যিলালিল কুরআন)
মুনাফিকদের ইসলাম বিরোধী ষড়যন্ত্রের এ হচ্ছে এক জঘন্যতম আচরণ। মদীনার ঐসব মুনাফিকদের অন্তরে সার্বক্ষণিক জ্বালা এই ছিল যে, মুসলিম নারী-পুরুষের নৈতিক মান অন্য সকল জাতির তুলনায় ছিল মহান ও সুউচ্চ। আর এতে করে ইসলামের দাওয়াতের প্রভাব ছিল প্রচুর এবং এর ফলাফল প্রমাণিত হচ্ছিলো ব্যাপকতরভাবে। তারা হিংসার বশবর্তী হয়ে মুসলিম নারী-পুরুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটাতে আরম্ভ করলো। এভাবে মুসলিম জাহানের নৈতিক ও চারিত্রিক ভিত ভেঙে দিতে পারলেই ওদের কলিজা ঠাণ্ডা হতো। আয়েশা -এর বিরুদ্ধে প্রচারিত ইফকের ঘটনাটিও উদ্দেশ্যেই সাজানো হয়েছিল। এখানে তাদের এহেন মিথ্যা ষড়যন্ত্রকারীদের কঠোর শাস্তি ও করুণ পরিণতির কথা ঘোষণা করা হয়েছে। তাদের সাবধান করে দেয়া হয়েছে যে, এখনো যদি তারা এহেন অপকর্ম থেকে বিরত না হয়, তাহলে এর পরিণতি তারা স্বচক্ষে দেখতে হবে। (তাদাব্বুরে কুরআন)
মুনাফিকদের পক্ষ থেকে সকল মুসলমান ও রাসূলুল্লাহ দুই প্রকারের কষ্ট পেতেন। তাদের দ্বিবিধ নির্যাতনের একটি ছিল এই যে, মুসলমানদের দাসীরা কাজকর্মের জন্য বাইরে গেলে দুই প্রকৃতির মুনাফিকরা তাদেরকে উত্যক্ত করতো এবং কখনো কখনো দাসী সন্দেহে স্বাধীন নারীদেরকেও উত্যক্ত করতো। ফলে সাধারণ মুসলমানগণ এবং রাসূলুল্লাহ কষ্ট পেতেন। তাদের দ্বিতীয় নির্যাতন ছিল, তারা সর্বাদা মিথ্যা খবর রটনা করতো। যেমন তারা বলে বেড়াতো এক্ষণে অমুক শত্রুপক্ষ মদীনা আক্রমণ করবে এবং সকলকে নিশ্চিহ্ন করে ছাড়বে। প্রথম প্রকারের নির্যাতন থেকে স্বাধীন নারীদেরকে বাঁচানোর তাৎক্ষণিক ও সহজ ব্যবস্থা ছিল স্বাধীন নারীদের মধ্যে বিশেষ স্বাতন্ত্র ফুটিয়ে তোলা। কারণ মুনাফিকরা স্বাধীন নারীদের পারিবারিক প্রভাব প্রতিপত্তি ও শক্তি- সামর্থের কারণে তাদেরকে সচরাচর উত্যক্ত করার সাহস পেত না। পরিচয়ের অভাবেই এরূপ ঘটনা সংঘটিত হতো। তাই স্বাধীন নারীদের পরিচয় ফুটিয়ে তোলার প্রয়োজন ছিল, যাতে তারা অতি সহজে দুষ্টদের কবল থেকে নিরাপদ হয়ে যায়।
অপরদিকে শরীয়ত স্বাধীন নারী ও দাসীদের মধ্যে প্রয়োজন বশত একটি পার্থক্যও রেখেছে। স্বাধীন নারীরা তাদের মুহরিম ব্যক্তির সামনে যতটুকু পর্দা করে, দাসীদের জন্য ঘরের বাইরেও ততটুকু পর্দা রাখা হয়েছে। কারণ, প্রভুর কাজকর্ম করাই দাসীর কর্তব্য, এজন্যে তাকে প্রয়োজনে বার বার বাইরেও যেতে হয়। এমতাবস্থায় মুখাবয়ব ও হাত আবৃত রাখা কঠিন ব্যাপার। স্বাধীন নারীরা বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হলেও তা বার বার হয় না। কাজেই পূর্ণ পর্দা পালন করা, তাদের জন্য কঠিন নয়। তাই স্বাধীন নারীদের জন্য নির্দেশ রয়েছে তারা যেন লম্বা চাদর মাথার উপর থেকে মুখাবয়বের সামনে ঝুলিয়ে নেয়। যাতে পর-পুরুষের দৃষ্টিতে মুখাবয়ব না পড়ে। বলা হয়েছে
يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيُبِهِنَّ তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। (মাআরেফুল কুরআন)
📄 মুসলিম নারীদের প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে যাওয়ার বিধান
يَأَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَ بَنْتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَا بِيُبِهِنَّ ذَلِكَ أَدْنَى أَنْ يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا.
অর্থ: হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে, আপনার কন্যাদেরকে এবং মু'মিনদের নারীদেরকে বলে দিন, তারা যেন তাদের চাদর নিজেদের উপর ঝুলিয়ে দেয়; এতে সহজেই তাদের পরিচয় পাওয়া যাবে, ফলে তারা লাঞ্ছিতা হবে না। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও করুণাময়। (সূরা আহযাব: আয়াত-৫৯)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: নারী-পুরুষের মাঝে, কর্মবণ্টন অনুযায়ী নারীগণের প্রধান কর্মক্ষেত্র পরিবার। পরিবারিক কার্যাবলী সম্পাদন বাড়ির অভ্যন্তরে হলেও কখনও প্রয়োজনে বাড়ির বাইরেও তাদের যাতায়াত আবশ্যকীয় হয়ে পড়ে। মুসলিম নারীগণ বিভিন্ন পারিবারিক, সামাজিক ও জাতীয় কার্যক্রমে বাড়ীর বাইরে যেতে কুরআন ও হাদীস নিষেধ করে নি। তবে তারা বের হবে পর্দা করে শালীনতা সহকারে। এ বিষয়ে সূরা আল আহযাবের ৩৩ আয়াতে এ মহিলাদের জন্য সাধারণ ঘরে পারিবারিক বিষয়াদিকেই প্রধান গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সাথে সাথে ঘরের বাইরে তাদের বিচরণ কীরূপ হবে সে বিষয়েও সীমারেখা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে।
আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূলকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন তাঁর স্ত্রী-কন্যা ও মুসলিম মহিলাদের প্রয়োজনীয় কাজে বাইরে যাওয়া সময় সমস্ত শরীর, মাথা ও বুকের খোলা অংশ আচ্ছাদিত করার আদেশ দেন। সর্বাঙ্গ আচ্ছাদনকারী একটা জিলবাব বা বড় চাদর দিয়ে শরীয়টাকে ঢেকে নিতে হবে। এ পোশাক তাদেরকে অন্যান্য নারীদের মধ্য থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্য এনে দিবে আর দুষ্কৃতকারী ও বখাটে লোকদের উত্যক্তি থেকে রক্ষা করবে। কেননা মহিলাদেরকে উত্যক্তকারী বখাটেরা আপাদমস্তক আবৃত মহিলাদেরকে দেখলে তাদেরকে দীনদগার পরহেজগার নারী হিসেবে চিনতে পেরে লজ্জা ও সংকোচবোধ করে এবং সংযত আচরণ করে। সূরা আল আহযাবের আলোচ্য ৫৯ নং আয়াতটিতে 'জিলবাব' পরিধানের নির্দেশ লক্ষ্যণীয়।
এ আয়াতের ব্যাখ্যা সম্পর্কে সুদ্দী বলেছেন, মদীনার কিছু পাপাচারী বখাটে লোক রাতের আঁধার নেমে এলেই মদীনার অলিগলিতে বেরিয়ে পড়তো এবং মেয়েদের খোঁজ করতো। মদীনা ছিল ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। তাই রাত হলে মহিলারা প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাইরে বেরিয়ে যেতো, আর পাপচারী বখাটেরা এ সুযোগের অপেক্ষায় থাকতো। তবে কোনো মহিলাকে চাদর দিয়ে আপাদমস্তক আবৃত দেখলে তারা বলতো এতো 'সম্ভ্রান্ত পরিবারের মহিলা'। কাজেই যারা বড় চাদর দিয়ে না ঢেকেই বেরিয়েছে, তখন তারা বলতো, এতো দাসী-বাঁদী বা নিম্নস্তরের মহিলা। এই বলেই তারা মহিলার উপর আক্রমণ চালাতো।
মুজাহিদ বলেছেন, 'জিলবাব' বা বড় চাদর পরিধানের আদেশ দেয়া হয়েছে এজন্যে, যেন বুঝা যায় তারা স্বাধীন ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে। ফলে কোনো অপরাধপ্রবণ লোক তাদের কোনোভাবে উত্যক্ত করতে চেষ্টা করবে না। আর 'আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু'- একথার অর্থ হলো অজ্ঞতাবশত জাহেলী যুগে যেসব অন্যায় হয়ে গেছে, তা আল্লাহ ক্ষমা করবেন।
এ আয়াত থেকে বুঝা যায়, আরবের সামাজিক পরিবেশকে পবিত্র করার জন্য যে অব্যাহত চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, ফেতনা-ফাসাদ ও নৈরাজ্য দূর করার জন্য যে ক্রমাগত বিধি-নিষেধ জারি করা হচ্ছিল এবং যাবতীয় বিশৃংখলা ও দুর্নীতিকে সংকীর্ণতম গণ্ডীতে সীমিত করার জন্য যে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হচ্ছিল এসব কিছুর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল গোটা মুসলিম সমাজের উপর ইসলামী নিয়ম-বিধি ও ঐতিহ্যের নিরংকুশ কর্তৃত্ব ও শাসন প্রতিষ্ঠা করা। (ফী-যিলালিল কুরআন)
"চিনে নেয়া যায়" এর অর্থ হচ্ছে, তাদেরকে এ ধরনের অনাড়ম্বর লজ্জা নিবারণকারী পোশাকে সজ্জিত দেখে প্রত্যেক প্রত্যক্ষকারী জানবে তারা অভিজাত ও সম্রাভ্রান্ত পরিবারের পূত-পবিত্র মেয়ে, এমন ভবঘুরে অসতী ও পেশাদার মেয়ে নয়, কোনো অসদাচারী মানুষ যার কাছে নিজের কামনা পূর্ণ করার আশা করতে পারে। "না কষ্ট দেয়া হয়" এর অর্থ হচ্ছে এই যে, তাদেরকে যেন উত্যক্ত ও জ্বালাতন না করা হয়।
এখানে কিছুক্ষণ থেমে একবার একথাটি অনুবাধন করার চেষ্টা করুন যে, কুরআনের এ হুকুম এবং এ হুকুমের যে উদ্দেশ্য আল্লাহ নিজেই বর্ণনা করেছেন তা ইসলামী সমাজ বিধানের কোন ধরনের প্রাণ শক্তির প্রকাশ ঘটাচ্ছে। ইতিপূর্বে সূরা নূরের ৩১ আয়াতে এ নির্দেশ আলোচিত হয়েছে যে; মহিলারা তাদের সাজসজ্জা অমুক অমুক ধরনের পুরুষ ও নারীদের ছাড়া আর কারো সামনে প্রকাশ করবে না। "আর মাটির ওপর পা দাপিয়ে চলবে না, যাতে যে সৌন্দর্য তারা লুকিয়ে রেখেছে লোকেরা যেন তা জেনে না ফেলে"।
এ হুকুমের সাথে যদি সূরা আহযাবের এ আয়াতটি মিলিয়ে পড়া হয় তাহলে পরিষ্কার জানা যায় যে, এখানে চাদর দিয়ে ঢাকার যে হুকুম এসেছে অপরিচিতদের থেকে সৌন্দর্য লুকানোই হচ্ছে তার উদ্দেশ্য। আর একথা সুস্পষ্ট যে, এ উদ্দেশ্য তখনই পূর্ণ হতে পারে যখন চাদরটি হবে সাদামাটা। নয়তো একটি উন্নত নকশাদার ও দৃষ্টিনন্দন কাপড় জড়িয়ে নিলে তো উলটো এ উদ্দেশ্য আরো খতম হয়ে যাবে। তাছাড়া আল্লাহ কেবল চাদর জড়িয়ে সৌন্দর্য ঢেকে রাখার হুকুম দিচ্ছেন না; বরং একথাও বলছেন যে, মহিলারা যেন চাদরের একটি অংশ নিজেদের ওপর লটকে দেয়। কোনো বিচক্ষণ বিবেকবান ব্যক্তি এ উক্তিটির এ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো অর্থ করতে পারেন না যে, এর উদ্দেশ্য হচ্ছে ঘোমটা দেয়া যাতে শরীর ও পোশাকের সৌন্দর্য ঢাকার সাথে সাথে চেহারাও ঢাকা পড়বে। তারপর আল্লাহ নিজেই এ হুকুমটির 'ইল্লাত' (কার্যকারণ) এ বর্ণনা করেছেন যে, এটি এমন একটি সর্বাধিক উপযোগী পদ্ধতি যা থেকে মুসলমান মহিলাদেরকে চিনে নেয়া যাবে এবং তারা উত্যক্ত হবার হাত থেকেও বেচে যাবে।
এ থেকে আপনা-আপনিই একথা প্রকাশ হয়ে যায় যে, এ নিদের্শ এমন সব মহিলাকে দেয়া হচ্ছে যারা পুরুষদের হাতে উত্যক্ত হবার এবং তাদের দৃষ্টিতে পড়ার ও তাদের কামনা-লালসার বস্তুতে পরিণত হবার ফলে আনন্দ অনুভব করার পরিবর্তে একে নিজেদের জন্য কষ্টদায়ক লাঞ্ছনাকর মনে করে, যারা সমাজে নিজেদেরকে বে-আবরু মক্ষিরাণী ধরনের মহিলাদের মধ্যে গণ্য করাতে চায় না; বরং সতী-সাধ্বী গৃহ প্রদীপ হিসেবে পরিচিত হতে চায় এ ধরনের শরীফ ও পূত চরিত্রের অধিকারিণী সৎকর্মশীলা মহিলাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, যদি সত্যিই তোমরা এভাবে নিজেদেরকে পরিচিত করাতে চাও এবং পুরুষদের যৌন লালসার দৃষ্টি সত্যিই তোমাদের জন্য আনন্দাদায়ক না হয়ে থাকে, তাহলে এ জন্য তোমরা খুব ভালোভাবে সাজসজ্জা করে বাসর রাতের কনে সেজে ঘর থেকে বের হয়ো না এবং দর্শকদের লালসার দৃষ্টির সামনে নিজেদের সৌন্দর্যকে উজ্জল করে তুলে ধরোনা। কেননা এটা এর উপযোগী পদ্ধতি নয়; বরং এ জন্য সর্বাধিক উপযোগী পদ্ধতি এই হতে পারে যে, তোমরা একটি সাদামাটা চাদরে নিজেদের সমস্ত সৌন্দর্য ও সাজসজ্জা ঢেকে বের হবে, চেহারা ঘোমটার আড়ালে রাখবে এবং এমনভাবে চলবে যাতে অলংকারের রিনিঝিনি আওয়াজ লোকদেরকে তোমাদের প্রতি আকৃষ্ট করবে না।
বাইরে বের হবার আগে যেসব মেয়ে সাজগোজ করে নিজেদেরকে তৈরি করে এবং ততক্ষণ ঘরের বাইরে পা রাখে না যতক্ষণ অপরূপ সাজে নিজেদেরকে সজ্জিতা না করে নেয়, তাদের এর উদ্দেশ্য এ ছাড়া আর কি হতে পারে যে, তারা সারা দুনিয়ার পুরুষদের জন্য নিজেদেরকে দৃষ্টিনন্দন করতে চায় এবং তাদেরকে নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করতে চায়। এরপর যদি তারা বলে, দর্শকদের ভ্রূভঙ্গী তাদেরকে কষ্ট দেয়, এরপর যদি তাদের দাবী হয় তারা "সমাজের মক্ষিরাণী" এবং "সর্বজনপ্রিয় মহিলা" হিসেবে নিজেদেরকে চিত্রিত করতে চায় না; বরং পূত-পবিত্রা গৃহিণী হয়েই থাকতে চায়, তাহলে এটা একটা প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষের কথা তার নিয়ত নির্ধারণ করে না; বরং কাজের মাধ্যমেই তার আসল নিয়ত প্রকাশ করে। কাজেই যে নারী আকর্ষনীয়া হয়ে পর পুরুষের সামনে যায়, তার এ কাজটির পেছনে কোন ধরনের উদ্দেশ্য কাজ করছে সেটা ঐ কাজ দ্বারাই প্রকাশ পায়। কাজেই এসব মহিলাদের থেকে যা আশা করা যেতে পারে ফিতনাবাজ লোকেরা তাদের থেকে তাই আশা করে থাকে। কুরআন মহিলাদেরকে বলে, তোমরা একই সঙ্গে "গৃহপ্রদীপ" ও "সমাজের মক্ষিরাণী" হতে পারো না। গৃহপ্রদীপ হতে চাইলে সমাজের মক্ষিরাণী হবার জন্য যেসব পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয় তা পরিহার করো এবং এমন জীবনধারা অবলম্বন করো যা গৃহপ্রদীপ হতে সাহায্য করতে পারে।