📄 আল্লাহ ও রাসূলের পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত এলে তা নারী পুরুষের জন্য অবশ্য পালনীয়
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَلًا مُبِينًا.
অর্থ: কোনো মু'মিন পুরুষ কিংবা মু'মিন নারীর জন্য এ অবকাশ নেই যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যখন কোনো কাজের নির্দেশ দেন, তখন সে কাজে তাদের কোনো নিজস্ব সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে। কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করলে সে তো প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় নিপতিত হয়। (সূরা আহযাব: আয়াত-৩৬)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: যয়নবের সাথে নবী-এর বিবাহ প্রসঙ্গে যে আয়াত নাযিল হয়েছিল এখান থেকেই তা শুরু হচ্ছে।
ইবনে আব্বাস, মুজাহিদ, কাতাদাহ, ইকরামাহ ও মুকাতিল ইবনে হাইয়ান বলেন, এ আয়াত তখন নাযিল হয়েছিল যখন নবী যায়েদের জন্য যয়নবের সাথে বিয়ের পয়গাম দিয়েছিলেন এবং যয়নব ও তার আত্মীয়রা তা নামঞ্জুর করেছিলেন। ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেছেন, নবী যখন এ পয়গাম দেন তখন যয়নব বলেন, "আমি অভিজাত কুরাইশ পরিবারের মেয়ে, তাই আমি তাকে নিজের জন্য পছন্দ করি না।" তাঁর ভাই আবদুল্লাহ ইবনে জাহশও এ ধরনের অসম্মতি প্রকাশ করেছিলেন এর কারণ ছিল এই যে, যায়েদ নবী-এর আযাদ করা গোলাম ছিলেন এবং যয়নব ছিলেন তাঁর ফুফু (উমাইমাহ বিনতে আবদুল মুত্তালিব)-এর কন্যা। এত উঁচু ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে, তাও আবার যাতা পরিবার নয়, নবীর নিজের ফুফাত বোন এবং তার বিয়ের পয়গাম তিনি দিচ্ছিলেন নিজের আযাদ করা গোলামের সাথে একথা তাদের কাছে অত্যন্ত খারাপ লাগছিল। এজন্য এ আয়াত নাযিল হয়। এ আয়াত শুনতেই যয়নব ও তাঁর পরিবারের সবাই নির্দ্বিধায় আনুগত্যের শির নত করেন। এরপর নবী তাদের বিয়ে পড়ান। তিনি নিজে যায়েদের পক্ষ থেকে ১০ দীনার ও ৬০ দিরহাম মোহরানা আদায় করেন, কনের কাপড় চোপড় দেন এবং কিছু খাবার দাবারের জিনিসপত্র পাঠান।
এ আয়াত যদিও একটি বিশেষ সময়ে নাযিল হয় কিন্তু এর মধ্যে যে হুকুম বর্ণনা করা হয় তা ইসলামী আইনের একটি বড় মূলনীতি এবং সমগ্র ইসলামী জীবন ব্যবস্থার ওপর এটি প্রযুক্ত হয়। এর দৃষ্টিতে যে বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে কোন হুকুম প্রমাণিত হয় সে বিষয়ে কোনো মুসলিম ব্যক্তি, জাতি, প্রতিষ্ঠান, আদালত, পার্লামেন্ট বা রাষ্ট্রের নিজের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা ব্যবহার করার কোনো অধিকার নেই। মুসলমান হবার অর্থই হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সামনে নিজের স্বাধীন ইখতিয়ার বিসর্জন দেয়া। কোনো ব্যক্তি বা জাতি মুসলমানও হবে আবার নিজের জন্য এ ইখতিয়ারটিও সংরক্ষিত রাখবে। এ দু'টি বিষয় পরস্পর বিরোধী-এ দুটি কাজ এক সাথে হতে পারে না। কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি এ দু'টি দৃষ্টিভংগীকে একত্র করার ধারণা করতে পারে না। যে ব্যক্তি মুসলমান হিসেবে বেঁচে থাকতে চায় তাকে অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সামনে আনুগত্যের শির নত করতে হবে। আর যে মুসলমান নয়। যদি সে না মানে তাহলে নিজেকে মুসলমান বলে যত জোরে গলা ফটিয়ে চিৎকার করুক না কেন আল্লাহ ও বান্দা উভয়ের দৃষ্টিতে সে মুনাফিকই গণ্য হবে।
📄 রাসূল কর্তৃক জায়নককে বিবাহের মাধ্যমে সামাজিক কুসংস্কারের অপনোদন
وَإِذْ تَقُولُ لِلَّذِي أَنْعَمَ اللهُ عَلَيْهِ وَاَنْعَمْتَ عَلَيْهِ أَمْسِكَ عَلَيْكَ زَوْجَكَ وَاتَّقِ اللهَ وَتُخْفِي فِي نَفْسِكَ مَا اللَّهُ مُبْدِيْهِ وَ تَخْشَى النَّاسَ وَاللَّهُ أَحَقُّ أَنْ تَخْشُهُ فَلَمَّا قَضَى زَيْدٌ مِنْهَا وَطَرًا زَوَّجُنُكَهَا لِكَى لَا يَكُونَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ حَرَجٌ فِي أَزْوَاجِ أَدْعِيَائِهِمْ إِذَا قَضَوْا مِنْهُنَّ وَطَرًا وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ مَفْعُولًا.
অর্থ: আর স্মরণ করুন, আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন এবং আপনিও যাকে অনুগ্রহ করেছেন, আপনি তাকে বলেছিলেন, "তুমি তোমার স্ত্রীকে স্বীয় বিবাহাধীনে থাকতে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর।" লোকের ভয়ে আপনি আপনার অন্তরে এমন বিষয় গোপন করেছিলেন যা আল্লাহ প্রকাশ করে দিবেন, অথচ আল্লাহকেই ভয় করা আপনার পক্ষে অধিকতর উচিত ছিল। তারপর যায়িদ যখন জায়নাবের সাথে বিবাহ সম্পর্ক ছিন্ন করল, তখন আমি তাকে আপনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলাম। যাতে মু'মিনদের কোনো সমস্যা না থাকে। আল্লাহর নির্দেশ কার্যকরী হয়েই থাকে। (আহযাব: আয়াত-৩৭)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: এখান থেকে ৪৮ আয়াত পর্যন্তকার বিষয়বস্তু এমন সময় নাযিল হয় যখন নবী যয়নবকে বিয়ে করে ফেলেছিলেন এবং একে ভিত্তি করে মুনাফিক, ইহুদী ও মুশরিকরা রাসূলের বিরুদ্ধে তুমূল অপপ্রচার শুরু করে দিয়েছিল। এ আয়াত গুলো অধ্যায়ন করার সময় একটি কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে। যে শত্রুরা নবী-এর বিরুদ্ধে ইচ্ছা করেই দুর্নাম রটাবার এবং নিজেদের অন্তরজ্বালা মিটাবার জন্য মিথ্যা, অপবাদ, গালমন্দ ও নিন্দাবাদের অভিযান চালাচ্ছিল তাদেরকে বুঝাবার উদ্দেশ্যে এগুলো বলা হয়নি; বরং এর আসল উদ্দেশ্য ছিল তাদের এ অভিযানের প্রভাব থেকে মুসলমানদেরকে রক্ষ করা এবং ছড়ানো সন্দেহ-সংশয় থেকে তাদেরকে সংরক্ষিত রাখা। একথা স্পষ্ট, আল্লাহর কালাম অস্বীকারকারীদেরকে নিশ্চিন্ত করতে পারতো না। এ কালাম যদি কাউকে নিশ্চিন্ত করতে পারতো, তাহলে তারা হচ্ছে এমন সব লোক যারা একে আল্লাহর কালাম বলে জানতো এবং সে হিসেবে একে মেনে চলতো। শত্রুদের আপত্তি কোনোভাবে তাদের মনেও সন্দেহ-সংশয় এবং তাদের মস্তিষ্কেরও জটিলতা ও সংকট সৃষ্টিতে সক্ষম না হয়ে পড়ে, সম্ভাব্য সকল সন্দেহ নিরসন করেছেন।
অন্যদিকে মুসলমানদেরকেও এবং স্বয়ং নবী কেও এ ধরনের অবস্থায় তাদের ভূমিকা কী হওয়া উচিত তা জানিয়ে দিয়েছেন।
এটা সে সময়ের কথা যখন যায়েদ ও যয়নবের সম্পর্ক তিক্ততার চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল এবং তিনি বারবার অভিযোগ করার পর শেষ পর্যন্ত নবী এর কাছে নিবেদন করেন, আমি তাকে তালাক দিতে চাই। যয়নব যদিও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের হুকুম মেনে নিয়ে তাকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যান কিন্তু নিজের মন থেকে এ অনুভূতিটি তিনি কখনো মুছে ফেলতে পারেননি যে, যায়েদ একজন মুক্তিপ্রাপ্ত দাস, তাদের নিজোদের পরিবারের অনুগ্রহে লালিত এবং তিনি নিজে আরবের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও এ ধরনের একজন নিম্নমানের লোকের সাথে তার বিয়ে দেয়া হয়েছে। এ অনুভূতির কারণে দাম্পত্য জীবনে তিনি কখনো যায়েদকে নিজের সমকক্ষ ভাবেননি। এ কারণে উভয়ের মধ্যে তিক্ততা বেড়ে যেতে থাকে। এক বছরের কিছু বেশি দিন অতিবাহিত হতে না হতেই অবস্থা তালাক দেয়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
কেউ কেউ এ বাক্যটির উল্টা অর্থ গ্রহণ করেছেন এভাবে, নবী নিজেই যয়নবকে বিয়ে করতে ইচ্ছুক ছিলেন এবং তাঁর মন চচ্ছিল যায়েদ তাকে তালাক দিয়ে দিক। কিন্তু যখন যায়েদ এসে বললেন, আমি স্ত্রীকে তালাক দিতে চাই তখন তিনি নাউযুবিল্লাহ আসল কথা মনের মধ্যে চেপে রেখে কেবলমাত্র মুখেই তাকে নিষেধ করলেন। একথায় আল্লাহ বলছেন, তুমি মনের মধ্যে যে কথা লুকিয়ে রাখছিলে আল্লাহ তা প্রকাশ করতে চাচ্ছিলেন। অথচ আসল ব্যাপারটা এর সম্পূর্ণ উল্টো। যদি এ সূরার ১,২,৩,ও ৭ আয়াতের সাথে এ বাক্যটি মিলিয়ে পড় হয়, তাহলে পরিষ্কার অনুভূত হবে যে, যায়েদ ও তার স্ত্রীর মধ্যে যে সময় তিক্ততা বেড়ে যাচ্ছিল সে সময়ই আল্লাহ নবী কে এ মর্মে ইংগিত দিয়েছিলেন যে, যায়েদ যখন তার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেবে তখন তোমাকে তার তালাক প্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করতে হবে। কিন্তু যেহেতু আরবের সে সমাজে পালকপুত্রের তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করার অর্থ কী তা নবী জানতেন এবং তাও এমন এক অবস্থায় যখন মুষ্টিমেয় কিছু সংখ্যক মুসলমান ছাড়া বাকি সমগ্র আরব দেশ তাঁর বিরুদ্ধে ধনুকভাঙাপণ করে বসেছিল- এ অবস্থায় তিনি এ কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে ইতঃস্তত করছিলেন। এ কারণে যায়েদ যখন স্ত্রীকে তালাক দেবার সংকল্প প্রকাশ করেন তখন নবী করীম তাঁকে বলেন আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজের স্ত্রীকে তালাক দিয়ো না। তার উদ্দেশ্য ছিল, যায়েদ যদি তালাক না দেন, তাহলে তিনি এ বিপদের মুখোমুখী হওয়া থেকে বেঁচে যাবেন। নয়তো যায়েদ তালাক দিলেই তাকে হুকুম পালন করতে হবে এবং তারপর তাঁর বিরুদ্ধে খিস্তি-খেউড় ও অপপ্রচারের ভয়াবহ তুফান সৃষ্টি করা হবে। কিন্তু মহান আল্লাহ তাঁর নবীকে উচ্চ মনোবল, দৃঢ় সংকল্প ও আল্লাহর ফায়সালায় রাজি থাকার যে উচ্চমর্যাদার আসনে দেখতে চাচ্ছিলেন সে দৃষ্টিতে নবী করীমের ইচ্ছা করে যায়েদকে তালাক থেকে বিরত রাখ নিম্নমানের কাজ বিবেচিত হয়। তিনি আসলে ভাবছিলেন যে, এর ফলে তিনি এমন কাজ করা থেকে বেঁচে যাবেন যাতে তাঁর দুর্নামের আশঙ্কা ছিল। অথচ আল্লাহ একটি বড় উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তাঁকে দিয়ে সে কাজটি করাতে চাচ্ছিলেন। "তুমি লোক ভয় করছ অথচ আল্লাহকে ভয় করাই অধিকতর সংগত"- এ কথাগুলো পরিষ্কারভাবে এ বিষয়বস্তুর দিকে ইংগিত করছে।
ইমাম যয়নুল আবেদীন আলী ইবনে হোসাইন এ আয়াতের ব্যাখ্যায় একথাই বলেছেন। তিনি বলেন, "আল্লাহ নবী -কে এই মর্মে খবর দিয়েছিলেন যে, যয়নব আপনার স্ত্রী মধ্যে শামিল হতে যাচ্ছেন। কিন্তু যায়েদ যখন এসে তাঁর কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেন তখন তিনি বললেন, আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজের স্ত্রী ত্যাগ করো না। এ কথায় আল্লাহ বলেলেন, আমি তোমাকে পূর্বেই জানিয়ে দিয়েছিলাম, আমি তোমাকে যয়নবের সাথে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছি অথচ তুমি যায়েদের সাথে কথা বলার সময় আল্লাহ যেকথা প্রকাশ করতে চান তা গোপন করছিলে। (ইবনে জারীর ও ইবনে কাসীর ইবনে আবী হাতেমের বরাত দিয়ে)
আল্লামা আলুসীও তাফসীর রুহুল মা'আনীতে এর একই অর্থ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, এটি হচ্ছে শ্রেয়তর কাজ পরিত্যাগ করার জন্য ক্রোধ প্রকাশ। নবী নিশ্চুপ থাকতেন অথবা যায়েদকে বলতেন, তুমি যা চাও করতে পারো, এ অবস্থায় এটিই ছিল শ্রেয়তর। অভিব্যক্তি ক্রোধের সারৎসার হচ্ছে তুমি কেন যায়েদকে বললে তোমার স্ত্রীকে ত্যাগ করো না? অথচ আমি তোমাকে আগেই জানিয়ে দিয়েছি যে, যয়নব তোমার স্ত্রীদের মধ্যে শামিল হবে।"
যায়েদ যখন নিজের স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিলেন এবং তার ইদ্দত পুরা হয়ে গেলো। প্রয়োজন পূর্ণ করলো শব্দগুলো স্বতস্ফূর্তভাবে একথাই প্রকাশ করে যে, তাঁর কাছে যায়েদের আর কোনো প্রয়োজন থাকলো না। কেবলমাত্র তালাক দিলেই এ অবস্থাটির সৃষ্টি হয় না। কারণ স্বামীর আর কোনো আকর্ষণ থেকে গেলে ইদ্দতের মাঝখানে তাকে ফিরিয়ে নিতে পারে। আর তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর গর্ভবতী হওয়া বা না হওয়ার কথা জানতে পারার মধ্যেও স্বামীর প্রয়োজন থেকে যায়। তাই যখন ইদ্দত খতম হয়ে যায় একমাত্র তখনই তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর মধ্যে স্বামীর প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়।
আল্লাহ এ কাজ নবী-এর মাধ্যমে এমন একটি প্রয়োজন ও উদ্দেশ্য সম্পাদনের জন্য করিয়েছিলেন যা এ পদ্ধতিতে ছাড়া অন্য কোনোভাবে সম্পাদিত হতে পারতো না। আরবে পালক পুত্রদের সম্পর্কিত আত্মীয়তার ব্যাপারে যে সমস্ত ভ্রান্ত রসম-রেওয়াজের প্রচলন হয়ে গিয়েছিল আল্লাহর রাসূল নিজে অগ্রসর হয়ে না ভাঙলে সেগুলো ভেঙে ফেলার ও উচ্ছেদ করার আর কোনো পথ ছিল না। কাজেই আল্লাহ নিছক নবীর গৃহে আর একজন স্ত্রী বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে নয়; বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য পূর্ণ করার জন্য এ বিয়ে করিয়েছিলেন।
📄 পালক পুত্রের স্ত্রী প্রকৃত পুত্রবধূ নয়
مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّنَ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا.
অর্থ: মুহাম্মদ তোমাদের মধ্যকার কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লহর রাসূল এবং সর্বশেষ নবী। আল্লাহ সকল বিষয়ে সর্বজ্ঞ। (সূরা আহযাব: আয়াত-৪০)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: বিরোধীরা নবী -এর এ বিয়ের ব্যাপারে যেসব আপত্তি উঠাচ্ছিল এ একটি বাক্যের মাধ্যমে সেসবের মূলোচ্ছেদ করে দেয়া হয়েছে।
তাদের প্রথম অভিযোগ ছিল, তিনি নিজের পুত্রবধূকে বিয়ে করেন, অথচ তাঁর নিজের শরীয়াতেও পুত্রের স্ত্রী পিতার জন্য হারাম। এর জবাবে বলা হয়েছে, "মুহাম্মাদ তোমাদের পুরুষদের কারো পিতা নন।" অর্থাৎ যে ব্যক্তির তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করা হয়েছে তিনি মুহাম্মাদ -এর পুত্রই ছিলেন না, কাজেই তার তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করা হারাম হবে কেন? তোমরা নিজেরাই জানো মুহাম্মাদ-এর আদতে কোনো পুত্র সন্তানই নেই। তাদের দ্বিতীয় আপত্তি ছিল, ঠিক আছে, পালক পুত্র যদি আসল পুত্র না হয়ে থাকে তাহলেও তার তালাক প্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করা বড় জোর বৈধই হতে পারতো কিন্তু তাকে বিয়ে করার এমন কী প্রয়োজন ছিল? এর জবাবে বলা হয়েছে, "কিন্তু তিনি আল্লাহর রাসূল।" অর্থাৎ রাসূল হবার কারণে তাঁর ওপর এ দায়িত্ব ও কর্তব্য আরোপিত হয়েছিল যে তোমাদের রসম রেওআজ যে হালাল জিনিসটিকে অযথা হারাম গণ্য করে রেখেছে সে ব্যাপারে সকল রকমের স্বার্থপ্রীতির তিনি অবসান ঘটিয়ে দেবেন এবং তার হালাল হাবার ব্যাপারে কোনো প্রকার সন্দেহ-সংশয়ের অবকাশই রাখবে না।
আবার অতিরিক্ত তাকিদ সহকারে বলা হয়েছে, "এবং তিনি শেষ নবী।" অর্থাৎ যদি কোনো আইন ও সামাজিক সংস্কার তাঁর আমলে প্রবর্তিত না হয়ে থাকে তাহলে তাঁর পরে আগমনকারী নবী তার প্রবর্তন করতে পারতেন, কিন্তু তাঁর পরে আর কোনো রাসূল তো দূরের কথা কোনো নবীই আসবেন না। কাজেই তিনি নিজেই জাহেলিয়াতের এ রসমটির মূলোচ্ছেদ করে যাবেন, এটা আরো অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল।
এরপর আরো বেশি জোর দিয়ে বলা হয়েছে, "আল্লাহ প্রত্যেটি বিষয়ের জ্ঞান রাখেন।" অর্থাৎ আল্লাহ জানেন, এ সময় মুহাম্মাদ -এর মাধ্যমে জাহেলিয়াতের এ রসমটির মূলোচ্ছেদ করা কেন জরুরি ছিল এবং এমনটি না করলে কী মহা অনর্থ হতো। তিনি জানেন, এখন আর তাঁর পক্ষ থেকে কোনো নবী আসবেন না, কাজেই নিজের শেষ নবীর মাধ্যমে এখন যদি তিনি এ রসমটিকে উৎখাত না করেন তাহলে এমন দ্বিতীয় আর কোন সত্তাই নেই যিনি এটি ভঙ্গ করলে সারা দুনিয়ার মুসলমানদের মধ্য থেকে চিরকালেন জন্য এটি মূলোৎপাটিত হয়ে যাবে। পরবর্তী সংস্কারকগণ যদি এটি ভাঙেন, তাহলে তাদের মধ্য থেকে আরো কর্মও তাঁর ইন্তিকালের পরে এমন কোনো বিশ্বজনীন ও চিরন্তন কর্তৃত্বের অধিকারী হবে না যার ফলে প্রত্যেক দেশের প্রত্যেক যুগের লোকেরা তার অনুসরণ করতে থাকবে এবং তাদের মধ্য থেকে কারো ব্যক্তিত্ব ও তাঁর নিজের মধ্যে এমন কোনো পবিত্রতার বাহন হবে না যার ফলে তাঁর কোনো কাজ নিছক তাঁর সুন্নাত হবার কারণে মানুষের মন থেকে অপছন্দনীয়তার সকল প্রকার ধারণার মূলোচ্ছেদ করতে সক্ষম হবে।
📄 মুমিন-নারী-পুরুষকে কষ্ট দেয়ার পরিণতি
وَ الَّذِيْنَ يُؤْذُوْنَ الْمُؤْمِنِيْنَ وَ الْمُؤْمِنٰتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوْا فَقَدِ احْتَمَلُوْا بُهْتَانًا وَّ اِثْمًا مُّبِيْنًا.
অর্থ: আর অপরাধবিহীন মু'মিনাহ নারীকে যারা কষ্ট দেয় তারা তো বহন করে মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা। (সূরা আহযাব: আয়াত-৫৮)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: আলোচ্য আয়াতে কোনো মুসলিম পুরুষ অথবা নারীকে শরীয়তসম্মত কারণ ছাড়া তোহমত বা মিথ্যা অপবাদ দেয়ার চরম পরিণতি সম্পর্কে সাবধান করা হয়েছে। মদীনায় এক শ্রেণির লোকেরা মুসলিম নর-নারীর বিরুদ্ধে এ ধরনের অপবাদ আরোপ করতো যা প্রকৃতপক্ষে মুসলিম নর-নারীগণ করতেন না। তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে নানা কুৎসা ও অপবাদ রটাতো দেখা যায়। বিবৃত ও গর্হিত রুচীর মুনাফিক ও দুষ্কৃতকারীদের এমন ধরনের দুরভিসন্ধির কবলে পড়ে মুসলিম নারী-পুরুষ সর্বত্রই হেস্তনেস্ত হয়ে থাকে। আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাদের যাবতীয় ষড়যন্ত্র ও দুরভিসন্ধির জবাব দেন এবং তাদের অপবাদ খণ্ডন করেন। (ফী যিলালিল কুরআন)
মুনাফিকদের ইসলাম বিরোধী ষড়যন্ত্রের এ হচ্ছে এক জঘন্যতম আচরণ। মদীনার ঐসব মুনাফিকদের অন্তরে সার্বক্ষণিক জ্বালা এই ছিল যে, মুসলিম নারী-পুরুষের নৈতিক মান অন্য সকল জাতির তুলনায় ছিল মহান ও সুউচ্চ। আর এতে করে ইসলামের দাওয়াতের প্রভাব ছিল প্রচুর এবং এর ফলাফল প্রমাণিত হচ্ছিলো ব্যাপকতরভাবে। তারা হিংসার বশবর্তী হয়ে মুসলিম নারী-পুরুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটাতে আরম্ভ করলো। এভাবে মুসলিম জাহানের নৈতিক ও চারিত্রিক ভিত ভেঙে দিতে পারলেই ওদের কলিজা ঠাণ্ডা হতো। আয়েশা -এর বিরুদ্ধে প্রচারিত ইফকের ঘটনাটিও উদ্দেশ্যেই সাজানো হয়েছিল। এখানে তাদের এহেন মিথ্যা ষড়যন্ত্রকারীদের কঠোর শাস্তি ও করুণ পরিণতির কথা ঘোষণা করা হয়েছে। তাদের সাবধান করে দেয়া হয়েছে যে, এখনো যদি তারা এহেন অপকর্ম থেকে বিরত না হয়, তাহলে এর পরিণতি তারা স্বচক্ষে দেখতে হবে। (তাদাব্বুরে কুরআন)
মুনাফিকদের পক্ষ থেকে সকল মুসলমান ও রাসূলুল্লাহ দুই প্রকারের কষ্ট পেতেন। তাদের দ্বিবিধ নির্যাতনের একটি ছিল এই যে, মুসলমানদের দাসীরা কাজকর্মের জন্য বাইরে গেলে দুই প্রকৃতির মুনাফিকরা তাদেরকে উত্যক্ত করতো এবং কখনো কখনো দাসী সন্দেহে স্বাধীন নারীদেরকেও উত্যক্ত করতো। ফলে সাধারণ মুসলমানগণ এবং রাসূলুল্লাহ কষ্ট পেতেন। তাদের দ্বিতীয় নির্যাতন ছিল, তারা সর্বাদা মিথ্যা খবর রটনা করতো। যেমন তারা বলে বেড়াতো এক্ষণে অমুক শত্রুপক্ষ মদীনা আক্রমণ করবে এবং সকলকে নিশ্চিহ্ন করে ছাড়বে। প্রথম প্রকারের নির্যাতন থেকে স্বাধীন নারীদেরকে বাঁচানোর তাৎক্ষণিক ও সহজ ব্যবস্থা ছিল স্বাধীন নারীদের মধ্যে বিশেষ স্বাতন্ত্র ফুটিয়ে তোলা। কারণ মুনাফিকরা স্বাধীন নারীদের পারিবারিক প্রভাব প্রতিপত্তি ও শক্তি- সামর্থের কারণে তাদেরকে সচরাচর উত্যক্ত করার সাহস পেত না। পরিচয়ের অভাবেই এরূপ ঘটনা সংঘটিত হতো। তাই স্বাধীন নারীদের পরিচয় ফুটিয়ে তোলার প্রয়োজন ছিল, যাতে তারা অতি সহজে দুষ্টদের কবল থেকে নিরাপদ হয়ে যায়।
অপরদিকে শরীয়ত স্বাধীন নারী ও দাসীদের মধ্যে প্রয়োজন বশত একটি পার্থক্যও রেখেছে। স্বাধীন নারীরা তাদের মুহরিম ব্যক্তির সামনে যতটুকু পর্দা করে, দাসীদের জন্য ঘরের বাইরেও ততটুকু পর্দা রাখা হয়েছে। কারণ, প্রভুর কাজকর্ম করাই দাসীর কর্তব্য, এজন্যে তাকে প্রয়োজনে বার বার বাইরেও যেতে হয়। এমতাবস্থায় মুখাবয়ব ও হাত আবৃত রাখা কঠিন ব্যাপার। স্বাধীন নারীরা বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হলেও তা বার বার হয় না। কাজেই পূর্ণ পর্দা পালন করা, তাদের জন্য কঠিন নয়। তাই স্বাধীন নারীদের জন্য নির্দেশ রয়েছে তারা যেন লম্বা চাদর মাথার উপর থেকে মুখাবয়বের সামনে ঝুলিয়ে নেয়। যাতে পর-পুরুষের দৃষ্টিতে মুখাবয়ব না পড়ে। বলা হয়েছে
يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيُبِهِنَّ তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। (মাআরেফুল কুরআন)