📘 আল কুরআনে নারীদের ২৫ সূরা > 📄 নির্দিষ্ট গুণ-বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন নারী-পুরুষের জন্য রয়েছে আল্লাহর ক্ষমা ও পুরস্কার

📄 নির্দিষ্ট গুণ-বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন নারী-পুরুষের জন্য রয়েছে আল্লাহর ক্ষমা ও পুরস্কার


إِنَّ الْمُسلمِينَ وَالْمُسْلِمَتِ وَ الْمُؤْمِنِينَ وَ الْمُؤْمِنَتِ وَ الْقُنِتِينَ وَ الْقُنِتُتِ وَالصُّدِقِينَ وَالصُّدِقْتِ وَالصُّبِرِينَ وَالصُّبِرَاتِ وَالْخَشِعِينَ وَ الْخُشِعتِ وَ الْمُتَصَدِّقِينَ وَالْمُتَصَدِّقْتِ وَ الصَّالِمِينَ وَ الصَّمْتِ وَ الْحَفِظِينَ فُرُوجَهُمْ وَ الْحَفِظَتِ وَ الذَّكِرِينَ اللَّهَ كَثِيرًا وَالذَّكِرَتِ أَعَدَّ اللهُ لَهُمْ مَّغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا.
অর্থ: নিশ্চয়ই মুসলিম পুরুষ ও মুসলিম নারী, মু'মিন পুরুষ ও মু'মিন নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, বিনয়ী পুরুষ ও বিনয়ী নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, রোযাদার পুরুষ রোযাদার নারী, স্বীয় লজ্জাস্থান হিফাযতকারী পুরুষ ও স্বীয় লজ্জাস্থান হিফাযতকারিণী নারী এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও অধিক স্মরণকারিণী নারী- এদের জন্য আল্লাহ প্রস্তুত রেখেছেন ক্ষমা ও বিরাট প্রতিদান। (সূরা আহযাব: আয়াত-৩৫)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: আদম সন্তান পুরুষ ও নারী-দুটো শ্রেণিতে বিভক্ত। মানব বংশ সংরক্ষণ ও বিস্তারের জন্য এতদোভয়ের সৃষ্টি, উভয়ের দৈহিক মানসিক গঠন পার্থক্য এবং তদানুযায়ী উভয়ের মধ্যে কর্মবণ্টন আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সৃষ্টি রহস্যের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিকবিশেষ। আল্লাহ তায়ালার এ বিধানের পরিবর্তন-পদক্ষেপ তাঁর সৃষ্টি রহস্যের স্বাভাবিক নীতি বা প্রাকৃতিক বিধান ধ্বংস করারই নামান্তর। এ জাতীয় পদক্ষেপ মানব জাতির জন্য দীর্ঘ মেয়াদে বা পরিণামের দিক থেকে কখনো কোনো কল্যাণ বয়ে আনতে পারেনি- আর তা সম্ভব নয়। কিন্তু তবুও বিভ্রান্ত মানব বংশের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এমনি কর্মকাণ্ডের ব্যর্থ প্রচেষ্টায় সদাতৎপর। অথচ ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণের কোনো মনোভাবই তাদের মধ্যে জাগ্রত হতে দেখা যায় না। ফলে এরা গোটা মানব জাতিকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়ে চলছে অহরহ।
নিজেদের চিন্তা-চেতনা ও কর্মকাণ্ডের যথার্থ মূল্যায়ন ও ফলপ্রসূ পর্যালোচনা করে প্রকৃত কল্যাণের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কোনো মনোভাবের উদ্রেক হচ্ছে না তাদের। ফলে তারা ধাবিত হচ্ছে মানব জীবনের সার্বিক বিপর্যয়ের পথে; আর রুদ্ধ করে দিচ্ছে মানজাতির প্রকৃত কল্যাণের রাজতোরণ।
আলোচ্য আয়াতসমূহে নারীদের সান্তনা ও স্বস্তি প্রদান এবং তাদের আমল গ্রহণযোগ্য হওয়ার শর্তাবলি সংশ্লিষ্ট বিশেষ আলোচনা রয়েছে। বলা হয়েছে আল্লাহ তায়ালা সমীপে মান-মর্যাদা ও তাঁর নৈকট্য লাভের ভিত্তি হলো সৎকার্যাবলি, আল্লাহর আনুগত্য ও বশ্যতা স্বীকার করা। এ ক্ষেত্রে পুরুষ হওয়া বা নারী হওয়ার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। (মাআরেফুল কুরআন)
এসব আয়াতে নারীদের স্মরণ করানো হয়েছে যে, তাদের মর্যাদা বৃদ্ধির ব্যাপারে পুরুষদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এবং ইসলামের নির্দেশসমূহ পালন করার মাধ্যমে নারীদেরকে পুরুষদের সাথে সমানভাবে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে যেতে হবে। আল্লাহ তায়ালার সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধির ব্যাপারে পুরুষ ও নারীর সকল অধিকার ও সুযোগ রয়েছে।
মুসলিম জাতি সত্তার বিশাল প্রাসাদটি গড়ে উঠার মত ভিত্তির জন্য যেসব গুণাবলির প্রয়োজন, এ আয়াতে ওসব গুণাবলির বহু মূল্যবান নির্দেশিকা বর্ণিত হয়েছে। আর সেসব গুণাবলি হলো, ইসলাম, ঈমান, আনুগত, সত্যবাদীতা, সবর, বিনয়-নম্রতা, দানশীলতা, সিয়াম সাধনা, চরিত্রের হেফাযত এবং আল্লাহ তায়ালার বেশি বেশি স্মরণ।
এসব কটি গুণই আল্লাহতে আত্মসর্পণকারী মুসলিম জাতি সত্তার বিশাল প্রাসাদের এক একটি মূল্যবান ইট। পুরুষ নারী নির্বিশেষে উক্ত গুণাবলির অধিকারী সকল মুসলিমের জনই রয়েছে আল্লাহর ক্ষমা ও মহাপ্রতিদান। একটি সুন্দর ও শান্তিময় সমাজ বিনির্মাণে এসব গুণাবলিতে সুসজ্জিত সকল পুরুষ-নারীর স্ব স্ব ভূমিকা পালন উন্নতির সোপানরূপে কার্যকরী হতে পারে।
আয়াতে উল্লিখিত গুণাবলি সম্পর্কিত প্রতিটি পরিভাষাই আজকের মুসলিম সমাজে অহরহ ব্যবহৃত হতে দেখা গেলেও এসবের যথার্থরূপ ও এসবের প্রকৃত ধারণা না থাকায় মুসলিম নর-নারীর মাঝে এসবের প্রভাব পড়তে দেখা যায় না-ফলে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল লাভও সম্ভব হচ্ছে না। সুতরাং আজকের মুসলিম উম্মার জন্য বর্ণিত গুণ-বৈশিষ্ট্যসমূহের পরিচিতিমূলক আলোচনা দরকার বলে মনে করি।
মুসলিম: অর্থাৎ যারা নিজেদের জন্য ইসলামকে জীবন বিধান হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে এবং এখন জীবন যাপনের ক্ষেত্রে এ বিধানের অনুসারী হবার ব্যাপারে স্থির সিদ্ধান্ত করে নিয়েছে। অন্য কথায়, যাদের মধ্যে ইসলাম প্রদত্ত চিন্তাপদ্ধতি ও জীবনধারার বিরুদ্ধে কোনো রকমের বিরোধিতা ও প্রতিবন্ধকতার লেশমাত্র নেই; বরং তারা তার পরিপূর্ণ আনুগত্য ও অনুসরণের পথ অবলম্বন করেছে।
ঈমান ও আনুগত্য: অর্থাৎ যাদের এ আনুগত্য নিছক বাহ্যিক নয়, গত্যন্তর নেই, মন চায় না তবুও করছি, এমন নয়; বরং মন থেকেই তারা ইসলামের নেতৃত্বকে সত্য বলে মেনে নিয়েছে। চিন্তা ও কর্মের যে পথ কুরআন ও মুহাম্মাদ ﷺ দেখিয়েছেন সেটিই সোজা ও সঠিক পথ এবং তারই অনুসরণের মধ্যে আমাদের সাফল্য নিহিত, এটিই তাদের ঈমান। যে জিনিসকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভুল বলে দিয়েছেন তাদের নিজেদের মতেও সেটি নিশ্চিতই ভুল। আর যাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ সত্য বলে দিয়েছেন তাদের নিজেদের মন-মস্তিস্কও তাকেই সত্য বলে নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করে। তাদের চিন্তা ও মানসিক অবস্থা এমন নয় যে, কুরআন ও সুন্নাত থেকে যে হুকুম প্রমাণিত হয় তাকে তারা অসংগত মনে করতে পারে এবং এ চিন্তার বেড়াজালে এমনভাবে আটকে যেতে পারে যে, কোনো প্রকারে তাকে পরিবর্তিত করে নিজেদের মন মাফিক করে নেবে। অথবা দুনিয়ার প্রচলিত পদ্ধতি অনুসারে তাকে ঢালাইও করে নেবে আবার এ অভিযোগও নিজেদের মাথায় নেবে না যে, আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের হুকুম কাটছাঁট করে নিয়েছি। হাদীসে নবী ﷺ ঈমানের সঠিক অবস্থা এভাবে বর্ণনা করেছেন,
"ذَاقَ طَعَمَ الْإِيْمَانِ مَنْ رَضِيَ بِاللهِ رَبَّا وَبِا الْإِسْلَامِ دِينًا وَبِمُحَمَّدٍ نَبِيًّا
করেছে সেই ব্যক্তি যে আল্লাহকে তার রব, ইসলামকে তার দীন এবং মুহাম্মাদকে তার নবী বলে মেনে নিতে রাজি হয়ে গেছে।" (মুসলিম: ২৬২৩)
অন্য একটি হাদীসে তিনি এর ব্যাখ্যা এভাবে করেছেন, "তোমাদের কোনো ব্যক্তি মু'মিন হয় না যতক্ষণ না তার প্রবৃত্তি আমি যা এনেছি তার অনুগত হয়ে যায়।"(শারহুস সুন্নাহ)
সত্যবাদিতা: অর্থাৎ নিজেদের কথায় যেমন সত্য তেমনি ব্যবহারিক কার্যকলাপেও সত্য। মিথ্যা, প্রতারণা, অসৎ উদ্দেশ্য, ঠগবৃত্তি ও ছলনা তাদের জীবনে পাওয়া যায় না। তাদের বিবেক যা সত্য বলে জানে মুখে তারা তাই উচ্চারণ করে। তাদের মতে যে কাজ ঈমানদারীর সাথে সত্য ও সততা অনুযায়ী হয় সে কাজই তারা করে। যার সাথেই তারা কোনো কাজ করে বিশ্বস্ততা ও ঈমানদারীর সাথে করে।
সবর বা ধৈর্য: অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশিত সোজা সত্য পথে চলার এবং আল্লাহর দীনকে প্রতিষ্ঠিত করার পথে যে বাধাই আসে, যে বিপদই দেখা দেয়, যে কষ্টই সহ্য করতে হয় এবং যে সমস্ত ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়, দৃঢ়ভাবে তারা তার মোকাবেলা করে। কোনো প্রকার ভীতি, লোভ ও প্রবৃত্তির কামনার কোনো দাবী তাদেরকে সোজা পথ থেকে হটিয়ে দিতে সক্ষম হয় না।
বিনয়-নম্রতা: অর্থাৎ তারা দম্ভ, অহংকার ও আত্মম্ভরীতামুক্ত। তারা এ সত্যের পূর্ণ সচেতন অনুভূতি রাখে যে, তারা বান্দা এবং বন্দেগীর বাইরে তাদের কোনো মর্যাদা নেই। তাই তাদের দেহ ও অন্তরাত্মা উভয়ই আল্লাহর সামনে নত থাকে। আল্লাহ ভীতি তাদের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে থাকে। আত্মঅহমিকায় মত্ত আল্লাহভীতি শূন্য লোকদের থেকে যে ধরনের মনোভাব প্রকাশিত হয় এমন কোনো মনোভাব কখনো তাদের থেকে প্রকাশিত হয় না। আয়াতের বিন্যাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করলে জানা যায়, এখানে এ সাধারণ আল্লাহভীতি মূলক মনোভাবের সাথে বিশেষ ভাবে "খুশু" বা বিনত হওয়া শব্দ ব্যবহার করায় এর অর্থ হয় নামায। কারণ এরপরই সাদকাহ ও রোযার কথা বলা হয়েছে।
দানশীলতা: এর অর্থ কেবল ফরয যাকাত আদায় করাই নয়; বরং সাধারণ দান-খয়রাতও এর অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ তারা আল্লাহর পথে উন্মুক্ত হৃদয়ে নিজেদের অর্থ ব্যয় করে। আল্লাহর বান্দাদের সাহায্য করার ব্যাপারে নিজেদের সামর্থ অনুযায়ী প্রচেষ্টা চালাতে তারা কসুর করে না। কোনো এতিম, রুগ্ন, বিপদাপন্ন, দুর্বল, অক্ষম, গরীব ও অভাবী ব্যক্তি তাদের লোকালয়ে তাদের সাহায্য থেকে বঞ্চিত থাকে না। আর আল্লাহর দীনকে সুউচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রয়োজন হলে তার জন্য অর্থ-সম্পদ ব্যয় করতে তারা কখনো কার্পণ্য করে না।
সাওম: ফরয ও নফল উভয় ধরনের রোযা এর অন্তর্ভুক্ত হবে। রোযাদার বা সিয়াম সাধনাকারী নারী-পুরুষকে তার সিয়াম পালন আত্ম নিয়ন্ত্রণের শক্তি পয়দা করে এবং জীবনের বিভিন্ন দিক ও বিভাগে শান্তি-শৃংখলা ফিরিয়ে এনে দেয়। সে বা তারা সিয়ামের মাধ্যমে বৈধ ভোগবস্তু পরিত্যাগ করার সেই কষ্টসাধ্য কাজটির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে নিতে পারে। এ মহান গুণটির প্রধানতম তাৎপর্য হচ্ছে মানব দেহের চাহিদার উপর মনের চাহিদার নিয়ন্ত্রণ লাভ, জীবনের প্রধান প্রধান চাহিদাকে নিজের আয়ত্বে আনার শক্তি অর্জন, ইচ্ছা শক্তিকে বিজয়ী ও প্রতিষ্ঠিত করা এবং মানবতাকে পাশববৃত্তির উপর বিজয়ী করা। মানুষের দেহ ও রূহের সমন্বিত শক্তি সিয়াম পালনের মাধ্যমেই অর্জিত হয়। সিয়াম পালন আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। ফলেমানুষের প্রধান অংশ বা উপাদান 'রূহ' বিশুদ্ধতা লাভে ধন্য হতে পারে। এ ব্যাপারেও নারী-পুরুষের মাঝে কোনো তারতম্য নেই।
লজ্জাস্থানের হেফাযত: এর দু'টি অর্থ হয়। একটি হচ্ছে, তারা যিনা থেকে দূরে থাকে এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে, তারা উলংগতাকে এড়িয়ে চলে। এই সাথে এটাও বুঝে নিতে হবে যে, কেবলমাত্র মানুষের পোশাক না পরে উলংগ হয়ে থাকাকে উলংগতা বলে না; বরং এমন ধরনের পোশাক পরাও উলংগতার অন্তর্ভুক্ত, যা এতটা সূক্ষ্ম হয় যে, তার মধ্য দিয়ে শরীর দেখা যায় অথবা এমন চোস্ত ও আটসাঁট হয় যার ফলে তার সাহায্যে দৈহিক কাঠামো ও দেহের উঁচু-নীচু অংগ সবই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আল্লাহকে অধিক স্মরণ: আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করার অর্থ হচ্ছে, জীবনের সকল কাজেকর্মে সমস্ত ব্যাপারেই সবসময় যেন মানুষের মুখে আল্লাহর নাম এসে যায়। মানুষের মনে আল্লাহর চিন্তা পুরোপুরি ও সর্বব্যাপী আসন গেঁড়ে না বসা পর্যন্ত এ ধরনের অবস্থা তার মধ্যে সৃষ্টি হয় না। মানুষের চেতনার জগত অতিক্রম করে যখন অচেতন মনের গভীরদেশেও এ চিন্তা বিস্তৃত হয়ে যায় তখনই তার অবস্থা এমন হয় যে, সে কোনো কথা বললে বা কোনো কাজ করলে তার মধ্যে আল্লাহর নাম অবশ্যই এসে যাবে। আহার করলে "বিসমিল্লাহ" বলে শুরু করবে। আহার শেষ করবে 'আলহামদুলিল্লাহ' বলে। আল্লাহকে স্মরণ করে ঘুমাবে এবং ঘুম ভাঙবে আল্লাহর নাম নিতে নিতে। কথাবার্তায় তার মুখে বারবার বিসমিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, ইনশাআল্লাহ, মাশাআল্লাহ এবং এ ধরনের অন্য শব্দ ও বাক্য বারবার উচ্চারিত হতে থাকবে। প্রত্যেক ব্যাপারে বারবার সে আল্লাহর সাহায্য চাইবে। প্রত্যেকটি নিয়ামত লাভ করার পর আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। প্রত্যেকটি বিপদ আসার পর তার রহমতের প্রত্যাশী হবে। প্রত্যেক সংকটে তার দিকে মুখ ফিরাবে। কোনো খারাপ কাজের সুযোগ এল তাঁকে ভয় করবে। কোনো ভুল বা অপরাধ করলে তাঁর কাছে মাফ চাইবে। প্রত্যেকটি প্রয়োজন ও অভাবের মুহূর্তে তাঁর কাছে প্রার্থনা করবে। মোটকথা উঠতে বসতে এবং দুনিয়ার সমস্ত কাজকর্মে আল্লাহর স্মরণ হয়ে থাকবে তার কণ্ঠলগ্ন এ জিনিসটি আসলে ইসলামী জীবনের প্রাণ। অন্য যে কোনো ইবাদাতের জন্য কোনো না কোনো সময় নির্ধারিত থাকে এবং তখনই তা পালন করা হয়ে থাকে এবং তা পালন করার পর মানুষ তা থেকে আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু এ ইবাদাতটি সর্বক্ষণ জারী থাকে এবং এটিই আল্লাহ ও তাঁর বন্দেগীর সাথে মানুষের জীবনের স্থায়ী সম্পর্ক জুড়ে রাখে। মানুষের মন কেবলমাত্র এসব বিশেষ কাজের সময়েই নয়; বরং সর্বক্ষণ আল্লাহর প্রতি আকৃষ্ট এবং তার কণ্ঠ সর্বক্ষণ তাঁর স্মরণে সিক্ত থাকলেই এরি মাধ্যমেই ইবাদাত ও অন্যান্য দীনী কাজে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়। মানুষের মধ্যে যদি এ অবস্থার সৃষ্টি হয়, তাহলে তার জীবনে ইবাদাত ও দীনী কাজ ঠিক তেমনিভাবে বুদ্ধি ও বিকাশ লাভ করে যেমন একটি চারাগাছকে তার প্রকৃতির অনুকূল আবহাওয়ায় রোপণ করা হলে তা বেড়ে উঠে। পক্ষান্তরে যে জীবন আল্লাহর এ সার্বক্ষণিক স্মরণ শূন্য থাকে সেখানে নিছক বিশেষ সময়ে অথবা বিশেষ সুযোগে অনুষ্ঠিত ইবাদাত ও দীনী কাজের দৃষ্টান্ত এমন একটি চারাগাছের মতো যাকে তার প্রকৃতির প্রতিকূল আবহাওয়ায় রোপণ করা হয় এবং নিছক বাগানের মালির বিশেষ তত্ত্বাবধানের কারণ এ বেঁচে থাকে। একথাটিই নবী একটি হাদীসে এভাবে বর্ণনা করেছেন।
"মু'আয ইবনে আনাস জুহানী বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল! জিহাদকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রতিদান লাভ করবে কে? জবাব দিলেন, যে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহকে স্মরণ করবে। তিনি নিবেদন করেন, রোযা পালনকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রতিদান পাবে কে? জবাব দিলেন, যে তাদের মধ্যে আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি স্মরণ করবে। আবার তিনি একই ভাবে নামায, যাকাত, হজ্জ ও সাদকা আদায়কারীদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। জাবাবে নবী করীম বলেন, "যে আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি স্মরণ করে।" (মুসনাদে আহমাদ)
আল্লাহর দরবারে কোন গুণাবলিকে আসল মূল্য ও মর্যাদা দেয়া হয় এ আয়াতে তা বলে দেয়া হয়েছে। এগুলো ইসলামের মৌলিক মূল্যবোধ। একটি বাক্যে নারীর মধ্যে কোনো ফারাক নেই। কাজের ভিত্তিতে নিঃসন্দেহে উভয় দলের কর্ম ক্ষেত্রে আলাদা। পুরুষদের জীবনের কিছু বিভাগে কাজ করতে হয়। নারীদের কাজ করতে হয় ভিন্ন কিছু বিভাগে। কিন্তু এ গুণাবলি যদি উভয়ের মধ্যে সমান থাকে তাহলে আল্লাহর কাছে উভয়ের মর্যাদা সমান এবং উভয়ের প্রতিদানও সমান হবে। একজন রান্নাঘর ও গৃহস্থালী সামলালো এবং অন্যজন খেলাফতের মসনদে বসে শরীয়তের বিধান জারী করলো আবার একজন গৃহে সন্তান লালন-পালন করলো এবং অন্যজন যুদ্ধের ময়দানে গিয়ে আল্লাহ তাঁর দীনের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করলেন এ জন্যে উভয়ের মর্যাদা ও প্রতিদানে কোনো পার্থক্য দেখা দেবে না।

📘 আল কুরআনে নারীদের ২৫ সূরা > 📄 আল্লাহ ও রাসূলের পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত এলে তা নারী পুরুষের জন্য অবশ্য পালনীয়

📄 আল্লাহ ও রাসূলের পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত এলে তা নারী পুরুষের জন্য অবশ্য পালনীয়


وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَلًا مُبِينًا.
অর্থ: কোনো মু'মিন পুরুষ কিংবা মু'মিন নারীর জন্য এ অবকাশ নেই যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যখন কোনো কাজের নির্দেশ দেন, তখন সে কাজে তাদের কোনো নিজস্ব সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে। কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করলে সে তো প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় নিপতিত হয়। (সূরা আহযাব: আয়াত-৩৬)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: যয়নবের সাথে নবী-এর বিবাহ প্রসঙ্গে যে আয়াত নাযিল হয়েছিল এখান থেকেই তা শুরু হচ্ছে।
ইবনে আব্বাস, মুজাহিদ, কাতাদাহ, ইকরামাহ ও মুকাতিল ইবনে হাইয়ান বলেন, এ আয়াত তখন নাযিল হয়েছিল যখন নবী যায়েদের জন্য যয়নবের সাথে বিয়ের পয়গাম দিয়েছিলেন এবং যয়নব ও তার আত্মীয়রা তা নামঞ্জুর করেছিলেন। ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেছেন, নবী যখন এ পয়গাম দেন তখন যয়নব বলেন, "আমি অভিজাত কুরাইশ পরিবারের মেয়ে, তাই আমি তাকে নিজের জন্য পছন্দ করি না।" তাঁর ভাই আবদুল্লাহ ইবনে জাহশও এ ধরনের অসম্মতি প্রকাশ করেছিলেন এর কারণ ছিল এই যে, যায়েদ নবী-এর আযাদ করা গোলাম ছিলেন এবং যয়নব ছিলেন তাঁর ফুফু (উমাইমাহ বিনতে আবদুল মুত্তালিব)-এর কন্যা। এত উঁচু ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে, তাও আবার যাতা পরিবার নয়, নবীর নিজের ফুফাত বোন এবং তার বিয়ের পয়গাম তিনি দিচ্ছিলেন নিজের আযাদ করা গোলামের সাথে একথা তাদের কাছে অত্যন্ত খারাপ লাগছিল। এজন্য এ আয়াত নাযিল হয়। এ আয়াত শুনতেই যয়নব ও তাঁর পরিবারের সবাই নির্দ্বিধায় আনুগত্যের শির নত করেন। এরপর নবী তাদের বিয়ে পড়ান। তিনি নিজে যায়েদের পক্ষ থেকে ১০ দীনার ও ৬০ দিরহাম মোহরানা আদায় করেন, কনের কাপড় চোপড় দেন এবং কিছু খাবার দাবারের জিনিসপত্র পাঠান।
এ আয়াত যদিও একটি বিশেষ সময়ে নাযিল হয় কিন্তু এর মধ্যে যে হুকুম বর্ণনা করা হয় তা ইসলামী আইনের একটি বড় মূলনীতি এবং সমগ্র ইসলামী জীবন ব্যবস্থার ওপর এটি প্রযুক্ত হয়। এর দৃষ্টিতে যে বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে কোন হুকুম প্রমাণিত হয় সে বিষয়ে কোনো মুসলিম ব্যক্তি, জাতি, প্রতিষ্ঠান, আদালত, পার্লামেন্ট বা রাষ্ট্রের নিজের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা ব্যবহার করার কোনো অধিকার নেই। মুসলমান হবার অর্থই হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সামনে নিজের স্বাধীন ইখতিয়ার বিসর্জন দেয়া। কোনো ব্যক্তি বা জাতি মুসলমানও হবে আবার নিজের জন্য এ ইখতিয়ারটিও সংরক্ষিত রাখবে। এ দু'টি বিষয় পরস্পর বিরোধী-এ দুটি কাজ এক সাথে হতে পারে না। কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি এ দু'টি দৃষ্টিভংগীকে একত্র করার ধারণা করতে পারে না। যে ব্যক্তি মুসলমান হিসেবে বেঁচে থাকতে চায় তাকে অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সামনে আনুগত্যের শির নত করতে হবে। আর যে মুসলমান নয়। যদি সে না মানে তাহলে নিজেকে মুসলমান বলে যত জোরে গলা ফটিয়ে চিৎকার করুক না কেন আল্লাহ ও বান্দা উভয়ের দৃষ্টিতে সে মুনাফিকই গণ্য হবে।

📘 আল কুরআনে নারীদের ২৫ সূরা > 📄 রাসূল কর্তৃক জায়নককে বিবাহের মাধ্যমে সামাজিক কুসংস্কারের অপনোদন

📄 রাসূল কর্তৃক জায়নককে বিবাহের মাধ্যমে সামাজিক কুসংস্কারের অপনোদন


وَإِذْ تَقُولُ لِلَّذِي أَنْعَمَ اللهُ عَلَيْهِ وَاَنْعَمْتَ عَلَيْهِ أَمْسِكَ عَلَيْكَ زَوْجَكَ وَاتَّقِ اللهَ وَتُخْفِي فِي نَفْسِكَ مَا اللَّهُ مُبْدِيْهِ وَ تَخْشَى النَّاسَ وَاللَّهُ أَحَقُّ أَنْ تَخْشُهُ فَلَمَّا قَضَى زَيْدٌ مِنْهَا وَطَرًا زَوَّجُنُكَهَا لِكَى لَا يَكُونَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ حَرَجٌ فِي أَزْوَاجِ أَدْعِيَائِهِمْ إِذَا قَضَوْا مِنْهُنَّ وَطَرًا وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ مَفْعُولًا.
অর্থ: আর স্মরণ করুন, আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন এবং আপনিও যাকে অনুগ্রহ করেছেন, আপনি তাকে বলেছিলেন, "তুমি তোমার স্ত্রীকে স্বীয় বিবাহাধীনে থাকতে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর।" লোকের ভয়ে আপনি আপনার অন্তরে এমন বিষয় গোপন করেছিলেন যা আল্লাহ প্রকাশ করে দিবেন, অথচ আল্লাহকেই ভয় করা আপনার পক্ষে অধিকতর উচিত ছিল। তারপর যায়িদ যখন জায়নাবের সাথে বিবাহ সম্পর্ক ছিন্ন করল, তখন আমি তাকে আপনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলাম। যাতে মু'মিনদের কোনো সমস্যা না থাকে। আল্লাহর নির্দেশ কার্যকরী হয়েই থাকে। (আহযাব: আয়াত-৩৭)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: এখান থেকে ৪৮ আয়াত পর্যন্তকার বিষয়বস্তু এমন সময় নাযিল হয় যখন নবী যয়নবকে বিয়ে করে ফেলেছিলেন এবং একে ভিত্তি করে মুনাফিক, ইহুদী ও মুশরিকরা রাসূলের বিরুদ্ধে তুমূল অপপ্রচার শুরু করে দিয়েছিল। এ আয়াত গুলো অধ্যায়ন করার সময় একটি কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে। যে শত্রুরা নবী-এর বিরুদ্ধে ইচ্ছা করেই দুর্নাম রটাবার এবং নিজেদের অন্তরজ্বালা মিটাবার জন্য মিথ্যা, অপবাদ, গালমন্দ ও নিন্দাবাদের অভিযান চালাচ্ছিল তাদেরকে বুঝাবার উদ্দেশ্যে এগুলো বলা হয়নি; বরং এর আসল উদ্দেশ্য ছিল তাদের এ অভিযানের প্রভাব থেকে মুসলমানদেরকে রক্ষ করা এবং ছড়ানো সন্দেহ-সংশয় থেকে তাদেরকে সংরক্ষিত রাখা। একথা স্পষ্ট, আল্লাহর কালাম অস্বীকারকারীদেরকে নিশ্চিন্ত করতে পারতো না। এ কালাম যদি কাউকে নিশ্চিন্ত করতে পারতো, তাহলে তারা হচ্ছে এমন সব লোক যারা একে আল্লাহর কালাম বলে জানতো এবং সে হিসেবে একে মেনে চলতো। শত্রুদের আপত্তি কোনোভাবে তাদের মনেও সন্দেহ-সংশয় এবং তাদের মস্তিষ্কেরও জটিলতা ও সংকট সৃষ্টিতে সক্ষম না হয়ে পড়ে, সম্ভাব্য সকল সন্দেহ নিরসন করেছেন।
অন্যদিকে মুসলমানদেরকেও এবং স্বয়ং নবী কেও এ ধরনের অবস্থায় তাদের ভূমিকা কী হওয়া উচিত তা জানিয়ে দিয়েছেন।
এটা সে সময়ের কথা যখন যায়েদ ও যয়নবের সম্পর্ক তিক্ততার চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল এবং তিনি বারবার অভিযোগ করার পর শেষ পর্যন্ত নবী এর কাছে নিবেদন করেন, আমি তাকে তালাক দিতে চাই। যয়নব যদিও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের হুকুম মেনে নিয়ে তাকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যান কিন্তু নিজের মন থেকে এ অনুভূতিটি তিনি কখনো মুছে ফেলতে পারেননি যে, যায়েদ একজন মুক্তিপ্রাপ্ত দাস, তাদের নিজোদের পরিবারের অনুগ্রহে লালিত এবং তিনি নিজে আরবের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও এ ধরনের একজন নিম্নমানের লোকের সাথে তার বিয়ে দেয়া হয়েছে। এ অনুভূতির কারণে দাম্পত্য জীবনে তিনি কখনো যায়েদকে নিজের সমকক্ষ ভাবেননি। এ কারণে উভয়ের মধ্যে তিক্ততা বেড়ে যেতে থাকে। এক বছরের কিছু বেশি দিন অতিবাহিত হতে না হতেই অবস্থা তালাক দেয়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
কেউ কেউ এ বাক্যটির উল্টা অর্থ গ্রহণ করেছেন এভাবে, নবী নিজেই যয়নবকে বিয়ে করতে ইচ্ছুক ছিলেন এবং তাঁর মন চচ্ছিল যায়েদ তাকে তালাক দিয়ে দিক। কিন্তু যখন যায়েদ এসে বললেন, আমি স্ত্রীকে তালাক দিতে চাই তখন তিনি নাউযুবিল্লাহ আসল কথা মনের মধ্যে চেপে রেখে কেবলমাত্র মুখেই তাকে নিষেধ করলেন। একথায় আল্লাহ বলছেন, তুমি মনের মধ্যে যে কথা লুকিয়ে রাখছিলে আল্লাহ তা প্রকাশ করতে চাচ্ছিলেন। অথচ আসল ব্যাপারটা এর সম্পূর্ণ উল্টো। যদি এ সূরার ১,২,৩,ও ৭ আয়াতের সাথে এ বাক্যটি মিলিয়ে পড় হয়, তাহলে পরিষ্কার অনুভূত হবে যে, যায়েদ ও তার স্ত্রীর মধ্যে যে সময় তিক্ততা বেড়ে যাচ্ছিল সে সময়ই আল্লাহ নবী কে এ মর্মে ইংগিত দিয়েছিলেন যে, যায়েদ যখন তার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেবে তখন তোমাকে তার তালাক প্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করতে হবে। কিন্তু যেহেতু আরবের সে সমাজে পালকপুত্রের তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করার অর্থ কী তা নবী জানতেন এবং তাও এমন এক অবস্থায় যখন মুষ্টিমেয় কিছু সংখ্যক মুসলমান ছাড়া বাকি সমগ্র আরব দেশ তাঁর বিরুদ্ধে ধনুকভাঙাপণ করে বসেছিল- এ অবস্থায় তিনি এ কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে ইতঃস্তত করছিলেন। এ কারণে যায়েদ যখন স্ত্রীকে তালাক দেবার সংকল্প প্রকাশ করেন তখন নবী করীম তাঁকে বলেন আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজের স্ত্রীকে তালাক দিয়ো না। তার উদ্দেশ্য ছিল, যায়েদ যদি তালাক না দেন, তাহলে তিনি এ বিপদের মুখোমুখী হওয়া থেকে বেঁচে যাবেন। নয়তো যায়েদ তালাক দিলেই তাকে হুকুম পালন করতে হবে এবং তারপর তাঁর বিরুদ্ধে খিস্তি-খেউড় ও অপপ্রচারের ভয়াবহ তুফান সৃষ্টি করা হবে। কিন্তু মহান আল্লাহ তাঁর নবীকে উচ্চ মনোবল, দৃঢ় সংকল্প ও আল্লাহর ফায়সালায় রাজি থাকার যে উচ্চমর্যাদার আসনে দেখতে চাচ্ছিলেন সে দৃষ্টিতে নবী করীমের ইচ্ছা করে যায়েদকে তালাক থেকে বিরত রাখ নিম্নমানের কাজ বিবেচিত হয়। তিনি আসলে ভাবছিলেন যে, এর ফলে তিনি এমন কাজ করা থেকে বেঁচে যাবেন যাতে তাঁর দুর্নামের আশঙ্কা ছিল। অথচ আল্লাহ একটি বড় উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তাঁকে দিয়ে সে কাজটি করাতে চাচ্ছিলেন। "তুমি লোক ভয় করছ অথচ আল্লাহকে ভয় করাই অধিকতর সংগত"- এ কথাগুলো পরিষ্কারভাবে এ বিষয়বস্তুর দিকে ইংগিত করছে।
ইমাম যয়নুল আবেদীন আলী ইবনে হোসাইন এ আয়াতের ব্যাখ্যায় একথাই বলেছেন। তিনি বলেন, "আল্লাহ নবী -কে এই মর্মে খবর দিয়েছিলেন যে, যয়নব আপনার স্ত্রী মধ্যে শামিল হতে যাচ্ছেন। কিন্তু যায়েদ যখন এসে তাঁর কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেন তখন তিনি বললেন, আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজের স্ত্রী ত্যাগ করো না। এ কথায় আল্লাহ বলেলেন, আমি তোমাকে পূর্বেই জানিয়ে দিয়েছিলাম, আমি তোমাকে যয়নবের সাথে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছি অথচ তুমি যায়েদের সাথে কথা বলার সময় আল্লাহ যেকথা প্রকাশ করতে চান তা গোপন করছিলে। (ইবনে জারীর ও ইবনে কাসীর ইবনে আবী হাতেমের বরাত দিয়ে)
আল্লামা আলুসীও তাফসীর রুহুল মা'আনীতে এর একই অর্থ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, এটি হচ্ছে শ্রেয়তর কাজ পরিত্যাগ করার জন্য ক্রোধ প্রকাশ। নবী নিশ্চুপ থাকতেন অথবা যায়েদকে বলতেন, তুমি যা চাও করতে পারো, এ অবস্থায় এটিই ছিল শ্রেয়তর। অভিব্যক্তি ক্রোধের সারৎসার হচ্ছে তুমি কেন যায়েদকে বললে তোমার স্ত্রীকে ত্যাগ করো না? অথচ আমি তোমাকে আগেই জানিয়ে দিয়েছি যে, যয়নব তোমার স্ত্রীদের মধ্যে শামিল হবে।"
যায়েদ যখন নিজের স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিলেন এবং তার ইদ্দত পুরা হয়ে গেলো। প্রয়োজন পূর্ণ করলো শব্দগুলো স্বতস্ফূর্তভাবে একথাই প্রকাশ করে যে, তাঁর কাছে যায়েদের আর কোনো প্রয়োজন থাকলো না। কেবলমাত্র তালাক দিলেই এ অবস্থাটির সৃষ্টি হয় না। কারণ স্বামীর আর কোনো আকর্ষণ থেকে গেলে ইদ্দতের মাঝখানে তাকে ফিরিয়ে নিতে পারে। আর তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর গর্ভবতী হওয়া বা না হওয়ার কথা জানতে পারার মধ্যেও স্বামীর প্রয়োজন থেকে যায়। তাই যখন ইদ্দত খতম হয়ে যায় একমাত্র তখনই তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর মধ্যে স্বামীর প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়।
আল্লাহ এ কাজ নবী-এর মাধ্যমে এমন একটি প্রয়োজন ও উদ্দেশ্য সম্পাদনের জন্য করিয়েছিলেন যা এ পদ্ধতিতে ছাড়া অন্য কোনোভাবে সম্পাদিত হতে পারতো না। আরবে পালক পুত্রদের সম্পর্কিত আত্মীয়তার ব্যাপারে যে সমস্ত ভ্রান্ত রসম-রেওয়াজের প্রচলন হয়ে গিয়েছিল আল্লাহর রাসূল নিজে অগ্রসর হয়ে না ভাঙলে সেগুলো ভেঙে ফেলার ও উচ্ছেদ করার আর কোনো পথ ছিল না। কাজেই আল্লাহ নিছক নবীর গৃহে আর একজন স্ত্রী বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে নয়; বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য পূর্ণ করার জন্য এ বিয়ে করিয়েছিলেন।

📘 আল কুরআনে নারীদের ২৫ সূরা > 📄 পালক পুত্রের স্ত্রী প্রকৃত পুত্রবধূ নয়

📄 পালক পুত্রের স্ত্রী প্রকৃত পুত্রবধূ নয়


مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّنَ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا.
অর্থ: মুহাম্মদ তোমাদের মধ্যকার কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লহর রাসূল এবং সর্বশেষ নবী। আল্লাহ সকল বিষয়ে সর্বজ্ঞ। (সূরা আহযাব: আয়াত-৪০)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: বিরোধীরা নবী -এর এ বিয়ের ব্যাপারে যেসব আপত্তি উঠাচ্ছিল এ একটি বাক্যের মাধ্যমে সেসবের মূলোচ্ছেদ করে দেয়া হয়েছে।
তাদের প্রথম অভিযোগ ছিল, তিনি নিজের পুত্রবধূকে বিয়ে করেন, অথচ তাঁর নিজের শরীয়াতেও পুত্রের স্ত্রী পিতার জন্য হারাম। এর জবাবে বলা হয়েছে, "মুহাম্মাদ তোমাদের পুরুষদের কারো পিতা নন।" অর্থাৎ যে ব্যক্তির তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করা হয়েছে তিনি মুহাম্মাদ -এর পুত্রই ছিলেন না, কাজেই তার তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করা হারাম হবে কেন? তোমরা নিজেরাই জানো মুহাম্মাদ-এর আদতে কোনো পুত্র সন্তানই নেই। তাদের দ্বিতীয় আপত্তি ছিল, ঠিক আছে, পালক পুত্র যদি আসল পুত্র না হয়ে থাকে তাহলেও তার তালাক প্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করা বড় জোর বৈধই হতে পারতো কিন্তু তাকে বিয়ে করার এমন কী প্রয়োজন ছিল? এর জবাবে বলা হয়েছে, "কিন্তু তিনি আল্লাহর রাসূল।" অর্থাৎ রাসূল হবার কারণে তাঁর ওপর এ দায়িত্ব ও কর্তব্য আরোপিত হয়েছিল যে তোমাদের রসম রেওআজ যে হালাল জিনিসটিকে অযথা হারাম গণ্য করে রেখেছে সে ব্যাপারে সকল রকমের স্বার্থপ্রীতির তিনি অবসান ঘটিয়ে দেবেন এবং তার হালাল হাবার ব্যাপারে কোনো প্রকার সন্দেহ-সংশয়ের অবকাশই রাখবে না।
আবার অতিরিক্ত তাকিদ সহকারে বলা হয়েছে, "এবং তিনি শেষ নবী।" অর্থাৎ যদি কোনো আইন ও সামাজিক সংস্কার তাঁর আমলে প্রবর্তিত না হয়ে থাকে তাহলে তাঁর পরে আগমনকারী নবী তার প্রবর্তন করতে পারতেন, কিন্তু তাঁর পরে আর কোনো রাসূল তো দূরের কথা কোনো নবীই আসবেন না। কাজেই তিনি নিজেই জাহেলিয়াতের এ রসমটির মূলোচ্ছেদ করে যাবেন, এটা আরো অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল।
এরপর আরো বেশি জোর দিয়ে বলা হয়েছে, "আল্লাহ প্রত্যেটি বিষয়ের জ্ঞান রাখেন।" অর্থাৎ আল্লাহ জানেন, এ সময় মুহাম্মাদ -এর মাধ্যমে জাহেলিয়াতের এ রসমটির মূলোচ্ছেদ করা কেন জরুরি ছিল এবং এমনটি না করলে কী মহা অনর্থ হতো। তিনি জানেন, এখন আর তাঁর পক্ষ থেকে কোনো নবী আসবেন না, কাজেই নিজের শেষ নবীর মাধ্যমে এখন যদি তিনি এ রসমটিকে উৎখাত না করেন তাহলে এমন দ্বিতীয় আর কোন সত্তাই নেই যিনি এটি ভঙ্গ করলে সারা দুনিয়ার মুসলমানদের মধ্য থেকে চিরকালেন জন্য এটি মূলোৎপাটিত হয়ে যাবে। পরবর্তী সংস্কারকগণ যদি এটি ভাঙেন, তাহলে তাদের মধ্য থেকে আরো কর্মও তাঁর ইন্তিকালের পরে এমন কোনো বিশ্বজনীন ও চিরন্তন কর্তৃত্বের অধিকারী হবে না যার ফলে প্রত্যেক দেশের প্রত্যেক যুগের লোকেরা তার অনুসরণ করতে থাকবে এবং তাদের মধ্য থেকে কারো ব্যক্তিত্ব ও তাঁর নিজের মধ্যে এমন কোনো পবিত্রতার বাহন হবে না যার ফলে তাঁর কোনো কাজ নিছক তাঁর সুন্নাত হবার কারণে মানুষের মন থেকে অপছন্দনীয়তার সকল প্রকার ধারণার মূলোচ্ছেদ করতে সক্ষম হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00