📄 যয়নবকে বিয়ে করার ফলে তুমুল অপপ্রচার
এ বিয়ে হওয়ার সাথে সাথেই নবী করীম -এর বিরুদ্ধে অকস্মিত ব্যাপক অপপ্রচার শুরু হয়ে যায়। মুশরিক, মুনাফিক ও ইহূদী সবাই তাঁর ক্রমাগত বিজয়ে জ্বলে পুড়ে মরছিল। উহুদের পরে আহযাব ও বনী কুরাইযার যুদ্ধ পর্যন্ত দু'টি বছর ধরে যেভাবে তারা একের পর এক মার খেতে থেকেছে তার ফলে তাদের মনে আগুন জ্বলছিল দাউদাউ করে। এখন প্রকাশ্য ময়দানে যুদ্ধ করে আর কোনো দিন তাঁকে হারাতে পারবে, এ ব্যাপারেও তারা নিরাশ হয়ে গিয়েছিল। তাই তারা এ বিয়ের ব্যাপারটিকে নিজেদের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত এটি সুযোগ মনে করে এবং ধারণা করে যে, এবার আমরা মুহাম্মদ -এর শক্তি ও তাঁর সাফল্যের মূলে রয়েছে যে চারিত্রিক শ্রেষ্ঠত্ব খতম করে দিতে পারবে। কাজেই গল্প ফাঁদা হয়, (নাউযুবিল্লাহ) মুহাম্মদ তাঁর পুত্রবধূকে দেখে তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন। পুত্র এ প্রেমের কথা জানতে পেরে নিজের স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেন। আর এরপর তিনি পুত্রবধূকে বিয়ে করে ফেলেন। অথচ এটা ছিল একদম বাজে কথা। কারণ যয়নব ছিলেন নবী করীম -এর ফুফাত বোন। শৈশব থেকে যৌবন পর্যন্ত তাঁর সমস্ত সময়টা অতিবাহিত হয় নবী করীম -এর সামনে।
কোনো এক সময় তাঁকে দেখে আসক্ত হবার প্রশ্ন কোথা থেকে আসে? তারপর রাসূল নিজেই বিশেষ উদ্যোগী হয়ে যায়েদ -এর সাথে তাঁর বিবাহ দেন। কুরাইশ বংশের মতো সম্ভ্রান্ত গোত্রের একটি মেয়েকে একজন আযাদকৃত গোলামের সাথে বিয়ে দেবার ব্যাপারে তাঁর পরিবারের কেউই রাজী ছিল না। যয়নব নিজেও এ বিয়েতে অখুশী ছিলেন। কিন্তু নবী কারীমের হুকুমের সামনে সবাই যায়েদের সাথে তাঁকে বিয়ে দিতে বাধ্য হন। এভাবে তাঁরা আরবে এ মর্মে প্রথম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন যে, ইসলাম একজন আযাদকৃত গোলামকে অভিজাত বংশীয় কুরাইশীদের সমপর্যায়ের নিয়ে এসেছে। সত্যিই যদি যয়নবের প্রতি নবী কোন আকর্ষণ থাকতো, তাহলে যায়েদ ইবনে হারেসার সাথে তাঁকে বিয়ে দেবার কী প্রয়োজন ছিল? তিনি নিজেই তাঁকে বিয়ে করতে পারতেন। কিন্তু নির্লজ্জ বিরোধীরা এসব নিরেট সত্যের উপস্থিতিতেও এ প্রেমের গল্প ফেঁদে বসে। খুব রঙ চড়িয়ে এগুলো ছড়াতে থাকে। অপপ্রচারের অভিযান ক্রমে এত প্রবল হয় যে, তার ফলে মুসলমানদের মধ্যেও তাদের তৈরি করা গল্প ছড়িয়ে পড়ে।
📄 মুহাম্মদ -এর স্ত্রীগণ মুমিনদের মাতা
النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ وَأَزْوَاجُةً أُمَّهُتُهُمْ وَأُولُوا الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ فِي كِتَبِ اللهِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُهْجِرِينَ إِلَّا أَنْ تَفْعَلُوا إِلَى أَوْلِيئِكُمْ مَعْرُوفًا كَانَ ذَلِكَ فِي الْكِتُبِ مَسْطُورًا .
অর্থ: নবী মু'মিনদের কাছে তাদের নিজেদের চেয়েও অধিক ঘনিষ্ঠ এবং তার স্ত্রীগণ তাদের মাতা আর আত্মীয়-স্বজন আল্লাহর বিধানে পরস্পর উত্তরাধিকারী হওয়ার ব্যাপারে অন্যান্য মু'মিন ও মুহাজিরদের চেয়ে অধিক ঘনিষ্ঠ। তবে যদি তোমরা তোমাদের নিজেদের বন্ধু-বান্ধবদের সাথে কিছু অনুগ্রহ করতে চাও করতে পার। এটা কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। (সূরা আহযাব: আয়াত-৬)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: নবী -এর সাথে মুসলমানদের এবং মুসলমানদের সাথে নবী -এর যে সম্পর্ক তা অন্যান্য সমস্ত মানবিক সম্পর্কের উর্ধ্বের এক বিশেষ ধরনের সম্পর্ক। নবী ও মু'মিনদের মধ্যে যে সম্পর্ক বিরাজিত, অন্য কোনো আত্মীয়তা ও সম্পর্ক তার সাথে কোনো দিক দিয়ে সামান্যতমও তুলনীয় নয়। নবী মুসলমানদের জন্য তাদের বাপ-মায়ের, চাইতেও বেশি স্নেহশীল ও দয়াময় হৃদয় এবং তাদের নিজেদের চাইতেও কল্যাণকামী। তাদের বাপ-মা, স্ত্রী ও ছেলে মেয়েরা তাদের ক্ষতি করতে পারে, তাদের সাথে স্বার্থপরের মতো ব্যবহার করতে পারে, তাদেরকে বিপথে পরিচালিত করতে পারে, তাদেরকে দিয়ে অন্যায় কাজ করাতে পারে, তাদেরকে জাহান্নামে ঠেলে দিতে পারে, কিন্তু নবী তাদের পক্ষে কেবলমাত্র এমন কাজই করতে পারেন যাতে তাদের সত্যিকারের সাফল্য অর্জিত হয়। তারা নিজেরাই নিজেদের পায়ে কুড়াল মারতে পারে, বোকামি করে নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করতে পারে কিন্তু নবী তাদের জন্য তাই করবেন যা তাদের জন্য লাভজনক হয়। আসল ব্যাপার যখন এই তখন মুসলমানদের ওপরও নবী -এর এ অধিকার আছে যে, তারা তাঁকে নিজেদের বাপ-মা ও সন্তানদের এবং নিজেদের প্রাণের চেয়েও বেশি প্রিয় মনে করবে। দুনিয়ার সকল জিনিসের চেয়ে তাঁকে বেশি ভালোবাসবে। নিজেদের মতামতের ওপর তার মতামতকে এবং নিজেদের ফায়সালার চেয়ে তাঁর ফায়সালাকে প্রাধান্য দেবে। তাঁর প্রত্যেকটি হুকুমের সামনে মাথা নত করে দেবে। বুখারি ও মুসলিম প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ তাদের হাদীসগ্রন্থে সামান্য শাব্দিক পরিবর্তন সহকারে এ বিষয়বস্তু সম্বলিত একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাতে বলা হয়েছে, "তোমাদের কোনো ব্যক্তি মু'মিন হতে পারেনা যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, তার সন্তান-সন্ততি ও সমস্ত মানুষের চাইতে বেশি প্রিয় হই।"
ওপরে বর্ণিত এ একই বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতেই নবী-এর এও একটি বৈশিষ্ট্য ছিল যে, মুসলমানদের নিজেদের পালক মাতা কখনো কোনো অর্থেই তাদের মা নয়; কিন্তু নবী- এর স্ত্রীগণ ঠিক তেমনিভাবে তাদের জন্য হারাম যেমন তাদের আসল মা তাদের জন্য হারাম। এ বিশেষ বিধানটি নবী ছাড়া দুনিয়ার আর কোনো মানুষের জন্য প্রযোজ্য নয়। এ প্রসঙ্গে এ কথাও জেনে নেয়া প্রয়োজন যে, নবী-এর স্ত্রীগণ শুধু মাত্র এ অর্থে মু'মিনদের মাতা যে, তাঁদেরকে সম্মান করা মুসলমানদের জন্য ওয়াজিব এবং তাঁদের সাথে কোন মুসলমানের বিয়ে হতে পারে না। বাদবাকি অন্যান্য বিষয়ে তাঁরা মায়ের মতো নন। যেমন তাদের প্রকৃত আত্মীয়গণ ছাড়া বাকি সমস্ত মুসলমান তাদের জন্য গায়ের মাহরাম ছিল এবং তাঁদের থেকে পর্দা করা ছিল ওয়াজিব। তাঁদের মেয়েরা মুসলমানদের জন্য বৈপিত্রেয় বোন ছিলেন না, যার ফলে তাদের সাথে মুসলমানদের বিয়ে নিষিদ্ধ হয়ে পরে। তাঁদের ভাই ও বোনেরা মুসলমানদের জন্য মামা ও খালার পর্যায়ভুক্ত ছিলেন না। কোনো ব্যাক্তি নিজের মায়ের তরফ থেকে যে মীরাস লাভ করে তাঁদের তরফ থেকে কোনো আত্মীয় মুসলমান সে ধরনের কোনো মীরাস লাভ করে না।
এ আয়াতে বলা হয়েছে, নবী-এর সাথে তো মুসলমানদের সম্পর্কের ধরন ছিল সবকিছু থেকে আলাদা। কিন্তু সাধারণ مسلمانوں মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক এমন নীতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হবে যার ফলে আত্মীয়দের অধিকার পরস্পরের ওপর সাধারণ লোকদের তুলনায় অগ্রগণ্য হয়। নিজের মা-বাপ, সন্তান-সন্ততি ও ভাই-বোনদের প্রয়োজন পূর্ণ না করে বাইরে দান-খয়রাত করে বেড়ালে তা সঠিক গণ্য হবে না। যাকাতের মাধ্যমে প্রথমে নিজের গরীব আত্মীয় স্বজনদেরকে সাহায্য করতে হবে এবং তারপর অন্যান্য হকদারকে দিতে হবে। মীরাস অপরিহার্যভাবে তারাই লাভ করবে যারা হবে মৃত ব্যক্তির নিকটতম আত্মীয়। অন্যদেরকে সে চাইলে (জীবিতাবস্থায়) হেবা, ওয়াকফ বা অসিয়াতের মাধ্যমে নিজের সম্পদ দান করতে পারে। কিন্তু এও ওয়ারিসদেরকে বঞ্চিত করে সে সবকিছু অন্যদেরকে দিয়ে যেতে পারে না। হিজরাতের পর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃ সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য যে পদ্ধতি অবলম্বিত হয়েছিল, যার প্রেক্ষিতে নিছক দীনী ভ্রাতৃত্বের সম্পর্কের ভিত্তিতে মুহাজির ও আনসারগণ পরস্পরের ওয়ারিস হতেন, এ হুকুমের মাধ্যমে তাও রহিত হয়ে যায়। আল্লাহ পরিস্কার বলে দেন, মীরাস বণ্টন হবে আত্মীয়তার ভিত্তিতে। তবে হ্যাঁ কোনো ব্যক্তি চাইলে হাদীয়া, তোহফা, উপঢৌকন বা অসিয়াতের মাধ্যমে নিজের কোনো দীনী ভাইকে সাহায্য করতে পারেন।
📄 রাসূলের স্ত্রীদের দুনিয়ার স্বাচ্ছন্দ পরিত্যাগের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত
يَأَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ إِنْ كُنْتُنَّ تُرِدْنَ الْحَيُوةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا فَتَعَالَيْنَ امَتِّعْكُنَّ وَأُسَرِّ حُكُنَّ سَرَاحًا جَمِيلًا . وَإِنْ كُنْتُنَّ تُرِدْنَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالدَّارَ الْآخِرَةَ فَإِنَّ اللَّهَ أَعَدَّ لِلْمُحْسِنَتِ مِنْكُنَّ أَجْرًا عَظِيمًا .
অর্থ : হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে বলুন, যদি তোমরা পার্থিব জীবন ও তার সৌন্দর্য চাও, তবে এসো আমি তোমাদের ভোগের ব্যবস্থা করে দিই এবং সম্মানের সাথে তোমাদেরকে বিদায় দিই। আর যদি তোমরা আল্লাহ্, তাঁর রাসূল ও পরকাল চাও, তবে তোমাদের মধ্যে যারা সৎ গুণসম্পন্ন, আল্লাহ তাদের জন্য বিরাট পুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন। (সূরা আহযাব: আয়াত ২৮-২৯)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা : উপরিউক্ত আয়াতসমূহ নাযিল হওয়ার ব্যাপারে এমন ঘটনাবলির বর্ণনা পাওয়া যায়, যা ছিল নবী করীম -এর মর্জির পরিপন্থী, যাতে তিনি অনিচ্ছাকৃতভাবে দুঃখ পান। তন্মধ্য হতে সহীহ মুসলিমে বর্ণিত একটি ঘটনা জাবের -এর রেওয়াতে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। ঘটনাটি হলো, একদিন রাসূলুল্লাহ -এর পুণ্যবতী স্ত্রীগণ তার খেদমতে সমবেতভাবে হাজির হয়ে তাদের জীবিকা ও আনুসঙ্গিক খরচাদির পরিমাণ বৃদ্ধির দাবী পেশ করেন। বিশিষ্ট মুফাসসির আবু হাইয়ান এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা তাফসীরে বাহরে মুহীতে প্রদান করেন। তাহলো আহযাব যুদ্ধের পর বনু-নযীর ও বনু কুরাইযার বিজয় এবং গনীমতের মাল বণ্টনের ফলে সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে খানিকটা স্বাচ্ছন্দ ফিরে আসে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পুণ্যবতী স্ত্রীগণ ভাবলেন যে, মহানবী হয়তো এসব গনীমতের মাল থেকে নিজস্ব অংশ রেখে দিয়েছেন। তাই তাঁরা সমবেতভাবে নিবেদন করে বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ পারস্য ও রোমের সম্রাজ্ঞীরা নানাবিধগ্রহণাপত্র ও মূল্যবান পোশাক পরিচ্ছদ পরিধান করে থাকে। তাদের সেবা-যত্নের জন্যে রয়েছে অগণিত দাস-দাসী। আমাদের দারিদ্র্য-পীড়িত জীর্ণ-শীর্ণ করুণ অবস্থা তো আপনি নিজেই দেখতে পাচ্ছেন। তাই মেহেরবানী করে আমাদের জীবিকা ও অন্যান্য খরচাদির পরিমাণ কিছুটা বৃদ্ধির কথা বিবেচনা করুন।
রাসূলুল্লাহ পুণ্যবতী স্ত্রীগণের পক্ষ থেকে দুনিয়াদার ভোগ-বিলাসী রাজা-বাদশাদের পরিবেশে বিদ্যমান জৌলুস ও সুযোগ-সুবিধা কিছুটা হলেও প্রদানের দাবীতে উপস্থাপিত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ কারণে বিশেষভাবে মর্মাহত হন যে, তাঁরা এতদিনের সৎসঙ্গ ও প্রশিক্ষণ লাভের পরও নবী-গ্রহের প্রকৃত মর্যাদা অনুধাবন করতে সক্ষম হননি। ফলে নবী যে দুঃখিত হবেন, তা তাঁরা ধারণা করতে পারেননি। সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে প্রাচুর্য ও সম্পদ বৃদ্ধি দেখে তাঁদের মধ্যে কিছুটা প্রাচুর্যের অভিলাস উদয় হয়েছিল।
সহীহ মুসলিমে জাবের ইবনে আবদুল্লাহ সে যুগের একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, একদিন আবু বকর ও উমর নবী করীমের খেদমতে হাজির হয়ে দেখনে তাঁর স্ত্রীগণ তাঁর চারদিকে বসে আছেন এবং তিনি কোনো কথা বলছেন না। নবী করীম উমরকে সম্বোধন করে বললেন, "তুমি দেখতে পাচ্ছো, এরা আমার চারদিকে বসে আছে এবং আমার কাছে খরচপত্রের জন্য টাকা চাচ্ছে।" একথা শুনে তাঁরা উভয়ে নিজ নিজ মেয়েকে ধমক দিলেন এবং তাদেরকে বললেন, তোমরা রাসূলল্লাহকে কষ্ট দিচ্ছো এবং এমন জিনিস চাচ্ছো যা তাঁর কাছে নেই। এ ঘটনা থেকে বুঝা যায়, নবী-এর আর্থিক সংকট সে সময় কেমন ঘনীভূত ছিল এবং কুফর ও ইসলামের চরম দ্বন্দ্বের দিনগুলোতে খরচপাতির জন্য পবিত্র স্ত্রীগণের তাগাদা তাঁর পবিত্র ব্যক্তিত্বকে কীভাবে বিচলিত করে তুলছিল।
এ আয়াতটি নাযিল হবার সময় নবী-এর স্ত্রী ছিল চারজন। তাঁরা ছিলেন ১. সওদা রসিয়া আনহা ২. আয়েশা, ৩. হাফসা এবং ৪. উম্মে সালামাহ
তখনো যয়নবের সাথে নবী করীমের বিয়ে হয়নি। (আহকামুল কুরআন, ইবনুল আরাবী, ১৯৫৮ সালে মিসর থেকে মুদ্রিত, ৩ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫১২-৫১৩) এ আয়াত নাযিল হবার পর নবী করীম সর্বপ্রথম আয়েশার সাথে আলোচনা করেন এবং বলেন, "আমি তোমাকে একটি কথা বলছি, জবাব দেবার ব্যাপারে তাড়াহুড়া করো না। তোমার বাপ-মায়ের মতামত নাও এবং তারপর ফায়সালা করো।" তারপর তিনি তাঁকে বলেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে এ হুকুম এসেছে এবং তাঁকে এ আয়াত শুনিয়ে দেন। আয়েশা বলেন, "এ ব্যাপারটি কি আমি আমার বাপ-মাকে জিজ্ঞেস করবো? আমি তো আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও আখেরাতকে চাই।" এরপর নবী এক এক করে তাঁর অন্যান্য পবিত্র স্ত্রীদের প্রত্যেকের কাছে যান এবং তাঁদেরকে একই কথা বলেন। তারা প্রত্যেকে আয়েশার মতো একই জবাব দেন। (মুসনাদে আহমাদ, মুসলিম ও নাসাঈ)
ইসলামী পরিভাষায় একে বলা হয় "তাখঈর"। অর্থাৎ স্ত্রীকে তার স্বামীর থাকার বা আলাদা হয়ে যাবার মধ্য থেকে যে কোনো একটিকে বাছাই করে নেবার ফায়সালা করার ইখতিয়ার দান করা। এই তাখঈর নবী-এর ওপর ওয়াজিব ছিল। কারণ আল্লাহ তাঁকে এর হুকুম দিয়েছিলেন। যদি তাঁর পবিত্র স্ত্রীগণের কেউ আলাদা হয়ে যাবার পথ অবলম্বন করতেন তাহলে তিনি আপনা আপনিই আলাদা হয়ে যেতেন না; বরং নবী করীমের আলাদা করে দেবার কারণে আলাদা হয়ে যেতেন যেমন আয়াতের শব্দাবলি থেকে সুস্পষ্ট হচ্ছে, "এসো আমি কিছু দিয়ে তোমাদের ভালোভাবে বিদায় করে দিই।" কিন্তু এ অবস্থায় তাঁকে আলাদা করে দেয়া নবী-এর ওপর ওয়াজিব ছিল। কারণ নিজের প্রতিশ্রুতি পালন না করা নবী হিসেবে তাঁর জন্য সমীচীন ছিল না।
আলাদা হয়ে যাবার পর বাহ্যত এটাই মনে হয়, মু'মিনের মাতার তালিকা থেকে তাঁর নাম কাটা যেতো এবং অন্য মুসলমানের সাথে তাঁর বিবাহ আর হারাম থাকতো না। কারণ তিনি দুনিয়া এবং তার সাজসজ্জার জন্যই তো রাসূলে করীমের থেকে আলাদা হতেন এবং এর অধিকার তাঁকে দেয়া হয়েছিল। আর একথা সুষ্পষ্ট যে, অন্য কারো সাথে বিবাহ নিষিদ্ধ থাকলে তাঁর এ উদ্দেশ্য পূর্ণ হতো না। অন্যদিকে আয়াতে এটিও একটি উদ্দেশ্য মনে হয়, নবী করীমের যে সকল স্ত্রী আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও আখেরাতকে পছন্দ করে নিয়েছেন তাঁদেরকে তালাক দেবার ইখতিয়ার নবীর আর থাকেনি। কারণ তাখঈরের দু'টি দিক ছিল। এক, দুনিয়াকে গ্রহণ করলে তোমাদেরকে আলাদা করে দেয়া হবে। দুই, আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও আখেরাতকে গ্রহণ করলে তোমাদের আলাদা করে দেয়া হবে না। এখন একথা সুস্পষ্ট, এ দু'টি দিকের মধ্য থেকে যে কোনো একটি দিকই কোনো মাহিমান্বিতা মহিলা গ্রহণ করলে দ্বিতীয় দিকটি স্বাভাবিকভাবেই তাঁর জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যেতো।
ইসলামী ফিকহে "তাখঈর" আসলে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করার পর্যায়ভুক্ত। অর্থাৎ স্বামী এর মাধ্যমে স্ত্রীকে এ ক্ষমতা দেয় যে, সে চাইলে তার স্ত্রী হিসেবে থাকতে পারে এবং চাইলে আলাদা হয়ে যেতে পারে। এ বিষয়টির ব্যাপারে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে ইজতিহাদের মাধ্যমে ফকীহগণ যে বিধান বর্ণনা করেছেন তার সংক্ষিপ্ত সার নিম্নরূপ-
১. এ ক্ষমতা একবার স্ত্রীকে দিয়ে দেবার পর স্বামী আর তা ফেরত নিতে পাবে না এবং স্ত্রীকে তা ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখতেও পারে না। তবে স্ত্রীর জন্য তা ব্যবহার করা অপরিহার্য হয়ে যায় না। সে চাইলে স্বামীর সাথে থাকতে সম্মত হতে পারে, চাইলে আলাদা হয়ে যাবার কথা ঘোষণা করতে পারে এবং চাইলে কোনো কিছুর ঘোষণা না দিয়ে এ ক্ষমতাকে এমনিই নষ্ট হয়ে যাবার সুযোগ দিতে পারে।
২. এ ক্ষমতাটি স্ত্রীর দিকে স্থানান্তরিত হবার জন্য দু'টি শর্ত রয়েছে। প্রথমত স্বামী কর্তৃক তাকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তালাকের ইখতিয়ার দান করা চাই, অথবা তালাকের কথা সুস্পষ্ট ভাষায় না বললেও এ ইখতিয়ার দেবার নিয়ত তার থাকা চাই। যেমন, সে যদি বলে, "তোমার ইখতিয়ার আছে" বা "তোমার ব্যাপার তোমার হাতে আছে," তাহলে এ ধরনের ইংগিতধর্মী কথার ক্ষেত্রে স্বামীর নিয়ত ছাড়া তালাকের ইখতিয়ার স্ত্রীর কাছে স্থানান্তরিত হবে না। যদি স্ত্রী এর দাবী করে এবং স্বামী হলফ সহকারে বিবৃতি দেয় যে, এর মাধ্যমে তালাকের ইখতিয়ার সোপর্দ করার উদ্দেশ্য তার ছিল না তাহলে স্বামীর কথা গ্রহণ করা হবে। তবে স্ত্রী যদি এ মর্মে সাক্ষী হাজির করে যে, "অবনিবনা ঝগড়া বিবাদের পরিবেশে বা তালাকের কথাবার্তা চলার সময় একথা বলা হয়েছিল, তাহলে তখন তার দাবী বিবেচিত হবে। কারণ এ প্রেক্ষাপটে ইখতিয়ার দেবার অর্থ এটাই বুঝা যাবে যে, স্বামীর তালাকের ইখতিয়ার দেবার নিয়ত ছিল।
দ্বিতীয়ত স্ত্রীর জানতে হবে যে, তাকে এ ইখতিয়ার দেয়া হয়েছে। যদি সে অনুপস্থিত থাকে, তাহলে তার কাছে এ খবর পৌঁছুতে হবে এবং যদি সে উপস্থিত থাকে, তাহলে এ শব্দগুলো তার শুনতে হবে। যতক্ষণ সে নিজ কানে শুনবে না অথবা তার কাছে খবর পৌঁছুবে না ততক্ষণ ইখতিয়ার তার কাছে স্থানান্তরিত হবে না।
৩. যদি স্বামী কোনো সময় নির্ধারণ করা ছাড়াই শর্তহীনভাবে স্ত্রীকে ইখতিয়ার দান করে, তাহলে স্ত্রী কতক্ষণ পর্যন্ত এ ইখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারে। এ ব্যাপারে ফকীহদের মধ্যে মতবিরোধ পাওয়া যায় একটি দল বলেন যে, বৈঠকে স্বামী একথা বললেই স্ত্রী তার ইখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারে। যদি সে কোনো জবাব না দিয়ে সেখান থেকে উঠে যায় অথবা এমন কাজে লিপ্ত হয় যা একথাই প্রমাণ করে যে, সে জবাব দিতে চায় না, তাহলে তার ইখতিয়ার বাতিল হয়ে যাবে। এ মত পোষণ করেন উমর, উসমান, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, জাবের ইবনে আবদুল্লাহ, জাবের ইবনে যায়েদ, আতা (র), মুজাহিদ (র), শা'বী (র) ইবরাহীম নাখঈ (র), ইমাম মালেক (র) ইমাম আবু হানীফা (র), ইমাম শাফেঈ (র), ইমাম আওযায়ী (র), সুফিয়ান সওরী (র) ও আবু সওর (র)। দ্বিতীয় দলগনের মতে, তার ইখতিয়ার ঐ বৈঠক পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তারপরও সে এ ইখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারবে। এ মত পোষণ করেন হাসান বসরী (র), কাতাদাহ ও যুহরী।
৪. স্বামী যদি সময় নির্ধারণ করে দেয়। যেমন, সে যদি বলে, এক মাস বা এক বছর পর্যন্ত তোমাকে ইখতিয়ার দিলাম অথবা এ সময় পর্যন্ত তোমার বিষয় তোমার হাতে রইলো, তাহলে ঐ সময় পর্যন্ত সে এ ইখতিয়ার ভোগ করবে। তবে যদি সে বলে, তুমি যখন চাও এ ইখতিয়ার ব্যবহার করতে পারো, তাহলে এ অবস্থায় তার ইখতিয়ার হবে সীমাহীন।
৫. স্ত্রী যদি আলাদা হতে চায়, তাহলে তাকে সুস্পষ্ট ও চূড়ান্ত অর্থবোধক শব্দাবলির মাধ্যমে তা প্রয়োগ করতে হবে। অস্পষ্ট শব্দাবলি, যার মাধ্যমে বক্তব্য সুস্পষ্ট হয় না, তা দ্বারা ইখতিয়ার প্রয়োগ কার্যকর হতে পারে না।
৬. আইনত স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীকে ইখতিয়ার দেবার জন্য তিনটি বাক্য ব্যবহার করা যেতে পারে।
> সে বলবে, "তোমার ব্যাপারটি তোমার হাতে রয়েছে।"
> সে বলবে, "তোমাকে ইখতিয়ার দেয়া হচ্ছে।"
> সে বলবে, "যদি তুমি চাও তাহলে তোমাকে তালাক দিলাম।" এর মধ্যে প্রত্যেকটির আইনগত ফলাফল হবে ভিন্ন রকমের। যেমন-
• "তোমার বিষয়টি তোমার হাতে রয়েছে" এ শব্দগুলো যদি স্বামী বলে থাকে এবং স্ত্রী এর জবাবে এমন কোনো স্পষ্ট কথা বলে যা থেকে বুঝা যায় যে, সে আলাদা হয়ে গেছে, তাহলে হানাফী মতে এক তালাক বায়েন হয়ে যাবে। অর্থাৎ এরপর স্বামী আর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারবে না। কিন্তু ইদ্দত অতিবাহিত হবার পর উভয়ে আবার চাইলে পরস্পরকে বিয়ে করতে পারে। আর যদি স্বামী বলে থাকে, "এক তালাক পর্যন্ত তোমার বিষয়টি তোমার হাতে রয়েছে," তাহলে এ অবস্থায় একটি 'রজঈ' তালাক অনুষ্ঠিত হবে। (অর্থাৎ ইদ্দতের মধ্যে স্বামী চাইলে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারে।) কিন্তু স্বামী যদি বিষয়টি স্ত্রীর হাতে সোপর্দ করতে গিয়ে তিন তালাকের নিয়ত করে থাকে অথবা একথা সুস্পষ্ট করে বলে থাকে, তাহলে সে সুস্পষ্ট ভাষায় নিজের ওপর তিন তালাক আরোপ করুক অথবা কেবলমাত্র একবার বলুক আমি আলাদা হয়ে গেলাম বা নিজেকে তালাক দিলাম, এ অবস্থার স্ত্রীর ইখতিয়ার তালাকের সমার্থক হবে।
• "তোমাকে ইখতিয়ার দিলাম" শব্দগুলোর সাথে যদি স্বামী স্ত্রীকে আলাদা হয়ে যাওয়ার ইখতিয়ার দিয়ে থাকে এবং স্ত্রী আলাদা হয়ে যাওয়ার কথা স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করে থাকে, তাহলে হানাফীদের মতে স্বামীর তিন তালাকের ইখতিয়ার দেবার নিয়ত থাকলেও একটি বায়েন তালাকই অনুষ্ঠিত হবে। তবে যদি স্বামীর পক্ষ থেকে তিন তালাকের ইখতিয়ার দেবার কথা সুস্পষ্টভাবে বলা হয়ে থাকে, তাহলে স্ত্রীর তালাকের ইখতিয়ারের মাধ্যমে তিন তালাক অনুষ্ঠিত হয়ে যাবে। ইমাম শাফেঈর (র) মতে, যদি স্বামী ইখতিয়ার দেবার সময় তালাকের নিয়ত করে থাকে এবং স্ত্রী আলাদা হয়ে যায়, তাহলে একটি রজঈ তালাক অনুষ্ঠিত হবে। ইমাম মালেকের (র) মতে, স্বামী যদি স্ত্রীর সাথে সহবাস করে থাকে তাহলে তিন তালাক অনুষ্ঠিত হবে আর যদি সহবাস না করে থাকে, তাহলে এ অবস্থায় স্বামী এক তালাকের নিয়তের দাবী করলে তা মেনে নেয়া হবে।
• "যদি তুমি চাও, তাহলে তোমাকে তালাক দিলাম" একথা বলার পর যদি স্ত্রী তালাকের ইখতিয়ার ব্যবহার করে, তাহলে বায়েন নয়; বরং একটি রজঈ তালাক অনুষ্ঠিত হবে।
৭. যদি স্বামীর পক্ষ থেকে আলাদা হবার ইখতিয়ার দেবার পর স্ত্রী তার স্ত্রী হয়ে থাকার জন্য নিজের সম্মতি প্রকাশ করে, তাহলে কোনো তালাক সংঘটিত হবে না। এ মত পোষণ করেন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা, আবুদ্দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু, ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু ও ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকীহগণ এ মতই অবলম্বন করেছেন। মাসরূক আয়েশাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তিনি জবাব দেন, "রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর স্ত্রীদেরকে ইখতিয়ার দিয়েছিলেন এবং তাঁরা রসূলূল্লাহরই সাথে থাকা পছন্দ করেছিলেন। একে কি তালাক বলে গণ্য করা হয়?" এ ব্যাপারে একমাত্র আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু ও যায়েদ ইবনে সাবেতের রাদিয়াল্লাহু আনহু এ অভিমত উদ্ধৃত হয়েছে যে, এ ক্ষেত্রে একটি রজঈ তালাক অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু এ উভয় মনীষীর অন্য একটি বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, তাঁরাও এ ক্ষেত্রে কোনো তালাক সংঘটিত হবে না বলে মত প্রকাশ করেছেন।
📄 পর্দা ও নারীর মর্যাদা রক্ষায় নবীর স্ত্রীদের প্রতি নির্দেশাবলি
يَانِسَاءَ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِّنَ النِّسَاءِ إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَ قُلْنَ قَوْلًا مَّعْرُوفًا . وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى وَأَقِمْنَ الصَّلوةَ وَاتِينَ الزَّكُوةَ وَأَطِعْنَ اللَّهَ وَ رَسُولَهُ إِنَّمَا يُرِيدُ اللهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا . وَاذْكُرْنَ مَا يُتْلَى فِي بُيُوتِكُنَّ مِنْ آيَتِ اللَّهِ وَالْحِكْمَةِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ لَطِيفًا خَبِيرًا.
অর্থ: হে নবীর স্ত্রীগণ! তোমরা কোনো সাধারণ স্ত্রীলোকের মত নও; যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর তবে (পরপুরুষের সাথে) কথা বলার সময় এমনভাবে কোমল কণ্ঠে কথা বলো না যাতে অন্তরে যার (কুপ্রবৃত্তির) রোগ রয়েছে- সে লালায়িত হয়। আর তোমরা ন্যায়সঙ্গত কথা বলবে। আর তোমরা নিজেদের ঘরে অবস্থান করবে এবং প্রাথমিক অজ্ঞতা যুগের ন্যায় নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়াবে না। তোমরা সালাত আদায় করবে, যাকাত প্রদান করবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশ পালন করবে। হে নবীর পরিবার! আল্লাহ তোমাদের অপবিত্রতা থেকে দূর করতে চান এবং তোমাদেরকে সর্বতোভাবে পবিত্র রাখতে চান। আর তোমাদের বাড়িতে আল্লাহর সে আয়াতসমূহ ও জ্ঞানের কথা যা পাঠ করা হয় তা তোমরা স্মরণ রাখ। নিশ্চয়ই আল্লাহ খুব সূক্ষ্মদর্শী, সর্বজ্ঞ। (সূরা আহযাব: আয়াত: ৩২-৩৪)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: এখান থেকে শেষ প্যারা পর্যন্ত আয়াতগুলোর মাধ্যমে ইসলামে পর্দা সংক্রান্ত বিধানের সূচনা করা হয়েছে। এ আয়াতগুলোতে নবী -এর স্ত্রীদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। কিন্তু এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে সমস্ত মুসলিম পরিবারে এ সংশোধনীগুলো প্রবর্তন করা। নবীর পবিত্র স্ত্রীগণকে সম্বোধন করার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে, যখন নবী -এর গৃহ থেকে এ পবিত্র জীবন ধারার সূচনা হবে তখন অন্যান্য সকল মুসলিম গৃহের মহিলারা আপনা আপনিই এর অনুসরণ করতে থাকবে। কারণ এ গৃহটিই তাদের জন্য আদর্শ ছিল। এ আয়াতগুলোতে নবী -এর স্ত্রীদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে কেবলমাত্র এরি ভিত্তিতে কেউ কেউ দাবী করে বসেছেন যে, এ বিধানগুলো কেবলমাত্র তাঁদের সাথেই সংশ্লিষ্ট। কিন্তু সামনের দিকে এ আয়াতগুলোতে যা কিছু বলা হয়েছে তা পাঠ করে দেখুন। এর মধ্যে কোনটি এমন যা শুধুমাত্র নবীর পবিত্র স্ত্রীদের সাথে সংশ্লিষ্ট এবং বাকি মুসলমান নারীদের জন্য কাঙ্ক্ষিত নয়? কেবলমাত্র নবীর স্ত্রীগণই আবর্জনামুক্ত নিষ্কলুষ জীবন যাপন করবেন, তাঁরাই আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করবেন, নামায তাঁরাই পড়বেন এবং যাকাত তাঁরাই দেবেন, আল্লাহর উদ্দেশ্য কি এটাই হতে পারতো? যদি এ উদ্দেশ্য হওয়া সম্ভব না হতো, তাহলে গৃহ কোণে নিশ্চিন্তে বসে থাকা, জাহেলী সাজসজ্জা থেকে দূরে থাকা এবং ভিন্ন পুরুষদের সাথে মৃদুস্বরে কথা বলার হুকুম একমাত্র তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট এবং অন্যান্য সমস্ত মুসলিম নারীরা তা থেকে আলাদা হতে পারে কেমন করে? একই কথার ধারাবাহিকতায় বিধৃত সামগ্রিক বিধানের মধ্য থেকে কিছু বিধিকে বিশেষ শ্রেণির মানুষের জন্য নির্দিষ্ট ও কিছু বিধিকে সর্বসাধারণের পালনীয় গণ্য করার পেছনে কোনো ন্যায়সংগত যুক্তি আছে কি? আর "তোমরা সাধারণ নারীদের মতো নও" এ বাক্যটি থেকেও এ অর্থ বুঝায় না যে, সাধারণ নারীদের সাজসজ্জা করে বাইরে বের হওয়া এবং ভিন্ন পুরুষদের সাথে খুব ঢলাঢলি করে কথাবার্তা বলা উচিত; বরং এ কথাটা কিছুটা এমনি ধরনের যেমন এক ভদ্রলোক নিজের সন্তানদেরকে বলে, "তোমরা বাজারের ছেলে মেয়েদের মত নও। তোমাদের গালাগালি না করা উচিত।" এ থেকে কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি ও বক্তা এ উদ্দেশ্য আবিষ্কার করবে না যে, সে কেবলমাত্র নিজের ছেলে মেয়েদের জন্য গালি দেয়াকে খারাপ মনে করে, অন্য ছেলে মেয়েদের মধ্যে এ দোষ থাকলে তাতে তার কোনো আপত্তি নেই।
প্রয়োজন হলে কোনো পুরুষের সাথে কথা বলতে বাধা নেই কিন্তু এ সময় নারীর কথা বলার ভংগী ও ধরন এমন হতে হবে যাতে আলাপকারী পুরুষের মনে কখনো এ ধরনের কোনো চিন্তার উদয় না হয় যে, এ নারীটির ব্যাপারে অন্য কিছু আশা করা যেতে পারে। তার বলার ভংগীতে কোনো নমনীয়তা থাকবে না। তার কথায় কোনো মনমাতানো ভাব থাকবে না। সে সজ্ঞানে তার স্বরে মাধুর্য সৃষ্টি করবে না, যা শ্রবণকারী পুরুষের আবেগকে উদ্বেলিত করে তাকে সামনে পা বাড়াবার প্ররোচনা দেবে ও সাহস যোগাবে। এ ধরনের কথাবার্তা সম্পর্কে আল্লাহ পরিষ্কার বলেন, এমন কোনো নারীর পক্ষে এটা শোভনীয় নয়, যার মনে আল্লাহ ভীতি ও অসৎকাজ থেকে দূরে থাকার প্রবণতা রয়েছে। অন্যকথায় বলা যায়, এটা দুশ্চরিত্রা ও বেহায়া নারীদের কথা বলার ধরন মু'মিন ও মুত্তাকী নারীদের নয়। এই সাথে সূরা নূরের নিম্নোক্ত আয়াতটিও সামনে রাখা দরকার
(وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا) (আর তারা যেন যমীনের ওপর এমনভাবে পদাঘাত করে না চলে যার ফলে যে সৌন্দর্য তারা লুকিয়ে রেখেছে তা লোকদের গোচরীভূত হয়।)
এ থেকে মনে হয় বিশ্ব-জাহানের রবের পরিষ্কার উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে, নারীরা যেন অযথা নিজেদের স্বর ও অলংকারের ধ্বনি অন্য পুরুষদেরকে না শোনায় এবং যদি প্রয়োজনে অপরিচিতদের সাথে কথা বলতে হয়, তাহলে পূর্ণ সতর্কতা সহকারে বলতে হবে। এ জন্য নারীদের আযান দেয়া নিষেধ। তাছাড়া জামায়াতের নামাযে যদি কোনো নারী হাজির থাকে এবং ইমাম কোনো ভুল করেন তাহলে পুরুষের মতো তার সুবহানাল্লাহ বলার অনুমতি নেই, তার কেবলমাত্র হাতের ওপর হাত মেরে আওয়াজ সৃষ্টি করতে হবে যাতে ইমাম সতর্ক হয়ে যান।
এখন চিন্তার বিষয় হচ্ছে যে দীন নারীকে ভিন্ন পুরুষের সাথে কোমল স্বরে কথা বলার অনুমতি দেয় না এবং পুরুষদের সাথে অপ্রয়োজনে কথা বলতেও তাদেরকে নিষেধ করে, সে কি কখনো নারীর মঞ্চে এসে নাচগান করা, বাজনা বাজানো ও রঙ্গরস করা পছন্দ করতে পারে? সে কি রেডিও-টেলিভিশনে নারীদের প্রেমের গান গেয়ে এবং সুমিষ্ট স্বরে অশ্লীল রচনা শুনিয়ে লোকদের আবেগকে উত্তেজিত করার অনুমতি দিতে পারে? নারীরা নাটকে কখনো কারো স্ত্রীর এবং কখনো কারো প্রেমিকার অভিনয় করবে, এটাকে কি সে বৈধ করতে পারে? অথবা তাদেরক বিমানবালা (Air-hostess) করা হবে এবং বিশেষভাবে যাত্রীদের মন ভোলাবার প্রশিক্ষণ দেয়া হবে, কিংবা ক্লাবে, সামাজিক উৎসবে ও নারী-পুরুষের মিশ্র অনুষ্ঠানে তারা চমকপ্রদ সাজ-সজ্জা করে আসবে এবং পুরুষদের সাথে অবাধে মিলেমিশে কথাবার্তা ও ঠাট্টা-তামাসা করবে, এসবকে কি সে বৈধ বলবে? এ সংস্কৃতি উদ্ভাবন করা হয়েছে কোন কুরআন থেকে? আল্লাহর নাযিল করা কুরআন তো সবার সামনে আছে। সেখানে কোথাও যদি এ সংস্কৃতির অবকাশ দেখা যায় তাহলে সেখানটা চিহ্নিত করা হোক। দুই নারীদের স্বাভাবিক অবস্থান হবে তাদের গৃহে।
সূরা আহযাবের ৩৩ আয়াতে বলা হয়েছে- وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى অর্থ: তোমরা তোমাদের গৃহে অবস্থান কর এবং প্রাচীন জাহেলীয়াতের নারীদের মত সাজগোজ করে সৌন্দর্য প্রদর্শন করে ঘোরাফেরা করো না।
এ আয়াতে মূলত নারী-পুরুষের স্বাভাবিক সৃষ্টিগত পার্থক্য সার্বিক সামর্থ ও জন্মগত কর্মক্ষমতার ভিত্তিতে দায়িত্ব ক্ষেত্র বণ্টন করে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে নারীগণ তাদের পারিবারিক দায়িত্ব পালন ব্যাপদেশে নিজ নিজ গৃহে অবস্থান করবে। এর অর্থ এ নয় যে, কোনো অবস্থাতেই তারা ঘরের বাইরে যেতে পারবে না। সঙ্গত কারণে শরয়ী প্রয়োজনে তারা বাইরেও বের হতে পারবে। তবে বের হওয়াটা অবশ্যই শালীনতা ও শরয়ী পর্দা সহকারে হতে হবে। যেন রাসূলুল্লাহ -এর নবুওয়াত পূর্ব জাহেলী যুগের মহিলাদের ন্যায় শরীরটাকে সাজগোজ করে আকর্ষণীয়রূপে বের না হয়। আয়াতের শেষাংশে এ বিষয়টির প্রতিই দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে- বলা হয়েছে- وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى অর্থাৎ পূর্বতন জাহেলী যুগের নারীদের মত সাজগোজ করে পরিপাটি হয়ে বেরুবে না। পরপুরুষদের সামনে রূপসৌন্দর্য প্রকাশ করা যাবে না। একথারই সামনে আরেকটি আয়াতে সুস্পষ্টভাবে বলে দেয়া হয়েছে, বলা হয়েছে غَيْرَ مُتَبَرِّجَتٍ بِزِيْنَةٍ 'সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে।" নারীগণ প্রয়োজনের তাগিদে বাড়ি থেকে বেরুবে, তবে যেন দেহ সৌষ্ঠব ও রূপ-সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে বের হয়। যেন বোরকা বা সমস্ত শরীর আবৃত করে ফেলে এমন চাদর ব্যবহার করে। বিষয়টি আরও পরিষ্কারভাবে বলে দেয়া হয়েছে এ সূরার ৬০ আয়াতে- বলা হয়েছে- يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيُبِهِنَّ অর্থাৎ তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে টেনে দেয়ার নির্দেশনাকে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে চেহারার উপরে নেকাব পরার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। নেকাব ছাড়া শুধু বোরকা ও বড় চাদর ব্যবহার যথার্থ হতে পারে কিভাবে? বস্তুত নারী দেহের সৌন্দর্য ও আকর্ষণ তো তাদের চেহারাতে ফুটে উঠে। পর্দার প্রকৃত উদ্দেশ্য তো সামাজিক শান্তি ও নিরাপত্তা বিধানের কার্যকর ব্যবস্থা করা। যাবতীয় অশ্লীলতা, বেহায়াপনা ও যৌন অনাচার থেকে নারী সমাজের হেফাযত করা। আর এসবের সূচনা হয়ে থাকে সাধারণত নারী পুরুষের পারস্পরিক আকর্ষণ থেকে। আর এ আকর্ষণ সৃষ্টির প্রথম ও প্রধান নারী অঙ্গ হলো তাদের চেহারা। এমতাবস্থায় মুখমণ্ডল খোলা রেখে বোরকা বা বড় চাদর পরিধান করা পর্দার উদ্দেশ্য সাধনের কতটুকু সহায়ক হতে পারে?
আয়াতে কুরআনীতে নারীদের সেজেগুঁজে আকর্ষণীয় রূপ পরিগ্রহ করে ঘরের বাইরে গিয়ে প্রদর্শনী করাকে আল্লাহর ভাষায় الْأُولَى الْجَاهِلِيَّةِ প্রাচীন জাহেলিয়াত বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। হাদীসের ভাষায় এসব নারীদের পরিচয় দেয়া হয়েছে এভাবে যে, তাদের অবস্থা হলো
كَاسِيَاتٍ عَارِيَاتٍ مُّبِيْلَاتٍ مَّائِلَاتٍ
অর্থাৎ পোশাক পরিধান করেও উলঙ্গ থাকবে; রূপ-সৌন্দর্য ও সাজগোজ করে তারা পর-পুরুষকে নিজের দিকে আকর্ষিত করবে, আর ওরা নিজেরাও পর-পুরুষের প্রতি থাকবে আকর্ষিতা হয়ে। আল কুরআন একে 'প্রাচীন জাহেলিয়াত' বলায় যা বুঝা যায় তাহলো:
* আখেরী নবীর নবুওয়াতপূর্ব সময়ে তা ছিল নারী সমাজের বেহায়াপনার চিত্র ও পশুত্বের বহিঃপ্রকাশ। যা ইসলামী শিক্ষার ফলে ইসলামী সমাজ থেকে বিদূরিত হয়ে যায়। তাই আল কুরআনের আহ্বান হলো মুসলিম নারী সমাজ যেন অনাগত কালেও ইসলামের এ তাহযীব- তমদ্দুন সমাজে জারি রাখে, আর পূর্বের সেই জাহেলী সংস্কৃতির পুনঃপ্রচলন রোধে সোচ্চার থাকে।
* আল কুরআনের প্রাচীন জাহেলিয়াত অথবা প্রাথমিক জাহেলিয়াত বলার মধ্যে এমন ইঙ্গিত রয়েছে যে, সেই যুগের জাহেলিয়াত পরবর্তী কোনো এক যুগে পুনরায় আত্মপ্রকাশ করতে পারে। আজকের সমাজে নারী-প্রগতি ও নারী ক্ষমতায়নের নামে যে রকমের জাহেলিয়াত বিরাজ করছে তৎপ্রতি লক্ষ্য করলে আল কুরআনের সেই শাশ্বত বাণীর সত্যতাই প্রমাণিত হয়।
* আজকের সমাজে মানবতা বর্জিত বল্লাহারা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে 'প্রগতি' বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। আর ইসলামের শাশ্বত বিধান ও চিরসুন্দর ব্যবস্থাকে চিত্রায়িত করা হচ্ছে সেকেলে, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, ইত্যাদি বিশ্লেষণে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে ইসলামী সংস্কৃতিই যে মানবজাতির জন্য উন্নতি, প্রগতি ও চিরকল্যাণের গ্যারান্টি- সর্বকালের সকল মানুষের প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত করার একমাত্র ব্যবস্থা, যা বিশ্বস্রষ্টা তথা মানব স্রষ্টার অমোঘ বিধান। যার বিপরীতে মানবরচিত ও মানব প্রচলিত যে কোনো রীতি প্রথাই উন্নতি ও প্রগতি পরিপন্থী; এটা নতুন আঙ্গিকে নতুন খোলসে নতুন নামে নতুন সমাজে যতবার যতভাবেই আত্মপ্রকাশ করুক না কেন। সুতরাং প্রকৃত অর্থে আখেরী নবীর মাধ্যমে আল্লাহ প্রদত্ত আসমানী জীবন বিধান ইসলামী রীতিনীতি ছাড়া বাকি সকল ব্যবস্থাই প্রগতি পরিপন্থী।
* الْجَاهِلِيَةِ الْأُولَى বা 'প্রাচীন জাহেলিয়াত' বলে ইসলাম বিরোধী সকল প্রকার জাহেলিয়াত খতম হয়ে যাওয়ার প্রতি ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। কারণ ইসলামপূর্ব সকল ব্যবস্থাই স্থায়ী হওয়ার অযোগ্য বলে প্রমাণিত সত্যে পরিণত হয়েছে। যদিও যুগে যুগে মুনাফিকরা আর ইসলাম বিদ্বেষীরা তাকে বুকে ধরে রেখে সেই জাহেলিয়াত প্রতিষ্ঠার মিথ্যা স্বপ্নে বিভোর আর তার ব্যর্থ চেষ্টায় গলদঘর্ম। আল কুরআনের ঘোষণা:
جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا. অর্থ : "সত্য সমাগত অসত্য বিতাড়িত, আর অসত্য তো স্থায়ী হবার অযোগ্যই বটে।"
মহাগ্রন্থ আল কুরআনের এ অবিস্মরণীয় আয়াত প্রাচীন জাহেলী বা আদিম মূর্খ যামানার কদর্য ও ঘৃণিত রীতিনীতির দিকে ইশারা করতে গিয়ে বলেছে, বাইরে বের হওয়ার সময় সাজগোজ করার অভ্যাসটি জাহেলিয়াতের পরিত্যক্ত সম্পত্তি। এটা অনুসরণ আধুনিক জাহেলিয়াতের উপর আরও এক কদম এগিয়ে গেছে এবং তার যাবতীয় চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা ও অনুভূতি সব প্রাচীন জাহেলিয়াত থেকেই গৃহীত।
* বস্তুত জাহেলিয়াত (মূর্খতা-অজ্ঞতা) কোনো একটি নির্দিষ্ট যামানার বৈশিষ্ট্য নয় যে তা একটি নির্দিষ্ট কালে বা কোনো এক নির্দিষ্ট দেশে থাকবে। আসলে এ হচ্ছে একটা নির্দিষ্ট সামাজিক ব্যবস্থা, এর পেছনে জীবনের এক নির্দিষ্ট চিন্তা-ভাবনা সক্রিয় রয়েছে। হতে পারে এ অবস্থা আবারও আসবে, এ চিন্তা আবারও পুনরুজ্জীবিত হবে। পূর্বের জাহেলিয়াত তখন নব্য জাহেলিয়াতের জন্য দিশারী হিসেবে কাজ করবে- তা যখন যেভাবে এবং যেখানেই হোক না কেন।
❖ আধুনিক বিশ্বের প্রতি তাকালে দেখা যায় মানুষ এখন এক অন্ধ জাহেলিয়াতের দিকে এগিয়ে চলছে। যা ভালমন্দ কিছুই দেখতে পাচ্ছে না, যা স্রোতের গতিতে গা ভাসিয়ে দিয়ে স্থূল অনুভূতি নিয়ে এগিয়ে চলছে। যার চিন্তাধারার মধ্যে পাশবিকবৃত্তিই অধিক ক্রিয়াশীল। এটি মানব জাতিকে মানবতাবোধ থেকে সরিয়ে নিয়ে হীনতার অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করার জন্য বদ্ধপরিকর। (ফী যিলালিল কুরআন)