📘 আল কুরআনে নারীদের ২৫ সূরা > 📄 বিবাহযোগ্য নারী-পুরুষের বিয়ের ব্যবস্থা করা সমাজ ও অভিভাবকের কর্তব্য

📄 বিবাহযোগ্য নারী-পুরুষের বিয়ের ব্যবস্থা করা সমাজ ও অভিভাবকের কর্তব্য


وَانْكِحُوا الْأَيَامَىٰ مِنْكُمْ وَالصَّلِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ ۚ إِنْ يَكُونُوا فُقَرَاءَ يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ ۗ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ وَلْيَسْتَعْفِفِ الَّذِينَ لَا يَجِدُونَ نِكَاحًا حَتَّىٰ يُغْنِيَهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ ۗ وَالَّذِينَ يَبْتَغُونَ الْكِتَابَ مِمَّا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ فَكَاتِبُوهُمْ إِنْ عَلِمْتُمْ فِيهِمْ خَيْرًا ۖ وَآتُوهُمْ مِنْ مَالِ اللَّهِ الَّذِي آتَاكُمْ ۚ وَلَا تُكْرِهُوا فَتَيَاتِكُمْ عَلَى الْبِغَاءِ إِنْ أَرَدْنَ تَحَصُّنًا لِتَبْتَغُوا عَرَضَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۚ وَمَنْ يُكْرِهُهُنَّ فَإِنَّ اللَّهَ مِنْ بَعْدِ إِكْرَاهِهِنَّ غَفُورٌ رَحِيمٌ
অর্থ: তোমাদের মধ্যে যারা 'অবিবাহিত তাদের বিবাহ সম্পাদন করো এবং তোমাদের দাস দাসীদের মধ্যে যারা সৎ তাদেরও। তারা অভাবগ্রস্ত হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দিবেন; আল্লাহ তো প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। যাদের বিবাহের সামর্থ্য নেই, আল্লাহ তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে অভাবমুক্ত না করা পর্যন্ত তারা যেন সংযম অবলম্বন করে এবং তোমাদের মালিকানাধীন দাস-দাসীদের মধ্যে কেউ তার মুক্তির জন্য লিখিত চুক্তি চাইলে, তাদের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হও, যদি তোমরা তাদের মধ্যে কল্যাণের সন্ধান পাও। আল্লাহ তোমাদেরকে যে সম্পদ দিয়েছেন তা হতে তোমরা তাদেরকে দান করবে। তোমাদের দাসিগণ, সতীত্ব রক্ষা করতে চাইলে পার্থিব জীবনের লোভ-লালসায় তাদেরকে ব্যভিচারিণী হতে বাধ্য করো না, আর যে তাদেরকে বাধ্য করে, তবে তাদের উপর জবরদস্তির পর আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
(সূরা আন নূর: আয়াত: ৩২-৩৩)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: আলোচ্য আয়াতে اَیَامی শব্দটি বহুবচন। এর অর্থ যে পুরুষের স্ত্রী নেই অথবা যে নারীর স্বামী নেই। আয়াতের তরজমায় 'জুড়িহীন' শব্দ দিয়ে একথাটি বুঝানো হয়েছে। শব্দটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ যে নারী বা পুরুষের এখনো বিয়ে হয়নি; অথবা বিয়ে হয়েছে; কিন্তু নারীটির স্বামী বা পুরুষটির স্ত্রী মারা গেছে; অথবা তালাক হয়ে গেছে। এসবের যে কোনো কারণে স্বামী-স্ত্রীবিহীন নর-নারীকে বিয়ে করানোর নির্দেশ রয়েছে আলোচ্য আয়াতে।
ইসলাম যেমন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। তেমনি ইসলামী শরীয়ত একটি সুষম শরীয়ত। এর যাবতীয় বিধি-বিধানে সমতা নিহিত আছে। একদিকে এসব ব্যাপারে বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আর একদিকে মানুষকে অবৈধ পন্থায় নিজ কামপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করা থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে, অপরদিকে স্বভাবগত চাহিদা ও কামনা-বাসনার প্রতি লক্ষ্য রেখে এর বৈধ বিশুদ্ধ পথও বলে দেয়া হয়েছে। তাছাড়া মানব জাতির অস্তিত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার উদ্দেশ্যে কতিপয় সীমার ভেতরে থেকে নর-নারীর মেলামেশার কোনো পন্থা প্রবর্তন করাটা যুক্তি ও শরীয়তের দাবী। কুরআন-সুন্নাহর পরিভাষায় এ পন্থার নাম বিবাহ। আলোচ্য আয়াতে এ সম্পর্কে স্বাধীন নর-নারীদের অভিভাবক এবং দাস-দাসীদের মালিকদেরকে এদের বিবাহ সম্পাদন করা আদেশ দেয়া হয়েছে।
আলোচ্য আয়াতের বর্ণনাভঙ্গী থেকে একথা প্রমাণিত হয় এবং এ ব্যাপারে ইমামগণও একমত যে, নিজের বিয়ে নিজেই সম্পাদন করার জন্য কোনো পুরুষ ও নারীর প্রত্যক্ষ পদক্ষেপ নেয়ার পরিবর্তে অভিভাবকদের মাধ্যমে এ কাজ সম্পাদন করাই বিবাহের মসনূন তরিকা ও উত্তম পন্থা। এতে অনেক ধর্মীয় ও পার্থিব উপকারিতা আছে।
বিশেষত মেয়েদের বিবাহ, তারা নিজেরাই সম্পন্ন করবে- এটা যেমন একটা নির্লজ্জ কাজ, তেমনি এতে অশ্লীলতার পথ খুলে যাওয়ারও সমূহ সম্ভাবনা থাকে। এ কারণেই কোনো কোনো হাদীসে নারীদেরকে অভিভাবকদের মাধ্যম ছাড়া নিজেদের বিবাহ নিজেরা সম্পাদন করা থেকে বাধাও দেয়া হয়েছে। ইমাম আবু হানীফা ও অন্য ইমামের মতে এ বিধানটি একটি বিশেষ সুন্নাত ও শরীয়তগত নির্দেশের মর্যাদা রাখে। যদি কোনো প্রাপ্তবয়স্কা বালিকা নিজের বিবাহ অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া 'কুফু' সম্মত তথা সমতুল্য লোকের সাথে সম্পাদন করে, তবে বিবাহ শুদ্ধ হয়ে যাবে। যদিও সুন্নাতের খেলাপ হওয়ার কারণে বালিকাটি তিরস্কারের যোগ্য হবে, যদি সে কোনোরূপ বাধ্যবাধকতার পরিপ্রেক্ষিতে এ পদক্ষেপ না নিয়ে থাকে।
ইমাম শাফেঈ ও অন্য ইমামের মতে অভিভাবকদের মাধ্যমে না হলে প্রাপ্তবয়স্কা বালিকার বিবাহও বাতিল গণ্য হবে। আলোচ্য আয়াত থেকে অধিকতরভাবে একথাই প্রমাণিত হয় যে, বিবাহে অভিভাবকের মধ্যস্থতা বাঞ্ছনীয়। এখন কেউ যদি অভিভাবকের মধ্যস্থতা ছাড়াই বিবাহ করে, তবে তা শুদ্ধ হবে কিনা আয়াত সে ব্যাপারে নিরব। বিশেষত এ কারণেই যে اَیَامی শব্দের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও নারী উভয়ই অন্তর্ভুক্ত। প্রাপ্তবয়স্ক বালকদের বিবাহ অভিভাবকের মধ্যস্থ ছাড়া সবার মতেই শুদ্ধ- কেউ এটাকে বাতিল বলে না। এমনিভাবে বাহ্যত বুঝা যায় যে, প্রাপ্তবয়স্কা বালিকা নিজের বিবাহ নিজেই সম্পাদন করলে তাও শুদ্ধ হয়ে যাবে। তবে সুন্নাত পরিপন্থী হওয়ার কারণে উভয়কেই তিরস্কার করা হবে। (মাআরেফুল কুরআন)
আলোচ্য আয়াতে অভিভাবক ও মুসলিম সমাজকে আদেশ দেয়া হয়েছে তারা যেন প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে মেয়েদের বিয়ে সম্পাদন করে দেয়। অধিকাংশ ইমাম তাফসীরকারের মতে এ আদেশ বাধ্যতামূলক নয়; বরং উপদেশ মূলক। তাদের প্রমাণ হলো রাসূলের যুগে অনেক লোক স্বামীহীন স্ত্রীহীন অবস্থায় জীবন কাটিয়েছে। তাদের তো বিয়ে দেয়া হয়নি। এ আয়াতের আদেশ বাধ্যতামূলক হলে তাদেরকে অবশ্যই বিয়ে দেয়া হতো। কিন্তু তাফসীরে "ফী যিলালিল কুরআন"-এর লেখক সাইয়েদ কুতুব শহীদ এর মতে এ আদেশ অবশ্যই বাধ্যতামূলক। তবে তা এ অর্থে নয় যে, রাষ্ট্র ও সরকার স্বামী-স্ত্রীহীন নর-নারীকে বিয়ে করতে বাধ্য করবে; বরং তার অর্থ এই যে, তাদের মধ্যে যারা বিয়ে করতে ইচ্ছুক, তাদেরকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে তাদের সতীত্ব ও শ্লীলতাকে নিরাপদ রাখা ও সংরক্ষণ করা ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অবশ্য কর্তব্য বা ওয়াজিব। কেননা বিয়ে হচ্ছে সতীত্বকে কার্যকরভাবে সংরক্ষণ এবং সমাজকে ব্যভিচার ও অশ্লীলতা থেকে পবিত্র করা ও পবিত্র রাখার পন্থা ও উপায়। সমাজকে ব্যভিচার থেকে পবিত্র রাখা যখন ওয়াজিব, তখন তার পন্থা ও উপায় অবলম্বন করাও ওয়াজিব।
'আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দিবেন' এর অর্থ এ নয় যে, যারই বিয়ে হবে আল্লাহ তাকেই ধনাঢ্য করে দেবেন; বরং এখানে বক্তব্য হচ্ছে, লোকেরা যেন এ ব্যাপারে খুব বেশি হিসেবী না বনে যায়। এর মধ্যে মেয়ে পক্ষের জন্যও নির্দেশ রয়েছে। বলা হয়েছে, সৎ ও ভদ্র রুচিশীল ব্যক্তি যদি তাদের কাছে পয়গাম পাঠায়, তাহলে নিছক তার দারিদ্র্য দেখেই যেন তা প্রত্যাখ্যান না করা হয়। ছেলে পক্ষকেও নির্দেশ দেয়া হয়েছে, কোন যুবককে নিছক এখনো খুব বেশি আয়-রোজগার করছে না বলে যেন আইবুড়ো করে না রাখা হয়। আর যুবকদেরকেও উপদেশ দেয়া হচ্ছে, বেশি সচ্ছলতার অপেক্ষায় বসে থেকে নিজেদের বিয়ের ব্যাপারকে অযথা পিছিয়ে দিয়ো না। সামান্য আয় রোজগার হলেও আল্লাহর ওপর ভরসা করে বিয়ে করে নেয়া উচিত। অনেক সময় বিয়ে নিজেই মানুষের আর্থিক সচ্ছলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্ত্রীর সহায়তায় খরচপাতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। দায়িত্ব মাথার ওপর এসে পড়ার পর মানুষ নিজেও আগের চাইতেও বেশি পরিশ্রম ও প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। অর্থকরী কাজে স্ত্রী সাহায্য করতে পারে। আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, ভবিষ্যতে কার জন্য কী লেখা আছে তা কেউ জানতে পারে না। ভালো অবস্থা খারাপ অবস্থায়ও পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে এবং খারাপ অবস্থা পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে ভালো অবস্থায়। কাজেই মানুষের প্রয়োজনের অতিরিক্ত হিসেবী হওয়া উচিত নয়।
'যাদের বিবাহের সামর্থ্য নেই, আল্লাহ তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে অভাবমুক্ত না করা পর্যন্ত তারা যেন সংযম অবলম্বন করে' এ প্রংসগে নবী থেকে যে হাদীসগুলো বর্ণিত হয়েছে সেগুলোই এ আয়াতগুলোর সবচেয়ে ভালো ব্যাখ্য হতে পারে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বর্ণনা করেছেন, নবী বলেন, "হে যুবকগণ! তোমাদের মধ্য থেকে যে বিয়ে করতে পারে তার বিয়ে করে নেয়া উচিত। কারণ এটি হচ্ছে চোখকে কুদৃষ্টি থেকে বাঁচাবার এবং মানুষের সততা ও সতীত্ব রক্ষার উৎকৃষ্ট উপায়। আর যার বিয়ে করার ক্ষমতা নেই তার রোযা রাখা উচিত। কারণ রোযা মানুষের দেহের উত্তাপ ঠাণ্ডা করে দেয়।" (বুখারী ও মুসলিম)
আবু হুরাইরা বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ বলেন, "তিন ব্যক্তিকে সাহায্য করা আল্লাহর দায়িত্ব। এক বক্তি হচ্ছে, যে চারিত্রিক বিশুদ্ধতা বজায় রাখার জন্য বিয়ে করে। দ্বিতীয় ব্যক্তি হচ্ছে, মুক্তিলাভের জন্য যে গোলাম লিখিতভাবে চুক্তিবদ্ধ হয় এবং তার মুক্তিপণ দেয়ার নিয়ত রাখে। আর তৃতীয় ব্যক্তি, যে আল্লাহর পথে জিহাদ করার জন্য বের হয়।" (তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, আহমাদ।)

📘 আল কুরআনে নারীদের ২৫ সূরা > 📄 পিতা-মাতার ঘরে প্রবেশের ক্ষেত্রে যে তিন সময় অনুমতি নিতে হবে

📄 পিতা-মাতার ঘরে প্রবেশের ক্ষেত্রে যে তিন সময় অনুমতি নিতে হবে


يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِيَسْتَأْذِنُكُمُ الَّذِينَ مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ وَ الَّذِينَ لَمْ يَبْلُغُوا الْحُلُمَ مِنْكُمْ ثَلَثَ مَرَّتٍ مِنْ قَبْلِ صَلوةِ الْفَجْرِ وَ حِينَ تَضَعُوْنَ ثِيَابَكُمْ مِّنَ الظَّهِيرَةِ وَ مِنْ بَعْدِ صَلوةِ الْعِشَاءِ ، ثَلَثُ عَوْرَتٍ لَّكُمْ لَيْسَ عَلَيْكُمْ وَلَا عَلَيْهِمْ جُنَاحٌ بَعْدَهُنَّ طُوفُونَ عَلَيْكُمْ بَعْضُكُمْ عَلَى بَعْضٍ * كَذلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْآيَتِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ.
অর্থ: হে মু'মিনগণ! তোমাদের মালিকানাধীন দাস-দাসিগণ এবং তোমাদের মধ্যে যারা বয়ঃপ্রাপ্ত হয়নি তারা যেন তোমাদের কক্ষে প্রবেশ করতে তিন সময়ে অনুমতি গ্রহণ করে, ফজরের সালাতের পূর্বে, দ্বিপ্রহরে যখন তোমরা তোমাদের পোশাক খুলে রাখো তখন এবং 'ইশার সালাতের পর; এ তিন সময় তোমাদের গোপনীয়তার সময়। এ তিন সময় ব্যতীত অন্য সময়ে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করলে তোমাদের জন্য এবং তাদের জন্য কোনো দোষ নেই। তোমাদের একে অপরের নিকট তো যাতায়াত করতেই হয়। এভাবে আল্লাহ তোমাদের নিকট তাঁর নির্দেশ সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। (সূরা আন নূর: আয়াত-৫৮)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ঈমানদারদের সম্বোধন করে বলেছেন, "হে ঈমানদারগণ! তোমাদের দাস-দাসী তথা চাকর-চাকরানীগণ আর তোমাদের যারা এখনো বুদ্ধির পরিপক্কতার পর্যায়ে পৌছেনি অর্থাৎ প্রাপ্তবয়স্ক হয়নি, তারা তোমাদের কক্ষে যেতে হলে এমন তিনটি সময় আছে যখন তারা তোমাদের কাছ থেকে প্রবেশের অনুমতি গ্রহণ করবে। কারণ এ তিনটি সময় হচ্ছে তোমাদের পর্দার সময়। অর্থাৎ এ তিনটি সময় মানুষের সাধারণ অভ্যাস অনুযায়ী একান্তবাস ও বিশ্রাম নেয়ার সময়। এ সময় মানুষ খোলামেলা থাকতে চায়, একান্তে এ সময়ে কখনো কখনো আবৃত অঙ্গও খুলে বা প্রয়োজন কেনো অঙ্গ খোলা হয়ে থাকে। তাই এমন তিনটি সময়ে নিজের চাকর-চাকরানী বা ছেলে মেয়েরা তোমাদের কক্ষে যেতে হলে অবশ্যই আগে তোমাদের অনুমতি নিতে হবে। এই তিনটি সময় হলো:
১. ফজরের নামাযের পূর্বে।
২. দুপুরে যখন তোমরা দেহের শিথিলতাকল্পে কিছুটা অনাবৃত হয়ে থাকে।
৩. ইশার নামাযের পর।
এ তিন সময় ছাড়া তাদের তোমাদের কাছে তোমাদের কক্ষে প্রবেশ করতে কোনো বাধা নেই। কেননা তোমাদের একে অন্যের কাছে বার বার আসা যাওয়া করতেই হয়। সুতরাং সবসময় অনুমতি চেয়ে প্রবেশ করা কষ্টকর। আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য এমনিভাবে বিধানাবলি সুস্পষ্টভাবে বিবৃত করেন, যেন তোমরা দুনিয়ার জীবনে ভাল হয়ে থাকতে পার। আল্লাহ তো সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়। কাজেই মানষের জন্য কিসে কল্যাণ আর কিসে ক্ষতি তা তিনিই ভাল জানেন। মানুষের স্বভাব-প্রকৃতির স্রষ্টা রাব্বুল আলামীন। তিনিই সম্যক উপলব্ধি করতে পারেন মানুষের সার্বিক অবস্থা। আর সেভাবেই তিনি মানুষের জন্য হুকুম-আহকাম দিয়ে থাকেন।
মূলে 'আওরাত' শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। বলা হয়েছে, "এ তিনটি সময় তোমাদের জন্য আওরাত।' আওরাত বলতে আমাদের ভাষায় মেয়েলোক বা নারী জাতি বুঝায়। কিন্তু আরবী ভাষায় এর মানে হয় বাধা ও বিপদের জায়গা এবং যে জিনিসের খুলে যাওয়া মানুষের জন্য লজ্জার ব্যাপার এবং যার প্রকাশ হয়ে পড়া তার জন্য বিরক্তিকর হয় এমন জিনিসের জন্যও এ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। তাছাড়া কোনো জিনিসের অসংরক্ষিত হওয়া অর্থেও এর ব্যবহার হয়। এ অর্থগুলো সবই পরস্পর নিকট সম্পর্কযুক্ত এবং আয়াতের অর্থের সাথে কোনো না কোনো পর্যায়ে সংযুক্ত। এর অর্থ হচ্ছে এ সময়গুলোতে তোমরা একাকী বা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে এমন অবস্থায় থাকো যে অবস্থায় গৃহের ছেলে মেয়ে বা চাকর বাকরদের হঠাৎ নির্জন স্থানে আসতে চায় তখন তাদের পূর্বাহ্নে অনুমতি নেবার নির্দেশ দাও।
এ তিন সময় ছাড়া অন্য সময় নাবালক ছেলে মেয়েরা এবং গৃহস্বামীর ও গৃহকর্ত্রীর মালিকানাধীন গোলাম ও বাঁদীরা সবসময় নারীর ও পুরুষদের কাছে তাদের কামরায় বা নির্জন স্থানে বিনা অনুমতিতে যেতে পারে। এ সময় যদি তোমরা কোনো অসতর্ক অবস্থায় থাকো এবং তারা অনুমতি ছাড়াই এসে যায় তাহলে তাদের হুমকি ধমকি দেবার অধিকার তোমাদের নেই। কারণ কাজের সময় নিজেদেরকে এ ধরনের অসতর্ক অবস্থায় রাখা তোমাদের নিজেদেরই বোকামী ছাড়া তো আর কিছুই নয়। তবে যদি তোমাদের শিক্ষা দীক্ষা সত্ত্বেও নির্জনবাসের এ তিন সময় তারা অনুমতি ছাড়াই আসে তাহলে তারা দোষী হবে। অন্যথায় তোমরা নিজেরাই যদি তোমাদের সন্তান ও গোলামী-বাঁদীদের এ আদব-কায়দা ও আচার-আচরণ শিক্ষা না দিয়ে থাকো, তাহলে তোমরা নিজেরাই গোনাহগার হবে।
উপরিউক্ত তিনটি সময় ছাড়া অন্য সবসময় ছোট ছেলে মেয়ে ও গোলাম-বাঁদীদের বিনা হুকুমে আসার সাধারণ অনুমতি দেবার এটিই হচ্ছে কারণ। এ থেকে উসূলে ফিক্‌হের এ বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, শরীয়াতের বিধানসমূহ কোনো না কোনো প্রয়োজন ও উপযোগিতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এবং প্রত্যেক হুকুমের পেছনে নিশ্চিতভাবেই কোনো না কোনো কার্যকারণ আছেই, তা বিবৃত হোক বা না হোক

📘 আল কুরআনে নারীদের ২৫ সূরা > 📄 বৃদ্ধাদের জন্য পর্দার বিধান

📄 বৃদ্ধাদের জন্য পর্দার বিধান


وَالْقَوَاعِدُ مِنَ النِّسَاءِ الَّتِي لَا يَرْجُونَ نِكَاحًا فَلَيْسَ عَلَيْهِنَّ جُنَاحٌ أَنْ يَضَعْنَ ثِيَابَهُنَّ غَيْرَ مُتَبَرِّجُتٍ بِزِينَةٍ وَأَنْ يَسْتَعْفِفْنَ خَيْرٌ لَّهُنَّ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ .
অর্থ: বৃদ্ধা নারী, যারা বিবাহের আশা রাখে না, তাদের জন্য অপরাধ নেই, যদি তারা তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে তাদের বহির্বাস খুলে রাখে; তবে এটা হতে তাদের বিরত থাকাই তাদের জন্য উত্তম। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। (সূরা আন নূর: আয়াত-৬০)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: আলোচ্য আয়াতে নারীদের পর্দার একটা ব্যতিক্রম অবস্থার উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ যে বৃদ্ধা নারীর প্রতি কেউ আকর্ষণ বোধ করে না, আর সে বিবাহেরও যোগ্য নয়, তার জন্য পর্দার বিধান এমনভাবে শিথিল করা হয়েছে যে, একজন অনাত্মীয় ব্যক্তিও তার জন্য মুহরিমের মত হয়ে। মুহরিমের সামনে যেসব অংগ আবৃত করা জরুরি নয়, এ বৃদ্ধার জন্য বেগানা পুরুষদের সামনেও সেসব অংগ আবৃত করা জরুরি নয়। এ আয়াতে বলা হয়েছে وَالْقَوَاعِدُ مِنَ النِّسَاءِ অর্থাৎ "মহিলাদের মধ্য থেকে যারা বসে পড়েছে" অথবা "বসে পড়া মহিলারা।" এর অর্থ হচ্ছে, হতাশার বয়স অর্থাৎ মহিলাদের এমন বয়সে পৌঁছে যাওয়া যে বয়সে আর তাদের সন্তান জন্ম দেবার যোগ্যতা থাকে না। যে বয়সে তার নিজের যৌন কামনা মৃত হয়ে যায় এবং তাকে দেখে পুরুষদের মধ্যেও কোনো যৌন আবেগ সৃষ্টি হতে পারে না। পরবর্তী বাক্য এ অর্থের দিকেই ইংগিত করেছে।
মূল শব্দ হচ্ছে يَضَعْنَ ثِيَابَهُنَّ "নিজেদের কাপড় নামিয়ে রাখে।" কিন্তু এর অর্থ সমস্ত কাপড় নামিয়ে উলংগ হয়ে যাওয়া তো হতে পারে না। তাই সকল মুফাস্সির ও ফকীহ্ সর্বসম্মতভাবে এর অর্থ নিয়েছেন এমন চাদর যার সাহায্যে সাজসজ্জা ও সৌন্দর্য লুকিয়ে রাখার হুকুম সূরা আহযাবের আয়াতে দেয়া হয়েছে। এখানে আরো বলা হচ্ছে غَيْرَ مُتَبَرِجُتٍ بِزِينَةٍ অর্থাৎ "সৌন্দর্য সহকারে সাজসজ্জা প্রকাশকারী হয় না। تَبَرَّجُ মানে হচ্ছে প্রকাশ ও প্রদর্শনী করা। তাবারুজ বলা হয় এমন খোলা নৌকা বা জাহাজকে যার ওপর ছাদ হয় না। এ অর্থে মহিলাদের জন্য এ শব্দটি তখনই বলা হয় যখন তারা পুরুষদের সামনে তাদের নিজেদের সৌন্দর্য ও সাজসজ্জা প্রদর্শনী করে। কাজেই আয়াতের অর্থ হচ্ছে, চাদর নামিয়ে দেবার এ অনুমতি এমন সব বৃদ্ধাদেরকে দেয়া হচ্ছে যাদের সাজসজ্জা করার ইচ্ছা ও শখ খতম হয়ে গেছে এবং যৌন আবেগ শীতল হয়ে গেছে। কিন্তু যদি এ আগুনের মধ্যে এখনো একটি স্ফুলিংগ সজীব থেকে থাকে এবং তা সৌন্দর্যের প্রদর্শনীর রূপ অবলম্বন করতে থাকে তাহলে আর এ অনুমতি থেকে লাভবান হওয়া যেতে পারেনা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00