📄 কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীণ হলেন সতী-স্বাধ্বী নারী মারইয়াম
فَأَتَتْ بِهِ قَوْمَهَا تَحْمِلُهُ قَالُوا يُمَرْيَمُ لَقَدْ جِئْتِ شَيْئًا فَرِيًّا. يَأُخْتَ هَرُوْنَ مَا كَانَ أَبُوكِ امْرَأَ سَوْءٍ وَمَا كَانَتْ أُمُّكِ بَغِيًّا.
অর্থ: অতঃপর সে সন্তানকে নিয়ে তার সম্প্রদায়ের নিকট উপস্থিত হলো; তারা বলল, 'হে মারইয়াম! তুমি তো এক অদ্ভুত কাণ্ড করে বসেছ। 'হে হারূন-ভগ্নি! তোমার পিতা অসৎ ব্যক্তি ছিলেন না এবং তোমার মাতাও ছিল না ব্যভিচারিণী।' (সূরা মারইয়াম: আয়াত: ২৭-২৮)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: আলোচ্য আয়াত দুটোতে মারইয়াম-এর গর্ভে ঈসা -এর জন্মগ্রহণের ফলে মারইয়াম সমাজের লোকদের দ্বারা যে তিরস্কৃত হয়েছিলেন সে কথাগুলো বিবৃত হয়েছে। বিষয়টি সূরা মারইয়ামের দ্বিতীয় রুকু'র ১৬ আয়াত থেকে ৩৫ আয়াত পর্যন্ত বর্ণনা করা হয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা নবী করীম -কে বলেছেন, এ কিতাব মারইয়ামের কাহিনী বর্ণনা করো। সূরা আলে মারইয়ামকে বায়তুল মাকদাসে ইবাদাতে বসিয়ে দিলেন। মারইয়ামের খালু যাকারিয়া থেকে দেখাশুনার দায়িত্ব নিলেন। এক সময় মারইয়াম নিজের লোকজন থেকে পূর্বদিকে গোসলের জন্য গেলেন এবং পর্দা করে নিলেন। আল্লাহ তায়ালা জিবরাঈল আমীনকে মারইয়ামের কাছে পাঠালেন। জিবরাঈল পূর্ণ মানবকৃতিতে মারইয়ামের সামনে উপস্থিত হলেন। মারইয়াম ভয় পেয়ে গেলেন আর বললেন, আমি দয়াময় আল্লাহর আশ্রয় চাই তোমার থেকে, যদি তুমি তাকওয়াবান লোক হও। জিবরাঈল বললেন, আমি তোমার রবের প্রেরিত দূত। আমি এসেছি তোমাকে একটি পবিত্র ছেলে দান করতে। (ভয় করো না, আমি তো মানুষ নই) এতে মারইয়াম কিছুটা নিণ্ডিত হয়ে বললেন, "আমার ছেলে হবে কীভাবে? যখন আমাকে কোনো পুরুষ স্পর্শ করেনি, আর আমি চরিত্রহীনরাও নই।” ফেরেশতা বললেন, "এভাবেই হবে।” (একথাটি যাকারিয়াকেও বলা হয়েছিল)। তোমার রব বলেছেন এটা তো আমার পক্ষে খুবই সহজ। আর আমি এটা এজন্য করবো যে, একে মানবজাতির জন্য একটা নিদর্শন হিসেবে বানাব এবং আমার পক্ষ থেকে রহমত বানিয়ে রাখব। এটা (পিতা ছাড়া ছেলে তৈরি করা ঈসাকে সৃষ্টি করা) তো একটা স্থিরকৃত কাজ। এ কথোপকথন চলছিল, হঠাৎ মারইয়ামের গ্রীরাদেশ থেকে কাপড় একটু সরে গেলে জিবরাইল তাঁর বুকের উপরিভাগের উন্মুক্ত স্থানে ফুঁ দিলেন আর পুত্র সন্তানের ভ্রুণ তাঁর গর্ভে সঞ্চারিত হলো। অতঃপর মারইয়াম যখন গর্ভ ধারণের লক্ষণ অনুভব করলেন তখন তিনি গর্ভসহ দূরবর্তী স্থানে চলে গেলেন।
তারপর প্রসবের সময় হলে যখন মারইয়াম-এর প্রসব বেদনা শুরু হলো, তখন তিনি একটি খেজুর গাছের নীচে আশ্রয় নিলেন। যাতে করে তিনি গাছের উপর ভর দিয়ে উঠা-নামা করতে পারেন। এ সময় তাঁর কোনো সঙ্গী-সাথী ছিল না। অথচ তিনি ছিলেন
প্রসব ব্যথায় অস্থির। সে সময় আরাম ও দরকারী যেসব উপকরণ কাছে থাকা উচিত ছিল, তার কিছুই তাঁর কাছে ছিল না। তাছাড়া সন্তান প্রসবের পর দুর্নামের আশঙ্কাও তাঁর মনকে অস্থির করে রেখেছিল। সেই কঠিনতম মুহূর্তে মারইয়াম দৈহিক ও মানসিক যন্ত্রণায় কত অসহায় ছিলেন তা ভুক্তভোগী নারীরাই বুঝতে পারেন। তখন তিনি বলতে লাগলেন -
يُلَيْتَنِي مِتُّ قَبْلَ هَذَا وَكُنْتُ نَسْيًا مَنْسِيًّا.
অর্থ: "হায়, আমি যদি এ অবস্থার আগেই মরে যেতাম আর আমার নামনিশানাও সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যেতো!” (সূরা মারইয়াম: আয়াত-২৩)
এমতাবস্থায় আল্লাহর নির্দেশে জিবরাঈল সেখানে পৌঁছে নিম্নভূমিতে অবস্থান নিলেন। তিনি নিম্নস্থান থেকে আওয়াজ দিয়ে বললেন, তুমি দুঃখ ও চিন্তা করো না। তোমার রব তোমার পাদদেশে একটি নহর বা ঝরনা প্রবাহিত করে দিয়েছেন, আর তুমি খেজুর গাছের কাণ্ড ধরে নিজের দিকে নাড়া দাও, তা থেকে তোমার উপর সুপক্ক খেজুর ঝরে পড়বে। সন্তান প্রসবের পর মারইয়াম ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়লে রাব্বুল আলামীন তাঁর খাদ্য হিসেবে এ সবের ব্যবস্থা করে দিলেন। শুকনো খেজুর গাছ তাজা হয়ে গেল এবং পাকা খেজুর দেখা দিল। আর পায়ের নিচে ঝর্ণা প্রবাহিত হলো। আল্লাহর পক্ষ থেকে ফেরেশতা মারইয়ামকে বললেন, তুমি খাও, পান করো, আর চোখ শীতল করো। অর্থাৎ খেজুর খেয়ে ক্ষুধা মিটাও, ঝরনার পানি পান করে তৃষ্ণা নিবারণ করো আর পুত্রকে দেখে ও আল্লাহর প্রিয় পাত্র হওয়ার কারণে চক্ষু শীতল করো এবং আনন্দিত থাক। বাকি দুর্নামের সমাধান হলো, যখনই কোনো মানুষ তোমার ছেলে দেখে তোমাকে প্রশ্নের সম্মুখিন করে তখন তুমি নিজে কোনো জবাব দিবে না, ইেিত বলবে আমি রহমান আল্লাহর জন্য রোযা রেখেছি, তাই কারো সাথে কথা বলবো না, আর বাচ্চার দিকে ইশারা করে তার কাছে জবাব শুনতে বলবে। দেখবে নবজাত শিশু আল্লাহর হুকুমে অস্বাভাবিকভাবে কথা বলে জবাব দিবে। এভাবে তোমার পবিত্রতা ও সতীত্বের অলৌকিক প্রমাণ প্রকাশিত হবে।
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, সন্তান প্রসবের সময় উপস্থিত হওয়ার মুহূর্তে মারইয়াম যে বলেছিলেন, "হায়! আমি যদি এ অবস্থার আগেই মরে যেতাম আর আমার নামনিশাও সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যেতো!” এ শব্দগুলো থেকেই বুঝা যায় মারইয়াম কত জটিল অবস্থায় পতিত হয়েছিলেন, কত কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন। অবস্থার নাজুকতা অনুধাবন করতে পারলে সবাই বুঝতে পারবেন, তাঁর মুখে এসব শব্দ কেবল প্রসব বেদনার কারণেই উচ্চারিত হয়নি। বরং এ চিন্তাই তাঁকে অস্থির করে তুলেছিল যে, আল্লাহ তাঁকে যে মারাত্মক ও কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করে দিলেন, তা থেকে তিনি মান-সম্মান নিয়ে কীভাবে নিষ্কৃতি পেতে পারেন। সমাজে তিনি কীভাবে সসম্মানে ঠাঁই পাবেন। এতদিন তো গর্ভকে লোক চক্ষুর আড়ালে কোনোভাবে লুকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন, কিন্তু এখন এ বাচ্চাকে কোথায় কীভাবে লুকিয়ে রাখবেন।
শেষ পর্যন্ত সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞ আল্লাহ তায়ালার কুদরতে মারইয়ামের ছেলে ঈসা পিতা ছাড়া কেবল মাতা থেকেই জন্মগ্রহণ করেন। জনমানবশূন্য ময়দানে একমাত্র আল্লাহর সাহায্যে মারইয়াম সন্তান প্রসব করলেন, ক্ষুধা-তৃষ্ণা থেকে বাঁচলেন আর মানুষের তোহমত থেকে বাঁচার পথও আল্লাহ পাক বলে দিলেন। বলে দিলেন, বাচ্চা সম্পর্কে মানুষের প্রশ্নের জবাবে তোমাকে কিছু বলতে হবে না। তার জন্ম সম্পর্কে যে কেউই প্রশ্ন তুলবে তার জবাব দানের ব্যবস্থা করা আমার দায়িত্ব। উল্লেখ্য, বনী ইসরাঈলের সমাজে চুপ থাকার রোযা রাখার রেওয়াজ ছিল।
মারইয়াম নবজাত সন্তান ঈসাকে নিয়ে লোকালায় এলে লোকেরা তাজ্জব হয়ে তাকে উপরোক্ত প্রশ্নগুলোর সম্মুখীন করলো। তাদের প্রশ্নগুলোর সারকথা ছিল এই যে, যার গোটা পরিবারই অত্যন্ত পবিত্র ও উন্নত চরিত্রের, তার দ্বারা এরূপ কাণ্ড হওয়া কত বড় সর্বনাসের কথা! মারইয়াম এসব প্রশ্নের কোনো জবাব না দিয়ে সদ্যজাত সন্তানের দিকে ইশারা করলেন। ইশারায় তিনি বুঝিয়ে দিলেন যে যা কিছু বলার ও জিজ্ঞেস করার আছে তা এ শিশুকেই জিজ্ঞেস করো। তার কাছেই তোমাদের জিজ্ঞাস্য বিষয়গুলোর জবাব পাবে। লোকেরা মনে করলো মারইয়াম তাদের সাথে উপহাস করছে। তাই তারা বললো ওতো কেবল কোলের শিশু মাত্র। তার সাথে আমরা কীভাবে কথা বলবো? সহসা সেই নবজাত সন্তান কোলের শিশু ঈসা বলে উঠলেন, "আমি আল্লাহর বান্দাহ। আল্লাহ আমাকে কিতাব দিয়েছেন ও নবী বানিয়েছেন। আর তিনি আমাকে সালাত ও যাকাতের আদেশ দিয়েছেন যতদিন আমি জীবিত থাকবো। তিনি আমাকে মায়ের অনুগত বানিয়েছেন, আমাকে স্বৈরাচারী ও হতভাগ্য দুচ্চরিত্র বানাননি। আর আমার প্রতি শান্তি যেদিন আমি জন্মেছি, যেদিন মরে যাব এবং যেদিন আমি জীবিত হয়ে উত্থিত হবো।"
আল কুরআন ঈসা-এর জন্মবৃত্তান্ত এভাবে বর্ণনা করার পর ঘোষণা করেছে: ذَلِكَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ قَوْلَ الْحَقِّ الَّذِي فِيهِ يَمْتَرُوْنَ . مَا كَانَ لِلَّهِ أَنْ يَتَّخِذَ مِنْ وَلَدٍ سُبْحْنَهُ إِذَا قَضَى أَمْرًا فَإِنَّمَا يَقُوْلُ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ .
অর্থ: "এ হলো মারইয়াম পুত্র ঈসার ঘটনা। এটা একটা চূড়ান্ত সত্য কথা, যে সম্পর্কে লোকেরা সন্দেহ করে থাকে। আল্লাহ তো এমন নন যে কাউকে তিনি নিজের পুত্র বানিয়ে নেবেন! তিনি পবিত্র মহিমায়ম, তিনি কোনো কাজ করা স্থির করলে বলেন, 'হও' অমনি তা হয়ে যায়।" (সূরা মারইয়াম আয়াত: ৩৪-৩৫)
অর্থাৎ ঈসা-এর শানও তাঁর বিশেষত্ব উক্ত আয়াতসমূহে বিবৃত হয়েছে। এমন একটি সত্য ও সুস্পষ্ট বিষয়ে লোকেরা অযথা বিতর্কের সৃষ্টি করে থাকে। তারা এতে নানাবিধ মতপার্থক্য দাঁড় করিয়েছে। কেউ তাঁকে আল্লাহ বানিয়ে দিয়েছে, আর কেউ বানিয়েছে আল্লাহর বেটা, কেউ বলেছে মিথ্যাবাদী, প্রতারক আবার অনেকে তাঁর বংশ ও নসবনামায় তিরস্কার করেছে। আল কুরআন তাই দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা দিয়েছে যে,
ইসা ইহুদী-খ্রিস্টানদের এসব সন্দেহ ও তর্ক-বিতর্কের ঊর্ধে। তিনি আল্লাহর একজন মোকাররম বান্দা, মিথ্যাবাদী-প্রতারক নন- সত্যবাদী, আল্লাহর নবী, তাঁর বংশ ও নসব পাক-পবিত্র। আল্লাহ তাঁকে 'কালেমাতুল্লাহ' আখ্যা দিয়েছেন। আয়াতে 'কাওলাল হক' বলে সম্ভবত এ 'কালেমাতুল্লাহ'-ই বুঝানো হয়েছে।
(আল কুরআনুল কারীম : শাব্বীর আহমদ উসমানী।)
ঈসা সম্পর্কে ইহুদী ও খ্রিস্টানদের অলীক চিন্তাধারায় বাহুল্য ও স্বল্পতা বিদ্যমান ছিল। খ্রিস্টানরা তো তাঁকে বাড়িয়ে আল্লাহর পুত্র বানিয়ে দিয়েছে: আর ইহুদীরা তাঁর অবমাননায় এমন ধৃষ্টতা দেখিয়েছে যে, তারা তাঁকে ইউসুফ মিস্ত্রির জারজ সন্তানরূপে আখ্যায়িত করেছেন- নাউযুবিল্লাহ। আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা উভয় প্রকার ভ্রান্ত লোকদের ভ্রান্তির অপনোদন করে তাঁর সঠিক মর্যাদা ও প্রকৃত সম্মান প্রতিষ্ঠিত করেছেন। (কুরতুবী থেকে মাআরেফুল কুরআন: মুফতী শফী র.)
এভাবে ঈসা-এর জন্ম নিয়ে যেমন তৎকালীন খ্রিস্টানরা নানা বিভ্রান্তি ও বিতর্কের অবতারণা করেছিল- তারা আল্লাহ তায়ালার বিশেষ কুদরত পুরুষ ছাড়া কেবল নারী থেকে সন্তান সৃষ্টি করার একটি স্বচ্ছ ঘটনাকে ঘোলাটে করার যাবতীয় ষড়যন্ত্র করেছিল, তারা মানুষের বৈশিষ্ট্যকে সর্বশক্তিমান আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করে নানা সন্দেহ ছড়িয়েছিল, ঈসা-কে আল্লাহর পুত্র' বলার মত জঘন্য ধৃষ্টতা দেখিয়েছিল। আল কুরআন তাদের সে ভ্রষ্টতার কথা উল্লেখ করে আখেরী নবীর সময়কার ইহুদী-খ্রিস্টান-মুশরিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাদের 'হক'-এর দিকে আহ্বান করেছিল। মুজিযা হিসেবে জন্মগ্রহণকারী ঈসা-এর জন্ম নিয়ে ঈসা ও তাঁর মাতা মারইয়ামকে অমর্যাদার বিতর্কের জালে জড়ানোর চক্রান্ত করেছিল। তেমনি আখেরী নবীর সময়কার ইহুদী-খ্রিস্টানরাও আল্লাহর নবী মুহাম্মদ-এর 'নবুওয়াত' সম্পর্কে অবিশ্বাস ও বিভ্রান্তির ঘূর্ণায়নে আবর্তিত হচ্ছে। আর মানব সমাজকেও বিভ্রান্ত করছে। এতে করে ইহুদী-খ্রিস্টান-মুশরিকগণ পৃথিবীর শান্তি, বিপন্ন করছিল আখেরী নবীর আনীত বিশ্ব শান্তির পয়গামের বিরোধিতা করে। আল্লাহ তায়ালা আলোচ্য ইতিহাসের সূচনা করেছেন এভাবে وَاذْكُرْ فِي الْكِتَبِ مَرْيَمَ “এ কিতাবে মারইয়ামের ইতিহাস আলোচনা করো।”
আল কুরআন এমনিভাবে পূর্বোক্ত নবী-রাসূলগণের ইতিহাস এবং আল্লাহর কতিপয় বিশেষ বান্দা ও বান্দীর ঘটনাবলি কিয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষণীয় বিষয়াদির আলোচনা করেছে। এখানে মারইয়াম পুত্র ঈসা-এর আলোচনায় তাঁর জন্ম-বৃত্তান্ত প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে খ্রিস্টানদের তাওহীদী শিক্ষা থেকে সরে যাওয়ার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তারা যে ঈসা-এর মূল শিক্ষা থেকে বহু দূরে অবস্থান করছে আল কুরআন তা প্রকাশ করে দিয়েছে। তারা ঈসা-কে আল্লাহর পুত্র বলে এবং মারইয়ামের উপর তোহমত আরোপ করে সর্বোপরি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে মানব স্বভাবের বানিয়ে সকল নবীর দীনের মূল ভিত্তি তাওহীদ, রিসালাত ও আখিরাতের উপর কুঠারাঘাত করেছে আর নিজেদেরকে শিরক ও কুফরের মধ্যে নিক্ষেপ
করেছে। অথচ নিজেদেরকে ঈসা ও ইনজিল কিতাবের অনুসারী বলে দাবী করছে।
সদ্যজাত শিশু ঈসা স্বয়ং মাতার কোলে থেকে সুস্পষ্ট বলে দিলেন। "আমি আল্লাহর বান্দা'। অর্থাৎ আমার এ অস্বাভাবিক জন্মের কারণে কেউ যেন এমন বিভ্রান্তিতে না পড়ে যে, আমি কোনো অতিমানবীয় অস্তিত্বের অধিকারী। আমি তো আল্লাহরই বান্দাহ। শিশু ঈসার দ্বিতীয় কথা ছিল, "আল্লাহ আমাকে কিতাব ও নবুওয়াত দানে ধন্য করেছেন আর আমি যেখানেই থাকি না কেন সেখানেই আমার অবস্থান হবে কেবল বরকত আর বরকত।" তাঁর তৃতীয় কথা ছিল, "আমাকে জীবনভর সালাত ও যাকাত প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মূলত এ দুটো বিষয়ই সকল শরীয়তের মূল ভিত্তি ছিল। এজন্যে সকল আসমানী জীবন ব্যবস্থায় সর্বপ্রথম এ দুটো বিষয়ের উল্লেখ করা হয়েছে।" শিশু ঈসার চতুর্থ কথা ছিল, "আল্লাহ আমাকে আমার মায়ের অনুগত বানিয়ে পাঠিয়েছেন। আমাকে তিনি স্বৈরাচারী ও বদ চরিত্রের বানাননি।" সর্বশেষ তিনি বলেছেন, "আমার প্রতি শান্তি যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি, যেদিন আমি মৃত্যুমুখে পতিত হবো আর যেদিন আমি জীবিত হয়ে উঠবো।"
ঈসা -এর জন্মের পর পরই মায়ের কোলে থেকে উপরিউক্ত পাঁচটি এমন বিষয়ের কথা বলেছেন যাতে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি অন্যসব মানুষের মতই একজন মানুষ। তিনি মানুষের ঊর্ধে আল্লাহ বা আল্লাহর বেটা কোনোটিই নন। প্রথম কথায় তিনি নিজেকে আল্লাহর বান্দাহ বলে সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন। দ্বিতীয় কথায় তাঁকে আল্লাহ কিতাব ও নবুওয়াত প্রাপ্ত আল্লাহর বিশেষ অনুগৃহীত বান্দা হিসেবে প্রকাশ করেছেন। তৃতীয় কথায় তিনি নিজের দায়িত্ব অন্যান্য নবী-রাসূলগণের দায়িত্বের অনুরূপ এবং মানুষ নবী হিসেবে যতদিন বেঁচে থাকেন ততদিন অর্পিত দায়িত্ব আনজাম দানের জন্য আদিষ্ট বলে প্রচার করেছেন। চতুর্থ কথায় তিনি অন্যান্য মানুষের মতই মারইয়ামের উদরে জন্ম নেয়ার কারণে মায়ের অনুগত থাকার কথা সংকল্প ও নির্দেশনার বিষয়ে স্বীকার করেছেন। ব্যতিক্রম কেবল এতটুকু যে, তিনি আল্লাহর বিশেষ কুদরতে পিতা ছাড়াই মায়ের গর্ভে জন্ম নিয়েছেন। আর সর্বশেষ কথায় তিনি নিজেকে জন্ম, মৃত্যু ও হাশরে উঠার স্বাভাবিক মানবীয় জীবন ধারার গণ্ডীর মধ্যে কথা একজন মানুষ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। সুতরাং তাঁর অনুসারী বলে দাবীদার খ্রিস্টানদের আকীদা-বিশ্বাস ও দাবী যে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও কল্পিত সে বিষয়ে সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল কুরআন পরিষ্কার ঘোষণা করে দিয়েছে।