📄 সন্তান হত্যা ও ব্যভিচার মারাত্বক অপরাধ
وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَاقٍ نَحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُمْ إِنَّ قَتْلَهُمْ كَانَ خِطْنًا كَبِيرًا، وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا.
অর্থ: দারিদ্র্যের আশঙ্কায় নিজেদের সন্তান হত্যা করো না। আমি তাদেরকেও রিযিক দেবো এবং তোমাদেরকেও। আসলে তাদেরকে হত্যা করা একটি মহাপাপ। যিনার কাছেও যেয়ো না, ওটা অত্যন্ত খারাপ কাজ এবং খুবই জঘন্য পথ। (সূরা বনী ইসরাঈল: আয়াত: ৩১-৩২)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: যেসব অর্থনৈতিক চিন্তাধারার ভিত্তিতে প্রাচীনকাল থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত যুগে যুগে জন্মনিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন আন্দোলন দানা বেঁধেছে, এ আয়াতটি তার ভিত পুরোপুরি ধ্বসিয়ে দিয়েছে। প্রাচীন যুগে দারিদ্র্য ভীতি শিশু হত্যা ও গর্ভপাতের কারণ হতো। আর আজ তা দুনিয়াবাসীকে তৃতীয় আর একটি কৌশল অর্থাৎ গর্ভনিরোধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু ইসলামের ঘোষণাপত্রের এ ধারাটি তাকে অন্নগ্রহণকারীদের সংখ্যা কমাবার ধ্বংসাত্মক প্রচেষ্টা ত্যাগ করে এমনসব গঠনমূলক কাজে নিজের শক্তি ও যোগ্যতা নিয়োগ করার নিদেশ দিচ্ছে যেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর তৈরি প্রাকৃতিক বিধান অনুযায়ী রিযিক বৃদ্ধি হয়ে থাকে। এ ধারাটির দৃষ্টিতে অর্থনৈতিক উপায়-উপকরণের স্বল্পতার আশঙ্কায় মানুষের বারবার সন্তান উৎপাদনের সিলসিলা বন্ধ করে দিতে উদ্যত হওয়া তার বৃহত্তম ভুলগুলোর অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এ ধারাটি মানুষকে এ বলে সাবধান করে দিচ্ছে যে, রিযিক পৌঁছাবার ব্যবস্থাপনা তোমার আয়ত্বাধীন নয়; বরং এটি এমন এক আল্লাহর আয়ত্বাধীন যিনি তোমাকে এ যমীনে আবাদ করেছেন। পূর্বে আগমনকারীদেরকে তিনি যেভাবে রুজি দিয়ে এসেছেন তেমনিভাবে তোমাদেরকেও দেবেন। ইতিহাসের অভিজ্ঞতাও একথাই বলে, দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে জনসংখ্যা যতই বৃদ্ধি হতে থেকেছে ঠিক সেই পরিমাণে; বরং বহুসময় তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে অর্থনৈতিক উপায় উপকরণ বেড়ে গিয়েছে। কাজেই আল্লাহর সৃষ্টি ব্যবস্থাপনায় মানুষের অযথা হস্তক্ষেপ নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
এ শিক্ষার ফলেই কুরআন নাযিলের যুগ থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো যুগে مسلمانوں মধ্যে জন্ম শাসনের কোনো ব্যাপক ভাবধারা জন্ম লাভ করতে পারেনি। "যিনার কাছেও যেয়ো না" এ হুকুম ব্যক্তির জন্য এবং সামগ্রিকভাবে সমগ্র সমাজের জন্যও। ব্যক্তির জন্য এ হুকুমের মানে হচ্ছে, সে নিছক যিনার কাজ থেকে দূরে থেকেই ক্ষান্ত হবে না; বরং এ পথের দিকে টেনে নিয়ে যায় যিনার এমন সব সূচনাকারী এবং প্রাথমিক উদ্যোগ ও আকর্ষণ সৃষ্টিকারী বিষয় থেকেও দূরে থাকবে। আর সমাজের ব্যাপারে বলা যায়, এ হুকুমের প্রেক্ষিতে সমাজ জীবনে যিনা, যিনার উদ্যোগ আকর্ষণ এবং তার কারণসমূহের পথ বন্ধ করে দেয়া সমাজের জন্য ফরয হয়ে যাবে। এ উদ্দেশ্যে সে আইন প্রণয়ন, শিক্ষা ও অনুশীলন দান, সামাজিক
পরিবেশের সংস্কার সাধন, সমাজ জীবনের যথাযোগ্য বিন্যাস এবং অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যবস্থা অবলম্বন করবে।
এ ধারাটি শেষ পর্যন্ত ইসলামী জীবন ব্যবস্থার একটি বৃহত্তম অধ্যায়ের বুনিয়াদে পরিণত হয়। এর অভিপ্রায় অনুযায়ী যিনা ও যিনার অপবাদকে ফৌজদারী অপরাধ গণ্য করা হয়। পর্দার বিধান জারী করা হয়। অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতার প্রচার কঠোরভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়। মদ্যপান, নাচ, গান ও ছবির (যা যিনার নিকটতম আত্মীয়) ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়। আর সেই সাথে এমন একটি দাম্পত্য আইন প্রণয়ন করা হয় যার ফলে বিবাহ সহজ হয়ে যায় এবং এ যিনার সামাজিক কারণসমূহের শিকড় কেটে যায়।
আকজের বিশ্বে মুসলিম সমাজ নিজেদের মুসলিম বলে পরিচয় দিতে এবং এজন্যে অহংকার করতে কসুর করে না ঠিক; কিন্তু ইসলামী জীবন বিধান তথা কুরআন সুন্নাহর আইন দৈনন্দিন জীবন এবং সামাজিকভাবে ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে করার ব্যাপারে চরম গাফলাতিতে নিমজ্জিত। তাদের অনেকে এ বিয়য়টিকে দুনিয়াদারী মনে করে থাকে। অনেক মুখলেছ ব্যক্তিও দীনকে ব্যক্তিগত আমলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে দিয়েই সন্তুষ্ট। অধিকন্তু কোনো ব্যক্তি বা দল যদি দীনকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা-সাধনা করতে দাওয়াত দেয় তখন এরাই তাদের বিরোধিতায় মেতে উঠে। বস্তুত দীনকে যথার্থ না বুঝার কারণে অধিকাংশ মানুষ এমনটি করে থাকে। অবশ্য কিছু লোক অহমিকায় ও হঠকারিতায় মত্ত হয়েও এরূপ করে থাকে।
প্রথমে বর্ণিতরা নিজেদেরকে সুন্নাতের পা-বন্দ আমল ও কার্যক্রমে খুব তৃপ্তি পায়, অথচ রাসূলুল্লাহ ﷺ ও খোলাফায়ে রাশেদার আমল ও কার্যক্রম জেনে তা অনুসরণ করতে রাজি না। সূরা বনী ইসরাঈলের আলোচ্য আয়াত দুটো যেন আজকের তথাকথিত মুসলমানদের শিক্ষা নিতে ডাকছে।