📄 পটভূমি
নবী তাওহীদের আওয়াজ বুলন্দ করার পর তখন ১২ বছর অতীত হয়ে গিয়েছিল। তাঁর পথ রুখে দেবার জন্য তাঁর বিরোধীরা সব রকমের চেষ্টা করে দেখছিল। তাতে সকল প্রকার বাধা বিপত্তির দেয়াল টপকে তাঁর আওয়াজ আরবের সমস্ত এলাকায় পৌঁছে গিয়েছিল। আরবের এমন কোনো গোত্র ছিল না যার দু'চারজন লোক তাঁর দাওয়াতে প্রভাবিত হয়নি। মক্কাতেই আন্তরিকতা সম্পন্ন লোকদের এমন একটি ছোট্ট দল তৈরি হয়ে গিয়েছিল যারা এ সত্যের দাওয়াতের সাফল্যের জন্য প্রত্যেকটি বিপদ ও বাধা বিপত্তির মোকাবিলা করতে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল। মদীনায় শক্তিশালী আওস ও খাযরাজ গোত্র দু'টির বিপুল সংখ্যক লোক তার সমর্থকে পরিণত হয়েছিল এখন তাঁর মক্কা থেকে মদীনায় স্থানান্তরিত হয়ে বিক্ষিপ্ত মুসলমানদেরকে এক জায়গায় একত্র করে ইসলামের মূলনীতিসমূহের ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার সময় ঘনিয়ে এসেছিল এবং অতিশীঘ্রই তিনি এ সুযোগ লাভ করতে যাচ্ছিলেন।
এহেন অবস্থায় মি'রাজ সংঘটিত হয়। মি'রাজ থেকে ফেরার পর নবী দুনিয়াবাসীকে এ পয়গাম শুনান।
📄 বিষয়বস্তু ও আলোচ্য বিষয়
এ সূরায় সতর্ক করা, বুঝানো ও শিক্ষা দেয়া এ তিনটি কাজই একটি আনুপাতিক হারে একত্র করে দেয়া হয়েছে।
সতর্ক করা হয়েছে মক্কার কাফেরদেরকে। তাদেরকে বলা হয়েছে, বনী ইসরাঈল ও অন্য জাতিদের পরিণাম থেকে শিক্ষা গ্রহণ করো। আল্লাহর দেয়া যে অবকাশ খতম হবার সময় কাছে এসে গেছে তা শেষ হবার আগেই নিজেদেরকে সামলে নাও।
মুহাম্মাদ ও কুরআনের মাধ্যমে যে দাওয়াত পেশ করা হচ্ছে তা গ্রহণ করো। অন্যথায় তোমাদের ধ্বংস করে দেয়া হবে এবং তোমাদের জায়গায় অন্য লোকদেরকে দুনিয়ায় আবাদ করা হবে। তাছাড়া হিজরাতের পর যে বনী ইসরাঈলের উদ্দেশ্যে শীঘ্রই অহী নাযিল হতে যাচ্ছিল পরোক্ষভাবে তাদেরকে এভাবে সতর্ক করা হয়েছে যে, প্রথমে যে শান্তি তোমরা পেয়েছো তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করো এবং এখন মুহাম্মাদ -এর নবুওয়াত লাভের পর তোমরা যে সুযোগ পাচ্ছো তার সদ্ব্যবহার করো। এ শেষ সুযোগটিও যদি তোমরা হারিয়ে ফেলো এবং এরপর নিজেদের পূর্বতন কর্মনীতির পুনরাবৃত্তি করো তাহলে ভয়াবহ পরিণামের সম্মুখীন হবে।
মানুষের সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য এবং কল্যাণ ও অকল্যাণের ভিত্তি আসলে কোন কোন জিনিসের ওপর রাখা হয়েছে, তা অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী পদ্ধতিতে বুঝানো হয়েছে।
তাওহীদ, পরকাল, নবুওয়াত ও কুরআনের সত্যতার প্রমাণ পেশ করা হয়েছে। মক্কার কাফেরদের পক্ষ থেকে এ মৌলিক সত্যগুলোর ব্যাপারে যেসব সন্দেহ-সংশয় পেশ করা হচ্ছিল সেগুলো দূর করা হয়েছে। দলীল-প্রমাণ পেশ করার সাথে সাথে মাঝে মাঝে অস্বীকারকারীদের অজ্ঞতার জন্য তাদেরকে ধমকানো ও ভয় দেখানো হয়েছে।
শিক্ষা দেবার পর্যায়ে নৈতিকতা ও সভ্যতা-সংস্কৃতির এমনসব বড় বড় মূলনীতির বর্ণনা করা হয়েছে যেগুলোর ওপর জীবনের সমগ্র ব্যবস্থাটি প্রতিষ্ঠিত করাই ছিল মুহাম্মাদ -এর দাওয়াতের প্রধান লক্ষ্য। এটিকে ইসলামের ঘোষণাপত্র বলা যেতে পারে। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এক বছর আগে আরববাসীদের সামনে এটি পেশ করা হয়েছিল।
এতে সুস্পষ্টভাবে বলে দেয়া হয়েছে যে, এটি একটি নীল নকশা এবং এ নীল নকশার ভিত্তিতে মুহাম্মাদ নিজের দেশের মানুষের এবং তারপর সমগ্র বিশ্ববাসীর জীবন গড়ে তুলতে চান।
এসব কথার সাথে সাথেই আবার নবীকে হেদায়াত করা হয়েছে যে, সমস্যা ও সংকটের প্রবল ঘূর্ণবর্তে মজবুতভাবে নিজের অবস্থানের ওপর টিকে থাকো এবং কুফরীর সাথে আপোশ করার চিন্তাই মাথায় এনো না। তাছাড়া মুসলমানরা যাদের মন কখনো কখনো কাফেরদের জুলুম, নিপীড়ন, কূটতর্ক এবং লাগাতার মিথ্যাচার ও মিথ্যা দোষারোপের ফলে বিরক্তিতে ভরে উঠতো, তাদেরকে ধৈর্য ও নিশ্চিন্ততার সাথে অবস্থার মোকাবিলা করতে থাকার এবং প্রচার ও সংশোধনের কাজে নিজেদের আবেগ-অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার উপদেশ দেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে আত্ম সংশোধন ও আতসংযমের জন্য তাদেরকে নামাযের ব্যবস্থাপত্র দেয়া যেসব উন্নত গুণাবলিতে বিভূষিত হওয়া উচিত তেমনি ধরনের গুণাবলীতে ভূষিত করবে। হাদীস থেকে জানা যায়, এই প্রথম পাঁচ ওয়াক্ত নামায মুসলমানদের ওপর নিয়মিতভাবে ফরয করা হয়।
📄 দাসত্ব হবে একমাত্র আল্লাহর এবং পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ
وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا ۚ إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا. وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُل رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا.
অর্থ : তোমার রব ফায়সালা করে দিয়েছেন, তোমরা কারোর ইবাদাত করো না, একমাত্র তাঁরই ইবাদাত করো। পিতামাতার সাথে ভালো ব্যবহার করো। যদি তোমাদের কাছে তাদের কোনো একজন বা উভয় বৃদ্ধ অবস্থায় থাকে, তাহলে তাদেরকে "উহ্” পর্যন্তও বলো না এবং তাদেরকে ধমকের সুরে জবাব দিয়ো না; বরং তাদের সাথে মর্যাদা সহকারে কথা বলো। আর দয়া ও কোমলতাসহকারে তাদের সামনে বিনম্র থাকো এবং দোয়া করতে থাকো এই বলে, হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া করো, যেমন তারা দয়া, মায়া, মমতা সহকারে শৈশবে আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন। (সূরা বনী ইসরাঈল : আয়াত : ২৩-২৪)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা : মানব জাতির শান্তি, কল্যাণ ও সাফল্য কীসে ও কীভাবে- তা একমাত্র সে সত্তাই ভাল জানেন, যিনি মানুষকে সৃষ্টি করে লালন-পালন করেন। সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা আল্লাহ তায়ালা মানুষকে দুনিয়ার জীবনে ইচ্ছাশক্তি ও কর্মের স্বাধীনতা দিয়ে তার জীবনের চলার পথও বাতলে দিয়েছেন। আল কুরআনই হচ্ছে আল্লাহর সেই পথনির্দেশিকা। আর এরই বাস্তবায়ন পদ্ধতি হচ্ছে রাসূলের সুন্নাহ। আলোচ্য আয়াতে মানবজাতির জন্যে দুটি মূলনীতি বর্ণিত হয়েছে।
১. মানবজাতি তাদের রব আল্লাহ ছাড়া কারো দাসত্ব করবে না।
২. মানুষ নিজ নিজ মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে।
এর অর্থ কেবল এতটুকুই নয় যে, আল্লাহ ছাড়া আর কারো পূজা-উপাসনা করো না; বরং এ সঙ্গে এর অর্থ হচ্ছে, বন্দেগী, গোলামী ও দ্বিধাহীন আনুগত্য একমাত্র আল্লাহরই করতে হবে। একমাত্র তাঁরই হুকুমকে হুকুম এবং তাঁরই আইনকে আইন বলে মেনে নাও এবং তাঁর ছাড়া আর কারো সার্বভৌম কর্তৃত্ব স্বীকার করো না। এটি কেবলমাত্র একটি ধর্ম বিশ্বাস এবং ব্যক্তিগত কর্মধারার জন্য একটি পথনির্দেশনাই নয়; বরং নবী ﷺ মদীনা তাইয়েবায় পৌঁছে কার্যত যে রাজনৈতিক, তামাদ্দুনিক ও নৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করেন এটি হচ্ছে সেই সমগ্র ব্যবস্থার ভিত্তি প্রস্তরও। এ ইমারতের বুনিয়াদ রাখা হয়েছিল এ মতাদর্শের ভিত্তিতে যে, মহান ও মহিমান্বিত আল্লাহই সমগ্র বিশ্বলোকের মালিক ও বাদশাহ এবং তাঁরই শরীয়াত এ রাজ্যের আইন।
ইমাম কুরতুবী রহ. বলেন, এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা পিতা-মাতার প্রতি আদব-সম্মান এবং তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করাকে নিজের ইবাদাতের সাথে একত্রিত করে ফরয করে দিয়েছেন। যেমন সূরা লুকমানে নিজের শোকরের সাথে মাতা-পিতার শোকরকে একত্রিত করে অপরিহার্য করে দিয়েছেন। বলা হয়েছে أَنِ اشْكُرْلِي وَلِوَالِدَيْكَ অর্থাৎ আমার শোকর করো আর পিতা-মাতারও। এতে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তায়ালার ইবাদাতের পর পিতা-মাতার আনুগত্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং আল্লাহ তায়ালার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার ন্যায় পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া ওয়াজিব। সহীহ বুখারীর একটি হাদীসও এর পক্ষে সাক্ষ্য দেয়। হাদীসে রয়েছে কোনো এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহকে প্রশ্ন করলো, আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় কাজ কোনটি? তিনি বললেন, সময় হলে নামায পড়া। সে আবার প্রশ্ন করলো, এরপর কোন কাজটি সর্বাধিক প্রিয়? তিনি বললেন, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার। (মাআরেফুল কুরআন-কুরতুবী থেকে)
পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার ও তাদের সেবাযত্নের বিষয়ে মুফতী শফী রহ. তাঁর তাফসীরে মাআরেফুল কুরআনে বেশ কয়েকটি হাদীস উদ্ধৃত করেছেন। তিনি সেগুলো নিয়েছেন তাফসীরে মাযহারী থেকে। এখানে তিনটি হাদীস উদ্ধৃত করা হলো-
১. বায়হাকী শোআবুল ঈমান গ্রন্থে এবং ইবনে আসাকির ইবনে আব্বাসের বাচনিক উদ্ধৃত করেছেন। রাসূলুল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে পিতা-মাতার আনুগত্য করে তার জন্য জান্নাতের দুটো দরজা খোলা থাকবে এবং যে ব্যক্তি পিতা-মাতার অবাধ্য হবে, তার জন্য জাহান্নামের দুটো দরজা খোলা থাকবে। যদি পিতা-মাতার মধ্যে একজনকে পায় তবে জান্নাত বা জাহান্নামের একটি দরজা খোলা থাকবে। একথা শুনে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করলো, জাহান্নামের এ শাস্তি বাণী কি এখনো প্রযোজ্য যখন পিতা-মাতা তার প্রতি যুলুম করেন? তিনি তিনবার বললেন, যদি পিতা-মাতা সন্তানের প্রতি যুলুমও করেন, তবুও পিতা-মাতার অবাধ্যতার কারণে সন্তান জাহান্নামে যাবে।
একথার সারমর্ম এই যে, পিতা-মাতার থেকে প্রতিশোধ নেয়ার অধিকার সন্তানের নেই। তাঁরা জুলুম করলেও সন্তান তাদের সেবা-যত্ন ও আনুগত্যের হাত গুটিয়ে নিতে পারে না।
২. বায়হাকী ইবনে আব্বাসের বাচনিক উদ্ধৃত করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ বলেন, “যে সেবা-যত্নকারী পুত্র পিতা-মাতার দিকে দয়া ও ভালবাসা সহকারে দৃষ্টিপাত করে তার প্রত্যেক দৃষ্টিপাতের বিনিময়ে সে একটি মকবুল হজ্জের সাওয়াব পায়।” লোকেরা আরয করলো, "সে যদি দিনে একশবার এভাবে দৃষ্টিপাত করে?" তিনি বললেন, হ্যাঁ, একশবার দৃষ্টিপাত করলেও প্রত্যেক দৃষ্টির বিনিময়ে এই সওয়াব পেতে থাকবে।"
৩. বায়হাকী শোআবুল ঈমানে আবু বকর এর বাচনিক বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ বলেন, সকল গোনাহর শাস্তির ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা যেগুলো ইচ্ছা করেন কিয়ামত পর্যন্ত পিছিয়ে নিয়ে যান। কিন্তু পিতা-মাতার হক নষ্ট করা এবং তাঁদের প্রতি অবাধ্য আচরণ করা এর ব্যতিক্রম। এর শাস্তি আখিরাতের পূর্বে দুনিয়াতেও দেয়া হয়।
📄 সন্তান হত্যা ও ব্যভিচার মারাত্বক অপরাধ
وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَاقٍ نَحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُمْ إِنَّ قَتْلَهُمْ كَانَ خِطْنًا كَبِيرًا، وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا.
অর্থ: দারিদ্র্যের আশঙ্কায় নিজেদের সন্তান হত্যা করো না। আমি তাদেরকেও রিযিক দেবো এবং তোমাদেরকেও। আসলে তাদেরকে হত্যা করা একটি মহাপাপ। যিনার কাছেও যেয়ো না, ওটা অত্যন্ত খারাপ কাজ এবং খুবই জঘন্য পথ। (সূরা বনী ইসরাঈল: আয়াত: ৩১-৩২)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: যেসব অর্থনৈতিক চিন্তাধারার ভিত্তিতে প্রাচীনকাল থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত যুগে যুগে জন্মনিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন আন্দোলন দানা বেঁধেছে, এ আয়াতটি তার ভিত পুরোপুরি ধ্বসিয়ে দিয়েছে। প্রাচীন যুগে দারিদ্র্য ভীতি শিশু হত্যা ও গর্ভপাতের কারণ হতো। আর আজ তা দুনিয়াবাসীকে তৃতীয় আর একটি কৌশল অর্থাৎ গর্ভনিরোধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু ইসলামের ঘোষণাপত্রের এ ধারাটি তাকে অন্নগ্রহণকারীদের সংখ্যা কমাবার ধ্বংসাত্মক প্রচেষ্টা ত্যাগ করে এমনসব গঠনমূলক কাজে নিজের শক্তি ও যোগ্যতা নিয়োগ করার নিদেশ দিচ্ছে যেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর তৈরি প্রাকৃতিক বিধান অনুযায়ী রিযিক বৃদ্ধি হয়ে থাকে। এ ধারাটির দৃষ্টিতে অর্থনৈতিক উপায়-উপকরণের স্বল্পতার আশঙ্কায় মানুষের বারবার সন্তান উৎপাদনের সিলসিলা বন্ধ করে দিতে উদ্যত হওয়া তার বৃহত্তম ভুলগুলোর অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এ ধারাটি মানুষকে এ বলে সাবধান করে দিচ্ছে যে, রিযিক পৌঁছাবার ব্যবস্থাপনা তোমার আয়ত্বাধীন নয়; বরং এটি এমন এক আল্লাহর আয়ত্বাধীন যিনি তোমাকে এ যমীনে আবাদ করেছেন। পূর্বে আগমনকারীদেরকে তিনি যেভাবে রুজি দিয়ে এসেছেন তেমনিভাবে তোমাদেরকেও দেবেন। ইতিহাসের অভিজ্ঞতাও একথাই বলে, দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে জনসংখ্যা যতই বৃদ্ধি হতে থেকেছে ঠিক সেই পরিমাণে; বরং বহুসময় তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে অর্থনৈতিক উপায় উপকরণ বেড়ে গিয়েছে। কাজেই আল্লাহর সৃষ্টি ব্যবস্থাপনায় মানুষের অযথা হস্তক্ষেপ নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
এ শিক্ষার ফলেই কুরআন নাযিলের যুগ থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো যুগে مسلمانوں মধ্যে জন্ম শাসনের কোনো ব্যাপক ভাবধারা জন্ম লাভ করতে পারেনি। "যিনার কাছেও যেয়ো না" এ হুকুম ব্যক্তির জন্য এবং সামগ্রিকভাবে সমগ্র সমাজের জন্যও। ব্যক্তির জন্য এ হুকুমের মানে হচ্ছে, সে নিছক যিনার কাজ থেকে দূরে থেকেই ক্ষান্ত হবে না; বরং এ পথের দিকে টেনে নিয়ে যায় যিনার এমন সব সূচনাকারী এবং প্রাথমিক উদ্যোগ ও আকর্ষণ সৃষ্টিকারী বিষয় থেকেও দূরে থাকবে। আর সমাজের ব্যাপারে বলা যায়, এ হুকুমের প্রেক্ষিতে সমাজ জীবনে যিনা, যিনার উদ্যোগ আকর্ষণ এবং তার কারণসমূহের পথ বন্ধ করে দেয়া সমাজের জন্য ফরয হয়ে যাবে। এ উদ্দেশ্যে সে আইন প্রণয়ন, শিক্ষা ও অনুশীলন দান, সামাজিক
পরিবেশের সংস্কার সাধন, সমাজ জীবনের যথাযোগ্য বিন্যাস এবং অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যবস্থা অবলম্বন করবে।
এ ধারাটি শেষ পর্যন্ত ইসলামী জীবন ব্যবস্থার একটি বৃহত্তম অধ্যায়ের বুনিয়াদে পরিণত হয়। এর অভিপ্রায় অনুযায়ী যিনা ও যিনার অপবাদকে ফৌজদারী অপরাধ গণ্য করা হয়। পর্দার বিধান জারী করা হয়। অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতার প্রচার কঠোরভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়। মদ্যপান, নাচ, গান ও ছবির (যা যিনার নিকটতম আত্মীয়) ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়। আর সেই সাথে এমন একটি দাম্পত্য আইন প্রণয়ন করা হয় যার ফলে বিবাহ সহজ হয়ে যায় এবং এ যিনার সামাজিক কারণসমূহের শিকড় কেটে যায়।
আকজের বিশ্বে মুসলিম সমাজ নিজেদের মুসলিম বলে পরিচয় দিতে এবং এজন্যে অহংকার করতে কসুর করে না ঠিক; কিন্তু ইসলামী জীবন বিধান তথা কুরআন সুন্নাহর আইন দৈনন্দিন জীবন এবং সামাজিকভাবে ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে করার ব্যাপারে চরম গাফলাতিতে নিমজ্জিত। তাদের অনেকে এ বিয়য়টিকে দুনিয়াদারী মনে করে থাকে। অনেক মুখলেছ ব্যক্তিও দীনকে ব্যক্তিগত আমলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে দিয়েই সন্তুষ্ট। অধিকন্তু কোনো ব্যক্তি বা দল যদি দীনকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা-সাধনা করতে দাওয়াত দেয় তখন এরাই তাদের বিরোধিতায় মেতে উঠে। বস্তুত দীনকে যথার্থ না বুঝার কারণে অধিকাংশ মানুষ এমনটি করে থাকে। অবশ্য কিছু লোক অহমিকায় ও হঠকারিতায় মত্ত হয়েও এরূপ করে থাকে।
প্রথমে বর্ণিতরা নিজেদেরকে সুন্নাতের পা-বন্দ আমল ও কার্যক্রমে খুব তৃপ্তি পায়, অথচ রাসূলুল্লাহ ﷺ ও খোলাফায়ে রাশেদার আমল ও কার্যক্রম জেনে তা অনুসরণ করতে রাজি না। সূরা বনী ইসরাঈলের আলোচ্য আয়াত দুটো যেন আজকের তথাকথিত মুসলমানদের শিক্ষা নিতে ডাকছে।