📄 ইউসুফ এর চারিত্রিক স্বচ্ছতা সম্পর্কে জুলাইখার স্বীকারোক্তি
قَالَ مَا خَطْبُكُنَّ إِذْ رَاوَدتُّنَّ يُوسُفَ عَن نَّفْسِهِ ، قُلْنَ حَاشَ لِلَّهِ مَا عَلِمْنَا عَلَيْهِ مِنْ سُوءٍ قَالَتِ امْرَأَتُ الْعَزِيزِ الْآنَ حَصْحَصَ الْحَقُّ أَنَا رَاوَدْتُهُ عَن نَّفْسِهِ وَإِنَّهُ لَمِنَ الصَّدِقِينَ.
অর্থ: একথায় বাদশাহ সেই মহিলাদেরকে জিজ্ঞেস করলো, "তোমরা যখন ইউসুফকে অসৎকাজে প্ররোচিত করার চেষ্টা করেছিলে তোমাদের তখনকার অভিজ্ঞতা কী?" সবাই একবাক্যে বললো, "আল্লাহর কী অপার মহিমা! আমরা তার মধ্যে অসৎ প্রবণতার গন্ধই পাইনি।” আযীযের স্ত্রী বলে উঠলো, "এখন সত্য প্রকাশ হয়ে গেছে। আমিই তাকে ফুসলাবার চেষ্টা করেছিলাম, নিঃসন্দেহে সে একদম সত্যবাদী।" (সূরা ইউসুফ: আয়াত-৫১)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: এখানে 'আযীযে মেছের'-এর স্ত্রীই নয়; বরং সমাজের অন্যান্য মহিলারাও যে ইউসুফের চরিত্রের স্বচ্ছতা সম্পর্কে সাক্ষ্য দিয়েছিল সেকথা ফুটে উঠেছে। সংক্ষিপ্ত ঘটনা হলো, মিশর সম্রাটের অনুপস্থিতিতে তার স্ত্রী ইউসুফকে যে নিজের কুমতলব চরিতার্থ করার জন্য ফুসলিয়েও কঠিন ষড়যন্ত্র করেও তাকে কাবু করতে পারলো না, অধিকন্ত সম্রাটের সামনে উল্টো ইউসুফের ঘাড়েই সমস্ত দোষ
চাপিয়ে দিল। শেষ পর্যন্ত মিশর সম্রাটও প্রকৃত ঘটনা বুঝতে পেরে নিজের স্ত্রীকে ভর্ৎসনা করলো আর ইউসুফকে বললো বিষয়টি নিয়ে যেন নাড়াচাড়া না করে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও লোক সমক্ষে স্ত্রীর মুখ বাচানোর জন্য ইউসুফকে জেলখানায় পাঠানো হলো। জেলখানায় তাঁকে বন্দী জীবনযাপন করতে হয়েছিল দীর্ঘ আট-নয় বছর।
ইউসুফ-এর সাথে আরও দুই যুবকও জেলখানায় আটক ছিল। দুই যুবকের দুটো স্বপ্নের ব্যাখ্যার জন্য তারা ইউসুফকে অনুরোধ জানালো। তারা দীর্ঘাদিনের বাস্তব ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় ইউসুফকে অত্যন্ত সৎ, চরিত্রবান ও সুবিজ্ঞ জানতে পেরেছে বলে উভয়ে তাঁর কাছে নিজ নিজ স্বপ্নের তা'বীর জানতে চাইলো। ইউসুফ তাদেরকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দিলেন। ইতোমধ্যে তাদের একজন স্বপ্নের ব্যাখ্যানুযায়ী জেলখানা থেকে মুক্তিও পেয়ে গেলো।
একদিন মিশর সম্রাট দরবারের লোকদের ডেকে তার এক আশ্চর্য স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাইলো। লোকেরা বললো, “এটা তো একটা অস্পষ্ট স্বপ্নের কথা আর আমরা তো স্বপ্নের তা'বীর সম্পর্কে জ্ঞাত নই।” সে সময় ওখানে জেলখানা থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত যুবকটিও উপস্থিত ছিল। তৎক্ষণাৎ তার মনে পড়লো দীর্ঘদিনের জেলখানার সাথী ইউসুফের কথা এবং স্বপ্নের তা'বীর সম্পর্কে তার বিজ্ঞতার কথা। সে বললো, আমি আপনাদেরকে এ স্বপ্নের তা'বীর বলে দেব, আমাকে একটু জেলখানায় ইউসুফের কাছে পাঠিয়ে দিন। যুবকটি সভাসদকে ইউসুফের নির্ভুল স্বপ্নে তা'বীর জানার বিষয়েও অবহিত করেছিল।
যুবকটিকে জেলখানায় পাঠানো হলো। সে ইউসুফকে বাদশাহর স্বপ্নের বিষয় জানালে ইউসুফ বাদশাহর স্বপ্নে ব্যাখ্যা বলে দিল। বাদশাহ বললো, "তাকে আমার কাছে নিয়ে আস।" বাদশাহর পাঠানো লোক যখন ইউসুফের কাছে গিয়ে এ সুসংবাদ দিল, তখন ইউসুফ তাকে বললেন, আগে তুমি তোমার মালিকের কাছে ফিরে গিয়ে তার কাছ থেকে জেনে আসতো, ঐসব মহিলাদের কী অবস্থা, যারা নিজেদের হাত কেটেছিল? নিশ্চয়ই আমার রব তাদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে ওয়াকিফহাল আছেন।"
এ খবর বাদশাহর কাছে গেলে তিনি সেসব মহিলাদের একত্র করে তাদের কাছ থেকে ইউসুফ সম্পর্কে তার চরিত্র সম্পর্কে জানতে চাইলেন।
সম্ভবত শাহীমহলে এ মহিলাদেরকে ডেকে এনে এ জবানবন্দী নেয়া হয়েছিল। আবার এও হতে পারে যে, বাদশাহ নিজের কোনো বিশেষ বিশ্বস্ত ব্যাক্তিকে পাঠিয়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে ব্যক্তিগতভাবে এ স্বীকারোক্তি আদায় করেছিলেন।
অনুমান করা যেতে পারে, এ স্বীকারোক্তিগুলো কীভাবে আট নয় বছর আগের ঘটনাবলিকে আবার নতুন করে তরতাজা করে দিয়েছিল, কীভাবে ইউসুফের ব্যক্তিত্ব কারাজীবনের দীর্ঘকালীন বিস্মৃতির পর আবার অকস্মাত বিপুলভাবে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল, কীভাবে মিসরের সমস্ত অভিজাত, মর্যাদাশালী ও মধ্যবিত্ত সমাজে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও তাঁর নৈতিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। বাইবেল ও
তালমূদের বরাত দিয়ে একথা বলা হয়েছে যে, বাদশাহ সাধারণ ঘোষণার মাধ্যমে সারা দেশের জ্ঞানীগুণী, আলেম ও পীরদের একত্র করেছিলেন এবং তারা সবাই তাঁর স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে অক্ষম হয়েছিল। এরপর ইউসুফ-এর ব্যাখ্যা করেছিলেন। এ ঘটনার ফলে সারা দেশের জনতার দৃষ্টি আগে থেকেই তাঁর প্রতি নিবদ্ধ হয়েছিল। তারপর বাদশাহর তলবনামা পেয়ে যখন তিনি জেলখানা থেকে বাইরে আসতে অস্বীকার করলেন তখন সমগ্র দেশবাসী অবাক হয়ে গিয়েছিল যে, এ আবার কেমন অদ্ভুত প্রকৃতির উচ্চ মনোবল সম্পন্ন মানুষ, যাকে আট নয় বছরের কারাবাসের পর বাদশাহ নিজেই মেহেরবানী করে ডাকছেন এবং তারপরও তিনি ব্যাকুল চিত্তে দৌঁড়ে আসছেন না! তারপর যখন তারা ইউসুফের নিজের কারামুক্তির এবং বাদশাহর সাথে দেখা করতে আসার জন্য পেশকৃত শর্তাবলি শুনালো তখন সবার দৃষ্টি এ অনুসন্ধান ও তদন্তের ফলাফলের প্রতি কেন্দ্রীভূত হয়ে রইল। এরপর যখন লোকেরা এর ফলাফল শুনলো তখন দেশের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা এই বলে বাহবা দিল যে, আহা, এ ব্যক্তি কেমন পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন জীবন ও চরিত্রের অধিকারী! কাল যারা নিজেদের সমবেত প্রচেষ্টায় তাঁকে কারাগারে পাঠিয়েছিল আজ তাঁর চারিত্রিক নিষ্কলুষতার পক্ষে তারাই সাক্ষ্য দিয়ে যাচ্ছে।
এ অবস্থা সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করলে একথা ভালোভাবেই উপলব্ধি করা যায় যে, সে সময় ইউসুফের উন্নতির উচ্চ শিখরে উঠার জন্য কেমন অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এরপর বাদশাহর সাথে সাক্ষাতের সময় ইউসুফ হঠাৎ কেমন করে তাকে দেশের অর্থ-সম্পদের ওপর কর্তৃত্ব দান করার দাবী জানিয়েছিলেন এবং বাদশাহ কেন নির্দ্বিধায় তা গ্রহণ করে নিয়েছিলেন একথা আর মোটেই বিস্ময়কর মেনে না। ব্যাপার যদি শুধু এতটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো যে কারাগারের একজন বন্দী বাদশাহর একটি স্বপ্নের তা'বীর বলে দিয়েছিলেন তাহলে এ জন্য তিনি বড়জোর কোনো পুরস্কারের এবং কারাগার থেকে মুক্তিলাভের অধিকারী হতে পারতেন। কিন্তু শুধুমাত্র এতটুকুন কথায় তিনি বাদশাহকে বলবেন, "আমাকে দেশের যাবতীয় অর্থ-সম্পদের ওপর কর্তৃত্ব দান করো" এবং বাদশাহ বলে দেবেন "নাও, সবকিছু তোমার জন্য হাযির"-এটা যথেষ্ট হতে পারতো না।