📘 আল কুরআনে নারীদের ২৫ সূরা > 📄 মিশরের বাদশাহর স্ত্রী জুলাইখার কাহিনী

📄 মিশরের বাদশাহর স্ত্রী জুলাইখার কাহিনী


وَرَاوَدَتْهُ الَّتِي هُوَ فِي بَيْتِهَا عَنْ نَفْسِهِ وَغَلَقَتِ الْأَبْوَابَ وَقَالَتْ هَيْتَ لَكَ قَالَ مَعَاذَ اللَّهِ إِنَّهُ رَبِّي أَحْسَنَ مَثْوَايَ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّلِمُونَ ﴿۲۳﴾ وَلَقَدْ هَمَّتْ بِهِ وَ هَمَّ بِهَا لَوْ لَا أَنْ رَا بُرْهَانَ رَبِّهِ كَذلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَ الْفَحْشَاءَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ ﴿۲۲﴾ وَاسْتَبَقَا الْبَابَ وَقَدَّتْ قَمِيصَهُ مِنْ دُبُرٍ وَ الْفَيَا سَيِّدَهَا لَذَا الْبَابِ قَالَتْ مَا جَزَاءُ مَنْ أَرَادَ بِأَهْلِكَ سُوءًا إِلَّا أَنْ يُسْجَنَ أَوْ عَذَابٌ أَلِيمٌ ﴿۲۵﴾ قَالَ هِيَ رَاوَدَتْنِي عَنْ نَفْسِي وَ شَهِدَ شَاهِدٌ مِنْ أَهْلِهَا إِنْ كَانَ قَمِيصُهُ قُدَّ مِنْ قُبُلٍ فَصَدَقَتْ وَهُوَ مِنَ الْكَذِبِينَ ﴿۲۶﴾ وَ إِنْ كَانَ قَمِيصُهُ قُدَّ مِنْ دُبُرٍ فَكَذَبَتْ وَ هُوَ مِنَ الصُّدِقِينَ ﴿۲٤﴾ فَلَمَّا رَا قَمِيصَهُ قُدَّ مِنْ دُبُرٍ قَالَ إِنَّهُ مِنْ كَيْدِكُنَّ إِنَّ كَيْدَكُنَّ عَظِيمٌ ﴿۲۸﴾ يُوسُفُ أَعْرِضْ عَنْ هُذَا وَاسْتَغْفِرِى لِذَنْبِكِ إِنَّكِ كُنْتِ مِنَ الْخُطِئِينَ ﴿۲۹﴾ وَ قَالَ نِسْوَةٌ فِي الْمَدِينَةِ امْرَأَتُ الْعَزِيزِ تُرَاوِدُ فَتْهَا عَنْ نَفْسِهِ قَدْ شَغَفَهَا حُبًّا إِنَّا لَنَرَبُّهَا فِي ضَلَلٍ مُّبِينٍ ﴿۳۰﴾ فَلَمَّا سَمِعَتْ بِمَكْرِهِنَّ أَرْسَلَتْ إِلَيْهِنَّ وَ اعْتَدَتْ لَهُنَّ مُتَكَاً وَ أَتَتْ كُلَّ وَاحِدَةٍ مِنْهُنَّ سِكِينَا وَ قَالَتِ اخْرُجُ عَلَيْهِنَّ فَلَمَّا رَأَيْنَةَ اكْبَرْنَهُ وَ قَطَّعْنَ أَيْدِيَهُنَّ وَ قُلْنَ حَاشَ لِلَّهِ مَا هُذَا بَشَرًا إِنْ هَذَا إِلَّا مَلَكَ كَرِيمٌ ﴿۳۱﴾ قَالَتْ فَذَلِكُنَّ الَّذِي لُمُتُنَّنِي فِيْهِ وَلَقَدْ رَاوَدُتُهُ عَنْ نَفْسِهِ فَاسْتَعْصَمَ وَ لَئِنْ لَّمْ يَفْعَلُ مَا أَمْرُهُ لَيُسْجَنَنَّ وَلَيَكُونًا مِّنَ الصَّغِرِينَ ﴿۳۲﴾ قَالَ رَبِّ السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَى مِمَّا يَدْعُونَنِي إِلَيْهِ ۚ وَإِلَّا تَصْرِفْ
عَنِّي كَيْدَهُنَّ أَصْبُ إِلَيْهِنَّ وَأَكُنْ مِنَ الْجُهِلِينَ ﴿٣٣﴾ فَاسْتَجَابَ لَهُ رَبُّهُ فَصَرَفَ عَنْهُ كَيْدَهُنَّ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ ﴿٣٢
অর্থ: যে মহিলাটির ঘরে সে ছিল সে তাকে নিজের দিকে আকর্ষণ করতে থাকলো এবং একদিন সে দরজা বন্ধ করে দিয়ে বললো, "চলে এসো"। ইউসুফ বললো, "আমি আল্লাহর আশ্রয় নিচ্ছি, আমার রব তো আমাকে ভালই মর্যাদা দিয়েছেন (আর আমি এ কাজ করবো!)। এ ধরনের জালেমরা কখনো কল্যাণ লাভ করতে পারে না। "মহিলাটি তার দিকে এগিয়ে এলো এবং ইউসুফও তার দিকে এগিয়ে যেতো যদি না তার রবের জ্বলন্ত প্রমাণ প্রত্যক্ষ করতো। এমনটিই হলো, যাতে আমি তার থেকে অসবৃত্তি ও অশ্লীলতা দূর করে দিতে পারি। আসলে সে ছিল আমার নির্বাচিত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।
শেষ পর্যন্ত ইউসুফ ও সে আগে-পিছে দরজার দিকে দৌড়ে গেলো এবং সে পেছন থেকে ইউসুফের জামা (টেনে ধরে) ছিঁড়ে ফেললো। উভয়েই দরজার ওপর তার স্বামীকে উপস্থিত পেলো। তাকে দেখতেই মহিলাটি বলতে লাগলো, "তোমার পরিবারের প্রতি যে অসৎ কামনা পোষণ করে তার কী শান্তি হতে পারে? তাকে কারাগারে প্রেরণ করা অথবা কঠোর শাস্তি দেয়া ছাড়া আর কী শাস্তি দেয়া যেতে পারে?"
ইউসুফ বললো, "সে-ই আমাকে ফাঁসাবার চেষ্টা করছিল।" মহিলাটির নিজের পরিবারের একজন (পদ্ধতিগত) সাক্ষ্য দিল, "যদি ইউসুফের জামা সামনের দিক থেকে ছেঁড়া থাকে তাহলে মহিলাটি সত্য কথা বলেছে এবং সে মিথ্যুক। আর যদি তার জামা পেছনের দিক থেকে ছেঁড়া থাকে তাহলে মহিলাটি মিথ্যা কথা বলেছে এবং সে সত্যবাদী।” স্বামী যখন দেখলো ইউসুফের জামা পেছনের দিক থেকে ছেঁড়া তখন বললো, "এসব তোমাদের মেয়েলোকদের ছলনা। সত্যিই বড়ই ভয়ানক তোমাদের ছলনা! হে ইউসুফ! এ ব্যাপারটি উপেক্ষা করো। আর হে নারী! তুমি নিজের অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো, তুমিই আসল অপরাধী"।
শহরের মেয়েরা পরস্পর বলাবলি করতে লাগলো, "আযীযের স্ত্রী তার যুবক গোলামের পেছনে পড়ে আছে, প্রেম তাকে উন্মাদ করে দিয়েছে। আমাদের মতে সে পরিষ্কার ভুল করে যাচ্ছে।"সে যখন তাদের এ শঠতাপূর্ণ কথা শুনলো তখন তাদেরকে ডেকে পাঠালো। তাদের জন্য হেলান দিয়ে বসার মজলিসের আয়োজন করলো। খাওয়ার বৈঠকে তাদের সবার সামনে একটি করে ছুরি রাখলো। (তারপর ঠিক সেই মুহূর্তে যখন তারা ফল কেটে কেটে খাচ্ছিল) সে ইউসুফকে তাদের সামনে বের হয়ে আসার ইশারা করলো। যখন ঐ মেয়েদের দৃষ্টি তার ওপর পড়লো, তারা বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলো এবং নিজের হাত কেটে ফেললো। তারা বললো, "আল্লাহর কী অপার মহিমা! এতো মানুষ নয়, এতো এক মহিমান্বিত ফেরেস্তা। আযীযের স্ত্রী বললো, "দেখলে তো! এ হলো সেই ব্যক্তি যার ব্যাপারে তোমরা আমার বিরুদ্ধে নিন্দাবাদ করতে। অবশ্যই আমি তাকে প্ররোচিত করার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু সে নিজেকে রক্ষা করেছে। যদি সে আমার কথা না মেনে
নেয় তাহলে কারারুদ্ধ হবে এবং নিদারুণভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে। "ইউসুফ বললো, “হে আমার রব! এরা আমাকে দিয়ে যে কাজ করাতে চাচ্ছে তার চাইতে কারাগারই আমার কাছে প্রিয়! আর যদি তুমি এদের চক্রান্ত থেকে আমাকে না বাঁচাও তাহলে আমি এদের ফাঁদে আটকে যাবো এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হবো।” তার রব তার দোয়া কবুল করলেন এবং তাদের অপকৌশল থেকে তাকে রক্ষা করলেন। অবশ্যই তিনি সবার কথা শোনেন এবং সবকিছু জানেন। (সূরা ইউসুফ: আয়াত: ২৩-৩৪)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: উপরিউক্ত বারটি আয়াত সূরা ইউসুফ থেকে নেয়া হয়েছে। সূরা ইউসুফকে আল্লাহ তায়ালা اَحْسَنَ الْقَصَصِ বা সর্বোত্তম কাহিনী বলে ঘোষণা দিয়েছেন। আর কুরআনের এ একটি সূরাতেই ইউসুফ-এর ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে। এতে মানবজাতির জন্য শিক্ষণীয় অনেক বাস্তব ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার্য অনেক বিষয় বর্ণিত হয়েছে। আলোচ্য আয়াতগুলোতে ২৩ আয়াত থেকে ৩৪ আয়াত পর্যন্ত তৎকালীন মিশরের বাদশাহর স্ত্রী যুলায়খার কাহিনী বিবৃত হয়েছে।
ইউসুফ-এর ভাইয়েরা তাঁকে কূপে নিক্ষেপ করে চলে গিয়েছিলো। আল্লাহর অসীম রহমতে ইউসুফ কূপে সুস্থ ও জীবিত থেকে গেলেন। পথিক কাফেলার লোকেরা তাঁকে কুপ থেকে তুলে নিয়ে মিশর শহরে বিক্রি করে দিল। মিশর শহরে ইউসুফের এ ক্রেতা ছিলেন মিশরের বাদশাহ (আযীযে মেছের) বাদশাহ ইউসুফকে কিনে নিয়ে স্ত্রীকে যা বললেন, কুরআনের ভাষায় তা হলো:
اكْرِمِي مَثْوَاهُ عَلَى أَنْ يَنْفَعَنَا أَوْ نَتَّخِذَهُ وَلَدًا.
অর্থ: "একে ভালভাবে থাকার ব্যবস্থা করো, এ আমাদের কোনো উপকারে আসতে পারে অথবা একে আমরা পুত্র হিসেবে গ্রহণ করতে পারি।" (সূরা ইউসুফ: আয়াত-২১)
ইউসুফ যখন যৌবনের স্তরে উপনীত হন, তিনি যখন আঠার-বিশ বছর বয়সের এক সুদর্শন যুবক এবং সুষমামণ্ডিত দেহ আর ভরা যৌবনের অধিকারী তখন তাঁর মালিকের স্ত্রী যুলায়খা ইউসুফের রূপ-সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে গোটা পরিবেশটাকেই ইউসুফের জন্য অস্বস্তিকর করে তুলেছিলো। প্রতিটি মুহূর্তেই জুলাইখা তার কুমতলব চরিতার্থ করার জন্য ওঁৎ পেতে থাকতো ইউসুফকে কাবু করার জন্য। আর ইউসুফ-আল্লাহতে বিশ্বাসী নওযোয়ান, তাকওয়ার বলে বলীয়ান দৃঢ়চেতা ও বলিষ্ঠ মনোবল সম্পন্ন যুবক হয়েও এ পরিস্থিতির শিকার হয়ে স্বীয় মানবিক দুর্বলতার কথা ভেবে কেঁপে উঠতেন। তিনি আল্লাহর দরবারে কাতর কণ্ঠে প্রার্থনা করে বলতেন, “ হে আল্লাহ! আমি বড়ই দুর্বল মানুষ, এসব আকর্ষণ ও প্রলোভনের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার শক্তি আমার নেই। আল্লাহ! তুমিই আমাকে আশ্রয় দাও। তুমিই আমাকে বাঁচাও।"
এমনি পরিস্থিতিতে একদা 'আযীযে মেছের'-এর অনুপস্থিতিতে জুলাইখা ইউসুফের সাথে যে আচরণ ও কাণ্ড করেছিল উপরিউক্ত ১২টি আয়াতে তারই বর্ণনা করা হয়েছে।
জুলাইখা ইউসুফকে বালাখানায় ঢুকিয়ে ক্রমাগত দরজাসমূহ বন্ধ করতে করতে ভিতরে নিয়ে গেল। কোনো কেনো বর্ণনায় সাতটি দরজায় সাতটি তালা দিয়ে দরজাগুলো বন্ধ করে ভিতরের দিকে চলে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
মূল আয়াতে আছে "বুরহান।" বুরহান মানে দলীল বা প্রমাণ। রবের প্রমাণ মানে রবের দেখিয়ে দেয়া বা বুঝিয়ে দেয়া এমন প্রমাণ যার ভিত্তিতে ইউসুফের বিবেক তার ব্যক্তিসত্তার কাছ থেকে একথার স্বীকৃতি আদায় করেছে যে, এ নারীর ভোগের আহবানে সাড়া দেয়া তার পক্ষে শোভনীয় নয়। এ প্রমাণটি কী ছিল। ইতোপূর্বে পিছনের বাক্যেই তা বলে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ সেখানে বলা হয়েছে, "আমার রব তো আমাকে ভালই মর্যাদা দিয়েছেন আর আমি খারাপ কাজ করবো! এ ধরনের জালেমরা কখনো কল্যাণ লাভ করতে পারে না।" এ অকাট্য যুক্তিই ইউসুফ আলাইহিস সালামকে সদ্যোন্মিত যৌবনকালের এ সংকট সন্ধিক্ষণে পাপ কাজ থেকে বিরত রেখেছিল। তারপর বলা হলো, "ইউসুফও তার দিকে এগিয়ে যেতো যদি না তার রবের জ্বলন্ত প্রমাণ প্রত্যক্ষ করতো।" এ থেকে নবীগণের নিষ্পাপ হবার (ইসমতে আম্বিয়া) তত্বের অর্ন্তনিহিত সত্য পুরোপুরি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। নবীর নিষ্পাপ হবার মানে এ নয় যে, তাঁর গুনাহ, ভুল ও ত্রুটি করার ক্ষমতা ও সামর্থ ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে, ফলে তাঁর দ্বারা গুনাহর কাজ সংঘটিত হতেই পারে না; বরং এর মানে হচ্ছে, নবী যদিও গুনাহ করার শক্তি রাখেন কিন্তু সমস্ত মানবিক গুণাবলি সম্পন্ন হওয়া এবং যাবতীয় মানবিক আবেগ, অনুভূতি, ইচ্ছা-প্রবণতা থাকা সত্ত্বেও তিনি এমন সদাচারী ও আল্লাহভীরু হয়ে থাকেন যে, জেনে বুঝে কখনো গুনাহ করার ইচ্ছা করেন না। তার বিবেকের অভ্যন্তরে আল্লাহর এমন সব শক্তিশালী দলীল প্রমাণ তিনি রাখেন যেগুলোর মোকাবিলায় প্রবৃত্তির কামনা বাসনা কখনো সফলকাম হবার সুযোগ পায় না। আর যদি সজ্ঞানে তিনি কোনো ত্রুটি করেই বসেন তাহলে মহান আল্লাহ তখনই সুস্পষ্ট অহীর মাধ্যমে তা সংশোধন করে দেন। কারণ তাঁর পদস্খলন শুধুমাত্র এক ব্যক্তির পদস্খলন নয়; বরং সমগ্র উম্মতের পদস্খলনের রূপ নেয়। তিনি সঠিক পথ থেকে এক চুল পরিমাণ সরে গেলে সারা দুনিয়া গোমরাহীর পথে মাইলের পর মাইল চলে যায়।
আলোচ্য আয়াতগুলোতে বলা হয়েছে, জুলাইখার সেই নির্জন কক্ষে আল্লাহর প্রমাণ প্রত্যক্ষ করার সাথে সাথেই ইউসুফ সেখান থেকে পলায়োনদ্যত হলেন এবং বাইরে চলে যাওয়ার জন্য দরজার দিকে দৌড় দিলেন। আযীয পত্রী জুলাইখা তাঁকে ধরার জন্য পেছনে দৌড় দিল এবং তাঁর জামা ধরে তাঁকে বাইরে যেতে বাধা দিতে চেষ্টা করলো। কিন্তু তিনি পবিত্রতা রক্ষার ব্যাপারে ছিলেন দৃঢ়সংকল্প- তাই তিনি থামলেন না। ফলে তাঁর জামা পেছন দিক থেকে ছিঁড়ে গেল। মাআরেফুল কুরআনে মুফতী শফী রহ. ঐতিহাসিক সূত্রের উল্লেখ করে বর্ণনা করেছেন, ইউসুফ দৌড়িয়ে দরজার ধারে পৌঁছামাত্র যুলায়খার বন্ধ করা তালাগুলো আপনা আপনি খুলে নীচে পড়ে যেতে থাকে। এভাবে প্রত্যেকটি দরজার তালা খুলে পড়ে যেতো আর ইউসুফ প্রতিটি
কামরার দরজা পেরিয়ে যেতে থাকলেন। শেষ পর্যন্ত ইউসুফ দরজার বাইরে বেরিয়ে পড়লেন। যুলায়খাও তাঁর পেছনে পেছনে যেতে যেতে শেষ দরজার বাইরে চলে গেল। উভয়ে দরজার বাইরে এসেই দেখলো আযীযে মেছের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এভাবে ইউসুফ তাকওয়ার বলে তথা আল্লাহর অসীম রহমতে এ মারাত্মক ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল থেকে রক্ষা পেলেন। তাঁর ঈমানী শক্তি এবং সর্বত্র আল্লাহর উপস্থিতির দ্বিধাহীন অকৃত্রিম বিশ্বাস থাকায় আল্লাহ তাঁকে হেফাযত করলেন।
এদিকে দরজার বাইরে দুজনই আযীযে মেছেরকে দাঁড়ানো দেখতে পেল। যুলায়খা চমকে উঠলো, আর সম্পূর্ণ বিপরীত দোষ ও অপবাদ চাপিয়ে দিল ইউসুফের ওপর। সে স্বামীকে বললো, যে লোক তোমার পরিজনের সাথে কুকর্মের ইচ্ছা করে তার শাস্তি এ ছাড়া কী হতে পারে যে তাকে জেলে পাঠানো হবে অথবা কোনো কঠোর দৈহিক যন্ত্রণা দেয়া হবে?
এতক্ষণ তো ইউসুফ সৌজন্যবোধের কারণে কোনো কথা বলেননি। এবার কিন্তু তিনি মুখ খুলতে বাধ্য হলেন। তাছাড়া প্রতিবাদ না করলে তো যুলায়খার মিথ্যা অপবাদ সমর্থন করা হয়। তিনি বলে উঠলেন : هِيَ رَاوَدَتْنِي عَنْ نَفْسِ “সে-ই তো নিজের কুমতলব চরিতার্থ করার জন্য আমাকে ফুসলাচ্ছিল।"
আযীযে মেছের পড়ে গেলেন বিপাকে। কে সত্যবাদী তা নির্ণয় করা তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়লো। ঠিক এ সময় আল্লাহ তায়ালা এক অলৌকিক অবস্থা করে দিলেন। ঐ পরিবারে অবস্থানরত একটি কচি শিশুকে আল্লাহ তায়ালা বিজ্ঞ ও দার্শনিকসূলভ বাকশক্তি দান করলেন। দোলনার শিশুটি থেকে এ ধারণা করাই যায় না যে, সে এসব কর্মকা- দেখবে ও বুঝবে, আর তারপর অত্যন্ত বিজ্ঞতার সাথে তা বর্ণনাও করে দেবে। যে শিশুটি বাহ্যত জগতের সবকিছু থেকে উদাসীন ও নির্বিকার অবস্থায় দোলনায় পড়েছিল, সে ইউসুফ-এর মুজিয়া হিসেবে ঠিক ঐ মুহূর্তে মুখ খুললো, যখন আযীযে মেছের ছিল এ ঘটনা সম্পর্কে নানা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে জড়িত।
আল্লাহ তায়ালা এ শিশুর মুখে একটি দার্শনিকসুলভ উক্তি করিয়েছেন। সে বললো, ইউসুফের জামাটি দেখ- যদি তা সামনের দিকে ছিন্ন থাকে তবে যুলায়খার কথা সত্য, ইউসুফ মিথ্যাবাদী রূপে সাব্যস্ত হবেন। পক্ষান্তরে যদি জামাটি পেছনে দিকে ছিন্ন থাকে তাহলে যুলায়খা মিথ্যুক আর ইউসুফ সত্যবাদী। কারণ, তাতে বুঝা যাবে যে ইউসুফ পলায়নরত ছিলেন। কিন্তু যুলায়খা তাকে পলায়নে বাধা দিতে চেয়েছিল। অতপর যখন শিশুর বর্ণিত আলামত অনুযায়ী জামাটি পেছনে দিকে ছিন্ন দেখ গেল, তখন ইউসুফ-এর পবিত্রতা প্রমাণিত হয়ে গেল।
শিশুর মুখে যুক্তিভিত্তিক কথা শোনার সময়ই আযীযে মেছের বুঝতে পেরেছিলেন যে, ইউসুফের পবিত্রতা প্রকাশ করার জন্যই এ অস্বাভাবিক ঘটনার অবতারণা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ইউসুফের জামাটি পেছনের দিকে ছেড়া দেখে বাদশাহ নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে,
দোষ যুলায়খারই এবং ইউসুফ পবিত্র, তখন তিনি যুলায়খাকে সম্বোধন করে বললেন :
إِنَّهُ مِنْ كَيْدِ كُنْ . إِنَّ كَيْدَ كُنَّ عَظِيمٌ .
অর্থ : "এতো তোমাদের ষড়যন্ত্র; তোমাদের ষড়যন্ত্র খুবই জটিল।” (ইউসুফ: আয়াত-২৮)
বাদশাহ যুলায়খাকে ভর্ৎসনা করার পর ইউসুফ -কে বললো, "ইউসুফ! এটাকে উপেক্ষা করো"- অর্থাৎ যুলায়খার এ ষড়যন্ত্র ভুলে যাও- এটা বলাবলি করতে যেয়ো না, নয়তো বে-ইজ্জতী হতে থাকবে। তারপর যুলায়খাকে সম্বোধন করে বললো :
وَاسْتَغْفِرِي لِذَنْبِكِ إِنَّكِ كُنْتِ مِنَ الْخَطِئِينَ.
অর্থ : "তুমি তোমার অপরাধের জন্য ক্ষমা চাও, তুমিই তো অপরাধী" (ইউসুফ: আয়াত-২৯)
অর্থাৎ স্বামীর কাছে ক্ষমা চাও, কারণ স্বামীর অবর্তমানে তুমি তারই অধিকারের খেয়ানত করেছো। অথবা ইউসুফের কাছে ক্ষমা চাও, কারণ নিজে দোষ করে তার উপর চাপিয়েছো। (মারেফুল কুরআন)
ইউসুফের প্রতি যুলায়খার আশক্তির বিষয়টি জনসমক্ষে রটে গেল। বিশেষত মহিলাদের মাঝে তা নিয়ে চলছিল বেশ কানাঘুষা। সে সমাজের মহিলাদের এ কানাঘুষার কথা যুলায়খার কানেও গেল। গোপনে যুলায়খার বিরুদ্ধে মহিলাদের কুৎসা রটনার খবর শুনে যুলায়খা এক ফন্দি আঁটলো। সে একদিন সেসব মহিলাকে ভোজসভায় আহ্বান করলো। মহিলাদের সামনে বিভিন্ন রকমের খাদ্যসামগ্রী ও ফলমূল রাখা হলো। যেহেতু কিছু খাবার ছিল চাকু দিয়ে কেটে খাওয়ার। তাই প্রত্যেক মহিলাকে একটি করে চাকুও দেয়া হলো। মহিলারা খাবার কাটতে উদ্যত হচ্ছিল। এমন সময় যুলায়খা পাশের কক্ষ থেকে ইউসুফকে মহিলাদের সামনে হাজির করলো। মহিলারা ইউসুফকে দেখে তাঁর রূপ সৌন্দর্যে স্থির থাকতে পারলো না। তারা ইউসুফের প্রতি বিমোহিত হয়ে অপলকনেত্রে তাকিয়ে চাকু দিয়ে খাবারের পরিবর্তে নিজে নিজ হাত কেটে ফেললো। তারা হতভম্ব হয়ে বলতে লাগলো,
حَاشَ لِلَّهِ مَا هُذَا بَشَرًا إِنْ هَذَا إِلَّا مَلَكُ كَرِيمٌ
অর্থ : "হায় আল্লাহ! এতো মানুষ নয়, অবশ্যই তিনি একজন সম্মানিত ফেরেশতা।" অর্থাৎ এত সুন্দর নুরানী চেহারা মানুষের হতে পারে না।" (সূরা ইউসুফ: আয়াত-৩১)
যুলায়খা তখন মহিলাদের বললো, "দেখলে তো, এ-ই তো সেই ব্যক্তি যার বিষয়ে তোমরা আমাকে ভর্ৎসনা করতে (আমার দুর্নাম রটাতে) আসলে আমিই তাকে ফুসলিয়েছিলাম, কিন্তু সে পবিত্র রয়েছে। ভবিষ্যতে সে যদি আমার আদেশ অমান্য করে তাহলে সে অবশ্যই কারাগারে নিক্ষিপ্ত হবে এবং লাঞ্ছিতও হবে।”
এ থেকে তদানীন্তন মিসরের উচ্চ ও অভিজাত সমাজে নৈতকতার অবস্থা কোথায় গিয়ে ঠেকেছিল তা অনুমান করা যায়। একথা সুস্পষ্ট, আযীযের স্ত্রী যেসব মহিলাকে
দাওয়াত দিয়েছিল তারা নিশ্চয়ই নগরের আমীর-উমরাহ ও বড় বড় সরকারী কর্মকর্তাদের বেগমরাই ছিল। এসব উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন ভদ্র মহিলার সামনে সে নিজের প্রিয় যুবককে পেশ করলো। তার সুদর্শন যৌবনোদ্ভিন্ন দেহ সুষমা দেখিয়ে সে তাদের কাছ থেকে এ স্বীকৃতি আদায় করতে চাইলো যে, এমন সুন্দর যুবকের জন্য যদি আমি পাগল না হয়ে যাই তাহলে আর কী হবো! তারপর এসব পদস্থ ব্যক্তিবর্গের স্ত্রী-কন্যারা নিজেদের কাজের মাধ্যমে যেন একথার সত্যতা প্রমাণ করলো যে, সত্যিই এ ধরনের অবস্থায় তাদের প্রত্যেকেই ঠিক তাই করতো যা আযীযের স্ত্রী করেছে। আবর অভিজাত মহিলাদের এ ভরা মজলিসে মেজবান সাহেবা প্রকাশ্যে এ সংকল্প ঘোষণা করতে একটুও লজ্জা অনুভব করলো না যে, যদি এ সুন্দর যুবক তার কামনার ক্রীড়নক হতে রাযি না হয়, তাহলে সে তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেবে। এ সবকিছুই একথা প্রমাণ করে যে, ইউরোপ ও আমেরিকা এবং তাদের প্রাচ্যদেশীয় অন্ধ অনুসারীরা আজ যে নারী স্বাধীনতা এবং নারীদের অবাধ বিচরণ ও মেলামেশাকে বিংশ শতাব্দীর প্রগতিশীলতার অবদান মনে করে থাকে তা আসলে কোনো নতুন জিনিস নয়, অনেক পুরাতন, প্রাচীন জিনিস। অতি প্রাচীনকালে দাকিয়ানুসের শাসনেরও বহুশত বছর আগে মিসরে ঠিক একই রকম শানশওকতের সাথে এর প্রচলন ছিল যেমন আজকের এ "প্রগতিশীলতার" যুগে আছে।
সে সময় ইউসুফ যেসব অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিলেন এ আয়াতগুলো আমাদের সামনে তার একটি অদ্ভুত চিত্র তুলে ধরেছে। উনিশ বিশ বছরের একটি সুন্দর যুবক। বেদুঈন জীবনের উদ্দামতায় লালিত বলিষ্ঠ ও সুঠাম দেহী। আত্মীয়-স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন প্রবাস জীবন, দেশান্তর ও বলপূর্বক দাসত্বের পর্যায় অতিক্রম করার পর ভাগ্য তাকে দুনিয়ার বৃহত্তম সুসভ্য রাষ্ট্রের রাজধানীতে একজন উচ্চ রাষ্ট্রীয় পদমর্যদাসম্পন্ন ব্যক্তির বাড়িতে টেনে এনেছে। এখানে এ বাড়ির যে বেগম সাহেবার সাথে সকাল বিকাল তাকে উঠাবসা করতে হয় সে-ই প্রথমে তার পেছনে লাগে। তারপর তার সৌন্দর্যের আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র রাষ্ট্রে। সারা শহরের অভিজাত পরিবারের মেয়েরা তার প্রেমে হাবুডুবু খেতে থাকে। এখন তার চতুর্দিকে সবসময় শত শত সুন্দর জাল বিছানা থাকে তাকে আটকাবার জন্য। তার ভাবাবেগকে উসকিয়ে দেবার এবং তার ধার্মিকতাকে ভেঙে টুকরো টুকরো করার জন্য সব ধরনের কৌশল ও ফন্দি আঁটা হতে থাকে। তিনি যেদিকে যান সেদিকেই দেখতে পান পাপ তার সমস্ত চাকচিক্য ও মোহনীয়তা নিয়ে দরজা উন্মুক্ত করে তাঁর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। অনেকে অসৎ ও অশালীন করার জন্য সুযোগ খুঁজতে থাকে। কিন্তু এখানে সুযোগই তাকে খুঁজে ফিরছে এবং সবসময় ওঁৎ পেতে আছে যখনই তার মনে অসৎকাজের প্রতি সামান্যতম ঝোঁকপ্রবণতা দেখা দেবে তখনই সে তার সামনে নিজেকে পেশ করে দেবে। দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা তিনি এক মহা আতংকের মধ্যে জীবন যাপন করছেন। কখনো মাত্র এক লহমার জন্য যদি তাঁর ইচ্ছা ও সংকল্পের বাঁধন সামান্যতম ঢিলে হয়ে যায় তাহলে পাপের যে অসংখ্য দরজা তার অপেক্ষায় হরহামেশা খোলা আছে তার যে কোনো একটির মধ্য দিয়ে তিনি ভেতরে
প্রবেশ করে যেতে পারেন। এ অবস্থায় এ আল্লাহ বিশ্বাসী যুবক যে সাফল্যের সাথে এসব শয়তানী প্ররোচনার মোকাবিলা করেছেন তা এমনিতেই কম প্রশংসনীয় নয়। কিন্তু এ সর্বোচ্চ মানের আত্মসংযমের পরিচয় দেবার পর আত্মোপলব্ধি ও চিন্তার বিশুদ্ধতারও তিনি চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন। এমন নজীরবিহীন পরহেজগারীর দৃষ্টান্ত স্থাপনের পরও তাঁর মনে কখনো এ মর্মে অহমিকা জাগেনি যে, "বাহ, কত মজবুত আমার চরিত্র! এতো সুন্দরী ও যুবতী মেয়েরা আমার প্রেমে পাগলপারা কিন্তু এরপরও আমার পদস্থলন হয়নি।" বরং এর পরিবর্তে তিনি নিজের মানবিক দুর্বলতার কথা চিন্তা করে ভয়ে কেঁপে উঠেছেন এবং অত্যন্ত দীনতার সাথে আল্লাহর কাছে সাহায্যের জন্য আবেদন জানিয়ে বলেছেন, হে আমার রব! আমি একজন দুর্বল মানুষ। এ অসংখ্য অগণিত প্ররোচনার মোকাবিলা করার শক্তি আমার কোথায়! তুমি আমাকে সহায়তা দান করো এবং আমাকে বাঁচাও। আমি ভয় করছি আমার পা পিছলে না যায় আসলে এটি ইউসুফ আলাইহিস সালামের নৈতিক প্রশিক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংকটময় অধ্যায় ছিল। বিশ্বস্ততা, আমানতদারী, চারিত্রিক নিষ্কলুষতা, সত্যনিষ্ঠা, অকপটতা, সংযম ও চিন্তার ভারসাম্যের অসাধারণ গুণাবলি এ পর্যন্ত তাঁর মধ্যে সুপ্ত ছিল এবং এ সম্পর্কে তিনি নিজেও বেখবর ছিলেন। এ কঠোর পরীক্ষার যুগে এ গুণগুলো সবই তাঁর মধ্যে বিকশিত হয়ে উঠলো। এগুলো পূর্ণ শক্তিতে কাজ করতে থাকেলো। তিনি নিজেও জানতে পারলেন তাঁর মধ্যে কোন কোন শক্তি আছে এবং তাদেরকে তিনি কোন কোন কাজে লাগাতে পারেন।

📘 আল কুরআনে নারীদের ২৫ সূরা > 📄 ইউসুফ এর চারিত্রিক স্বচ্ছতা সম্পর্কে জুলাইখার স্বীকারোক্তি

📄 ইউসুফ এর চারিত্রিক স্বচ্ছতা সম্পর্কে জুলাইখার স্বীকারোক্তি


قَالَ مَا خَطْبُكُنَّ إِذْ رَاوَدتُّنَّ يُوسُفَ عَن نَّفْسِهِ ، قُلْنَ حَاشَ لِلَّهِ مَا عَلِمْنَا عَلَيْهِ مِنْ سُوءٍ قَالَتِ امْرَأَتُ الْعَزِيزِ الْآنَ حَصْحَصَ الْحَقُّ أَنَا رَاوَدْتُهُ عَن نَّفْسِهِ وَإِنَّهُ لَمِنَ الصَّدِقِينَ.
অর্থ: একথায় বাদশাহ সেই মহিলাদেরকে জিজ্ঞেস করলো, "তোমরা যখন ইউসুফকে অসৎকাজে প্ররোচিত করার চেষ্টা করেছিলে তোমাদের তখনকার অভিজ্ঞতা কী?" সবাই একবাক্যে বললো, "আল্লাহর কী অপার মহিমা! আমরা তার মধ্যে অসৎ প্রবণতার গন্ধই পাইনি।” আযীযের স্ত্রী বলে উঠলো, "এখন সত্য প্রকাশ হয়ে গেছে। আমিই তাকে ফুসলাবার চেষ্টা করেছিলাম, নিঃসন্দেহে সে একদম সত্যবাদী।" (সূরা ইউসুফ: আয়াত-৫১)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: এখানে 'আযীযে মেছের'-এর স্ত্রীই নয়; বরং সমাজের অন্যান্য মহিলারাও যে ইউসুফের চরিত্রের স্বচ্ছতা সম্পর্কে সাক্ষ্য দিয়েছিল সেকথা ফুটে উঠেছে। সংক্ষিপ্ত ঘটনা হলো, মিশর সম্রাটের অনুপস্থিতিতে তার স্ত্রী ইউসুফকে যে নিজের কুমতলব চরিতার্থ করার জন্য ফুসলিয়েও কঠিন ষড়যন্ত্র করেও তাকে কাবু করতে পারলো না, অধিকন্ত সম্রাটের সামনে উল্টো ইউসুফের ঘাড়েই সমস্ত দোষ
চাপিয়ে দিল। শেষ পর্যন্ত মিশর সম্রাটও প্রকৃত ঘটনা বুঝতে পেরে নিজের স্ত্রীকে ভর্ৎসনা করলো আর ইউসুফকে বললো বিষয়টি নিয়ে যেন নাড়াচাড়া না করে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও লোক সমক্ষে স্ত্রীর মুখ বাচানোর জন্য ইউসুফকে জেলখানায় পাঠানো হলো। জেলখানায় তাঁকে বন্দী জীবনযাপন করতে হয়েছিল দীর্ঘ আট-নয় বছর।
ইউসুফ-এর সাথে আরও দুই যুবকও জেলখানায় আটক ছিল। দুই যুবকের দুটো স্বপ্নের ব্যাখ্যার জন্য তারা ইউসুফকে অনুরোধ জানালো। তারা দীর্ঘাদিনের বাস্তব ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় ইউসুফকে অত্যন্ত সৎ, চরিত্রবান ও সুবিজ্ঞ জানতে পেরেছে বলে উভয়ে তাঁর কাছে নিজ নিজ স্বপ্নের তা'বীর জানতে চাইলো। ইউসুফ তাদেরকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দিলেন। ইতোমধ্যে তাদের একজন স্বপ্নের ব্যাখ্যানুযায়ী জেলখানা থেকে মুক্তিও পেয়ে গেলো।
একদিন মিশর সম্রাট দরবারের লোকদের ডেকে তার এক আশ্চর্য স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাইলো। লোকেরা বললো, “এটা তো একটা অস্পষ্ট স্বপ্নের কথা আর আমরা তো স্বপ্নের তা'বীর সম্পর্কে জ্ঞাত নই।” সে সময় ওখানে জেলখানা থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত যুবকটিও উপস্থিত ছিল। তৎক্ষণাৎ তার মনে পড়লো দীর্ঘদিনের জেলখানার সাথী ইউসুফের কথা এবং স্বপ্নের তা'বীর সম্পর্কে তার বিজ্ঞতার কথা। সে বললো, আমি আপনাদেরকে এ স্বপ্নের তা'বীর বলে দেব, আমাকে একটু জেলখানায় ইউসুফের কাছে পাঠিয়ে দিন। যুবকটি সভাসদকে ইউসুফের নির্ভুল স্বপ্নে তা'বীর জানার বিষয়েও অবহিত করেছিল।
যুবকটিকে জেলখানায় পাঠানো হলো। সে ইউসুফকে বাদশাহর স্বপ্নের বিষয় জানালে ইউসুফ বাদশাহর স্বপ্নে ব্যাখ্যা বলে দিল। বাদশাহ বললো, "তাকে আমার কাছে নিয়ে আস।" বাদশাহর পাঠানো লোক যখন ইউসুফের কাছে গিয়ে এ সুসংবাদ দিল, তখন ইউসুফ তাকে বললেন, আগে তুমি তোমার মালিকের কাছে ফিরে গিয়ে তার কাছ থেকে জেনে আসতো, ঐসব মহিলাদের কী অবস্থা, যারা নিজেদের হাত কেটেছিল? নিশ্চয়ই আমার রব তাদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে ওয়াকিফহাল আছেন।"
এ খবর বাদশাহর কাছে গেলে তিনি সেসব মহিলাদের একত্র করে তাদের কাছ থেকে ইউসুফ সম্পর্কে তার চরিত্র সম্পর্কে জানতে চাইলেন।
সম্ভবত শাহীমহলে এ মহিলাদেরকে ডেকে এনে এ জবানবন্দী নেয়া হয়েছিল। আবার এও হতে পারে যে, বাদশাহ নিজের কোনো বিশেষ বিশ্বস্ত ব্যাক্তিকে পাঠিয়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে ব্যক্তিগতভাবে এ স্বীকারোক্তি আদায় করেছিলেন।
অনুমান করা যেতে পারে, এ স্বীকারোক্তিগুলো কীভাবে আট নয় বছর আগের ঘটনাবলিকে আবার নতুন করে তরতাজা করে দিয়েছিল, কীভাবে ইউসুফের ব্যক্তিত্ব কারাজীবনের দীর্ঘকালীন বিস্মৃতির পর আবার অকস্মাত বিপুলভাবে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল, কীভাবে মিসরের সমস্ত অভিজাত, মর্যাদাশালী ও মধ্যবিত্ত সমাজে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও তাঁর নৈতিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। বাইবেল ও
তালমূদের বরাত দিয়ে একথা বলা হয়েছে যে, বাদশাহ সাধারণ ঘোষণার মাধ্যমে সারা দেশের জ্ঞানীগুণী, আলেম ও পীরদের একত্র করেছিলেন এবং তারা সবাই তাঁর স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে অক্ষম হয়েছিল। এরপর ইউসুফ-এর ব্যাখ্যা করেছিলেন। এ ঘটনার ফলে সারা দেশের জনতার দৃষ্টি আগে থেকেই তাঁর প্রতি নিবদ্ধ হয়েছিল। তারপর বাদশাহর তলবনামা পেয়ে যখন তিনি জেলখানা থেকে বাইরে আসতে অস্বীকার করলেন তখন সমগ্র দেশবাসী অবাক হয়ে গিয়েছিল যে, এ আবার কেমন অদ্ভুত প্রকৃতির উচ্চ মনোবল সম্পন্ন মানুষ, যাকে আট নয় বছরের কারাবাসের পর বাদশাহ নিজেই মেহেরবানী করে ডাকছেন এবং তারপরও তিনি ব্যাকুল চিত্তে দৌঁড়ে আসছেন না! তারপর যখন তারা ইউসুফের নিজের কারামুক্তির এবং বাদশাহর সাথে দেখা করতে আসার জন্য পেশকৃত শর্তাবলি শুনালো তখন সবার দৃষ্টি এ অনুসন্ধান ও তদন্তের ফলাফলের প্রতি কেন্দ্রীভূত হয়ে রইল। এরপর যখন লোকেরা এর ফলাফল শুনলো তখন দেশের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা এই বলে বাহবা দিল যে, আহা, এ ব্যক্তি কেমন পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন জীবন ও চরিত্রের অধিকারী! কাল যারা নিজেদের সমবেত প্রচেষ্টায় তাঁকে কারাগারে পাঠিয়েছিল আজ তাঁর চারিত্রিক নিষ্কলুষতার পক্ষে তারাই সাক্ষ্য দিয়ে যাচ্ছে।
এ অবস্থা সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করলে একথা ভালোভাবেই উপলব্ধি করা যায় যে, সে সময় ইউসুফের উন্নতির উচ্চ শিখরে উঠার জন্য কেমন অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এরপর বাদশাহর সাথে সাক্ষাতের সময় ইউসুফ হঠাৎ কেমন করে তাকে দেশের অর্থ-সম্পদের ওপর কর্তৃত্ব দান করার দাবী জানিয়েছিলেন এবং বাদশাহ কেন নির্দ্বিধায় তা গ্রহণ করে নিয়েছিলেন একথা আর মোটেই বিস্ময়কর মেনে না। ব্যাপার যদি শুধু এতটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো যে কারাগারের একজন বন্দী বাদশাহর একটি স্বপ্নের তা'বীর বলে দিয়েছিলেন তাহলে এ জন্য তিনি বড়জোর কোনো পুরস্কারের এবং কারাগার থেকে মুক্তিলাভের অধিকারী হতে পারতেন। কিন্তু শুধুমাত্র এতটুকুন কথায় তিনি বাদশাহকে বলবেন, "আমাকে দেশের যাবতীয় অর্থ-সম্পদের ওপর কর্তৃত্ব দান করো" এবং বাদশাহ বলে দেবেন "নাও, সবকিছু তোমার জন্য হাযির"-এটা যথেষ্ট হতে পারতো না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00