📘 আল কুরআনে নারীদের ২৫ সূরা > 📄 নাযিল হওয়ার সময়

📄 নাযিল হওয়ার সময়


এ সূরার বিষয়বস্তু থেকে একথা বুঝা যাচ্ছে যে, এটিও নবী -এর মক্কায় অবস্থানের শেষ যুগে নাযিল হয়ে থাকবে। তখন কুরাইশের লোকেরা নবীকে হত্যা বা দেশান্তর করবে, না বন্দী করবে, এ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিল। এ সময় মক্কার কাফের সমাজের কোনো কোনো লোক (সম্ভবত ইহুদীদের ইংগিত) নবীকে পরীক্ষা করার জন্য তাঁকে প্রশ্ন করে, বনী ইসরাঈলরা কী কারণে মিসরে চলে গিয়েছিল? যেহেতু আরববাসীরা এ ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানতো না, তাদের কথা-কাহিনী ও পৌরানিক বৃত্তাস্তসমূহে কোথাও এর কোনো উল্লেখই পাওয়া যেতো না এবং নবী -এর নিজের মুখেও ইতিপূর্বে এ সম্পর্কিত কোনো কথা শোনা যায়নি, তাই তারা আশা করছিল, তিনি এর কোনো বিস্তারিত জবাব দিতে পারবেন না অথবা এ সময় টালবাহানা করে কোনো ইহুদীকে জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করবেন এবং এভাবে তাঁর বুজরুকি ধরা পড়ে যাবে। কিন্তু এ পরীক্ষায় উলটো তারাই মার খেয়ে গেলো। আল্লাহ কেবল সাথে সাথেই ইউসুফ আলাইহি সালামের এ ঘটনা সম্পূর্ণ তাঁর মুখ দিয়ে শুনিয়েই ক্ষান্ত হলেন না; বরং এ ঘটনাকে কুরইশরা ইউসুফের ভাইদের মতো নবী -এর সাথে যে ব্যবহার করছিল ঠিক তার সদৃশ ঘটনা হিসেবে উপস্থাপিত করলেন।

📘 আল কুরআনে নারীদের ২৫ সূরা > 📄 নাযিলের উদ্দেশ্য

📄 নাযিলের উদ্দেশ্য


১. এর মাধ্যমে মুহাম্মাদ -এর নবুওয়াতের প্রমাণ এবং তাও আবার বিরোধীদের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা। সেই সাথে তাদের স্থিরীকৃত পরীক্ষায় একথা প্রমাণ করে দেয়া যে, নবী কোনা কথা বলেন না; বরং অহীর মাধ্যমে যথার্থ জ্ঞান লাভ করেন। ৩ ও ৭ আয়াতে এ উদ্দেশ্যটি সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে এবং ১০২ ও ১০৩ আয়াতে পূর্ণ শক্তিতে এর ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
২. কুরাইশ সরদারদের ও মুহাম্মাদ -এর মধ্যে এ সময় যে দ্বন্দ্ব চলছিল তার ওপর ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইদের ঘটনা প্রয়োগ করে কুরাইশদেরকে একথা জানিয়ে দেয়া যে, আজ তোমরা নিজেদের ভাইয়ের সাথে ঠিক তেমনি আচরণ করছো যেমন ইউসূফের ভাইয়েরা তাঁর সাথে করেছিলেন। কিন্তু যেমন তারা আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধে লড়াই করে সফল হয়নি এবং শেষ পর্যন্ত যাকে চরম
নির্দয়ভাবে কুয়ার মধ্যে ফেলে দিয়েছিলো সেই ভায়ের পদতলেই নিজেদের সঁপে দিতে হয়েছিল। ঠিক তেমনিভাবে আল্লাহর কৌশল ও ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে তোমাদের শক্তি প্রয়োগ সফল হতে পারবে না। একদিন তোমাদেরও নিজেদের এ ভাইয়ের কাছে দয়া ও অনুগ্রহ ভিক্ষা করতে হবে, যাকে আজ তোমরা খতম করে দেবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছো। সূরার শুরুতে এ উদ্দেশ্যটিও পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, "ইউসুফ ও তার ভাইদের ঘটনার মধ্যে এ প্রশ্নকারীদের জন্য অনেক নিদর্শন রয়েছে।”
৩. আসলে ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনাকে মুহাম্মাদ ও কুরাইশদের দ্বন্দ্বের ওপর প্রয়োগ করে কুরআন মজীদ যেন একটি স্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল। পরবর্তীকালের ঘটনাবলি তাকে অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণ করেছে। এ সূরাটি নাযিল হওয়ার দেড় দু'বছর পরই কুরাইশরা ইউসুফের ভাইদের মতো মুহাম্মাদ কে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। তাদের হাত থেকে প্রাণ বাঁচাবার জন্য তাঁকে বাধ্য হয়ে মক্কা থেকে বের হতে হয়। তারপর তাদের প্রত্যাশার সম্পূর্ণ বিরুদ্ধেই দেশান্তরী অবস্থায়ই তিনি ঠিক তেমনি উন্নতি ও কর্তৃত্ব লাভ করেন যেমন ইউসুফ আলাইহিস সালাম করেছিলেন। তারপর মক্কা বিজয়ের সময় ঠিক সেই একই ঘটনা ঘটেছিল যা মিসরের রাজধানীতে ইউসুফ আলাইহিস সালামের সামনে তাঁর ভাইদের শেষ উপস্থিতির সময় ঘটেছিল। সেখানে যখন ইউসুফের ভাইয়েরা চরম অসহায় ও দীন হীন অবস্থায় তাঁর সামনে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে বলছিলেন, "আমাদের প্রতি সাদকা করুন। আল্লাহ সাদকাকারীদেরকে উত্তম পুরস্কার দিয়ে থাকেন।” তখন ইউসুফ আলাইহিস সালাম প্রতিশোধ নেবার শক্তি রাখা সত্ত্বেও তাদেরকে মাফ করে দিলেন এবং বললেন, "আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদের মাফ করে দিন। তিনি সকল অনুগ্রহকারীর চাইতে বড় অনুগ্রহকারী।"
অনুরূপভাবে এখানে যখন মুহাম্মাদ -এর সামনে পরাজিত বিধ্বস্ত কুরাইশরা মাথা নত করে দাঁড়িয়েছিল এবং তিনি তাদের প্রত্যেকটি জুলুমের বদলা নেবার ক্ষমতা রাখতেন তখন তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমরা কী মনে করো? আমি তোমাদের সাথে কেমন ব্যবহার করবো?” তারা জবাব দিল, "আপনি একজন উদারচেতা ভাই এবং একজন উদারচেতা ভাইয়ের সন্তান।” একথায় তিনি বললেন, "আমি তোমাদের সেই একই জবাব দিচ্ছি যে জবাব ইউসুফ তার ভাইদেরকে দিয়েছিলেন। অর্থাৎ আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। যাও তোমাদের মাফ করে দিলাম।"

📘 আল কুরআনে নারীদের ২৫ সূরা > 📄 বিষয়বস্তু ও আলোচ্য বিষয়

📄 বিষয়বস্তু ও আলোচ্য বিষয়


এ সূরাতেই আল্লাহ তায়ালা ইউসুফ -এর কাহিনীকে 'সুন্দরতম কাহিনী' বলে বিশেষিত করেছেন। কিন্তু কুরআন কোনো কাহিনী বা ঘটনাকে ইতিহাসের ঢং-এ বর্ণনা করে না; বরং কাহিনীর মাধ্যমে ইসলামের উন্নত শিক্ষা ও উপদেশ দান করে।
গোটা কাহিনীতে এ কথা স্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়েছে যে, ইবরাহীম, ইসহাক , ইয়াকুব ও ইউসুফ যে দীন-ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন, মুহাম্মদ -ও ঐ একই দীনের দাওয়াত দিচ্ছেন।
এ কাহিনীর মাধ্যমে জনগণের সামনে দু'রকমের বিপরীতমুখী চরিত্র তুলে ধরা হয়েছে; যাতে মানুষ নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে, কোন্ ধরনের চরিত্র ভালো- একদিকে ইয়াকুব ও ইউসুফ-এর চরিত্র, অপর দিকে ইউসুফ -এর হিংসুক ভাই, আযীযে মিসর, তার স্ত্রী ও মিসরের অভিজাত পরিবারের মহিলাদের চরিত্র।
এ কাহিনীর মাধ্যমে একটি গভীর অর্থপূর্ণ তত্ত্বও মানুষের মনে রেখাপাত করে। সে তত্ত্বটি হচ্ছে, আল্লাহ যা করতে চান তা অবশ্যই হয়ে যায়। মানুষ যত চেষ্টা-তদবিরই করুক, তা ঠেকাতে পারে না; বরং দেখা যায়, মানুষ যে পরিকল্পনা ও কৌশল অবলম্বন করে তা তাদের উদ্দেশ্য সফল করার বদলে আল্লাহর ইচ্ছা পূরণেরই সহায়ক হয়। যেমন- ইউসুফ -এর ভাইয়েরা তাঁকে কুয়ায় ফেলে মনে করেছিল যে, তাদের পথের কাঁটা দূর হয়ে গেল; কিন্তু দেখা গেল, তাদের এ অপকর্মের ফলেই ইউসুফ-এর উন্নতির পথ খুলে গেল। আযীযে মিসরের স্ত্রী ইউসুফ-কে জেলে পাঠিয়ে মনে করেছিল যে, তার যৌন কামনা পূরণ করতে রাজি না হওয়ার প্রতিশোধ নেওয়া হলো।
অথচ এ জেলজীবনই ইউসুফ-কে মিসরের শাসকের পদমর্যাদায় পৌছিয়ে দিল। অপরদিকে ইউসুফ-এর ভাইয়েরা তাদের অন্যায় আচরণের জন্য তাঁর নিকট লজ্জিত হলো এবং আযীযে মিসরের স্ত্রী নিজের হীন চরিত্রের কারণে অপদস্ত হলো।
এ জাতীয় ঘটনা দু-চারটি নয়, ইতিহাসের পাতা এ ধরনের উদাহরণে ভরা। এসব ঘটনা এ মহাসত্যেরই সাক্ষী যে, আল্লাহ যাকে উপরে ওঠাতে চান, সারা দুনিয়ার শক্তি মিলেও তাকে নীচে ফেলতে পারে না; বরং মানুষ তাকে নীচে ফেলে দেওয়ার জন্য যত ফন্দি করে, আল্লাহ তার সবগুলোকেই তাকে উপরে ওঠার মাধ্যম বানিয়ে দেন। এর বিপরীতে আল্লাহ যাকে নীচে ফেলতে চান, তাকে ওঠানোর জন্য যত কৌশলই করা হোক তা উল্টে যায়।

📘 আল কুরআনে নারীদের ২৫ সূরা > 📄 এ সূরার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো

📄 এ সূরার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো


একজন মর্দে মুমিন যদি সত্যিকার ইসলামী চরিত্রে সজ্জিত হয় এবং ধীরস্থিরভাবে সবর ও হিকমতের সাথে আল্লাহ তাআলার উপর সম্পূর্ণ ভরসা করে সকল সমস্যার মোকাবিলা করতে থাকে, তাহলে নিছক চরিত্রবলেই সে সারা দেশ জয় করতে পারে। ইউসুফ ১৭ বছর বয়সে ক্রীতদাস অবস্থায় বিদেশে সম্পূর্ণ অপরিচিত পরিবেশে
পড়ে যান। অত্যন্ত উন্নত নৈতিক চরিত্রের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও নৈতিক অপরাধে দোষী হিসেবেই তাকে জেলে যেতে হয়। এমন চরম দুরবস্থা থেকে তিনি ঈমান ও চরিত্রের হাতিয়ার দিয়ে শত্রুদের পরাজিত করে মিসর জয় করেন। তিনি সেদেশে ইসলামী শাসনব্যবস্থা কায়েম করেন। ৩০ বছর বয়সে দেশের শাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে দীর্ঘ ৫০ বছর পরম সুনাম ও সুখ্যাতির সাথে মিসর শাসন করেন। ৮০ বছর বয়সে তিনি ইনতিকাল করেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00