📄 নামকরণ
এ সূরার ৪৬ ও ৪৭নং আয়াতে আসহাবে আরাফ বা আরাফবাসীদের উল্লেখ করা হয়েছে। সেই জন্যে এর নামকরণ করা হয়েছে আল আরাফ। অন্য কথায় বলা যায়, এ সূরাকে সূরা আল আরাফ বলার তাৎপর্য হচ্ছে এই যে, যে সূরার মধ্যে আ'রাফের কথা বলা হয়েছে, এটা সেই সূরা।
📄 নাযিলের সময়
এ সূরার আলোচ্য বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করলে সুস্পষ্টভাবে অনুভূত হয় যে, এ সূরাটি সূরা আন'আমের প্রায় সমসময়ে নাযিল হয়। অবশ্য এটা আগে না আন'আম আগে নাযিল হয় তা নিশ্চয়তার সাথে চিহ্নিত করা যাবে না। তবে এ সূরায় প্রদত্ত ভাষণের বাচনভংগী থেকে এটি যে ঐ সময়ের সাথে সম্পর্কিত তা পরিষ্কার বুঝা যায়। কাজেই এর ঐতিহাসিক পটভূমি অনুধাবন করার জন্যে সূরা আন'আমের শুরুতে যে ভূমিকা লেখা হয়েছে তার ওপর একবার নজর বুলিয়ে নেয়া যথেষ্ট হবে।
📄 আলোচ্য বিষয়
এ সূরার ভাষণের কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু হচ্ছে রিসালাতের প্রতি ঈমান আনার দাওয়াত। আল্লাহ প্রেরিত রাসূলের আনুগত্য করার জন্যে শ্রোতাদের উদ্বুদ্ধ করাই এর সমগ্র আলোচনার মৌল উদ্দশ্য ও লক্ষ্য। কিন্তু এ দাওয়াত সতর্ক করার ও ভয় দেখানোর ভাবধারাই ফুটে উঠেছে বেশি করে। কারণ এখানে যাদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে (অর্থাৎ মক্কাবাসী) তাদেরকে বুঝাতে দীর্ঘকাল অতিবাহিত হয়ে গিয়েছিল। তাদের স্থূল শ্রবণ ও অনুধাবন শক্তি, হঠকারিতা, গোয়ার্তুমী ও একগুয়েমী মনোভাব চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। যার ফলে রাসূলের প্রতি তাদেরকে সম্বোধন করা বন্ধ করে দিয়ে অন্যদেরকে সম্বোধন করার হুকুম অচিরেই নাযিল হতে যাচ্ছিল। তাই বুঝাবার ভংগীতে নবুওয়াত ও রিসালাতের দাওয়াত পেশ করার সাথে সাথে তাদেরকে একথাও জানিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, নবীর মোকাবিলায় তোমরা যে কর্মনীতি অবলম্বন করেছো তোমাদের আগের বিভিন্ন মানব সম্প্রদায়ও নিজেদের নবীদের সাথে অনুরূপ আচরণ অবলম্বন করে অত্যন্ত মারাত্মক পরিণতির সম্মুখীন হয়েছিল। তারপর বর্তমানে যেহেতু তাদেরকে যুক্তি প্রমাণ সহকারে দাওয়াত দেবার প্রচেষ্টা চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হতে চলেছে। তাই ভাষণের শেষ অংশে তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে আহলি কিতাবদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। আর এক জায়গায় সারা দুনিয়ার মানুষকে সাধারণভাবে সম্বোধন করা হয়েছে। এ থেকে এরূপ আভাস পাওয়া যাচ্ছে যে, এখন হিজরত নিকটবর্তী এবং নবীর জন্যে তার নিটকতর লোকদেরকে সম্বোধন করার যুগ শেষ হয়ে আসছে।
এ ভাষণের এক পর্যায়ে ইহুদিদেরকেও সম্বোধন করা হয়েছে। তাই এই সাথে রিসালাত ও নবুওয়াতের দাওয়াতের আর একটি দিকও সুস্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়েছে। নবীর প্রতি ঈমান আনার পর তাঁর সাথে মুনাফিকী নীতি অবলম্বন করার, আনুগত্য ও অনুসৃতির অঙ্গীকার করার পর তা ভঙ্গ করার এবং সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য সম্পর্কে অবহিত হয়ে যাওয়ার পর মিথ্যার প্রতি সাহায্য সহযোগিতা দানের কাজে আপাদমস্তক ডুবে থাকার পরিণাম কী, তাও এতে জানিয়ে দেয়া হয়েছে।
📄 আল্লাহর আদেশের অবাধ্যতা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে
وَيَا آدَمُ اسْكُنْ أَنْتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ فَكُلَا مِنْ حَيْثُ شِئْتُمَا وَلَا تَقْرَبَا هَذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّلِمِينَ.
অর্থ: আর হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী তোমরা দু'জনাই এ জান্নাতে থাকো। যেখানে যা তোমাদের ইচ্ছা হয় খাও, কিন্তু এ গাছটির কাছে যেয়ো না, অন্যথায় তোমরা জালেমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে”। (সূরা আল আরাফ: আয়াত-১৯)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: আলোচ্য আয়াতের পূর্বের আয়াতগুলোতে আদম সৃষ্টি ও শয়তানের অবাধ্যতা এবং বনী আদমের সাথে শয়তানের শত্রুতার সূচনা সম্পর্কে উপরিউক্ত কথাগুলো বলা হয়েছে। অতঃপর এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা আদম-কে লক্ষ্য করে তার চির শত্রু শয়তানের চক্রান্ত থেকে বেঁচে থাকার জন্য সাবধানতা অবলম্বনের পথ বাতলে দিয়েছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আদমের সাথী হিসেবে হাওয়া-কে সৃষ্টি করে তাদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে জান্নাতে বসবাস করার নির্দেশ দিয়ে বললেন, “ও আদম! তুমি তোমার স্ত্রীকে নিয়ে জান্নাতে বসবাস কর। আর জান্নাতের যেখান থেকে ইচ্ছা পানাহার কর। কিন্তু এ গাছটির ধারেও যেয়ো না- তাহলে তোমরা উভয়ে যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়বে।"
সূরা আল বাকারার ৪র্থ রুকু'তেও বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। সেখানে আলোচ্য আয়াতটির সাথে এ আয়াতের হুবহু মিল রয়েছে। সূরা আল বাকারার ৩৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে।
وَ قُلْنَا يَأْدَمُ اسْكُنْ اَنْتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ وَكُلَا مِنْهَا رَغَدًا حَيْثُ شِئْتُهَا وَلَا تَقْرَبَا هَذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّلِمِينَ.
"আর আমি বললাম, "ও আদম! তুমি তোমার স্ত্রীকে নিয়ে জান্নাতে বসবাস করো, আর দু'জন এ থেকে স্বাচ্ছন্দে পানাহার করো। তবে এ গাছটির ধারেও যেয়ো না- তাহলে তোমরা উভয়েই যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়বে।” একই বিষয়ের বর্ণনায় উপরিউক্ত
সূরা আল বাকারা, সূরা আল আরাফের দু'টো আয়াতই জান্নাতে বসবাসের নির্দেশনায় আল্লাহ তায়ালা সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন আদম -কে; আর এ নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত করেছেন তার স্ত্রীকে। বলেছেন,
اسْكُنْ أَنْتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ "তুমি বসবাস করো তোমার স্ত্রীকে নিয়ে জান্নাতে" লক্ষণীয় যে, এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বসবাসের ব্যাপারে কেবল আদম -কেই সম্বোধন করেছেন। এ ব্যাপারে উভয়কে সম্বোধন করা হয়নি। আয়াতে বসবাসের ও জীবন ধারণের ক্ষেত্রে আদমকে উদ্দেশ্য করে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, কারণ হাওয়া ছিলেন আদম-এর অধীন। আয়াতে পরবর্তী অংশে খানা-পিনার বিষয়ে উভকেই সম্বোধন করা হয়েছে। আয়াতের বিষয়বস্তু বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, স্ত্রীগণের থাকার ব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রণ থাকবে স্বামীর উপর, কিন্তু আল্লাহর বিধি-নিষেধ মেনে চলার ব্যাপারে উভয়ই স্বতন্ত্রভাবে দায়ী। স্ত্রীর অবস্থান সংক্রান্ত যাবতীয় দায়-দায়িত্ব স্বামীর উপর ন্যস্ত হলেও আল্লাহর হুকুম-আহকাম পালনের ব্যাপারে উভয়কেই সম্বোধন করা হয়েছে বিধায় এ বিষয়ে স্বামী-স্ত্রী স্বতন্ত্রভাবে নিজ নিজ কৃতকর্মের জন্য আল্লাহর কাছে দায়ী- (তাফসীরে মাযহারী)
আল্লাহ তায়ালা আদম-হাওয়ার বাসস্থান ব্যবস্থার সমাধান স্বরূপ এ নির্দেশ দিয়েছেন। তাদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থাও এতে বলে দেয়া হয়েছে। আর বলে দেয়া হয়েছে এসবের সীমারেখাও। আল্লাহর দেয়া সীমারেখা লংঘন করা হলে তার পরিণতি সম্পর্কেও সাবধান করে দেয়া হয়েছে।
তারপর শয়তান তাদের উভয়কে (আদম-হাওয়া) ওয়াসওয়াসা দিল, যাতে তাদের সামনে প্রকাশ করে দেয় (তাদের লজ্জাস্থান) যা তাদের কাছে গোপন ছিল। অর্থাৎ এমন ওয়াসওয়াসা দিল যাতে করে আদম-হাওয়ার বেহেশতী লেবাস থেকে তারা বঞ্চিত হয়ে পড়ে। তারা বিবস্ত্র হয়ে পড়ে। সে বললো, "তোমাদের রব এ গাছ থেকে নিষেধ করার কারণ একমাত্র এই যে, এতে তোমরা ফেরেশতা হয়ে যাবে অথবা চিরন্তন জীবন লাভ করে বসবে। সে তাদের উভয়কে কসম করে বললো, "আমি তোমাদের জন্য অবশ্যই কল্যাণকামী" এভাবে সে তাদের প্রতারণার জালে আবদ্ধ করে ফেললো। শেষ পর্যন্ত যখন তারা উভয়ে ঐ গাছের স্বাদ আস্বাদন করলো, তাদের গোপন অঙ্গসমূহ তাদের সামনে খুলে গেল।
তারা নিজেদের অঙ্গ জান্নাতের পাতা দিয়ে ঢাকতে লাগলো। তখন তাদের রব তাদের ডেকে বললো, আমি কি তোমাদের ঐ গাছটি থেকে নিষেধ করিনি? আর তোমাদের বলিনি যে, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু?"
মানুষের চির শত্রু শয়তান আদম-হাওয়াকে প্রতারিত করে বিপদে ফেলার জন্য তাদের হিতাকাঙ্ক্ষী হয়ে কসম করে তাদেরকে আল্লাহর কথা অমান্য করাতে সক্ষম হলো। তারা উভয়ে শয়তানের ধোঁকায় পড়ে নিষিদ্ধ গাছের ফল খেলেন। অমনি তাঁদের
বেহেশতী লেবাস খুলে গেলে তাঁরা লজ্জাস্থান ঢাকার জন্য জান্নাতী গাছের পাতা শরীরে ধারণ করলেন।
এখানে উল্লেখ্য যে, সাধারণত একথা প্রসিদ্ধ ও প্রচলিত যে, শয়তান প্রথমে বিবি হাওয়াকে প্রতারিত করতে সক্ষম হয়েছিল। পরে তাকে দিয়ে আদম-কে প্রতারিত করা হয়েছিল। কিন্তু কুরআন থেকে জানা যায় যে, আদম-হাওয়া উভয়কেই একই সময়ে শয়তান প্রতারিত করেছিল। কুরআন বলে,
فَدَلَّهُمَا بِغُرُورِ فَلَمَّا ذَاقَا الشَّجَرَةَ بَدَتْ لَهُمَا سَوْا تُهُمَا
অর্থ: "সে দু'জনকেই প্রতারণার জালে আবদ্ধ করে ফেললো, আর যখন দু'জনেই গাছটির স্বাদ আস্বাদন করলো তখন তাদের উভয়ের সামনে উভয়ের লজ্জাস্থান খুলে গেল।" (সূরা আল আ'রাফ: আয়াত-২২)
শয়তান কর্তৃক আদম-হাওয়ার প্রতারিত হওয়ার ইতিহাসের একথাটি কুরআনে সুস্পষ্টভাবেই বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু শয়তান প্রথমে বিবি হাওয়াকে প্রতারিত করেছে, অতঃপর তারই মাধ্যমে আদম-কে প্রতারিত করা হয়েছে। একথাটি গুরুত্ব সহকারে লক্ষ্য করার বিষয়। কারণ এতে করে নারী জাতির নৈতিক, আইনগত ও সামাজিক মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করার ব্যাপারে সাংঘাতিক কাজ করেছে। আর এতে করে ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত করার চেষ্টা করা হয়েছে যে, মানুষের যাবতীয় বিপর্যয়ের দ্বার উন্মুক্ত হওয়ার পেছনে নারীরা দায়ী। আল-কুরআনের উপরিউক্ত আয়াতে মূলত: এ ধরনের কাল্পনিক কথার প্রতিবাদ করা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে আল্লাহর নাফরমানী করলে নারী-পুরুষ উভয়কেই চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়।"