📄 অপরাধী নারী-পুরুষ উভয়েই সমান শাস্তি পাবে
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالًا مِّنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ .
অর্থ: চোর-পুরুষ বা নারী যেই হোক না কেন, উভয়ের হাত কেটে দাও। এটা তাদের কর্মফল এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। আল্লাহর শক্তি সবার ওপর বিজয়ী এবং তিনি জ্ঞানী ও সর্বজ্ঞ। (সূরা: আল মায়িদা: আয়াত-৩৮)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: উপরিউক্ত আয়াতটি চুরি কর্মের দণ্ডবিধি সম্পর্কিত। এখানে বলা হয়েছে চোর পুরুষ হোক আর নারী হোক তাদের উভয়ের হাত কেটে দাও।
এখানে প্রণিধানযোগ্য যে, কুরআনী বিধি-বিধানে কোনো বিষয়ে হুকুম করা হলে পুরুষদের সম্বোধন করে নির্দেশ দেয়া হয় আর নারীরা পুরুষদের সাথে অন্তর্ভুক্ত থাকে। নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত ও অন্যান্য বিধি-বিধানে কুরআন-সুন্নাহর রীতি তাই। কিন্তু চুরি ও যিনার শাস্তির বেলায় পুরুষ ও নারীকে পৃথকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর কারণ, এই বিধানটি হচ্ছে হুদূদ বা দণ্ডবিধি সম্পর্কিত। আর কোনো প্রকার সন্দেহ দেখা দিলে হুদূদ রহিত হয়ে যায়। এজন্যে এখানে পুরুষদের অধীনস্থ করে নারীদের সম্বোধন করা হয়নি, বরং নারীর কথা পৃথক করে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।
দু'হাত নয়; বরং এক হাত। আর সমগ্র উম্মত এ ব্যাপারেও একমত যে, প্রথমবার চুরি করলে ডান হাত কাটতে হবে। নবী বলেছেন, "খেয়ানতকারীর হাত কাটা হবে না," এ থেকে জানা যায়, খেয়ানত বা আত্মসাৎ ইত্যাদি চুরির পর্যায়ভুক্ত নয়; বরং চুরি বলতে এমন কাজ বুঝায় যার মাধ্যমে মানুষ একজনের ধন সম্পদ তার নিয়ন্ত্রণ ও সংরক্ষণ থেকে বের করে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।
নবী এই সাথে এরূপ নির্দেশও দিয়েছেন যে, একটি ঢালের মূল্যের চেয়ে কম পরিমাণ চুরি করলে হাত কাটা যাবে না। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের বর্ণনা অনুযায়ী নবী-এর যুগে একটি ঢালের মূল্য ছিল দশ দিরহাম, ইবনে উমরের বর্ণনা অনুযায়ী
তার মূল্য ছিল তিন দিরহাম, আনাস ইবনে মালিকের বর্ণনা অনুযায়ী পাঁচ দিরহাম এবং আয়েশার বর্ণনা অনুযায়ী ছিল অর্ধ দিনার। সাহাবীদের এ মতবিরোধের কারণে চুরির সর্বনিম্ন নিসাব অর্থাৎ কমপক্ষে কী পরিমাণ চুরি করলে হাত কাটা হবে এবং ব্যাপারে ফকীহদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। ইমাম আবু হানীফার মতে এর সর্বনিম্ন পরিমাণ দশ দিরহাম। ইমাম মালেক, ইমাম শাফেঈ ও ইমাম আহমদের মতে এক- চতুর্থাংশ দীনার। (সে যুগের দিরহামে থাকতো ৩ মাসা ১ রতি পরিমাণ রূপা এবং এক-চতুর্থাংশ দীনার হতো ৩ দিরহামের সমান।) আবার এমন অনেক জিনিস আছে যেগুলো চুরি করলে হাত কাটার শাস্তি দেয়া যাবে না। যেমন নবী এর নির্দেশ "ফল ও সবজী চুরি করলে হাত কাটা যাবে না।" "খাদ্যবস্তু চুরি করলে হাত কাটা যাবে না"। আয়েশা একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাতে বলা হয়েছে, "তুচ্ছ ও নগণ্য বস্তু চুরির অপরাধে নবী -এর আমলে হাত কাটা হতো না।"
আলী ও উসমানের ফায়সালা ছিল "পাখি চুরি করলে হাত কাটা যাবে না" এবং সাহাবীগণের মধ্য থেকে কেউ এ ব্যাপারে মতবিরোধ প্রকাশ করেননি। তাছাড়া উমর ও আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা বাইতুলমাল থেকে কেউ কোনো বস্তু চুরি করলে তার হাত কাটেননি। এ বাপারেও কোথাও সাহাবায়ে কেরামের কোন মতবিরোধের উল্লেখ নেই।
এসব মৌল উৎসের ভিত্তিতে ফিকাহর বিভিন্ন ইমাম কিছু নির্দিষ্ট বস্তু চুরি করার অপরাধে হাত কাটার দণ্ড না দেবার কথা ঘোষণা করেছেন। ইমাম আবু হানীফার মতে শাক- শবজি, ফল, গোশত রান্না করা খাবার, যে শস্য এখনো স্তূপীকৃত করা হয়নি এবং খেলার সরঞ্জাম ও বাদ্যযন্ত্র চুরি করলে হাত কাটার শাস্তি দেয়া হবে না। এ ছাড়াও তিনি বনে বিচরণকারী পশু ও বাইতুল-মালের জিনিস চুরি করলে তাতে হাত কাটার শাস্তি নেই বলে ঘোষণা করেছেন। অনুরূপভাবে অন্যান্য ইমামগণও কোন কোন জিনিস চুরির ক্ষেত্রে এ শাস্তি কার্যকর নয় বলে ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু এর অর্থ এ নয় যে, এ চুরিগুলোর অপরাধে আদতে কোনো শাস্তিই দেয়া হবে না; বরং এর অর্থ হচ্ছে, এ অপরাধগুলোর কারণে হাত কাটা হবে না।