📄 এক স্ত্রীর প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়া এবং অন্যদের ঝুলন্ত রাখা বৈধ নয়
وَ لَنْ تَسْتَطِيعُوا أَنْ تَعْدِلُوا بَيْنَ النِّسَاءِ وَلَوْ حَرَصْتُمْ فَلَا تَمِيلُوا كُلَّ الْمَيْلِ فَتَذَرُوهَا كَالْمُعَلَّقَةِ وَإِنْ تُصْلِحُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا.
অর্থ: আর তোমরা যতই ইচ্ছা কর না কেন তোমাদের স্ত্রীদের প্রতি সমান ব্যবহার করতে পারবে না; তবে তোমরা কোনো একজনের দিকে সম্পূর্ণভাবে ঝুঁকে পড় না ও অপরকে ঝুলানো অবস্থায় রেখো না। যদি তোমরা নিজেদেরকে সংশোধন কর ও সাবধান হও তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা আন নিসা: আয়াত-১২৯)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: আলোচ্য আয়াতে একাধিক স্ত্রীর সাথে বৈষম্যহীন আচরণ সম্পর্কিত অবস্থা ও পরিস্থিতির কথাই ব্যক্ত করা হয়েছে।
মানুষ সব অবস্থায় একাধিক স্ত্রীদের মধ্যে সব দিক দিয়ে পূর্ণ সাম্য কায়েম করতে পারে না। একটি স্ত্রী সুন্দরী রূপসী এবং অন্যটি কুৎসিত। একজন যুবতী এবং অন্যজন
বিগত যৌবনা। একজন চির রুগ্ন ও অন্যজন সবল স্বাস্থ্যবতী। একজন কর্কশ স্বভাবের ও কটুভাষিণী এবং অন্যজন মধুর প্রকৃতির ও মিষ্টভাষিণী। স্ত্রীদের মধ্যে এ ধরনের আরো বিভিন্ন প্রকৃতিগত পার্থক্য থাকতে পারে। এর ফলে স্বভাবতই এক স্ত্রীর প্রতি আকর্ষণ বেশি ও অন্য স্ত্রীর প্রতি কম হতে পারে। এহেন অবস্থায় আইন এ দাবী করে না যে, ভালোবাসা, আকর্ষণ ও দৈহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে উভয়ের মধ্যে পরিপূর্ণ সমতা কায়েম রাখা অপরিহার্য; বরং আইন কেবল এতটুকু দাবী করে, যখন তুমি আকর্ষণহীনতা সত্ত্বেও একটি মেয়েকে তালাক দিচ্ছো না এবং নিজে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে বা তার কামনা অনুযায়ী তাকে নিজের স্ত্রীর মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত রাখছো, তখন তার সাথে অবশ্যই এতটুকু সম্পর্ক রাখো যার ফলে সে কার্যত স্বামীহীনা হয়ে না পড়ে। এ অবস্থায় এক স্ত্রীর তুলনায় অন্য স্ত্রীর প্রতি বেশি ঝুকে পড়া ও তার প্রতি বেশি অনুরক্ত হওয়া একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু অন্য স্ত্রীর প্রতি যেন এমনভাবে অবহেলা ও অনীহা প্রদর্শিত না হয় যার ফলে মনে হতে থাকে যে, তার কোনো স্বামীই নেই।
📄 মারইয়ামকে মিথ্যা অপবাদ দেয়ার পরিণতি
وَ بِكُفْرِهِمْ وَقَوْلِهِمْ عَلَى مَرْيَمَ بُهْتَانًا عَظِيمًا.
অর্থ: এবং তারা লানতগ্রস্ত হয়েছিল তাদের কুফরীর জন্য ও মারইয়ামের বিরুদ্ধে গুরুতর অপবাদের জন্য। (সূরা আন নিসা: আয়াত-১৫৬)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: আল কুরআনের আলোচ্য আয়াত এর পূর্ববর্তী ও তৎপরবর্তী কয়েকটি আয়াতে ইয়াহুদী জাতির কতগুলো জঘন্যতম গুনাহর বিষয় আলোচনা করা হয়েছে। এসব গুনাহ তাদের উপর আল্লাহর গযব ডেকে এনেছিল আর তাদের আল্লাহর হেদায়াত ও সত্য পথ থেকে বিভ্রান্ত করেছিল ও বহুদূরে নিক্ষেপ করেছিল। উপরিউক্ত আয়াতাংশে ইয়াহুদীদের উপর আল্লাহর গযব আসার দু'টো কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। একটি তাদের নবী কর্তৃক আনীত আল্লাহর সত্যদীনকে অস্বীকার করা, দ্বিতীয়টি হচ্ছে মারইয়ামের উপর জঘন্য তোহমত আরোপ করা।
মারইয়াম ছিলেন বনী ইসরাঈলের অতীব শরীফ, খ্যাতিমান ও প্রসিদ্ধ ধর্মীয় পরিবারের এক অবিবাহিতা কন্যা। আল্লাহর কুদরত প্রকাশে পুরুষের মিলন ছাড়াও যে আল্লাহ সন্তান দিতে পারেন, তারই একমাত্র নযীর হিসেবে ঈসা পিতা ছাড়া বিবি মারইয়ামের গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মের ব্যাপারটি ইয়াহুদী জাতির নিকট প্রকৃতপক্ষে মোটেই সন্দেহের বিষয় ছিলো না। যেদিন তিনি জন্মগ্রহণ করেন সেদিনই আল্লাহ তায়ালা সমস্ত ইয়াহুদী জাতিকে সাক্ষী রেখে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, এতো এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন শিশু, এর জন্যই একটি মুযিজা, এর সাথে নৈতিক অপরাধের কোনো সম্পর্কে নেই। অবিবাহিতা কন্যা মারইয়াম যখন কোলে বাচ্চা নিয়ে আসল, তখন জাতির ছোট-বড় হাজার হাজার লোক এসে সে ঘরে ভিড় জমায়। তারা বাচ্চা সম্পর্কে
মারইয়ামকে জিজ্ঞেস করলে সে এ সম্বন্ধে কোনো কথাই বলেনি। সে চুপচাপ থেকে হাতের ইশারায় বাচ্চাকে জিজ্ঞেস করতে বললো। উপস্থিত জনতা সবিস্ময়ে বললো দোলনায় শাযিত এ শিশুকে আমরা কী জিজ্ঞেস করতে পারি? আল্লাহর কুদরতে সে শিশুই কথা বলে তাদের জবাব দিল। সদ্যজাত শিশুটি স্পষ্ট ও বিশুদ্ধ ভাষায় বলে দিল:
إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ اثْنِيَ الْكِتَابَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا.
অর্থ: "আমি আল্লাহর বান্দা, তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন, আর আমাকে নবী বানিয়েছেন।” (সূরা মারইয়াম: আয়াত-৩০)
এভাবে ঈসা-এর জন্ম সম্পর্কিত সকল প্রকার সন্দেহ-শোবাহর মূলোৎপাটন করে দিলেন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা। তাই ঈসা -এর যৌবন কাল পর্যন্ত কেউ না মারইয়ামের প্রতি ব্যভিচারের দোষ চাপিয়েছে, না ঈসা -কে অবৈধ সন্তান বলে কোনো খোঁচা দিয়েছে। কিন্তু যখন ঈসা ত্রিশ বছর বয়সে উপনীত হওয়ার পর নবুয়াতের দায়িত্ব পালন শুরু করলেন, ইয়াহুদীদের যাবতীয় বদ কাজের জন্য তিরস্কার করতে লাগলেন, তাদের নৈতিক পতনের বিষয়ে সাবধান করতে লাগলেন, আল্লাহর দ্বীন কায়েমের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে, দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে, আর প্রত্যেক ক্ষেত্রে শয়তানী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে যাওয়ার আহ্বান জানালেন, তখন ইয়াহুদীরা এ নির্ভিক ও সততার আওয়ায স্তদ্ধ করে দেয়ার সকল অসদুপায় অবলম্বন করতে লাগলো। বিগত ত্রিশ বছর পর্যন্ত তারা যা বলেনি এখন তাই বলতে শুরু করলো। তারা বলতে লাগলো (নাউযুবিল্লাহ) "মারইয়াম ব্যভিচারিণী ছিলেন, ঈসা অবৈধ সন্তান।" অথচ তারা নিঃসন্দেহে জানতো এ মা ও সন্তান উভয়ই ওসব মলিনতা ও কদর্য থেকে পূত-পবিত্র। তাই তাদের এ দোষারোপ আসলে কোনো সন্দেহের কারণে ছিলো না; বরং তা ছিল একেবারেই মিথ্যা। তারা তো জেনে বুঝে সত্যের বিরোধিতার জন্যই এরূপ বলছিলো, এজন্যে আল্লাহ তায়ালা তাদের এ আচরণকে যুলুম ও মিথ্যা না বলে তাকে 'কুফর' বলে অভিহিত করেছিলেন। কারণ, এতে করে তাদের উদ্দেশ্য ছিল দ্বীনের পথে বাধা সৃষ্টি করা মাত্র।
📄 মীরাসের সম্পত্তিতে পুরুষের অংশ নারীর দ্বিগুণ
يَسْتَفْتُونَكَ قُلِ اللهُ يُفْتِيْكُمْ فِي الْكَلَلَةِ إِنِ امْرُوا هَلَكَ لَيْسَ لَهُ وَلَدٌ وَلَه أُخْتٌ فَلَهَا نِصْفُ مَا تَرَكَ وَهُوَ يَرِثُهَا إِنْ لَّمْ يَكُنْ لَّهَا وَلَدٌ فَإِنْ كَانَتَا اثْنَتَيْنِ فَلَهُمَا الثُّلُثْنِ مِمَّا تَرَكَ وَ إِنْ كَانُوا إِخْوَةً رِجَالًا وَ نِسَاءٌ فَلِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنْثَيَيْنِ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ أَنْ تَضِلُّوا وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ.
লোকেরা তোমার নিকট 'কালাল' সম্পর্কে জানতে চায়। বল, 'পিতা-মাতাহীন নিঃসন্তান ব্যক্তি সম্বন্ধে তোমাদেরকে আল্লাহ ব্যবস্থা জানাচ্ছেন কোনো পুরুষ মারা গেলে সে যদি নিঃসন্তান হয় এবং তার এক বোন থাকে তবে তার জন্য পরিত্যক্ত সম্পদের
অর্ধেক। আর বোন যদি সন্তানহীনা হয় তবে তার ভাই তার উত্তরাধিকারী হবে, আর দুই বোন থাকলে তাদের জন্য তার পরিত্যক্ত সম্পদের দুই-তৃতীয়াংশ, আর যদি ভাই-বোন উভয়ে থাকে তবে এক পুরুষের অংশ দুই নারীর অংশের সমান।' তোমরা পথভ্রষ্ট হবে- এ আশঙ্কায় আল্লাহ তোমাদেরকে পরিষ্কারভাবে জানাচ্ছেন এবং আল্লাহ সর্ববিষয়ে সবিশেষ অবহিত। (সূরা: আন নিসা: আয়াত-১৭৬)
এ সূরাটি নাযিল হওয়ার অনেক পরে এ আয়াতটি নাযিল হয়। কোনো কোনো হাদীসের বর্ণনা থেকে জানা যায়, এটি কুরআনের সর্বশেষ আয়াত। এ বর্ণনাটি সঠিক না হলেও কমপক্ষে এতটুকু প্রমাণিত যে, এ আয়াতটি নবম হিজরীতে নাযিল হয়। এর অনেক পূর্বে সূরা নিসা নাযিল হয় এবং তাকে একটি স্বতন্ত্র সূরা হিসেবে তখন পাঠ করা হচ্ছিল। এ জন্যই মীরাসের বিধান বর্ণনার উদ্দেশ্যে সূরার শুরুতে যে আয়াতগুলো বর্ণা করা হয় তার সাথে এ আয়াতটি বর্ণিত হয়নি; বরং পরিশিষ্ট হিসেবে সূরার শেষে একে রাখা হয়েছে।
এই আয়াতে 'কালালা' শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। 'কালালা' শব্দের অর্থের ব্যাপারে মতবিরোধ রয়েছে। কারো কারো মতে কালালা হচ্ছে এমন এক ব্যক্তি যার সন্তান নেই এবং যার বাপ-দাদাও বেঁচে নেই। আবার অন্যদের মতে যে ব্যক্তি নিছক নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যায় তাকে কালালা বলা হয়। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু শেষ সময় পর্যন্ত এ ব্যাপারে দ্বিধান্বিত ছিলেন। কিন্তু আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহুর মতে প্রথমোক্ত লোকটিকেই কালালা বলা হয়। সাধারণ ফকীহগণ তাঁর এই মত সমর্থন করেছেন। কুরআন থেকেও এই মতেরই সমর্থন পাওয়া যায়। কারণ কুরআন কালালার বোনকে পরিত্যক্ত সম্পত্তির অর্ধেকের মালিক বানানো হয়েছে। অথচ কালালার বাপ বেঁচে থাকলে বোন সম্পত্তির কিছুই পায় না।
এখানে এমন সব ভাইবোনের মীরাসের কথা বলা হচ্ছে যারা মৃতের সাথে মা ও বাপ উভয় দিক দিয়ে অথবা শুধুমাত্র বাপের দিক দিয়ে শীরক। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু একবার তাঁর এক ভাষণে এই অর্থের ব্যাখ্যা করেছিলেন। কোনো সাহাবা তাঁর এই ব্যাখ্যার সাথে মতবিরোধ করেননি। ফলে এটি একটি সর্বসম্মত মতে পরিণত হয়েছে। ভাই তার সমস্ত সম্পদের ওয়ারিশ হবে, যদি কোনো নির্দিষ্ট অংশের অন্য কোনো অধিকারী না থেকে থাকে। আর যদি নির্দিষ্ট অংশের অন্য কোনো অধিকারী থাকে- যেমন স্বামী তাহলে প্রথমে তার অংশ আদায় করার পর অবশিষ্ট পরিত্যক্ত সম্পত্তি ভাই পাবে। দু'য়ের বেশি বোন হলে তাদের সম্পর্কেও এই একই বিধান কার্যকর হবে।