📄 অন্যের স্ত্রীকে বিবাহ করা হারাম
وَالْمُحْصَنَتُ مِنَ النِّسَاءِ إِلَّا مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ كِتُبَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ .
অর্থ: এবং তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসী ছাড়া অন্যের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ নারীদেরকেও বিয়ে করা হারাম। এটা হল তোমাদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ। (সূরা: আন নিসা: আয়াত-২৪)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: যে চৌদ্দ প্রকার স্ত্রীলোককে বিবাহ করা হারাম করা হয়েছে পূর্বে তার তের প্রকারের বিবরণ দেয়া হয়েছে। এখানে চৌদ্দতম প্রকারের মহিলার উল্লেখ করা হয়েছে; আর তারা হচ্ছে অন্যের বিবাহে আবদ্ধ স্ত্রীলোক। প্রকাশ থাকে যে, পূর্ববর্তী আয়াতে ও এ আয়াতের প্রথমাংশে যে চৌদ্দ প্রকারের স্ত্রী লোককে বিবাহ করা হারাম ঘোষণা করা হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছে-
ক. বংশের কারণে হারাম
খ. দুধ পানের কারণে হারাম
গ. বৈবাহবাহিক সম্পর্কের কারণে হারাম।
এ তিন কারণে হারাম ঘোষিত মহিলারা চিরদিনের জন্যে হারাম।
আয়াতে "অধিকারভুক্ত দাসীগণকে" হালাল ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়টি সম্পর্কে অধুনা এক শ্রেণির মুসলিম চিন্তাবিদদের মধ্যেও বিভ্রান্তি বিরাজ করছে।
যেসব মেয়ে যুদ্ধ বন্দিনী হয়ে এসেছে এবং তাদের স্বামীরা দারুল হার্বে (ইসলাম বিরোধী ও ইসলামের শত্রুদের শাসিত দেশ) রয়ে গেছে তারা হারাম নয়। কারণ দারুল হার্ব থেকে দারুল ইসলামে আসার পর তাদের বিয়ে ভেঙে গেছে। এই ধরনের মেয়েদের বিয়েও করা যায় আবার যাদের মালিকানায় তারা আছে তারা তাদের সাথে সংগমও করতে পারে। তবে স্বামী-স্ত্রী যদি একই সাথে বন্দী হয়ে আসে, তাহলে এ ক্ষেত্রে কোন্ ধরনের বিধান গৃহীত হবে, এ ব্যাপারে ফকীহগণের মধ্যে মতবিরোধ আছে। ইমাম্ আবু হানীফা ও তাঁর সাথীগণের মতে, তাদের বিয়ে অপরিবর্তিত থাকবে। অন্যদিকে ইমাম মালেক ও ইমাম শাফেঈর মতে তাদের বিয়ে অটুট থাকবে না।
যুদ্ধ বন্দিনী দাসীদের সাথে সংগম করার ব্যাপারে বহু রকমের বিভ্রান্তি লোকদের মধ্যে পাওয়া যায়। তাই এ প্রসঙ্গে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো ভালো করে বুঝে নেয়া দরকার।
১. যে সমস্ত মেয়ে যুদ্ধে বন্দী হয়, তাদেরকে বন্দী করার সাথে সাথেই যে কোনো সৈনিক তাদের সাথে সংগম করার অধিকার লাভ করে না; বরং ইসলামী আইন অনুযায়ী এই ধরনের মেয়েদেরকে সরকারের হাতে সোপর্দ করে দেয়া হবে। সরকার চাইলে তাদেরকে বিনা শর্তে মুক্ত করে দিতে পারে, তাদের থেকে মুক্তিপণ গ্রহণ করতে পারে, শত্রুর হাতে যেসব মুসলমান বন্দী হয়েছে তাদের সাথে এদের বিনিময়ও করতে পারে এবং চাইলে তাদেরকে সৈন্যদের মধ্যে বণ্টন করে দিতেও পারে। এ ব্যাপারে সরকারের পূর্ণ ইখতিয়ার রয়েছে। একজন সৈনিক কেবলমাত্র সরকারের পক্ষ থেকে তাকে যে যুদ্ধ বন্দিনীটি দেয়া হয় তার সাথেই সংগম করতে পারে।
২. যে মেয়েটিকে এভাবে কারো মালিকানায় দেয়া হয়, যতক্ষণ না তার একবার মাসিক ঋতুস্রাব হয় এবং এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হওয়া যায় যে, সে গর্ভবতী নয় ততক্ষণ তার সাথে সংগম করা যেতে পারে না। এর আগে তার সাথে সংগম করা হারাম। আর যদি সে গর্ভবতী হয়, তাহলে সন্তান ভূমিষ্ঠ হবার আগেও তার সাথে সংগম করা অবৈধ।
৩. যুদ্ধ বন্দিনীদের সাথে সংগম করার ব্যাপারে তাদের অবশ্যই আহলি কিতাব হতে হবে এমন কোনো শর্ত নেই। তাদের ধর্ম যাই হোক না কেন, যাদের মধ্যে তাদেরকে ভাগ করে দেয়া হবে তারা তাদের সাথে সংগম করতে পারবে।
৪. যে মেয়েকে যার ভাগে দেয়া হবে একমাত্র সেই তার সাথে সংগম করতে পারবে। অন্য কারো গায়ে হাত তার দেবার অধিকার নেই। সেই মেয়ের গর্ভে যে সন্তান জন্মাবে সে তার মালিকের বৈধ সন্তান হিসেবে গণ্য হবে। শরীয়াতে আপন ঔরসজাত সন্তানের যে অধিকার নির্ধারিত হয়েছে এই সন্তানের আইনগত অধিকারও তাই হবে। সন্তানের জননী হয়ে যাবার পর এই মেয়েকে আর বিক্রি করা যাবে না এবং মালিক মরে যাওয়ার সাথে সাথেই সে মুক্ত হয়ে যাবে।
৫. যে মেয়েটি এভাবে কোনো ব্যক্তির মালিকানাধীন হয়, তাকে তার মালিক যদি দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তির সাথে বিয়ে দিয়ে দেয় তাহলে মালিক তার থেকে অন্য সমস্ত খেদমত নিতে পারবে কিন্তু তার সাথে যৌন সম্পর্ক রাখার অধিকার তার থাকবে না।
৬. শরীয়াত স্ত্রীদের সংখ্যার ব্যাপারে যেমন চারজনের সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে, দাসীদের ব্যাপারে তেমন কোনো সংখ্যা নির্ধারণ করে দেয়নি। ধনী লোকেরা বেশুমার বাদী কিনে কিনে মহল ভরে ফেলবে এবং বিলাসিতার সাগরে গা ভাসিয়ে দেবে, এটা শরীয়াতের উদ্দেশ্য ছিল না; বরং আসলে যুদ্ধের অনিশ্চিত অবস্থাই ছিল এ ব্যাপারে সীমা নির্ধারণ না করার মূল কারন।
৭. সরকার আইনগতভাবে কোনো ব্যক্তিকে যুদ্ধবন্দীদের ওপর যে মালিকানা অধিকার দান করেছে মালিকানার অন্যান্য অধিকারের ন্যায় এটিও স্থানান্তর যোগ্য।
৮. বিয়ে এমন একটি আইনসংগত কাজ তেমনি সরকারের পক্ষ থেকে কাউকে যথারীতি মালিকানা অধিকার দান করাও একটি আইনসংগত কাজ। কাজেই যে ব্যক্তি বিয়ের মধ্যে কোন প্রকার অন্যায় ও অপ্রীতির ব্যাপার দেখে না, তার ক্রীতদাসীর সাথে সংগম করার মধ্যে খামাখা কোনো অন্যায় ও অপ্রীতিকর বিষয় অনুভব করার পেছনে কোনো ন্যায়সংগত কারণ নেই।
৯. যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে থেকে কোনো মেয়েকে কারো মালিকানায় দিয়ে দেবার পর পুনর্বার সরকার তাকে ফেরতে নেবার অধিকার রাখে না, ঠিক যেমন কোনো মেয়ের অভিভাবক তাকে কারো সাথে বিয়ে দেবার পর আবার তাকে ফিরিয়ে নেবার অধিকার হারিয়ে ফেলে।
১০. কোন সেনাপতি যদি নিছক সাময়িকভাবে তার সৈন্যদেরকে বন্দিনী মেয়েদের মাধ্যমে নিজেদের যৌন তৃষ্ণা মিটাবার অনুমতি দেয় এবং তাদেরকে সৈন্যদের মধ্যে ভাগ করে দেয়, তাহলে ইসলামী আইনের দৃষ্টিতে এটা হবে সম্পূর্ণ একটি অবৈধ কাজ। যিনার সাথে এর কোনো পার্থক্য নেই। আর যিনা ইসলামী আইন অনুযায়ী একটি অপরাধ।
📄 বিবাহে মোহরানা ধার্য অপরিহার্য
وَ أُحِلَّ لَكُمْ مَّا وَرَاءَ ذَلِكُمْ أَنْ تَبْتَغُوا بِأَمْوَالِكُمْ مُّحْصِنِينَ غَيْرَ مُسْفِحِينَ * فَمَا اسْتَمْتَعْتُمْ بِهِ مِنْهُنَّ فَأْتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ فَرِيضَةً وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيْمَا تَرْضَيْتُمْ بِهِ مِنْ بَعْدِ الْفَرِيضَةِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا.
অর্থ: এদের ছাড়া অন্যান্য নারীদেরকে বিয়ে করা তোমাদের জন্য হালাল, এ শর্তে যে, অর্থের বিনিময়ে বিয়ে করার জন্য তোমরা তাদের কামনা করবে, ব্যভিচারের জন্য নয়। বিয়ের মাধ্যমে যে নারীদের তোমরা উপভোগ করেছ তাদের ধার্যকৃত মোহর তাদেরকে দিয়ে দিবে। আর তোমাদের কোনো গুনাহ হবে না যদি মোহর ধার্য করার পর কোনো বিষয়ে উভয়ে একমত হও। নিশ্চয় আল্লাহ হলেন সর্বজ্ঞ, হিকমাতওয়ালা। (সূরা: আন নিসা: আয়াত-২৪)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: পূর্বোক্ত আয়াতে বর্ণিত নির্দিষ্ট মহিলাদের ছাড়া বাকি মহিলাদের মধ্য হতে মোহরানার বিনিময়ে বিয়ে করার হুকুম এ আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে ঐসব নারীগণ ছাড়া বাকিসব নারী তোমাদের জন্যে হালাল করা হয়েছে। যেমন চাচার কন্যা, খালার মেয়ে, মামাত বোন, মামা ও চাচার স্ত্রী তাদের মৃত্যুর পর- যদি তারা অন্য কোনো সম্পর্ক দ্বারা হারাম না হয়। আর পালক পুত্রের স্ত্রী- যদি সে তাকে তালাক দিয়ে দেয়, কিংবা সে মারা যায়, স্ত্রী মারা গেলে তার বোন ইত্যাদি অসংখ্য প্রকারের মহিলাই ذَلِكُمْ مَّاوَرَاءَ -এর অন্তর্ভুক্ত।
তবে কুরআনের অন্য আয়াতে চারজনের অধিক সংখ্যক নারীকে বিবাহ করতে নিষেধ করা হয়েছে। অর্থাৎ সর্বোচ্চ চারজনকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ রাখা যেতে পারে। আয়াত থেকে বুঝা গেল মোহরানা ছাড়া বিবাহ হতে পারে না। এমনকি স্বামী-স্ত্রী উভয় যদি মোহরানা ছাড়া বিবাহে সম্মত হয়, তবুও মোহরানা আবশ্যই আদায় করতে হবে।
তবে বিবাহের আকদ হওয়ার সময় যদি মোহরানার পরিমাণ উল্লেখ্য না করা হয়ে থাকে তবুও বিবাহ কার্যকর হয়ে যাবে। আর সে অবস্থায় মোহরে মেছেল' ওয়াজিব হবে। কোনো অবস্থাতেই বিবাহ মোহরানা ছাড়া জায়েয হবে না। অবশ্য মোহরানা আদায়ের ব্যাপারে স্ত্রীর পূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে। সে ইচ্ছা করলে কোনো প্রকার চাপ ছাড়া স্বেচ্ছায় মোহরানা আংশিক বা সম্পূর্ণ মাফ করে দিতে পারে। 'মোহরে মেছেল' বলতে মেয়ের অন্যান্য বোন, ফুফু, চাচাত, জেঠাতো বোনদের মোহরের সমপরিমাণ মোহরানা বুঝায়।
এ আয়াতে ( أَنْ تَبْتَغُوا بِأَمْوَالِكُمْ ) (তোমাদের সম্পদের বিনিময়ে তলব করবে) বলে বুঝানো হয়েছে যে, বিবাহের উদ্দেশ্য মহিলাদের সন্ধান কর তোমাদের সম্পদ তাদের মোহরানা হিসেবে দিয়ে (বায়যাবী)। অর্থাৎ মোহরানা প্রদান করে বিবাহ কর। ফকীহগণ এ আয়াত থেকে প্রমাণ পেশ করেছেন যে, 'মোহরানা' বিবাহের একটি অত্যাবশ্যকীয় অংশ বা উপাদান, তার পরিমাণ নির্দিষ্ট হোক বা না-ই হোক।
এ আয়াত থেকে প্রমাণ হয় 'মোহরানা' ছাড়া বিবাহ অনুষ্ঠিত হতে পারে না। তা অপরিহার্য, চাই তার পরিমাণ নির্দিষ্ট হোক বা না-ই হোক। (মাদারিক)
মোহরানার উপর্যুপরি তাকীদ থেকে প্রতিভাত হয় যে, নারীদের অধিকার সংরক্ষণে যত্নবান হওয়া ইসলামী আইনে কতটা বাঞ্ছনীয়। মূল আর্থিক ব্যয় বিবাহ এবং যিনা উভয় ক্ষেত্রেই অভিন্ন। পার্থক্য এই যে, বিবাহের দ্বারা জীবনটা মানুষের মত সুশৃংখল ও অনুগত হয়ে যায়। পক্ষান্তরে যিনার দ্বারা মানুষ পশুর মতো হীন পর্যায়ে উপনীত হয়।
আয়াতে বিবাহের জুড়ি তালাসের জন্য পুরুষকে সম্বোধন করে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যেন বিবাহের প্রস্তাবটা হবে পুরুষের কাজ আর গ্রহণ বা অনুমোদন করা হবে নারীর কাজ।-(তাফসীরে মাজেদী)
📄 স্বাধীন মুসলিম নারীকে বিয়ে করবে
وَ مَنْ لَّمْ يَسْتَطِعْ مِنْكُمْ طَوْلًا أَنْ يَنْكِحَ الْمُحْصَنَتِ الْمُؤْمِنَتِ فَمِنْ مَّا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ مِّنْ فَتَيْتِكُمُ الْمُؤْمِنَتِ وَاللهُ أَعْلَمُ بِأَيْمَانِكُمْ بَعْضُكُمْ مِّنْ بَعْضٍ فَانْكِحُوهُنَّ بِإِذْنِ أَهْلِهِنَّ وَاتُوهُنَّ اُجُورَهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ مُحْصَنَتٍ غَيْرَ مُسْفِحَةٍ وَ لَا مُتَّخِذُتِ أَخْدَانٍ فَإِذَا أُحْصِنَّ فَإِنْ آتَيْنَ بِفَاحِشَةٍ فَعَلَيْهِنَّ نِصْفُ مَا عَلَى الْمُحْصَنَتِ مِنَ الْعَذَابِ ذَلِكَ لِمَنْ خَشِيَ الْعَنَتَ مِنْكُمْ وَأَنْ تَصْبِرُوا خَيْرٌ لَّكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ.
অর্থ: আর তোমাদের মধ্যে যদি কেউ স্বাধীন মুসলমান নারী বিয়ে করার ক্ষমতা না রাখে, তবে সে তোমাদের স্বত্বাধীন ঈমানদার দাসী বিয়ে করবে। আল্লাহ তোমাদের ঈমান সম্পর্কে ভাল জানেন। তোমরা পরস্পর সমান। সুতরাং তোমরা তাদের বিয়ে করবে তাদের মালিকের অনুমতিক্রমে এবং নিয়ম অনুযায়ী তাদের মোহর দিয়ে দিবে এ হিসেবে যে, তারা বিবাহিতা স্ত্রী; এ হিসেবে নয় যে, তারা ব্যভিচারিণী ও উপপতি গ্রহণকারিণী। যদি বিবাহিতা হওয়ার পর তারা ব্যভিচার করে তবে তাদের শাস্তি হবে স্বাধীন নারীদের অর্ধেক। এ ব্যবস্থা (দাসীকে বিয়ে করা) তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তির জন্য যে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার ভয় করে। তবে ধৈর্য ধারণ করা তোমাদের জন্য উত্তম। আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সুরা আন নিসা: আয়াত-২৫)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: একজন মুসলিম বিয়ে করবে একজন স্বাধীন সম্ভ্রান্ত মুসলিম মহিলাকে। কিন্তু কেউ যদি সম্ভ্রান্ত বংশের মুসলিম পাত্রী (মুহসানাত)-কে বিয়ে করার পুরো সামর্থ না রাখে, তবে সে নিজেদের মধ্যকার শরীয়তসম্মত মালিকানাধীন দাসীদের বিয়ে করবে। কেননা অধিকাংশ দাসীর মোহরানা ও খরচাদি কম হয়ে থাকে এবং তাদের গরীবের ঘরে বিয়ে দিতে সংকোচ করা হয় না। আর দাসীকে বিয়ে করতে কোনো পুরুষের সংকোচ করাও উচিত নয়। কেননা ধার্মিকতা ও ঈমানদারীর দিক থেকে একজন দাসী একজন স্বাধীন নারীর চেয়েও উত্তম হতে পারে। ব্যক্তির শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তিই হলো ঈমান ও তাকওয়া। তোমাদের মধ্যে ঈমানের দিক থেকে কে শ্রেষ্ঠ আর কে নিকৃষ্ট, তা কেবল আল্লাহই ভাল জানেন। কারণ এটা তো অন্তরের সাথেই সম্পৃক্ত, আর অন্তরের পূর্ণ খবর তো আল্লাহর ভাল জানা আছে। পার্থিব দিক থেকে সংকোচের বড় কারণ হচ্ছে বংশগত পার্থক্য থাকা অথচ বংশের মূল উৎস হলেন আদম ও হাওয়া । উৎসের অভিন্নতার কারণে তোমরা সবাই পরস্পর সমান, সবাই একই বংশোদ্ভুত। সুতরাং সংকোচের কোনো কারণ থাকা মোটেই সমীচীন নয়।
অবশ্য আয়াতে ভাষ্যে বলা হয়েছে স্বাধীন নারীকে বিয়ে করার অর্থ সামর্থ না থাকলে ঈমানদার দাসীদের বিয়ে করা যায়। সুতরাং যথাসম্ভব স্বাধীন নারীকেই বিয়ে করার
চেষ্টা করতে হবে। আর যদি দাসীদেরই বিয়ে করতে হয়, তবে ঈমানদার দাসী খোঁজ করতে হবে। ইমাম আবু হানিফা (র)-এর মত এটাই। তাঁর মতে স্বাধীন সম্ভ্রান্ত মুসলিম নারীকে বিয়ে করার সামর্থ থাকা সত্ত্বেও দাসী কিংবা ইয়াহুদী খ্রিস্টান দাসীকে বিয়ে করা মাকরূহ। ইমাম শাফেঈ (র) ও অন্যান্য ইমামের মতে স্বাধীন নারীকে বিয়ে করার শক্তি সামর্থ থাকা সত্ত্বেও দাসীকে অথবা ইয়াহুদী খ্রিস্টান দাসীকে বিয়ে করা সর্বাবস্থায় অবৈধ। চিন্তাশীল উলামায়ে কিরামের মতে স্বাধীন ইয়াহুদী-খ্রিস্টান নারীকে বিয়ে করা বৈধ হলেও তা থেকে বেঁচে থাকা উত্তম। বর্তমান যুগে এর গুরুত্ব অত্যাধিক। (মাআরেফুল কুরআন)
আয়াতে বলা হয়েছে, "স্বাধীন মহিলাকে বিয়ে করার সামর্থ না থাকলে দাসী ঈমানদার মহিলাকে বিয়ে করবে।" সুতরাং মুতাআ বৈধ নয়। কারণ, স্বাধীন নারীকে বিয়ে করার সামর্থ না থাকা অবস্থায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্য মুতাআ ছিল সহজতম পথ। এতে যৌন বাসনারও পরিতৃপ্তি হতো এবং আর্থিক বোঝাও বিয়ের তুলনায় অনেক কম হতো। অথচ আল্লাহ তায়ালা স্বাধীন নারীকে বিবাহ করতে অসমর্থ হলেও মুতাআর অনুমতি দেননি। কাজেই মুতাআ সর্বাবস্থায় হারাম।
📄 নারী-পুরুষ উভয়ই তাদের অর্জিত অংশ পাবে
وَ لَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ لِلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبُوا وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبْنَ وَاسْتَلُوا اللَّهَ مِنْ فَضْلِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا.
অর্থ: যা দ্বারা আল্লাহ তোমাদের কাউকে কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন তোমরা তার লালসা কর না। পুরুষ যা অর্জন করে তা তার প্রাপ্য অংশ এবং নারী যা অর্জন করে তা তার প্রাপ্য অংশ। আল্লাহর নিকট তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ। (সূরা আন নিসা: আয়াত-৩২)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: আলোচ্য আয়াতে বিরাট গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক বিধান দেয়া হয়েছে। এটি সংরক্ষিত এবং যথাযথভাবে কার্যকরী করা হলে সমাজ জীবনে মানুষ বিপুল শান্তি ও নিরাপত্তা লাভে সক্ষম হবে। আল্লাহ সমস্ত মানুষকে সমান করে তৈরি করেননি; বরং তাদের মধ্যে অসংখ্য দিক দিয়ে পার্থক্য সৃষ্টি করে রেখেছেন। কেউ সুশ্রী, কেউ কুশ্রী। কেউ সুকণ্ঠ, কেউ কর্কশ ভাষী। কেউ শক্তিশালী, কেউ দুর্বল। কেউ পূর্ণাঙ্গ সুগঠিত অংগ-প্রত্যংগের অধিকারী, আবার কেউ জন্মগতভাবে পঙ্গু। কাউকে শারীরিক ও মানসিক শক্তির মধ্যে কোনো একটির শক্তি বেশি দেয়া হয়েছে আবার কাউকে দেয়া হয়েছে অন্য কোনো শক্তি। কাউকে অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থায় পয়দা করা হয়েছে আর কাউকে খারাপ অবস্থায়। কাউকে বেশি উপায় উপকরণ দেয়া হয়েছে, কাউকে দেয়া হয়েছে কম। এ তারতম্য ও পার্থক্যের ভিত্তিতেই মানুষের সমাজ-সংস্কৃতি
বৈচিত্রমণ্ডিত হয়েছে। আর এটিই বুদ্ধি ও যুক্তিসম্মত। কিন্তু যেখানেই এই পার্থক্যের স্বাভাবিক সীমানা ছাড়িয়ে মানুষ তার ওপর নিজের কৃত্রিম পার্থক্যের বোঝা চাপিয়ে দেয় সেখানেই এক ধরনের বিপর্যয় দেখা দেয়। আর যেখানে আদতে এই পার্থক্যকেই বিলুপ্ত করে দেবার জন্য প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করার প্রচেষ্টা চালানো হয় সেখানে আর এক ধরনের বিপর্যয় দেখা দেয়। মানুষের মধ্যে একটি বিশেষ মানসিকতা দেখা যায়।
নিজের চাইতে কাউকে অগ্রসর দেখতে পেলে সে অস্থির হয়ে পড়ে। মানুষের এই মানসিকতা তাই সমাজ জীবনে হিংসা, বিদ্বেষ, রেষারেষি, শত্রুতা, দ্বন্দ্ব, সংঘাত ইত্যাদি সৃষ্টির মূল। এরই ফলে যে অনুগ্রহ সে বৈধ পথে অর্জন করতে পারে না তাকে অবৈধ পথে লাভ করার জন্য উঠে পড়ে লাগে। এই মানসিকতা থেকে দূরে থাকার জন্য আল্লাহর এই আয়াতে নির্দেশ দিচ্ছেন, তাঁর বক্তব্যের উদ্দেশ্য হচ্ছে অন্যদের প্রতি তিনি যে অনুগ্রহ করেছেন তুমি তার আকাঙ্ক্ষা করো না। তবে আল্লাহর কাছে অনুগ্রহের জন্য দোয়া করো। তিনি নিজের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অনুযায়ী তোমার জন্য যে অনুগ্রহটি উপযোগী মনে করবেন সেটিই তোমাকে দান করবেন। আর তিনি যে বলেছেন, "যা কিছু পুরুষরা উপার্জন করেছে তাদের অংশ হবে সেই অনুযায়ী আর যা কিছু মেয়েরা উপার্জন করেছে তাদের অংশ হবে সেই অনুযায়ী" এর অর্থ যতদূর আমি বুঝতে পেরেছি তা হচ্ছে এই যে, পুরুষদের ও মেয়েদের মধ্য থেকে যাকে আল্লাহ যাই কিছু দিয়েছেন তাকে ব্যবহার করে যে যেমন কিছু নেকী বা গোনাহ অর্জন করবে সেই অনুযায়ী অথবা অন্য কথায় সেই জাতীয় জিনিসের মধ্য থেকেই আল্লাহর কাছে সে অংশ পাবে।