📄 নারীদের সম্পদে হস্তক্ষেপ বৈধ নয়
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَحِلُّ لَكُمْ أَنْ تَرِثُوا النِّسَاءَ كَرْهًا وَلَا تَعْضُلُوهُنَّ لِتَذْهَبُوا بِبَعْضِ مَا أَتَيْتُمُوهُنَّ إِلَّا أَنْ يَأْتِينَ بِفَاحِشَةٍ مُبَيِّنَةٍ وَ عَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ فَإِنْ كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهُ فِيْهِ خَيْرًا كَثِيرًا .
অর্থ: হে ঈমানদারগণ! জোরপূর্বক নারীদের উত্তরাধিকারী হওয়া তোমাদের জন্য হালাল নয়। আর তোমরা তাদেরকে যা দিয়েছ তা গ্রহণ করার উদ্দেশ্যে বন্দি করে রেখ না, কিন্তু তারা যদি প্রকাশ্যে ব্যাভিচারে লিপ্ত হয় (তাহলে ভিন্ন কথা)। আর তোমরা তাদের সাথে সদ্বাচরণ কর। কেননা হতে পারে তোমরা তাদেরকে অপছন্দ করছ অথচ আল্লাহ তাতে অনেক কল্যাণ নিহিত রেখেছেন। (সূরা আন নিসা: আয়াত-১৯)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: জাহেলী যুগে নারীদের উপর স্বামীদের পক্ষ থেকে যেমন উৎপীড়ন নির্যাতন চলতো, তেমনি চলতো ওয়ারিসদের পক্ষ থেকেও। ইসলাম উভয় ধরনের উৎপীড়নকে হারাম ঘোষণা করেছে। আল কুরআন বৈবাহিক উৎপীড়ন ওয়ারিশী উৎপীড়ন- দু'টোকেই হারাম করে দিয়েছে আর নারীদের সাথে সদ্ভাবে জীবন যাপনের নির্দেশ দিয়েছে।
স্বামীর মৃত্যুর পর তার পরিবারের লোকেরা তার বিধবাকে মীরাসী সম্পত্তি মনে করে তার অভিভাবক ও ওয়ারিস হয়ে না বসে। স্বামী মরে গেলে স্ত্রী ইদ্দত পালন করার পর স্বাধীনভাবে যেখানে ইচ্ছা যেতে এবং যাকে ইচ্ছা বিয়ে করতে পারে।
📄 স্ত্রীদেরকে দেয়া কোনো কিছু ফেরত নেয়া বৈধ নয়
স্ত্রী যদি সুন্দরী না হয় অথবা তার মধ্যে এমন কোনো ত্রুটি থাকে যে জন্য স্বামী তাকে অপছন্দ করে তাহলে এ ক্ষেত্রে স্বামীর তৎক্ষণাৎ হতাশ হয়ে তাকে পরিত্যাগ করতে উদ্যত হওয়া উচিত নয়। যতদূর সম্ভব তাকে অবশ্যই ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা অবলম্বন করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, স্ত্রী সুন্দরী হয় না ঠিকই কিন্তু তার মধ্যে অন্যান্য এমন কিছু গুণাবলি থাকে, যা দাম্পত্য জীবনে সুন্দর মুখের চাইতে অনেক বেশি গুরুত্ব লাভ করে। যদি সে তার এই গুণাবলি প্রকাশের সুযোগ পায়, তাহলে তার স্বামী রত্নটি যিনি প্রথম দিকে শুধুমাত্র স্ত্রীর অসুন্দর মুখশ্রী দেখে হতাশ হয়ে পড়ছিলেন, এখন দেখা যাবে তার চরিত্র মাধুর্যে তার প্রেমে আত্মহারা হয়ে পড়ছেন। এমনিভাবে অনেক সময় দাম্পত্য জীবনের শুরুতে স্ত্রীর কোনো কোনো কথা ও আচরণ স্বামীর কাছে বিরক্তিকর মনে হয় এবং এ জন্য স্ত্রীর ব্যাপারে তার মন ভেঙে পড়ে। কিন্তু সে ধৈর্য ধারণ করলে এবং স্ত্রীকে তার সম্ভাব্য সকল যোগ্যতার বাস্তবায়নের সুযোগ দিলে সে নিজেই অনুধাবন করতে পারে যে, তার স্ত্রীর মধ্যে দোষের তুলনায় গুণ অনেক বেশি। কাজেই দাম্পত্য সম্পর্ক ছিন্ন করার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করা মোটেই পছন্দনীয় নয়। তালাক হচ্ছে সর্বশেষ উপায়। একান্ত অপরিহার্য ও অনিবার্য অবস্থায়ই এর ব্যবহার হওয়া উচিত। নবী বলেন, "তালাক জায়েয হলেও দুনিয়ার সমস্ত জায়েয কাজের মধ্যে এটি আল্লাহর কাছে সবচাইতে অপছন্দনীয়।"
অন্য একটি হাদীসে নবী বলেন, "বিয়ে করো এবং তালাক দিয়ো না। কারণ আল্লাহ এমন সব पुरुष ও নারীকে পছন্দ করেন না যারা ভ্রমরের মতো ফুলে ফুলে মধু আহরণ করে বেড়ায়।"
وَإِنْ أَرَدْتُمُ اسْتِبْدَالَ زَوْجٍ مَكَانَ زَوْجٍ وَآتَيْتُمْ إِحْدُهُنَّ قِنْطَارًا فَلَا تَأْخُذُوا مِنْهُ شَيْئًا أَتَأْخُذُونَهُ بُهْتَانًا وَاثْمًا مُبِينًا، وَكَيْفَ تَأْخُذُونَهُ وَ قَدْ أَفْضَى بَعْضُكُمْ إِلَى بَعْضٍ وَأَخَذْنَ مِنْكُمْ مِّيْثَاقًا غَلِيظًا.
অর্থ: আর যদি তোমরা এক স্ত্রীর পরিবর্তে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করতে চাও আর তাদের কাউকে অঢেল সম্পদ দিয়ে থাক, তবে তা থেকে কিছুই গ্রহণ করবে না। তোমরা কি তা গ্রহণ করতে চাও অপবাদ ও প্রকাশ্যে পাপাচারের মাধ্যমে।
আর কীভাবে তোমরা তা গ্রহণ করবে অথচ তোমরা একে অপরের সাথে মিলিত হয়েছ এবং স্ত্রীদের নিকট থেকে তোমরা দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়েছ। (সূরা আন নিসা: আয়াত: ২০-২১)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: আলোচ্য আয়াতে স্ত্রীর পক্ষ থেকে প্রকৃতপক্ষে কোনো দোষ ছাড়াই যদি স্বামী নিছক নিজের বাসনা চরিতার্থ করার মানসে বর্তমান স্ত্রীকে পরিত্যাগ করে দ্বিতীয় বিয়ে করতে চায়, এমতাবস্থায় যদি সে অগাধ অর্থ-সম্পদও তাকে দিয়ে
থাকে, তবে তালাকের বিনিময়ে তার কোনো অংশ ফেরত নেয়া কিংবা আদায় যোগ্য দেনা মাফ করানো স্বামীর জন্যে হারাম। কারণ এ ক্ষেত্রে স্ত্রীর তো কোনো দোষ নেই তাছাড়া মোহরানা ওয়াজিব হওয়ার কারণও পূর্ণতা লাভ করেছে। অর্থাৎ বিয়েও হয়েছে উভয়ের মিলনও হয়েছে।
পাকাপোক্ত অংগীকার অর্থ বিয়ে। কারণ এটি আসলে বিশ্বস্ততার একটি মজবুত ও শক্তিশালী অংগীকার ও চুক্তি এবং এরই স্থিতিশীলতা ও মজবুতীর ওপর ভরসা করেই একটি মেয়ে নিজেকে একটি পুরুষের হাতে সোপর্দ করে দেয়। এখন পুরুষটি যদি নিজের ইচ্ছায় এ অংগীকার ও চুক্তি ভংগ করে তাহলে চুক্তি করার সময় সে যে বিনিময় পেশ করেছিল তা ফিরিয়ে নেবার অধিকার তার থাকে না।
📄 পূর্ব পুরুষ ও অধঃস্তন পুরুষদের স্ত্রীকে বিবাহ করা বৈধ নয়
وَلَا تَنْكِحُوا مَا نَكَحَ آبَاؤُكُمْ مِّنَ النِّسَاءِ إِلَّا مَا قَدْ سَلَفَ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَ مَقْتًا وَسَاءَ سَبِيلًا.
অর্থ: তোমাদের বাপ-দাদা যেসব নারীদেরকে বিয়ে করেছে তোমরা তাদেরকে বিয়ে কর না; তবে আগে যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই এটা অশ্লীলতা ও গুনাহের কাজ এবং নিকৃষ্ট পন্থা। (সূরা আন নিসা: আয়াত: ২০-২১)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: জাহেলী যুগে পিতার মৃত্যুর পর তার স্ত্রীকে পুত্ররা নির্দ্বিধায় বিয়ে করে নিত। আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা এ নির্লজ্জ কাজটি নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। আর আল্লাহ একে আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ বলে অভিহিত করেছেন। এতো এক কুরুচী ও কুস্বভাবের কাজ। দীর্ঘদিন যাকে মা বলে সম্বোধন করা হয়ে আসছে। পিতার মৃত্যুর পর তাকে স্ত্রী করে রাখা মানব চরিত্রের জঘন্যতম অপমৃত্যু ছাড়া আর কী হতে পারে?
মুফতী মুহাম্মদ শফী (র) তাফসীরে মাআরেফুল কুরআনে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, তোমরা ঐ নারীকে বিয়ে করো না যাদেরকে তোমাদের পিতা, দাদা, নানা বিয়ে করেছেন। তবে অতীতে এমন কিছু হয়ে থাকলে তা ধর্তব্য নয়। ভবিষ্যতে যেন এমনটি কিছুতেই না হতে পারে। নিশ্চয়ই এ কাজটি যুক্তির দিক থেকে অশ্লীল, সুস্থ বিবেকের লোকের পরিভাষায় অত্যন্ত ঘৃণ্য এবং শরীয়তের আইনেও নেহায়াত মন্দ পথ।
সামাজিক ও তামাদ্দুনিক সমস্যাবলির ক্ষেত্রে জাহেলিয়াতের ভ্রান্ত পদ্ধতিগুলোকে হারাম গণ্য করে সাধারণভাবে কুরআন মাজীদে অবশ্যই একথা বলা হয়ে থাকে, "যা হয়ে গেছে তা হয়ে গেছে"। এর দু'টি অর্থ হয়।
এক, অজ্ঞতা ও অজ্ঞানতার যুগে তোমরা যে সমস্ত ভুল করেছো, সেগুলো পাকড়াও করা হবে না। তবে এ ক্ষেত্রে শর্ত হচ্ছে এই যে, এখন যথার্থ নির্দেশ এসে যাবার পর
তোমরা নিজেদের কার্যকলাপ সংশোধন করে নাও এবং ভুল ও অন্যায় কাজগুলো পরিহার করো, সেগুলোর পুনরাবৃত্তি করো না।
দুই, আগের যুগের কোনো পদ্ধতিকে যদি এখন হারাম গণ্য করা হয়ে থাকে, তাহলে তা থেকে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সঠিক হবে না যে, আগের আইন বা রীতি অনুযায়ী যে কাজ ইতিপূর্বে করা হয়েছে তাকে নাকচ করে দিয়ে তা থেকে উদ্ভুত ফলাফলকে অবৈধ ও তার ফলে যে দায়িত্ব মাথায় চেপে বসেছে তাকে অনিবার্যভাবে রহিত করা হচ্ছে। যেমন এখন বিমাতাকে বিয়ে করা হারাম গণ্য করা হয়েছে। এর অর্থ এ নয় যে, এ পর্যন্ত যত লোক এ ধরনের বিয়ে করেছে, তাদের গর্ভজাত সন্তানদেরকে জারজ গণ্য করা হচ্ছে এবং নিজেদের পিতার সম্পদ সম্পত্তিতে তাদের উত্তরাধিকার রহিত করা হচ্ছে। অনুরূপভাবে যদি লেনদেনের কোনো পদ্ধতিকে হারাম গণ্য করা হয়ে থাকে, তাহলে তার অর্থ এ নয় যে, এ পদ্ধিতে এর আগে যতগুলো লেনদেন হয়েছে, সব বাতিল গণ্য হয়েছে এবং এখন এভাবে কোনো ব্যক্তি যে ধন-সম্পদ উপার্জন করেছে তা তার থেকে ফেরত নেয়া হবে অথবা ঐ সম্পদকে হারাম গণ্য করা হবে।
ইসলামী আইন মোতাবিক এ কাজটি একটি ফৌজদারী অপরাধ এবং আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষ এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার ক্ষমতা রাখেন। আবু দাউদ, নাসাঈ ও মুসনাদে আহমাদে এ হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, নবী এই অপরাধকারীদেরকে মৃত্যুদণ্ড ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার শাস্তি দিয়েছেন। আর ইবনে মাজাহ ইবনে আব্বাস থেকে যে রেয়ায়াত উদ্ধৃত করেছেন তা থেকে জানা যায়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে এই সাধারণ নির্দেশটি বর্ণনা করেছিলেন, "যে ব্যক্তি মুহরিম আত্মীয়ের মধ্য থেকে কারো সাথে যিনা করে তাকে হত্যা করো"।
ফিকহবিদদের মধ্যে এ ব্যাপারে মতবিরোধ রয়েছে। ইমাম আহমাদের মতে এহেন ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে এবং তার ধন-সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে। ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালেক ও ইমাম শাফেঈর মতে যদি সে কোনো মুহরিম আত্মীয়ার সাথে যিনা করে থাকে, তাহলে তাকে যিনার শাস্তি দেয়া হবে আর যদি বিয়ে করে থাকে তাহলে তাকে কঠিন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হবে।
📄 যে সব মহিলাদের বিয়ে করা হারাম
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ أُمَّهُتُكُمْ وَبَنْتُكُمْ وَأَخَوْتُكُمْ وَعَمَّتُكُمْ وَخُلْتُكُمْ وَبَنْتُ الْآخِ وَ بَنْتُ الْأُخْتِ وَأُمَّهُتُكُمُ الَّتِي أَرْضَعْنَكُمْ وَأَخَوَاتُكُمْ مِّنَ الرَّضَاعَةِ وَ أُمَّهَتُ نِسَائِكُمْ وَ رَبَائِبُكُمُ الَّتِي فِي حُجُورِكُمْ مِّنْ نِّسَائِكُمُ الَّتِي دَخَلْتُمْ بِهِنَّ فَإِنْ لَّمْ تَكُونُوا دَخَلْتُمْ بِهِنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ وَ حَلَائِلُ أَبْنَائِكُمُ الَّذِينَ مِنْ أَصْلَا بِكُمْ وَ أَنْ تَجْمَعُوا بَيْنَ الْأُخْتَيْنِ إِلَّا مَا قَدْ سَلَفَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا.
অর্থ: তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে তোমাদের মাতা, কন্যা, বোন, ফুফু, খালা, ভাতিজি, ভাগিনী, দুধমাতা, দুধবোন, শাশুড়ি। আর তোমাদের স্ত্রীদের পূর্ব স্বামীর কন্যা, যারা তোমাদের অভিভাবকত্বে আছে যদি তোমরা ঐ স্ত্রীদের সাথে মিলন করে থাক, তবে যদি মিলন না করে থাক তবে দোষ নেই। তোমাদের ঔরসজাত পুত্রবধূকে এবং দুই বোনকে একসাথে বিয়ে করাও হারাম করা হয়েছে। তবে আগে যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু। (সূরা আন নিসা: আয়াত-২৩)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: উপরিউক্ত আয়াতে যে ১৪ প্রকার মহিলাকে বিয়ে করা হারাম তাদের বিষয়ে বর্ণিত হয়েছে-
ইবনে আব্বাস বলেন সাত প্রকারের মহিলা বংশগত কারণে আর সাত প্রকারের মহিলা বৈবাহিক কারণে বিবাহ করা হারাম হয়েছে। এখানে মা বলতে আপন মা ও বিমাতা উভয়ই বুঝায়। তাই উভয়ই হারাম এ ছাড়া বাপের মা ও মায়ের মা-ও এ হারমের অন্তর্ভুক্ত। যে মহিলার সাথে বাপের অবৈধ সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে সে পুত্রের জন্য হারাম কিনা এ ব্যাপারে মতবিরোধ রয়েছে। প্রথম যুগের কোনো কোনো ফকীহ একে হারাম বলেন না। আর কেউ কেউ হারাম বলেছেন; বরং তাদের মতে, বাপ যৌন কামনা সহ যে মহিলার গা স্পর্শ করেছে সেও পুত্রের জন্য হারাম। অনুরূপভাবে যে মহিলার সাথে পুত্রের অবৈধ সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে, সে বাপের জন্য হারাম কিনা এবং যে পুরুষের সাথে মা বা মেয়ের অবৈধ সম্পর্ক ছিল অথবা পরে হয়ে যায়, তার সাথে বিয়ে করা মা ও মেয়ে উভয়ের জন্য হারাম কিনা, এ ব্যাপারেও প্রথম যুগের ফকীহদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। এ প্রসঙ্গে ফকীহদের আলোচনা অত্যন্ত দীর্ঘ। তবে সামান্য চিন্তা করলে একথা সহজেই অনুধাবন করা যায় যে, কোনো ব্যক্তি যদি এমন কোনো স্ত্রীলোকের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ থাকে, যার ওপর তার পিতার বা পুত্রেরও নজর থাকে অথবা যার মা বা মেয়ের ওপরও তার নজর থাকে, তাহলে এটাকে কখনো সুস্থ ও সৎ সামাজিকতার উপযোগী বলা যেতে পারে না। যে সমস্ত আইনগত চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিবাহ ও অবিবাহ, বিবাহ পূর্ব ও বিবাহ পরবর্তী এবং স্পর্শ ও
দৃষ্টিপাত ইত্যাদির মধ্যে পার্থক্য করা হয়, কিন্তু আল্লাহর শরীয়াতের স্বাভাবিক প্রকৃতি তা মেনে নিতে মোটেই প্রস্তুত নয়। সোজা কথায় পারিবারিক জীবনে একই স্ত্রীলোকের সাথে বাপ ও ছেলে অথবা একই পুরুষের সাথে মা ও মেয়ের যৌন সম্পর্ক কঠিন বিপর্যয় সৃষ্টির কারণ এবং শরীয়াত একে কোনোক্রমেই বরদাস্ত করতে পারে না। নবী বলেন, "যে ব্যক্তি কোনো মেয়ের যৌন অংগের প্রতি দৃষ্টিপাত করে তার মা ও মেয়ে উভয়ই তার জন্যে হারাম হয়ে যায়"।
তিনি আরো বলেন, "আল্লাহ সেই ব্যক্তির চেহারা দেখাই পছন্দ করেন না, যে একই সময় মা ও মেয়ে উভয়ের যৌনাংগে দৃষ্টিপাত করে"।
এ হাদীসগুলো থেকে শরীয়াতের উদ্দেশ্য দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। নাতনী ও দৌহিত্রীও কন্যার অন্তর্ভুক্ত। তবে অবৈধ সম্পর্কের ফলে যে মেয়ের জন্ম হয় সেও হারাম কিনা, এ ব্যাপারে অবশ্যই মতবিরোধ আছে। ইমাম আবু হানীফা (র), ইমাম মলেক রা. ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের (র) মতে সেও বৈধ কন্যার মতোই মুহরিম। অন্যদিকে ইমাম শাফেঈর (র) মতে সে মুহরিম নয় অর্থাৎ তাকে বিয়ে করা যায়; কিন্তু আসলে যে মেয়েটিকে সে নিজে তার নিজেরই ঔরসজাত বলে জানে, তাকে বিয়ে করা তার জন্য বৈধ, এ চিন্তাটিও সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ বিবেককে ভারাক্রান্ত করে। সহোদর বোন, বৈমাত্রেয় বোন ও বৈপিত্রেয় বোন- তিন জনই সামনভাবে এ নিদের্শের আওতাধীন।
এ সম্পর্কগুলোর ক্ষেত্রেও সহোদর, বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয়ের-ব্যাপারে কোনো পার্থক্য নেই। বাপ ও মায়ের বোন সহোদর, বৈমাত্রেয় বা বৈপিত্রেয় যে পর্যায়েরই হোক না কেন তারা অবশ্যই পুত্রের জন্য হারাম। অনুরূপভাবে ভাই ও বোন সহোদর, বৈমাত্রেয় বা বৈপিত্রেয় যে কোনো পর্যায়েরই হোক না কেন তাদের কন্যারা নিজের কন্যার মতই হারাম।
সমগ্র উম্মাতে মুসলিমা এ ব্যাপারে একমত যে, একটি ছেলে বা মেয়ে যে স্ত্রীলোকদের দুধ পান করে তার জন্য ঐ স্ত্রীলোকটি মায়ের পর্যায়ভুক্ত ও তার স্বামী বাপের পর্যায়ভুক্ত হয়ে যায় এবং আসল মা ও বাপের সম্পর্কের কারণে যে সমস্ত আত্মীয়তা হারাম হয়ে যায় দুধ-মা ও দুধ-বাপের সম্পর্কের কারণেও সেসব আত্মীয়তাও তার জন্য হারাম হয়ে যায়। এ বিধানটির উৎসমূলে রয়েছে নবী করীম -এর এ নির্দেশটি- "বংশ ও রক্ত সম্পর্কের দিক দিয়ে যা হারাম দুধ সম্পর্কের দিক দিয়েও তা হারাম"।
তবে কী পরিমাণ দুধ পানে দুধ সম্পর্কের দিক দিয়ে বিয়ে করা হারাম হয়ে যায় সে ব্যাপারে মতবিরোধ আছে। ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম মালেকের মতে যে পরিমাণ দুধ পান করলে একজন রোযাদারের রোযা ভেঙে যেতে পারে কোন স্ত্রীলোকের সেই পরিমাণ দুধ যদি শিশু পান করে, তাহলে হারামের বিধান প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। কিন্তু ইমাম আহমাদের মতে তিনবার পান করলে এবং ইমাম শাফেঈর মতে পাঁচ বার পান করলে এ হারামের বিধান প্রতিষ্ঠিত হয়। এ ছাড়াও কোন্ বয়সে দুধ পান করলে বিবাহ
সম্পর্ক হারাম হয়ে যায় সে ব্যাপারেও মতানৈক্য রয়েছে। এ ব্যাপারে ফকীহগণ নিম্নোক্ত মত পোষণ করেন।
১. শিশুর মাতৃদুগ্ধ পানের যে স্বাভাবিক বয়স কাল, যখন তার দুধ ছাড়ানো হয় না এবং দুধকেই তার খাদ্য হিসেবে খাওয়ানো হয়, এই সময়ের মধ্যে কোন মহিলার দুধ পান করলে বিবাহ সম্পর্ক হারাম হয়ে যায়। নয়তো দুধ ছাড়ানোর পর কোনো শিশু কোনো মহিলার দুধ পান করলে, তা পানি পান করারই পর্যায়ভুক্ত হয়। উম্মে সালমা ও ইবনে আব্বাস এ মত পোষণ করেছেন। আলী থেকেও এই অর্থে একটি বর্ণনা পাওয়া যায়। যুহরী, হাসান বসরী কাতাদাহ, ইকরামাহ ও আওযাঈও এ মত পোষণ করেন।
২. শিশুর দুই বছর বয়স কালের মধ্যে যে দুধ পান করানো হয় কেবল মাত্র তা থেকেই দুধ সম্পর্ক প্রমাণিত হয়। এটি উমর , ইবনে মাসউদ , আবু হুরাইয়া ও ইবনে উমরের মত। ফকীহগণের মধ্যে ইমাম শাফেঈ, ইমাম আহমাদ, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মাদ ওসুফিয়ান সাওরী এই মত গ্রহণ করেছেন। ইমাম আবু হানীফারও একটি অভিমত এরই সপক্ষে ব্যক্ত হয়েছে। ইমাম মালিকও এই মতের সমর্থন করেন। কিন্তু তিনি বলেন, দু'বছর থেকে যদি এক মাস দু'মাস বেশি হয়ে যায় তাহলে তার ওপরও ঐ দুধ পানের সময় কালের বিধান কার্যকর হবে।
৩. ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম যুফারের বিখ্যাত অভিমত হচ্ছে, দুধপানের মেয়াদ আড়াই বছর এবং এই সময়ের মধ্যে কোনো স্ত্রীলোকের দুধ পান করলে দুধ-সম্পর্ক প্রমাণিত হবে।
৪. যে কোনো বয়সে দুধ পান করলে দুধ সম্পর্ক স্থাপিত হবে। অর্থাৎ এ ব্যাপারে বয়স নয়, দুধই আসল বিষয়। পানকারী বৃদ্ধ হলেও দুধ পানকারী শিশুর জন্য যে বিধান তার জন্যও সেই একই বিধান জারী হবে। আয়েশা এ মত পোষণ করেন। আলী থেকেই এরই সমর্থনে অপেক্ষাকৃত নির্ভুল অভিমত বর্ণিত হয়েছে। ফকীহদের মধ্যে উরওয়াহ ইবনে যুবাইর, আতা ইবনে রিবাহ, লাইস ইবনে সা'দ ও ইবনে হাযম এই মত অবলম্বন করেছেন।
যে মহিলার সাথে শুধু মাত্র বিয়ে হয়েছে তার মা হারাম কী না এ ব্যাপারে মতবিরোধ আছে। ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেঈ ও ইমাম আহমাদ রাহেমাহুমুল্লাহু তার হারাম হওয়ার অভিমত ব্যক্ত করেছেন। অন্যদিকে আলীর মতে কোনো মহিলার সাথে একান্তে অবস্থান না করা পর্যন্ত তার মা হারাম হবে না। সৎ-বাপের ঘরে লালিত হওয়াই এই ধরনের মেয়ের হারাম হওয়ার জন্য শর্ত নয়। মহান আল্লাহ নিছক এই সম্পর্কটির নাজুকতা বর্ণনা করার জন্য এ শব্দাবলি ব্যবহার করেছেন। এ ব্যাপারে মুসলিম ফকীহগণের 'ইজমা' অনুষ্ঠিত হয়েছে যে, সৎ-মেয়ে সৎ-বাপের ঘরের লালিত হোক বা না হোক সর্বাবস্থায়ই সে সৎ-বাপের জন্য হারাম।
এই শর্তটি কেবলমাত্র এ জন্য বৃদ্ধি করা হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি যাকে পালক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেছে, তার বিধবা বা তালাক প্রাপ্তা স্ত্রী ঐ ব্যক্তির জন্য হারাম নয়। কেবল মাত্র নিজের ঔরস জাত পুত্রের স্ত্রীই বাপের জন্য হারাম। এভাবে পুত্রের ন্যায় প্রপুত্র ও দৌহিত্রের স্ত্রীও দাদা ও নানার জন্য হারাম।
নবী -এর নির্দেশ, খালা ও ভাগিনী এবং ফুফু ও ভাইঝিকেও এক সাথে বিয়ে করা হারাম। এ ব্যাপারে একটা মূলনীতি মনে রাখা দরকার। সেটি হচ্ছে, এমন ধরনের দু'টি মেয়েকে একত্রে বিয়ে করা হারাম যাদের একজন যদি পুরুষ হতো তাহলে অন্য জনের সাথে তার বিয়ে হারাম হতো।