📄 আল্লাহ পিতা ছাড়া শুধু মা থেকে সন্তান দিয়েছেন
قَالَتْ رَبِّ أَنَّى يَكُونُ لِي وَلَدٌ وَلَمْ يَمْسَسْنِي بَشَرٌ قَالَ كَذَلِكِ اللَّهُ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ إِذَا قَضَى أَمْرًا فَإِنَّمَا يَقُولُ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ.
অর্থ: একথা শুনে মারইয়াম বললো, "হে আমার প্রতিপালক! আমার সন্তান কেমন করে হবে? আমাকে তো কোনো পুরুষ স্পর্শও করেনি।" জবাব এলো, "এমনটিই হবে। আল্লাহ যা চান সৃষ্টি করেন। তিনি যখন কোনো কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন তখন কেবল এতটুকুই বলেন হয়ে যাও, তাহলেই তা হয়ে যায়।" (সূরা আল ইমরান: আয়াত-৪৭)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: ফেরেশতারা মারইয়ামকে বললেন, "হে মারইয়াম আল্লাহ তাঁর পক্ষ থেকে একটি বাণীর সুসংবাদ দিচ্ছেন, যার নাম হবে ঈসা ইবনে মারইয়াম।' তিনি ইহ-পরকালের সম্মানিত ও আল্লাহর ঘনিষ্ঠদের অন্তর্ভুক্ত। যিনি দোলনায় ও কোলে থেকে মানুষের সাথে কথা বলবেন। আর যিনি পুণ্যবানদের একজন। তখন মারইয়াম আশ্চর্য হয়ে বললেন, "আমার গর্ভে কী করে সন্তান জন্মিবে! আমি তো বিবাহিতা নই। আমি ব্যভিচারিণীও নই।" কারণ স্বাভাবিক নিয়মে তো নর-নারীর যৌন মিলনের ফলে সন্তানের জন্ম হয়ে থাকে। তিনি বলেন, "আমাকে তো কখনো কোনো নর স্পর্শ পর্যন্ত কেরনি।” কোনো পুরুষ তোমাকে স্পর্শ না করলেও তোমার সন্তান হবে। এখানে যে 'এমনটি হবে' শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যাকারিয়া আলাইহিস সালামের জবাবেও এই একই শব্দ ব্যবহার করা হয়েছিল। সেখানে এর যে অর্থ ছিল এখানেও সেই একই অর্থ হওয়াই উচিত। তা ছাড়া পরবর্তী বাক্য বরং পূর্বাপর সমস্ত বর্ণনাই এই অর্থ সমর্থন করে যে, কোনো প্রকার যৌন সংযোজন ছাড়াই মারয়ামকে সন্তান জন্মের সুসংবাদ দেয়া হয়েছিল।
আল্লাহর জাত ও সিফাতে যে কাউকে সমকক্ষ মনে করা শিরক তেমনি মানুষের কোনো সিফাত-বৈশিষ্ট্যকে আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করাও শিরক। ইয়াহুদীরা বলতো ওযায়ের আল্লাহর পুত্র আর খ্রিস্টানরা বলতো ঈসা আল্লাহর পুত্র। এভাবে আল্লাহর কিতাবের আহল হয়েও এ দু'টো সম্প্রদায়-ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানরা আল্লাহর সাথে মানুষের একটা বৈশিষ্ট্য জন্মদান ও যৌন কর্মকে সম্পৃক্ত করে আল্লাহর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে শিরকে লিপ্ত হয়ে পড়ে।
আল্লাহর সৃষ্টি পদ্ধতির একটা দিক উক্ত আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। কোনো কিছু সৃষ্টিতে আল্লাহ কোনো কারণ উপকারণের মুখাপেক্ষী নন; কিছু মুহাককিক আলিমগণের মতে আল্লাহকে কোনো কিছু সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে 'কুন' শব্দটিও বলতে হয় না। তাদের মতে 'কুন' বলতে যতটুকু সময় লাগে আল্লাহর ইচ্ছা বলে কোনো কিছু ততটুকু সময়ের মধ্যেই সৃষ্টি হয়ে যায়। অর্থাৎ কোনো কিছু সৃষ্টি করার জন্য আল্লাহ তায়ালা 'কুন' বলার প্রতিও মুহতাজ নন; বরং সে জন্যে তাঁর ইচ্ছা করাই যথেষ্ট। আল্লাহর অসীম কুদরতের তিনি আদম-কে সৃষ্টি করেছেন পুরুষ-স্ত্রী ছাড়া, হাওয়াকে সৃষ্টি করেছেন পুরুষ
(আদম) থেকে, আর ঈসা -কে সৃষ্টি করেছেন নারী (মারইয়াম) থেকে। এটা আল্লাহর কুদরত। কিন্তু আল্লাহর কুদরত প্রকাশ পায় বিশেষ কোনো কারণে, বিশেষ কোনো সময়ে। তাছাড়া সবকিছুই সাধারণ আল্লাহর আদত অনুসারেই প্রকাশ পায়। দুনিয়ার সাধারণ নিয়মই হলো আল্লাহর আদত। নাস্তিকরা যাকে বলে প্রকৃতি। বস্তুত প্রকৃতি বলতে কোনো কিছুরই অস্তিত্ব নেই। আল্লাহই ভাল জানেন।
📄 আল্লাহর নিকট নারী-পুরুষের কোনো পার্থক্য নেই আমলের ক্ষেত্রে
فَاسْتَجَابَ لَهُمْ رَبُّهُمْ أَنِّي لا أُضِيعُ عَمَلَ عَامِلٍ مِّنْكُمْ مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى بَعْضُكُم مِّنْ بَعْضٍ فَالَّذِينَ هَاجَرُوا وَأُخْرِجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ وَأُوذُوا فِي سَبِيلِي وَقَاتَلُوا وَقُتِلُوا لَا كَفِّرَنَّ عَنْهُمْ سَيِّئَتِهِمْ وَلَأُدْخِلَنَّهُمْ جَنَّتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ ثَوَابًا مِّنْ عِندِ اللَّهِ وَاللَّهُ عِندَهُ حُسْنُ الثَّوَابِ.
অর্থ: জবাবে তাদের রব বললেন, আমি তোমাদের কারো কর্মকাণ্ড নষ্ট করবো না। পুরুষ হও বা নারী, তোমরা সবাই একই জাতির অন্তর্ভুক্ত। কাজেই যারা আমার জন্য নিজেদের স্বদেশ ভূমি ত্যাগ করেছে এবং আমার পথে যাদেরকে নিজেদের ঘর বাড়ি থেকে বের করে দেয়া ও কষ্ট দেয়া হয়েছে এবং যারা আমার জন্য লড়েছে ও মারা গেছে, তাদের সমস্ত গোনাহ আমি মাফ করে দেবো এবং তাদেরকে এমন সব বাগানে প্রবেশ করাবো যার নীচে দিয়ে ঝরনাধারা বয়ে চলবে। এসব হচ্ছে আল্লাহর কাছে তাদের প্রতিদান এবং সবচেয়ে ভালো প্রতিদান আল্লাহর কাছেই আছে। (সূরা আল ইমরান: আয়াত-১৯৫)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: পূর্ববতী আয়াতসমূহে আমলী ঈমানদার লোকদের কতিপয় দোয়া-মুনাযাতের বর্ণনা ছিল। আলোচ্য আয়াতে সে দোয়ার মনজুরী এবং আমলী লোকদের নেক আমলের বিপুল প্রতিদানের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে।
সৎকাজ যেই করুক না কেন সে তার পুরোপুরি প্রতিদান ও সওয়াব পাবে। কাজটি চাই কোনো পুরুষই করুক অথবা কোনো নারীই করুক। প্রতিদান প্রাপ্তিতে উভয়ের জন্যেই একই নিয়ম। আল্লাহর দরবারে এমন কোনো নিয়ম নেই যে, একই কাজ যদি পুরুষ করে তবে এক প্রকার ফল পাবে, আর যদি স্ত্রীলোকেরা করে তবে অন্য প্রকারের ফল পাবে। আল্লাহ নর ও নারীর পার্থক্যের দরুন তাদের আমলের প্রতিফলের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেন না। এ ক্ষেত্রে আল্লাহর কথা হলো- بَعْضُكُمْ مِنْ بَعْضٍ “তোমরা (নর-নারী) পরস্পরের অংশ বিশেষ।" কাজেই আমলের ফলাফলের দিক থেকেও কোনো তারতম্য নেই বা থাকবে না।
ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ বা স্বল্প ধারণার লোকেরা মনে করে থাকে যে, ইসলাম কেবল পুরুষদের প্রাধান্য ও গুরুত্ব দেয়। নারীদের কোনো মর্যাদা বা অধিকার ইসলামে নেই।
এমনকি আজকের সমাজে কিছু নামধারী মুসলিম যুবক-যুবতীদেরও এমনি ধারণা রয়েছে। উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে ইসলামী তাহজীব-তমাদ্দুনের যথার্থ ধারণা ও আমল না থাকার কারণে এবং আন্তর্জাতিক ইসলাম বিদ্বেষীদের ষড়যন্ত্রের ফলে মুসলমানদের একটি অংশের মধ্যে অতি সুকৌশলে এ জাতীয় বিষক্রিয়ার সংক্রমণ ঘটেছে।
ইসলামের শিক্ষা সম্পর্কে সত্যিকার ধারণা না থাকার কারণে মুসলিম সমাজের কতিপয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও বিশ্বের অমুসলিমদের ইসলাম বিরোধী শ্লোগান নিজেদের মধ্যে শুধু প্রচলন নয়; বরং নিজেরা তা গ্রহণ ও বরণ করে নিচ্ছে। যেমন সাম্প্রদায়িকতা'। যে ইসলাম সাম্প্রদায়িকতার মুলোৎপাটনকারী সার্বজনীন আদর্শ। সে ইসলামকেই দুর্নাম করা হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতার নামে।
আল-কুরআনের উপস্থাপিত নারী পুরুষের মর্যাদার পার্থক্যহীনতা, নর-নারীদের যথোপযুক্ত মর্যাদার ঘোষণা আজকের বিশ্বে কার্যকর না থাকার দরুণ উদ্ভুত পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে নারী দিবস, শিশু দিবস ইত্যাদি দিবসগুলো আন্তর্জাতিকভাবে উদযাপন করা হচ্ছে। কিন্তু ইসলামের বিধি-বিধানগুলো সমাজে বাস্তবায়িত হলে এসব দিবস পালনের কি প্রয়োজন হতো?