📄 সম্বোধন ও আলোচ্য বিষয়াবলি
এই বিভিন্ন ভাষণকে এক সাথে মিলিয়ে যে জিনিসটি একে একটি সুগ্রথিত ধারাবাহিক প্রবন্ধে পরিণত করেছে সেটি হচ্ছে এর উদ্দেশ্য, মূল বক্তব্য ও কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তুর সামঞ্জস্য ও একমুখীনতা। সূরায় বিশেষ করে দু'টি দলকে সম্বোধন করা হয়েছে। একটি দল হচ্ছে, আহলী কিতাব (ইহুদী ও খ্রিস্টান) এবং দ্বিতীয় দলটিতে রয়েছে এমন সব লোক যারা মুহাম্মদ -এর প্রতি ঈমান এনেছিল।
সূরা বাকারায় ইসলামের বাণী প্রচারের যে ধারা শুরু করা হয়েছিল প্রথম দলটির কাছে সেই একই ধারায় প্রচার আরো জোরালো করা হয়েছে। তাদের আকীদাগত ভ্রষ্টতা ও চারিত্রিক দুষ্কৃতি সম্পর্কে সর্তক করে দিয়ে তাদেরকে জানানো হয়েছে যে, এই রাসূল এবং এই কুরআন এমন এক দীনের দিকে নিয়ে আসছে প্রথম থেকে সকল নবীই যার দাওয়াত নিয়ে আসছেন এবং আল্লাহর প্রকৃতি অনুযায়ী যা একমাত্র সত্য দীন। এই দীনের সোজা পথ ছেড়ে তোমরা যে পথ ধরেছো তা যেসব কিতাবকে তোমরা আসমানী
কিতাব বলে স্বীকার করো তাদের দৃষ্টিতেও সঠিক নয়। কাজেই যার সত্যতা তোমরা নিজেরাও অস্বীকার করতে পারো না তার সত্যতা স্বীকার করে নাও।
দ্বিতীয় দলটি এখন শ্রেষ্ঠতম দলের মর্যাদা লাভ করার কারণে তাকে সত্যের পতাকাবাহী ও বিশ্বমানবতার সংস্কার ও সংশোধনের দায়িত্ব দান করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে সূরা বাকারায় যে নির্দেশ শুরু হয়েছিল এখানে আরো বৃদ্ধি করা হয়েছে। পূর্ববর্তী উম্মতদের ধর্মীয় ও চারিত্রিক অধঃপতনের ভয়াবহ চিত্র দেখিয়ে তাকে তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করা থেকে দূরে থাকার জন্য সতর্ক করা হয়েছিল। একটি সংস্কারবাদী দল হিসেবে সে কিভাবে কাজ করবে এবং যেসব আহলি কিতাব ও মুনাফিক মুসলমান আল্লাহর পথে নানা প্রকার বাধা বিপত্তি সৃষ্টি করছে তাদের সাথে কী আচরণ করবে, তাও তাকে জানানো হয়েছে। উহুদ যুদ্ধে তার মধ্যে যে দুর্বলতা দেখা দিয়েছিল তা দূর করার জন্যও তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।
এভাবে এ সূরাটি শুধুমাত্র নিজের অংশগুলোর মধ্যে ধারাবাহিকতা রক্ষা করেনি এবং নিজের অংশগুলোকে একসূত্রে গ্রথিত করেনি; বরং সূরা বাকারার সাথেও এর নিকট সম্পর্ক দেখা যাচ্ছে। এটি একেবারেই তার পরিশিষ্ট মনে হচ্ছে। সূরা বাকারার লাগোয়া আসনই তার স্বাভাবিক আসন বলে অনুভূত হচ্ছে।
📄 নাযিলের কার্যকারণ
সূরাটির ঐতিহাসিক পটভূমি হচ্ছে-
১. এই সত্য দীনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারীদেরকে সূরা বাকারায় পূর্বাহ্নেই যেসব পরীক্ষা, বিপদ-আপদ ও সংকট সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়া হয়েছিল তা পূর্ণ মাত্রায় সংঘটিত হয়েছিল। বদর যুদ্ধে ঈমানদারগণ বিজয় লাভ করলেও এ যুদ্ধটি যেন ছিল ভীমরুলের চাকে ঢিল মারার মতো ব্যাপার। এ প্রথম সশস্ত্র সংঘর্ষটি আরবের এমন সব শক্তিগুলোকে অকস্মাত নাড়া দিয়েছিল যারা এ নতুন আন্দোলনের সাথে শত্রুতা পোষণ করতো। সবদিকে ফুটে উঠছিল ঝড়ের আলামত। মুসলমানদের ওপর একটি নিরন্তর ভীতি ও অস্থিরতার অবস্থা বিরাজ করছিল। মনে হচ্ছিল, চারপাশের সারা দুনিয়ার আক্রমণের শিকার মদীনার এ ক্ষুদ্র জনবসতিটিকে দুনিয়ার বুক থেকে মুছে ফেলে দেয়া হবে। মদীনার অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর এ পরিস্থিতির অত্যন্ত বিরূপ প্রভাব পড়েছিল। মদিনা ছিল তো একটি ছোট্ট মফস্বল শহর। জনবসতি কয়েক'শো ঘরের বেশি ছিল না। সেখানে হঠাৎ বিপুল সংখ্যক মুহাজিরের আগমন। ফলে অর্থনৈতিক ভারসাম্য তো এমনিতেই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তার ওপর আবার এই যুদ্ধাবস্থার কারণে বাড়তি বিপদ দেখা দিল।
২. হিজরতের পর নবী মদীনার আশপাশের ইহুদী গোত্রগুলোর সাথে যে চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন তারা সেই চুক্তির প্রতি সামান্যতমও সম্মান প্রদর্শন করেনি। বদর যুদ্ধকালে এই আহলি কিতাবদের যাবতীয় সহানুভূতি তাওহীদ ও
নবুয়াত এবং কিতাব ও আখেরাত বিশ্বাসী মুসলমানদের পরিবর্তে মূর্তিপূজারী মুশরিকদের সাথে ছিল। বদর যুদ্ধের পর তারা কুরাইশ ও আরবদের অন্যান্য গোত্রগুলোকে প্রকাশ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে প্রতিশোধ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে থাকে। বিশেষ করে বনী নাযির সরদার কা'ব ইবনে আশরাফ তো এ ব্যাপারে নিজের বিরোধমূলক প্রচেষ্টাকে অন্ধ শত্রুতা বরং নীচতার পর্যায়ে নামিয়ে আনে। মদিনাবাসীদের সাথে এই ইহুদীদের শত শত বছর থেকে যে বন্ধুত্ব ও প্রতিবেশিসুলভ সম্পর্ক চলে আসছিল তার কোনো পরোয়াই তারা করেনি। শেষ যখন তাদের দুষ্কর্ম ও চুক্তি ভঙ্গ সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদর যুদ্ধের কয়েক মাস পরে এই ইহুদী গোত্রগুলোর সবচেয়ে বেশি দুষ্কর্মপরায়ণ 'বনী কাইনুকা' গোত্রের ওপর আক্রমণ চালান এবং তাদেরকে মদীনার শহরতলী থেকে বের করে দেন। কিন্তু এতে অন্য ইহুদী গোত্রগুলোর হিংসার আগুন আরো তীব্র হয়ে ওঠে। তারা মদিনার মুনাফিক মুসলমান ও হিযাজের মুশরিক গোত্রগুলোর সাথে চক্রান্ত করে ইসলাম ও مسلمانوں জন্য চার দিকে অসংখ্য বিপদ সৃষ্টি করে। এমনকি কখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রাণ নাশের জন্য তাঁর ওপর আক্রমণ চালানো হয় এই আশঙ্কা সর্বক্ষণ দেখা দিতে থাকে। এ সময় সাহাবায়ে কেরাম সবসময় সশস্ত্র থাকতেন। নৈশ আক্রমণের ভয়ে রাতে পাহারা দেয়া হতো। নবী যদি কখনো সামান্য সময়ের জন্যও চোখের আড়াল হতেন সাহাবায়ে কেরام উদ্বেগ আকুল হয়ে তাঁকে খুঁজতে বের হতেন।
৩. বদরে পরাজয়ের পর কুরাইশদের মনে এমনিতেই প্রতিশোধের আগুন জ্বলছিল, ইহুদীরা তার ওপর কেরোশিন ছিটিয়ে দিল। ফলে এক বছর পরই মক্কা থেকে তিন হাজার সুসজ্জিত সৈন্যের একটি দল মদীনা আক্রমণ করলো। এ যুদ্ধটি হলো উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে। তাই উহুদের যুদ্ধ নামেই এটি পরিচিত। এ যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য মদীনা থেকে এক হাজার লোক নবী-এর সাথে বের হয়েছিল। কিন্তু পথে তিন শত মুনাফিক হঠাৎ আলাদা হয়ে মদীনার দিকে ফিরে এলো। নবীর সাথে যে সাত শত লোক রয়ে গিয়েছিল তার মধ্যেও মুনাফিকদের একটি ছোট দল ছিল। যুদ্ধ চলা কালে তারা মুসলমানদের মধ্যে ফিত্না সৃষ্টি করার সম্ভাব্য সব রকমের প্রচেষ্টা চালালো। এই প্রথমবার জানা গেলো, মুসলমানদের স্বগৃহে এত বিপুল সংখ্যক আস্তীনের সাপ লুকানো রয়েছে এবং তারা এভাবে বাইরের শত্রুদের সাথে মিলে নিজেদের ভাই-বন্ধু ও আত্মীয়-স্বজনদের ক্ষতি করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে।
৪. উহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয় যদিও মুনাফিকদের কৌশলের একটি বড় অংশ ছিল, তবুও মুসলমানদের নিজেদের দুর্বলতার অংশও কম ছিল না।
একটি বিশেষ চিন্তাধারা ও নৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তিতে যে দলটি এই সবেমাত্র গঠিত হয়েছিল, যার নৈতিক প্রশিক্ষণ এখনো পূর্ণ হতে পারেনি এবং নিজের বিশ্বাস ও নীতি সমর্থন যার লড়াই করার এই মাত্র দ্বিতীয় সুযোগ ছিল তার কাজে কিছু দুর্বলতা প্রকাশ হওয়াটা একটা স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। তাই যুদ্ধের পর এই যাবতীয় ঘটনাবলির ওপর বিস্তারিত মন্তব্য করা এবং তাতেই ইসলামে দৃষ্টিতে মুসলমানদের মধ্যে যেসব দুর্বলতা পাওয়া গিয়েছিল তার মধ্য থেকে প্রত্যেকটির প্রতি অংগুলি নির্দেশ করে তার সংশোধনের জন্য নির্দেশ দেবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। এ প্রসঙ্গে একথাটি দৃষ্টি সমক্ষে রাখার উপযোগিতা রাখে যে, অন্য জেনারেলরা নিজেদের যুদ্ধের পরে তার ওপর যে মন্তব্য করেন, এ যুদ্ধের ওপর কুরআনের মন্তব্য তা থেকে কত ভিন্ন!
📄 আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী মাতৃগর্ভে মানুষের আকৃতি গঠিত হয়
إِنَّ اللَّهَ لَا يَخْفَى عَلَيْهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ هُوَ الَّذِي يُصَوِّرُكُمْ فِي الْأَرْحَامِ كَيْفَ يَشَاءُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ.
অর্থ: পৃথিবী ও আকাশের কোনো কিছুই আল্লাহর কাছে গোপন নেই। তিনি মায়ের পেটে থাকা অবস্থায় যেভাবে ইচ্ছা তোমাদের আকৃতি গঠন করেন। এই প্রবল পরাক্রান্ত মহাজ্ঞানের অধিকারী সত্তা ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। (সূরা-আল ইমরান: আয়াত: ৫-৬)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: এখানে দু'টি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের প্রতি ইংগিত করা হয়েছে।
এক, তোমাদের প্রকৃতিকে তাঁর মতো করে কেউ জানতে পারে না, এমনকি তোমরা নিজেরাও জানতে পারো না। কাজেই তার পথপ্রদর্শন ও পথনির্দেশনার ওপর আস্থা স্থাপন করা ছাড়া তোমাদের গত্যন্তর নেই।
দুই, যিনি গর্ভাশয়ে তোমাদের উৎপত্তি থেকে শুরু করে পরবর্তী সকল পর্যায়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে তোমাদের ছোট ছোট প্রয়োজনগুলোও পূর্ণ করার ব্যবস্থা করেছেন, তিনি দুনিয়ার জীবনে তোমাদের হিদায়াত ও পথ প্রদর্শনের ব্যবস্থা করবেন না, এটা কেমন করে সম্ভব হতে পারে? অথচ তোমরা সবচেয়ে বেশি এ জিনিসটিরই মুখাপেক্ষী।
কোনো মানব সন্তান মাতা-পিতার ইচ্ছায় যেমন জন্মগ্রহণ করে না, তেমনি আকার-আকৃতিতেও মাতা-পিতার কোনো হাত নেই। নারী জাতির উদর থেকে আল্লাহ নিজ ক্ষমতায় ও স্ব-ইচ্ছায় মানব জাতির রূপরেখা, স্বভাব-চরিত্র, স্থায়িত্ব, আয়ু ইত্যাদি নির্ধারণ করে থাকেন। অতএব যার হাতে এসব কিছুই নিবন্ধ একমাত্র তিনিই মানব জাতির ইলাহ মাবুদ হওয়ার যোগ্য। অন্য আয়াতে রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেছেন। তিনি কাউকে ছেলে দান করেন কাউকে দিয়ে থাকেন মেয়ে, আর কাউকে রাখেন
আকীম অর্থাৎ বন্ধা- নিঃসন্তান। আবার তিনি কাউকে দু'ধরনের সন্তান- ছেলে ও মেয়ে উভয়টিই দিয়ে থাকেন।
যদিও মাতা-পিতার যৌন মিলনের ফলে সন্তান জন্মগ্রহণ করে কিন্তু এমন অনেক দম্পতি আছেন যারা শেষ বয়সে উপনীত হয়েও কোনো সন্তান লাভে সক্ষম হন না। অনেকে অনেক চেষ্টা-তদবীর করেও সন্তান লাভ করতে পারেন না। অথচ অনেক দম্পতি এমন আছে তারা আর সন্তান কামনা করে না- জন্ম নিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণের পরেও দেখা যায় স্বামী-স্ত্রীর অজান্তে গর্ভে সন্তান এসে গেছে। মোটকথা সন্তান হওয়া না হওয়ার মূল চাবিকাঠি রাব্বুল আলামীনের হাতে।
📄 দুনিয়ার নেয়ামতসমূহের মধ্যে নারীর অবস্থান শীর্ষে
زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَالْبَنِينَ وَالْقَنَاطِيرِ الْمُقَنْطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَالْخَيْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَالْأَنْعَامِ وَالْحَرْثِ ذَلِكَ مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاللَّهُ عِندَهُ حُسْنُ الْمَابِ.
অর্থ: মানুষের জন্য নারী, সন্তান, সোনারূপার স্তূপ, সেরা ঘোড়া, গবাদী পশু ও কৃষি ক্ষেতের প্রতি আসক্তিকে বড়ই সুসজ্জিত ও সুশোভিত করা হয়েছে। কিন্তু এগুলো দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের সামগ্রী মাত্র।
প্রকৃতপক্ষে উত্তম আবাস তো রয়েছে আল্লাহর কাছে। (সূরা আল ইমরান: আয়াত-১৪)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: আলোচ্য আয়াতে দুনিয়ার ছয়টি প্রধান নেয়ামতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন-
১. নারী ২. সন্তানাদি ৩. সোনা-রূপার ভা-ার ৪. উৎকৃষ্ট ঘোড়া (বাহন) ৫. গৃহপালিত জন্তু ৬. শষ্য ক্ষেত।
এসব উল্লেখযোগ্য প্রধান নেয়ামতসমূহের মধ্যে নারী হচ্ছে শীর্ষস্থানীয়। হাদীসের ভাষায় الْمَرْاةُ الصَّالِحَةُ خَيْرٌ مَا يَكْذِزُ الْمَرْءُ অর্থাৎ "মানুষ যা কিছু সঞ্চয় করে তন্মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট হচ্ছে সতী নারী।"
নারীর সতীত্বের ব্যাখ্যায় হাদীসে বলা হয়েছে-"স্বামী যখন তার প্রতি দৃষ্টিপাত করে তখন সে তাকে সুখী করে, তাকে কোনো আদশে করলে সে আনুগত্য স্বীকার করে, তাকে ঘরে রেখে গেলে সে নিজের পবিত্রতা রক্ষা করে ও স্বামীর ধন-সম্পদের হেফাজত করে।” অন্য এক হাদীসে আছে মহানবী বলেছেন, "আমার কাছে নারী ও সুগন্ধি খুবই প্রিয় বস্তু। তবে নামাযে আমার হৃদয় মনে প্রশান্তি আসে।"
মানুষকে দুনিয়ার জীবনে আল্লাহর দেয়া উক্ত ছয়টি নেয়ামতের মধ্যে সর্বপ্রথম ও প্রধান হলো নারী। বাকিগুলো মূলতঃ নারীকে কেন্দ্র করেই এবং নারীর কারণেই। আল্লাহ
তায়ালা মানুষের মনে এসব নেয়ামতের প্রতি স্বভাবগতভাবেই আশক্তি আকর্ষণ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। মানব স্বভাবের মধ্যে এসবের আশক্তি সৃষ্টির পেছনে আল্লাহ তায়ালার অনেক রহস্য বিদ্যমান রয়েছে। যেমন-
১. এসবের প্রতি আশক্তি ও আকর্ষণ না থাকলে পৃথিবীর সমস্ত ব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলা ধ্বংস হয়ে যেত। মানুষকে দুনিয়াতে আল্লাহর প্রতিনিধি করে পাঠানোর কোনো মূল্য হতো না আর পৃথিবী বে-আবাদ হয়ে পড়তো।
২. মানুষের মনে জাগতিক নেয়ামতের প্রতি আশক্তি ও ভালবাসা না থাকলে তারা পরকালীন প্রশান্তি কামনার্থে সৎকাজে উদ্বুদ্ধ হতো না এবং অসৎকাজ থেকে বিরত থাকার মানসিকতা অর্জন করতে পারতো না।
৩. এসব আকর্ষণীয় নেয়ামতের প্রতি মানুষের অন্তরে ভালবাসা ও আশক্তি সৃষ্টি করে মূলত তাদের পরীক্ষা নেয়া হয়ে থাকে। আল্লাহ দেখতে চান কারা এসবের মধ্যে ডুবে থেকেও আল্লাহর সাথে সাক্ষাত হওয়ার কথা স্মরণ রেখে এগুলোকে আল্লাহ দেয়া সীমারেখার মধ্যে রেখে ব্যবহার করে ও নির্ধারিত গণ্ডীর মধ্যে থেকে নশ্বর দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবন অতিবাহিত করে। পক্ষান্তরে কারা দুনিয়ার এসব চাকচিক্য ও খেল-তামাশার মোহে আচ্ছন্ন হয়ে নিয়ন্ত্রণবিহীন জীবনাযাপন করে। যেমন আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন।
إِنَّا جَعَلْنَا مَا عَلَى الْأَرْضِ زِينَةً لَهَا لِنَبْلُوَهُمْ أَيُّهُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا.
অর্থ: "আমি পৃথিবীর সমস্ত বস্তু পৃথিবীর সৌন্দর্যের জন্যে সৃষ্টি করেছি। যাতে তাদের মধ্যে কে সৎকাজ করে তা পরীক্ষা করে দেখতে পারি।" (সূরা আল কাহাফ: আয়াত-৭)
পৃথিবীতে যেসব বস্তুকে আল্লাহ তায়ালা মানুষের চোখে সুশোভিত করে দিয়েছেন শরীয়তসম্মত পন্থায় সেগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী পরিমিত উপার্জন ও যথাবিধি ব্যবহার করলে উভয় জাহানেই সাফল্য নিশ্চিত। পক্ষান্তরে ওসব বস্তু অবৈধ পন্থায় উপার্জন ও ব্যবহার করলে সামগ্রিক ধ্বংস অনবিার্য।
উদাহরণস্বরূপ প্রধান আশক্তির বস্তু হিসেবে নারীকে নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। নারীর প্রতি আশক্তি পুরুষের স্বভাবজাত কামনা বাসনা আল্লাহ নিজেই সৃষ্টি করে দিয়েছেন। যার মূলে রয়েছে পৃথিবীর সামগ্রিক শৃংখলা ও সৌন্দর্য রক্ষা ও বিশ্বের উৎকর্ষ সাধনের নিয়ামক স্বরূপ ভূমিকা রাখা। এখন কেউ যদি এ কামনা বাসনাকে বিধি বহির্ভূত পন্থায় ও শরীয়ত বিরোধী উপায়ে ব্যবহার করে সামাজিক কাঠামো ভেঙে দেয়ার পরিবেশ সৃষ্টিতে মত্ত হয়ে পড়ে তবে তাদের আল্লাহয় স্বয়ং তা থেকে প্রতিহত করবেন না। আল্লাহ তো তাদের একদিকে হক-বাতিল, ভাল-মন্দ, নেক-বদ ইত্যাদির পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন অন্যদিকে মানুষকে দিয়েছে ইচ্ছার স্বাধীনতা। কর্মের স্বাধীনতা নির্বাচন স্বাধীনতা। আল্লাহ পরীক্ষা করছেন মানুষ এসব স্বাধীনতা কীভাবে ভোগ করে। নর-নারীর পারস্পরিক যৌন সম্পর্কে যখন নিয়ন্ত্রণহীনভাবে পরিচালিত হয় তখন তা পশুত্ব ছাড়া আর কিছু নয়। পক্ষান্তরে শরীয়তসম্মত পন্থায় যদি তা সুনিয়ন্ত্রিত থাকে
তবেই তাতে যেমন সেরা সৃষ্টি মানুষের সম্ভ্রম বজায় থাকে তেমনি তাতে সামাজিক ভিত্তিমূল সুদৃঢ় থেকে বিশ্ব সভ্যতায় সূচিত হয় সত্যিকারের প্রগতি ও সমৃদ্ধি। আজকের পাশ্চাত্য জগতও তাদের সম্পর্কে প্রকাশিত সমকালীন পত্র-পত্রিকা যে অবাধ যৌন আচরণে অশুভ পরিণতির সাক্ষ্য বহন করছে তা আজকের পৃথিবীর অজানা নয়।
আলোচ্য আয়াতে কারিমায় উপরিউক্ত যেকটি বিশেষ লোভনীয় বস্তুর উল্লেখ করার পর এগুলো সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা হলো: ذلِكَ مَتَاعُ الْحَيُوةِ الدُّنْيَا وَاللَّهُ عِنْدَهُ حُسْنُ الْمَابِ.
অর্থ: "এসব নেয়ামত সামগ্রী হচ্ছে পার্থিব জীবনের ব্যবহার করার জন্যে। (এগুলোকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে স্থির করার জন্যে নয়)। আর আল্লাহর কাছে রয়েছে উত্তম ঠিকানা।" অন্য কথায় দুনিয়ার নেয়ামতসমূহ ঠিক তেমনি অস্থায়ী যেমন অস্থায়ী দুনিয়ার জীবন। পক্ষান্তরে পরকালীন জীবন যেমন স্থায়ী তেমনি স্থায়ী সে জীবনের নেয়ামতসমূহ। এজন্যেই আল্লাহর ঘোষণা হলো একমাত্র আল্লাহর কাছেই রয়েছে উত্তম ঠিকানা যার নিয়ামতসমূহ না ধ্বংস হবে না হ্রাস পাবে। বুদ্ধিমান তো সে ব্যক্তি, যে অস্থায়ী সুখ-শান্তি ও চাকচিক্যে মত্ত না হয়ে স্থায়ী শান্তি ও সার্বিক সাফল্য প্রাপ্তির চেষ্টায় নিজেকে নিয়োজিত রাখে।