📄 সহবাসের পূর্বে স্বামী মারা গেলেও স্ত্রীকে ইদ্দত পালন করতে হবে
وَالَّذِينَ يُتَوَفَّوْنَ مِنْكُمْ وَيَذَرُونَ أَزْوَاجًا يَتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا فَإِذَا بَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيْمَا فَعَلْنَ فِي أَنْفُسِهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ.
অর্থ: তোমাদের মধ্য থেকে যারা মারা যায়, তাদের পরে যদি তাদের স্ত্রীরা জীবিত থাকে, তাহলে তাদের চার মাস দশ দিন নিজেদেরকে (বিবাহ থেকে) বিরত রাখতে হবে। তারপর তাদের ইদ্দত পূর্ণ হয়ে গেলে তারা ইচ্ছামতো নিজেদের ব্যাপারে প্রচলিত পদ্ধতিতে যা চায় করতে পারে, তোমাদের ওপর এর কোনো দায়িত্ব নেই। আল্লাহ তোমাদের সবার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবহিত। (সূরা আলা-বাকারা: আয়াত-২৩৪)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: স্বামী মারা যাবার পর স্ত্রীর ইদ্দত পালনের যে সময় কাল এখানে বর্ণিত হয়েছে এটি এমন বিধবাদেরও পালন করতে হবে যাদের সাথে স্বামীদের বিয়ের পর একান্তে বসবাস হয়নি। তবে গর্ভবতী বিধবাদের এই ইদ্দত পালন করতে হবে না। গর্ভস্থ সন্তান প্রসব হবার সাথে সাথেই তাদের ইদ্দত পূর্ণ হয়ে যায়। স্বামীর মৃত্যুর পর পরই অথবা তার কয়েক মাস পরে সন্তান প্রসব হোক না কেন সমান কথা।
"নিজেদেরকে বিরত রাখতে হবে"- এর অর্থ কেবল এতটুকুই নয় যে, এই সময় বিয়ে করতে পারবে না; বরং এই সঙ্গে নিজেকে কোনো প্রকার সাজ-সজ্জা ও অলংকারেও ভূষিত করতে পারবে না। হাদীসে সুস্পষ্টভাবে এ নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, স্বামী মৃত্যুকালীন ইদ্দত পালনের সময় নারীরা রঙিন কাপড় ও অলংকার পরতে পারবে না, মেহেদী, সুর্মা, খুশু ও খেজাব লাগাতে পারবে না, এমনকি কেশ বিন্যাস করতেও পারবে না। তবে এই সময় নারীরা ঘর থেক বাইরে যেতে পারবে কী না এ ব্যাপার মতবিরোধ আছে। উমর আল, উসমান আাছি, ইবনে উমর আলাইছি, যায়েদ ইবনে সাবেত, ইবনে মাসউদ রাজিহা, উম্মে সালমা আজুহা, সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যেব, ইবরাহীম নাখঈ, মুহাম্মাদ ইবনে শীরীন এবং চার ইমামের মতে স্বামী যে ঘরে মারা গেছে ইদ্দত পালনকালে বিধবা স্ত্রীকে সেই ঘরেই থাকতে হবে। দিনের বেলা কোনো প্রয়োজনে সে বাইরে যেতে পারে। কিন্তু ঐ ঘরের মধ্যেই তার অবস্থান হতে হবে। বিপরীত পক্ষে আয়েশা আলা, আতা, তাউস, হাসান বসরী, উমর ইবনে আবদুল আযীয এবং সকল আহলুষ যাহেরের মতে বিধবা স্ত্রী তার উদ্দতকাল যেখানে ইচ্ছা পালন করতে পারে এবং এ সময় সে সফরও করতে পারে।
📄 বিধবাদেরকে ইশারা ইঙ্গিতে বিবাহের প্রস্তাব দেয়া বৈধ কিন্তু গোপনে বিবাহ চুক্তি বৈধ নয়
وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيمَا عَرَّضْتُمْ بِهِ مِنْ خِطْبَةِ النِّسَاءِ أَوْ أَكْنَنْتُمْ فِي أَنْفُسِكُمْ عَلِمَ اللهُ أَنَّكُمْ سَتَذْكُرُونَهُنَّ وَلَكِن لَّا تُوَاعِدُوهُنَّ سِرًّا إِلَّا أَنْ تَقُولُوا قَوْلًا مَعْرُوفًا وَلَا تَعْزِمُوا عُقْدَةَ النِّكَاحِ حَتَّى يَبْلُغَ الْكِتَابُ أَجَلَهُ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي أَنْفُسِكُمْ فَاحْذَرُوهُ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ غَفُورٌ حَلِيمٌ .
অর্থ: ইদ্দতকালে তোমরা এই বিধবাদেরকে বিয়ে করার ইচ্ছা ইশারা ইংগিতে প্রকাশ করলে অথবা মনের গোপন কোণে লুকিয়ে রাখলে কোনো ক্ষতি নেই। আল্লাহ জানেন, তাদের চিন্তা তোমাদের মনে জাগবেই। কিন্তু দেখো, তাদের সাথে কোনো গোপন চুক্তি করো না। যদি কোনো কথা বলতে হয়, প্রচলিত ও পরিচিত পদ্ধতিতে বলো। তবে বিবাহ বন্ধনের সিদ্ধান্ত ততক্ষণ করবে না যতক্ষণ না ইদ্দত পূর্ণ হয়ে যায়। খুব ভালোভাবে জেনে রাখো, আল্লাহ তোমাদের মনের অবস্থাও জানেন। কাজেই তাঁকে ভয়
করো এবং একথাও জেনে রাখো, আল্লাহ ধৈর্যশীল এবং ছোট খাটো ত্রুটিগুলো এমনিতেই ক্ষমা করে দেন। (সূরা আল-বাকারা: আয়াত ২৩৫)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: আলোচ্য আয়াতে ইদ্দত পালনরত বিধবাদের ইশারা-ইঙ্গিতে বিবাহ প্রস্তাব প্রদান সম্পর্কে বলা হয়েছে। এ ধরনের প্রস্তাব জায়েয হলেও বিবাহ কার্যের গোপন চুক্তি জায়েয নয় এবং ইদ্দতের মধ্যে যথারীতি প্রকাশ্যে প্রস্তাব দিয়েও বিবাহ জায়েয নয়। ইদ্দত শেষ হওয়ার পর ইসলামী শরীয়তের নিয়ম-রীতি অনুযায়ী বিবাহ কার্য সম্পাদন করা যেতে পারে। সকল ইমামের এ বিষয়ে ইজমা রয়েছে যে, ইদ্দত শেষ হওয়ার পূর্বে বিবাহ শুদ্ধ নয়।
মৃত স্বামীর বিধবা স্ত্রীকে অস্পষ্ট ভাষায় বিবাহের প্রস্তাব দেয়া জায়েয আছে। তেমনিভাবে তালাক প্রাপ্তাকেও এভাবে বিবাহ প্রস্তাব দেয়া বৈধ।
এ প্রসঙ্গে তাফসীরে ইবনে কাসীরে রাসূলুল্লাহ-এর সময়কার একটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।
ফাতিমা বিনতে কায়েস-কে যখন তার স্বামী আবু আমর ইবনে হাফস তৃতীয় তালাক দিয়েছিলেন তখন রাসূলুল্লাহ তাকে বললেন, তুমি ইবনে মাকতুমের ঘরে ইদ্দত পালন কর। তিনি আরো বললেন, ইদ্দত পালন শেষ হলে আমাকে জানাবে। অতঃপর ইদ্দত পালন শেষ হলে উসামা ইবনে যায়েদ তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন এবং উসামার সাথে তার বিবাহ সম্পন্ন হয়। (ইবনে কাসীর)
এখানে স্মরণ রাখা আবশ্যক যে, উপরিউক্ত বিধানাবলি হলো বিধবা অথবা বায়েন তালাক প্রাপ্তা স্ত্রীর ব্যাপারে। সুতরাং তালাক রাজঈর ইদ্দত চলাকালে স্বামী ছাড়া অন্য কারো জন্যে পয়গাম দেয়া জায়েয নয়।
📄 মোহরানা ধার্য ব্যতীত বিবাহ হলে এবং স্ত্রীকে স্পর্শ না করলেও তাকে তালাক দিলে কিছু সম্পদ দিতে হবে
لَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ إِنْ طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ مَا لَمْ تَمَسُّوهُنَّ أَوْ تَفْرِضُوا لَهُنَّ فَرِيضَةً وَمَتِّعُوهُنَّ عَلَى الْمُوسِعِ قَدَرُهُ وَعَلَى الْمُقْتِرِ قَدَرُهُ ، مَتَاعًا بِالْمَعْرُوفِ حَقًّا عَلَى الْمُحْسِنِينَ.
অর্থ: নিজেদের স্ত্রীদেরকে স্পর্শ করার বা মোহরানা নির্ধারণ করার আগেই যদি তোমরা তালাক দিয়ে দাও তাহলে এতে তোমাদের কোনো গোনাহ নেই। এ অবস্থায় তাদেরকে অবশ্যই কিছু না কিছু দিতে হবে। সচ্ছল ব্যক্তি তার সাধ্যমত এবং দরিদ্র তার সংস্থান অনুযায়ী প্রচলিত পদ্ধতিতে দেবে। সৎলোকদের ওপর এটি একটি অধিকার। (সূরা আল-বাকারা: আয়াত-২৩৬)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: আলোচ্য আয়াতে বিয়ে ও তালাক সম্পর্কিত একটি বিধান বর্ণিত হয়েছে। তা হচ্ছে বিয়ের আকদ হয়েছে ঠিক কিন্তু আকদ হওয়ার সময় মোহর নির্ধারণ করা হয়নি। এমতাবস্থায় যদি স্ত্রীর সাথে নির্জনবাস ও সহবাস হওয়ার পূর্বে তালাক হয়ে যায় তবে ঐ স্ত্রীকে মোহর দেয়া ওয়াজিব নয়। কিন্তু তবুও সামর্থানুযায়ী ঐ স্ত্রীকে অবশ্যই কিছু সম্পদ দিতে হবে। নেককার লোকদের উপর সামর্থ অনুসারে কিছু সম্পদ তাকে দিয়ে দেয়া ওয়াজিব। কতটুকু সম্পদ দিতে হবে কুরআন মজীদ তা নির্ধারণ করে দেয়নি; বরং তা লোকদের শিষ্টাচার ও ঈমানী মর্যাদার উপর ছেড়ে দিয়ে এতটুকু সীমা বলে দিয়েছে যে, ধনী ব্যক্তি তার আর্থিক সংগতি অনুযায়ী আর দরিদ্র ব্যক্তি তার সামর্থ অনুযায়ী কিছু দিয়ে দেবে।
ইসলামী শরীয়ত নারীদের ইজ্জত সম্ভ্রমের যে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং যা ইসলামী সমাজ ছাড় আর কোথায়ও নেই তারই একটা নূন্যতম নিদর্শন হচ্ছে উপরিউক্ত বিধান। নারীর সাথে কেবল বিয়ের শরীয়তসম্মত চুক্তি বা আকদ হওয়ার কারণেই তাকে কিছু সম্পদ দিতে হবে। তার সাথে বিয়ে উত্তর দৈহিক সম্পর্ক না হলেও এবং বিয়ের সময় মোহর ধার্য না হয়ে থাকলেও ইসলামী শরীয়তের এ নির্দেশ। কারণ, সম্পর্ক স্থাপনের পর তা ছিন্ন করলে স্ত্রীগণ কিছু না কিছু ক্ষতিগ্রস্ত অবশ্যই হয়ে থাকে। তাই সামর্থানুসারে সে ক্ষতিপূরণের জন্য আল্লাহর এ নির্দেশ।
আর যদি আকদ হওয়ার সময় মোহর নির্ধারণ করা হয়ে থাকে এবং নির্জনবাসের পূর্বেই তালাক সংঘটিত হয়। তবে নির্ধারিত মোহরের অর্ধেক দেয়া ওয়াজিব। অবশ্য স্ত্রী যদি ক্ষমা করে দেয় অথবা স্বামী যদি মোহর দিয়ে দেয়, তবে তা তাদের বদান্যতা। অবশ্যই ক্ষমা করার বিষয়টি বর্তমানে অত্যন্ত জটিল অবস্থায় পরিণত হয়ছে। স্ত্রীর ক্ষমা করে দেয়াটা কোনো চাপে পড়ে অথবা আবেগে আতিসহ্যে কিনা তার প্রতি লক্ষ্য রাখা আবশ্যক। স্ত্রী সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় ক্ষমা করলে তবেই তা ক্ষমা হিসেবে গণ্য হতে পারে, অন্যথায় নয়।
আমাদের সমাজে 'মোহর' মাফ করে দেয়ার বিষয়টি স্ত্রীর সাথে সম্পৃক্ত বলে মনে করা হয়। উপরিউক্ত অবস্থায় স্বামীর পক্ষ থেকেও ক্ষমা হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুরুষের পূর্ণ মোহর দিয়ে দেয়াকেও মাফ করে দেয়া বলা হয়েছে হয়তো এজন্যে যে, আরব দেশে সাধারণ প্রথানুযায়ী বিয়ের সঙ্গে সঙ্গেই মোহর দিয়ে দেয়া হতো। সুতরাং সহবাসের পূর্বে তালাক দিলে প্রদত্ত মোহরের অর্ধেক স্বামীর প্রাপ্য হয়ে যেত। কাজেই সে যদি এই অর্ধেক না নেয়, তবে তাও ক্ষমার পর্যায়ে পড়ে। ক্ষমা বা মাফ করা উত্তম তাকওয়ার অনুকুল। কেননা তালাক যে ভদ্রোচিত পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে এ ক্ষমা তারই নিদর্শন যা শরীয়াতের দৃষ্টিতে উত্তম ও সওয়াবের কাজ। সুতরাং ক্ষমা স্ত্রীর পক্ষ থেকেও হতে পারে আর তা হতে পারে স্বামীর পক্ষ থেকেও। (মাআরেফুল কুআন)
📄 সাক্ষী হিসেবে নারী
وَاسْتَشْهِدُوا شَهِيدَيْنِ مِنْ رِجَالِكُمْ فَإِنْ لَّمْ يَكُونَا رَجُلَيْنِ فَرَجُلٌ وَامْرَأَتَانِ مِمَّنْ تَرْضَوْنَ مِنَ الشُّهَدَاءِ أَنْ تَضِلَّ إِحْدَاهُمَا فَتُذَكِّرَ إِحْدَاهُمَا الْأُخْرَى .
অর্থ: তারপর নিজেদের পুরুষদের মধ্য থেকে দুই ব্যক্তিকে তার স্বাক্ষী রাখো। আর যদি দু'জন পুরুষ না পাওয়া যায়, তাহলে একজন পুরুষ ও দু'জন মহিলা সাক্ষী হবে, যাতে একজন ভুলে গেলে অন্যজন তাকে স্মরণ করিয়ে দেবে। (সূরা আল-বাকারা: আয়াত-২৮২)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: আলোচ্য আয়াতাংশে লেনদেনে দলীল লেখা ও লেখানোর জরুরি মূলনীতি ব্যক্ত করা হয়েছে। ইসলামে লেনদেনে দলীল সম্পাদনার সাথে সাথে সাক্ষী রাখার জন্যে বিধান দেয়া হয়েছে। যেন কখনো কোনো পারস্পরিক কলহ দেখা দিলে আদালতে সাক্ষীদের সাক্ষ্য দ্বারা ফায়সালা করা যেতে পারে। কিন্তু কিফহ শাস্ত্রবিদগণের মতে কেবল লেখা শরীয়ত সম্মত প্রমাণ নয়, সাথে সাথে সাক্ষীও থাকতে হবে। সাক্ষী ছাড়া কেবল লেখার উপর ভিত্তি করে বিচার ফায়সালা করা শরীয়ত সম্মত নয়।
শরীয়ত সাক্ষীর সংখ্যাও নির্ধারণ করে দিয়েছে, সমাজে গ্রহণযোগ্য দু'জন মুসলমান পুরুষ সাক্ষী থাকতে হবে। যদি দু'জন পুরুষ না পাওয়া যায়, তবে অন্তত: একজন পুরুষ ও দু'জন নারীকে সাক্ষী বানাতে হবে। যাতে করে একজন নারী বিষয়টি ভুলে গেলে অপরজন তা স্মরণ করিয়ে দিতে পারে।
আলোচ্য আয়াতে সাক্ষ্য গ্রহণের কতিপয় জরুরি নীতিমালা বর্ণিত হয়েছে। যেমন- ১. সাক্ষীর সংখ্যা হবে দু'জন পুরুষ। ২. সাক্ষীদ্বয়কে মুসলিম হতে হবে। ৩. দু'জন পুরুষ না পেলে অন্তত: একজন পুরুষ ও দু'জন নারী সাক্ষী হবে। ৪. সাক্ষী করতে হবে এমন সব লোককে যারা নিজেদের নৈতিক চরিত্র বিশ্বস্ততার কারণে লোক সমাজে নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচিত। ৫. একা একজন পুরুষ অথবা কেবল দু'জন স্ত্রীলোক সাক্ষীর জন্য যথেষ্ট নয়।